ভূমিকা (ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ)

ভূমিকা

উনিশ শতকের প্রারম্ভেই কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটলেও ঐতিহাসিক-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে প্রায় শতবর্ষ পরে জন্ম নেয় ঢাকাকেন্দ্রিক নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী। শতবর্ষের পশ্চাৎপদতার অলঙ্ঘ্য দেয়াল, রক্তস্রোতে জমে থাকা সংস্কারের মোহন-পুষ্ট প্রলেপ, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর কারণ-অকারণ সম্প্রদায়-বৈরী– সবকিছু মিলে বাঙালি মুসলিমমানস তখন পাড়ি দিচ্ছে এক ঊর্মিল ক্রান্তিলগ্ন। শতাব্দীর বেদনাময় যুগ-প্রতিবেশ অতিক্রমণের অভিলাষে নবজাগ্রত মুসলিম-মনীষা তখন হয়ে ওঠে সংস্কারমুখী, ছড়িয়ে দিতে চায় নতুন যুগের নতুন আলো; বিশ শতকের শুরুতেই তারা নতুন স্বপ্নের সম্ভাবনায় হয়ে ওঠে সৃষ্টিচঞ্চল। কিন্তু শতাব্দী-পরম্পরায় প্রসারিত সামন্ত মূল্যবোধের সঙ্গে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াতেই বিরোধ বাধে নবজাগ্রত এই শক্তির, রক্তাক্ত হয়ে ওঠে বুর্জোয়া মানবতাবাদে প্রত্যয়ী মধ্যশ্রেণীর সচেতন-সত্তা। বিশ শতকের সূচনালগ্নে যন্ত্রণাজর্জর এই যুগ-প্রতিবেশে বাংলা সাহিত্য-ক্ষেত্রে আবির্ভূত হন মুক্তচিত্ত-দ্রোহী এক আধুনিক শিল্পী, নাম তাঁর খান বাহাদুর কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬)।

মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে ইমদাদুল হক হচ্ছেন সেই শিল্পী, যিনি শিল্প-উপাদান সংগ্রহে প্রথম মনোযোগী হলেন সমকালের প্রতি। তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত, উদার মানবতাবাদী, মননশীল এবং যুক্তিবাদী শিল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ঔপন্যাসিক। কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথালালিত সামন্ত-মূল্যবোধে স্নিগ্ধ মুসলিম সমাজ-অঙ্গনে বাসন্তি হাওয়ার প্রত্যাশায় ইমদাদুল হক সাহিত্যক্ষেত্রে দ্রোহীসত্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তবু তিনি বিদ্রোহী নন, সমাজ ভাঙার ডাক নেই তার কর্মে-বরং মুসলিম সমাজের বিবিধ খণ্ডচিত্র আর গ্লানির অঙ্গন উপস্থাপন করেই তিনি তৃপ্ত থাকতে চেয়েছেন। বলা যেতে পারে, ইমদাদুল হক যেন অনেকটা মুসলিমসমাজের শরৎচন্দ্র (১৮৭৬-১৯৩৮), শরৎচন্দ্র পল্লী-সমাজ-এ (১৯১৬) যা করেছেন তাই যেন ধরেছেন ইমদাদুল হক তাঁর উপন্যাসে–অবশ্যই স্ব-সমাজের পটভূমিতে।

মহান শিক্ষাব্রতী ইমদাদুল হকের শিল্পিমানসের প্রধান শক্তি তাঁর প্রখর সমাজবীক্ষণ ক্ষমতা এবং এই প্রধান শক্তিই, আমাদের বিবেচনায়, তার শিল্পিসত্তার প্রধান দুর্বলতা। সমাজবীক্ষণ-সূত্রে হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ দেখে তিনি ব্যথিত হয়েছেন এবং সাহিত্যক্ষেত্রে এই বিদ্বেষের প্রতিফলনে তিনি হয়েছেন ক্ষুব্ধ। তিনি মুক্তচিত্তেই প্রত্যাশী ছিলেন ভারতের মহামিলনে– শিল্পিমানসের এই প্রত্যাশাই তার সকল সাহিত্যকর্মের মৌল প্রেরণা। তার স্বপ্ন আর প্রত্যাশা-প্রার্থনা কেমন ছিল, তা নিজেই তিনি লিখে গেছেন ১৩১০ সালের বৈশাখ সংখ্যা ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হিন্দু-মুসলমান ও বঙ্গ-সাহিত্য নামক প্রবন্ধে এবং সেখান থেকেই এক দীপ্র এলাকা :

হিন্দুগণ মুসলমানের হৃদয়ে আঘাত প্রদান করিয়া যে বিরোধ সৃষ্টি করিয়া রাখিয়াছেন, তাহার উপর আবার মুসলমানগণ যদি হিন্দুর অন্তরে ক্ষোভদান করিয়া বিরোধের উপর বিরোধ চাপাইতে বসেন, তাহা হইলে আমাদের ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার স্বপ্ন কস্মিনকালেও সফল হইবে না, কিন্তু হিন্দু সুলেখকগণ যদি মুসলমান-বিদ্বেষভাব সাহিত্যে এত পরিস্ফুট করিয়া তুলিয়া ইংরাজের ফরাসী এবং আইরিশ-বিদ্বেষের দৃষ্টান্ত অনুকরণ না করিতেন তাহা হইলে হিন্দু-মুসলমানকে আজ একই গৃহে আবদ্ধ বৈরীভাবাপন্ন দুই সহোদর ভ্রাতার ন্যায় পরস্পর কুণ্ঠিত ও সঙ্কুচিত হইয়া বাস করিতে হইত না।

০২.

চুয়াল্লিশ বছরের কর্মচঞ্চল জীবনে ইমদাদুল হকের প্রধান কীর্তি আবদুল্লাহ্ (১৯৩৩) উপন্যাস।২ একটিমাত্র উপন্যাস লিখে ইমদাদুল হক বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন তার স্বতন্ত্র প্রতিভার স্বাক্ষর। আবদুল্লাহ উপন্যাস বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকের সময়সীমায় প্রবাহিত মুসলিম জীবনবিশ্বাস এবং জীবন-যন্ত্রণার শিল্পিত ভাষ্য। একটি বিশেষ যুগসত্যকে ধারণ করে রচিত হলেও আবদুল্লাহ্ স্ব-কালের সীমা পেরিয়ে অভিষিক্ত হয়েছে কালোত্তীর্ণ শিল্পের মর্যাদায়। যে বিষয়পুঞ্জকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে আবদুল্লাহ্ তা এখনো আছে আমাদের সমাজে, হয়তো কমেছে তার মাত্রা এবং আসবে এমন একদিন যেদিন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মুসলিমজীবন কেমন ছিল, তার অস্তিত্ব খুঁজবো ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ্-র পাতায়–সেদিন আবদুল্লাহ্ বোধকরি, শিল্প থাকবে না, হবে ইতিহাস এবং সে-সূত্রেই আমরা বলছি, আবদুল্লাহ্ যতটা না শিল্প, তার চেয়ে বড় কথা এ-হচ্ছে সমাজচিত্র, খালি চোখে দেখা পুঙ্খানুপুঙ্খ সমাজবাস্তবতা।

আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে গ্রামীণ মুসলিমসমাজের পীরভক্তি, ধর্মীয় কুসংস্কার, পর্দাপ্রথা, আশরাফ-আতরাফ বৈষম্য, হীন স্বার্থপরতা, সম্প্রদায়বিদ্বেষ ইত্যাদির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া মানবতাবাদী প্রতিবাদ। মধ্যবিত্তের বিকাশের ফলে মুসলিমসমাজের ভিত্ কিভাবে নড়ে উঠেছে তার চিত্র আছে, আছে গ্রামীণ সমাজের বহুমাত্রিক জটিলতা ও বিরোধ; তবু স্রষ্টার ধর্মনিরপেক্ষ উদার মানবতাবাদী দর্শনই আবদুল্লাহ্ উপন্যাসের মৌল-অভিজ্ঞান। ইমদাদুল হক স্বপ্ন দেখেছেন মানব-মৈত্রীর, ঘৃণা করেছেন সম্প্রদায়-বিদ্বেষী মানসিকতাকে মুসলিম জীবনচিত্রণ-সূত্রে এ-কথাই উচ্চারিত হয়েছে উপন্যাসে। এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয় আবদুল্লাহ্ উপন্যাস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিমত

আবদুল্লাহ্ বইখানি পড়ে আমি খুশি হয়েছি–বিশেষ কারণে, এই বই থেকে মুসলমানের ঘরের কথা জানা গেল। এদেশের সামাজিক আবহাওয়া-ঘটিত একটা কথা এই বই আমাকে ভাবিয়েছে। দেখলুম যে ঘোরতর বুদ্ধির অন্ধতা হিন্দুর আচারে হিন্দুকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করেছে, সেই অন্ধতাই চাদর ত্যাগ করে লুঙ্গি ও ফেজ পরে মুসলমানের ঘরে মোল্লার অন্ন জোগাচ্ছে। এ কি মাটির গুণ? এই রোগবিষে ভরা বর্বরতার হাওয়া এদেশে আর কতদিন চলবে? আমরা দুই পক্ষ থেকে কি বিনাশের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরস্পর পরস্পরকে আঘাত ও অপমান করে চলব? লেখকের লেখনীর উদারতা বইখানিকে বিশেষ মূল্য দিয়েছে।

আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে ইমদাদুল হক ব্যক্তিচরিত্র অপেক্ষা সমাজমানসের প্রতি অধিক মনোযোগী ছিলেন; ফলে উপন্যাসের যে অন্যতম শর্ত চরিত্রসৃজন, তা থেকে গেছে গৌণ, কখনো-বা অবহেলিত-উপেক্ষিত। মানবচিত্তের মূল প্রবৃত্তিগুলির দ্বন্দ্বে মানুষ কত অসহায়–এই চিরন্তন সত্যের রূপ-অঙ্কনে কাজী সাহেব যতটা নজর দেননি, তার চেয়ে বেশী তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে গ্রাম-বাংলার মুসলমানদের বিশেষ সমাজ ও বিশেষ কালের ছবি আঁকার দিকে। শিল্পী বঙ্কিমচন্দ্রের (১৮৩৮-১৮৯৪) উপন্যাসসমূহ যেমন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে হিন্দু বঙ্কিমচন্দ্রের কঠোর শাসনে; তেমনি শিল্পী ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ্ বরাবর নিয়ন্ত্রিত হয়েছে সমাজের গলদ-প্রদর্শক একজন সমাজসংস্কারক ইমদাদুল হকের অদৃশ্য নির্দেশে। ফলে একটি মহাকাব্যিক পটকে স্পর্শ করেও ইমদাদুল হক ব্যর্থ হয়েছেন শৈল্পিক সিদ্ধি অর্জনে। এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বিষাদ-সিন্ধু (১৮৯১) আর আনোয়ারার (১৯১৪) পরে। আবদুল্লাহ্-র জাগরণকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি একটা বিশেষ সময়ের মুসলিমমানসের। শিল্পিত ভাষ্য হিসেবেই।

সফল হোক বা না-ই হোক, তবু আবদুল্লাহ-ই এ-উপন্যাসের নায়ক। তাকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের ঘটনাক্রম আবর্তিত হয়েছে, ধরা যায় তাকে সমস্ত ঘটনার যোগসূত্র হিসেবেই–তবু তার কোন ভূমিকাই নায়কোচিত নয়। প্রথম আবির্ভাবে তাকে যেমনটি দেখেছি, উপন্যাসের অন্তিমলগ্নেও সে তেমনি থেকে গেছে, ভোগেনি একবারও অন্তর্দ্বন্দ্বে; সমস্ত বিপর্যয়ের মুখে সে সব সময়ই যেন যুধিষ্ঠির। প্রথম থেকেই আবদুল্লাহ্ সম্পূর্ণাঙ্গ চরিত্র, তার কোন উদ্ভব নেই, বিকাশ নেই, নেই কোন পরিণতি। আবদুল্লাহ যেন ইমদাদুল হকের মানস-আকাঙ্ক্ষার শিল্প-মূর্তি ইমদাদুল হকের মতোই সংযতবাক, অচঞ্চলচিত্ত ও আদর্শনিষ্ঠ এক শিক্ষাব্রতী।

এতসব সীমাবদ্ধতা ধারণ করেও, আবদুল্লাহ্ এই অর্থে অনন্য ভাস্বর চরিত্র যে, সে-ই নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তমানসের প্রথম শিল্প-সন্তান। রক্ষণশীলতার দুর্গ সৈয়দ সাহেব আর প্রগতিমুখী মীর সাহেবের চৈতন্যের সংঘাত-সংঘর্ষে আবদুল্লাহ্ তৃতীয় মাত্রা নিয়ে বুর্জোয়া মানবতাবাদের ধারক হয়ে উঠতে চেয়েছে–কূপমণ্ডুকতা-পীরপ্রথা-ধর্মপ্রথা আর পাথরচাপা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তাই অভীকচিত্তে সে বলতে পেরেছে এমন কথা–

ক. তাদের (হিন্দুদের) আছে বলেই যে আমাদের সেটা থাকতে হবে, এমন ত কোনো কথা নেই, আম্মা! আর এই পীর-মুরীদি ব্যবসায়টা হিন্দুদের পুরুতগিরির দেখাদেখিই শেখা, নইলে হযরত ত নিজেই মানা করে গেছেন, কেউ যেন ধর্ম সম্বন্ধে হেদায়েত করে পয়সা না নেয়।

খ. অত শরীয়তের ধার ধারিনে ভাই সাহেব; এইটুকু বুঝি যে মানুষের সুখ-সুবিধারই জন্য শরা-শরীয়ত জারি হয়েছে; বে-কায়দা কালে-অকালে কড়াকড়ি করে মানুষকে দুঃখ দেবার জন্যে হয়নি।

গ. খোদার উপর অবিশ্বাস দেখলে কোন্‌খানে? সংসারে উন্নতির চেষ্টা না করে কেবল হাত পা কোলে করে বসে থাকলেই যদি খোদার উপর বিশ্বাস আছে বলে ধরতে চাও, তবে আমি স্বীকার করি, আমার তেমন বিশ্বাস নেই।

আবদুল্লাহ্ পীরপ্রথা আর কুসংস্কারপ্রিয়তাকে প্রায়শই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে যেমন জর্জরিত করেছে, তেমনি উচ্চারণ করেছে অসাম্প্রদায়িক মানস-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন দেখেছে একটি নতুন সমাজের। বরিহাটীর স্কুল থেকে বিদায়-লগ্নে ছাত্রদের উদ্দেশে তার বক্তব্য মুসলিম মধ্যবিত্তের অসাম্প্রদায়িক জীবনদৃষ্টিকে যেমন প্রকাশ করেছে, তেমনি এর মধ্য দিয়েই ইমদাদুল হকের মৌল-আকাঙ্ক্ষাও অভিব্যঞ্জিত হয়েছে–আশীর্বাদ করি, তোমরা মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও–যে মানুষ হলে পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা কত্তে ভুলে যায়, হিন্দু মুসলমানকে, মুসলমান হিন্দুকে আপনার জন বলে মনে কত্তে পারে। এই কথাটুকু তোমরা মনে রাখবে ভাই, –অনেকবার তোমাদের বলেছি, আবার বলি, হিন্দু-মুসলমানে ভেদজ্ঞান মনে স্থান দিও না। আমাদের দেশে যত অকল্যাণ, যত দুঃখ-কষ্ট, এই ভেদজ্ঞানের দরুনই সব। এইটুকু ঘুচে গেলে আমরা মানুষ হতে পারব দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারব।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে মুসলিম মধ্যবিত্তমানসের মৌল-লক্ষণ সমাজবিচ্ছিন্ন স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং একই সাথে সমাজ-সংশ্লিষ্ট কর্মচেতনা আবদুল্লাহ্ চরিত্রের মধ্য দিয়ে শিল্পমূর্তি লাভ করেছে। আবদুল্লাহ্ তার দৃষ্টিকে সমাজ-অঙ্গন থেকে কখনো ব্যক্তিলোকে নিয়ে আসতে পারেনি ফলে সমাজস্রোতে ভাসমান ব্যক্তি-আবদুল্লাহর কোনই সংরাগ অনুরাগ–সংবেদনা আমাদের কাছে ধরা দেয়নি। সে সব সময় ভালো থেকে গেছে, খুব ভালো এবং শেষ পর্যন্ত এক ভালোমানুষ হিসেবেই নতুন-পুরাতনের দ্বন্দ্বে সে জয়ী হয়েছে– স্রষ্টা যেন নিজের মানসইচ্ছাকে আবদুল্লাহর মাধ্যমে শিল্পমূর্তি দান করেছেন। তাই উপন্যাসের অন্তিমলগ্নে হরনাথের দৃষ্টিকোণে লেখক উচ্চারণ করেছেন এমন কথা–

এই মহৎ উদার যুবকের প্রতি তাঁহার (হরনাথ) মন আপনা হইতে নত হইয়া পড়িল। শ্রদ্ধায়, প্রীতিতে তাহার সমগ্র অন্তর্দেশ ভরিয়া উঠিল। তিনি উঠিয়া আবদুল্লাহকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, ভাই, তোমার মহত্ত্বের কাছে আজ আমি নতশিরে পরাজয় স্বীকার করছি। আজ হতে সত্যিই তুমি আমার ভাই।

আবদুল্লাহ্ উপন্যাসের মৌল-বিষয় মুসলিমসমাজের জগদ্দল-প্রথা আর মিথ্যা সামন্ত আভিজাত্যের পতন-উন্মোচন এবং সে-সূত্রেই সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস-চরিত্রের উজ্জ্বল নির্মিতি। সৈয়দ সাহেবই এ-উপন্যাসের একমাত্র চরিত্র, যাকে ভালো-মন্দ মিলিয়ে রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয়। শরাফতী অভিমান, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অতিধার্মিকতা, মিথ্যা আভিজাত্যবোধ, অমিতচারিতা, খ্যাতি অর্জনের দুর্মর বাসনা এবং অর্থলোলুপতা–সবকিছু মিলে তিনি ধ্বংসোনুখ সামন্তসমাজের শেষ নিশ্বাস যেন। মীর হোসেন আলীর চরিত্র সৈয়দ সাহেবের বিপরীত প্রান্ত ধরে নির্মিত হয়েছে। সে সুদখোর, তাই প্রচলিত ধারণায় অধার্মিক–কিন্তু গভীরতর দৃষ্টিতে দেখলে সে অধার্মিক হয়েও মানুষ। ধার্মিক হলেই যে মানুষ শ্রদ্ধেয় হয় না, অথচ পুরোপুরি ধার্মিক না হলেও শ্রদ্ধেয় হতে পারে, এই দৃষ্টিকোণে চরিত্রদ্বয় চিত্রিত করে ইমদাদুল হক আধুনিক যুগের ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে তার সাধর্মের পরিচয় দিয়েছেন।১১ দুটো চরিত্রের অন্তসত্তার দ্বন্দ্বের মাধ্যমে লেখক উপস্থাপন করতে চেয়েছেন মুক্তবুদ্ধির এক মৌল ধারণা, যা কাজী আবদুল ওদুদের ভাষ্যে–

যখন ভাবা যায়, রক্ষণশীল সৈয়দ সাহেবের প্রকাণ্ড ব্যক্তিত্ব, তার চারপাশের জগতের উপরে তার প্রভাব, আর সমাজে অপ্রিয় কিন্তু তীক্ষ্ণদৃষ্টি ও বিচক্ষণ মীর সাহেবের অনাড়ম্বর কিন্তু সুনিশ্চিত সংস্কারপ্রয়াস ও তাতে অনেকখানি সাফল্য, তখন মনে হয় এই দুই ব্যক্তি অথবা দুই শক্তি আবদুল্লাহ-কারের তুলিকার প্রধান বিষয়, –আবদুল্লাহ্, আবদুল কাদের, রাবিয়া, হালিমা প্রমুখ মুসলিম নবীন-নবীনা হচ্ছেন বাংলার মুসলিমসমাজের এই দুই বিরুদ্ধশক্তির অবশ্যম্ভাবী সংঘর্ষজাত স্ফুলিঙ্গ। এই স্ফুলিঙ্গই অবশ্য ভবিষ্যতের অচঞ্চল আলোকের পূর্বাভাস।১২

আবদুল্লাহ উপন্যাসে নারী আছে, কিন্তু কোন নারী-চরিত্র নেই যারা ব্যক্তিত্বে-প্রেমে সংগ্রামে-সত্তায় সমুজ্জ্বল। কারণ একটাই, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মুসলিম সমাজে নারীর ব্যক্তিত্ব-বিকাশের চরম অবরোধ। তবে এখানে লেখকের ব্যর্থতা ঢাকবার পুরোপুরি অবকাশ নেই, কারণ সালেহা-হালিমা বা রাবিয়ার বেশ কিছু পূর্বেই মোহাম্মদ নজিবর রহমানের (১৮৭৮-১৯২৩) শব্দস্রোতে আমরা পেয়েছিলাম ব্যক্তিত্বসচেতন আনোয়ারা চরিত্র–তারও ছিল একই সমাজপটভূমি।

দিগম্বর ঘোষ এবং হরনাথ চরিত্রের মাধ্যমে লেখক উপস্থিত করেছেন হিন্দু-সামন্তপ্রভুর মহাজনি শোষণের চিত্র। ইমদাদুল হকের শিল্পিমানসের মৌল-ধর্ম অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সে-সূত্রে আবদুল্লাহর পরেই এসেছে ডাক্তার দেবনাথ সরকার চরিত্র। দেবনাথ সকল ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মানবিক গুণে জাগ্রত এক উদার মানুষ। এ-উপন্যাসে প্রায়ই সাম্প্রদায়িক চেতনা উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের মুখে, কিন্তু লেখকের সাফল্য এখানেই যে, তিনি সচেতনভাবে তার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন এবং আবদুল্লাহ্ ও দেবনাথ-চরিত্রের মাধ্যমে তার কেন্দ্রীয়বোধে জাগ্রত থেকেছেন।

কাজী ইমদাদুল হক বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক নন, তবে শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের অন্যতম ধর্ম যে পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতা–তা ছিল আবদুল্লাহ্-কারের করতলগত। পর্যবেক্ষণক্ষমতার সূক্ষ্মতায় ইমদাদুল হক ছিলেন শ্রেষ্ঠমানের শিল্পী এবং এ সূত্রেই এ-উপন্যাসে পরিপ্রেক্ষিতের চরিত্রসমূহের উজ্জ্বল নির্মিতি। ইমদাদুল হক যে ঔপন্যাসিকের প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন, এ-উপন্যাসে পরিপ্রেক্ষিতের চরিত্রগুলো দেখেই আমরা তা অনুধাবন করতে পারি। নিরাসক্ত দৃষ্টি দিয়ে তিনি এমন কতিপয় চরিত্র নির্মাণ করেছেন, সমকালীন মুসলিম কথাকোবিদদের রচনায় তার তুলনা মেলা ভার। ২৯ পরিচ্ছেদে আছে এমন একটি উজ্জ্বল নির্মাণ। আবদুল্লাহ্ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে রসুলপুর স্কুলে। পল্লিগ্রামের রাস্তা বর্ষার অত্যাচারে গরুর গাড়ির জন্যে উপযুক্ত ছিল না, ফলে একস্থানে গাড়ি অচল হলো। রাস্তার পাশেই এক ব্রাহ্মণের বাড়ির উপর দিয়ে যাবার বিকল্প পথ ছিল। আবদুল্লাহ্ সে-চেষ্টা করতে গেলে উপন্যাসে ফুটলো সেই ক্ষণিকের উজ্জ্বল চরিত্র–

আবদুল্লাহ্ যথাশক্তি বিনয়ের ভাব দেখাইয়া কহিল, মশায়, আমি গরুর গাড়ি করে যাচ্ছিলাম, গ্রামের মধ্যে এসে দেখি রাস্তার এক জায়গায় ভাঙ্গা, গাড়ি চলা অসম্ভব। শুনলাম মশায়ের বাড়ির পাশ দিয়ে একটা পথ আছে, যদি দয়া করে…

লোকটি রুখিয়া উঠিয়া কহিলেন, হ্যাঁ, তোমার গাড়ি চলে না চলে তা আমার কি? আমার বাড়ির উপর দিয়ে ত আর সদর রাস্তা নয় যে, যে আসবে তাকেই পথ ছেড়ে দিতে হবে…

আবদুল্লাহ্ একটু দৃঢ়স্বরে কহিল, মশায়, বিপদে পড়ে একটা অনুরোধ কত্তে এসেছিলাম, তাতে আপনি চটছেন কেন? পথ চেয়েছি বলে ত আর কেড়ে নিতে আসিনি। সোজা বল্লেই হয়, না, দেব না।

ওঃ, ভারি ত লবাব দেখি! কে হে তুমি, বাড়ি বয়ে এসে লম্বা লম্বা কথা কইতে লেগেছো?

লোকটা গজর গজর করিতে লাগিল। আবদুল্লাহ্ ফিরিয়া চলিল। তাহাকে বিষণ্ণ মুখে ফিরিতে দেখিয়া গাড়োয়ান কহিল, দেলে না বুঝি? আমি জানি ও ঠাহুর ভারি ত্যান্দোড়। তবু আপনেরে একবার যাতি কলাম, ভদ্দর লোক দেখলি যদি যাতি দেয়।

গাড়োয়ানের সঙ্গে নিজে কাদায় নেমে গাড়ি চালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় আবদুল্লাহ্। অবশেষে গ্রামের লোকদের সাহায্যে তারা গাড়ি খাদ থেকে তুলে নিতে সক্ষম হয়। তখন ব্রাহ্মণ ব্যক্তির অভিব্যক্তি–

ব্রাহ্মণটি উঠিয়া গিয়াছিলেন; কিছুক্ষণ পরে পান চিবাইতে চিবাইতে ডাবা হাতে আবার বাহিরে আসিয়া বসিলেন।…

যাইবার পূর্বে আবদুল্লাহ সেই ডাবা-প্রেমিকটির দিকে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল ঠাকুরমশায় তাহাদের দিকে তাকাইয়া আছেন এবং সুস্থচিত্তে ধূমপান করিতেছেন।১৩

অপ্রধান চরিত্রসমূহের ক্ষেত্রেও ইমদাদুল হকের এমন শৈল্পিক-সিদ্ধি লক্ষণীয়। বরিহাটী গভর্নমেন্ট স্কুলের হেডমাস্টার, পূর্বাঞ্চল-নিবাসী মৌলবী সাহেব, কলকাতার পীর সাহেব কিংবা রেলস্টেশনের হোটেলওয়ালার চরিত্র নির্মাণে ইমদাদুল হক রেখেছেন অসামান্য সাফল্যের স্বাক্ষর। পূর্বাঞ্চল-নিবাসী মৌলবী সাহেব এক বিস্ময়কর চরিত্র। এ-চরিত্রসূত্রে ইমদাদুল হক একদিকে যেমন তুলে ধরেছেন সমাজের শ্রেণী-বৈষম্যের উৎকট চেহারা; তেমনি তার আপন অস্তিত্বের অভিলাষ। সৈয়দ সাহেবের পারিবারিক মক্তবে প্রভু-পুত্র বাঁদী-পুত্রদের পাঠ-প্রদানে বৈষম্যের কারণ জিজ্ঞাসায় মৌলবী সাহেবের অকপট উচ্চারণ–

মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর আরো কাছে ঘেঁষিয়া আসিয়া ফিসফিস করিয়া কহিতে লাগিল, খতাড়া খি, বোলেননি, দুলহা মিঞা? অরা অইলো গিয়া আত্রাফগোর ফোলাফান, অরা এইসব মিয়াগোরের হমান চলতাম্ ফারে? অবৃগো জিয়াদা সবক দেওয়া মানা আছে, বোজুলেননি?

এতক্ষণে আবদুল্লাহ্ এই পাঠদান-কৃপণতার মর্ম হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইল। পাছে প্রতিবেশী সাধারণ লোকের ছেলেরা নিজেদের ছেলেদের অপেক্ষা বেশী বিদ্যা উপার্জন করিয়া বসে, সেই ভয়ে তাহার শ্বশুর এইরূপ বিধান করিয়াছেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তা ওদের পড়তে আসতে দেন কেন? একেবারেই যদি ওদের না পড়ান হয়, সেই ভাল নয় কি?

