চেস্টারটন পড়তে শুরু করেছি। এবার আসবার সময় কিনে নিয়ে এসেছিলাম। গতকাল Hammer of God শেষ করেছি। দেখা হলে আলোচনা করব। ততদিনে সব গল্প পড়া হয়ে যাবে।
একবার আমাদের এখানে বেড়াতে আসুন না। আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে বাবাকে বলেছি, উনি খুব খুশি হয়েছেন। আপনি এলে ভারি আনন্দ পাবেন।
আশা করি ভালো আছেন। নমস্কার নেবেন। ইতি–
অপালা
চিঠি পড়া শেষ করিয়া কাজল অন্যমনস্কের মতো কাগজ কয়খানা খামে ভরিয়া টেবিলে রাখিয়া দিল। জানালা দিয়া মৃদু বাতাস আসিতেছে। জানালার ঠিক বাহিরেই একটা টগর গাছ, অন্ধকারের ভিতব তাহার আরছা আদল বোঝা যায়। শেলী লিখিয়াছিলেন—The champak odours fail! কী যেন নাম কবিতাটার? Lines to an Indian Air? প্রথম পড়িবার সময় মনের ভিতর চম্পকসুরভিত একঝলক বসন্তের বাতাস বহিয়া গিয়াছিল। হঠাৎ এখন সেই অনুভূতিটা যেন আবার ফিরিয়া আসিল। কিংবা ঠিক অতটা নহে—তবু কেমন একটা ঘোর-ঘোর ভাব। অবশ্য ইহাকে নিশ্চয় প্রেমপত্র বলা চলে না, ট্রাডিশনাল প্রেমপত্রের কোনো লক্ষণ ইহাতে নাই। কিন্তু এই প্রথম একজন মেয়ে তাহাকে চিঠি লিখিয়াছে। এতদিনে তাহার জীবনে এমন কিছু ঘটিল, যাহা একান্তভাবে তাহার নিজের।
এ চিঠি সে কাহাকেও দেখাইবে না, অন্য কাহারও ইহাতে কিছুমাত্র অধিকার নাই। একটা বয়স পর্যন্ত মানুষের জীবনে কোনো গোপনীয়তা থাকে না, ফলে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের চিহ্নও থাকে না। গোপনীয়তার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয় আঁটে, কিন্তু তাহার জন্য কিছু মূল্যও দিতে হয়।
যাই যাই করিয়াও সরল শৈশবের যেটুকু অংশ প্রথম যৌবন পর্যন্ত থাকিয়া যায়, সেই অনাবিল সারল্য মূল্য হিসাবে বিসর্জিত হয়।
অবশ্য অপালা প্রেমপত্র লেখে নাই। সাধারণ চিঠি—যেমন বন্ধু বন্ধুকে লেখে।
০৬. জনার্দন গাঙ্গুলী
যষ্ঠ পরিচ্ছেদ
জনার্দন গাঙ্গুলী শহরে একটি অতি পরিচিত মুখ। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ সে সাব-পোস্টাপিস হইতে চিঠির ঝুলি কাঁধে লইয়া একটি পুরাতন ব্যালে সাইকেলে চাপিয়া চিঠি বিলি করিতে বাহির হয়, এবং বিকাল তিনটা সাড়ে তিনটার সময় পত্ৰবিতরণ শেষ করিয়া দিনের কর্তব্য সাঙ্গ করে। অন্যান্য পিওনেরা বেলা দেড়টা কি দুইটার ভিতর কাজ শেষ করে, কিন্তু জনার্দন গাঙ্গুলী সবার আত্মীয়-কেহ তাহাকে দাদা, কেহ মামা, কেহ অন্য কিছু বলিয়া ডাকে। প্রত্যেকের বাড়িতে কুশলপ্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া, একগ্লাস জল খাইয়া, মেয়ের বিবাহের কতদূর কি ঠিক হইল, কর্তার গেঁটেবাত কেমন আছে সে সম্বন্ধে সংবাদ লইয়া চিঠি বিলি করিতে তাহার কিছু বিলম্ব হয়। তাহার বিশ্বস্ত। বাহনটি