একমাস সগৌরবে স্কুল চলিল।
একদিন সন্ধ্যাবেলা সবে স্কুল বসিয়াছে, কাজল ছাত্রদের কী একটা টস দিয়া একটু পায়চারি করিবে বলিয়া বারান্দা হইতে নামিয়াছে, এমন সময় একজন লোক আসিয়া তাহাকে নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল।
লোকটির চেহারা বিশাল, প্রথম দেখিলে মনে হয় একসঙ্গে বুঝি চার-পাচজন মানুষকে বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে। পরনে খাটো ও মোটা ধুতি, গায়ে খাকি রঙের ফতুয়া জাতীয় জামা। হাতপাগুলি মোটা শারে গুড়ির মতো। আঙুল দেখিলে মনে হয় যেন একহড়া মর্তমান কলা ঝুলিয়া আহে। মুখে প্রচুর দাড়িগোঁফের জঙ্গল।
লোকটি আবার কাজলকে হাতজোড় করিয়া নমস্কার করি।
কাজল জিজ্ঞাসা করিল–কি চাই ভাই তোমার?
লোকটা ভাঙা ভাঙা হেঁড়ে গলায় বলিল–শুনলাম শহরে লিখাপড়া জানা খোকাবাবুরা ইস্কুল খুলেছে-গরিব আর বুঢ়া লোকেদের পড়া শিখাবে বলে, এইটা কি সেই ইস্কুল?
কাজল একটু অবাক হইল। এসব খোজে এই লোকটার কী প্রয়োজন? সে বলিল–হা, এটাই। তুমি কিছু বলবে?
লোকটা বিনয়ে ঘাড় নিচু করিয়া মৃদুস্বরে (সিংহের পক্ষে তাহার গর্জনকে যতটা মৃদু করা সম্ভব) বলিল—হাঁ বাবু। আমি লেখাপড়া শিখবো।
কাজল বিস্মিত হইয়া লোকটার দিকে তাকাইয়া রহিল। বলে কী! ইহার বয়েস দেখিয়া যতদূর মনে হয়, পঞ্চান্নর কম হইবে না। কথার টানে বোঝা যায় বাঙালিও নয়। তাহার উপর এই মনোহর আকৃতি! ইহাকে পড়াইতে রীতিমত বুকের পাটা দরকার। ছাত্র অবাধ্যতা করিলে পাড়াসুদ্ধ লোক ঠেকাইতে পারিবে কিনা সন্দেহ। সর্বনাশ! লোকটির এরুপ ভয়ানক দুর্বুদ্ধি হইল কেন? আরও কত কাজ তো করিতে পারিত?
কাজল একবার সেঁক গিলিযা বলিল—লেখাপড়া শিখবে? ইয়ে—সে তো খুব আনন্দের কথা। তবে হয়েছে কী—মানে, তোমার আবার একটু বয়েস হয়ে গিয়েছে মনে হচ্ছে কিনা—এই বয়েসে কী—
লোকটা কাজলের দুই হাত ধরিয়া মিনতির স্বরে বলিল—খোখাবাবু, আমি বিনতি করছিআমাকে পড়াও। বেশি না, থোড়া শিখলেই হবে। ভগওয়ান তোমার মঙ্গল করবেন।
কাজলের অদ্ভুত লাগিল। লোকটির বিশাল, কুদর্শন ও বৃঢ় প্রচ্ছদের অন্তরালে একটি সরল এবং কোমল অন্তঃকরণ যেন উঁকি দিতেছে। সে জিজ্ঞাসা করিল—তোমার নাম কী? কোথায় থাকো?
-বাবু, আমার নাম সিংহাসন, বাড়ি চম্পারণ জিলা। এখানে আমি ইস্টেশনে কুলিব কাম করি-থাকি বুড়য়া সিংয়ের বস্তিতে। একা। বাড়ির সবাই থাকে দেশের গ্রামে। আমাকে পড়াও বাবু, আমি ধেয়ানসে পঢ়বে–
কাজল ফাঁপরে পড়িল। অজ্ঞানতিমিরে নিমজ্জিতকে আলোকশিখা দেখাইবার জন্য স্কুল খুলিয়াছে, এখন এই বিদ্যোৎসাহী প্রৌঢ় ছাত্রকে বিমুখ করে কী করিয়া? অথচ ইহার আকার-প্রকার দেখিয়া মনে হয় কাজলের, জীবদ্দশায় বর্ণপরিচয় শেষ হইয়া উঠিবে না।
সে বলিল—আচ্ছা, সে হবে এখন। তুমি এসে এইখানে বোসো আগে, তোমার সঙ্গে একটু আলাপ করি
সিংহাসন বারান্দার একপ্রান্তে সসঙ্কোচে বসিল। কাজল চেয়ারে এবং সিংহাসন মাটিতে বসিয়াছে, তাহা সত্ত্বেও সিংহাসনেব মাথা প্রায় তাহার মাথার কাছে উঠিয়া আসিয়াছে। জোয়ান বটে লোকটা।
কাজল বলিল—তুমি হঠাৎ লেখাপড়া শিখতে চাও কেন?
