যখন হিন্দুধর্ম্ম প্রবল ছিল, লোকে দ্রব্যগুণ কিম্বা ভূতত্ব জানতো না, তখনই এই সকলের মান্য ছিল! আজকাল ইংরেজি লেখা-পড়ার কল্যাণে সে গুড়ে বালি পড়েছে। কিন্তু কলকেতা সহরে না দেখা যায়, এমন জিনিষই নাই; সুতরাং কখন কখন “সোণা-করা” “ছলে-করা” “নিরাহার” “ভূতনাবানো” “চণ্ডসিদ্ধ” প্রভৃতির পেটের দায়ে এসে পড়েন, অনেক জায়গায় বুজরুক দ্যাখান, শেষ কোথাও না কোথাও ধরা পড়ে বিলক্ষণ শিক্ষা পেয়ে যান।
১.২৪ হোসেন খাঁ
বছর চার পাঁচ হলো, এই সহরে হোসেন খাঁ নামে এক মোছলমান বহু কালের পর ঐ রঙ্গে ভয়ানক আড়ম্বরে দেখা দেন—তিনি হজরত জিনিয়াই সিদ্ধ; (পাঠক আরব্য উপন্যাসের আলাদিন ও আশ্চৰ্য্য প্রদীপের কথা স্মরণ করুন)—“মনে করেন, সেই জিনিষই জিনি দ্বারা আনতে পারেন, বাক্সের ভিতর থেকে ঘড়ি, আংটী, টাকা উড়িয়ে দেন, নদীজলে চাবির থলে ফেলে দিলে জিনির দ্বারা তুলে আনান” এই প্রকার অদ্ভুত কৰ্ম্ম কত্তে পারেন।
ক্রমে সহরে সকলেই হোসেন খাঁর কথার আন্দোলন কত্তে লাগলেন—ইংরেজী কেতার বড়দলে হোসেন খার খবর হলো। হোসেন খাঁ আজ রাজা বাহাদুরের বাগানে বাক্সর ভিতর থেকে টাকা উড়িয়ে দিলেন, উইলসনের হোটেল থেকে খাবার উড়িয়ে আনলেন, বোতল বোতল শ্যামপিন, দোনা দোনা গোলাবি ধিলি ও দলিম কিসমিস্ প্রভৃতি হরেক রকম খাবার জিনিষ উপস্থিত কল্লেন। কাল–রায়বাহাদুরের বাড়ীতে কমলালেবু, বেলফুলের মালা বরফ ও আচার আনলেন। যাঁরা পরমেশ্বর মনিতেন না, তাঁরাও হোসেন খাঁকে মানতে লাগলেন! ভাষায় বলে, “পাথরে পূজিলে পাঁচে পীর হয়ে পড়ে;” ক্রমে হোসেন খাঁ বড় বড় কাশ্মীরী উললুক ঠকাতে লাগলেন। অনেক জায়গায় খোরাকি বরাদ্দ হলো। বুজরুকী দেখবার জন্য দেশ-দেশান্তর থেকে লোক আসতে লাগলো। হোসেন খাঁ “প্রিমিয়ম্” বেড়ে গেল। জুচ্চুরি চিরকাল চলে না। “দশ দিন চোরের, এক দিন সেধের”; ক্রমে দুই এক জায়গায় হোসেন খাঁ ধরা পড়তে লাগলেন—কোথাও ঠোনাকা ঠানাকা, কোথাও কানমলা; শেষ প্রহার বাকী রইলো না। যাঁরা তাঁরে পূর্ব্বে দেবতা-নির্ব্বিশেষে আদর করেছিলেন, তাঁরাও দু এক ঘা দিতে বাকী রাখলেন না। কিছুদিনের মধ্যেই জিনি-সিদ্ধ হোসেন খাঁ পৌত্তলিকের শ্রাদ্ধের দাগ ষাঁড়ের অবস্থায় পড়লেন; যাঁরা আদর করে নিয়ে যান, তারাই দাগী করে বাহির করে দেন, শেষে সরকারী অতিথিশালা আশ্রয় কোল্লেন–হোসেন খাঁ জেলে গেলেন! যিনি পাতাল আশ্রয় কল্লেন!
