ডানদিকে পঞ্চম দরজাটা খোলা। ভিতরে ছোট্ট একটু বাঁধানো উঠানমতে। উঠানের চারদিক ঘিরিয়া দু-তিনটি খুব ছোট ছোট খুপরির মতো ঘর। উঠানের একপ্রান্তে জলের কল (বাবার ডায়েরিতে আছে বাবা কাশীতে প্রথম জলের কল দেখে, এই কলটাই নাকি?) আর ঠিক মাঝখানে একটি তুলসীমঞ্চ। দুইজন বৃদ্ধা একটি ঘরের সামনে বারান্দায় বসিয়া মালা জপ করিতেছে। ঘরের মধ্যে কথাবার্তার আওয়াজ কানে যাইতেছে বটে, কিন্তু কাহাকেও দেখা যাইতেছে না। বারান্দার বৃদ্ধা দুইজন সম্ভবতঃ চোখে খুবই কম দেখে, কাজলের উপস্থিতি গ্রাহ্য না করিয়া তাহারা মালা জপ করিয়া চলিল।
কাজল দাঁড়াইয়া কী করিবে ভাবিতেছে, এমন সময় তুলসীমঞ্চে সন্ধ্যা দিবার জন্য একজন প্রৌঢ়া মহিলা প্রদীপ হাতে বাহির হইয়া কাজলকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া বলিলেন–কে? কে ওখানে? কী চাই?
কাজল বলিল—আজ্ঞে আমি, একটু প্রয়োজন ছিল—
—কী প্রয়োজন? কার কাছে এসেছেন?
-আপনি বরং সন্ধেটা দেখিয়ে নিন, তারপর বলছি। ব্যাপারটা বোঝাতে আমার একটু সময় লাগবে।
প্রৌঢ়টি অবাক হইয়া কাজলের দিকে একবার তাকাইয়া তুলসীতলায় প্রদীপ নামাইয়া প্রণাম করিল। এব মধ্যে তাহাদের গলার শব্দ পাইয়া এক ভদ্রলোক ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছেন। কাজল আন্দাজে বুঝিল-ইনিই রামধন মুখুজ্যে। ভদ্রলোক বলিলেন–কী চাই মশাই? এদিকে আসুন—
কাজল রোযাকের কাছে গিয়া বলিল—আমার নাম অমিতাভ রায়। আমি কলকাতা থেকে আসছি। আপনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল—
-আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না তো! কী দরকার?
–দরকার তেমন কিছু নয়। আসলে এই বাড়িতে অনেকদিন আগে আমার ঠাকুরদা আর ঠাকুমা ভাড়া থাকতেন। বাবা তখন খুব ছোট। এই বাড়িতেই আমার ঠাকুরদা মারা যান। আমি আজ সকালে কাশী এসেছি, এমনি বেড়াতে—ভাবলাম বাবার ছোটবেলা কেটেছে যেখানে সে বাড়িটা দেখে যাই।
সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাইয়া রামধন মুখুজ্যে বলিলেন–ব্যস, এই কারণে এসেছেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
সন্ধ্যা দেখাইতে আসা প্রৌঢ়াটিও অবাক হইয়া তাকাইয়া আছেন। কাজল ইহাদের দোষ দিতে পারিল না। সন্ধ্যার অন্ধকারে একজন অপরিচিত লোক এমন অদ্ভুত অনুরোধ লইয়া উপস্থিত হইল, যা দিনকাল পড়িয়াছে, সন্ত্রস্ত না হইয়া উপায় থাকে না।
রামধন বলিলেন—বাড়িটা দেখতে এসেছেন মানে বুঝলাম না! কীভাবে বাড়ি দেখবেন?
