একদিন একটা মজার কাণ্ড হইল।
দুপুর আড়াইটার পর ইউনিভার্সিটিতে আর কোনও ক্লাস ছিল না। কাজল বইখানা হাতে ট্রামে চাপিয়া এপ্ল্যানেডে গিয়া নামিল। হাঁটিতে হাঁটিতে ময়দানে একটা কাঠবাদামের গাছ দেখিয়া তাহার নিচে বসিয়া পড়িল। দূরে পশ্চিমদিকে গঙ্গাবক্ষে সারি সারি জাহাজ বাঁধা, তাহাদের মাস্তুলগুলির ঊর্ধ্বমুখ স্পর্ধায় আকাশকে বিদ্ধ করিতেছে। দুপুরে শেষ ক্লাসে ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রেড পড়ানো হইতেছিল। তাহার কয়েকটা লাইন মনে আসিল কাজলের। হাতে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের কবিতার সংকলনখানা ছিল, সেটার পাতা উল্টাইয়া সে প্রেলড-এর নির্বাচিত অংশ বাহির করিয়া পড়িতে লাগিল। জীবনের এইসব একান্ত মুহূর্তগুলি বড়ো সুন্দর। ঘাসের উপর দিনান্তের রৌদ্র আসিয়া এলাইয়া পড়িয়াছে, আপনমনে বসিয়া কেমন কবিতা পড়া।
কাছেই কেহ কী বলিয়া যেন চেঁচাইতেছে। তাহার কর্কশ স্বরে বিরক্ত হইয়া কাজল মুখ তুলিয়া তাকাইল।
একজন হিন্দুস্থানী গাড়োয়ান শ্রেণীর লোক কিছুদূরে গামছা পাতিয়া ঘুমাইতেছিল। একটা লালমুখো সার্জেন্ট আসিয়া তাহাকে ঠেলিয়া তুলিয়া গালিগালাজ করিতেছে। গভীর নিদ্রা হইতে অকস্মাৎ জাগিয়া এই নিদারুণ বিপৎপাতে লোকটা হতচকিত হইয়া পড়িয়াছে। সার্জেন্ট তিবস্কারে ক্ষান্তি দিয়া নির্যাতন পর্বের সমাপ্তি-অনুষ্ঠান হিসাবে লোকটিকে একটা রদ্দা মারিল। নীরবে অপমান পরিপাক করাই এক্ষেত্রে দুর্বলের একমাত্র পন্থা, লোকটা মাবের চোটে মাটিতে বসিয়া পড়িল, তারপর ম্লানমুখে ধীরে ধীরে নিজের গামছাটা পাট করিয়া কঁাধে লইয়া যাইবার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইল।
কাজলের হঠাৎ খুব রাগ হইল। অকস্মাৎ সে উঠিয়া হিন্দুস্থানী লোকটার সামনে গিয়া বলিল—দাঁড়াও, কোথায় যাচ্ছো? শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্ট কোমরে হাত দিয়া দাঁড়াইয়া ব্যাপার দেখিতেছিল, তাহাকে বলিল–তুমি এ লোকটাকে অকারণে মারলে কেন?
বিজিত দেশের নাগরিকের নিকট হইতে শাসকজাতির প্রতিনিধি এ ধরনের প্রশ্ন আশা করে। সার্জেন্ট বিস্মিত হইয়া বলিল—আমি কী তোমার কাছে আমার কাজের কৈফিয়ৎ দেব? তুমি কে?
—আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। না, তুমি পুলিশ, তোমার কর্তব্যের জন্য আমার কাছে কৈফিয়ৎ দিতে বাধ্য নও। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি এই লোকটা কোনও অপরাধ করেনি, অথচ তুমি একে শারীরিক নির্যাতন করলে।
সার্জেন্টের মুখ লাল হইয়া উঠিল।—তুমি কী আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো?
কাজল বলিল–আদৌ না। আমি শুধু এই কথা বলছি যে, ভাগ্যক্রমে আমরা পরাধীন, তোমরা শাসক। কিন্তু চিরকাল কোনও জাতি পরাধীন থাকে না, যদি কোনওদিন তোমাদের চলে যেতে হয়, তাহলে পেছনে কিছু সুন্দর স্মৃতি রেখে যাওয়াই কী ভালো নয়?
