সেদিন সকালে ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া কাজলের মনে হইল—আজ দিনটা বেশ ভালো কাটিবে। কেন একথা মনে হইল তাহা সে বলিতে পারে না। কিন্তু বাড়ির সামনের নিমগাছে প্রভাতেব স্নিগ্ধ রৌদ্র, বাতাসের ঝরঝরে তাজা ভাব আর ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের বাহিরে অবস্থিত একটা বহস্যময় অনুভূতি তাহাকে জানাইয়া দিল—আজ একটি বিশেষ দিন। এগারোটায় জরুরি ক্লাস আছে বলিয়া আজ তাহাকে নটার মধ্যে বাহির হইতে হইবে। স্নান করিতে ঢুকিয়া আপনমনে সে তাহার প্রিয় একটি গান গাহিতেছিল—আজি দক্ষিণপবনে দোলা লাগিল মনে। সে লক্ষ করিয়া দেখিয়াছে, সকালবেলা কোনো একটা গানের সুর মনে আসিলে এবং কয়েকবার গুনগুন করিলে সারাদিন সেটি মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আজও তাহাই হইল, ট্রেনে যাইতে যাইতে, কলেজে ক্লাসের ভিতর এবং কমনরুমে সে সারাদিন ধরিয়া গানটা গাহিল। কমনরুমে পাশে বসিয়া প্রভাত গ্রিস ল সম্বন্ধে ভাষাতত্ত্বের নোট লিখিতেছিল, গান শুনিয়া সে আড়চোখে কাজলের দিকে তাকাইয়া অনুচ্চস্বরে বলিল–ব্যাপার কী?
গান থামাইয়া কাজল বলিল—কিসের কী ব্যাপার?
–খুশি যে আর ধরে না! গুনগুন গান চলেছে! একবার ঝেড়ে কাশা দেখি
—কী যা তা বলছো! এমনিই সকাল থেকে সুরটা—খুশির কী দেখলে?
প্রভাত সব বুঝি গোছের মুখভাব করিয়া বলিল–দেখ ভাই, আলল, ধূপের গন্ধ, প্রেম আর বাছুরের শিং-এ যদি ভেতরে থাকে তো ফুটে বেরুবেই। এ জিনিস গোপন করে রাখা যায় না—
কাজল রাগ করিয়া মুখ ফিরাইয়া বসিয়া রহিল। প্রভাত হাসিতে হাসিতে আবার ভাষাতত্ত্বের নোট লেখা শুরু করিল।
কিন্তু সকালের অহেতুক আনন্দ যে প্রতিশ্রুতি বহন করিয়া আনিয়াছিল, সন্ধ্যা অবধি তাহা বাস্তবে রূপায়িত হইবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরিয়া কাজল ভাবিল যাই, একটু আড্ডা দিয়ে আসি। শিবদাস-অভয় ওদের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না–
নাইটস্কুল উঠিয়া গিয়াছে। দাবার আসর বসিতে দেরি হইতেছিল, তাছাড়া বিদ্যালয়ের বালকেরা আলস্যবশত দুরে না গিয়া বারান্দার ধারেই যথেচ্ছ প্রাকৃতিক আহ্বানে সাড়া দিত। ফলে স্থানটিতে যে আরহাওয়ার সৃষ্টি হইয়াছিল তাহাকে ঠিক বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিমণ্ডল বলা যায়। রামযদু সরকার নিতান্ত বিরক্ত হইয়া একদিন জানাইয়া দিলেন—যথেষ্ট হইয়াছে, আর নয়। এবার তাহারা স্কুলের জন্য অন্য স্থান দেখিয়া লইতে পারে। ছেলেদের উৎসাহও কমিয়া আসিয়াছিল। কাজেই কয়েকমাস চলিবার পর স্কুল উঠিয়া গেল।
শহরের ঘিঞ্জি বসতি ছাড়াইয়া যে পথটি নদীর দিকে চলিয়া গেল, তাহারই ধারে একটি সুপ্রাচীন বটগাছ আছে। গাছটির বয়েস কম করিয়া শ-দেড়েক বছর হইবে, অনেকখানি জায়গা ঝুরি নামিয়া অধিকার করিয়া রহিয়াছে। সন্ধ্যার পর কোনো কোনো দিন এইখানে কাজল এবং তাহার বন্ধুদের আসর বসে। গলা ছাড়িয়া গান গাহিবার বা কবিতা আবৃত্তি করিবার পক্ষে এমন জায়গা আর নাই। লুকাইয়া ধূমপান করিবার জন্যও আদর্শ জায়গা বটে।
পড়ার টেবিলে বই এবং খাতা পত্র রাখিয়া কাজল আডিডায় যাইবার জন্য বাড়ির বাহির হইতেছে, এমন সময় হৈমন্তী ডাকিয়া বলিল–কী রে, খাবার খেয়ে যাবিনে? এই তো এলি, আবার কোথায় বেরুচ্ছিস?