এই কথায় মৌলবী সাহেবের হৃদয়ে করুণা উথলিয়া উঠিল। তিনি কহিলেন, অহহঃ, হেডা কাম বালা অয় না, দুহা মিঞা! গরীব তাবেলম হিব্বার চায়, এক্কেবারে নৈরাশ করলে খোদার কাছে কি জবাব দিমু? গোমরারে এলেম দেওনে বহুত সওয়াব আছে কেতাবে ল্যাহে।১৪

আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে ইমদাদুল হক মূলত এঁকেছেন সমাজচিত্র, তাই কোন চরিত্রেরই ব্যক্তিক মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণে তিনি উৎসাহী নন। নজিবর রহমানের আনোয়ারা-র মতোই আবদুল্লাহ্ সমকালীন মুসলিম-জীবনবিশ্বাসের শিল্প-প্রতিমা। তবে আনোয়ারার ঘটনাসংস্থান কিংবা চরিত্রচিত্রণ-প্রক্রিয়া যেখানে সষ্টার সামন্ত-মূল্যচেতনা ও নীতিবোধ নিয়ন্ত্রিত, সেখানে আবদুল্লাহ্-র ঘটনাংশ, চরিত্রসৃজন-কৌশল কিংবা পরিপ্রেক্ষিত-উন্মোচন একান্তই বিকাশোন্মুখ বুর্জোয়া মানবতা-শাসিত। ইমদাদুল হক সম্পূর্ণ স্বাধীন-চিত্তের ও মৌলিক পর্যবেক্ষণ-শক্তির পরিচয় দিয়েছেন আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে। এ-বইটি বাঙালি মুসলমান সমাজের ক্ষয়িষ্ণু আদর্শ ও পরিহার্য রীতিনীতি-সমালোচনার এক স্মরণীয় প্রচেষ্টা।১৫

০৩.

লেখকের ব্যক্তি-সংবেদনা এবং সমাজচৈতন্যের চিত্র ও চিত্রকল্পময় বর্ণনাত্মক নির্মিতির নাম যদি হয় উপন্যাস, তবে ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ্-কে আমরা দিতে পারি না একটা সফল উপন্যাসের অভিধা। উপন্যাসের গঠনশৈলী এবং প্রকরণ–পরিচর্যার দিকে ইমদাদুল হক তেমন মনোযোগী ছিলেন না; পূর্বেই বলেছি, তার কেন্দ্রীয় দৃষ্টি মূলত বহির্বাস্তব বৃহত্তর সমাজ-অঙ্গনেই ছিল বিচরণশীল। উপন্যাসের যে-কেন্দ্রানুগশক্তি সকল খণ্ডচিত্রকে একটি অখণ্ড মালায় গ্রথিত করে, তা এখানে নেই। কাহিনীর কেন্দ্রে থেকেও আবদুল্লাহ্ পালন করতে পারেনি সেই কেন্দ্রানুগ শক্তির ভূমিকা। ফলে উপন্যাস-অবয়ব ধারণ করেও আবদুল্লাহ অন্তিম বিচারে থেকে যায় প্যারীচাঁদ মিত্রের (১৮১৪-৮৩) আলালের ঘরের দুলাল-এর (১৮৫৮) মতোই সমাজের চিত্রমালা হিসেবে।

উপন্যাসের বর্ণনাংশে এবং সংলাপের ভাষা-ব্যবহারে ইমদাদুল হক সচেতন প্রযত্নের স্বাক্ষর রেখেছেন। উপন্যাসের যে-অংশ লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণের আলোয় রচিত হয়েছে, সেখানকার ভাষা সাধুরীতির; আর চরিত্রসমূহের সংলাপে আছে চলিতরীতি। পূর্বাঞ্চলীয় মৌলবী সাহেব কিংবা কলকাতার পীর সাহেবের মুখে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে ইমদাদুল হক বিস্ময়কর সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষা-ব্যবহারের সম্ভাবনার সীমা মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে ইমদাদুল হকের হাতেই প্রথম প্রসারিত হয়েছে। প্রকরণ–পরিচর্যায় ইমদাদুল হক সচেতন ছিলেন না–পূর্বেই বলেছি। তবু কখনো কখনো কিছু বর্ণনাত্মক পরিচর্যা পাঠকের সংবেদনাকে আকর্ষণ করে। এমন একটি দীপ্র এলাকা–

বৈঠকখানা ঘরটি নিরতিশয় জীর্ণ এবং আসবাবপত্রও তাহার অনুরূপ। বসিবার জন্য একখানি ভগ্নপ্রায় চৌকি–সে এত পুরাতন যে, ধুলা-বালি জমিয়া জমিয়া তাহার রং একেবারে কালো হইয়া গিয়াছে। চৌকির উপর একটি শতছিদ্র ময়লা শতরঞ্জি পাতা, তাহার উপর ততোধিক ময়লা দুই-একটা তাকিয়া, উহার এক পার্শ্বে সদ্যব্যবহৃত ক্ষুদ্র জায়নামাজটি কোণ উল্টাইয়া পড়িয়া আছে। মেঝের উপর একটা গুড়গুড়ি, নয়চাটীতে এক ন্যাকড়া জড়ান হইয়াছে যে, তাহার আদিম আবরণের চিহ্নমাত্রও আর দৃষ্টিগোচর হইবার উপায় নাই। গৃহের এক কোণে একটি মেটে কলসী, কোণে একটি বহু টোল-খাওয়া নল-বাকা কলাইবিহীন বা স্বকৃত কর্দমের উপর কাৎ হইয়া পড়িয়া আছে। ১৬

ইমদাদুল হকের ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কৌতুকময়তা এবং তাঁর কৌতুকে আছে মননশীলতা ও মার্জিত রুচির স্বাক্ষর। যেমন–

ক. বৈঠকখানার এক প্রান্তে তখন এ বাটীর পারিবারিক মক্তব বসিয়া গিয়াছে। একখানি বড় অনতিউচ্চ চৌকির উপর ফর্শ পাতা; তাহারই উপর বসিয়া পূর্বাঞ্চল-নিবাসী বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব আরবী, ফারসী এবং উর্দু সবকের রাশিতে ছোট ছোট ছেলেদের মাথা ভরাট করিয়া দিতেছে।১৭।

খ. এইরূপ বহু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনার পর মৌলুদ-খান সাহেব এক দীর্ঘ মোনাজাত (প্রার্থনা) করিয়া মৌলুদ শরীফ সাঙ্গ করিলেন। সমস্তই উর্দু ভাষাতে কথিত ও গীত হইল; অধিকাংশ লোকই তাহার এক বর্ণও বুঝিল না; কিন্তু তাহাতে পুণ্যসঞ্চয়ের কোন বাধা হইল না।১৮

প্রায় সকল লেখকের মতো, ইমদাদুল হকেরও যাত্রা শুরু কবিতার স্নিগ্ধতা নিয়ে। তবে। এ-উপন্যাসে তার সেই কবিসত্তা সুপ্তই থেকেছে, মাঝে একবার মাত্র প্রকৃতি-বর্ণনায় আঁখি জল (১৯০০) আর লতিকা-র ইমদাদুল হক উঁকি দিয়েছেন এখানে–

তখন শরৎকাল প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। মাঠগুলি পরিপূর্ণ; মৃদুমন্দ বায়ু হিল্লোলে তাহাদের শ্যামল হাস্য ক্ষণে ক্ষণে তরঙ্গায়িত হইয়া উঠিতেছে। এই অপূর্ব নয়ন-তৃপ্তিকর দৃশ্য দেখিতে এবং শারদীয় প্রভাতের সুখ-শীতল সমীরণের মধুর স্পর্শ অনুভব করিতে করিতে আবদুল্লাহ্ মাঠের পর মাঠ এবং গ্রামের পর গ্রাম পার হইয়া চলিতে লাগিল।১৯

ইমদাদুল হক প্রায়শই প্রবাদ-প্রবচনের অব্যর্থ ভাষ্যে তুলে ধরেন আপন বক্তব্য, যা আবদুল্লাহ উপন্যাসের ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উপমা-উৎপ্রেক্ষা তার শিল্পচেতনার প্রাতিস্বিকতাকেই প্রমাণিত করে। তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি চরিত্রের ভাবনাপুঞ্জের অনুগামী করে নির্মাণ করেন উপমা-উৎপ্রেক্ষা। যেমন–

ক. পথে হঠাৎ সাপ দেখিলে মানুষ যেমন এক লক্ষে হটিয়া দাঁড়ায়, সেও তেমনি হটিয়া গিয়া বলিয়া উঠিল, আহা, করেন কি, করেন কি, গোলদার সাহেব!২০

খ. দমাদম্ ঢোলে ঘা পড়িতে লাগিল। মদনের মনে হইল, যেন সে ঘা তাহার বুকের ভিতরই পড়িতেছে। ২১

গ. হালিমাকে সঙ্গে লইয়া আবদুল্লাহ্ যখন গৃহে ফিরিল, তখন মাতা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন।২২

০৪.

আবদুল্লাহ উপন্যাস মোট ৪১ পরিচ্ছেদের সমষ্টি হলেও, কাজী ইমদাদুল হক লিখেছেন এর প্রথম ৩০ পরিচ্ছেদ মাত্র; বাকি ১১টি পরিচ্ছেদ লিখে উপন্যাসটির একটা সন্তোষজনক সমাপ্তি টেনেছেন কাজী আনোয়ারুল কাদীর। মোসলেম ভারত (১৯২০) পত্রিকা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইমদাদুল হকের অসুস্থতাজনিত কারণে আবদুল্লাহ শুধুই ইমদাদুল হকের রচনা থাকেনি–তবে এই অর্থেই এটি ইমদাদুল হকের রচনা যে কাজী আনোয়ারুল কাদীর মূলত ইমদাদুল হকের খসড়া অবলম্বন করেই উপন্যাসটি সমাপ্ত করেছেন। যে ১১টি পরিচ্ছেদ আনোয়ারুল কাদীর লিখেছেন, তাতে তাঁকে ইমদাদুল হকের মতো সমাজের চিত্রকর ততটা মনে হয়নি, যতটা মনে হয়েছে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষক। আনোয়ারুল কাদীর অতি সংক্ষেপে পরিচ্ছেদগুলো শেষ করেছেন, ফলে তার স্বাতন্ত্র তেমন প্রকাশিত হতে পারেনি। তবু দু-একটি পরিচ্ছেদে তার শিল্পপ্রতিভার স্পর্শ লেখেছে। সালেহার মৃত্যু দৃশ্য কিংবা সৈয়দ সাহেবের অন্তিমযাত্রা বর্ণনায় তিনি অনেক সংযতবাক এবং নিরাসক্ত। বোধ করি, আনোয়ারুল কাদীরের শিল্পপ্রতিভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য পরিমিতিবোধ; বিভিন্ন চরিত্রের মৃত্যু-বর্ণনায় তার এই বৈশিষ্ট্য চমৎকার প্রকাশিত হয়েছে।

০৫.

সমাজবীক্ষণ যদি আধুনিক ঔপন্যাসিকের অন্যতম লক্ষণ হয়, তবে আবদুল্লাহ্-র স্রষ্টা ইমদাদুল হক আধুনিক ঔপন্যাসিকদের সগোত্র; কিন্তু তবু তিনি সফল ঔপন্যাসিক নন। তিনি সমাজ-প্রাঙ্গণ থেকে অনেক উপাদান সংগ্রহ করেছেন; কিন্তু কতটুকু রাখবেন আর কতটুকু বাদ দিবেন– তা তিনি বুঝতে চাননি কিংবা জানতেন না। তাই প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে; শিল্পী ইমদাদুল হকের পরাভব ঘটেছে শিক্ষাব্রতী সমাজ-সংস্কারক খান বাহাদুর কাজী ইমদাদুল হকের হাতে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ মহৎ উপন্যাস। হতে পারেনি। তবু একটি বিশেষ সময়ের মুসলিম-জীবনবিশ্বাস ও জীবনযন্ত্রণার শিল্পরূপ হিসেবে আবদুল্লাহ-র মূল্য অনস্বীকার্য এবং পুনরায় বলছি–একগুচ্ছ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, আবদুল্লাহ্-ই নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তের প্রথম শিল্পসন্তান। শিল্পসিদ্ধিতে কালজয়ী মহিমা দাবি না করলেও, সমাজবিকাশের ইতিহাস হিসেবে আবদুল্লাহ্ উপন্যাসের মূল্য কোন সূত্রেই অকিঞ্চিৎকর নয়।

ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ
বাংলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 ০১-০৫. বি. এ. পরীক্ষা

আবদুল্লাহ – উপন্যাস – কাজী ইমদাদুল হক

বি. এ. পরীক্ষার আর কয়েক মাস মাত্র বাকি আছে, এমন সময় হঠাৎ পিতার মৃত্যু হওয়ায় আবদুল্লাহর পড়াশুনা বন্ধ হইয়া গেল।

পিতা ওলিউল্লাহর সাংসারিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। পৈতৃক সম্পত্তি যাহা ছিল, তাহা অতি সামান্য; শুধু তাহার উপর নির্ভর করিয়া থাকিতে হইলে সংসার চলিত না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি পৈতৃক খোন্দকারী ব্যবসায়েরও উত্তরাধিকার পাইয়াছিলেন বলিয়া নিতান্ত অন্ন-বস্ত্রের জন্য তাহাকে বড় একটা ভাবিতে হয় নাই।

ওলিউল্লাহ্ পীরগঞ্জের পীর-বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। পূর্বে পরিগঞ্জের চতুষ্পার্শ্বে বহু গ্রামে ইহাদের মুরীদান ছিল বলিয়া পূর্বপুরুষগণ নবাবি হালে জীবন কাটাইয়া গিয়াছেন। কিন্তু কালক্রমে মুরীদানের সংখ্যা কমিয়া কমিয়া এক্ষণে সামান্য কয়েক ঘর মাত্র অবশিষ্ট থাকায় ইহাদের নিদারুণ অবস্থা বিপর্যয় ঘটিয়াছে। সে প্রতিপত্তিও আর নাই, বার্ষিক সালামীরও সে প্রতুলতা নাই; কাজেই ওলিউল্লাহকে নিতান্ত দৈন্যদশায় দিন কাটাইতে হইয়াছে। তথাপি যে দুই-চারি ঘর মুরীদান তিনি পাইয়াছিলেন, তাহাদের নিকট প্রাপ্য বার্ষিক সালামীর উপর নির্ভর করিয়াই তিনি একমাত্র পুত্রকে কলিকাতায় রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইতেছিলেন। সুতরাং তাহার অকালমৃত্যুতে আবদুল্লাহর আর খরচ চালাইবার কোনো উপায়ই রহিল না; বরং এক্ষণে কী উপায়ে সংসার চালাইবে, সেই ভাবনায় সে আকুল হইয়া উঠিল।

আবদুল্লাহর বিবাহ অনেক দিন পূর্বে হইয়া গিয়াছিল। তাহার শ্বশুরালয় একবালপুরে; শ্বশুর সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস তাহার পিতার আপন খালাতো এবং মাতার আপন ফুফাতো ভাই ছিলেন। আবার সেই ঘরেই তাহার এক শ্যালক আবদুল কাদেরের সহিত, আবদুল্লাহর একমাত্র ভগ্নী হালিমারও বিবাহ হইয়াছিল। এই বদল-বিবাহ আবদুল্লাহর পিতামহীর জীবদ্দশায় তাঁহারই আগ্রহে সম্পন্ন হয়।

সৈয়দ আবদুল কুদ্‌সের মাতা আবদুল্লাহ্ পিতামহীর সহোদরা ছিলেন। এই দুই ভগ্নীর মধ্যে অত্যন্ত সম্প্রীতি ছিল; এবং তাহারা পরস্পরের নাতি-নাতিনীর বিবাহ দিবার জন্য বড়ই আগ্রহান্বিত ছিলেন। কিন্তু তাহাদের এ সম্প্রীতি সন্তানদিগের মধ্যে প্রসারিত হয় নাই; কেননা সৈয়দরা সম্পন্ন গৃহস্থ, এবং খোন্দকারেরা এক সময়ে যথেষ্ট ঐশ্বর্য ও সম্ভ্রমের অধিকারী থাকিলেও, আজ নিতান্ত দরিদ্র, ধরিতে গেলে একরূপ ভিক্ষোপজীবী। তাই আবদুল কুদ্দুস প্রথমে ওলিউল্লাহর সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনে নারাজ ছিলেন; কিন্তু অবশেষে মাতার সনির্বন্ধ অনুরোধ এড়াইতে না পারিয়া তাহাকে এই বদল-বিবাহে সম্মত হইতে হইয়াছিল।

বিবাহের পর হইতে হালিমা বৎসরের অধিকাংশ কালই শ্বশুরালয়ে থাকিত; কিন্তু আবদুল্লাহর শ্বশুর কন্যাকে অধিক দিন পীরগঞ্জে রাখিতেন না। তাই বলিয়া আবদুল্লাহর পিতামাতার মনে যে বিশেষ ক্ষোভ ছিল, এমত নহে। তাহারা বড় ঘরে একমাত্র পুত্রের বিবাহ দিয়া এবং না-খাইয়া না-পরিয়া তাহাকে লেখাপড়া শিখিতে দিয়া, এই ভরসায় মনে মনে সুখী হইতেন যে, খোদা যদি দিন দেন, তবে পুত্র কৃতবিদ্য হইয়া যখন প্রচুর অর্থ উপার্জন করিবে, তখন বউ আনিয়া সাধ-আহ্লাদে মনের বাসনা পূর্ণ করিবেন। এখন সে। বড়লোকের মেয়েকে আনিয়া কেবল খাওয়া-পরার কষ্ট দেওয়া বৈ তো নয়!

কিন্তু আবদুল্লাহর পিতার সে সাধ আর পূর্ণ হইল না; এমনকি মৃত্যুকালেও তিনি পুত্রবধূর মুখ দেখিতে পাইলেন না। আবদুল্লাহ্ বাটী আসিয়াই পিতার কঠিন রোগের সংবাদ শ্বশুরালয়ে পাঠাইয়াছিল এবং হালিমাকে ও তাহার স্ত্রীকে সত্বর পাঠাইয়া দিতে অনুরোধ করিয়াছিল। কিন্তু তাহারা সে অনুরোধ রক্ষা করেন নাই।

আবদুল্লাহর সংসারে এখন এক মাতা এবং তাহার পিতামহের বাঁদী-পুত্রের বিধবা স্ত্রী করিমন ভিন্ন অন্য কোনো পরিজন নাই। করিমন বাঁদী হইলেও আপনার জনের মতোই এই সংসারে জীবন কাটাইয়া বুড়া হইয়াছে। সে গৃহকর্মে আবদুল্লাহর মাতার সাহায্য করে, এবং আবশ্যকমতো বাজারবেসাতিও করিয়া আনে।

এই ক্ষুদ্র সংসারটির খরচপত্র ওলিউল্লাহ্ যে ব্যবসায়ের আয় হইতে কষ্টেসৃষ্টে নির্বাহ করিতেন, আবদুল্লাহর সে ব্যবসায় অবলম্বনে একেবারেই প্রবৃত্তি ছিল না। সে ভাবিতেছিল, চাকরি করিতে হইবে। যদিও সে বি. এ.-টা পাস করিতে পারিল না, তথাপি উপস্থিত ক্ষেত্রে সামান্য যে কোনো চাকরি তাহার পক্ষে প্রাপ্য হইতে পারে, তাহারই দ্বারা সে সংসারের অসচ্ছলতা দূর করিতে সমর্থ হইবে।

এইরূপ স্থির করিয়া আবদুল্লাহ তাহার মাতাকে গিয়া কহিল যে, সে আর পড়াশুনা করিবে না, কলিকাতায় গিয়া যাহা হোক একটা চাকরির চেষ্টা করিবে।

হঠাৎ পুত্রের এইরূপ সঙ্কল্পের কথা শুনিয়া মাতার মন বড়ই দমিয়া গেল। বি. এ. পাস করিয়া বড় চাকরি করিবে কিংবা জজের উকিল হইবে–ইহাই আবদুল্লাহ্ চিরদিনের আশা; কী গভীর দুঃখে যে সে আজ সেই চিরদিনের আশা ত্যাগ করিয়া চাকরির সন্ধানে বাহির হইবার প্রস্তাব করিতেছে, মাতা তাহা বুঝিতে পারিলেন। তাই নিতান্ত ব্যাকুল-কাতর দৃষ্টিতে পুত্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন, কোনো কথা কহিতে পারিলেন না।

আবদুল্লাহ্ তাহার মাতার কাতর দৃষ্টি সহিতে পারিত না। এক্ষণে কী বলিয়া তাহাকে সান্ত্বনা দিবে ঠিক করিতে না পারিয়া কহিতে লাগিল, তা আর কী করব আম্মা, এখন সংসার-খরচই চলবে কেমন করে তাই ভেবে দিশে পাচ্ছি নে। যদি সুবিধেমতো একটা চাকরি পাই, তা হলে সংসারটাও চলে যাবে, ঘরে বসে পড়ে পাস করাও যাবে…

মাতার বুক ফাটিয়া একটা গভীর নিশ্বাস পড়িল। তিনি ধীরে ধীরে কহিলেন, যা ভালো বোঝ, কর বাবা। সবই খোদার মরজি।

এই বলিয়া তিনি চুপ করিলেন। আবদুল্লাহ মনে মনে কলিকাতায় যাইবার দিন স্থির করিয়া কথা কী করিয়া পড়িবে, তাহাই ভাবিতেছে, এমন সময় মাতা আবার কথা কহিলেন,

একটা কাজ কল্লে হয় না, বাবা?

আবদুল্লাহ্ সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করিল, কী কাজ আম্মা?

একবার মুরীদানে গেলে হয় না? তারা কি কিছু সাহায্য করবে না তোর পড়াশুনার জন্যে?

মাতা জানিতেন, আবদুল্লাহ্ খোন্দকারী ব্যবসায়ের ওপর অত্যন্ত নারাজ; তবু যদি এই দুঃসময়ে তাহার মন একটু নরম হয়, এই মনে করিয়া তিনি একটু ভয়ে ভয়েই মুরীদানে যাইবার কথা তুলিলেন, কিন্তু তিনি যাহা ভয় করিয়াছিলেন, তাহাই হইল; আবদুল্লাহ্ একটু চঞ্চল হইয়া বলিয়া উঠিল, না আম্মা সে আমাকে দিয়ে হবে না!

মাতা নীরব হইলেন। আবদুল্লাহ্ দেখিল, সে তাহার মাতার মনে বেশ একটু আঘাত দিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু সে যখন নিজের বিশ্বাস ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কোনো কাজ করিতে প্রস্তুত নহে, তখন তাহার মতের সমর্থন করিয়া মাতাকে একটু বুঝাইবার জন্য কহিতে লাগিল, আব্বাও ও-কাজটা বড় পছন্দ করতেন না; তবে আর উপায় ছিল না বলেই তিনি নিতান্ত অনিচ্ছায় মুরীদানে যেতেন। সেই জন্যই তো আমাকে তিনি ইংরেজি পড়তে দিয়েছিলেন, যাতে ও ভিক্ষের ব্যবসায়টা আর আমাকে না করতে হয়।

পুত্র যখন তর্ক উঠাইল, তখন মাতাও আর ছাড়িতে চাহিলেন না। তিনি তাহার যুক্তি খাইবার জন্য কহিলেন, তাই বুঝি? তোকে না তিনি মাদ্রাসায় দিয়েছিলেন! তারপর তুই-ই তো নিজে ইচ্ছে করে মাদ্রাসা ছেড়ে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হলি।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা হয়েছিলাম বটে, কিন্তু তাতে কোনো দিনই আবার অমত ছিল না। তিনি বরাবর বলতেন, মাদ্রাসা পাস করে বেরুলে আমাকে ইংরেজি পড়তে দেবেন। ইংরেজি না পড়লে আজকাল–

মাতা বাধা দিয়া কহিলেন, তার ইচ্ছে ছিল, তুই মৌলবী হবি, তারপরে একটু ইংরেজি শিখবি; তা না, ফস্ করে মাদ্রাসা ছেড়ে ইংরেজি পড়া শুরু করে দিলি। এ-দিকও হল না, ও-দিকও হল না। আজ যদি তুই মৌলবী হতিস তবে আর ভাবনা ছিল কী! এখন কি আর মুরীদানরা তোকে মানবে?

আবদুল্লাহ্ অবজ্ঞাভরে কহিল, তা নাই-বা মানল; আমি তো আর তাদের দুয়ারে ভিখ মাগতে যাচ্ছি নে!

মাতা অনুযোগ করিয়া কহিলেন, ছি বাবা, অমন কথা বলতে নেই। মুরুব্বিরা সকলেই তো ঐ কাজ করে গেছেন। যারা অবুঝ, তাদের হেদায়েত করার মতো সওয়াবের কাজ কি আর আছে বাবা!

হ্যাঁ, হেদায়েত করা সওয়াবের কাজ বটে, কিন্তু তাতে পয়সা নেওয়াটা কোনোমতেই সওয়াব হতে পারে না। বরং তার উল্টো।

তারা খুশি হয়ে সালামী দেয়, ওতে দোষ নেই বাবা! সব দেশে, সকল জাতেই এ রকম দস্তুর আছে;–কেন, হিন্দুদের মধ্যে কি নেই!

তা থাকলই-বা; তাদের আছে বলেই যে আমাদের সেটা থাকতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই, আম্মা! আর এই পীর-মুরীদি ব্যবসায়টা হিন্দুদের পুরুতগিরির দেখাদেখিই শেখা, নইলে হযরত তো নিজেই মানা করে গেছেন, কেউ যেন ধর্ম সম্বন্ধে হেদায়েত করে পয়সা না নেয়।

আবদুল্লাহর এই বক্তৃতায় মাতা একটু অসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়া কহিলেন, ওই তো ইংরেজি পড়ার দোষ, কেবল বাজে তর্ক করতে শেখে; শরীয়ত মানতে চায় না। তুই যে পীরগোষ্ঠীর নাম-কাম বজায় রাখতে পারবি নে, তা আমি সেই কালেই বুঝেছিলাম। সে যাকগে, যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন কী করবি, তাই ঠিক কর।

আবদুল্লাহ একটু চিন্তা করিয়া কহিল, পরীক্ষেটা যদি পাস করতে পারতাম, তবে একটা ভালো চাকরি জুটত। এখন চেষ্টা কল্লে বড়জোড় ত্রিশ কি চল্লিশ টাকা মাইনে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তার জন্যেও মুরুব্বি চাই যে, আম্মা! কাকে যে ধরব তাই ভাবছি।

যদিও ওলিউল্লাহ পুত্রকে প্রথমে মাদ্রাসায় দিয়াছিলেন, তথাপি তাহাকে ইংরেজি পড়াইবার ইচ্ছা তাহার খুবই ছিল। ইংরেজি না শিখিলে দুরবস্থা ঘুচিবে না, তাহা তিনি বেশ বুঝিতে পারিয়াছিলেন। এদিকে ইংরেজি শিখিয়া লোকের আকিদা খারাপ হইয়া যাইতেছে, তাহাও তিনি স্বচক্ষে দেখিয়াছিলেন; কাজেই প্রথমে মাদ্রাসায় পড়াইয়া পুত্রের আকিদা পাকা করিয়া লইয়া তাহাকে ইংরেজি পড়িতে দিবেন মনে মনে তাহার এইরূপ সঙ্কল্প ছিল। কিন্তু জমাতে চাহরম পড়িয়াই যখন আবদুল্লাহ্ মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগে গিয়া ভর্তি হইল, তখন তিনি আর বাধা দেন নাই। তাহার পর ক্রমে এন্ট্রান্স ও এফ. এ. পাস করিয়া যখন সে বি. এ. পড়িতে লাগিল, তখন পুত্র হয় খুব দরের চাকরি পাইবে, না হয় উকিল হইয়া জেব ভরিয়া টাকা উপায় করিয়া আনিবে, এই আশা আবদুল্লাহর পিতামাতার অন্তরে জাগিয়া উঠিয়াছিল। তাহারা এই বলিয়া মনকে প্রবোধ দিলেন যে, ইংরেজি পড়িয়া সচরাচর ছেলেরা যেমন বিগড়াইয়া যায়, আবদুল্লাহ তেমন বিগড়ায় নাই। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, রোজা রাখে; পাকা মুসল্লির মতো সকল বিষয়েই বেশ পরহেজ করিয়া চলে। এক্ষেত্রে ইংরেজি পড়িয়া পুত্র যদি বড়লোক হইতে পারে, তাহাতে বাধা দিবেন কেন? খোদা উহাকে যেদিকে চালাইয়াছেন, ভালোর জন্যেই চালাইয়াছেন।

এক্ষণে স্বামীর অকালমৃত্যুতে পুত্রের বি. এ. পাসের এবং বড়লোক হওয়ার আশা ভঙ্গ হইল; তাই আবদুল্লাহর জননীর মন বড়ই দমিয়া গিয়াছিল। যে হাকিম হইতে অথবা অন্তত জেলার একজন বড় উকিল হইতে পারিত, তাহার পক্ষে এখন সামান্য চাকরিও মিলা দুষ্কর হইয়া পড়িয়াছে, ইহাই মনে করিয়া তাহার অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। অঞ্চলে চক্ষু মুছিতে মুছিতে তিনি কহিলেন, বাবা একটা কাজ কল্লে হয় না?