—মাঠের এই অংশ জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নয়। এখানে শুয়ে থাকা বেআইনি—
–সেই কথাটা তুমি একে বুঝিয়ে বলতে পারতে। পশুশক্তির প্রকাশে কোনও মহত্ত্ব নেই।
–তোমাকে কর্তব্যে বাধাদানের জন্য আমি এখনই গ্রেপ্তার করতে পারি জানো?
সরাসরি এ কথার উত্তর না দিয়া কাজল বলিল—আমার হাতে এই বইটা দেখছো? এখানা তোমাদের বিখ্যাত কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখা, এক্ষুনি বসে বসে পড়ছিলাম। একে আমি একজন মহাকবি বলে মনে করি। যে জাতি এমন মহাপুরুষের জন্ম দিয়েছে সেই জাতির লোকের কাছে কী আমরা এর চেয়ে ভালো ব্যবহার আশা করতে পারি না?
সার্জেন্টটি একেবারে run of the mil নহে। বয়সেও তরুণ, এখনও কঠিন হৃদয় পুলিশে পরিণত হইতে পারে নাই। তাহার মুখের রাগত ভাব একটু একটু করিয়া কমিয়া আসিল। সে বলিল—তুমি কী সত্যিই বিশ্বাস করে একদিন ব্রিটিশরা ভারত থেকে চলে যাবে? একদিন এ দেশ আর আমাদের সাম্রাজ্যের অধিকারে থাকবে না?
আমি সত্যিই একথা বিশ্বাস করি। ইতিহাস কী সেই সাক্ষ্যই দেয় না? কোনও জাতি কখনও চিরকাল পরাধীন থেকেছে? আর প্রকৃত বীর এবং সভ্যজাতের লক্ষণ হল দুর্বলের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করা।
শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্ট কয়েক মুহূর্ত কী ভাবিল, তারপর হঠাৎ কাজলের দিকে হাত বাড়াইয়া বলিল–অ রাইট, আই অ্যাম সিনসিয়ারলি সরি। কাম, জয়েন হ্যান্ডস্–
এতদুর হইবে তাহা কাজল ভাবে নাই। সে হাসিমুখে করমর্দন করিল।
–আমার নাম হ্যারল্ড ওগডেন, শতকরা একশো ভাগ ব্রিটিশ রক্ত বইছে আমার শরীরে। তবু বলি, তোমরা স্বাধীনতা পেলে আমি খুশি হব
তারপর হাসিতে হাসিতে বলিল—তুমি আবার আমার এ কথা ওপরওয়ালাদের বলে দিয়ে, তাহলে গরিবের চাকরিটি যাবে!
ওগডেন চলিয়া গেলে কাজলও ট্রাম ধরিবার জন্য পা বাড়াইল। সমস্ত ঘটনার কেন্দ্র সেই হিন্দুস্থানী লোকটি একটু দুরে দাঁড়াইয়া ব্যাপার দেখিতেছিল। সে এবার আগাইয়া আসিয়া বলিল–আরে বাপ! আপ তো বহোৎ তেজি আদমি বাবুসাহেব! গোরা পুলিশ ভি আপনাকে কুছু বলল না!
