সিংহাসন এক হাঁটু পাতিয়া এবং এক হাঁটু তুলিয়া অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে। সামনে মাটির উপর স্লেট রাখিয়া অবিচলিত ধৈর্যের সঙ্গে বর্ণমালা লেখা অভ্যাস করে। কখনও বা বর্ণপরিচয়ের পাতা খুলিয়া অক্ষরগুলির উপর মোটা মোটা আঙুল রাখিয়া ভারি গলায় পড়িতে থাকে—কো, ক্ষো, গো—
কিন্তু সবার সবকিছু হইবার নহে। কেবলমাত্র আগ্রহ থাকিলেই কেহ ইচ্ছামত শিক্ষালাভ করিতে পারে না—সেক্ষেত্রে প্রবণতার প্রশ্ন আছে। কিছুদিন যাইবাব পর কাজল বুঝিতে পারিল লেখাপড়া জিনিসটা সিংহাসনের হইবার নহে। কিন্তু বেচারার এমন আকুলতা—তাহাকে মুখেব উপর নিষ্ঠুর সত্য কথাটা বলিতে বাধে। বিশেষ করিয়া লজেন্স বিতরণের মাধ্যমে তরুণ সহপাঠীদের নিকট সিংহাসন যেরূপ জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছে তাহাতে সে বিদায় লইলে ইস্কুল টিকিবে কিনা সন্দেহ। বরং যেমন চলিতেছে চলুক। মন্দ কী, ইহাতে কাহারও ক্ষতি নাই। লোকটি নেশাভাঙ না করিয়া অন্তত একটা ভালো জিনিস লইয়া আছে।
একদিন কাজল সিংহাসনের বাড়ি দেখিতে গেল।
রেলওয়ে স্টেশনের পাশ দিয়া ফিডার বোড় বাহির হইয়া জেলাশহরে যাইবার বড়ো রাস্তায় মিশিয়াছে। ফিডার রোডের ধারে বুড়য়া সিংয়ের বস্তি, সেখানে গিয়া,সিংহাসনের নাম করিতেই একজন তাহার ঘরটা দেখাইয়া দিল। সমস্ত বস্তিটা ছোট ছোট নিচু খোর চালের ঘর লইয়া প্রস্তুত, তাহারই একটায় সিংহাসন থাকে।
ঘরের সামনে দাঁড়াইয়া নাম ধরিয়া ডাকিতেই সিংহাসন বাহির হইয়া কাজলকে দেখিয়া অবাক হইয়া গেল।
–খোখাবাবু আপনি! কী ব্যাপার খোখাবাবু?
–কিছু না সিংহাসন, এমনি, তোমার বাড়ি আসতে ইচ্ছে ছিল, চলে এলাম।
সিংহাসন খুশিতে বিপর্যস্ত হইয়া পড়িল। ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া সে কাজলকে একটা জলচৌকির উপর বসিতে দিল। বস্তির মধ্যে হইলেও ঘরখানি বেশ পরিষ্কার। একদিকে একটি দড়ির চারপাই, তাহার উপর একটি চাদর ও বালিশ—দুইটিই ফরসা করিয়া কাঁচা। ঘরের অপর প্রান্তে অনুচ্চ কাঠের বেদির উপরে সিরলিপ্ত রামসীতার পট। এককোণে ঝকঝকে করিয়া মাজা একটি পেতলের ঘটি ও কয়েকটি থালাবাসন।
কাজল বলিল–বাঃ, বেশ ঘর তোমার। বেশ পরিষ্কার করে রেখেছো
—আমি নোংরা দেখতে পারে না খোখাবাবু। বাইরেটা যার নোংরা, তার ভেতরটা সাফা হোয়। উ বাত ছোড়ো, কী খাবে বোলো–
-আমি কিছু খাবো না সিংহাসন, তুমি ব্যস্ত হোয়ো না–
সিংহাসন সে কথা শুনিবার পাত্র নহে। ব্রাহ্মণ অতিথি, অন্য কিছু খাইতে আপত্তি করিবে ভাবিয়া পাড়ার একটা ছেলেকে দিয়া খাঁটি গরুর দুধ আনাইয়া নতুন মাটির ভাঁড়ে করিয়া খাইতে দিল। বলিল—আমি গরিব লোক, আজ এই দিলাম। এবার দেশে গেলে তোমার জন্য পেঁঢ়া নিয়ে আসবো–আমাদের দেহাতে খুব আচ্ছা পেঁঢ়া তৈরি হয়–
দুগ্ধপান করিতে কবিতে কাজল বলিল–তুমি রাত্তিরে কী খাবে সিংহাসন?
