চিঠি পড়িতে শুরু করার সময়ে কাজলের মনে হইল একমিনিট আগে অবধি তাহার জীবন যেরকম ছিল, এই চিঠি পড়ার পর আর তাহা থাকিবে না—একেবারে বদল হইয়া যাইবে। কিছুদিন আগে পড়া কোন্ এক ইংরাজি উপন্যাসের নায়ক যেন বলনাচের আসরে পঞ্চদশী মেয়রের কন্যাকে দেখিয়া ভাবিয়াছিল-Life will never be the same again! ঠিক তেমন।
অপালা লিখিয়াছে :
শ্রদ্ধাস্পদেষু,
আপনি হয়তো ভেবেছিলেন আমি এমনি ঝোকের মাথায় ঠিকানা নিয়েছি, কিন্তু কোনোদিনই চিঠি লিখবো না। প্রথম কারও সঙ্গে পরিচয় হলে অনেকেই আগ্রহ করে ঠিকানা নেয়, যোগাযোগ রাখার সদিচ্ছা সত্যিই থাকে, কিন্তু সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামান্য পরিচয়ের স্মৃতি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে, চিঠি লেখা আর হয়ে ওঠে না। আমার ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। ছোটবেলা থেকে মাতৃভাষার চর্চায় বঞ্চিত থাকার পর এখন নতুন উৎসাহে আমি প্রচুর বাংলা চিঠি লিখে থাকি। আমার হাতের লেখাটা বিশেষ খারাপ নয়, বলুন? আর আমার বয়েসী মেয়ের আপনার বয়েসী ছেলেকে চিঠি লেখার বিষয়ে বাঙালি সমাজে যে একটা নিষেধাজ্ঞা আছে, সেটাও আমার ক্ষেত্রে খাটে না তা তো আপনাকে সেদিন বলেইছি—কারণ আমি বাঙালি সমাজ বলতে যা বোঝায় তার ভেতরে মানুষ হইনি। একদিক দিয়ে তাতে আমার উপকারই হয়েছে। মাঝে-মধ্যে ছুটিতে যখন বাংলাদেশে যাই, দেখি বাংলার মেয়েরা নানান অকারণ এবং অসহ্য সামাজিক নিয়মের বাঁধনে আধমরা হয়ে বাঁধা পড়ে আছে। তাদের মনের প্রসার নেই, চোখে দীপ্তি নেই—দেখলে এত খারাপ লাগে যে কী বলবো! তাদের দোষ নেই, শত শত বছরের সংস্কার এবং নিষেধের বাধা কাটিয়ে ওঠা দারুণ শক্তিমানের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না, তারা হঠাৎ কী করে পেরে উঠবে? এইসব মেয়েদের জন্য বড়ো কষ্ট হয়, পৃথিবীটা যে আসলে কত বড়ো, কত সুন্দর তা ওরা জানতেই পারলো না।
গতবার ছুটিতে বাড়ি এসে বর্ধমান জেলার এক অজ পাড়াগায়ে বাবার দূর-সম্পর্কের এক পিসিমার কাছে কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল। ভারি সরল মেয়েটি, এমনিতে লেখাপড়া কিছু জানে না, কিন্তু স্বভাবে একটা সহজাত বুদ্ধির ছাপ আছে। তার মধ্যে ভদ্রতা, সেবা আর অতিথিপরায়ণতা যা দেখেছি তাতে অবাক হতে হয়েছে, শহরের অনেক তথাকথিত বড়োলোকের মেয়ের মধ্যে তেমন থাকে না। এই মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল—আচ্ছা দিদি, পাহাড় কেমন দেখতে? আমি অনেকক্ষণ ধরে তাকে বুঝিয়েছিলাম পাহাড় দেখতে কেমন, পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সকালবেলা সূর্যোদয় দেখতে কেমন লাগে। আরও কত গল্প করেছিলাম। মেয়েটা বলেছিল—আমার খুব ইচ্ছে করে কোথাও বেড়াতে যাই, কিন্তু কে নিয়ে যাবে বলো? এই তো সামনের বছরই বোধহয় আমার বিয়ে হয়ে যাবে, বাবা খুব চেষ্টা করছেন। তারপর সারাজীবন ভাত রান্না, কাপড়কাঁচা ছেলে মানুষ করা—আর কোনোদিন বেরুতে পারব না–
আমার এত মায়া হল! ওকে কথা দিয়ে এসেছি এবার যখন ছুটিতে যাবো, তখন ওকে দু-এক মাসের জন্য আমার সঙ্গে নিয়ে আসবো। যদি অবশ্য ততদিনে ওর বিয়ে না হয়ে যায়। কিন্তু এ তো গেল একটা মেয়ের কথা, বাংলাদেশে এমন হতভাগ্য মেয়ে হাজার হাজার আছে। তাদের কী হবে? সবাইকে তো আমি বেড়াতে নিয়ে আসতে পারবো না?