কিছুক্ষণ কী ভাবিয়া শেষে সিংহাসন বলিল—আপনার কাছে শরম করে আর কী হবে? বলেই ফেলি। আমার দুই শাদি বাবু—পহলা অওরতের বাচ্চাকাচ্চা হল না। তখন আমি করলো কী, এটা একটু খারাপ কাম হয়েছিল—আমি আর একটা শাদি করলো। দুসরা বিবির একটাই লেড়কা, তার বয়েস এখন পহ সাল। হেলেটাকে বাবু আমি বুকে করে মানুষ করলাম, বপন থেকে যা চাইলে তাই দিলাম—কিন্তু মহার পাজি লৌভাদের সঙ্গে মিশে ছেলেটা বিগড়ে গেল। দুমাস আগে মুলুক গিয়েছিলাম। একদিন হেলে আমার সঙ্গে ঝগড়া করে বলল–তোকে বাপ বলতে শরম হয়। তুই তো অপড় কুলি আছিস, ফালতু আদমি! ভাবুন খোখাবাবু, আমার নিজের লেড়কা আমাকে অপড় আর কুলি বলে গালি দিল। গুসসা করে আমি মুলুক থেকে চলে এসেছি। এখন আমি লিখাপড়া শিখে নিজের হাসে ছেলেকে একটা চিঠি লিখতে চাই। উফ্! আমার লিখা চিঠি পেলে ছেলে কেমন অবাক হয়ে যাবে ভাবুন তো বাবু! তখন সে আর আমাকে ফালতু আমি বলতে সাহস পাবে না—
কাজলের অবশ্য মনে হইল সিংহাসন অপেক্ষা তাহার ছেলেরই শিক্ষার প্রয়োজন বেশি এবং সিংহাসন নিজে বিদ্যার্জনের উদ্যোগ না করিয়া উক্ত পুত্রের দুইপাটি দাঁত ভাঙিয়া দিলে শিক্ষাটা সম্পূর্ণ হইত। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে এই ভয়ালদর্শন অথচ নিরীহ ও সরল মানুষটির প্রতি কেমন একটা আকর্ষণ অনুভব করিল। সে বলিল–আচ্ছা, আমি তোমাকে পড়াবো। কাল সন্ধেবেলা স্লেট আর পেনসিল নিয়ে চলে আসবে–
সিংহাসন যথার্থ খুশি হইয়া বলিল–রামজী আপনার মঙ্গল করুন। বেশি না বাবু, সির্ফ একটা চিঠি লিখবার মতো শিখালেই হবে—
—তোমাকে কিন্তু বাংলা শিখতে হবে, আমি হিন্দি জানি না
-ঠিক আছে বাবু। মহল্লায় বাঙালি মাস্টরবাবু আছে। ছেলে তাকে দিয়ে পড়িয়ে লিবে। সে আরও ভালো হবে, আমার দেশে কোনো হিন্দুস্তানী বাংলা লিখতে জানে না
পরের দিন হইতে সিংহাসন নিয়মিত স্কুলে আসিতে আরম্ভ করিল। তাহার অধ্যবসায় দেখিলে বিস্মিত হইতে হয়। পুরা দুইঘণ্টা সে একটুও নড়ে না, বসিয়া বসিয়া স্লেটের ক-খ-এর উপর দাগা বুলায়। প্রথমদিকে তাহার অল্পবয়স্ক সহাধ্যায়ীরা ব্যাপার দেখিয়া হাসি চাপিতে পারে নাই। তাহাদের হাসি ও কোলাহলে পড়াশুনার অসুবিধা হয় বলিয়া আজকাল সিংহাসন স্কুলে একঠোঙা সস্তা লজেন্স লইয়া আসে। ছেলেপুলেরা গোলমাল শুরু করিলেই সিংহাসন দরাজ হাতে লজেন্স বিতরণ করিতে থাকে। কোলাহল অচিরেই থামিয়া যায়।