মাতার অনিরুদ্ধ কণ্ঠ আবদুল্লাহকে বিচলিত করিয়া তুলিল। সে যেন মাতার আদেশ তৎক্ষণাৎ পালন করিবার জন্যে প্রস্তুত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কী কাজ আম্মা।

মাতা কহিলেন, আমাদের এখন যেমন অবস্থা, তাতে তো আর অভিমান করে থাকলে চলবে না, বাবা! তোর শ্বশুরের কাছে গিয়ে কথাটা একবার পেড়ে দেখ, –তিনি বড়লোক, ইচ্ছে কল্লে অনায়াসে এই কটা মাস তোর পড়ার খরচটা চালিয়ে দিতে পারেন।

এই প্রস্তাবে আবদুল্লাহর মন দমিয়া গেল। সে কী উত্তর দিবে ঠিক করিতে না পারিয়া হঠাৎ বলিয়া ফেলিল, পরের কাছে হাত পাততে ইচ্ছে করে না, আম্মা।

মাতা আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, পর কী রে! তার সঙ্গে যে তোর কেবল শ্বশুর-জামাই সম্পর্ক, এমত তো আর নয়।

আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। মাতা আবার কহিলেন, কী বলিস?

আবদুল্লাহ্ কহিল, বলব আর কী, আম্মা; তিনি যে সাহায্য করবেন, এমন তো আমার মনে হয় না।

তিনি সাহায্য করবেন না, আগে থেকেই তুই ঠিক করে রাখলি কী করে? একবার বলেই দ্যাখ না?

আবদুল্লাহ্ কহিল, তিনি নিজের ছেলের সঙ্গে সে-বার কেমন ব্যবহার করেছিলেন, তা কি আপনি জানেন না আম্মা? আবদুল কাদের আর আমি যখন মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে ভর্তি হই, তখন আব্বাকে আমি জানিয়েছিলাম, কিন্তু সে তার বাপের কাছে গোপন রেখেছিল। সে খুবই জানত যে, তার বাবা একবার জানতে পারলে আর কিছুতেই পড়ার খরচ দেবেন না; কেননা তিনি ইংরেজি শেখার উপর ভারি নারাজ। ফলে ঘটলও তাই; কয়েক বৎসর কথাটা গোপন ছিল, তারপর যখন আমরা ফার্স্ট ক্লাসে উঠলাম, তখন কেমন করে যেন আমার শ্বশুর সে কথা জানতে পারলেন, আর অমনি বেচারার পড়া বন্ধ করে দিলেন! আর আমি ইংরেজি পড়ি বলে আমার উপরও তিনি সেই অবধি নারাজ হয়ে আছেন। হয়তো-বা মনে করেন যে, আমিই কুপরামর্শ দিয়ে তার ছেলেকে খারাপ করে ফেলেছি।

মাতা কহিলেন, তা তিনি দীনদার পহেজগার মানুষ, তার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে আরবি পড়িয়ে মৌলবী করেন। ছেলে যখন বাপের অবাধ্য হল, আবার কথাটা এদ্দিন গোপন রাখল, তখন তো তার রাগ হবারই কথা! তুই তো আর বাপের অমতে ইংরেজি পড়তে যাস নি, তোর উপর তিনি কেন নারাজ হতে যাবেন?

আবদুল্লাহ্ কহিল, কিন্তু আমার মনে হয় আম্মা, তিনি আমাকে বড় ভালো চোখে দেখেন না। দেখুন, আব্বার ব্যারামের সময় নিজে তো কোনো খবর নিলেনই না, আবার হালিমাকে কি আপনাদের বউকে, –কাউকে পাঠালেন না…

মাতা বাধা দিয়া কহিলেন, সে তো তার দোষ নয়, বাবা! তিনি যে তখন বাড়ি ছিলেন না। তারপর যদিই-বা বাড়ি এলেন, নিজেই শয্যাগত হয়ে পড়লেন, নইলে কি আর তিনি আসতেন না!

বড় আদরের একমাত্র মেয়ে-পুত্রবধূকে স্বামী মৃত্যুকালে দেখিতে চাহিয়াও দেখিতে পান নাই, এই কথা মনে করিয়া আবদুল্লাহ্-জননীর শোক আবার উথলিয়া উঠিল। তিনি ভগ্নকণ্ঠে কহিতে লাগিলেন, যাক সেসব কথা–বরাতে যা ছিল হয়ে গেছে, তা নিয়ে এখন মন ভার করে থেকে আর কী হবে! দোষ কারুরই নয় বাবা, সবই খোদার মরজি। তুই অনর্থক অভিমান করে থাকিস নে। আর তোর শ্বশুর যে আমাদের নিতান্ত আপনার জন। তার সঙ্গে আর অভিমান কী বাবা!

আবদুল্লাহর শ্বশুর যে বাস্তবিকই একজন বড়লোক ছিলেন, তাহা নহে। কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থ হইয়াও তাহার মনে বড়লোকের আত্মম্ভরিতাটুকু পুরামাত্রায় বিরাজ করিত। তার অপেক্ষা কিঞ্চিৎ হীনাবস্থার লোককেই তিনি কৃপার চক্ষে দেখিতেন। এরূপ চরিত্রের লোক পিতার খালাতো এবং মাতার ফুফাতো ভাই হলেও তাহাকে নিতান্ত আপনার জন বলিয়া মনে করিয়া লইতে আবদুল্লাহর প্রবৃত্তি ছিল না। কিন্তু সে তাহার স্নেহপরায়ণা মাতার বড়ই অনুগত ছিল; তাহার নিজের ফুফাতো ভাইয়ের প্রতি সনির্বন্ধ বিরাগ দেখাইলে পাছে তাহার মনে কষ্ট হয়, এই ভাবিয়া সে অবশেষে কহিল, তা আপনি যখন বলছেন আম্মা, তখন একবার তার কাছে গিয়েই দেখি।

মাতা প্রীত হইয়া কহিলেন, হ্যাঁ বাবা তাই যা, আর দেরি করিস নে। আমি বলি কাল ভোরেই বিসমিল্লাহ্ বলে রওয়ানা হও।

.

০২.

পরদিন রাত্রি শেষ না হইতেই আবদুল্লাহর মাতা শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিলেন এবং তাড়াতাড়ি চারিটি ভাত রাঁধিয়া যখন আবদুল্লাহকে ডাকিতে গেলেন, তখনো আকাশ পরিষ্কার হয় নাই। মাতার আহ্বানে আবদুল্লাহ্ শয্যার উপর উঠিয়া চোখ কচলাইতে কচলাইতে কহিল, এত রাত থাকতে!

বাঃ রাত আর কোথায় রে? কাক-কোকিল সব ডেকে উঠল যে? নে ওঠ, নামাযটা পড়ে চাট্টি খেয়ে বেরিয়ে পড়।

এত ভোরে আবার খাব কী আম্মা?

চাট্টি ভাত বেঁধে রেখেছি বাবা–

আপনি বুঝি রাত্রে আর ঘুমোন নি, বসে বসে ভাত বেঁধেছেন?

মাতা একটু হাসিয়া কহিলেন, দেখ, হাবা ছেলে বলে কী শোন। চাট্টি ভাত রাঁধতে বুঝি সারা রাত জাগতে হয়? আমি তো এই একটু আগেই উঠলাম। এতটা পথ যাবি, চাট্টি খেয়ে না গেলে পথে ক্ষিধেয় কষ্ট পাবি যে, বাবা।

আবদুল্লাহ আলস্য ত্যাগ করিতে করিতে কহিল, তা খাওয়াটা একটু বেলা উঠলেও তো হতে পারত।

বেলা উঠে গেলে রোদে কষ্ট পাবি। নে, এখন ওঠ; আর আলিস্যি করিস নে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, রোদে কষ্ট পাব কেন, আম্মা, আমি তো আর একটানে অতটা পথ হাঁটব না, পথে জিরিয়ে যাব ঠিক করেছি।

কোথায় জিরুবি?

কেন, শাহপাড়ায় গোলদারদের বাড়ি? তারা লোক বড় ভালো, আমাকে খুব খাতির করে।

মাতা মৃদু হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তারা যে তোদের মুরীদান, তাদের বাড়ি যাবি? শেষকালে যদি…

আবদুল্লাহ্ বাধা দিয়া কহিল, ওঃ, আমি বুঝি সেখানে খোনকারী করতে যাব! এমনি যাব মেহমানের মতো। একবেলা একটু জিরিয়ে আবার বেলা পড়লে বেরিয়ে পড়ব!

যদি তারা সালামী টালামী দেয়?

দিলেই অমনি নিয়ে নিলুম আর কি!

তারা যে তা হলে বড্ড বেজার হবে, বাবা।

তা হলে আর কী করব, আম্মা। যতদূর পারি তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করতে হবে।

এমন সহজলভ্য উপজীবিকা যাহাদের চিরদিনের অভ্যাস, অতি সামান্য হলেও তাহাদের পক্ষে উহার আশা পরিত্যাগ করা কঠিন, তাই মাতা মনে মনে একটু ক্ষুণ্ণ হইলেন। এখনো যদি আবদুল্লাহ একবার মুরীদানে গিয়া ঘুরিয়া আসে, তাহা হইলে তাহার পড়ার ভাবনা থাকে। না। কিন্তু সে কিছুতেই রাজি হইবে না; অগত্যা তিনি ভাবিলেন, থাক, যে কাজে উহার মন যায় না সে কাজের জন্য পীড়াপীড়ি করা ভালো নহে। খোদা অবশ্যই একটা কিনারা করিয়া দেবেন। আবদুল্লাহর ইচ্ছা ছিল একটু বেলা হইলে ধীরেসুস্থে বাটী হতে বাহির হইবে; কিন্তু মাতার পীড়াপীড়িতে ফজরের নামায বাদেই তাহাকে দুটি খাইয়া রওয়ানা হইতে হইল।

একবালপুর তাহাদের বাটী হইতে আট ক্রোশ। পিতা বাঁচিয়া থাকিতে আবদুল্লাহকে কখনো এতটা পথ হাঁটিয়া যাইতে হয় নাই; গরুর গাড়ি অথবা কোনো কোনো সময়ে পালকি করিয়া সে শ্বশুরালয়ে যাতায়াত করিয়াছে। কিন্তু এক্ষণে টানাটানির সংসারে মিতব্যয়িতার নিতান্ত দরকার বুঝিয়া সে হাঁটিয়াই চলিয়াছে। মাতা অনেক পীড়াপীড়ি করিয়াছিলেন; দুই-এক টাকা গাড়ি ভাড়া দিলে কতই-বা টানাটানি বাড়িত! কিন্তু সে কিছুতেই গাড়ি লইতে রাজি হয় নাই।

গ্রামখানি পার হইয়াই আবদুল্লাহ্ এক বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে আসিয়া পড়িল। তখন শরৎকাল প্রায় হইয়া আসিয়াছে। মাঠগুলি ধান্যে পরিপূর্ণ; মৃদুমন্দ বায়ু হিল্লোলে তাহাদের শ্যামল হাস্য ক্ষণে ক্ষণে তরঙ্গায়িত হইয়া উঠিতেছে। এই অপূর্ব নয়নতৃপ্তিকর দৃশ্য দেখিতে এবং শারদীয় প্রভাতের সুখ-শীতল সমীরণের মধুর স্পর্শ অনুভব করিতে করিতে আবদুল্লাহ্ মাঠের পর মাঠ এবং গ্রামের পর গ্রাম পার হইয়া চলিতে লাগিল।

ক্রমে বেলা বাড়িয়া উঠিল, এবং ক্লান্ত পথিকের পক্ষে হৈমন্তিক রৌদ্রও অসহ্য বোধ হইতে লাগিল। সুতরাং তিন-চারি ক্রোশ পথ আঁটিবার পর শ্রান্তি দূর করিবার জন্য আবুদল্লাহ্ এক মাঠের প্রান্তে বৃক্ষতলে বসিয়া পড়িল।

কিয়ৎক্ষণ বিশ্রামের পর যখন তাহার মন বেশ প্রফুল্ল হইয়া উঠিল, তখন নিজের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নানা কথা মনে উঠিতে লাগিল। এতদিন সে যে উচ্চ আশা হৃদয়ে পোষণ করিয়া আসিতেছিল, তাহা সফল হইবার সম্ভাবনা না থাকিলেও, ক্লান্তদেহে আজ বটবৃক্ষতলে বসিয়া সে মনে মনে ভবিষ্যতের যে চিত্রটি আঁকিতেছিল, তাহা নিতান্ত উজ্জ্বলতাহীন নহে। সে ভাবিতেছিল চাকরি তাহাকে করিতেই হইবে, আর কোনো উপায় নাই। সরকারি চাকরি তো পাওয়া কঠিন, মুরব্বি না ধরিতে পারিলে সামান্য কেরানীগিরিও জুটিবে না। কিন্তু মুরব্বি কোথায় পাইবে? কাহাকে ধরিবে? সোজাসুজি গিয়া সাহেব সুবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া একবার চেষ্টা করিয়া দেখা যাইতে পারে। কিন্তু কী চাকরির জন্য চেষ্টা করিবে? পুলিশের? –নাঃ, ও চাকরিটা ভালো নয়। সবরেজিস্ট্রারি?–ওটা পাওয়া বড় কঠিন না হইতে পারে; কত এট্রেন্স ফেল সবরেজিস্ট্রার হইতেছে, কিন্তু অনেক দিন এপ্রেন্টিসি করিতে হয়; ততদিন চলিবে কিসে? একটা মাস্টারি পাইলে মন্দ হয় না; ত্রিশ কি চল্লিশ টাকা মাহিনা পাওয়া যাইতে পারে, চাই কি একটা টুইশন যোগাড় করিতে পারিলে আরো দশ-বিশ টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আরো বিশেষ সুবিধা এই যে, মাস্টারি করিতে করিতে বি. এ. পরীক্ষাটার জন্য প্রস্তুত হওয়া যাইবে। এটা মস্ত লাভ। আর কোনো চাকরিতে এই সুবিধাটা হইবে না। শ্বশুর তো সাহায্য করিবেনই না, তাহা জানা আছে; কেবল আম্মাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য। একবার তাহার কাছে যাওয়া। তা তিনি সাহায্য না-ই করিলেন, পরের সাহায্য গ্রহণ না করিতে হইলেই ভালো। আবদুল্লাহ মাস্টারি করিবে; বি. এ. পাস করিয়া তাহার চিরদিনের ঐকান্তিক বাসনা পূর্ণ করিয়া জীবন সফল করিবে। হাতে কিছু টাকা জমাইয়া আবার। কলিকাতায় দুই বৎসর আইন পড়িবে–এখানেও একটি টুইশন যোগাড় করিয়া লইবে। পাস করিয়া যখন সে ওকালতি আরম্ভ করিবে তখন আর ভাবনা কী?–চাই কি, তখন দেশের কাজে, সমাজের কাজে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া যাইবে। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার, স্ত্রী-শিক্ষার প্রবর্তন প্রভৃতি ব্যাপারে সে জীবন উৎসর্গ করিয়া ধন্য হইবে। এই সকল সংস্কার সুসম্পন্ন না হইলে, বিশেষত যতদিন স্ত্রী-শিক্ষা সমাজে প্রচলিত করা না যাইতেছে, ততদিন মুসলমানদের কুসংস্কারের আবর্জনা দূর হইবে না; এবং তাহা না হইলে সমাজের উন্নতি একেবারেই অসম্ভব। আবদুল্লাহ্ মনে মনে স্থির করিয়া ফেলিল যে, খোদা যদি দিন দেন, তবে স্ত্রী-শিক্ষার জন্য তাহার যথাসর্বস্ব পণ করিয়া ফেলিবে!

এইরূপ সুমহৎ সঙ্কল্প করতে করিতে হঠাৎ আবদুল্লাহর চৈতন্য হইল যে, বেলা অনেক বাড়িয়া গিয়াছে। শাহপাড়ায় পৌঁছিতে এখনো এক ক্রোশ পথ বাকি, কাজেই তাড়াতাড়ি উঠিয়া তাহাকে আবার পথ লইতে হইল।

.

০৩.

আবদুল্লাহ্ যখন শাহপাড়ার গোলদার-বাড়ি আসিয়া পৌঁছিল, তখন বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। সংবাদ পাইয়া গৃহস্বামী কাসেম গোলদার ব্যস্ত–সমস্ত হইয়া ছুটিয়া আসিল এবং তাহার দীর্ঘ শুভ্র শ্মশ্রুরাজি ভূলুণ্ঠিত করিয়া আবদুল্লাহর কদমবুসি করিতে উদ্যত হইল! এ ধরনের অভিনন্দনের জন্য আবদুল্লাহ্ একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। পথে হঠাৎ সাপ দেখিলে মানুষ যেমন এক লম্ফে হটিয়া দাঁড়ায়, সেও তেমনি হাটিয়া গিয়া বলিয়া উঠিল, আহা, করেন কী, করেন কী, গোলদার সাহেব!

কাসেম গোলদার বড়ই সরলপ্রাণ, ধর্মপরায়ণ, পীরভক্ত লোক। আবদুল্লাহর পিতা তাহার পীর ছিলেন; এক্ষণে তাহার মৃত্যুতে আবদুল্লাহ্ তাহার স্থলাভিষিক্ত বলিয়া মনে করিয়া লইয়া সে আবদুল্লাহর কদমবুসি কবিরার জন্য নত মস্তকে হাত বাড়াইয়াছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ্ পা টানিয়া লওয়ায় সে উহা স্পর্শ করিতে পাইল না; তাহার মনে হইল, বেহেশতের দুয়ারের চাবি তাহার হাতের কাছ দিয়া সরিয়া গেল! বড়ই মর্মপীড়া পাইয়া রুদ্ধকণ্ঠে কাসেম কহিতে লাগিল, আমাদের কি পায়ে ঠেললেন, হুজুর? আমরা আপনাদের কত পুরুষের মুরীদ! আপনার কেবলা সাহেব তার এই গোলামের উপর বড়ই মেহেরবান ছিলেন; আপনি আমাদের পায়ে না রাখিলে কী উপায় হবে হুজুর!

কাসেমের মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করিয়া আবদুল্লাহ বড়ই অপ্রস্তুত হইয়া গেল। চিরদিনের সংস্কার-বশে যে ব্যক্তি তাহাকে পূর্ব হইতেই পীরের পদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া রাখিয়াছে, এবং আজ সরল বিশ্বাসে প্রাণের ঐকান্তিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা অঞ্জলি ভরিয়া নিবেদন করিবার জন্য উন্মুখ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, আবদুল্লাহর এই অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখ্যান যে সে ব্যক্তির প্রাণে গুরুতর আঘাত দিবে ইহা আর বিচিত্র কী! কিন্তু উপায় নাই। এ আঘাত অনেককেই দিতে হইবে, এবং অনেকবার তাহাকে এইরূপ অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হইতে হইবে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, অমন কথা বলবেন না, গোলদার সাহেব। আমার বাপ-দাদা সকলেই পীর ছিলেন মানি, কিন্তু আমি তো তাদের মতো পীর হবার যোগ্য হই নি। ও কাজটা আমার দ্বারা কোনোমতেই হবে না। তা ছাড়া আপনি বৃদ্ধ, সুতরাং আমার মুরব্বি; এক্ষেত্রে আমারই উচিত আপনার কদমবুসি করা।

কাসেম শিহরিয়া উঠিয়া দাঁতে জিভ কাটিয়া কহিল, আরে বাপরে বাপ! এমন কথা বলে আমাকে গোনাহগার করবেন না, হুজুর! যে বংশে খোদা আপনাকে পয়দা করেছেন, তার এক বিন্দু রক্ত যার গায়ে আছে, তিনিই আমাদের পীর, আমাদের মাথার মণি! আপনাদের পায়ের একটুখানি ধুলো পেলেই আমাদের আখেরাতের পথ খোলাসা হয়ে যায়, হুজুর!

আবদুল্লাহ্ একটুখানি হাসিয়া কহিল, খোদা না করুন যেন আখেরাতের পথ খোলাসা করবার জন্যে কাউকে আমার মতো লোকের পায়ের ধুলো নিতে হয়! তা যাকগে, এখন আমি যে এতটা পথ হেঁটে হয়রান হয়ে এলাম, আমাকে একটু বিশ্রাম করতে দিতে হবে, সে কথা কি ভুলে গেলেন গোলদার সাহেব?

কাসেমের চৈতন্য হইল। তাই তো! এতক্ষণ সে কথাটা যে তাহার খেয়ালেই আসে। নাই। তখনই, ওরে বিছানাটা পেতে দে, পানি আন, তেল আন, গোসলের যোগাড় কর ইত্যাকার শোরগোল পড়িয়া গেল।

আবদুল্লাহ যখন মুরশিদের প্রাপ্য ভক্তি-নিদর্শনগুলি গ্রহণ করিয়া কাসেমের মনের বাসনা পূর্ণ করিতে অস্বীকার করিল, তখন সে অন্তত মেহমানদারি বাবদে সে ত্রুটি ষোল আনা সংশোধন করিয়া লইতে চেষ্টা করিল। সময়াভাবে এ-বেলা কেবল মোরগের গোশত এবং মুগের ডাল প্রভৃতির দ্বারা কোনো প্রকারে মেহমানের মান-রক্ষা হইল বটে, কিন্তু রাতের জন্যে বড় এক জোড়া খাসির এবং সেই উপলক্ষে গ্রামের প্রধান ব্যক্তিগণকেও দাওয়াদ করিবার বন্দোবস্ত হইয়া গেল।

এদিকে বেলা প্রায় তিন প্রহরের সময় আহারাদি সম্পন্ন করিয়া যখন আবদুল্লাহ্ কাসেম গোলদারকে ডাকিয়া কহিল যে, আর বিলম্ব করিলে চলিবে না, তাহাকে এখনই রওয়ানা হইতে হইবে, নহিলে সন্ধ্যার পূর্বে একবালপুরে পৌঁছিতে পারিবে না, তখন কাসেমের মাথায় যেন আকাশ ভাঙিয়া পড়িল। সে হাত দুটি জোড় করিয়া এমনই কাতর মিনতিপূর্ণ দৃষ্টি তাঁহার মুখের উপর স্থাপন করিল যে, বেচারা বুড়া মানুষের মনে দ্বিতীয়বার দুঃখ দিতে আবদুল্লাহর মন সরিল না। সুতরাং সে সেখানেই সেদিনকার মতো রাত্রিবাস করিতে রাজি হইয়া গেল। আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া কাসেম তৎক্ষণাৎ কোমর বাঁধিয়া যথারীতি আয়োজনে লাগিয়া পড়িল।

সারাটা বৈকাল এবং রাত্রি এক প্রহর ধরিয়া লোকজনের আনাগোনা, চিৎকার, বালক বালিকাগণের গণ্ডগোল এবং ডেকচি, কাফগীরের ঘনসংঘাতে গোলদার-বাড়ি মুখরিত হইতে লাগিল। এই বিরাট ব্যাপার দেখিয়া আবদুল্লাহ ভাবিতে লাগিল, মুসলমান সমাজে পীর মুরশিদের সম্ভ্রম ও মর্যাদা কত উচ্চ! গোলদারেরা না হয় সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ; ইহাদের পক্ষে মুরশিদের অভ্যর্থনার জন্য অম্লান বদনে অর্থ ব্যয় করা অসম্ভব না হইতে পারে। কিন্তু নিতান্ত দরিদ্র যে, সে-ও তাহার বহু যত্নপালিত খাসি-মুরগির মায়া গৃহাগত মুরশিদের সেবায় উৎসর্গ করিয়া এবং মহাজনের নিকট হইতে উচ্চ হারের সুদে গৃহীত ঋণের শেষ টাকাটি সালামী স্বরূপ তাহার চরণপ্রান্তে ফেলিয়া দিয়া বেহেশতের পাথেয় সঞ্চয় হইল ভাবিয়া আপনাকে ধন্য মনে করে।

রাত্রে আহারাদির পর কাসেম কয়েকজন মাতব্বর লোক লইয়া এক মজলিস বসাইল এবং তাহাদের এই একমাত্র পীরবংশধর যে পৈতৃক ব্যবসায় পরিত্যাগ করিয়া হতভাগ্য মুরীদগণের পারত্রিক কল্যাণ সম্বন্ধে একেবারে উদাসীন হইয়া পড়িয়াছেন ইহাই লইয়া নানা ছন্দোবন্ধে দুঃখ প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। এই পীরগোষ্ঠী যে কত বড় কেরামতকুশল, সমাগত লোকদিগকে তাহা বুঝাইবার জন্য সে আবদল্লাহর পূর্বপুরুষগণের বিষয়ে অনেক গল্প বলিতে লাগিল।

প্রথম যিনি আরব হইতে পীরগঞ্জে আসেন–সে কত কালের কথা, তাহার ঠিকানা নাই;–তিনি প্রকাও এক মাছে চড়িয়া সাগর পার হইয়াছিলেন; তাই তাহাকে সকলে মাহী সওয়ার বলিত। তিনি কত বড় পীর ছিলেন, তাঁহার দস্ত মোবারকের স্পর্শমাত্রেই কেমন করিয়া মরণাপন্ন রোগীও বাঁচিয়া উঠিত, ঘরে বসিয়াই তিনি কেমন করিয়া বহু ক্রোশ দূরবর্তী নদীবক্ষে মজ্জমান নৌকা টানিয়া তুলিয়া ফেলিতেন এবং সেই ব্যাপারে কিরূপে তাঁহার আস্তিন ভিজিয়া যাইত, আকাশে হাত তুলিয়া আও আও বলিয়া ডাকিতেই কোথা হইতে হাজার হাজার কবুতর আসিয়া জুটিত এবং তিনি হাত নাড়িয়া কী প্রকারে আস্তিনের ভিতর হইতে রাশি রাশি ধান, ছোলা, মটর প্রভৃতি বাহির করিয়া তাহাদিগকে খাওয়াইতেন, সে সকল ঘটনা সালঙ্কারে বর্ণনা করিয়া কাসেম সকলকে স্তম্ভিত ও চমৎকৃত করিয়া দিল। আবার শুধু তিনিই যে একলা পীর ছিলেন, এমত নহে, তাহার বংশেও অনেক বড় বড় পীর জন্মিয়া গিয়াছেন; এমনকি, কেহ কেহ শিশুকালেই এমন আশ্চর্য কেরামত দেখাইয়াছেন যে তাহা ভাবিলেও অবাক হইতে হয়। মাহী সওয়ার পীর সাহেবের পৌত্র কিংবা প্রপৌত্রের একটি বড় আদরের কাঁঠাল গাছ ছিল। একবার তাহাতে একটিমাত্র কাঁঠাল ফলিয়াছিল, সেটা তিনি নিজে খাইবেন বলিয়া ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার অনুপস্থিতকালে তাহার এক বালক-পুত্র ঐ কাঁঠালটি পাড়িয়া খাইয়া ফেলেন। বাটী আসিয়া পীর সাহেব যখন দেখিলেন যে গাছে কাঁঠাল নাই, তখন তিনি বড়ই রাগান্বিত হইয়া সকলকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, কে উহা খাইয়াছে। সকলেই জানিত, কিন্তু ভয়ে কেহ বলিল না। অবশেষে তিনি পুত্রের বিমাতার নিকট জানিতে পারিলেন কাহার এই কাজ। তখন পুত্রের তলব হইল; কিন্তু তিনি অস্বীকার করিলেন এবং কহিলেন, কেন, বাপজান, কেহ তো সে কাঁঠাল খায় নাই, গাছের কাঁঠাল গাছেই আছে!

তাহার পর পীর সাহেব গিয়া দেখেন, সত্য সত্যই গাছের কাঁঠাল গাছেই ঝুলিতেছে! দেখিয়া তো তিনি অবাক হইয়া গেলেন, কিন্তু ব্যাপার কী, তাহা বুঝিতে বাকি রহিল না। তখন তাহার বড় গোস্বা হইল; তিনি বলিলেন, কেয়া এক ঘরমে দো পীর। যাও বাচ্চা, সো রহো। সেই যে বাচ্চা গিয়া শুইয়া রহিলেন, আর উঠিলেন না!

আবদুল্লাহ্ নিতান্ত নিরুপায় হইয়া বসিয়া বসিয়া কাসেমের এই সরল বিশ্বাসের উচ্ছ্বাস-রঞ্জিত উপাখ্যানগুলি জীর্ণ করিতেছিল। ক্রমে রাত্রি অধিক হইয়া চলিল দেখিয়া

অবশেষে মজলিস ভঙ্গ করিয়া সকলে উঠিয়া গেল। অতঃপর আবদুল্লাহ্ শুইয়া শুইয়া ভাবিতে লাগিল, পুত্রের পীরত্বে পিতার হৃদয়ে এরূপ সাংঘাতিক হিংসার উদ্রেক আরোপ করিয়া ইহারা পীর মাহাত্ম্যের কী অদ্ভুত আদর্শই মনে মনে গড়িয়া তুলিয়াছে!

.

০৪.

বহু কষ্টে বৃদ্ধ কাসেম গোলদারের সরল ভক্তিজাল ছিন্ন করিয়া পরদিন বৈকালে আবদুল্লাহ্ একবালপুরে পৌঁছিল।

আবদুল্লাহর বড় সম্বন্ধী আবদুল মালেক এইমাত্র নিদ্রা হইতে উঠিয়া বৈঠকখানার বারান্দার এক প্রান্তে জলচৌকির উপর বসিয়া ওযু করিতেছিলেন। লোকটি হাফেজ এবং উকট পরহেজগার; ওযুর সময় কথা বলিলে গোনাহ্ হইবে বলিয়া, কেবল একটুখানি মুচকি হাসিয়া তিনি আপাতত ভগ্নীপতির অভ্যর্থনার কাজ সারিয়া লইলেন এবং পুনরায় সযত্নে ওযু ক্রিয়ায় মনোনিবেশ করিলেন। ওযু শেষে উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তারপর দুলা মিঞা ধরগে’ তোমার কী মনে করে? খবর ভালো তো?

