ক্রমে মাল চন্দন ও দানসামগ্রী উচ্ছুগগু হলে সভঙ্গ হলো। কলকেতার ব্রাহ্মণভোজন দেখতে বেশ—হুজুরেরা আঁতুরের ক্ষুদ মেয়েটিকেও বাড়ীতে রেখে ফলার কত্তে আসেন না—যার যে কটি ছেলেপুলে আছে, ফলারের নি সেগুলি বেরোবে! এক এক জন ফল রিমুখো বামুলকে ক্রিয়বাড়ীতে ঢুকতে দেখলে হঠাৎ বোধ হয়, যেন গুরুমশাই পাঠশালা তুলে চলেছেন। কিন্তু বেরোবার সময় বোধ হয়, এক একটা সর্দার ধোপা,লুচি মোণ্ডার মোটটি একটা গাধায় বইতে পারে না। ব্রাহ্মণরা সিকি, দুয়ানি ও আধুলি দক্ষিণা পেয়ে, বিদেয় হলেন, দই-মাখন এঁটো কলাপাত, ভাঙ্গা খুরী ও আঁবের আঁটীর নীলগিরি হয়ে গেল। মাছিরা ভ্যান ভ্যান করে উড়তে লাগলো—কাক ও কুকুরেরা টাঁকতে লাগলো। সামিয়ানায় হাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং জল সপসপানি ও লুচি, মণ্ডা, দই ও আঁবের চপটে একরকম ভেপ্সো গন্ধ বা মাতিয়ে তুলে–সে?হ্ম ক্রিস্মেবীর ফেরত লোক ভিন্ন অন্যে হঠাৎ আঁচতে পারবেন না।
এদিকে বৈকালে রাস্তায় কাঙ্গালী জমতে লাগলো, যত সন্ধতা হতে লাগলো, তই অন্ধকারের সঙ্গে কাঙ্গালী বাড়তে লাগলো। ভারী, কোনদার, উড়ে ও বেহার, রেয়ো ও গুলিখোরেরা কাঙ্গালীর দলে মিশতে লাগলো, জনতার ও! ও! রো! রো। শব্দে বাড়ী প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। রাত্তির সাতটার সময়ে ক ঙ্গালীদের বিদেয় করবার জন্য প্রতিবাসী ও বড় বড় উঠানওরলি লোকেদের বাড়ী পোরা হলো; শ্রাদ্ধের অধ্যক্ষের থলে থলো সিকি, আধুলি, দুয়ানি ও পয়সা নিয়ে দরজায় দাঁড়ালেন; চলতি মশাল, লণ্ঠন ও ‘আও! অও। রাস্তায় রাস্তায় কাঙ্গালী ডেকে বেড়াতে লাগলো; রাত্তির তিনটে পৰ্যন্ত কাঙ্গালী বিদেয় হলো! প্রায় ত্রিশ হাজার কাঙ্গালী জমেছিলো, এর ভিতর অনেকগুলি গর্ভবতী কাঙ্গালীও ছিল, তারা বিদেয়ের সময় প্রসব হয়ে পড়াতে নম্বরে বিস্তর বাড়ে।
কাঙ্গালী বিদেয়ের দিন দলস্থ নবশাখ, কায়স্থ ও বৈদ্যদের জলপান, ফলারে কেউ ফ্যালা যায় না, বামুন ও রেয়োদর মধ্যে যেমন তুখোড় ফুলারে আছে, কায়েত, নবশাক ও বদ্যিদের মধ্যেও ততোধিক। বরং কতক বিষয়ে এদের কাছে সার্টিফিকেটওয়ালা ফলারের কল্কে পায় না।
সহরের কাবু বাড়ী কোন ক্ৰিয়ে-কৰ্ম্ম উপস্থিত হলে বাড়ীয় ক্ষুদে ক্ষুদে ছেলেরা চাপকান, পায়জামা, টুপি ও পেটি পরে হাতে লাল রুমাল ঝুলিয়ে ঠিক যাত্রার নকীব সেজে, দলস্থ ও আত্মীয় কুটুম্বদের নেমস্তোর কত্তে বেরোন। এর মধ্যে বড় মানুষ বা শাসে-জলে হলে সঙ্গে পেশাদার নেমুন্তন্নে বামুন থাকে। অনেকের বাড়ীর সরকার বা দাদাঠাকুর গোছর পূজারী বামুনেও চলে। নেমন্তন্নে বামুন বা সরকার রামগোছের এক ফর্দ হাতে করে, কানে উডেন পেন্সিল গুঁজে পান চিবুতে চিবুতে নেমেন্তোনো বেরে যান—ছেলেটি কেবল “টু, কাপির” সইয়ের মতন সঙ্গে থাকে।