—ও কিছু না ভাই, সাহস করে কথা বললে একটু তো ফল হয়ই–
লোকটির মুখে অকৃত্রিম বিস্ময় ও শ্রদ্ধা ফুটিয়া উঠিয়াছে। সে বলিল—ওফ! বাবুজির আংগ্রেজি যেন মিশিনগানের গুলি–
মনের মধ্যে কীসের একটা অতৃপ্তি, একটা অপূর্ণতার ভাব। কী যেন করিবার ছিল, যাহা করিতে পারিলে জীবনটা সার্থকতা লাভ করিত—সেটা ক্রমাগতই স্বর্ণমৃগের মতো জীবন-অরণ্যের বিশাল বৃক্ষের ফাঁকে ফাঁকে সরিয়া বেড়াইতেছে। জন্ম-কর্ম-প্রেম-মৃত্যুর সমস্ত স্বাভাবিক পর্যায়ের মধ্য দিয়া আর এক অলৌকিক জগৎ পরিব্যাপ্ত, শেষরাত্রির নিবিড় সুষুপ্তির ভিতরে যে জগৎটার আবছা তীরভূমি ব্যবধানের সমুদ্রপারে ক্ষণমুহূর্তের জন্য দেখা দিয়াই আবার দেশ-কালের জটিল গোলকধাঁধায় হারাইয়া যায়। রিটায়ার করিবার কিছুদিন আগে সুরপতি একটা হিজ মাস্টার্স ভয়েস কোম্পানির গ্রামোফোন কিনিয়াছিলেন। মামাবাড়ি হইতে সেটি কাজল লইয়া আসিয়াছে। ওয়েলিংটনের মোড়ের পুরোনো রেকর্ডের দোকান হইতে সংগ্রহ করা একসেট মোজার্ট, বিঠোফেন, শুম্যান, শোপার রেকর্ড হাতে বাজাইয়া মাঝে মাঝে কাজল শোনে। আনফিনিশড সিম্ফনি বা পেজ্যান্টস মেরিমকিং-এর নরম পর্দার স্বরগুলি ওবো-র বিষণ্ণ উদাস করা আওয়াজে বুকের গভীর গোপন হইতে ভুলিয়া যাওয়া হারানো ব্যথা তুলিয়া আনে, পিয়ানোর শব্দে পাইনবন হইতে বরফগলা জলের ঝরনা নামিয়া আসে। চোখের সামনে ভাসিয়া ওঠে বাৰ্চ, বিচ আর অ্যাসপেন অরণ্য। তাহার ফাঁকে ফাঁকে উত্তরসমুদ্র হইতে বহিয়া আসা হিমশীতল বাতাস সারাদিন খেলা করে। কোথায় রহিয়াছে সাহারা মরুভূমির মধ্যবর্তী তাসিলি পাহাড়, যাহার গুহায় বহুসহস্র বৎসর পূর্বে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আঁকা চিত্র অন্ধকারে গোপন আছে একদিন প্রকৃত রসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার আশায়। কোথায় আমাজন অববাহিকার উন্নতশীর্ষ বৃক্ষের ডালে বসিয়া তীক্ষ্ণস্বরে ডাকে টুকান পাখি, তাহার বিচিত্রবর্ণের শরীর বেলাশেষের সূর্যালোকে ক্ৰমে নিষ্প্রভ হইয়া আসে। ইস্টার দ্বীপের প্রস্তরময় তটভূমিতে লাফাইয়া পড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ব্যস্ত তরঙ্গমালা। জাপান সমুদ্র পার হইয়া যায় বিধ্বংসী শক্তিসম্পন্ন সুনামী প্রবাহ। ট্রঘোনের স্বরে যেন শতবৎসরের বিস্মৃতির পর্দাটা সরিয়া যায়, কাজলের মনে হয় কবে যেন সে ওইসব দেশে একবার করিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। কতবার সে বলগাহরিণের স্নেজে চাপিয়া বিভার শিকার করিতে গিয়াছে, দেখিয়াছে নরম তুষারের উপর ভালুকের সদ্যসৃষ্ট পদচিহ্ন। কতবার ইউফ্রেটিস নদীর জলে সাঁতার কাটিয়া নলখাগড়ার বনের ধারে কাপড় শুকাইতে দিয়া তাকাইয়া থাকিয়াছে নীল আকাশের দিকে। দুর্গের চূড়া হইতে রাজকুমারীকে একহাতে ধরিয়া লাফাইয়া পড়িয়াছে পরিখার জলে। হানিবলের আল্পস পর্বত পার হইবার সময় সে ছিল সশস্ত্র সৈনিক, ফিনিশীয় নৌবাণিজ্যের যুগে সে ছিল একজন সার্থবাহ। তারসপ্তকে বেহালার সম্মিলিত করুণ-মধুর স্বরে বুকের মধ্যে হারানো সেই সব দিনের জন্য একটা অদ্ভুত হাহাকার মাথা কুটিয়া মরে।