আবদুল্লাহ্ তাহার কদমবুসি করিয়া কহিল, জি হাঁ, ভালোই। আপনি কেমন আছেন?

আমি ভালো। একটু বোস ভাই, আমি আসরের নামায পড়ে নিই। এই বলিয়া আবদুল মালেক নামায পড়িতে গেল।

এদিকে চাকর মহলে দুলা মিঞা এয়েছেন, দুলা মিঞা এয়েছেন বলিয়া একটা কলরব উঠিল এবং দেখিতে দেখিতে উহা অন্দরমহল পর্যন্ত সংক্রামিত হইয়া পড়িল। কয়েকটা বাঁদী দরজার প্রান্তদেশ হইতে মুখ বাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কোন্ দুলা মিঞা রে? চাকরেরা জবাব দিল, পীরগঞ্জের দুলা মিঞা।

বাঁদীরা সেই সংবাদ লইয়া অন্দরের দিকে দৌড়িয়া গেল।

দুলা মিঞার আগমন-সংবাদে, অন্দর হইতে একদল ঘোট ঘোট শ্যালক ছুটিয়া আসিল, –কেহ কেহ আবদুল্লাহর নিকটে আসিয়া কদমবুসি করিল, এবং নিতান্ত ছোটগুলি একটু তফাতে দাঁড়াইয়া মুখে আঙুল দিয়া চাহিয়া রহিল।

আবদুল্লাহ্ ইহাদিগের সহিত একটু মিষ্টালাপ করিতেছে, এমন সময় আবদুল মালেক নামায পড়িয়া উঠিয়া একজন চাকরকে ডাকিয়া কহিলেন, ওরে, দুলা মিঞার ওযুর পানি দে।

আবদুল্লাহ্ ওযু করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিল, আবদুল কাদের কোথায়?

আবদুল মালেক কহিল, ওঃ, সে আজ ধরগে’ তোমার মাস তিনেক হল বাড়ি ছাড়া।

কেন কোথায় গেছে?

খোদা জানে, কোথায় গেছে! আব্বার সঙ্গে ধরগে’ তোমার একরকম ঝগড়া করেই চলে গেছে।

আবদুল্লাহ্ একটু শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন, কেন, কী নিয়ে ঝগড়া কল্লে?

আবদুল্লাহ্ পায়ের ধুলা-মাটি ভালো করিয়া ধুইয়া ফেলিবার জন্য একজন চাকরকে আর এক বদনা পানির জন্য ইশারা করিল। ছোকরার দলের মধ্যে একজন খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। বিরক্ত হইয়া আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিলেন, হাসছিস কেন রে?

একজন কহিল, ঐ দেখুন, ভাইজান, দুলাভাই নাঙ্গল চষে এয়েছেন, তাই এক হাঁটু ধুলো-কাদা লেগে রয়েছে!

আবদুল মালেক এক ধমক দিয়া কহিলেন, যা–যাঃ! ছেঁড়াগুলো ধরগে’ তোমার ভারি বেতমিজ হয়ে উঠেছে! যা-না তোরা, ওযু করে আয় গে, নামাযের ওক্ত হয়ে গেছে, এখনো ধরগে’ তোমার দাঁত বার করে হাসছে আর ফাজলামি কচ্ছে! যাঃ

ছেলের দল তাড়া খাইয়া চলিয়া গেলে আবদুল মালেক কহিলেন, সত্যি, দুলা মিঞা, এমন করে হেঁটে আসাটা ধরগে’ তোমার ভালো হয় নি। নিদেনপক্ষে একখানা গরুর গাড়ি করে তোমার আসা উচিত ছিল।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আমার মতো গরিবের পক্ষে অতটা আমীরি পোষায় না, ভাই সাহেব!

আরে না, না; এ ধরগে’ তোমার আমীরির কথা হচ্ছে না। লোকের মান-অপমান আছে তো। এতে ধরগে’ তোমার লোকে বলবে কী?

লোকে কী বলে না বলে, তা হিসেব করে সকল সময় কি চলা যায়? লোকে কেবল বলতেই জানে, কিন্তু গরিবের মান বাঁচাবার পয়সা যে কোত্থেকে আসবে তা বলে দেয় না!

একখানা গরুর গাড়ি করে আসতে ধরগে’ তোমার কতই-বা খরচ হত?

তা যতই হোক, গরিবের পক্ষে সেটা মস্ত খরচ বৈকি!

তবু, ধরগে’ তোমার খোদা যে ইজ্জতটুকু দিয়াছেন, সেটুকু ধরগে’ তোমার বজায় রাখতে তো হবে!

যে ইজ্জতের সঙ্গে খোদা পয়সা দেন নি, সেটা ইজ্জতই নয় ভাই সাহেব! বরং তার উল্টো। সেটাকে যে হতভাগা জোর করে ইজ্জত বলে চালাতে চায়, তার কেসমতে অনেক দুঃখ লেখা থাকে।

কথাটা আবদুল মালেকের ঠিক বোধগম্য হইল না; সুতরাং কী জবাব দিবেন স্থির করিতে না পারিয়া তর্কটা ঘুরাইয়া দিবার জন্য কহিলেন, তোমরা ভাই দু পাতা ইংরেজি পড়ে কেবল ধরগে’ তোমার তর্ক করতেই শেখ; তোমাদের সঙ্গে তো আর কথায় পারা যাবে না! ধরগে’ তো–

আবদুল্লাহ বাধা দিয়া কহিল, যাকগে, ও সব বাজে তর্কে কাজ নেই। আমি নামাযটা পড়ে নিই। নামায শেষে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, আপনি যে বলছিলেন, আবদুল কাদের বাড়ি থেকে ঝগড়া করে বেরিয়েছে…

আবদুল মালেক কহিলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে গোঁ ধরেছে, চাকরি করবে। আব্বা বলেন, না, আবার মাদ্রাসায় পড়;–তা তিনি ধরগে’ তোমার ভালো কথাই বলেন; দু-তিন বছর ঘরে বসে বসে নষ্ট কল্লে, পড়াশুনা কিচ্ছু কল্লে না–তদ্দিনে সে ধরগে’ তোমার পাস-করা মৌলবী হতে পারত–দীনী এলম হাসেল করত। তা সেদিকে তো তার মন নেই; বলে চাকরি করবে।

তা বেশ তো চাকরি কল্লেই বা তাতে ক্ষেতিটা কী হত?

আবদুল মালেক বিরক্ত হইয়া কহিলেন, হ্যাঁঃ, চাকরি করবে। আমাদের খান্দানে ধরগে’ তোমার কেউ কোনো কালে চাকরি কল্লে না। আর আজ সে যাবে চাকরি কত্তে? তা যদি ধরগে’ তোমার তেমন বড় চাকরি টাকরি হত, না হয় দোষ ছিল না;-উনি যে কটর মটর একটু ইংরেজি শিখেছেন, তাতে ধরগে’ তোমার ছোট চাকরি ছাড়া আর কী জুটবে? তাতে মান থাকবে? তাতে বাপ-দাদার নাম ধরগে’ তোমার–

সে গেছে কোথায়, ভাই সাহেব?

গেছে সদরে, আর যাবে কোথায়? মোল্লার দৌড় ধরগে’ তোমার মসজিদ পর্যন্ত কিনা! বলিয়া আবদুল মালেক একটু হাসিয়া দিলেন।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, সেখানে বসে কী কচ্ছে, তার কোনো খবর পেয়েছেন?

করবে আর কী? সেখানে আকবর আলী বলে একজন আমলা আছে তার বাপ ধরগে’ তোমার প্যাদাগিরি কত্ত–তারই ছেলে পড়ায় আর সে চাট্টি খেতে দেয়। সে নাকি বলেছে। ওকে সব্‌রেজিস্ট্রার করে দেবে!

আবদুল্লাহ কহিল, বেশ তো, যদি সব্‌রেজিস্ট্রার হতে পারে তো মন্দ কী?

আবদুল মালেক নিতান্ত তাচ্ছিল্যের সহিত কহিলেন, হ্যাঃ, সব্‌রেজিস্ট্রার চাকরি ধরগে’ তোমার অনি মুখের কথা আর কি! তাতে আবার প্যাদারপোকে মুরব্বি ধরেছেন, দুনিয়ায় আর লোক পান নি!

এই প্যাদার পো’টি কে, জানিবার জন্য আবদুল্লাহ্ বড়ই উৎসুক হইল, কিন্তু তাহার প্রতি আবদুল মালেকের যেরূপ অবজ্ঞা দেখা গেল তাহাতে তাহার নিকট হইতে সঠিক খবর পাওয়া যাইবে, এরূপ বোধ হইল না। পরে এ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিলেই জানা যাইবে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ চুপ করিয়া রহিল।

কিছুক্ষণ পরে আবদুল্লাহ্ কহিল, আমি তাকে বাড়ির ঠিকানায় একখানা পত্র লিখেছিলাম, তার কোনো জবাব পেলাম না। বোধহয় সে চিঠি সে পায় নি।

আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিলেন, কবে লিখেছিলে?

আব্বার ব্যারামের সময়।

আবদুল মালেক যেন একটু বিচলিত হইয়া উঠিয়া কহিলেন, তা–তা–তা ধরগে’ তোমার ঠিক বলতে পারিনে।

আবদুল্লাহ্ আবার কিছুক্ষণ ভাবিয়া পরে জিজ্ঞাসা করিল, শ্বশুর সাহেব এখন ভালো আছেন তো?

আবদুল মালেক কহিলেন, নাঃ, ভালো আর কোথায়! তিনি ব্যারামে পড়েছেন এই ধরগে’ তোমার প্রায় মাসাবধি হল–

ব্যারামটা কী? এখন কেমন আছেন?

এই জ্বর আর কি! এখন ধরগে’ তোমার একটু ভালোই আছেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ও জ্বর তো আপনাদের বাড়িতে লেগেই আছে! দুদিন ভালো থাকেন তো পাঁচ দিন জ্বরে ভোগেন। কাউকে তো বাদ পড়তে দেখিন…

না, না, এবার আবা বড় শক্ত ব্যারামে পড়েছিলেন। জ্বরটা ধরগে’ তোমার দশ-বার দিন ছিল। বড় কাহিল হয়ে গেছেন। একেবারে ধরগে’ তোমার বাচবারই আশা ছিল না। চাচাজানের ফাতেহার সময় ধরগে’ তোমার সে হাঙ্গামেই আমরা কেউ যেতে পারি নি। ধরগে’ তোমা–

তা ফাতেহার সময় যেন যেতে পারেন নি, কিন্তু আবার ব্যারামের সময় যখন আমি খবর পাঠাই, তখন আমার স্ত্রীকে পর্যন্ত পাঠালেন না, হালিমাকেও না। মরণকালে তিনি ওদের একবার দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনাদের মেহেরবানিতে তার ভাগ্যে আর সেটা ঘটল না।

আবদুল মালেক একটু উষ্ণ হইয়া উঠিয়া কহিল, বাঃ, কেমন করে পাঠাই? আবদুল কাদের তখন বাড়িতে ছিল না, আব্বাও ছিলেন না, কার হুকুমে ধরগে’ তোমার পাঠাই!

আবদুল্লাহ একটু শ্লেষের সহিত কহিল, আঁ, বাপ মরে, এমন সময় তো হুকুম ছাড়া পাঠানো যেতেই পারে না! তা হালিমা আপনাদের বউ তাকে না হয় আটকে রাখলেন, কিন্তু আমার স্ত্রীকে কেন পাঠালেন না। তার বেলায় তো আর কারুর হুকুমের দরকার ছিল না।

কার সঙ্গে পাঠাব? বাড়িতে আর কেউ ছিল না, আমি তো আর ধরগে’ তোমার বাড়ি ফেলে যেতে পারি নে!

কেন, আবদুল খালেকের সঙ্গে পাঠালেই তো হত।

আবদুল মালেক যেন একেবারে আকাশ হইতে পড়িল। বলিল, সে কী! তার সঙ্গে? সে হল ধরগে’ তোমার গায়ের মহরুম…

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্য হইয়া কহিল, আবদুল খালেক গায়ের মরুম হয়ে গেল!

বাঃ, হবে না? সে হল ধরগে’ তোমার খালাতো ভাই বৈ তো নয়।

কেন, কেবল কি সে খালাতো ভাই? চাচাতো ভাইও তো বটে–বাপের আপন মামাতো ভাইয়ের ছেলে–আবার ধরতে গেলে একই বংশ…

তা হলই-বা, তবু শরীয়তমতো সে ধরগে’ তোমা….

এমন নিকট জ্ঞাতি যে, তার বেলাতেও আপনারা শরীয়তের পোকা বেছে মহরুম, গায়ের মহরুমের বিচার করতে বসবেন, বিশেষ আমার এমন বিপদের সময়, এতটা আমার বুদ্ধিতে জুয়ায় নি।

তা জুয়াবে কেন? তোমরা ধরগে’ তোমার ইংরেজি পড়েছ, শরা-শরীয়ত তো মান না, সে জন্যে ধরগে’ তোমার…

অত শরীয়তের ধার ধারি নে ভাই সাহেব; এইটুকু বুঝি যে মানুষের সুখ-সুবিধারই জন্য শরা-শরীয়ত জারি হয়েছে; বে-ফায়দা কালে-অকালে কড়াকড়ি করে মানুষকে দুঃখ দেবার জন্যে হয় নি। যাক গে যাক, আপনার সঙ্গে আর সেসব কথা নিয়ে মিছে তর্ক করে কোনো ফল নেই। আযানও পড়ে গেল, চলুন নামায পড়া যাক।

বহির্বাটীর এক কোণে ইহাদের বৃহৎ নূতন পারিবারিক মসজিদ নির্মিত হইতেছিল। উহার গম্বজগুলির কাজ শেষ হইয়া গিয়াছিল; কিন্তু মেঝে, বারান্দা, কপাট, এসকল বাকি থাকিলেও কিছুদিন হইতে উহাতে রীতিমতো নামায আরম্ভ হইয়া গিয়াছিল। আবদুল কুদ্দুস সাহেবের বাঁদী-পুত্র খোদা নেওয়াজ এই নূতন মসজিদের খাদেম। সে-ই আযান দিতেছিল। আযান শুনিয়া আবদুল মালেক আবদুল্লাহূকে লইয়া তাড়াতাড়ি মসজিদের দিকে চলিলেন; সঙ্গে সঙ্গে তাহার ছোট ছোট কয়েকটি বৈমাত্রেয় ভাই, দুই-এক জন গোমস্তা এবং চাকরদের মধ্যে কেহ কেহ মসজিদে গিয়া উঠিল। প্রতিবেশীরাও অনেকে মগরেবের সময় এইখানে আসিতে আরম্ভ করিয়াছিল; সুতরাং জামাত মন্দ হইল না। আবদুল মালেক ভিড় ঠেলিয়া পেশনামাজের উপর গিয়া খাড়া হইলেন এবং কৃচ্ছ্বসাধ্য কেরাত ও বহুবিধ শিরশ্চালনার সহিত সুরা ফাতেহার আবৃত্তি আরম্ভ করিলেন।

নামায শেষে আবদুল্লাহ্ বাহিরে আসিয়া মসজিদটি দেখিতে লাগিল। একটু পরেই আবদুল মালেক বাহিরে আসিলে কহিল, এখনো তো মসজিদের ঢের কাজ বাকি আছে, দেখছি।

আবদুল মালেক কহিল, হ্যাঁ, এখনো ধরগে’ তোমার অর্ধেক কাজই বাকি।

উভয়ে বৈঠকখানার দিকে অগ্রসর হইল। আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কত খরচ পড়ল?

ওঃ, সে ঢের। ধরগে’ তোমার প্রায় হাজার আষ্টেক খরচ হয়ে গেছে।

মসজিদটি নির্মাণ করিতে সৈয়দ সাহেবকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছে। হাতে নগদ। টাকা কিছুই ছিল না; সুতরাং কয়েকটি তালুক বিক্রয় করা ভিন্ন তিনি টাকা সংগ্রহের কোনো উপায় খুঁজিয়া পান নাই। আবদুল মালেক কিন্তু এই বিক্রয় ব্যাপারে মনে মনে পিতার ওপর চটিয়া গিয়াছিল। সে ভাবিতেছিল, পিতা নিজের আখেরাতের জন্য পুত্রদিগকে তাহাদের হক হইতে বঞ্চিত করিতেছেন। তাই মসজিদের খরচের কথায় সে তাহার মনের বিরক্তিটুকু চাপিয়া রাখিতে পারিল না। সে বলিয়া ফেলিল, খান কয়েক তালুকও ধরগে’ তোমার এই বাবদে উড়ে গেছে।

কী রকম?

বিক্রি হয়ে গেছে।

শেষটা তালুক বেচতে হল! কেন, বন্ধক রেখে টাকা ধার নিলেও তো হত।

না; তাতে ধরগে’ তোমার সুদ লাগে যে!

কিন্তু তালুক বিক্রয় করিয়া মসজিদ নির্মাণের কথায় আবদুল্লাহ্ বড়ই আশ্চর্য বোধ করিল। সে কহিল, নিকটেই যখন আবদুল খালেকদের একটা মসজিদ রয়েছে, তখন এত টাকা নষ্ট করে আর মসজিদ দেওয়ার কী দরকার ছিল, তা তো আমি বুঝি নে!

আবদুল মালেক ছোটখাটো একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, যার আখেরাতের কাজ সেই করে রে ভাই; ও মসজিদ যিনি দিয়ে গেছেন, তাঁর কাজ তিনিই করে গেছেন; তাতে করে ধরগে’ তোমার আর কারুর আকবতের কাজ হবে না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, এক মসজিদের আযান যত দূর যায়, তার মধ্যে আর একটা মসজিদ দেওয়া নিতান্তই ফজুল। এতে আকবতের কোনো কাজ হল বলে তো আমার বিশ্বাস হয় না। তার ওপর এমন করে তালুক বেচে মসজিদ দেওয়া, এ যে খামাখা টাকা নষ্ট করা।

নষ্ট ঠিক না; আবার কাজ আব্বা করে গেলেন, কিন্তু আমাদের ধরগে’ তোমার.. একরকম ভাসিয়ে দিলেন। তালুক কটা কিনেছে কে, জান?

না, কে কিনেছে?

আবদুল খালেকের বেনামীতে মামুজান কিনেছেন।

কোন্ মামুজান?

রসুলপুরের মামুজান–তিনি ছাড়া ধরগে’ তোমার আবদুল খালেকের, বেনামীতে আবার কে কিনবে?

আবদুল্লাহর খেয়াল হইল রসুলপুরের মামুজান আবদুল খালেকদেরই আপন মাতুল, আবদুল মালেকদিগের বৈমাত্রেয় মাতুল। কিন্তু সে বুঝিতে পারিল না, নিজের নামে না কিনিয়া ভাগিনেয়ের নামে বেনামী কেন করিলেন। সুতরাং ঐ কথা আবদুল মালেককে জিজ্ঞাসা করিল।

আবদুল মালেক কহিল, কী জানি! হয়তো ধরগে’ তোমার কোনো মতলব টতলব আছে।

তা হবে বলিয়া আবদুল্লাহ্ চুপ করিয়া রহিল। এমন সময় অন্দর হইতে তাহার তলব হইল।

.

০৫.

অন্দরে প্রবেশ করিয়া আবদুল্লাহ্ তাহার শাশুড়িদ্বয় এবং অপরাপর মুরব্বিগণের নিকট সালাম আদাব বলিয়া পাঠাইল। তাহার পর হালিমার কক্ষে গিয়া উপস্থিত হইতেই হালিমা তাহার শিশুপুত্রটি ক্রোড়ে লইয়া কাঁদিতে কাদিতে আসিয়া ভ্রাতার কদমবুসি করিল। পিতার মৃত্যু-সংবাদ পাওয়া অবধি সে অনেক কাদিয়াছে। তাহার স্বামী বিদেশে; এ বাটীতে তাহাকে প্রবোধ দিবার আর কেহ নাই, সুতরাং সে নির্জনে বসিয়া নীরবে কাদিয়াই মনের ভার কিঞ্চিৎ লঘু করিয়া লইয়াছে। কিন্তু আজ ভ্রাতার আগমনে তাহার রুদ্ধ শোক আবার উথলিয়া উঠিল; সে আবদুল্লাহর সম্মুখে দাঁড়াইয়া ফুঁপাইয়া ফুঁপাইয়া কাঁদিতে লাগিল।

উচ্ছ্বসিত শোকাবেগে আবদুল্লাহরও হৃদয় তখন মথিত হইতেছিল; তাই অন্যমনস্ক হইবার জন্য সে হালিমার ক্রোড় হইতে শিশুটিকে তুলিয়া লইয়া তাহার মুখচুম্বন করিল এবং ধীরে ধীরে দোল দিতে দিতে কহিল, আর মিছে কেঁদে কী হবে বোন! যা হবার হয়ে গেছে, সবই খোদার মরজি।

এদিকে হালিমার পুত্রটি অপরিচিত ব্যক্তির অযাচিত আদরে বিরক্ত হইয়া খুঁতখুঁত করিতে লাগিল দেখিয়া হালিমা তাহাকে ক্রোড় হইতে ফিরাইয়া লইল এবং অনিরুদ্ধ কণ্ঠে কহিতে লাগিল, মরণকালে আব্বা আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এমন কেসমত নিয়ে এসেছিলাম যে, সে সময়ে তার একটু খেদমত কত্তেও পেলাম না–এ কষ্ট কি আর জীবনে ভুলতে পারব, ভাইজান!

আবদুল্লাহ্ দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিল, তা আর কী করবে বোন! তখন তোমার স্বামী, শ্বশুর, কেউ বাড়ি ছিলেন না…

কেন, বড় মিঞা তো ছিলেন?

তিনি বললেন যে, বাড়িতে তিনি তখন একলা, কী করে সব ফেলে যাবেন! আর তা ছাড়া তোমার স্বামীর কি শ্বশুরের বিনা হুকুমে…

হ্যাঁ! গরিবের বেলাতেই যত হুকুমের দরকার। কেন?–সেবার আমার বড় জার মার ব্যারামের সময় তো কেউই বাড়ি ছিলেন না, আর উনি তো তখন কলকেতায় পড়েন। বুবুর এক ভাই হঠাৎ একদিন এসে তাকে নিয়ে চলে গেলেন, আমার শাশুড়ি-টাশুড়ি কেউ তো টু শব্দটি কল্লেন না! তারা বড়লোক কিনা তাই আর কারো হুকুম নেবার দরকার হল না…

হয়তো তারা আগে থেকে হুকুম নিয়ে রেখেছিলেন…

না–তা হবে কেন? ওঁরা যেদিন চলে গেলেন, তার এক দিন বাদেই তো আমার শ্বশুর বাড়ি এলেন। বাড়ি এসে তবে সব কথা শুনে চুপ করে থাকলেন।

আবদুল্লাহ্ দুঃখিত চিত্তে কহিতে লাগিল, তা আর কী হবে বোন! বড়লোকের সঙ্গে কুটুম্বিতা কল্লে এ-রকম অবিচার সইতেই হয়। দেখ, তোমার বেলা না হয় দুলা মিঞার হুকুমের দরকার ছিল, কিন্তু আমি তো তোমার ভাবীকে পাঠাতে লিখেছিলাম, তাও তো পাঠালেন না! আবদুল খালেকের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে পাঠাতে পাত্তেন, কিন্তু ভাই সাহেব বললেন, সে গায়ের মহরুম কাজেই তার সঙ্গে পাঠানো যায় না…

হালিমা বাধা দিয়া কহিল, কিসের গায়ের মহরুম? ও-সব আমার জানা আছে। কেবল না পাঠাবার একটা বাহানা! কেন? মজিলপুরের ফজলু মিঞাকে তো এঁরা সকলেই দেখা দেন, তিনিও তো খালাতো ভাই!

আবদুল্লাহ কহিল, ফজলু হল গিয়ে মায়ের আপন বোনের ছেলে, আর আবদুল খালেক সতাত বোনের ছেলে…

তা হলই-বা সতাত বোনের ছেলে; ইনি যদি গায়ের মরুম হন তবে উনিও হবেন। ওসব কোনো কথা নয়, ভাইজান, আসল কথা, ফজলু মিঞারা বড়লোক আর এ বেচারা গরিব।

আবদুল্লাহ্ গম্ভীর-বিষণভাবে মাথা নাড়িয়া কহিল, তা সত্য! গরিবকে এরা বড়ই হেকারত করেন–তা সে এগানাই হোক, আর বেগানাই হোক।

হালিমা একটু ভাবিয়া আবার কহিল, আচ্ছা, ওঁর সঙ্গে যেন না পাঠালেন; কিন্তু বড় মিঞা তো নিজেও নিয়ে যেতে পাত্তেন…

তিনি বাড়ি ফেলে যেতে পাল্লেন না যে!

ওঃ। ভারি তো তিনি বাড়ি আগলে বসে রয়েছেন কিনা! তিনি তো আজকাল বাইরেই থাকেন, অন্দরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

কেন, কেন! কী হয়েছে?

কথাবার্তা নিম্ন স্বরেই চলিতেছিল; কিন্তু এক্ষণে হালিমা আরো গলা নামাইয়া কহিল, হবে আর কী? ওই গোলাপী ছুঁড়িটেকে উনি নিকে করেছেন কিনা তাই।

এই অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ এইখানেই শেষ করিবার জন্য আবদুল্লাহ্ কহিল, যাক্ গে যাক। ওসব কথায় আর কাজ নেই। তোমার ভাবী কোথায়?

তিনি আম্মার ঘরে নামায পড়ছেন।

তখন এশার ওক্ত ভালো করিয়া হয় নাই; সুতরাং আবদুল্লাহ্ ভাবিল, বুঝি এখনো মগরেবের জের চলিতেছে। তাই জিজ্ঞাসা করিল, এত লম্বা নামায যে?

হালিমা কহিল ওঃ! তা বুঝি আপনি জানেন না! এবার আমার শ্বশুরের ব্যারামের সময় পীর সাহেব এসেছিলেন কিনা, তাই তখন ভাবী তার কাছে মুরীদ হয়েছেন। সেই ইস্ত আমার শ্বশুরের মতো সেই মগরেবের সময় জায়নামাজে বসেন, আর এশার নামায শেষ করে তবে ওঠেন।

আবদুল্লাহ্ সকৌতুকে তাহার স্ত্রীর আচার-নিষ্ঠার বিবরণ শুনিতেছিল। শুনিয়া সে কহিল, বটে নাকি? তা হলে তোমার ভাবী তো দেখছি এই বয়েসেই বেহেশতের সিঁড়ি গাঁথতে লেগে গেছেন…।

হালিমা কহিল, না না, ঠাট্টা নয়; ভাবী আমার বড়ই দীনদার মানুষ। তার পর আবার পীর সাহেবের কাছে সেদিন মুরীদ হয়েছেন…

তা তুমিও সেইসঙ্গে মুরীদ হলে না কেন?

হালিমা হঠাৎ বিষাদ-গম্ভীর হইয়া ধীরে ধীরে কহিল, আমি যে আব্বার কাছেই আর বছর মুরীদ হয়েছিলাম, ভাইজান!

এই কথায় উভয়ের মনে পিতার স্মৃতি জাগিয়া উঠিল। উভয়ে কিয়ৎকাল নীরব হইয়া রহিল।

আবদুল্লাহ্ হাত বাড়াইয়া কহিল, খোকাকে দেও তো আর একবার আমার কাছে…

ইতিমধ্যে খোকা মাতার স্কন্ধে মাথা রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। হালিমা তাহাকে দুই বাহুর উপর নামাইয়া কহিল, এখন থাক, আবার জেগে উঠে চেঁচাবে। শুইয়ে দিই।

আবদুল্লাহ কহিল, আচ্ছা হালিমা, ও-বেচারার বুকের ওপর একটা আধমনি পাথর চাপিয়ে রেখেছ কেন?

হালিমা পুত্রকে শোয়াইতে শোয়াইতে জিজ্ঞাসা করিল, আধমনি পাথর আবার কোথায়?

ঐ যে মস্ত বড় একটা তাবিজ।

ওঃ! ও একখানা হেমায়েল-শরিফ তাবিজ করে দেওয়া হয়েছে।

আবদুল্লাহ্ চক্ষু কপালে তুলিয়া কহিল, এ্যাঁ! একেবারে আস্ত কোরান!