১.২৫ ভূত-নাবানো
আর একবার যে আমরা ভূতনাবানো দেখেছিলেম, সেও বড় চমৎকার। আমাদের পাড়ার একজনের বড় ভয়ানক রোগ হয়। স্যাকরারা বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন, সুতরাং রোগের চিকিৎসা কত্তে ত্রুটি কল্লে না, ইংরেজ-ডাক্তার বদ্দি ও হাকিমের ম্যালা করে ফেল্লে; প্রায় তিন বৎসর ধরে চিকিৎস হলো, কিন্তু রোগের কেউ কিছু কত্তে পাল্লে না। রোগ ক্রমশঃ বৃদ্ধি হচ্ছে দেখে বাড়ীর মেয়েমহল তুলসী দেওয়া-কালীঘাটে সস্তেন—কালভৈরবে স্তবপাঠ-তুক্তাক—সাফরিদ-নারাণ–বালওড়-বালসী— শোপুর–নুরপুর ও হালুমপুর প্রভৃতি বিখ্যাত জায়গার চন্নামেন্তো ও মাদুলি ধারণ হলো, তারকেশ্বরে হত্যে দিতে লোক গেল-বাড়ীর বড় গিন্নী কালীঘাটে বুক চিরে রক্ত দিতে ও মাথায় ও হাতে ধূনো পোড়াতে গেলেন—শেষে একজন ভূতচালা আনা হয়।
ভূতচালার ভূতের ডাক্তারি পর্য্যন্ত করা আছে। আজকাল দু-এক বাঙ্গালী ডাকতার মধ্যে মধ্যে পেসেণ্টের বাড়ী ভূত সেজে দেখা দেন—চাদরের বদলে দড়ি ও পেরেক সহিত মশারি গায়ে, কখন বা উলঙ্গ হয়েও আসেন, কেবল মন্ত্রের বদলে চার পাঁচ জন রোজায় ধরাধরি করে আনতে হয়। এঁরা কলকেতা মেডিকেল কলেজের এজুকেটেড ভূত। ভূতচালা চণ্ডীমণ্ডপে বাসা পেলেন, ভূত আসবার প্রোগ্রাম স্থির হলো—আজ সন্ধ্যার পরেই ভূত নামবেন, পাড়ায় দু-চার বাড়ীতে খবর দেওয়া হলো—ভূত মনের কথা ও রুগীর ঔষধ বলে দেবে। ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে গেল, কুঠীওয়ালারা ঘরে ফিল্লেন-বারফট্কারা বেরুলেন, বিগ্রহের উত্তরাঢ়ি কায়েতের মত (দর্শন মাত্র) সেতল খেলেন, গীর্জ্জের ঘড়ীতে ঢং ঢং ঢং করে নটা বেজে গেল, গুম করে তোপ পড়লো। ছেলেরা “বোমকালী কলকেতাওয়ালী” বলে হাততালি দে উঠলো,–ভূতনাবানো আসরে নাবলেন!
আমাদের প্রতিবাসী, ভূতনাবানোর কথাপ্রমাণ ও বাড়ীর গিন্নিদের মুখে শুনে ভূতের আহার জন্য আয়োজন কত্তে ত্রুটী করে নাই; বড়বাজারের সমস্ত উত্তমোত্তম মেঠাই; ক্ষীরের নানারকম পেয় ও লেহ্যরা পদার্পণ কল্লেন। বোধ হয়, আমাদের মত প্রকৃত ফলারের দশ জনে তাদের শেষ কত্তে পারে না; রোজা ও তাঁর দুই চেলায় কি করবেন! রোজা ঘরে ঢুকে একটি পিঁড়েয় বসে ঘরের ভিতরে সকলের পরিচয় নিতে লাগলেন—অনেকের আপদমস্তক ঠাউরে দেখে নিলেন—দুই এক জন কলেজ বয় ও মোটা মোটা লাঠিওয়ালারা নিমন্ত্রিতদের প্রতি তাঁর যে বড় ঘৃণা জন্মেছিল, তা তাঁর সে সময়ের চাউনিতেই জানা গেল।
রোজার সঙ্গে দুটি চেলামাত্র, কিন্তু ঘরে প্রায় জন চল্লিশ ভূত দেখবার উমেদার উপস্থিত, সুতরাং ভূত প্রথমে আসতে অস্বীকার করেছিলেন। তদুপলক্ষে রোজাও “কাল ও কৃশ্চানীর” উপলক্ষে একটু বক্তৃতা কোত্তে ভোলেন নাই—শেষে দর্শকদের প্রগাঢ় ভক্তি ও ঘরের আলো নিবিয়ে অন্ধকার করবার সম্মতিতে, রোজা ভূত আন্তে রাজি হলেন–চেলারা খাবার দাবার সাজানো থালা যে সে বসলেন, দরজায় হুড়কো পড়লো, আলো নিবিয়ে দেওয়া হলো; রোজ্য কোশা-কুশী ও আসন নিয়ে শুদ্ধাচারে ভূত ডাকতে বলেন। আমরা ভূতের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে বারোইয়ারির গুদোমজাৎ সংগুলির মত অন্ধকারে বসে রইলেম!
