কলিকাতার মতো মালতীনগরেও কাজলের একটা বন্ধুর দল আছে। ইহাদের মধ্যে শিবদাস নামে একটি ছেলে একদিন কাজলকে বলিল—আমরা অকারণে জীবনটা ব্যয় করছি তা বুঝতে পারছিস কাজল?
বন্ধুর দলের ভবরঞ্জন ক্লাস এইটে একটি মেয়েকে বাড়িতে পড়ায়। তাহার বাবার বন্ধুর মেয়ে। গতকাল ভবরঞ্জন সিকের পাঞ্জাবি পরিয়া পড়াইতে গিয়াছিল-ছাত্রী নাকি বলিয়াছে, মাস্টারমশাই, এই জামাটাতে আপনাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। এই কথার কি গূঢ় অর্থ হইতে পারে তাহা লইয়া এতক্ষণ তুমুল তর্ক চলিতেছিল। একপাশে স্বয়ং ভবরঞ্জন ঘাসের উপর চিৎ হইয়া ধরাশায়ী মহারথীর ন্যায় পড়িয়া ছিল এবং বন্ধুদের বাক্যস্রোতের ফাঁকে ফাঁকে যতিচিহ্নের মতো উদাস দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিতেছিল। এই রঙিন আরহাওয়ার মধ্যে শিবদাসের কঠিন দার্শনিক প্রশ্নজাল গানের আসরে মোহমুদগরের শ্লোকের মতো সবাইকে ভয়ানক চমকাইয়া দিল।
কাজল বলিল—তুই কী বলতে চাইছিস?
-আমি বলতে চাইছি যে, এই আড্ডা দেওয়া, মেয়েদের নিয়ে আলোচনা আর নাটক নভেল পড়ে আমরা বৃথা সময় কাটিয়ে দিচ্ছি। একটা কাজের কাজ কিছু করা উচিত। এরপর বুড়ো হয়ে গেলে আর অনুশোচনা ছাড়া কিছু করার থাকবে না—
বার্ধক্যের কথা ভাবিয়া কেহ যে খুব একটা ভয় পাইল এমন নহে। যৌবন সময়টাই এমন, যখন কেবল জীবনের আশাব্যঞ্জক দিকটি চোখে পড়ে। কোনো কিছু যে ফুরাইয়া যাইবার সম্ভাবনাও আছে সেটা চট করিয়া মনে আসে না।
অভয় জিজ্ঞাসা করিল–তোর মাথায় কোনো প্ল্যান আছে?
শিবদাস বলিল—আছে।
—কি?
—আমরা গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের জন্য নাইট স্কুল খুলতে পারি। এই আমাদের শহরেই কত ছেলেমেয়ে ইস্কুলে যায় না, তাদের বাবা-মায়ের ছেলেপুলেকে পড়াশুনো শেখাবার পয়সা নেই। আমরা বন্ধুরা মিলে তাদের লেখাপড়া শেখাতে পারি
কথাটা সবারই মনে ধরিল। বিকালে আড্ডা না দিয়া পড়াইলে মন্দ কি? সবাই মিলিয়া দেশের কাজও করা হইবে, আবার পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে গল্পগুজবও করা যাইবে।
কাজল বলিল—কাজটা ভালো। কিন্তু এর ইনিশিয়েটিভ কে নেবে?
শিবদাস বলিল—আমি নেবো। তুমি এবং অন্যরাও নেবে। আরে, এ কাজ শুরু করতে কী আর এমন হাতিঘোড়া লাগবে? আমরা সবাই দু-টাকা করে চাঁদা দিলেই একগাদা ধারাপাত, ফার্স্টবুক আর খাতা-পেনসিল হয়ে যাবে। ইস্কুলের ছেলেদের কাছে পুরোনো বইপত্রও কিছু চেয়ে নেবো
সুভাষ বলিল—আর ব্ল্যাকবোর্ড? পুরোনো ব্ল্যাকবোর্ড তো আর চেয়ে আনা যায় না!
ম্যাকবোর্ড এখন কি হবে? শুরুতে ওসবের দরকার নেই। তোমরা শুধু বল প্রত্যেকে সপ্তাহে দু-দিন করে সন্ধেবেলা এমদান করতে রাজি কিনা?
সকলেই রাজি। অভয় বলিল—কিন্তু জায়গা কোথায়? পড়াবো কোনখানে?
