গাঙ্গুলী পিওনের চোখ দুটি আরও ছোট ছোট এবং অধিকতর বর্তুলাকার হইয়া গেল। সে বলিল—না, আমি ঠিক বুঝলাম না।
কাজল মরীয়া হইয়া বলিল—সেগুলো যদি আপনি বিলি না করে আপনার কাছে রেখে দেন তাহলে খুব ভালো হয়। বাড়িতে গোলমালকে কোথায় রেখে দেয়, পরে আর পাই না। শনিবার আমার কলেজ থাকে না, বাড়িতেই থাকি। সেদিন আমি চিঠি আপনার কাছ থেকে চেয়ে নেবো
জনার্দন গাঙ্গুলী কয়েক মুহূর্ত নিশূপ। তাহার খাড়া খাড়া চুল বাতাসে নড়িতেছে। কান পাতিয়া শুনিলে বুঝিবা মাথার ভিতর চিন্তার যন্ত্র চলিবার খুটখাট শব্দ শোনা যাইবে।
তারপর সে হাসিয়া বলিল—বেশ, তাই ভালো। শনিবার শনিবার তুই আমার কাছ থেকে চিঠি চেয়ে নিস। তা তোর কী এখন থেকে খুব ঘনঘন চিঠি আসবে মনে হচ্ছে নাকি?
উত্তর হিসাবে কাজলের গলা দিয়া যে শব্দ বাহির হইল তাহার স্পষ্ট অর্থ করা কঠিন। গাঙ্গুলী আবার জিজ্ঞাসা করিল—সব চিঠিই কী আমার কাছে রেখে দেব, না যেগুলো নীল খামে
আসবে কেবল সেগুলো? কালকে যেমন একটা এসেছিল
কাজল যেন এখানে উপস্থিত নাই। গাঙ্গুলী পিওন অন্য কাহাকেও কিছু বলিতেছে। হাসিয়া সাইকেলে উঠিতে উঠিতে জনার্দন গাঙ্গুলী বলিল–ঠিক আছে। চিঠি আমার কাছেই থাকবে।
তারপর আপাদমস্তক কাজলকে একবার ভালো করিয়া দেখিয়া লইয়া বলিল—তুই বড়ো হয়ে গেলি, আঁ? কতটুকু দেখেছি তোকে–
এক-একজন মানুষ আছে যাহাদের কাছে লোকের গোপন কথা নিরাপদে থাকে। গাঙ্গুলী পিওন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিল। কেমন করিয়া সে নির্ভুলভাবে কেবলমাত্র অপালার চিঠিগুলিই বাছিয়া নিজের কাছে রাখিত, বাকিগুলি বাড়িতে বিলি করিয়া দিত–তা সে অপালা যে রঙের খামেই চিঠি লিখুক না কেন। প্রতিমাসে হাজার হাজাব চিঠি লইয়া যাহাব কারবার, মানুষের হাতের লেখা চিনিতে তাহার সময় লাগে না। জনার্দন গাঙ্গুলী সম্ভবত সেই অভিজ্ঞতাই প্রয়োগ করিয়াছিল।
কোনো একজায়গায় বেশিদিন বাস করিলে সেখানকার মাটিতে মানুষের শিকড় গজাইয়া যায়। কাজলের জীবনেও তাহাই ঘটিয়াছিল। অপুর মৃত্যুর পর মামাবাড়িতে বাস করিতে আসা, নিজেদের বাড়ি করিয়া লওয়া, কলিকাতার কলেজে পড়া—এইসব কারণে মালতীপুরে তাহার স্থায়ী ঠিকানা গড়িয়া উঠিয়াছে। ছোটবেলা হইতে বাস করিবার জন্য জায়গাটার উপর তাহার কিছুটা মায়াও আছে। মালতীপুর কলিকাতা হইতে কাছে বলিয়া আরহাওয়ায় শহরের ছোঁয়াচ পুরাদস্তুর, গাছপালা এবং ফাঁকা জায়গা কম, বাড়িঘর বেশি। প্রতিবৎসরই নতুন নতুন আরও বাড়ি উঠিতেছে, জমির দাম আগুন। মূল রাস্তাগুলির দুইধারে ফাঁকা জমি আর নাই বলিলেই চলে। গ্রাম সুন্দর, বিশাল শহরেরও একটি নিজস্ব সৌন্দর্য আছে—কিন্তু এই ধরনের আধা গ্রাম আধা শহর