হালিমা কহিল, কী করব ভাইজান, সকলে মিলে ওর দু হাতে, গলায় একরাশ তাবিজ বেঁধে দিয়েছিলেন। তার কতক রুপোর, কতক সোনার–সেগুলোর জন্যে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু কাপড়ের মোড়ক করে যেগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে তেল-ময়লা জড়িয়ে এমন বিশ্রী গন্ধ হয়ে উঠেছিল যে, উনি একদিন রাগ করে সব খুলে ফেলে দিয়েছিলেন। আম্মা, বুবু, এঁরা সব ভারি রাগারাগি কত্তে লাগলেন। তাইতে উনি বললেন যে, একখানা কোরান-মজিদই তাবিজ করে দিচ্ছি–তার চাইতে বড় আর কিছুই নেই! তাই একটা আসী কোরান দেওয়া হয়েছে।

এমন সময় একটা বাঁদী নাশতার খাঞ্চা লইয়া আসিল, এবং শাশুড়ি প্রভৃতি মুরব্বিগণের দোয়া আবদুল্লাহকে জানাইল। আবদুল্লাহ্ কহিল, এখন নাশতা কেন?

হালিমা কহিল, এখন না তো কখন আবার নাশতা হবে?

একেবারে ভাত খেলেই হত।

ওঃ, এ-বাড়ির ভাতের কথা ভুলে গেছেন ভাইজান? রাত দুপুরের তো এদিকে না, ওদিকে বরং যতটা পারে।

তা বটে! তবে নাশতা একটু করেই নেওয়া যাক। এই বলিয়া আবদুল্লাহ দস্তরখানে গিয়া বসিল। একটা বাঁদী সেলাচী লইয়া হাত ধোয়াইতে আসিল। তাহার পরিধানে একখানি মোটা ছেঁড়া কাপড়, তাহাতে এত ময়লা জমিয়া আছে যে, বোধহয় কাপড়খানি ক্রয় করা অবধি কখনো ক্ষারের মুখ দেখে নাই! উহার দেহটিও এমন অপরিষ্কার যে, তাহার মূল বর্ণ কী ছিল, কাহার সাধ্য তাহা ঠাহর করে!

আবদুল্লাহ্ অত্যন্ত বিরক্তির সহিত কহিল, আচ্ছা হালিমা, তোমরা এই ছুঁড়িগুলোকে একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে পার না? ওদের দেখলে যে বমি আসে। আর এই ময়লা গা হাত নিয়ে ওরা খাবার জিনিসপত্র নাড়ে-চাড়ে, ছেলে-পিলে কোলে করে, তাদের খাওয়ায় দাওয়ায়, এতে শরীর ভালো থাকবে কেন?

ঘরে জন দুই বাঁদী ছিল; আবদুল্লাহর এই কথায় উহারা ফিক্‌ ফিক্‌ করিয়া হাসিতে হাসিতে মুখ ঘুরাইয়া চলিয়া গেল–যেন দুলা মিঞা তাহাদের লইয়া ভারি একটা রসিকতা করিতেছেন।

হালিমা কহিল, কী করব ভাইজান, এ বাড়ির ঐ রকমই কাণ্ডকারখানা। প্রথম প্রথম আমারও বড়ড় ঘেন্না করত, কিন্তু কী করব, এখন সয়ে গেছে! অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু হারামজাদীগুলোর সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠি নি। চিরকেলের অভ্যেস, তাই পরিষ্কার থাকাটা ওদের ধাতেই সয় না।

একখানি পরোটার এক প্রান্ত ভাঙিতে ভাঙিতে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কাপড় ওদের কখানা করে আছে?

ও, তা বড় বেশি না; কারুর ঐ একখানা, কারুর-বা দেড়খানা—

দেড়খানা কেমন?

একখানা গামছা কারুর কারুর আছে, কালেভদ্দরে সেইখানা পরে তালাবে গিয়ে একটা ডুব দিয়ে আসে।

চামচে করিয়া এক টুকরা গোশত ও একটুখানি লোআব তুলিয়া লইয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, তা বেচারাদের খানকয়েক করে কাপড় না দিলে কেমন করেই-বা পরিষ্কার রাখে, এতে ওদেরই-বা এমন দোষ কী!

আর খানকয়েক করে কাপড়! আপনিও যেমন বলেন! ও শুয়োরের পালগুলোকে অত কাপড় দিতে গেলে এঁরা যে ফতুর হয়ে যাবেন দুদিনে!

তবু এতগুলো বাঁদী রাখতেই হবে!

হালিমা কহিল, তা না হলে আর বড়মানুষি হল কিসে ভাইজান!–ও কী? হাত তুলে বসলেন যে? কই, কিছুই তো খেলেন না!…

নাশতা আর কত খাব?

না, না, সে হবে না; নিদেন এই কয়খানা মোরব্বা আর এই হালুয়াটুকু খান। এই বলিয়া হালিমা মিষ্টান্নের তশতরিগুলি ভ্রাতার সম্মুখে বাড়াইয়া দিল। অগত্যা আরো কিছু খাইতে হইল।

নাশতা শেষ করিয়া হাত ধুইতে ধুইতে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, আবদুল কাদেরের কোনো চিঠিপত্র পেয়েছ এর মধ্যে?

হালিমা মাথা নিচু করিয়া আঙুলে শাড়ির আঁচল জড়াইতে জড়াইতে কহিল, আমার কাছে চিঠি লেখা তো উনি অনেকদিন থেকে বন্ধ করেছেন।

আবদুল্লাহ্ আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

হালিমা কহিল, এ বাড়ির কেউ ওসব পছন্দ করেন না। বলেন–জানানাদের পক্ষে লেখাটেখা হারাম। তাতেও বাধত না–উনি ওসব কথা গ্রাহ্য কত্তেন না; কিন্তু চিঠি হাতে পেলেই বড় মিঞা সব খুলে খুলে পড়েন, তাই উনি চিঠিপত্র লেখা ছেড়ে দিয়েছেন।

এ বাটীর মহিলাগণ চিঠিপত্রের ধার বড় একটা ধারিতেন না। পড়াশুনার মধ্যে কোরান শরীফ, তাহার উপর বড়জোর উর্দু মেহুল জেন্নত পর্যন্ত; ইহার অধিক বিদ্যা তাহাদিগের পক্ষে নিষিদ্ধ ফল। লেখা–তা সে উর্দুই হোক আর বাঙলাই হোক, আর বাঙলা পড়া, এ সকল তো একেবারেই হারাম। হালিমা যদিও পিত্রালয়ে থাকিতে এই হারামগুলি কিঞ্চিৎ আয়ত্ত করিয়া লইয়াছিল এবং বিবাহের পর স্বামীর উৎসাহে প্রথম প্রথম উহাদের চর্চাও কিছু কিছু রাখিয়াছিল, কিন্তু অল্পকালমধ্যেই শ্বশুরালয়ের কুশাসনে তাহার এই কু-অভ্যাসগুলি দূরীভূত হইয়া গিয়াছিল। আবদুল্লাহ্ হালিমাকে পত্র লিখিলে, সে অপরাপর অন্দরবাসিনীদের ন্যায় বাটীর কোনো বালককে দিয়া অথবা বাহিরের কোনো গোমস্তার নিকট বাঁদীদের মারফত খবর দেওয়াইয়া জবানী-পত্র লিখাইয়া লইত। এইরূপ জবানীপত্র পাইলে আবদুল্লাহ্ ভগ্নীকে লেখাপড়ার চর্চা ছাড়িয়া দিয়াছে বলিয়া ভর্ৎসনা করিয়া পত্র লিখিত এবং সাক্ষাৎ হইলে হালিমা সময় পায় না ইত্যাদি বলিয়া কাটাইয়া দিত। এতদিন সে আসল কথাটি অনাবশ্যক বোধে ভ্রাতাকে বলে নাই, কিন্তু সম্প্রতি তাহার মন এ বাটীর সকলের উপর তিক্ত হইয়া উঠিয়াছিল বলিয়া সে কথায় কথায় অনেক কিছু বলিয়া ফেলিয়াছে। আবদুল্লাহও আজ বুঝিতে পারিল, হালিমা কেন স্বহস্তে পত্রাদি লেখে না। মনে মনে তাহার রাগটা পড়িল গিয়া আবদুল মালেকের ওপর। তিনি কেন পরের চিঠি খুলিয়া পড়েন–তাহার কি একটুও আক্কেল নাই? ছোট ভাই তাহার স্ত্রীর নিকট পত্র লিখিবে, তাহাও খুলিয়া পড়িবেন? কী আশ্চর্য!

এই কথাটি মনে মনে আলোচনা করিতে করিতে আবদুল্লাহর সন্দেহ হইল, বোধহয় সে কলিকাতা হইতে আসিবার সময় পিতার রোগের সংবাদ দিয়া আবদুল কাদেরকে যে পত্র লিখিয়াছিল, তাহাও আবদুল মালেকের কবলে পড়িয়া মারা গিয়াছে। তাহার এই সন্দেহের কথা সে হালিমাকে খুলিয়া বলিল। হালিমা জিজ্ঞাসা করিল, সেটা কি ইংরেজিতে লেখা ছিল?

আবদুল্লাহ্ কহিল, হ্যাঁ ইংরেজিতে। অনেক দিন আবদুল কাদের আমাকে পত্র লেখে নি; আমিও জানতাম না যে, সে চাকরির সন্ধানে বরিহাটে গেছে। তাই বাড়ির ঠিকানাতেই লিখেছিলাম।

হালিমা একটু ভাবিয়া কহিল, একদিন বড় মিঞার ছেলে জানু ইংরেজি চিঠির মতো কী একটা কাগজ নিয়ে খেলা করছিল। আমি মনে করলাম, এ ইংরেজি লেখা কাগজ ওনার ছাড়া আর কারুর হবে না; কোনো কাজের কাগজ হতে পারে বলে আমি সেটা জানুর হাত থেকে নিয়ে তুলে রেখেছিলাম।

আবদুল্লাহ্ আগ্রহের সহিত কহিল, কোথায় রেখেছিলে আন তো দেখি।

তার খানিকটা নেই, জানু ছিঁড়ে ফেলেছিল। আনছি এখনই– এই বলিয়া হালিমা সেই ছেঁড়া কাগজখানি বাক্স খুলিয়া বাহির করিল।

কাগজের টুকরাটি দেখিয়াই আবদুল্লাহ্ বলিয়া উঠিল, বাঃ, এ তো দেখছি আমারই সেই চিঠি।

হালিমা কহিল, তবে নিশ্চয়ই বড় মিঞা ওটা খুলেছিলেন, তারপর ইংরেজি লেখা দেখে ফেলে দিয়েছিলেন।

একটু আগেই যখন আবদুল্লাহ আবদুল মালেককে সেই চিঠির কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিল তখন হঠাৎ তাহার চোখে-মুখে একটু বিচলিত ভাব দেখা গিয়াছিল। সেটুকু আবদুল্লাহর দৃষ্টি না এড়াইলেও তাহার নিগূঢ় কারণটুকু বুঝিতে না পারিয়া তখন সে সেদিকে ততটা মন দেয় নাই। এক্ষণে উহার অর্থ বেশ পরিষ্কার হইয়া গেল, তাই সে বড়ই আফসোস করিয়া কহিতে লাগিল, দেখ তো কী অন্যায়! চিঠিখানা না খুলে যদি উনি ঠিকানা ঘুরিয়ে দিতেন, তবে সে নিশ্চয়ই পেত। ইংরেজি চিঠি দেখেও সেটা খুলে যে তার কী লাভ হল, তা খোদাই জানেন! আবদুল কাদের আমার চিঠির জবাবও দিলে না, একবার এলও না; তাই ভেবে আমি তার ওপর চটেই গিয়েছিলাম। ফাতেহার সময় হয়ে গেছে! সে হয়তো এদ্দিন আব্বার এন্তেকালের কথা শুনেছে; আর আমি তাকে একটা খবর দিলাম না মনে করে সে হয়তো ভারি বেজার হয়ে আছে…

হালিমা কহিল না, না ভাইজান, বেজার হবেন কেন? এই চিঠির টুকরাই তো আপনার সাক্ষী! বললে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, কার জন্যে এটা ঘটেছে। আপনি তাকে একখানা লিখে দিন না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, হ্যাঁ কালই লিখতে হবে।

এমন সময় একজন বাঁদী পানের বাটা লইয়া ঘরে প্রবেশ করিল। হালিমা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, পান কে দিল রে বেলা?

ছোট বুবুজী দিয়েছেন।

তাঁর নামায হয়ে গেছে?

হ্যাঁ, নামায পড়ে উঠেই পান তয়ের কল্লেন।

হালিমা ভ্রাতাকে কহিল, তবে এখন একবার ও-ঘরে যান। রাতও হয়েছে, দেখি গে ভাতের কদ্দূর হল।

দুয়ারের নিকট হইতে ফিরিয়া আসিয়া হালিমা জিজ্ঞাসা করিল, এবার কদিন থাকবেন, ভাইজান?

কেন বল দেখি?

যাবার সময় আমাকে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু।

আমার তো তাই ইচ্ছে আছে; এখন দেখি কর্তারা কী বলেন। যদি তারা দুলা মিঞার হুকুম চেয়ে বসেন, তবেই তো মুশকিল হবে…

না, এবার না গিয়ে কিছুতেই ছাড়ব না, তা বলে রাখচি।

আচ্ছা, আচ্ছা দেখি তো একবার বলে কয়ে।

০৬-১০. স্ত্রীর ঘরে

স্ত্রীর ঘরে গিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিল, সালেহা খাটের সম্মুখস্থ চৌকির উপর বসিয়া পান সাজিতেছে। ঘরে একটা বাঁদী ছিল; আবদুল্লাহকে আসিতে দেখিয়া সে বাহির হইয়া গেল।

সালেহা তাড়াতাড়ি চৌকি হইতে নামিয়া স্বামীর নিকটবর্তী হইল এবং কদমবুসি করিবার জন্য দেহ নত করিল। আবদুল্লাহ্ ইহার জন্য প্রস্তুতই ছিল, সে তৎক্ষণাৎ স্ত্রীর বাহুদ্বয় ধরিয়া তাহাকে টানিয়া তুলিল এবং কহিল, আঃ, ছিঃ তোমার ও-রোগটা এখনো গেল না দেখছি।

ইতোমধ্যে সালেহা আবদুল্লাহর বাহুবেষ্টনে আবদ্ধ হইয়া গিয়াছে। তাহার স্বামী এইরূপ অভ্যর্থনা চান বটে; কিন্তু সে কদমবুসির পরিবর্তে এরূপ বেহায়াপনার দ্বারা স্বামীর অভ্যর্থনা করা মোটেই পছন্দ করিত না। সে ভাবিত, তাহার স্বামী তাহাকে একটা বৃহৎ কর্তব্যকর্মে বাধা দিয়া কাজ ভালো করেন না।

ছাড়ুন ছাড়ুন, কেউ দেখতে পাবে বলিয়া সালেহা স্বামীর সাগ্রহ বাহুবেষ্টন হইতে আপনাকে মুক্ত করিয়া লইয়া সরিয়া দাঁড়াইল। একটু পরে আবার কহিল, আপনি বড় অন্যায় করেন।

আবদুল্লাহ্ চৌকির উপর বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কী অন্যায় করি?

চৌকির অপর প্রান্তে উঠিয়া বসিতে বসিতে সালেহা কহিল, এই–এই–সালাম করতে দেন না আর কি! ওতে যে আমার গোনাহ্ হয়।

যদি গোনাহ্ হয়, তবে সে আমারই হবে, কেননা, আমিই করতে দেই না।

আপনার হলে তো আমারও হল–

আবদুল্লাহ্ একটু বিদ্রুপের স্বরে কহিল, বাঃ, বেশ ফতোয়া জারি করতে শিখেছ যে দেখছি!

পানের বাটাটি স্বামীর সম্মুখে বাড়াইয়া দিয়া সালেহা কহিল, ফতোয়া আবার কোথায় হল?

বাটা হইতে দুটি পান তুলিয়া মুখে দিয়া চিবাইতে চিবাইতে আবদুল্লাহ্ কহিল, কেন, এই যে বললে, একজনের গোনাহ্ হলে দুজনের হয়! এ তো নতুন ফতোয়া নতুন মুরীদ হয়ে বুঝি এ সব শিখেছ?

সালেহা একটু বিরক্ত হইয়া কহিল, যান, ওসব কথা নিয়ে তামাশা করা ভালো না।

না, তামাশা কচ্ছিনে; কিন্তু আজকাল তোমার নামায আর ওজিফার যে রকম বান ডেকেছে, তাতে হয়তো আমি ভেসেই যাব। এই যে আমি এদ্দিন পরে এসে সন্ধে থেকে বসে আছি…

সালেহা অসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়া কহিল, খোদার কাজ করতে আপনি মানা করেন?

আবদুল্লাহ্ কৃত্রিম ভয়ের ভাব দেখাইয়া দাঁতে জিভ কাটিয়া কহিল, তওবা তওবা, তা কেন করব? তবে কিনা সংসারের কাজও তো মানুষের আছে…।

কেন আমি নামায পড়ি বলে কি সংসারের কাজ আটকে থাকে?

নামায পড়লে আটকায় না বটে, কিন্তু অত লম্বা ওজিফা জুড়ে বসলে আটকায় বৈকি! বিশেষ করে আমাদের মতো গরিবের ঘরে, যেখানে বাঁদী গোলামের ভিড় নেই।

কথাটা সালেহার ভালো লাগিল না। সে তাহার পিতার বড়ই অনুগত ছিল, এবং শৈশব হইতে এ সকল ব্যাপারে তাহারই অনুকরণ করিয়া আসিতেছে। তাহার উপর আবার সম্প্রতি পীর সাহেবের নিকট মুরীদ হইয়া দ্বিগুণ উৎসাহে ধর্মের অনুষ্ঠানে আপনাকে নিয়োজিত করিয়াছে। তাহার বিশ্বাস জন্মিয়া গিয়াছে যে, এইরূপ কঠোর অনুষ্ঠানই পরকালে বেহেশত লাভের উপায়, ইহাই সর্বপ্রথম কর্তব্য। সংসারের কাজগুলি সব নিতান্তই বাজে কাজ, যেটুকু না করিলেই চলে না সেইটুকু করিলেই যথেষ্ট। সংসার সম্বন্ধে ইহার অধিক কোনো কর্তব্য আসিতে পারে না। তাই আজ তাহার স্বামী খোদার কাজ অপেক্ষা সংসারের কাজের গুরুত্ব অধিক বলিয়া মত প্রকাশ করিতেছেন মনে করিয়া সালেহা বিরক্ত, ক্ষুণ্ণ এবং রুষ্ট হইয়া উঠিল। সে একটু উষ্ণতার সহিত বলিয়া ফেলিল, হোক, তবু খোদার কাজ আগে, পরে আর সব।

আবদুল্লাহ্ দেখিল, এ আলোচনা ক্রমে অপ্রীতিকর হইয়া উঠিতেছে। তখন সে কথাটা চাপা দিবার জন্য কহিল, সে কথা ঠিক। তা যাক্, তুমি কেমন আছ, তাই বল।

আছি ভালোই, আম্মার তবিয়ত ভালো তো?

ভালো আর কোথায়! আব্বার এন্তেকালের পর থেকে তার শরীর ক্রমে ভেঙে পড়েছে।

সালেহা একটু চুপ করিয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমি তখন যেতে পারি নি বলে কি তিনি রাগ করেছেন?

আবদুল্লাহ কহিল, না–তিনি তোমার উপর রাগ করবেন কেন? তবে আব্বা মরবার সময় তোমাকে দেখতে পান নি বলে বড় দুঃখ করে গেছেন।

তা কী করব, আমাকে পাঠাবার তখন কোনো সুবিধে হয়ে উঠল না। পরে একটু ভাবিয়া সালেহা আবার কহিল, আপনিও তো এসে আমাকে নিয়ে যেতে পারতেন।

আমি আব্বাকে ফেলে আসি কী করে? তাকে দেখবার শুনবার তো আর লোক ছিল না।

সালেহা চুপ করিয়া রহিল। কিয়ৎক্ষণ পরে আবদুল্লাহ কহিল, আমার বোধহয় আর পড়াশুনা হবে না।

তবে কী করবেন?

ভাবছি একটা চাকরির চেষ্টা দেখব।

একজন তো চাকরি করবেন বলে আবার সঙ্গে চটাচটি করে গেছেন…

সে চাকরি করে নিজের উন্নতি করতে চায়, তাতে বাধা দেওয়া তো আমার শ্বশুরের উচিত হয় নি…

আর বাপের অমতে তাকে চটিয়ে, চাকরি করতে যাওয়া বুঝি মেজ ভাইজানের বড় উচিত হয়েছে?

এমন ভালো কাজেও যদি বাপ চটেন, তা হলে লাচার হয়ে অবাধ্য হতেই হয়…

না, তাতে কি কখনো ভালো হয়? হাজার ভালো কাজ হলেও বাপ যদি নারাজ থাকেন, তাতে বরকত হয় না।

স্ত্রীর সহিত তর্কে এইখানে আবদুল্লাহকে পরাস্ত হইতে হইল। অগত্যা সে কহিল, হ্যাঁ, সে কথা ঠিক। আবদুল কাদেরের উচিত ছিল বাপকে বুঝিয়ে বলে তাকে রাজি করে যাওয়া…

তাতেও কিছু হত না। আব্ব মেজ ভাইজানকে বলেছিলেন আবার মাদ্রাসায় পড়তে। তিনি বলেন, যারা শরীফজাদা তাদের উচিত দীন ইসলামের উপর পাকা হয়ে থাকা। ইংরেজি পড়া, কি চাকরি করতে যাওয়া ওসব দুনিয়াদারী কাজে ইমান দোরস্ত থাকে না বলে তিনি মোটেই পছন্দ করেন না।

পছন্দ করেন না, তা তো বুঝলাম। কিন্তু যারা এখন শরীফজাদা আছেন, পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে কোনোরকমে না হয় শরাফতি করে যাচ্ছেন। তারপর দুই এক পুরুষ বাদে সম্পত্তিটুকু যখন তিল তিল করে ভাগ হয়ে যাবে, তখন শরাফতি বজায় রাখবেন কী দিয়ে? তখন যে পেটের ভাতই জুটবে না…

কেন জুটবে না? খোদার উপর তওয়াল রাখলে নিশ্চয়ই জুটবে।

ঘরে বসে খালি খোদার উপর তওয়াল রাখলে তো আর অমনি ভাত পেটের ভিতর ঢুকবে না। তার জন্যে চেষ্টা করতে হবে ও যাতে দু পয়সা উপায় হয় তার জন্যে খাটতে হবে। যে দিন-কাল পড়েছে, তাতে ইংরেজি না শিখলে আর সেটি হবার যো নেই…।

কেন কত লোক যে ইংরেজি শেখে নি, খোদা কি তাদের ভাত-কাপড় জুটিয়ে দিচ্ছেন না?

তর্ক আবার অপ্রিয় হইয়া উঠিবার উদ্যোগ করিতেছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, যা গে যাক্, ও-সব কথা তোমরা বুঝবেও না, ও-তর্কেও আর কাজ নেই…

না, আমরা বুঝিও নে, বুঝতে চাইও নে; কেবল এইটুকু জানি যে, খোদার উপর তওয়াল রাখলে আর তার কাজ রীতিমতো করে গেলে, কারুর কোনো ভাবনা থাকে না। আব্বা যে বলে থাকেন, ইংরেজি পড়লে খোদার উপর আর লোকের তেমন বিশ্বাস থাকে না, তা দেখছি ঠিক।…

শেষটা তাহার নিজের উপরই প্রযুক্ত হইল বুঝিয়া আবদুল্লাহ্ একটু বিরক্তির স্বরে কহিল, খোদার উপর অবিশ্বাস দেখলে কোন্‌খানে? সংসারে উন্নতির চেষ্টা না করে কেবল হাত-পা কোলে করে বসে থাকলেই যদি খোদার উপর বিশ্বাস আছে বলে ধরতে চাও, তবে আমি স্বীকার করি, আমার তেমন বিশ্বাস নেই।

স্বামীর মুখে এত বড় নাস্তিকতার কথা শুনিয়া সালেহা একেবারে শিহরিয়া উঠিল। সে। দাঁতে জিভ কাটিয়া কহিল, এ্যাঁ, বলেন কী! তওবা করুন, তওবা করুন, অমন কথা মুখ দিয়ে বার করবেন না! ওতে কত বড় গোনাহ্ হয়, তা কি আপনি জানেন না? ও-কথা যে শোনে সেও জাহান্নামে যায়।…

এমন সময় মসজিদে এশার নামাযের আযান আরম্ভ হওয়ায় আবদুল্লাহ্ চুপ করিয়া রহিল। আযান শেষে মুনাজাত করিয়া কহিল, জাহান্নামে যাবার ভয় থাকে তো তোমার আর ওসব শুনে কাজ নেই।

এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ একটা বালিশ টানিয়া লইয়া শুইয়া পড়িল।

সালেহা কহিল, এখন শুলেন যে? নামায পড়তে যাবেন না?

না, আর মসজিদে যাব না, ঘরেই পড়ব এখন; একটু গড়াগড়ি দিয়ে নিই। বড় হয়রান হয়ে এসেছি।

তবে আমি যাই, নামাযটা পড়ে নিয়ে খানার যোগাড় করি গিয়ে–

তা হলে দেখছি খাওয়াদাওয়ার এখনো ঢের দেরি আছে–ততক্ষণে আমি নামায পড়ে বেশ একটা ঘুম দিয়ে নিতে পারব। তুমি এক বদনা ওযুর পানি পাঠিয়ে দিও

এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ চৌকির উপর পড়িয়া পড়িয়া একটা বিকট হাই তুলিয়া সাড়ম্বরে আলস্য ত্যাগ করিল।

সালেহা একটা বাঁদীকে ডাকিয়া পানি দিতে বলিয়া চলিয়া গেল।

হালিমা ও সালেহার চেষ্টায় সেদিন একটু সকাল সকাল খানার বন্দোবস্ত হইল। তখন। রাত্রি দ্বিপ্রহর পার হইয়া গিয়াছে।

একটা বাঁদী আসিয়া আবদুল্লাহকে ডাকিয়া তাহার শ্বশুরের ঘরে লইয়া গেল। দস্তরখান সেইখানেই বিছানো হইয়াছিল। আবদুল্লাহ্ ঘরে প্রবেশ করিতেই শ্বশুর কহিলেন, এস বাবা, এস, ভালো আছ তো?

আবদুল্লাহ্ শ্বশুরের কদমবুসি করিয়া কহিল, জি হাঁ, ভালোই আছি। হুজুরের তবিয়ত কেমন?

শ্বশুর একটু কাতর স্বরে কহিলেন, আর বাবা তবিয়ত! এবার নিতান্তই খোদার মরজিতে আর হুজুরের (অর্থাৎ পীর সাহেবের) দোয়াতে বেঁচে উঠেছি, নইলে বাচবার আশা ছিল না। এখনো চলতে পারি নে, হাত-পা কাপে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা এই দুর্বল শরীরে রাত্রে একটু সকাল সকাল খেয়ে নিলে বোধ করি ভালো হয়…

আর বাবা, ওটা অভ্যেস হয়ে গেছে–তা ছাড়া নামাযটা না পড়ে কেমন করে খাই। খেলে যে আর শুয়ে পারি নে…

এমন সময় বাঁদীরা বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলিকে নিদ্রা হইতে উঠাইয়া টানিতে টানিতে আনিয়া দস্তরখানে একে একে বসাইয়া দিয়া গেল। বেচারারা বসিয়া বসিয়া ঢুলিতে লাগিল। কর্তার বাঁদী-পুত্র খোদা নেওয়াজ দস্তরখানের উপর বাসন-পেয়ালা প্রভৃতি সাজাইতে সাজাইতে একটা বাঁদীকে ডাকিয়া কহিল, ওরে ফুলি, বড় মিঞা সাহেবকে ডেকে নিয়ে আয়।

আবদুল কুদ্দুস প্রথম বয়সে একটি বাঁদীকে নিকাহ্ করিয়াছিলেন, তাহারই গর্ভে খোদা নেওয়াজের জন্ম হয়। খোদা নেওয়াজই তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র; কিন্তু সে বাঁদী-গর্ভজাত বলিয়া বিবি-গর্ভজাত কনিষ্ঠ ভ্রাতাদিগকে বড় মিঞা সাহেব, মেজ মিঞা সাহেব ইত্যাদি বলিয়া ডাকিতে হয়। সংসারে যে তাহাকে ঠিক চাকরের মতো থাকিতে হয়, এরূপ বলা যায় না; কেবল মসজিদ এবং দস্তরখানে খাদেমি এবং অন্দরের ও সদরের ফুট-ফরমাইশ খাটা ভিন্ন তাহার আর বড় একটা কাজ ছিল না। অবশ্য তাহার আহারাদি যে চাকর-মহলেই হইত, তাহা বলাই বাহুল্য।

বড় মিঞা সাহেব তাহার বহির্বাটীস্থ মহল হইতে অন্দরে আনীত হইলে খান আরম্ভ হইল। কর্তা আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করিয়া কহিতে লাগিলেন, তোমার ওয়ালেদ মরহুমের সঙ্গে আমার একবার শেষ দেখাটা হল না, সেজন্যে আমার জানে বড় সমা লেগেছে। বড় ভালো লোক ছিলেন তিনি, এমন দীনদার পরহেজগার লোক আজকালকার জমানায় বড় একটা দেখতে পাওয়া যায় না। কী করব, বাবা, সবই কিসমত? তা তোমার আম্মা ভালো আছেন তো?