বিগত পঁচিশ বৎসর ধরিয়া অক্লান্তভাবে তাহাকে পিঠে করিয়া কর্তব্য পালনে সাহায্য করে। সহকর্মী কিংবা চিঠির গ্রাহকদের কাছে বাহনটি বিখ্যাত। প্পি মারা চাকা, জং ধরা নড়বড়ে মাডগার্ড, ছিড়িয়া স্পঞ্জ বাহির হওয়া সিট, সামনের রডের সহিত নারিকেলের দড়ি দিয়া বাঁধা, রবারের বলহন—সমস্তটা মিলাইয়া অত্যন্ত করুণ দৃশ্য। নেহাত প্রকৃত বিলাতী র্যালে বলিয়া ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কাঁপিতে কাঁপিতে এখনও পথ অতিক্রম করে।
জনার্দন গাঙ্গুলীর মুখের আকৃতি কিছুটা চতুষ্কোণ, ছোট ছোট করিয়া চুল ছাঁটা—যথেষ্ট তৈলদান সত্ত্বেও সেগুলি সটান দাঁড়াইয়া থাকে। চোখদুটি বর্তুলাকার এবং সামান্য রক্তবর্ণ। মাঝারি দৈর্ঘ্য, গায়ে মোটা খাকির জামাতাহাতে পিতলের বোম বসানো। পরনে খাকির প্যান্ট এবং পায়ে শক্ত চামড়ার কালো রঙের কাবুলি চপ্পল। বয়েস বছর বাহান্ন হইবে। এই বর্ণনা হইতে চোখের সামনে অবশ্যই একটি নয়নাভিরাম দেবমূর্তি ভাসিয়া ওঠে না, কিন্তু চেহারা যেমনই হোক, গাঙ্গুলী পিওন মানুষটি ভালো।
পরের দিন কী একটা অজুহাতে কলেজ কামাই করিয়া কাজল তাহাদের গলির উলটাদিকে যে বটগাছটা আছে তাহার তলায় বেলা এগারোটা নাগাদ গিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। গাছের শিকড়ের উপর বসিয়া খোঁড়া অযোধ্যা নাপিত সামনে ইটের আসনে উপবিষ্ট খরিদ্দারের দাড়ি কামাইয়া দিতেছে। কাজলকে দেখিয়া বলিল–কী খোকা, দাড়ি বানাবে? কাজল হাসিয়া বলিল—না। ইহা তাহাদের পুরাতন রসিকতা। কাজল বাড়িতে নিজেই দাড়ি কামায় সে কথা অযোধ্যা জানে, তবু দেখা হইলেই সে রোজ এই কথা বলিবে। অযোধ্যা কাজলকে বালক দেখিয়াছে, তখনও দেখা হইলেই হাতে ক্ষুর লইয়া হাসিয়া বলিত—এসো থোকা, হজামৎ করে দিই। সে অভ্যাসটা রহিয়া গিয়াছে।
সাড়ে এগারোটার সময় দূরে নড়বড়ে সাইকেলের উপর গাঙ্গুলী পিওনের খাকি পোশাক পরা পরিচিত চেহারার উদয় হইল। কাজল তাহাকে গলির মুখে ধরিয়া ফেলিয়া বলিল—গাঙ্গুলীমামা, আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল
জনার্দন গাঙ্গুলী সাইকেল হইতে নামিয়া কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল–কী রে? এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কী বলবি?
কাজল জীবনে কখনও মিথ্যা কথা বলে নাই এমন নহে, কিন্তু মুখে সারল্য এবং নিষ্পাপ ভাব ফুটাইয়া এ ধরনের ডাহা মিথ্যা বলিতে সে অভ্যস্ত নয়। সে আমতা আমতা করিয়া বলিল—যা, ইয়ে হয়েছে কী—আমার চিঠি সম্বন্ধে আপনাকে—মানে, বিলি না করে যদি–
—কী বলছিস ঠিক করে বল দেখি! বিলি না করে কী করবো?
কাজল ঘামিয়া উঠিয়াছে। অসংলগ্নভাবে সে বলিল—চিঠিগুলো, মানে আমার নামে যেগুলো আসবে, আপনি যদি–বুঝতে পারলেন তো?