এটি জরুরি সমস্যা বটে। সেদিন বিতর্ক করিয়া কোনো সমাধান খুঁজিয়া পাওয়া গেল না। দিনপাঁচেক বাদে শিবদাস সান্ধ্যআড্ডায় ঘোষণা করিল—ওহে, নাইটস্কুলের জায়গা পাওয়া গিয়াছে
অভয় বলিল—খুব ভালো কথা, কোথায়?
—সরকারদের বাড়ির বারান্দায়। দোমহলা বাড়ি, লোকজন সব ভেতরে থাকে। সদর বাড়ির বারান্দায় কেবল বুড়ো রামযদু সরকার, নেড়ার বাবা আর কানাই চাটুজ্যে—এরা মিলে দাবার আড্ডা বসায়। তা সে আসর বসে রাত্তির ন-টায়, চলে দেড়টা দুটো অবধি। আমরা স্কুল করবো সন্ধে ছটা থেকে সাড়ে-সাত কি আটটা পর্যন্ত। কাজেই তাদের অসুবিধে হবার কথা নয়। রামযদু সরকারকে বলে-কয়ে রাজি করিয়েছি। সামনের মাসের পয়লা তারিখ থেকে স্কুল চালু করে দাও–
খাতাপত্র ধারাপাত ইত্যাদির ব্যবস্থা হইয়া গেল এবং অচিরেই সরকারবাড়ির বারান্দায় নিয়মিত নাইটস্কুল বসিতে লাগিল।
প্রথম দিন একটি ছোটমতো সভা করিয়া স্কুলের উদ্বোধন হইল। রামদু সরকারের বাড়ি, কাজেই তাঁহাকে সভাপতি করা হইল। আর আসিলেন স্থানীয় বিদ্যালয়ের হেডপণ্ডিত। দু-একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোকও আসিলেন। ছেলেরা আরও অনেককে বলিয়াছিল, কিন্তু প্রায় সবাই একটা না একটা কাজ দেখাইয়া এড়াইয়া গেলেন। হেডপণ্ডিত বলিলেন—বিদ্যাদান অতি পুণ্যকর্ম। তিনি স্বয়ং এই পথে বিগত পঁয়ত্রিশ বৎসর ধরিয়া পুণ্যার্জন করিয়া আসিতেছেন। ছেলেরা যে গতানুগতিক প্রমোদে মত্ত না হইয়া দেশের মানুষকে শিক্ষাদানের ব্রত লইয়াছে, ইহাতে তিনি আনন্দিত বোধ করিতেছেন। ইস্কুলটি টিকিয়া থাকুক—ঈশ্বরের কাছে তাঁর এই প্রার্থনা।
রামযদু সরকার জীবনে জনসভায় কিছু বলেন নাই। তিনি বলিলেন—ছেলেগুলিকে তিনি চেনেন, ইহারা সবাই খুব ভালো। কাজেই যে কাজ তাহারা করিতে চলিয়াছে তাহাও যে ভালো তাহাতে তাহার সন্দেহ নাই। তবে রাত্রিতে তাহাদের দাবার আচ্ছাটি বিশ বৎসরেরছেলেরা আড়ার সময় হইবার পূর্বেই যেন বারান্দা ছাড়িয়া দেয়।
সমবেত জনসাধারণকে হরি ময়রার দোকানের সিঙাড়া আর অমৃতি খাওয়াইয়া সভার সমাপ্তি হইল।
কাজল ও তাহার বন্ধুরা শহরের নিম্নবিত্ত অধিবাসীদের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরিয়া ইস্কুলের কথা প্রচার করিয়া আসিয়াছিল। প্রথমদিন জনা দশ-বারো ছাত্র-ছাত্রী পড়িতে আসিল। ইহাদের মধ্যে কেহ বর্ণপরিচয়হীন, কেহবা শহরের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে পড়ে, গৃহশিক্ষক রাখিবার সঙ্গতি নাই বলিয়া নাইটস্কুলে পড়া দেখিয়া লইতে আসে।
প্রতি সপ্তাহেই দুই-একজন করিয়া ছাত্র বাড়িতে লাগিল। কাজল হিসাব করিয়া দেখিল এই হারে ছাত্রসংখ্যা বাড়িতে থাকিলে মাস দুয়েকের মধ্যে সরকারদের বারান্দায় আর কুলাইবে না। আচ্ছা, প্রয়োজন হইলে বরং তাহাদের বাড়ির বাহিরের ঘরে স্কুলের একটা ব্রাঞ্চ খোলা যাইবে।