জি না, তেমন ভালো আর কোথায়! আব্বার এন্তেকালের পর থেকে তারও তবিয়ত খারাব হয়ে পড়েছে।

তা তো পড়বেই বাবা, তাঁর ধড়ে কি আর জান আছে! এর চেয়ে সদমা আর দুনিয়াতে নেই। ওঁয়ার শরীরটার দিকে একটু নজর রেখো বাবা, আর এ সময় তুমি কাছে কাছেই থেকো, ওয়াকে একলা ফেলে কোথাও গিয়ে বেশি দিন থেকো না, এ-সময়ে তুমি কাছে থাকলে ওঁর মনটা একটু ভালো থাকবে।…

এইরূপ বহুবিধ উপদেশের মধ্য দিয়া খানা শেষ হইল, আবদুল্লাহ একবার মনে করিয়াছিল, তাহার পড়াশুনার কথাটা এই সময়ে পাড়িয়া দেখিবে, কিন্তু আবার ভাবিল, না, এখন ও-সব কথা পাড়িয়া কাজ নাই। কাল দিনের বেলা সুবিধামতো নিরিবিলি পাইলে তখন। বলা যাইবে। বিশেষত এতগুলি লোকের সামনে তাহার মুখ ফুটিল না; তাহার আত্মসম্মান। অন্তরের মধ্য হইতে তাহাকে বাধা দিতে লাগিল।

.

০৭.

পলাশডাঙ্গার মদন গাজীর বাড়িতে আজ মহা হুলুস্থুল পড়িয়া গিয়াছে। তাহার ভয়ানক বিপদ উপস্থিত। মহাজন দিগম্বর ঘোষ পেয়াদা এবং বহু লোকজন লইয়া আজ তাহার বসতবাড়িতে বাশগাড়ি করিতে আসিয়াছেন। পাড়ার লোকজনে তাহার বাহিরবাড়ি পরিপূর্ণ, সকলেই। বেচারার ঘোর বিপদে সহানুভূতি ও দুঃখ প্রকাশ করিতেছে। কিন্তু এ বিপদ হইতে মদন গাজী কিসে উদ্ধার পাইতে পারে তাহা কেহই স্থির করিতে পারিতেছে না।

মদনের অবস্থা বেশ ভালোই ছিল। তাহার খামার জমিগুলির মত উর্বরা জমি এ অঞ্চলে আর কাহারো ছিল না। গোলাভরা ধান, গোয়াল-ভরা গরু, ছালল এবং উঠান-ভরা মোরগ-মুরগি লইয়া সে বেশ সুখে-স্বচ্ছন্দে দিনপাত করিত। তাহার জমিতে পাটও জন্মিত এবং তাহা হইতে রাশি রাশি কাঁচা টাকা পাইয়া সে কৃষকমহলে খাতির যথেষ্ট জমাইয়া তুলিয়াছিল। কাজেই জ্যেষ্ঠপুত্র সাদেকের বিবাহের সময় পাঁচজন জ্ঞাতি-কুটুম্ব একত্র হইয়া ধরিয়া বসিল, খুব ধুমধাম করা চাই, দু-চারখানা গ্রামের লোক খাওয়াইতে হইবে, বাজি বাজনা, জারি-কবি, এসবের বন্দোবস্ত করিতে হইবে, নহিলে শুধু মদন গাজীর কেন, পলাশডাঙ্গার শেখেদের কাহারো মান থাকিবে না। শেখেরা তো আর এখন আগেকার মতো মিঞা সাহেবদের গোলামি করে না। মদন গাজীর মতো মাথা–তোলা লোকও মিঞা সাহেবদের মধ্যেই-বা কটা আছে? এবার দেখানো চাই শেখেরাও মিঞাদের মতো ধুমধাম করিতে জানে, ইত্যাদি।

প্রথমটা মদনের এসবে বড় মত ছিল না; কিন্তু পাঁচজনের উৎসাহে সেও নাচিয়া উঠিল। পুত্রের বিবাহে বিস্তর টাকা ব্যয় করিয়া ফেলিল। সুতরাং বেশ রকমের একটা দেনাও তাহাকে ঘাড় পাতিয়া লইতে হইল। আর মদনের মতো সম্পন্ন গৃহস্থকে কেই-বা না বিনা বাক্যব্যয়ে টাকা ধার দিবে। রসুলপুরের দিগম্বর ঘোষ যদিও ভারি কড়া মহাজন–তাহার সুদের হারও যেমন উঁচু আদায়ের বেলাও তেমনি কড়াক্রান্তি পর্যন্ত কোনো দিন রেয়াত করে না। তবু এক্ষেত্রে তিনি পরম আগ্রহের সহিত খামারগুলি রেহেন রাখিয়া কম সুদেই মদনকে টাকা ধার দিয়া তাহাকে মস্ত খাতির করিয়া ফেলিয়াছেন। তাই পাঁচজনে বলিল, ও দেনার জন্য কিছু ভয় নেই মদন। খোদা তোমাকে যেমন দিতে আছেন, তাতে ওই কটা টাকা পরিশোধ কত্তি আর কদ্দিন? মদন আশায় বুক বাঁধিল, পিতাপুত্রে দ্বিগুণ উৎসাহে আবার ক্ষেতের কাজে লাগিয়া গেল।

মদনের খামার জমিগুলির ওপর অনেকেরই লোভ ছিল; কিন্তু এ যাবৎকাল কেহই তাহাতে হাত দিবার সুযোগ পান নাই। এবারে যখন সে হতভাগ্য ঘোষ মহাশয়ের কবলে পতিত হইল, তখন তিনি মনে মনে বেশ একটুখানি প্রীতি অনুভব করিলেন, তাহার পর দুই তিন বৎসর ধরিয়া যখন ক্রমাগত অজন্মা হইতে লাগিল, এবং মদনের দেয় সুদ কিস্তির পর কিস্তি বাকি পড়িয়া চক্রবৃদ্ধিহারে ক্রমাগত বাড়িয়া চলিল, তখন ঘোষ মহাশয় ভাবিলেন, আর যায় কোথায়!

ফলে ঘটিল তাহাই। টাকা আর পরিশোধ হইল না। তিন বৎসরের অজন্মার পর চতুর্থ বৎসরে যখন সুপ্রচুর ফসল জন্মিবার সম্ভাবনা দেখা গেল, তখন মদনের আশা হইল যে, খোদায় করিলে এবার মহাজনের টাকা পরিশোধ করিতে পারিবে। কিন্তু ওদিকে ঘোষ। মহাশয়ের সজাগ দৃষ্টি ফসলের প্রাচুর্যের দিকে পতিত হইয়া তাহাকে একটু ব্যস্ত করিয়া তুলিল–পাছে মদন ঋণ পরিশোধ করিবার সুযোগ পাইয়া বসে, এই ভয়ে তিনি তামাদির অজুহাতে তাড়াতাড়ি নালিশ করিয়া দিলেন। মদন প্রচুর ফসলের সম্ভাবনার কথা বলিয়া সময় প্রার্থনা করিল, কিন্তু সে সময়ে তাহার হাতে নগদ টাকা ছিল না, সহসা কাহারো নিকট ধারও পাওয়া গেল না। কাজেই তদ্বিরের অভাবে বিশেষত ওপক্ষের মুক্তহস্ত তদ্বিরের মুখে সে তাহার ক্ষীণ প্রার্থনা গ্রাহ্য করাইতে পারিল না। মদনের খামার জমিগুলি নিলাম হইয়া গেল, এবং ঘোষ মহাশয় সেগুলি খরিদ করিয়া ফেলিলেন। আর একটু বিশেষ রকম তদ্বিরের ফলে সমস্ত খামার জমিগুলি নিলাম হইয়াও কতক টাকা বাকি রহিয়া গেল। মদন সেই টাকার দরুন আবার বসতবাটী রেহেন দিয়া নূতন খত লিখিয়া দিল এবং সে যাত্রা নিষ্কৃতি পাইল।

কিন্তু খামারগুলি হারাইয়া এক্ষণে তাহার পক্ষে সেই নূতন খতের টাকা পরিশোধ করা আরো অসম্ভব হইয়া পড়িল। এখন তাহার পেট চালানোই দায়; পরিবারের লোক তো কম নয়, –দুবেলা তাহাদের সকলের পেট ভরিয়া আহার জোটে না, পরিবারের পরনে কাপড় এক প্রকার নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। ঘরের জিনিসপত্র একে একে সব গিয়াছে। তবু মদন জোয়ান ছেলেটিকে সঙ্গে লইয়া পাড়ায় জন-মজুরি করিয়া কোনোক্রমে পরিবারগুলিকে অনশন হইতে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে–কিন্তু এ যাবৎ একটি পয়সা সুদ দিয়া উঠিতে পারে নাই। ক্রমে অর্ধাশনক্লেশ এবং তাহার ওপর দারুণ ভাবনায় তাহার শরীর একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছে।

এদিকে কিছুদিন হইতে মদনের বসতবাটীখানির ওপর ঘোষ মহাশয়ের পুত্র শ্রীমান জনার্দন ঘোষের লোলুপ দৃষ্টি পড়িয়া আছে। বাড়িখানি বেশ উচ্চভূমির উপর নির্মিত, এবং তাহার সহিত কয়েক বিঘা বাগানের উপযুক্ত জমিও আছে। স্থানটিও বেশ নির্জন–চারিদিকে যদিও মুসলমান কৃষক বস্তি তথাপি অন্তত যখন সেখানে কোনো ভদ্রলোকের বসতি নাই, তখন স্থানটি একটি সুন্দর বাগানবাড়ির জন্য উপযুক্তরূপ নির্জন বলিয়াই মনে করা যাইতে পারে। পিতার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির উপর ঘরে বসিয়া যদৃচ্ছা আমোদ-প্রমোদ করা চলে না; তাই একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ করিবার জন্য এইরূপই একটি নির্জন প্রশস্ত স্থানের অভাব জনার্দন বাবু অনেক দিন হইতে বোধ করিয়া আসিতেছেন। এক্ষণে পলাশডাঙ্গা এবং রসুলপুরের মধ্যে একটা নদীর ব্যবধান থাকায়, এই গ্রামটিই বাগানবাড়ি নির্মাণের উপযুক্ত বলিয়া তিনি স্থির করিয়াছেন। মদনের বাড়িখানিও ঠিক নদীর উপরেই; সুতরাং গোপন বিহারের জন্য এরূপ নিরাপদ স্থান আর কোথায় পাওয়া যাইবে? সুতরাং মদনের নামে নালিশ করিয়া উহার। বাড়িখানির দখল লইবার জন্য তিনি কিছুকাল যাবৎ পিতাকে বারবার তাগাদা করিতেছেন। আর ঘোশ মহাশয়ই-বা কতকাল খতখানি ফেলিয়া রাখিবেন? সুতরাং আবার নালিশ হইল। ঘোষ মহাশয় দস্তুরমাফিক ডিক্রি পাইলেন।

এক্ষণে সেই ডিক্রির বাবদে ঘোষ মহাশয় বহু লোকজনসহ মদনের ভিটাবাড়িতে বাঁশগাড়ি করিতে আসিয়াছেন।

মদন আসিয়া ঘোষ মহাশয়ের পায়ের উপর আছাড় খাইয়া পড়িল এবং কহিতে লাগিল, দোহাই বাবু, আমারে এক্কেবারে পথে দাঁড়া করাবেন না বাবু, আপনার পায়ে পড়ি বাবু…

ঘোষ মহাশয় পা টানিয়া কহিলেন, তা আমি কী করব বাপু; তুই টাকাটা এদ্দিন ফেলে রাখলি, যদি কিছু কিছু করে দিয়ে আসৃতিস, তোরও গায়ে লাগত না, আমারও খত তামাদি হত না। খত ফেলে রেখে তো আর আমি টাকাটা খোওয়াতে পারিনে।

মদন কাদিতে কঁদিতে কহিল, বললে বিশ্বাস করবেন না বাবু, আমি দুবেলা দুমুঠো ভাতই জোটাতে পারিনে, পরিবারের পরনে কাপড় দিতে পারিনে, কতে আপনার টাকা দেব…

দিগম্বর ঘোষ ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, হা, ওসব মায়াকান্না রেখে দে! কেন, তোর জোয়ান ব্যাটা রয়েছে, দুই বাপ-পোয়ে তো জন খেটে পয়সা রোজগার করিস–আবার বলে কিনা (মুখ ভ্যাংচাইয়া) দুমুঠো ভাত জোটাতে পারিনে পরিবারের কাপড় দিতে পারিনে!…

মদন কহিল, হায়, হায়, বাবু দ্যাহেন তো বুড়ো হয়ে গিছি, তাতে আজ বছরখানেতে হাঁপানি ব্যারামে এক্কালে কাবু হয়ে পড়িছি–কাজ কত্তি আর পারি নে। একলা ওই ছাওয়ালডা খাটে খাটে আর কত রোজগার কত্তি পারে বাবু? খানেআলা তো এট্টা দুডো না, কেমন করে যে সবগুলোর জান্টা বেঁচে আছে, তা আল্লাই জানে…

নে নে, এখন ওসব প্যান্প্যানানি রাখ। আমার টাকা তো আদায় করতে হবে…।

একান্ত প্রাণের দায়ে মরিয়া হইয়া মদন কহিল, তবে আর কয়ডা দিন রেহাই দেন। কত্তা, আমি এবার না খায়ে, না দায়ে আপনার টাকা কিছু কিছু করে দেব…

ঘোষ মহাশয় অবজ্ঞাভরে কহিলেন, হাঃ, তুই এতদিন বড় দিতে পাল্লি, এখন আবার দিবি! শুধু কথায় কি আর চিড়ে ভিজে রে, মদন!

তবে আমার কী উপায় হবে বাবু–কনে গে দাঁড়াব সব কাচ্চা বাচ্চা নে!

তা আমি কী জানি! তোর যেখানে খুশি সেইখানে যা–এখন এ বাড়ি আমার, আমি দখল করেছি।

এই কথায় মদন আর স্থির থাকিতে পারিল না। উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া উঠিয়া কহিল, ওগো আপনারা পাঁচজন আছেন, এট্টুখানি দয়া করে ওনারে দুটো কথা কয়ে আমারে বাঁচান। গো, আমারে বাঁচান, এ বাপদাদার ভিটেটুকখানি গেলি আমি কম্নে গে দাঁড়াব–হায় রে আল্লা! আমি কম্নে গে দাঁড়াব!

বিরক্ত হইয়া জনার্দন বাবু পেয়াদাকে ডাকিয়া কহিলেন, –নেও, তোমরা বাঁশটা গেড়ে ফেল! এই ব্যাটারা, চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বাজা, ঢোল বাজা!

দমাদম ঢোলে ঘা পড়িতে লাগিল। মদনের মনে হইল, যেন সে ঘা তাহার বুকের ভিতরই পড়িতেছে। সে আবার ডুকরিয়া কাঁদিয়া উঠিল। এদিকে ঘোষ মহাশয় তাহার লোকজন লইয়া তাহার গৃহে প্রবেশ করিতে যাইতেছেন দেখিয়া সে দরজার সম্মুখে আড় হইয়া কহিল, আমার গলায় পা দে দমড়া বার করে ফেলে দেন কত্তা। আমার জানে আর এ সয় না গো, আমার জানে আর সয় না! হায় রে আল্লাহু, আমি কাচ্চা-বাচ্চা বউ ঝি নিয়ে কমে গে দাঁড়াব–ওগো আপনারা দয়া করে আমার হয়ে বাবুকে দুটো কথা কগে! আমার ঝি-বউরে পথে বার করবেন না গো বাবু, এট্টু দয়া করেন বাবু! আমি যে তাগোরে কারো বাড়ি ধান ভানতিও যাতি দেই নি। তাগোর মান-ইজ্জত মারবেন না, হা হা হা!…

পাড়ার একজন মোড়ল এ দৃশ্য আর দেখিতে না পারিয়া দিগম্বর ঘোষের দিকে একটু অগ্রসর হইয়া কহিল, কত্তা বুড়ো মানুষ ডুকরে কাঁদতি লেগেছে, এট্টু দয়া করেন–ওগোরে পথে বের করবেন না…

জনার্দন বাবু রুখিয়া উঠিয়া কহিলেন, ও ব্যাটার কান্নাতেই আমাদের খতের টাকা পরিশোধ হবে নাকি?

মোড়ল মিনতি করিয়া কহিল, না বাবু, আমি সে কথা কই নি। এক্ষণি ওগোরে বাড়ি হতি তাড়াবেন না তাই কই। কিছুদিন সোমায় দিলি ও আপনার এট্টা মাথা গোঁজবার জাগা করে নিতে পারবে…

পাছে বাগানবাড়ির পত্তন করিতে বিলম্ব হইয়া পড়ে, এ ভয়ে জনার্দন বাবু অধীর হইয়া বলিয়া উঠিলেন, না না, ওসব হবে টবে না বাপু। আমরা আজই দখল নেব।

মোড়ল কহিল, তা নেন, কত্তা; কিন্তু ওগোরে দিন কতেক থাতি দেন…

এদিকে মদন দরজার সম্মুখে আড় হইয়া পড়িয়াই আছে। দিগম্বর ঘোষ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়া কহিলেন, ওঠ, নইলে তোকে ডিঙ্গিয়ে আমরা বাড়ির ভিতর ঢুকব…

এই কথায় আরো একজন প্রতিবেশী দয়াপরবশ হইয়া কহিল, ঘোষ মশাই, দখল তো আপনার হলই, তা এখন বাড়ির মদ্দি গে ওগোরে বেইজ্জত করে আর আপনাগোর লাভ কী হবে? এট্টু থামেন, আমরা মদন গাজীর পরিবারগোরে সরায়ে নে যাই। আপনারা যদি দোরডা এট্টু ছাড়েন, তয় আমরা বাড়ি খালি করি।

পেয়াদা তখন বলিয়া উঠিল, আরে, তোমরা সেই ফাঁকে জিনিসপত্তরগুলোও সরাও আর কি?

মদন উঠিয়া বসিয়া বলিয়া উঠিল, হায় হায় প্যাদাজী, জিনিসপত্তর কি কিছু আছে! কিছু নেই রে আল্লা কিছু নেই! বউডোর এট্টা বদনা ছিল, তাও আজ কদ্দিন হল বেচে খাইচি– ছাওয়ালডার জ্বর হল, কদ্দিন কাজে যাতি পাল্লে না, কচি বউডোরে কাঁদায়ে নিজিরগোর প্যাট্টা ভল্লাম–। বলিতে বলিতে বৃদ্ধের শ্বেত শ্মশ্রুজি বাহিয়া দরবিগলিতধারে অশ্রু গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।

এমন সময় বাড়ির ভিতর হইতে স্ত্রীলোকদিগের যুগপৎ ক্রন্দন এবং চিৎকার শোনা গেল। ব্যাপার কী জানিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া মদন তাড়াতাড়ি উঠিয়া বাড়ির ভিতর যাইতেছিল, এমন সময় তাহার বৃদ্ধা স্ত্রী দরজার কাছে আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতে করিতে কহিল, ওগো আল্লা গো, কী হবে গো আমার সাদেক গাঙ্গে ঝাঁপ দেছে গো, –ওরে আমার সোনার যাদু রে– ভিটেমাটি সব গেলে সেই দুঙ্কে আমার যাদু পানিতে ডুব দেছে রে আল্লা! হা হা হা হা…

এদিকে স্ত্রীর মুখে এই কথা শুনিতে শুনিতে হতভাগ্য মদন দড়াম করিয়া আছাড় খাইয়া পড়িল। বাড়ির ভিতরে-বাহিরে একটা শোরগোল পড়িয়া গেল–এক দিক হইতে স্ত্রীলোকেরা অন্য দিক হইতে প্রতিবেশীরা ছুটিয়া দরজার কাছে আসিয়া দেখিল, বৃদ্ধ মদন চৌকাঠের উপর মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়া আছে।

.

০৮.

রসুলপুর গ্রামখানি বেশ বর্ধিষ্ণু। তথায় বহুসংখ্যক উচ্চ শ্রেণীর হিন্দু এবং মুসলমান রইস্ বাস করেন। হিন্দুগণ প্রায় সকলেই সম্পন্ন গৃহস্থ কিন্তু মুসলমান রইসগণের অবস্থা ভালো নহে। তাহাদের অনেকেরই পৈতৃক সম্পত্তি, এমনকি, কাহারো কাহারো বসতবাটীখানি পর্যন্ত রসুলপুরেরই হিন্দু মহাজনদিগের নিকট ঋণদায়ে আবদ্ধ; তথাপি তাহারা সাংসারিক উন্নতির জন্য কোনো প্রকার উদ্যোগ করিবার আবশ্যকতা বোধ করেন না। একমাত্র খোদা ভরসা করিয়াই খোশ মেজাজে বহাল তবিয়তে দিন গুজরান করিয়া থাকেন।

এতদ্ভিন্ন পলাশডাঙ্গা প্রভৃতি নিকটস্থ গ্রামগুলিতে অনেক মুসলমান কৃষক বাস করে। গ্রাম সন্নিহিত বিল এবং ক্ষেত্রগুলি প্রচুর উৎপাদনশীল হইলেও এই সকল হতভাগ্য কৃষকের অবস্থা সচ্ছল নহে। তাহারা যাহা কিছু উপার্জন করে, তাহার অধিকাংশই মহাজনেরা গ্রাস করিয়া বসে; অবশিষ্ট যাহা থাকে, তাহাতে কায়ক্লেশে বৎসরের অর্ধেককাল চালাইয়া বাকি অর্ধেকের খাওয়া-পরার জন্য ইহারা আবার মহাজনের হাতে-পায়ে ধরিতে যায়।

আবদুল্লাহর ফুফা মীর মোহূসেন আলি রসুলপুর গ্রামেরই একজন মধ্যবিত্ত রই। তিনি পৈতৃক সম্পত্তি যাহা পাইয়াছিলেন, তাহা সামান্য হইলেও পাটের করবারে এবং মহাজনিতে বেশ দু পয়সা উপার্জন করিয়া এখানে এ অঞ্চলের মধ্যে একজন ধনী লোক বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মীর সাহেব গৃহশূন্য এবং নিঃসন্তান। লোকে বলিত স্বামী সুদ খান বলিয়া পীরের মেয়ে মনের দুঃখে সংসার ছাড়িয়া গিয়াছেন এবং সুদের গোনায় আল্লাহতালা মীর সাহেবকে সংসারের সুখ হইতে বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছেন।

কিন্তু মহাজনি কারবারে মীর সাহেব নিজগ্রাম অঞ্চলে বড় একটা সুবিধা করিয়া উঠিতে পারেন নাই। তাহার খাতকের প্রায় সকলেই ভিন্ন গ্রামের এবং তাহাদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী মুসলমান। মীর সাহেবের নিকট অনেক কম সুদে টাকা পাইত বলিয়া তাহারা ফি মৌসুমে তাহার নিকট হইতে আবশ্যকমতো টাকা ধার লইত এবং মৌসুমে যথেষ্ট লাভ করিয়া মীর সাহেবের কড়া গণ্ডা বুঝাইয়া দিয়া যাইত।

মধ্যবিত্ত মুসলমান রইস্ যাহাদের একটু আধটু ভূ-সম্পত্তি আছে এবং দরিদ্র মুসলমান কৃষক, গ্রাম্য মহাজনের পক্ষে এই দুই শ্রেণীর লোকের মধ্যে টাকা খাটাইবার যেমন সুবিধা, এমন আর কোথাও নাই। রসুলপুর অঞ্চলে এই শ্রেণীর লোক যথেষ্ট থাকাতে হিন্দু মহাজনেরা বেশ ফাঁপিয়া উঠিতেছেন; কিন্তু তাহার সুদের হার অতি সামান্য হইলেও মীর সাহেব তাহাদের মধ্যে দুইটি কারণে ব্যবসায় জমাইতে পারেন নাই। প্রথমত, রইসগণের প্রায় সকলেই তাহার জ্ঞাতি-কুটুম্ব; সুতরাং তাহার পরম হিতৈষী। কাজেই হিন্দু মহাজনদিগের নিকট হইতে উচ্চ হারের সুদে ঋণ গ্রহণ করিয়া জেরবার হইতেছেন, তথাপি মীর সাহেবকে মহাজনি কারবারে প্রশ্রয় দিয়া তাহাকে জাহান্নামে পাঠাইতে তাহাদের প্রবৃত্তি হইতেছে না। দ্বিতীয়ত, পূর্বপুরুষগণের মনিব বলিয়া কৃষকমহলে রইগণের আজ পর্যন্ত যে প্রভুত্বটুকু টিকিয়া ছিল, তাহারই বলে তাহারা তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিয়াছেন যে, মুসলমান হইয়া যে ব্যক্তি সুদ খায়, সে জাহান্নামী এবং সে জাহান্নামীর সঙ্গে মুসলমান হইয়া যে কারবার করে সেও জাহান্নামে যায়। এই জন্যেই তো সুদখোরের বাড়িতে খাওয়া অথবা তাহাকে বাড়িতে দাওৎ করিয়া খাওয়ানো মস্ত গোনার কাজ। কিন্তু হিন্দুদের যখন ধর্মে বাধে না, তখন সুদ খাইলে তাহাদের কোনো পাপ নাই, সুতরাং লাচারী হালেতে তাহাদের সঙ্গে কারবারেও কোনো দোষ হইতে পারে না।

পাঁচজন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে একত্রে লোক দুর্দশাগ্রস্ত হইয়া পড়ে, এবং সেই অবস্থায়। কয়েক পুরুষ কাটাইয়া দেয়, তখন তাহাদের কেমন একটা দুর্দশার নেশা লাগিয়া যায়– কিছুতেই সে নেশা ছুটিতে চাহে না। ক্রমে মনে এবং দেহে একটা অবসাদ আসিয়া পড়ে, যাহার গতিকে সংসারের দুঃখ-কষ্ট তাহাদের ধাতে বেশ সহিয়া যায়। ইহা অপেক্ষা অধিক। সুখে সংসারে বাস করা সম্ভব যে হইতে পারে, এরূপ কল্পনা তাহাদের মনেও আসে না, কেননা খোদা না দিলে আসিবে কোথা হইতে? এরূপ অবস্থায় খোদার উপর একপ্রকার সম্পূর্ণ নিশ্চেষ্ট নির্ভরের মাত্রা কিছু বেশি হইয়া পড়ে, এবং ইহকালের সচ্ছলতার বিনিময়ে। পরকালে বেহেশতের মেওয়া-জাতের ওপর একচেটিয়া অধিকার পাইবার আশায় ধর্মের বাহ্যিক আচার-নিষ্ঠার বাড়াবাড়িও দেখা গিয়া থাকে।

কিন্তু অপরের সুখস্বচ্ছন্দতার প্রতি বাহ্যত ঔদাসীন্য দেখালেও যে ব্যক্তি অক্ষমতা এবং উদ্যমবিহীনতার দরুন নিজের দুর্দশা ঘুচাইতে পারে না, তাহার আচার-নিষ্ঠার অন্তরালেও অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন লোকের প্রতি একটা ঈর্ষার অস্বচ্ছন্দতা তাহার মনের কোণে সঙ্গোপনে। বিরাজ করিতে থাকিবেই, যাহাদের ওপর ব্যক্তিগত অথবা সামাজিকভাবে কোনো প্রকার শাসন-তাড়না চালাইবার সুযোগ বা সম্ভাবনা না থাকে, তাহাদের ওপর সে ঈর্ষা প্রকাশ তো পায়-ই না বরং উহা আবশ্যকমতো নীচ তোষামোদেও পরিণত হইতে পারে; কিন্তু জ্ঞাতি কুটুম্ব প্রভৃতি যাহাদের উপর একটু আধটু ক্ষমতা চলে, তাহাদের মধ্যে যখন কেহ আত্মোন্নতি করিয়া স্বসমাজে সকলের ওপর টেক্কা মারিবার যোগাড় করিয়া তোলে, তখন সেই গুপ্ত ঈর্ষা তাহার সকল প্রচেষ্টাকে নষ্ট করিয়া দিবার জন্য বিকট মূর্তিতে সকলের মনে স্বপ্রকাশ করিয়া বসে। কাজেই যাহারা দল বাধিয়া একবার মজিয়াছে, শত চেষ্টা করিলেও তাহাদের উদ্ধার পাওয়া কঠিন। কয়েকজন লোক জলে ডুবিলে পরস্পর পরস্পরকে জলের ভিতর টানিয়া রাখিতে চেষ্টা করিয়া থাকে।

