কিন্তু ভারতীয় রাগসঙ্গীতের প্রভাব অন্যরকম। সুরের জগতের এই অদ্ভুত দিকটা কাজল বিস্ময়ের সহিত লক্ষ্য করিয়াছে। দেশী গান বা ওস্তাদের বাজনা শুনিলে মন দিগবিদিকে ছড়াইয়া পড়ে না, বরং আত্মস্থ হইয়া নিজেরই হৃদয়ের গভীরে ডুব দিয়া ধ্যানমগ্ন হইয়া পড়ে। ভাবিলে তাহার অবাক লাগে, একই তো স্বরসপ্তক—তাহারই হেরফেরে কত বৈচিত্র্য!
কে জানে মৃত্যুর পর আর কোথাও নতুন করিয়া জীবন শুরু হয় কিনা, কোথাও আবার মায়ের কোল, স্বপ্নমাখা শৈশব অপেক্ষা করিয়া থাকে কিনা। হয়তো অনন্ত কালসমুদ্রে বর্তমান জীবনই একমাত্র সবুজ দ্বীপ। কিছু একটা করিতে হইবে। সময় বৃথা বহিয়া যাইতেছে।
একদিন বিকালে ইউনিভার্সিটি হইতে বাহির হইয়া কাজল ও প্রভাত গোলদিঘির একটা বেঞ্চে গিয়া বসিল। অপরাহের বৌদ্র রাঙা হইয়া মহাবোধি সোসাইটির বাড়ির গায়ে পডিযাছে। কতকগুলি অল্পবয়স্ক ছেলে জল ছোঁড়াছুড়ি করিযা স্নান কবিতেছে। কিছুক্ষণ নানা বিষয়ে আলোচনা কবিবাব পর কাজল বলিল–প্রভাত, একটা কথা তোমাকে বলব বলে কদিন ভেবে রেখেছি, কিন্তু ঠিকমতো সুযোগ না পাওয়ায় আর বলা হয়ে উঠছে না। বিষয়টা আমার কাছে খুব জরুরি
প্রভাত কাজলের গলাব স্ববে একটু বিস্মিত হইয়া বলিল–খুব জবুবি? কী বিষয়ে?
-দেখ, কিছুদিন ধবেই মনে হচ্ছে জীবনটা যেন বৃথা কাটিয়ে দিচ্ছি। প্রত্যেকেই একটা না একটা কিছু করার জন্য পৃথিবীতে আসে। আমার পড়াশুনো তো শেষ হয়ে এল, কিন্তু সামনে আমার কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই। এবার কী করব প্রভাত?
প্রভাত কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিল—খুব শক্ত প্রশ্ন। এখুনি আমি তোমাকে এব জবাব দিতে পারবো না। তবে একটা কথা বলি, তোমাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে বিচার করার সুযোগ আমার হয়েছে তাতে মনে হয় শিল্পই তোমার পথ।
—শিল্প? কী ধরনের শিল্পের কথা বলছো?
-বৃহত্তরভাবে শিল্প বলতে যা বোঝায়। তোমার মধ্যে অনেক বলবার কথা রয়েছে, শিল্পের মাধ্যমে তা প্রকাশের চেষ্টা করে দেখছো না কেন?
কাজল বলিল–যেমন?
—যেমন তুমি সাহিত্যিক হবার চেষ্টা করে দেখতে পাবো। শিল্পের অন্য কোনও শাখায় এমন নিভৃত চর্চার সুযোগ আর নেই।
কাজল হাসিয়া বলিল—এ কথাটা আমি নিজেও ভেবেছি, কিন্তু এতে অনেক অসুবিধা আছে।
-কিসের অসুবিধে?
—অনেক রকম। প্রধান দুটোব কথা বলছি, শোনন। প্রথমতঃ, সাহিত্যে আমার সত্যিকারের কোনো প্রবণতা আছে কিনা তা বোঝা দরকার। নইলে কেবলমাত্র আমার খেয়াল হয়েছে বলেই লিখতে শুরু করার কোনও মনে হয় না। সাহিত্য চার পয়সার চানাচুর নয়, যে ইচ্ছে কিনে এনে চিবোতে পারে না
প্রভাত বলিল—এর সমাধান এই সমস্যার মধ্যেই নিহিত আছে। তোমার মধ্যে সাহিত্যিক প্রতিভা রয়েছে কিনা জানাবার জন্য তোমাকে আগে তা লিখতে হবে। আর একটা কী?