সিংহাসন একগাল হাসিয়া বলিল–আমি আর কী খাবে? সেরভর আটা দিয়ে ছ-খানা রোটি বানাবো, করেলার ভাজি করবো আর রহড়ের দাল–এই খাবো।
কাজল অবাক হইয়া বলিল—একসের আটায় ছ-খানা রুটি! বলো কী?
—হাঁ বাবু। বাঙালি রোটি না-হামাদের বেহারী রোটি, বহুৎ মোটা আর পয়দাওয়ালা। পাতলা বাঙালি রোটি খেলে হামার পেট ভরে না।
সিংহাসন অবিচল ধৈর্যের সঙ্গে পড়াশুনা চালাইতে লাগিল। দুই-তিনমাস কাটিয়া গেল, এখনও সে ক-খ লিখিতে শিখিল না। কিন্তু তাহার নিষ্ঠা দেখিয়া কাজলের আশঙ্কা হইল, একদিন হয়তো বা সে সত্যই লেখাপড়া শিখিয়া ফেলিবে।
অকস্মাৎ একদিন সিংহাসন পড়িতে আসিল না।
ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত, কারণ অসহ্য গরম বা ঝমঝম বৃষ্টি কোনোটাই এতদিন সিংহাসনকে ঠেকাইতে পারে নাই। বগলে স্লেট-পেন্সিল লইয়া সে নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে আসিয়া হাজির হয়। প্রথমদিন কাজল ভাবিল বোধহয় তাহার অসুখ করিয়াছে। কিন্তু পরপর দুই তিনদিন তাহার অনুপস্থিতির পর কাজল চিন্তিত হইয়া পড়িল। কী হইল মানুষটার? একবার খোঁজ করা দরকার।
সেদিন সন্ধ্যায় স্কুলে কাজলের ক্লাস ছিল না, হাঁটিতে হাঁটিতে সে বুড়য়া সিংয়ের বস্তিতে গিয়া হাজির হইল। হ্যাঁ, ওই তো নিজের ঘরের সামনে হাঁটুর উপর থুতনি রাখিয়া সিংহাসন বসিয়া আছে–তাহার গায়ে লাল কুর্তা, লাইসেন্সওয়ালা কুলিদের ইউনিফর্ম। কাছে গিয়া সে বলিল—কী সিংহাসন, পড়তে যাচ্ছ না যে?
সিংহাসন ঘোলাটে লাল চোখে একবার কাজলের দিকে তাকাইয়া আবার পূর্ববৎ বসিয়া রহিল। তাহার দৃষ্টি দেখিয়া মনে হইল না সে কাজলকে চিনিয়াছে।
এ আবার কী কাণ্ড! লোকটা নেশা করিয়াছে নাকি? কিন্তু এ কয়দিনে সে যতটা বুঝিয়াছে তাহাতে সিংহাসন নেশা করিবে বলিয়া বিশ্বাস হয় না। তবে?
আরও দুই-একবার ডাকাডাকি করিয়াও কাজল সাড়া পাইল না।
—বাবুজি!
কাজল দেখিল, বস্তিরই একজন প্রৌঢ় হিন্দুস্থানী অধিবাসী তাহার কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। লোটা বলিল–বাবুজি, আপনি আমার সঙ্গে এদিকে আসুন—
ব্যাপার কিছু বুঝিতে না পারিয়া কাজল তাহার সঙ্গে একটু দূরে গিয়া দাঁড়াইল।
–বাবুজি, আপনি কী সিংহাসনের কাছে এসেছেন?
—হ্যাঁ। কী হয়েছে ওর? কথা বলছে না কেন?
প্রৌঢ় লোকটি মাথা নিচু করিয়া বলিল—সিংহাসনের দেশ থেকে খবর এসেছে। চেচক হয়ে ওর ছেলেটা মারা গিয়েছে। আজ চারদিন ওইরকম বসে আছে বাবুজি, খাচ্ছে না, শুচ্ছে না—
কাজলের বুকের মধ্যে কে যেন হাতুড়ি দিয়া আঘাত করিল। চেচক–মানে বসন্ত হইয়া সিংহাসনের ছেলে মারা গিয়াছে! বেচারা সিংহাসন, প্রৌঢ় বয়েসের সন্তান–এ ধাক্কা সামলাইয়া ওঠা কঠিন হইবে। সে দূর হইতে তাকাইয়া দেখিল—সিংহাসন পাথরের মূর্তির মতো চুপ করিয়া বসিয়া আছে।