রসুলপুরের রইগণও কয়েক পুরুষ ধরিয়া দল বাধিয়া ক্রমাগত মজিয়া আসিতেছেন। ইতোমধ্যে হঠাৎ মীর মোহসেন আলি নিজের চেষ্টায় যখন অবস্থা ফিরাইয়া ফেলিলেন, তখন আর কাহারো পক্ষে তাহাকে সুনজরে দেখিবার সম্ভাবনা রহিল না। তিনি সকলের অপ্রিয় হইয়া উঠিলেন–বিশেষত, তিনি যখন সুদ খাইতে আরম্ভ করিলেন তখন সকলে তাহাকে মনে মনে ঘৃণা করিতে লাগিলেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কেহ তাহাকে অবজ্ঞা করিতে সাহস পাইতেন না, বরং মৌখিক শিষ্টাচারের একটু বাড়াবাড়িই দেখাইতেন। তাহা হইলেও, সামাজিকভাবে তাহার সহিত মেলামেশা সকলে যথাসম্ভব এড়াইয়া চলিতেন।

এদিকে মীর সাহেবের ন্যায় গৃহশূন্য নিঃসন্তানের পক্ষে তো গ্রামের ওপর অথবা বাড়ির ওপর কোনো মায়ার বন্ধন ছিল না; তাই তিনি বৎসরের অধিকাংশ সময় বিদেশে বিদেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। ইহাতে তাহার পাটের কারবারেরও সুবিধা হইত এবং বিদেশে লোকের কাছে খাতিরও পাইতেন বেশ। সুতরাং স্বগ্রাম অপেক্ষা বিদেশই তাহার পক্ষে অধিক বাঞ্ছনীয় হইয়া উঠিয়াছিল। মাসেক দু মাস বিদেশে ঘুরিবার পর তিনি বাটী আসিয়া দশ-পনের দিন থাকিতেন, আবার বাহির হইয়া পড়িতেন।

এইরূপে একবার মাস দুই বিদেশ ভ্রমণের পর বাটী আসিয়া মীর সাহেব আবদুল্লাহর একখানি পত্র পাইয়া অবগত হইলেন যে, তাহার সম্বন্ধী খোন্দকার ওলিউল্লাহ্ পরলোকগমন করিয়াছেন। পত্রখানিতে প্রায় এক মাস পূর্বের তারিখ ছিল–মীর সাহেব ভাবিতে লাগিলেন, এতদিন আবদুল্লাহৃদের কোনো খবর না লওয়াটা বড়ই অন্যায় হইয়া গিয়াছে। যদিও আবদুল্লাহর পিতামাতা সুদখোর বলিয়া মীর সাহেবের ওপর নারাজ ছিলেন এবং স্ত্রীর মৃত্যুর পর হইতে মীর সাহেবের সহিত শ্বশুরালয়ের সম্বন্ধ একরূপ উঠিয়া গিয়াছিল, তথাপি তিনি আবদুল্লাহকে অতিশয়। স্নেহ করিতেন এবং কলিকাতায় গেলে একবার তাহার সহিত সাক্ষাৎ না করিয়া ফিরিতেন না। অবশ্য আবদুল্লাহর সহিত তাহার এই ঘনিষ্ঠতার বিষয় তাহার পিতামাতার নিকট হইতে গোপন রাখা হইয়াছিল; এবং যদিও এক্ষণে মীর সাহেবের গায়ে পড়িয়া খয়েরখাহী দেখাইতে যাওয়াটা আবদুল্লাহর মাতা পছন্দ নাও করিতে পারেন, তথাপি আবদুল্লাহর একটা সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি মন স্থির করিতে পারিতেছেন না। চিঠি তো সে বাড়ি হইতে প্রায় এক মাস পূর্বে লিখিয়াছে; কিন্তু এখন সে কোথায় আছে, তাহা কী করিয়া জানা যায়? এ অবস্থায় একবার পীরগঞ্জেও যাওয়া কর্তব্য কি না মীর সাহেব তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন।

বৈঠকখানার বারান্দায় বসিয়া তিনি মনে মনে এইরূপ আলোচনা করিতেছেন, এমন সময় দেখিতে পাইলেন, একটা লোক ভিজা কাপড়ে হাঁপাইতে হাঁপাইতে তাহারই দিকে আসিতেছে। একটু কাছে আসিলেই তিনি লোকটিকে চিনিতে পারিলেন এবং তৎক্ষণাৎ কী, কী সাদেক গাজী, খবর কী? বলিতে বলিতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন। সাদেক একেবারে ছুটিয়া আসিয়া তাহার পা দুটি জড়াইয়া ধরিল, এবং রুদ্ধ নিশ্বাসে কহিতে লাগিল, দোহাই হুজুর, আমাগোরে রক্ষে করেন…

অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হইয়া মীর সাহেব তাহাকে হাত ধরিয়া উঠাইতে গেলেন, কিন্তু সে কিছুতেই তাহার পা ছাড়িয়া উঠিতে চাহিল না, কেবলই বলিতে লাগিল–আমাগোরে বাঁচান, হুজুর, আমাগোরে বাঁচান।

আরে কী হয়েছে, তাই বল না! আমার সাধ্যে যা থাকে তা করব বলছি–এখন উঠে স্থির হয়ে বসে কথাটা কী বল তো শুনি!

এই কথায় একটু আশ্বস্ত হইয়া সাদেক পা ছাড়িয়া উঠিয়া মাটির উপর বসিতে বসিতে কহিল, আর কি থির হবার যো আছে, হুজুর! দিগম্বর ঘোষ মশায় আমাগোর সব খায়ে বইছেন, এখন বাড়িখানও কোরক দে আজ আসে বাশগাড়ি করতিছেন। আমাগোর কী উপায় হবে, হুজুর! আমাগোর বাঁচান কর্তা। আপনি না হলি আর কেউ বাঁচাতি পারবে না!…

মীর সাহেব তাহাকে বাধা দিয়া কহিলেন, আরে ছি ছি! অমন কথা বলে না সাদেক, বাঁচানেওয়ালা খোদা!–আচ্ছা, কত টাকার দেনা ছিল?

সাদেক কহিল, খতে ল্যাহা ছিল দুইশো তিন কুড়ি, এখন সুদ আর খরচ-খরচা নে মহাজনের দাবি হইছে পাঁশশয় বাইশ টাকা কয় আনা যেনি!…আপনি যদি এট্টু দয়া না করেন মীর সাহেব, তবে আমরা এবার এক্কাল পথে দাঁড়াই…

মীর সাহেব কহিলেন, আচ্ছা তুমি এগোও, –আমি টাকা নিয়ে আসছি।

না, হুজুর, আমি আপনার সাথেই যাব–গাং সাঁতরে আইছি, তাড়াতাড়ি লা পালাম না, কারে কিছু কই নি, পাছে দেরি হয়ে যায়…।

আচ্ছা আচ্ছা, চল, আমি এক্ষুনি টাকা নিয়ে আসছি। বলিয়া মীর সাহেব অন্দরে চলিয়া গেলেন, এবং একটু পরেই কাপড়চোপড় পরিয়া আবশ্যকমতো টাকা লইয়া বাহিরে আসিলেন।

মীর সাহেবের বাড়ির পশ্চাতে বাগানের পরেই তাঁহাদের ঘাট; ঘাটে একখানি ডিঙ্গি নৌকা বাঁধা ছিল, উভয়ে গিয়া তাহাতে উঠিলেন। সাদেক বৈঠা লইয়া বসিলে মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, আচ্ছা সাদেক, তোমাদের এমন দশা হয়েছে, তা এদ্দিন আমাকে একবারও বল নি তো!

সাদেক কহিতে লাগিল, কী করব হুজুর, বাপজী আপনার কাছে আসতি সাওস করেন না। ওই বাদশা মিঞাই তো যত নষ্টের গোড়া–তানিই বাপজীরে আপনার কাছে আসতি মানা করেন। তানারা সাত-পুর্ষে মুনিব; বাপজী কন, কেমন করে তানাগোর কথা ঠেলি!…

আমি তো সেই কালেই কইছিলাম বাপজীরে যে, ও ঘোষের পোর কাছে যাবেন না– ওর যে সুদির খাই বাপই রে! তা, বাদশা মিঞা পরামিশ্যে দে বাজীরে সেই ঘোষের পোর কাছেই নে গেল–তা নলি কি আজ আমাগোর ভিটেমাটি উচ্ছন্ন যায় হুজুর!

বলিতে বলিতে ডিঙ্গি আসিয়া ওপাড়ে ভিড়িল। মীর সাহেব চট করিয়া নামিয়া মদন গাজীর বাড়ির দিকে চলিলেন। সাদেক তাড়াতাড়ি নৌকাখানি বাধিয়া রাখিয়া পশ্চাৎ পশ্চাৎ দৌড়াইয়া গেল।

.

০৯.

সেইদিন বৈকালে আসরের নামায বাদ তসবিটি হাতে ঝুলাইতে ঝুলাইতে বাদশা মিঞা প্রতিবেশী জ্ঞাতি লাল মিঞার বাড়িতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাহার পায়ে এক জোড়া বহু পুরাতন চটি, পরিধানে মার্কিনের থান-কাটা তহবন, গায়ে ঐ কাপড়েরই লম্বা কোর্তা, মাথায় চিকনিয়া চাঁদপাল্লা টুপি তসবির দানাগুলির উপর দ্রুত সঞ্চলনশীল অঙ্গুলিগুলির সহিত ওষ্ঠদ্বয় ঘন কম্পমান।

এইমাত্র লাল মিঞা আসরের নামায পড়িয়া গিয়াছেন–বাদশা মিঞার আগমনে তিনি বাহিরে আসিয়া সালাম-সম্ভাষণ করিলেন, বাদশা মিঞাও যথারীতি প্রতিসম্ভাষণ করিয়া তাহার সহিত বৈঠকখানায় গিয়া উঠিলেন। বৈঠকখানা ঘরটি নিরতিশয় জীর্ণ এবং আসবাবপত্রও তাহার অনুরূপ। বসিবার জন্য একখানি ভগ্নপ্রায় চৌকি—সে এত পুরাতন যে, ধুলাবালি জমিয়া জমিয়া তাহার রং একেবারে কালো হইয়া গিয়াছে। চৌকির উপর একটি শতছিদ্র ময়লা শতরঞ্জি পাতা, তাহার উপর ততোধিক ময়লা দুই-একটা তাকিয়া, উহার এক পার্শ্বে সদ্যব্যবহৃত ক্ষুদ্র জায়নামাজটি কোণ উল্টাইয়া পড়িয়া আছে। মেঝের উপর একটা গুড়গুড়ি, নইচাটিতে এত ন্যাকড়া জড়ানো হইয়াছে যে, তাহার আদিম আবরণের চিহ্নমাত্রও আর দৃষ্টিগোচর হইবার উপায় নাই। গৃহের এক কোণে একটি মেটে কলসি, কোণে একটি বহু টোল-খাওয়া নল-বাঁকা কলাইবিহীন বদনা স্বকৃত কর্দমের উপর কাত হইয়া পড়িয়া আছে।

টলটলায়মান চৌকিখানির করুণ আপত্তির দিকে নজর রাখিয়া উভয়ে সাবধানে তাহাতে উঠিয়া বসিলেন। লাল মিঞা কহিলেন, তারপর, ভাই সাহেব, খবর কী?

অঙ্গুলি এবং ওষ্ঠদ্বয়ের যুগপৎ সঞ্চালন বন্ধ করিয়া বাদশা মিঞা কহিলেন, পলাশডাঙ্গার মদন গাজীর খবর শুনেন নি?

না তো। কেন, কী হয়েছে?

মারা গেছে। বলিয়া তিনি আবার পূর্ববৎ অঙ্গুলি এবং ওষ্ঠ ঘন ঘন চালাইতে লাগিলেন।

মারা গেছে! হঠাৎ মারা গেল কিসে?

ওঃ, সে অনেক কথা। ও দিগম্বর ঘোষের অনেক টাকা ধারত কিনা, তাই দিগম্বর এসেছিল বাড়ি ক্রোক কত্তে। সে কিছুতেই দখল দেবে না, তারপর যখন জোর করে ওদের বাড়ি থেকে বার করে দিতে গেল, তখন ওর ছেলেটা গিয়ে পানিতে পল, আর তাই শুনে মদন অজ্ঞান হয়ে ধড়াস করে পড়ে গেল চৌকাঠের ওপর। তারপর মাথা ফেটে রক্তারক্তি আর কি!

তাইতে ম’ল?

হ্যাঁ, সেই যে পল, আর উঠল না…

আহা! বেচারা বুড়ো বয়সে বড় কষ্ট পেয়েই গেল!

সহানুভূতিসূচক ঘাড় নাড়া দিয়া বাদশা মিঞা কহিলেন, সত্যি, বড় কষ্টটাই পেয়েছে! এদানী তার বড়ই টানাটানি পড়েছিল কিনা?

ছেলেটা যে পানিতে পল বলে তার কী হল?

তা তো আর শুনি নি। সেও গেছে বোধহয়…

আহা! একসঙ্গে বাপ-ব্যাটায় গেল! মুসিবত যখন আসে, তখন এমনি করেই আসে।

বাদশা মিঞা অনুমোদনসূচক মস্তক সঞ্চালন করিয়া কহিলেন, তার আর সন্দেহ কি? বলিয়াই আবার তসবি চালাইতে লাগিলেন।

লাল মিঞা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, বাড়ি ক্রোকের কী হল?

বাদশা মিঞা যেন একটু ক্ষুণ্ণ মনেই কহিলেন, আর ক্রোক কত্তে পাল্লে কই! ওদিকে মীর সাহেব যে কোন্ সন্ধানে ছিলেন তা তিনিই জানেন; ঠিক সময়মতো এসে হাজির আর কি?

তা, তিনি এসে কী কল্লেন?

টাকাটা মিটিয়ে দিলেন আর কি!

লাল মিঞা যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। চোখ তুলিয়া কহিলেন, হ্যাঁ মীর সাহেব!

বাদশা মিঞা গম্ভীরভাবে কহিলেন, হ্যাঁ। তবে ওর ভেতর অনেক কথা আছে। আবার তাহার ওষ্ঠ ও অঙ্গুলি ক্ষিপ্রগতিতে চলিতে আরম্ভ করিল।

লাল মিঞা ঔৎসুক্যে অধীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কী কথা, ভাই, কী কথা?

কিছুক্ষণ আপন মনে তসবি পড়িয়া বাদশা মিঞা কহিলেন, কথা আর কি! যেত ঘোষেদের ঘরে তার বদলে এল এখন মীরের পোর হাতে। সে ঐ ফিকিরেই দিনরাত ফেরে কিনা।

লাল মিঞা একটুখানি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, তাই তো!

বাদশা মিঞার তসবি ঘন ঘন চলিতে লাগিল। একটু পরে তিনি কহিলেন, এর ভেতরে মীরের পোর আরো মতলব আছে…

সাগ্রহে লাল মিঞা জিজ্ঞাসা করিলেন, কী মতলব, ভাই সাহেব?

বাদশা মিঞা স্বর অত্যন্ত নামাইয়া ফিসফিস করিতে করিতে কহিলেন, মদনের ব্যাটার বউকে দেখেছেন?

না।

চাষা হলে কী হয়, দেখতে বেশ!

তাই–কী?

মীরের পোর নজর পড়েছে।

চোখ কপালে তুলিয়া লাল মিঞা কহিলেন, এ্যাঁ, সত্যি নাকি?

কদ্দিন দেখিছি মীরের পো ওপারে গিয়ে সময় নেই অসময় নেই, ঘুরঘুর করে একলাটি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর দেখুন কত লোকের বাড়ি-ঘর-দোর নিলাম হয়ে যাচ্ছে, ক্রোক হচ্চে, কারুর বেলায় কিছু না, ওই মদন গাজীর জন্যেই ওর এত পুড়ে উঠল–কেন? টাকাটা অমনি দিয়ে ফেলে, একটা খতও নিলে না! হাঃ! মীর সাহেব তেমনি তোক আর কি! আর এখন তো খুব সুবিধেই হয়ে গেল! বাপ-ব্যাটা দুজনেই মরেছে। আসল কথা, আমি যা বললাম– দেখে নেবেন।

লাল মিঞা কহিলেন, মীরের পোর ওদিকেও একটু আছে, তা তো আমি জানতাম না! এই জন্যেই আর বেথা কল্লে না, কেবল পথে পথেই ঘুরে বেড়ায়।

সমর্থন পাইয়া বাদশা মিঞা সোল্লাসে কহিলেন, ঠিক বলেছেন, ভাই! ওইটাই আসল কথা। নইলে একলা মানুষ, এত টাকা রোজগারের ফন্দি কেন? তোর বাপু কে খাবে!

ওর পয়সা কি আর কারুর ভোগে লাগবে? খোদা সে পথ যে আগেই মেরে রেখেছেন! হারামের পয়সা ও হারামেই উড়িয়ে দিয়ে যাবে।

বাদশা মিঞা গম্ভীরভাবে স্বীয় মস্তকটি বারকয়েক আঁকা দিয়া অনুমোদন জ্ঞাপন। করিলেন। কিন্তু তাহার ওষ্ঠদ্বয় ও অঙ্গুলি দ্রুতবেগে তসবি পাঠ করিয়া চলিল।

এমন সময় মসজিদ হইতে মগরেবের আযান শোনা যাইতে লাগিল। উভয়েই নীরবে আযান বাদ মোনাজাত করিলেন এবং তাড়াতাড়ি বৈঠকখানা হইতে বাহির হইয়া মসজিদের দিকে প্রস্থান করিলেন।

নামায অন্তে যখন মুসল্লিগণ মসজিদ হইতে একে একে বাহির হইতে লাগিলেন, তখনো। সন্ধ্যার অন্ধকার ভালো করিয়া ঘনায় নাই। মীর মোহসেন আলিও মসজিদে আসিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি একটু বিলম্বে আসিয়া এক প্রান্তে স্থান লইয়াছিলেন, এবং নফল নামায শেষ করিয়া মুদ্রিত নয়নে নীরবে দোয়া দরুদ পাঠ করিতেছিলেন। বাদশা মিঞা বাহিরে আসিবার সময়। অস্পষ্ট আলোকে তাহাকে দেখিতে পাইলেন এবং লাল মিঞার গা টিপিয়া ইশারা করিয়া দেখাইলেন। উভয়ে পরস্পরের দিকে চাহিয়া একটু গূঢ়ার্থসূচক হাস্য করিলেন।

আজকার মদন গাজী সংক্রান্ত ব্যাপারটি সকলের কাছে সালঙ্কারে বর্ণনা করিবার জন্য বাদশা মিঞা উৎসুক হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাই বাহিরে আসিয়া দুই-একজনের সম্মুখে। কথাটি উত্থাপন করিবামাত্র কী হয়েছে? কী হয়েছে? বলিতে বলিতে বহু উৎকণ্ঠ শ্রোতা তাহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। বাদশা মিঞা তাহার ইতিহাস অর্ধেক চোখের ভঙ্গিতে এবং অর্ধেক নিম্ন স্বরে বলিয়া যাইতে লাগিলেন। এদিকে মীর সাহেব মসজিদ হইতে বাহির হইয়া যখন তাহাদের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়া সালাম-সম্ভাষণ করিলেন, তখন সকলে প্রতিসম্ভাষণ। করিয়া, কবে আসিলেন? কেমন আছেন? ইত্যাদি কুশল প্রশ্ন করিলেন; মীর সাহেবও স্মিতমুখে সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া গৃহাভিমুখে গমন করিলেন।

বাটী আসিয়া মীর সাহেব দেখিলেন যে, তাহার বৈঠকখানার বারান্দায় কে একটা লোক বসিয়া আছে। সিঁড়িতে উঠিতে উঠিতে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে হে, অন্ধকারে বসে?

লোকটি কহিল, আমি আলতাফ।

ওঃ, তুমি এসেছ! বেশ, বেশ, বেশ। আমি আরো ভাবছিলাম, তোমাকে ডেকে পাঠাব। ঘরে এস–ওঃ, ঘর যে অন্ধকার, –এই উলফৎ উলফৎ!

উলফৎ নামক তাহার বিহার-নিবাসী ভৃত্যটি অন্য ঘরে বসিয়া বসিয়া তামাক টানিতেছিল। মনিবের ডাকে সে তাড়াতাড়ি হুঁকা রাখিয়া গালভর ধোয়া ছাড়িতে ছাড়িতে ভারী আওয়াজে উত্তর দিল, আওতা হায়, হাজুর।

মীর সাহেব একটু বিরক্ত হইয়া কহিলেন, আরে আওতা কেয়া রে। বাত্তি লাও না! শাম হো গ্যায়া আভতক বাত্তি নেহি দিয়া ঘর মে?।

উলফৎ বাহিরে আসিয়া কহিল, উ কা হায় মেজ পর! তাহার পর ঘর অন্ধকার দেখিয়া অপ্রস্তুত হইয়া বলিয়া উঠিল, আরে বুত গইল! হম্‌ তো হারকেল জ্বালকে মে হী পর ধর দিয়া রাহা।

মীর সাহেব একটু হাসিয়া কহিলেন, হ, হাঁ, বুত তো গইল, আভ ফের জ্বালা দেই তো আচ্ছা ভইল।

মনিব তাহার ভাষা লইয়া মধ্যে মধ্যে এইরূপ পরিহাস করিতেন, তাহাতে উফৎ শুধু একটু হাসিত, কখনো বেজার হইত না। সেও একটুখানি হাসিয়া কহিল, আবহী জ্বালা দেতা হাজুর।

আলো জ্বালা হইলে মীর সাহেব আলতাফকে সঙ্গে লইয়া ভিতরে গিয়া বসিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের কলেজ খোলে নি?

আলতাফ কহিলেন, জি না, এই সোমবারে খুলবে। মীর সাহেব কহিলেন, তবু ভালো! আমার এবার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেল, তাই ভাবছিলাম বুঝি এদ্দিন কলেজ খুলে গেছে। যা হোক বেশি দেরিও তো আর নেই। আজ হল গিয়ে বিষবার, মধ্যে আর তিন দিন আছে। কবে রওয়ানা হবে?

আমার তো ইচ্ছে কাল বাদজুমা রওয়ানা হই; কিন্তু বাপজানের যে মত হয় না।

কেন?

তিনি আমাকে তো আর পড়তেই দিতে চান না। বলেন, এনট্রেন্স পাস করেছিস ঐ ঢের হয়েছে, এখন একটা দারোগাগিরি-টিরির চেষ্টা দেখ।

তা তুমি কী ঠিক করেছ?

আমার তো ইচ্ছে এফ.এ টা পাস করি। এঞ্জামিনের তো আর বেশি দেরি নেই, এই কটা মাস…

মীর সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন, এফ.এ টা যদি পাস কত্তে পার তবে কী করবে?

আলতাফ একটু আমতা আমতা করিয়া কহিল, বি. এ. পড়তে পাল্লে তো ভালোই হত, তবে…

তবে আবার কী, তুমি যদি পড়তে চাও, তবে আমি যদ্দিন বেঁচে আছি, তোমাকে যেমন খরচ দিচ্ছি, তেমনই দেব। সেজন্যে কিছু ভেবো না।

বাপজান যে বড় গোলমাল করেন। ঐ তারাপদ বাবুর ছেলে সুরেন দারোগা হয়েছে কিনা, আর উপায়ও কচ্ছে খুব, তাই দেখে তিনি আমাকেও ঐ কাজে ঢুকবার জন্যে কেবলই জেদ কচ্ছেন।

আচ্ছা বাদশা মিঞাকে আমি ভালো করে বুঝিয়ে দেবখন। খরচপত্রের জন্যে তো আর এখন আটকাচ্ছে না, কেন মিছেমিছি পড়া বন্ধ করে ভবিষ্যৎ মাটি করা! আর দারোগগিরি ফারোগিরি ও-সব কাজে যেয়ো না–ওতে গেলে মানুষ একেবারে মাটি হয়ে যায়।

জি না, আমার তো ইচ্ছে না, কেবল বাপজানই জেদ করেন কিনা, তাই বলছিলাম।

আচ্ছা আমি তাঁকে কালই বলব। আমার আবার একটু পীরগঞ্জে যাবার ইচ্ছে ছিল। মনে করেছিলাম, কালই রওয়ানা হব। থাক একটা দিন পরে গেলেও ক্ষেতি হবে না। তা। তুমি এক কাজ কর না কেন, পরশু আমার নৌকাতেই চল তোমাকে বরিহাটীতে নামিয়ে দিয়ে যাব।

আলতাফ তাতেই সম্মত হইয়া কহিল, জি আচ্ছা, পরশু আপনার সঙ্গেই যাব।

মীর সাহেব একটু চিন্তা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আহমদ আলি-টালি ওদের কোনো খবর পেয়েছ?

জি না, আহ্মদ আলির কোনো খবর পাই নি, তবে আবদুল বারীর পত্র পেয়েছি। সেও আজ-কাল রওয়ানা হবে।

দু মাস থেকে ওদের কারুর টাকা দেওয়া হয় নি। তা কলকেতায় গেলে পরে পাঠিয়ে দিলে চলবে না?

তা চলতে পারে। কিন্তু আমার পথ-খরচের টাকা নেই–বাপজান বললেন, তাঁর হাত বড় টানাটানি…

ওঃ, আচ্ছা আমি গোটা পাঁচেক টাকা দেব–পরশুই দেব–একসঙ্গেই তো যাওয়া হবে। আর তোমরা কলকেতায় গিয়ে এই হপ্তাখানেকের মধ্যেই টাকা পাবে। ওদেরও বলে দিও।

জি আচ্ছা। তবে এখন উঠি, রাত হল…

আচ্ছা এস।

আলতাফ কিঞ্চিৎ মাথা নোয়াইয়া আদাব করিয়া বিদায় লইল।

.

১০.

প্রাতে ঘুম ভাঙিলে আবদুল্লাহ্ দেখিল খোলা জানালার ভিতর দিয়া ঘরে রৌদ্র আসিয়া পড়িয়াছে। না জানি কত বেলা হইয়া গিয়াছে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল; কিন্তু পার্শ্বে সালেহাকে দেখিতে না পাইয়া মনে মনে কহিল, দেখ তো, কী অন্যায়! কখন উঠে গেছে অথচ আমাকে ডেকে দিয়ে গেল না।

প্রতিদিন ভোরে ওঠা যাহাদের অভ্যাস, হঠাৎ একদিন উঠিতে বিলম্ব হইয়া গেলে সে নিজের ওপর তো চটেই পরন্তু যে লোক ইচ্ছা করিলে তাহাকে সময়মতো তুলিয়া দিতে পারিত, অথচ দেয় নাই, তাহারও উপর চটিয়া যায়। তাই, সালেহাকে বেশ একটু বকিয়া দিতে হইবে এইরূপ সঙ্কল্প করিতে করিতে আবদুল্লাহ্ পরদা সরাইয়া খাট হইতে নামিয়া আসিল। সালেহার বাঁদী বেলা রাত্রে সেই ঘরে শুইত; আবদুল্লাহ্ তাহাকে ডাকিতে গিয়া দেখিল, সেও ঘরে নাই! মনে মনে ভারি বিরক্ত হইয়া আবদুল্লাহ্ আপনাআপনি বলিয়া উঠিল, কী মুশকিল, আমি এখন বাইরে যাই কী করে!

একটু ভাবিয়া আবদুল্লাহ্ দরজার নিকট আসিল এবং কপাট দুটি সামান্য একটু ফাঁক করিয়া উঁকি মারিয়া দেখিতে চেষ্টা করিল, কেহ কোথাও আছে কি না। ভালো করিয়া দরজার বাহিরে মুখ বাড়াইতে তাহার সাহসে কুলাইল না; কী জানি যদি এমন কোনো স্ত্রী-পরিজনের। সহিত তাহার চোখাচোখি হইয়া যায়, যিনি তাহাকে দেখা দেন না, তাহা হইলে ভয়ঙ্কর লজ্জার কথা হইবে।

কিন্তু আবদুল্লাহ্ কাহারো সাড়াশব্দ পাইল না। যদিও রৌদ্রে উঠান বেশ ভরিয়া গিয়াছে, তথাপি বাড়িসুদ্ধ সকলকে নিদ্রিত বলিয়াই বোধ হইল। বেলা দেড় প্রহরের পূর্বে ইহাদের শয্যাত্যাগের নিয়ম নাই; তবে যাহারা নিতান্তই ফজরের নামায কাযা করিতে চাহেন না, তাহারা ভোরে একবার শয্যাত্যাগ করেন বটে, কিন্তু নামায পড়িয়াই আবার আর এক কিস্তি নিদ্রা দিয়া থাকেন। সুতরাং এ সময়ে একা একা সটান বাহিরে চলিয়া গেলেও কোনো অদ্রষ্টব্যা পুর-মহিলার সাক্ষাতে পড়িয়া অপ্রস্তুত হইবার সম্ভাবনা নাই। আবদুল্লাহ্ একবার ভাবিল, তাহাই করা যাউক; কিন্তু পরক্ষণেই তাহার খেয়াল হইল, একজন পথপ্রদর্শকের সাহায্য ব্যতিরেকে শ্বশুর-দুর্গের প্রাঙ্গণ অতিক্রম করা জামাতার পক্ষে গুরুতর অশিষ্টতা। কাজেই, বাহিরে যাইবার জরুরি তলব থাকিলেও তাহাকে আপাতত নিশ্চেষ্ট হইয়া শয্যাপ্রান্তে বসিয়া থাকিতে হইল।

একটু পরেই হালিমা দরজার কাছে আসিয়া মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, ভাইজান, উঠেচেন?

