যে সকল মহাপুরুষ দলপতিরা সভাস্থ হন নাই, তারা আপনার আপনার দলে ঘোঁট পাড়িয়ে দিলেন–অনেক ভট্টাচাৰ্য বিদেয় নিয়ে ফলার মেরে এসেও শেষে শ্ৰীশ্ৰী ঁধৰ্ম্মসভার উমেদার প্রপৌত্রদের দলের দলপতির কাছে গঙ্গাজল ছুঁয়ে শলিগেরামে সান্নে দিব্বি কোত্তে লাগলেন যে, তিনি অ্যাদ্দিন শহরে আচেন, কিন্তু রমাপ্রসাদ রায় যে কে, তাও তিনি জানেন না; তিনি শুদ্ধ বাবুকেই জানেন। আর তার ঠাকুর (স্বর্গীয় তর্কবাচস্পতি খুড়ো) মরবার সময়ে বলে গিয়েছেন যে, “ধৰ্ম্ম অবতার! আপনার মত লোক অর জগতে নাই।” এ সওয়ায় অনেক শূন্য-উপাধিধারী হজুরেরা ধরা পড়লেন, গোবর খেলেন, শ্রীবিষ্ণু স্মরণ কল্লেন ও ভুরু কামালেন।
কলকেতার প্রথম বিধবা বিবাহের দিন, বালি, উতেরপাড়া, অশ্বিকে ও রাজপুর অঞ্চলের বিস্তর ভট্টাচাৰ্য্য সভাস্থ হন—ফলার ও বিদেয় মাবেন। তার পর ক্রমে গা-ঢাকা হতে আরম্ভ হন; অনেকে গোবর খান, অনেকে সভাস্থ হয়েও বলে, আমি সের্দিন শয্যাগত ছিলাম।
যতদিন এই মহাপুরুষদের প্রাদুর্ভাব থাক্বে, তত দিন বাঙ্গালীর ভদ্রস্থ নাই; গোঁসাইরা হাড়ি মুচি মুফরাস নিয়ে বেঁচে আছেন; এই মহাপুরুষের গোটকক হতভাগা গোমূখ কায়স্থ ব্রাহ্মণ দলপতির জোরে আজও টিকে আছেন, এরা এক এক জন হারামজাদকী ও বজ্জাতীর প্রতিমূর্ত্তি, এদিকে এমনি সজ্জা গজ্জা করে বেড়া যে, হঠাৎ কার সাধ্যি, অন্তরে প্রবেশ করে, হঠাৎ দেখলে বোধ হয়, অতি নিরীহ ভদ্রলোক; বাস্তবিক সে কেবল ভড়ং ও ভণ্ডামম!
১.২২ রসরাজ ও যেমনকৰ্ম্ম তেমনি ফল
রমাপ্রসাদ রায়ের মার সপিণ্ডনে সভাস্থ হওয়ায় কোন কোনখানে তুমূল কাণ্ড বেধে উঠলো–বাবা ছেলের সঙ্গে পৃথক হলেন। মামী ভাগ্নেকে ছাঁট্লেন–-ভাগ্নে মামীর চিরঅন্ন-পালিত হয়েও চিরজন্মের কৃতজ্ঞতায় ছাই দিয়ে, বিলক্ষণ বিপক্ষ হয়ে পড়লেন! আমরা যখন স্কুলে পড়তুম, তখন সহরের এক বড়মানুষ সোণার বেণেদের বাড়ীর শম্ভুবাবু বলে একজন আমাদের ক্লাসফ্রেণ্ড ছিলেন; একদিন তিনি কথায় কথায় বলেন যে “কাল রাত্রে আমি ভাই অমাড় স্ত্রীকে বড় ঠাট্টা কড়েচি, সে আমায় বলে তুমি হনুমান্”; আমি অমনি ভস কড়ে বললুম তোর শ্বশুড় হনুমান!” ভাগ্নেবাবুও সেই রকম ঠাট্টা আরম্ভ কল্লেন। ‘রসরাজ’ কাগজ পুনরায় বেরুলো, খেউড় ও পচালের স্রোত বইতে লাগলো। এরি দেখাদেখি একজ সংস্কৃত কলেজের কৃতবিদ্য ছোকরা ব্রাহ্মধর্ম্ম ও কলেজ-এডুকেশন মাথায় তুলে যেমন কম্ম তেমনি ফুল নামে ‘রসরাজে’র জুড়ি এক পচালপোরা কাগজ বার কল্লেন—’রসরাজ’ ও ‘তেমনি ফলে’ লড়াই বেধে গেল। দুই দলে কৃত্বাস্ত্র ও সেনাসংগ্রহ করে, সমরসাগরে অবতীর্ণ হলেন —স্কুলবয়েরা ভূরি ভূরি নির্ব্বুদ্ধি দলবল সংগ্রহ কয়ে, কুরুপাণ্ডব যুদ্ধ ঘটনার ন্যায় ভিন্ন ভিন্ন দলে মিলিত