বাড়িটা সে অতসী কাচ হাতে লইয়া গল্পের গোয়েন্দার মতো হামাগুড়ি দিয়া দেখিবে না। কিন্তু অতীতের স্মৃতির সঙ্গে জড়িত স্থানের প্রতি যে গভীর আকর্ষণ তাহা অন্যকে বোঝানো দুরুহ। বোধটা যাহার মধ্যে আছে, তাহার আছে। যাহাব নাই, নাই।
কাজল বলিল—আজ্ঞে বিশেষ করে দেখার তো কিছু নেই। তবে ঠাকুরদা কোন ঘরটায় থাকতেন সেটা যদি একবার জানতে পারতাম–
ঘরের মধ্যে ঢুকিতে চায় যে! রামধন মুখুজ্যে ভাবিতেছিলেন লোকটাকে আর প্রশ্রয় দেওয়া উচিত হইবে কিনা, এমন সময় বাহিরের দরজা দিয়া একজন সুবেশ স্মিতদর্শন যুবক ঢুকিয়া উঠানে দাঁড়াইল। তাহাকে দেখিয়া রামধন যেন গুরুতর সমস্যার হাত হইতে মুক্তি পাইলেন। বলিলেন–এই যে নির্মল, বেড়ানো হল? তুমি একবার কথা বল তো এর সঙ্গে। আমি ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারছি নে–
পরে কাজলের দিকে ফিরিয়া ঈষৎ গর্বের সুরে বলিলেন–আমার ভাগ্নে, কলকাতায় ইংরিজি খবরের কাগজের অফিসে চাকরি করে শহরের বড়ো বড়ো সব লোকের সঙ্গে জানাশোনা। আপনি বরং এর সঙ্গে কথা বলুন। কাল এসেছে আমার কাছে বেড়াতে–
যুবকটির বয়েস বছর আটাশ-ঊনত্রিশ, পরনে পায়জামা ও পাঞ্জাবি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। ছিপছিপে চেহারা, রঙ ফরসা। মুখেচোখে বুদ্ধির ছাপ। সে কাজলের দিকে ফিরিয়া বলিল–কী ব্যাপার ভাই? আপনি কোথা থেকে আসছেন?
যুবকটির আবির্ভাবে কাজল খুশি হইয়াছিল। ইহাকে বিষয়টা বোঝানো সহজ হইবে। নিজের আগমনের কারণ সে পুনরায় খুলিয়া বলিল। তাহার পর হাসিয়া বলিল—কিছুটা নস্টালজিয়া, কিছুটা নিজের ফ্যামিলির ইতিহাসের প্রতি মোহ—এই আর কী! আপনাদের অবশ্য বড়োই কষ্ট দেওয়া হল–
-কিছু নয়। কিন্তু মামা কী বলতে পারবেন এঁরা কোন ঘরে থাকতেন? পুরোনো ভাড়াটেরা এখন আর কেউ নেই। মামাই নিচের সবটা নিয়ে থাকেন।
রামধন বলিলেন—না, আমি বলতে পারব বলে মনে হচ্ছে। কাবণ এদিকের ঘর দুটো বাড়িওয়ালা কখনওই ভাড়া দিত না, নিজেই থাকত। ওপাশের দুটো ঘরের মধ্যে ডানদিকেরটায় পুরোনো ভাড়াটেরা বহুদিন ছিল, আমরা আসায় উঠে গিয়েছে। কাজেই হলে ওই বাঁদিকের কোণের ঘরটাই হবে। দেখবেন? যাও না নির্মল, একবার দেখিয়ে দাও
মোটা দেওয়াল আর নিচু ছাদওয়ালা পুরাতন ঘর। বাতাস ঢুকিবার পথ নাই। উঃ, এই ঘরের মধ্যে তাহার বাবা ছোটবেলায় থাকত! ঘরের মধ্যে গত পঞ্চাশ বছরে একবারও বোধহয় চুনকাম হয় নাই। বিবর্ণ, ধূসর দেওয়ালে সঁাতাধরা দাগ। বর্তমানে ঘরটি বোধহয় বিশেষ ব্যবহার হয় না, কারণ কয়েকটি টিনের তোরঙ্গ এবং এককোণে দাঁড় করানো একটি গোটানো মাদুর ছাড়া ঘরে আর কোনও আসবাব নাই। কড়িকাঠ হইতে ঝুলন্ত তারের ডগায় একটি অল্প পাওয়ারের ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলিতেছে। তাহার বাবার সময় নিশ্চয়ই বিদ্যুতের আলো ছিল না, পরে হইয়াছে।
বাবার শৈশব, ঠাকুরদার মৃত্যু, ঠাকুমার কত দুঃখ ও সংগ্রাম–এই ঘরে। কাজল অনেকক্ষণ অবাক হইয়া তাকাইয়া রহিল, যদিও ঘরের শ্রীহীন অভ্যন্তরে বিশেষ করিয়া দেখিবার কিছু ছিল না। নির্মল ছেলেটি বিবেচক, কাজলের মনের অবস্থা অনুমান করিয়া সে চুপ করিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল।