—এই একটু কাছেই যাবো। দরকার আছে। দেরি হবে না, ফিরে এসে পড়তে বসবো। তুমি বরং এ ঘরটায় একটু ধুনো দিয়ে রেখো, বড্ড মশা কামড়ায়–
—খেয়ে যাবিনে? হালুয়া করে রেখেছি, খাবি?
—রাত্তিরে খাবোখন, বুটির সঙ্গে দিয়ো। এখন খিদে নেই—
কী মনে পড়ায় হৈমন্তী বলিল—ভালো কথা, তোর একটা চিঠি এসেছে আজ দুপুরে। পড়ার টেবিলে টেবিলক্লথের তলায় চাপা দিয়ে রেখেছি। দেখিস
—কার চিঠি মা?
—তা কী জানি! খামের চিঠি-বন্ধুবান্ধব কারও হবে—
হৈমন্তী চলিয়া গেলে কাজল আবার নিজের ঘরে ফিরিয়া আসিল। তাহাকে কে চিঠি লিখিয়াছে? ছুটির সময় কলেজের বন্ধুবা পুরী, দার্জিলিং বা বৈদ্যনাথ ধাম বেড়াইতে গেলে সেখান হইতে চিঠি লেখে বটে, কিন্তু এখন তো কলেজ পুরাদমে চলিতেছে। চিঠি লিখিবার মতো পরিচিত অন্য কাহারও কথা তাহার মনে আসিল না।
টেবিলক্লথের নিচে হইতে চিঠি বাহির হইল। আকাশী নীল রঙের খাম, ছয় পয়সার ডাকটিকিট আঁটা। খামের উপর ইংরাজিতে তাহার নাম ও ঠিকানা লেখা আছে। কিন্তু হস্তাক্ষর পবিচিত নহে।
খাম খুলিতেই পালা এযাব মেলের কাগজে লেখা দুই-তিন পৃষ্ঠার চিঠি। পাতা উল্টাইযা চিঠির শেষে কাহার নাম রহিয়াছে দেখিতে গিয়া কাজল অবাক হইয়া গেল। এ কাহার নাম? সে ঠিক দেখিতেছে তো?
অপালা তাহাকে চিঠি লিখিয়াছে!
উঃ, ভাগ্যিস মা চিঠিটা খুলিয়া পড়ে নাই! মায়ের সহিত তাহার সম্পর্কের কোনো আড়াল গড়িয়া ওঠে নাই, অপরের চিঠি পড়িবাব ভদ্রসমাজে যে একটা নিষেধ আছে তাহা এখানে খাটে না। অনেক সময়েই তাহার ফিরিতে দেরি হইলে হৈমন্তী অসংকোচে তাহার চিঠি খুলিয়া পড়িয়া ফেলে। অবশ্য অপালা কী লিখিয়াছে সে জানে না, হয়তো হৈমন্তী এ চিঠি পড়িলে এমন কিছু আসে-যায় না—তবু কেমন একটা সংকোচের বোধ তাহাকে চাপিয়া ধরিল।
কাজলের আর বন্ধুদের সহিত গল্প করিতে যাইবার উৎসাহ ছিল না। অন্যদিন এইসময়ে বাড়ি থাকিতে হইলে সে হাঁপাইয়া ওঠে। আজ মনে হইল—আবার কে এখন বাহির হয়! রোজ রোজ আচ্ছা ভালো লাগে না। বরং বাড়িতে বসিয়া বার্কের কনসিলিয়েশন স্পীচটা শেষ করিয়া ফেলা যাইবে।
পড়ার টেবিলে বসিয়া কাজল চিঠির ভাজ খুলিল, তারপর কী ভাবিয়া উঠিয়া গিয়া দরজাটা সন্তর্পণে বন্ধ করিয়া ছিটকিনি তুলিয়া দিল।