কাজল দেখিতে পারে না। শহরের চমকপ্রদ অভিনবত্ব নাই, আবার গ্রামের সরল স্বাভাবিকত্বও নাই, পরিকল্পনাহীনভাবে কিছু বাড়িঘর দোকানবাজার আর চালা গড়িয়া উঠিয়াছে—এই মাত্র। নিশ্চিন্দিপুরে তাহার বাবার যে মায়াময় শৈশব প্রকৃতির অকৃপণ দানে স্বর্ণমণ্ডিত হইয়া উঠিয়াছিল, তেমন ঈশ্বরের আশীর্বাদপুত শৈশব সে মালতীপুরে যাপন করে নাই। প্রবাসী ইংরেজ যেন অকিঞ্চিকর ঘটনা সম্বন্ধে রসিকতা করে-nothing to write home about, কাজলের শৈশবও প্রায় তাহাই। তবু নিজের কৈশোর ও শৈশব প্রত্যেকেরই প্রিয়। বড়ো হইয়া উঠিতে উঠিতে মনের মধ্যে কত ভাঙচুর হয়, কত সরল বিশ্বাস সন্দেহে পরিণত হয়, আবার কত অস্পষ্ট ধারণা গভীর বিশ্বাসের রূপ নেয়। ছোটবেলার খেলার সঙ্গী, কতদিনের কত মেঘ-ঘনাইয়া-আসা কালবৈশাখীর অপরাহু, রাত্রিতে হ্যারিকেনের আলো কমাইয়া দিয়া মায়ের কাছে শুইয়া গল্প শোনা। নাঃ, বাবার মতো না হইলেও তাহার ছোটবেলাও নিতান্ত খারাপ কাটে নাই।
তবু নিশ্চিন্দিপুরের জন্য মাঝে মাঝে ভারি মন কেমন করে।
শহরের সহিত তাহার কোনো আত্মীয়তা নাই। গ্রামে সে বেশিদিন বাস করে নাই সত্য, কিন্তু সেখানেই তাহার অস্তিত্বের মূল প্রোথিত রহিয়াছে। কয়েকদিন ধরিয়া সে ভাবিতেছে—একবার নিশ্চিন্দিপুরে গেলে বেশ হত। কে কেমন আছে দেখে আসতাম। এই ইচ্ছার সহিত সমাপতনের মতো আর একটি ঘটনা পরের সপ্তাহেই কাজলের নিশ্চিন্দিপুর যাওয়াকে নিশ্চিত করিয়া তুলিল।
কলিকাতা হইতে অপুর ভক্ত সেই জগদীশবাবু একদিন আসিয়া বলিলেন–সামনের মাসে আমরা অপূর্ববাবুকে নিয়ে সভা করবো। তার আগে একবার তার গ্রামটা ঘুরে আসতে চাই। যে গ্রামকে তিনি তার সাহিত্যে অমর করে রেখেছেন সেটা না দেখলে তাকে পুরো চেনা যাবে না। কী করে যেতে হয় একটু বলে দেবে?
কাজল বলিল—তার চেয়ে ভালো হয়, আমি আপনাদের নিয়ে যাই চলুন। আমিও কিছুদিন ধরে যাবো যাবো করছি, বরং এই সুযোগে—
-বাঃ, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। যেদিন যাবে সেদিনই ফেরা যাবে তো?
–তা চেষ্টা করলে ফেরা যায়, আজকাল তো মোটববাসও হয়েছে ও-পথে। তবে ভালো করে বেড়াতে হলে আমার সঙ্গে একটা দিন না হয় থেকে যাবেন।
—তা অবশ্য হতে পাবে যদি অসুবিধে না হয়—
—অসুবিধে আর কী? আমার সঙ্গেই তো থাকবেন।
যাইবার দিন ঠিক হইয়া যাইবার পর কাজলের মনে অদ্ভুত একটা আনন্দের ঢেউ বহিতে লাগিল। অপুর মৃত্যুর পর বার দুই সে নিশ্চিন্দিপুর গিয়াছিল। থাকা হয় নাই, বাড়িতে জরুরি কাজ থাকায় আবার রাত্রে ফিরিয়া আসিতে হইয়াছিল। রানুপিসির সঙ্গেও দেখা হয় নাই-রানাঘাটে কে একজন আত্মীয় অসুস্থ থাকায় রানুপিসি সেখানে গিয়াছিল। এবার গেলে হয়তো দেখা হইবে।