তাই একদিক দিয়ে নিজেকে খুব ভাগ্যবতী বলে মনে হয়।
আপনাকে চিঠি লেখার আর একটা কারণ–আপনার বাবার বইগুলি আমি পড়তে শুরু করেছি। কেমন লাগছে জানতে চাইবেন নিশ্চয়। শুধু একটা কথাই বলি, তার থেকে যতটা পারেন বুঝে নেবেন। কথাটা এই-—কেবলমাত্র অপূর্বকুমার রায়ের বই পড়বার জন্যই আমার বাংলা শেখা উচিত ছিল। একটু একটু করে পড়ছি, আর দেখছি উনি যেন ঠিক আমার মনের কথাটি বলছেন। গ্রামের শান্ত, সুন্দর পরিবেশ-বাঁশবন, পাখির ডাক, সজনের ফুল—আবার তার সঙ্গে মায়ের মায়ের ভালোবাসা দিয়ে মাখা নিম্পাপ শৈশব, মাঠের ওপারে নীল দিগন্তের দিকে তাকিয়ে সুদূরের কল্পনায় মগ্ন হয়ে যাওয়া—এসব কথা এত সহজভাবে আর কে বলতে পেরেছেন? আপনার বাবার লেখা ভালো লেগেছে—এটা আপনাকে জানানো দরকার ছিল।
ছোটবেলায় বাবা একবার আমাকে স্টিভেনসনের দু-তিনখানা বই কিনে দিয়েছিলেন। ট্রেজার আইল্যান্ড পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যেন কী অপার মুক্তির সন্ধান এনে দিল বইখানা! নীল সমুদ্র, নির্জন দ্বীপ, পালতোলা জাহাজে করে দুঃসাহসিক অভিযান-রাত্তিরে তো লং জন সিলভারকে কদিন স্বপ্নই দেখে ফেললাম। পৃথিবীটা ছোট নয়, শুধু আমার পরিবার, দেশ বা এই গ্রহটা নিয়ে বিশ্ব গঠিত নয়—কোটি কোটি নক্ষত্র আর নীহারিকা দিয়ে তৈরি এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের যে রূপ, তার আরছা আভাস সেই বয়েসেই যেন দূর থেকে দেখতে পেয়েছিলাম। তারপর এতদিন কত মানুষের সঙ্গে মিশেছি, কত লেখাপড়া জানা পণ্ডিতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কিন্তু কারও কাছে এসব কথা আর শুনিনি। সবাই সাধারণ কথা বলে, সবাই তুচ্ছ কথা বলে। এই প্রথম আপনার বাবার বইয়ের ভেতরে আমার ছোটবেলার স্বপ্নের প্রতিধ্বনি পেলাম।
আর সেদিন পিকনিকে গিয়ে আপনার সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছিল তাতে বুঝেছিলাম, আমাদের চিন্তার বেশ একটা মিল আছে। আপনি বোধহয় এই মানসিকতা আপনার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন। জানেন, আমার পরিচিত মানুষ অনেক আছে, কিন্তু আমার বন্ধু কেউ নেই। অনেক চিন্তা মনে আসে—যা বলবার লোক পাই না। আপনাকে বন্ধু মনে করে যদি মাঝে মাঝে চিঠি লিখি তাহলে আপনি কী আমাকে বেহায়া মেয়ে মনে করবেন?