আমার বাবা লেখক ছিলেন। নিজের মুখে বলছি বলে কিছু মনে কোরো না, বর্তমান কালের পাঠকেরা বাবাকে বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে আমাকে লিখতে হলে খুব বিরাট বাধা ঠেলে এগুতে হবে–
—এ কথা আমার ঠিক বলে মনে হয় না।
-নাও হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় পাঠকেরা আমার লেখাকে আমার বাবার লেখাব সঙ্গে মনে মনে তুলনা করবে। সেটা নতুন লেখকের পক্ষে কাম্য নয়। বিখ্যাত মানুষের ছেলের পক্ষে বড়ো কাজ করা খুব কঠিন।
প্রভাত সামান্য ভাবিয়া বলিল হতে পারে, জোর করে না বলব না। কারণ সত্যিই বৃড়ো মানুষের ছেলেকে বড়ো হতে দেখা যায় না। কিন্তু এটাও তো পরীক্ষাসাপেক্ষ অমিতাভ। তাছাড়া গত তিন-চার বছরে তোমার কিছু লেখা আমি পড়েছি, তাতে প্রকৃতই সৎ সাহিত্যের উপাদান রয়েছে। তুমি লেখো।
দুই বন্ধুতে আরও অনেক আলোচনা হইল। ফিরিবার সময় প্রভাত বলিল—তুমি এবার কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করো, বুঝলে? শুধুমাত্র ভেতরে অনেক বলবার কথা থাকলেই তা দিয়ে সাহিত্য হয় না। বলার কথাটা হচ্ছে পাখি, কিন্তু সে পাখির জন্য একটা ভালো খাচা দরকার। খাচা বানাবার মালমশলা জোগাড় করতে শুরু করো–
রাত্রিতে শুইয়া কাজল অনেক চিন্তা করিল। জীবনকে সম্যকভাবে জানিতে হইলে এই চার দেওয়ালের মধ্যে বসিয়া থাকিলে চলিবে না। কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়াই কিছুদিন ঘুরিয়া বেড়াইলে কেমন হয়? সামনে পূজা আসিতেছে, সে সময় ইচ্ছা করিলে মাসখানেক বেড়ানো চলে। অবশ্য পূজার পর তিন-চার মাসের মধ্যেই এম.এ. পরীক্ষা, পড়াশুনার ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা আছে। তবে বইপত্র কিছু সঙ্গে লওয়া যাইতে পারে। আর ফিরিবার পর বেশি করিয়া পড়াশুনা করিলে ক্ষতি সামলাইয়া লওয়া যাইবে।
এবার বাহির হইবে সম্পূর্ণ একা। বন্ধুদের সঙ্গে নহে।
সিদ্ধান্ত লইবার সঙ্গে সঙ্গে কাজল সমস্ত মনে একটা অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করিল। প্রকৃত জীবনানন্দ স্থাণুত্বের পরিপন্থী—সবরকম বন্ধনকে অগ্রাহ্য করিয়া পৃথিবীর মূক্ত প্রসাবে ইচ্ছামতো বিচরণের একটা নেশা আছে। মানুষ মূলতঃ প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতিব সন্তান, অবণ্যে-প্রান্তরে ছিল তাহার নিবাস। সভ্যতার প্রয়োজনে পরে সে নগর গড়িয়াছে, যন্ত্র বানাইয়াছে বটে, কিন্তু ইট কাঠলৌহে প্রস্তুত মহানগর তাহার প্রকৃত আশ্রয় নহে। মানুষের মস্তিষ্কের কোনও এক গোপন কোণে তাহার অরণ্যচারী মুক্ত জীবনের প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতি লুকাইয়া আছে, যে কারণে সামান্য সুযোগ পাইলেই লোকে তল্পিতল্পা বাঁধিযা বেড়াইতে বাহির হয়, হারাইয়া যাওয়া সেই আনন্দময় স্বাধীনতাকে আর একবার আস্বাদন করিতে চায়। তাহা না হইলে কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করিয়া, পথের কষ্ট ভোগ করিয়া অচেনা বিদেশে ঘুরিবার অন্য কী সার্থকতা আছে?