আজকাল ইংরিজি কেতার প্রাদুর্ভাবে অনেকে সাপ্টা ফলার বা জোজে যেতে “লাইক” করেন না! কেউ ছেলে পুলে পাঠিয়ে সারেন, কেউ স্বয়ং বাগানে যাবার সময়ে ক্রিয়েবাড়ী হয়ে বেড়িয়ে যান। কিছু আহার কত্তে অনুরোধ কল্লে, ভয়ানক রোগের ভাণ করে কাটিয়ে দ্যান; অথচ বাড়ীতে এক ঝোড়া কুম্ভকর্ণের আহার তল পেয়ে যায়–হাতিশালের হাতী ও ঘোড়াশালের ঘোড়া খেয়ে ও পেট ভরে না।
পাঠক! আমরা প্রকৃত ফলার দাম। লোহার সঙ্গে চুম্বকপাথরের যে সম্পর্ক, আমাদের সহিত লুচিরও সেইরূপ। তোমার বাড়ীতে ফলারটা আসটা জলে অনুগ্রহ করে আমাদের ভুলে না; আমরা মুনকে রঘুর ভাই। ফুলারের নাম শুনে, আমরা নরক ও জেলে পৰ্যন্ত যাই। সেবার মৌলুবী হালুম হোসেন খাঁ বাহাদুরের ছেলের সুন্নতে ফলার করে এসেছি। হিন্দুধৰ্ম্ম ছাড়া কাণ্ড বিধবা-বিয়েতে ৪ পাত পাতা গিয়েছে। আর কলকেতার ব্রাহ্মসমাজের জন্মতিথি উপলক্ষে ১১ই মাঘ পোপ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দি ফাষ্টের বাড়ীতে যে বছর বছর একটা অনুক্ষেত্তর হয়, তাতেও প্রসাদ পেয়েচি। লল কথা ঐ ব্রাহ্মভোজের দিন ঠাকুরবাবুর মাঠের মত চণ্ডীমণ্ডপে ব্রাহ্ম ধরে না, কিন্তু প্রতি বুধবারে উপাসনার সময়ে সমাজে ন দশ বারোকে চক্ষু বুজে ঘাড় নাড়তে ও সুর করে সংস্কৃত মজিয়া পড়তে দেখতে পাই। বাকিরা কোথায়? তারা বোধ হয় পোষাকী ব্রাহ্ম। না আমাদের মত যজ্ঞির বিড়াল?
এ সওয়ায় আমাদের ফলারের বিস্তর ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট আছে; যদি ইউনিভার্সিটিতে বি এ, ও বিএলের মত ফলারের ডিগ্রী স্থির হয়, তা হলে, আমরা তার প্রথম ক্যান্ডিডেট।
রমাপ্রসাদবাবুর মার সপিণ্ডনের জলপানে আড়ম্বর খিলক্ষণ হয়েছিল—উপচারও উত্তম রকম অহরণ হয়। সহরের জলপান দেখতে বড় মন্দ নয়; এক তো মধ্যাহ্নভোজন বা জলপান রাত্তির দুই প্রহর পর্য্যন্ত ঠেল মারে; তাতে নানা রকম জানোয়ারের একত্রে সমাগম। যারা আহার কত্তে বসেন, সেগুলির পা, প্রথম ঘোড়ার মত লাল বাঁধান বোধ হবে; ক্রমে সমীচীনরূপে দেখলে বুঝতে পারবেন যে, কর্ম্মকর্ত্তা ও ফলারের সঙ্গীদের প্রতি এমনি বিশ্বাস যে জুতো জোড়াটি খুলে খেতে বসতে ভরসা হয় না।
শেষে কায়স্থের ভোজ মগডম্বরে সম্পন্ন হলো। কুলীনেরা পর্য্যায় মত রুই মাছের মুড়ো মুণ্ডী পেলেন—এক একটা আধবুড়ো আফিমখোর কুলীনের মাছের বুড়ো চিবানো দেখে ক্ষুদে ক্ষুদে ছেলেরা ভয় পেতে লাগলো। এক এক সুনের পাত গো-ভাগারকে হারিয়ে দিলে! এই প্রকারে প্রায় পেনের দিন সমারোহের পর রমাপ্রসাদের মার সপিণ্ডনের ধুম চুলো-হুজুকদারেরা জিরতে লাগলেন!