হলেন। দুর্ঘদ্ধিপরায়ণ ক্যারাণী, কুটেরা ওবাজে লোকেরা সেই কষ্য রস পান করবার জন্য কাক, কবন্ধ ও শৃগাল শকুনির মত, রণস্থল জুড়ে রইলো! ‘রসরাজ’ ও ‘তেমনি ফলের’ ভয়ানক সংগ্রাম চলতে লাগলো—“পীর গোরাচাঁদের ম্যালা ‘পরীর জন্মবিবরণ’ ‘ঘোড়া ভূত’ ও ‘ব্রহ্ম-দৈত্যের কথোপকথন’ প্রভৃতি প্রস্তাবপরিপূর্ণ ‘রসরাজ’ প্রতিদিন পাঁচশ, হাজার, দু হাজার কপি নগদ বিক্রী হতে লাগলো। কিন্তু ‘ব্রাহ্মধৰ্ম্ম’ মাসে একখানাও ধারে বিক্রী হয় কি না সন্দেহ। ‘তিলোত্তমা’ ও ‘সীতার বনবাসের’ খদ্দের নাই। কিছুদিন এই প্রকার লড়াই চলচে, এমন সময়ে গবর্ণমেণ্ট বাদী হয়ে কদর্য্য প্রস্তাব লিখন অপরাধে ‘রসরাজ’ সম্পাদকের নামে পুলিসে নালিশ কল্লেন, ‘যেমন কর্ম্ম’ ও পাছে তেমনি ফল পান, এই ভয়ে গা ঢাকা দিলেন; ‘রসরাজের’ দোয়ার ও খুলীরে মূল গায়েনকে মজলিসে বেধে, ‘চাচা আপন বাঁচা’ কথাটি স্মরণ করে, মেদ্দোষ ও মন্দিরে ফেলে চম্পট দিলো। ভাগ্নেবাবু (ওরফে মিত্তির খুড়ো) সফিনের ভয়ে, অন্দরমহলের পাইখানা আশ্রয় কল্লেন—গিরিবর ক্ষেত্রমোহন বিদ্যারত্ন চামর ও নূপুর নিয়ে সৎসাহিত্য-গ্রন্থাবলী তিন মাসের জন্য হরিণবাড়ী ঢুকলেন। ‘পীর গোরাচাঁদের’ বাকি গীত সেইখানে গাওয়া হলো। পাতরভাঙ্গা হাতুড়ির শব্দ, বেতের পটাং পটাং ও বেড়ীর ঝুমঝুমানি মন্দিরে ও মৃদঙ্গের কাজ কল্লে–কয়েদীরা বাজে লোক সেজে ‘পীরের গীত’ শুয়ন মোহিত হয়ে বাহবা ও পালা দিলে; “খেলেন দই রমাকান্ত, বিকারে ব্যালা গোবর্দ্ধন”। যে ভাষা কথা আছে, ভাগ্নেবাবু (ওরফে মিড়ির খুড়ো) ও রসরাজ-সম্পাদকের সেইটির সার্থকতা হলো; আমরাও ক্রমে বুড়ো হয়ে পড়লেম, চসমা ভিন্ন দেখতে পাইনে।
১.২৩ বুজরুকী
পাঠক! আমাদের হরিভদ্দর খুড়ো কায়স্ত মুখখী কুলীন, দেড় শ’ ছিলিম গাঁজা প্রত্যহ জলযোগ হয়ে থাকে; থাকবার নির্দ্দিষ্ট ঘরবাড়ী নাই, সহরে খান্কীমহলে অনেকের সঙ্গে আলাপ থাকায় শোবার ও খাবার ভাবনা নাই, বরং আদর করে কেউ “বেয়াই” কেউ জামাই” বলে ডাকতো। আমাদের খুড়া ফলার মাত্রেই পার ধূলো দেন ও লুচিটে সন্দেশটা বেঁধে আনতেও কসুর করেন না। এমন কি, তাগে পেলে চলনসই জুতা জোড়াটাও ছেড়ে আসেন না। বলতে কি, আমাদের হরিভদ্দর খুড়ো এক রকম সবলোট গোছের ভদ্দর লোক। খুড়ো উপস্থিত হয়েই এ কথা সে কথার পর বল্লেন যে, “আর শুনেছ, আমাদের সিমলে পাড়ায় এক মহাপুরুষ সন্ন্যাসী এসেছেন তিনি সিদ্ধ, তিনি সোনা তৈরী কত্তে পারেন—লোকের মনের কথা গুণে বলেন, পারাভস্ম খাইয়ে সেদিন গঙ্গাতীরে একটা পচা মড়াকে বাঁচিয়েছেন, ভারি বুজরুক!” কিন্তু আমরা ক’বার ক’টি সন্ন্যাসীর বুজরুকী ধরেচি, গুটিকত ভূতনাচার ভূত উড়িয়ে দিয়েছি, আর আমাদের হাতে একটি জোচ্চোরের জোচ্চুরী বেরিয়ে পড়ে।