হ্যাঁ, এস হালিমা।

হালিমা ভিতরে আসিয়া কহিল, এই একটু আগেই একবার ডেকে গিইছি, তখন আপনার কোনো সাড়া পাই নি।

আজ উঠতে বড্ড বেলা হয়ে গেছে। তোমার ভাবী কোন্ সকালে উঠে গেছে, তা আমাকে তুলে দিয়ে যায় নি…

অনেক রাত্রে শুয়েছিলেন, তাই বোধহয় তিনি আপনার ঘুম ভাঙান নি…

সে গেল কোথায়?

বোধহয় আমার ঘরে গিয়ে ঘুমুচ্ছেন…

আর আমি এখানে একলা একলা বসে ফ্যা ফ্যা কচ্চি! একটু বাইরে যাব, তা একটা লোক পাচ্ছি নে যে আমাকে নিয়ে যায়…

কেন, বেলা ছুঁড়িটা কোথায় গেল?

কেমন করে বলব কোথায় গেল! ওই যে তার মাদুর পড়ে আছে, কিন্তু তার দেখা নেই!

এ বাটীর দস্তুর এই যে বিবি স্বয়ং উপস্থিত না থাকিলে কোনো বাঁদীকে স্বামীর ঘরে থাকিতে দেওয়া হয় না। এই কথা মনে করিয়া হালিমা কহিল, ওঃ, তাকে তবে ভাবী সাহেবা উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। আচ্ছা, আমিই আপনাকে পার করে দিচ্ছি, চলুন। এখনো কেউ ওঠেন নি, খবর দেওয়ার দরকার হবে না।

এই বলিয়া হালিমা ভ্রাতাকে সঙ্গে লইয়া বাহিরে আসিল এবং এদিক-ওদিক চাহিয়া কহিল, যান। আবদুল্লাহ বাহিরে চলিয়া গেল।

বহির্বাটী তখনো নিস্তব্ধ; কেবল খোদা নেওয়াজ কুয়ার নিকটে বসিয়া কর্তার কাটি মাজিতেছিল। আবদুল্লাহ কুয়ার দিকে অগ্রসর হইয়া কহিল, আদাব, ভাই সাহেব!

আবদুল্লাহর অভিবাদনে খোদা নেওয়াজ যেন একটু ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া কহিল, আদাব, আদাব! আসুন দুলা মিঞা। পানি তুলে দেব কি?

আবদুল্লাহ্ কহিল, না, না, ভাই সাহেব, আপনি কষ্ট করবেন না, চাকরদের কাউকে ডেকে দিন?

বাঁদী-পুত্র বলিয়া খোদা নেওয়াজকে সকলেই প্রায় বাড়ির চাকরের মতোই দেখিত; কেহ তাহাকে আপনি বলিয়া কথা কহিত না, অথবা ব্যবহারেও কোনো প্রকার সম্ভ্রমের ভাব দেখাইত না। কিন্তু তাহার সহিত আবদুল্লাহর ব্যবহার স্বতন্ত্ররূপ ছিল; বড় সম্বন্ধী বলিয়া তাহাকে যথারীতি সম্মান করিতে ক্রটি করিত না। ইহাতে খোদা নেওয়াজ যেমন একটু সঙ্কোচ বোধ করিত, তেমনই আবদুল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধায় তাহার চিত্ত ভরিয়া উঠিত। সে তাড়াতাড়ি হুঁকাটি ধুইতে ধুইতে কহিল, না না, কষ্ট কিসের! আপনার জন্যে একটু পানি তুলে দেব, তাতে আবার কষ্ট!

এই বলিয়া খোদা নেওয়াজ কাটি রাখিয়া পানি উঠাইবার জন্য বালতির দড়ি গুছাইতে লাগিল।

আচ্ছা, আপনি পানি তুলুন, আমি বদনাটা নিয়ে আসি। এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ বৈঠকখানার দিকে অগ্রসর হইল। খোদা নেওয়াজ উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিল, না না, দুলা মিঞা আপনি দাঁড়ান, আমিই বদনা এনে দিচ্ছি।

চাকরদিগের ঘরে তখন দুই-এক জন উঠিয়া বসিয়া ধূমপান প্রভৃতির সাহায্যে আলস্য দূর করিতেছিল। খোদা নেওয়াজের কথা শুনিতে পাইয়া তাহারা বাহিরে আসিল, এবং একজন দৌড়িয়া গিয়া বদনা আনিয়া দিল। বদনায় পানি ভরিয়া দিয়া খোদা নেওয়াজ তাহাকে কহিল, যা তো কালু, বদনাটা পায়খানায় দিয়ে আয়।

আরে না, না; নবাবির কাজ নেই–আমিই বদনা নিয়ে যাচ্চি।–এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ বদনা লইতে গেল, কিন্তু কালু চট করিয়া বদনাটা তুলিয়া লইয়া পায়খানার দিকে অগ্রসর হইল।

মুখ হাত ধুইয়া আবদুল্লাহ্ খোদা নেওয়াজকে জিজ্ঞাসা করিল, বড় মিঞা সাহেব এখনো ওঠেন নি?

খোদা নেওয়াজ কহিল, বোধ করি এতক্ষণ উঠেছেন; এমনি সময়ই তো ওঠেন।

তিনি থাকেন কোন ঘরে?

খোদা নেওয়াজ একটুখানি হাসিয়া কহিল, তার নতুন মহলে। সেই পাছ-দুয়ারের ঘরখানায় যেখানে মেয়েরা বসে পড়ে…।

ও! আচ্ছা তাঁর কাছে একবার যাই আর আমাদের নতুন ভাবী সাহেবার সঙ্গে আলাপ করে আসি…

যান, কিন্তু সে দেখা দিলে হয়…

কেন, কেন?

সে যে এখন বিবি হয়েছে!…

আবদুল্লাহ্ সকৌতুকে কহিল, বটে নাকি?

দেখতেই পাবেন এখন।

বাটীর পশ্চাৎ দিকের বাগানের ভিতর দিয়া আবদুল্লাহ্ বড় মিঞার মহলে আসিয়া উপস্থিত হইল। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। আবদুল মালেক জাগিয়াছে, কিন্তু এখনো শয্যা ত্যাগ করে নাই। পেচোয়ানের অগ্রভাগ হাতে ধরিয়া, মুখনলটি ঠোঁটের উপর রাখিয়া সে আসন্ন ধূমপানের গৌরচন্দ্রিকা ভাজিতেছিল। তাঁহার সদ্য-নিকায়িতা সহধর্মিণী গোলাপী খাটের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া কলিকায় ফুঁ দিতেছিল; বারান্দায় কাহার পদশব্দ শুনিয়া ঘাড় ফিরাইতেই আবদুল্লাহর সহিত তাহার চোখাচোখি হইয়া গেল। অমনি পুরা দেড় হাত ঘোমটা টানিয়া তাড়াতাড়ি কলিকাটি হুঁকার মাথায় দিয়া ঘরের কোণে গিয়া পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইল।

আবদুল মালেক একটু ব্যস্ত হইয়া, কে? কে? বলিতে বলিতে বিছানায় উঠিয়া বসিল। আবদুল্লাহ্ দরজার কাছে দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আসতে পারি, ভাই সাহেব?

আরে তুমি দুলা মিঞা? তুমি আসবে, তা ধরগে’ তোমার আসতে পারিটারি আবার কেন?

কী জানি, নতুন ভাবী সাহেবা পাছে কিছু মনে করেন–বলিতে বলিতে আবদুল্লাহ্ ঘরের ভিতর উঠিয়া আসিল।

না, না, ও ধরগে’ তোমার কী মনে করবে–বরাবর তো ধরগে’ তোমার দেখা দিয়ে এসেছে…।

এদিকে দরজা খোলসা দেখিয়া গোলাপী এক দৌড়ে পলাইয়া গেল। আবদুল্লাহ কহিল, ঐ দেখুন ভাই সাহেব, যা বলেছিলাম!

আবদুল মালেক এক গাল হাসিয়া কহিল, হেঁ, হেঁ, তা এখন ধরগে’ তোমার একটু লজ্জা করবে বৈকি? তোমার বড় ভাবী যখন তোমাকে দেখা দেন না, তখন ধরগে’ তোমার…।

তা তো বটেই, তা তো বটেই! বলিতে বলিতে আবদুল্লাহ্ শয্যাপ্রান্তে বসিয়া পড়িল। আবদুল মালেক সজোরে তামাক টানিতে লাগিল।

আবদুল্লাহর ইচ্ছা হইতেছিল যে, একবার সেই চিঠিখানার কথা তুলিয়া আবদুল মালেককে একটু ভর্ৎসনা করিয়া দেয়; কিন্তু আবার ভাবিল, তাহাতে কোনো লাভ হইবে না। চিঠি খোলার যে কী দোষ, তাহা তো উহার ন্যায় কুশিক্ষিত কুসংস্কারসম্পন্ন লোককে বুঝানো যাইবেই না, বরং এই কথা লইয়া হয়তো একটা মন কষাকষির সূত্রপাত হইতে পারে। সুতরাং সে কথা মনে মনে চাপিয়া গিয়া আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কর্তা কি আজকাল বাইরে আসেন?

আবদুল মালেক কহিল, হ্যাঁ, আজ কদিন থেকে আসছেন একবার করে।

কখন?

এই সকালেই। বাইরেই এসে নাশতা করেন। কেন, কোনো কথা আছে নাকি?

আছে কিছু কথা।

ঔৎসুক্যের ঝোঁকে বেশ একটুখানি চঞ্চলতা দেখাইয়া আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিল, কী কথা, এ্যাঁ? কী কথা?

এমন কিছু না; এই কী করব না-করব তারই পরামর্শের জন্যে।

ওঃ, তারই জন্যে! বলিয়া আবদুল মালেক একটুখানি সোয়াস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া আবার সজোরে তামাক টানিতে লাগিল। দুই-চারি টান দিয়াই সে আবার কহিল, তা তোমাদের জাত-ব্যবসায় ধর না কেন?

কথাটির ভিতরে আবদুল্লাহ্ বেশ একটুখানি শ্লেষের ইঙ্গিত অনুভব করিলেও সে মনোভাব চাপিয়া রাখিয়া কহিল, নাঃ, ওটা আমার করবার ইচ্ছে নেই।

তবে কী করবে?

এ প্রসঙ্গ লইয়া আর নাড়াচাড়া করিবার ইচ্ছা আবদুল্লাহর আদৌ ছিল না; তাই সে কহিল, দেখি আমার শ্বশুর সাহেবের কী মত হয়।

আবদুল মালেক একটা  বলিয়া পুনরায় পেচোয়ানে মনোনিবেশ করিল এবং খুব জোরের সহিত টান দিতে লাগিল। অবশেষে একটি সুদীর্ঘ সুখটান দিয়া গাল-ভরা ধোয়া ছাড়িতে ছাড়িতে কহিল, এইবারে উঠি, মুখ-হাত ধুয়ে নিই। কী জানি ধরগে’ তোমার আব্বা যদি বৈঠকখানায় এসে পড়েন, তবে এক্ষুনি নাশতার ডাক পড়বে।

নলটি বিছানার উপরে ফেলিয়া দিয়া আবদুল মালেক নামিয়া পড়িল। আবদুল্লাহ্ও তাহার সঙ্গে উঠিয়া বাহিরে আসিল এবং বৈঠকখানার দিকে চলিয়া গেল।

১১-১৫. বৈঠকখানার এক প্রান্তে

বৈঠকখানার এক প্রান্তে তখন এ বাটীর পারিবারিক মক্তব বসিয়া গিয়াছে। একখানি বড় অনতিউচ্চ চৌকির উপর ফরুশ পাতা; তাহারই উপর বসিয়া পূর্বাঞ্চল-নিবাসী বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব আরবি, ফারসি এবং উর্দু সবকের রাশিতে ছোট ছোট ছেলেদের মাথা ভরাট করিয়া দিতেছেন। বাটীর ছোট ও মাঝারি পাঁচ-ছয়টি, প্রতিবেশীদিগের মাঝারি ও বড় আট দশটি ছেলে সুরে-বেসুরে সবক ইয়াদ করিতে লাগিয়া গিয়াছে। বাড়ির ছেলেগুলি মৌলবী সাহেবের সহিত একাসনে বসিয়াছে, কিন্তু অপর সকলকে ফশের সম্মুখে মেঝের উপর মাদুর পাতিয়া বসিতে হইয়াছে।

মৌলবী সাহেব প্রত্যহ এখানে বসিয়া এই ক্ষুদ্র মক্তবটি চালাইয়া থাকেন। এতদ্ভিন্ন। তাহাকে বৈকালে আরো একটি ক্ষুদ্র বালিকা-মক্তব চালাইতে হয়। যে ঘরটিতে আবদুল মালেক আজকাল অধিষ্ঠিত হইয়া আছেন, সেটি একটু নিরালা জায়গায় বলিয়া বাড়ির খুব ছোট ছোট মেয়েরা সেইখানে বসিয়া মৌলবী সাহেবের নিকট সবক গ্রহণ করে। এইজন্য বহির্বাটীর অপর কোনো পুরুষের সেখানে গতিবিধি একেবারে নিষিদ্ধ। মৌলবী সাহেব একে বৃদ্ধ, তাহাতে বহুকাল যাবৎ বাটীর লোকের মধ্যেই গণ্য হইয়া উঠিয়াছেন বলিয়া আট বৎসরের অধিক বয়স্কা বালিকাদিগকে সবক দিবার অধিকারটুকু প্রাপ্ত হইয়াছেন। পরম দীনদার লোক বলিয়া সকলেই এমনকি খোদ্ সৈয়দ সাহেব পর্যন্ত তাহার খাতির করেন।

আবদুল্লাহ্ বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়া আসোলামু আলায়কুম বলিয়া মৌলবী সাহেবকে সম্ভাষণ করিল। মৌলবী সাহেব তাড়াতাড়ি উঠিয়া ওয়ালায়কুম সালাম বলিয়া প্রতিসম্ভাষণ করিলেন, সঙ্গে সঙ্গে বালকেরাও দাঁড়াইয়া উঠিয়া সমস্বরে ওস্তাদজীর অনুকরণে অভ্যাগতের সংবর্ধনা করিল। অতঃপর মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর সহিত মোসাফা করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিলেন।

কবে আসলেন দুলহা মিঞা? তবিয়ত বালো তো?

এই কাল সন্ধ্যাবেলায় এসেছি। ভালোই আছি। আপনি কেমন আছেন মৌলবী সাহেব?

বালোই! হলাম আপনার ওয়ালেদ সাহেব এন্তেকাল ফর্মাইছেন?

জি হাঁ।

আচানক? খি বেমারী আসর খছিল তানিরে?

এই জ্বর আর কি?

মৌলবী সাহেব তাঁহার সুদীর্ঘ শ্বেত শ্মশ্রুরাশির মধ্যে অঙ্গুলি চালনা করিতে করিতে গভীর দুঃখ ও সহানুভূতির সুরে কহিলেন, আহা, বরো নেক বান্দা আছিলেন তিনি। আমারে বরো বালা জানাতেন। এ বারি আইলেই আমার লগে এক বেলা বইস্যা আলাপ না কইর‍্যা যাইতেন না!

এদিকে বালকগুলি দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া হাঁ করিয়া ইহাদের আলাপ শুনিতেছিল। হঠাৎ সেদিকে মৌলবী সাহেবের মনোযোগ আকৃষ্ট হওয়ায় তিনি ধমক দিয়া কহিলেন, বহ, বহ্, তরা সবক পর। বইঅ্যান, দুলহা মিঞা, খারাইয়া রইল্যান?

আবদুল্লাহ্ ফরশের উপর উঠিয়া বসিল, মৌলবী সাহেবও তাহার পার্শ্বে বসিলেন। ওদিকে বালকের দল আরবি, ফারসি এবং উর্দুর যুগপৎ আবৃত্তির অদ্ভুত সম্মিলিত কলরবে বৈঠকখানাটি মুখরিত করিয়া তুলিল।

আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষণ মনোযোগের সহিত উহাদের পাঠ শ্রবণ করিল। পরে কে কী কেতাব পড়ে, কোন ছেলেটি কেমন, ইত্যাদি বিষয় মৌলবী সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। বাড়ির ছেলেগুলি বয়সে ছোট হইলেও, অপর ছেলেদের অপেক্ষা অনেক বেশি পড়িয়া ফেলিয়াছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, ও বেচারারা এত পিছনে পড়ে আছে। কেন, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব নিতান্ত অবজ্ঞাভরে কহিলেন, অঃ, অরা? অরা আর খি খম্‌ ফারে? অরূগো কি জেহেন আছে দুলহা মিঞা সাব! বচ্ছর বচ্ছর খায়দা বোগদাদী আর আম্‌ফারা লইয়া গঁাগোর গ্যাগোর খরুতে আছে। সবক এয়াদই খতাম্ ফারে না…।

আচ্ছা দেখি বলিয়া আবদুল্লাহ উহাদের নিকটে গিয়া দুই একটি বালককে পরীক্ষা করিতে আরম্ভ করিল। দেখিল উহারা যে সবকটুকু পাইয়াছে, সেটুকু মন্দ শিখে নাই। নানারূপ জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া আবদুল্লাহ্ বুঝিতে পারিল যে, ইহারা বহুদিন অন্তর নূতন সবক পাইয়া থাকে; তাও যেটুকু পায়, সে অতি সামান্য। এই হতভাগ্য বালকগুলি ওস্তাদজীর চেষ্টাকৃত অবহেলায় মারা যাইতেছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ উঠিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওদের বুঝি রীতিমতো সবক দেন না, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব চট করিয়া বলিয়া উঠিলেন, দিমু না কিয়েল্লাই? ইয়াদ খরতাম্ ফারে না তো!

আবদুল্লাহ্ প্রতিবাদ করিল, কেন পারবে না, মৌলবী সাহেব, আমি তো যে কয়টাকে দেখলাম, তারা তো কয়েকটা সুরা বেশ শিখেছে!

বৃদ্ধ একটু চঞ্চল হইয়া কহিলেন, হে, যে ইয়াদ খরতাম্ ফারে, হে ফারে! আর হগ্‌গোলে ফারে চীখার ফারবার। আয় তো দেহি কলিমুদ্দীন তর সবক লইয়া।

কলিমুদ্দীন নামক একটি দশ কি এগার বৎসরের বালক আম্পারা ও পান্দেনামা হাতে লইয়া মাদুরাসন হইতে উঠিয়া আসিল। মৌলবী সাহেব তাহাকে আদেশ করিলেন, ক তো দেহি, খয় সুরা ইয়াদ খছস?

বালকটি গড়গড় করিয়া অনেকগুলি সুরা মুখস্থ বলিয়া গেল। পরে আবদুল্লাহর নির্দেশক্রমে পান্দেনামা হইতেও কয়েকটি বয়েত আবৃত্তি করিল। ছেলেটি মেধাবী বলিয়া মৌলবী সাহেব যে তাহাকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারেন নাই, তাহা বেশ বুঝা গেল।

আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিল, এরা এসবের মানেটানে কিছু বোঝে?

মৌলবী সাহেব দারুণ তাচ্ছিল্যের সহিত কহিলেন, হঃ, মানি বুজবো! হেজেমতনই খরুতে মুণ্ডু গুইর্যা যায়, তা আবার মানি বুজবো! খি বা খন্ দুলহা মিঞা! ইয়ার মইদ্দে আরো খতা আছে দুলহা মিঞা, বোজলেন? খতা আছে! বলিয়া মৌলবী সাহেব গূঢ়ার্থসূচক ভঙ্গিসহকারে মস্তক সঞ্চালন করিলেন।

আবদুল্লাহ্ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কী কথা, মৌলবী সাহেব?

কলিমুদ্দীন তাহাদের সম্মুখে এতক্ষণ দাঁড়াইয়া ছিল। মৌলবী সাহেব তাহাকে এক ধমক দিয়া কহিলেন, যা-যাঃ–সবক ইয়া কর্‌ গিয়া।…

তাড়া খাইয়া বেচারা গিয়া স্বস্থানে বসিয়া আবার অপরাপর বালকগণের কলরবে যোগদান করিল।

মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর আরো কাছে ঘেঁষিয়া আসিয়া ফিসফিস করিয়া কহিতে লাগিল, খতাড়া খি, বোজুলেননি, দুলহা মিঞা? অরা অইলো গিয়া আাফগোর ফোলাফান, অরা এইসব মিয়াগোরের হমান হমান চলতাম্ ফারে? অবৃগো জিয়াদা সবক দেওয়া মানা আছে, বোজুলেননি?

কার মানা?

খোদ্ সাবের! তিনি আইস্যা দহলিজে বইস্যা বইস্যা হুনেন, খারে খি সবক দি না দি।

এতক্ষণে আবদুল্লাহ্ এই পাঠদান-কৃপণতার মর্ম হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইল। পাছে প্রতিবেশী সাধারণ লোকের ছেলেরা নিজের ছেলেদের অপেক্ষা বেশি বিদ্যা উপার্জন করিয়া বসে, সেই ভয়ে তাহার শ্বশুর এইরূপ বিধান করিয়াছেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তা ওদের পড়তে আসতে দেন কেন? একেবারেই যদি ওদের না পড়ানো হয়, সেই ভালো নয় কি?

এই কথায় মৌলবী সাহেবের হৃদয়ে করুণা উথলিয়া উঠিল। তিনি কহিলেন, অহহঃ, হেডা কাম বালা অয় না, দুলহা মিঞা! গরিব তাবেলম হিক্রবার চায়, এক্কেকালে নৈরাশ করলে খোদার কাছে কী জবাব দিমু? গোম্রারে এলেম দেওনে বহুত সওয়াব আছে কেতাবে ল্যাহে।

মৌলবী সাহেবের কেতাবের জ্ঞানের বহর এবং তাহার প্রয়োগের প্রণালী দেখিয়া আবদুল্লাহ্ মনে মনে যথেষ্ট কৌতুক অনুভব করিতেছিল, এমন সময় কর্তা সৈয়দ আবদুল কুদ্দস সাহেব ধীরে ধীরে লাঠি ভর করিয়া বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন।

.

১২.

সৈয়দ সাহেবকে আসিতে দেখিয়া সকলে উঠিয়া দাঁড়াইল। আবদুল্লাহ্ একটুখানি মাথা নোয়াইয়া আদাব করিল, কিন্তু মৌলবী সাহেব পরম সম্ভ্রমে আভূমি অবনত হইয়া তাহাকে আদাব করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হুজুরের তবিয়ত বালা তো?

সৈয়দ সাহেব উভয়ের আদাব গ্রহণ করিয়া, বৈঠকখানার অপর প্রান্তস্থ প্রশস্ত ফশের উপর উঠিয়া বসিতে বসিতে একটু ক্ষীণস্বরে কহিলেন, হ্যাঁ, একরকম ভালোই, তবে কমজোরীটা যাচ্ছে না…

মৌলবী সাহেব সহানুভূতির ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, –অহঃ, হুজুর যে বেমারী কাটাইয়া উঠছেন, তাই খোদার কাছে শোকর করন লাগে। খুজুরী অইবই! তা অডা যাইব গিয়া খাইতে লইতে।

সৈয়দ সাহেব জামাতার দিকে চাহিয়া কহিলেন, –এস বাবা, বস।

আবদুল্লাহ্ বড় ফশের উপর উঠিয়া বসিল। মৌলবী সাহেব তাহার ছাত্রদিগের নিকট ফিরিয়া গেলেন, এবং ছাত্রেরা দ্বিগুণ উৎসাহের সহিত দুলিয়া দুলিয়া সবক ইয়াদ করিতে লাগিল।

শ্বশুরকে একাকী পাইয়া আবদুল্লাহ্ তাহার পড়াশুনার কথা বলিবার জন্য উৎসুক হইয়া উঠিল। কী বলিয়া কথাটি তুলিবে, মনে মনে তাহারই আলোচনা করিতেছিল, এমন সময় তাহার শ্বশুর জিজ্ঞাসা করিলেন, –তা, এখন কী করবেটরবে কিছু ঠিক করেছ, বাবা?

শ্বশুর আপনা হইতেই কথাটি পাড়িবার পথ করিয়া দিলেন দেখিয়া সোৎসাহে আবদুল্লাহ্ কহিলেন, জি, এখনো কিছু ঠিক করতে পারি নি; তবে পরীক্ষেটার আর ক মাস মাত্র আছে, এ কটা মাস পড়তে পাল্লে বোধহয় পাস করতে পারতাম…

তা বেশ তো! পড় না হয়…

কিন্তু খরচ চালাব কেমন করে তাই ভাবছি। হুজুর যদি মেহেরবানি করে একটু সাহায্য করেন…

বাধা দিয়া শ্বশুর বলিয়া উঠিলেন, –হেঃ হেঃ আমি! আমি কী সাহায্য করব?

এই কটা মাসের খরচের অভাবে আমার পড়াটা বন্ধ হয়। সামান্যই খরচ, হুজুর যদি চালিয়ে দিতেন, তো আমার বড্ড উপকার হত…।

আমি কোথা থেকে দেব? আমার এখন এমন টানাটানি যে তা বলবার নয়। মসজিদটার জন্য ক বছর ধরে মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে যদি-বা শুরু করে দিয়েছিলাম, তা এখনো শেষ করতে পারলাম না। এবারে ব্যারামে পড়ে ভেবেছিলাম, বুঝি খোদা আমার কেসমতে ওটা লেখেন নি! তাড়াতাড়ি আকামত করে নামায শুরু করিয়ে দিলাম; কিন্তু কাজটা শেষ করতে এখনো ঢের টাকা লাগবে। কোথা থেকে কী করব ভেবে ভেবে বেচায়েন হয়ে পড়িছি। এখন এক খোদাই ভরসা বাবা, তিনি যদি জুটিয়ে দেন, তবে মসজিদ শেষ করে যেতে পারব। কিন্তু এখন আমার এমন সাধ্যি নেই যে, তোমাকে সাহায্য করি।

আবদুল্লাহ অত্যন্ত দুঃখের সহিত কহিল, তা হলে আর আমার পড়াশুনা হয় না, দেখছি!

শ্বশুর একটু সান্ত্বনার ও সহানুভূতির সুরে কহিলেন, তা আর কী করবে বাবা, খোদা যার কেসমতে যা মাপান, তার বেশি কি সে পায়? সকল অবস্থাতেই শোকর গোজারী করতে হয়, বাবা! সবই খোদাতালার মরজি! আর তা ছাড়া এতে তো তোমার ভালোই হবে, আমি দেখছি; তোমাকে ইংরেজি পড়তে দিয়ে তোমার বাপ বড়ই ভুল করেছিলেন, এখন বুঝে দেখ বাবা, খোদাতালার ইচ্ছে নয় যে তুমি ওই বেদীনী লোভে পড়ে দীনদারী ভুলে যাও। তাই তোমার ও-পথ বন্ধ করেছেন তিনি। তোমরা যে পীরের গোষ্ঠী, তোমাদের ও-সব চালচলন সইবে কেন, বাবা? ও-সব দুনিয়াদারি খেয়াল ছেড়ে-ছুঁড়ে দিয়ে দীনদারীর দিকে মন দাও, দেখবে খোদা সব দিক থেকে তোমারে ভালো করবেন ।

আবদুল্লাহ্ তাহার শ্বশুরের এই দীর্ঘ বক্তৃতায় অসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়াছিল। সে একটু বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, কিন্তু সংসার চালাবার জন্যে তো পয়সা রোজগার করতে হবে…

শ্বশুর বলিলেন, –কেন, তোমার বাপ-দাদারা সংসার চালিয়ে যান নি? তারা যেমন দীনদারী বজায় রেখেও সুখে-স্বচ্ছন্দে সংসার করে গেছেন, তোমরা এলে-বিয়ে পাস করেও তেমন পারবে না। আর লোকের কাছে কত মান সম্ভ্রম…

তারা যে কাজ করে গেছেন, আমার ও কাজে মন যায় না!

শ্বশুর একটু বিরক্তির স্বরে কহিলেন, –ওই তো তোমাদের দোষ। সাধে কি আমি ইংরেজি পড়তে মানা করি? ইংরেজি পড়লে লোকের আর দীনদারীর দিকে কিছুতেই মন যায় না–কেবল খেয়াল দৌড়ায় দুনিয়াদারির দিকে খালি পয়সা, পয়সা। আর তাও বলি, তোমার বাপ খোন্দকারী করেও তো খাসা পয়সা রোজগার করে গেছেন, তোমার পেছনেও কম টাকাটা ওড়ান নি! একটা ভালো কাজে টাকাগুলো খরচ করতেন, তাও না হয় বুঝতাম, নিজের আব্বতের কাজ করে গেলেন। নাহক টাকাটা উড়িয়ে দিলেন, না নিজের কোনো কাজে লাগল, না তোমাদের কোনো উপকার হল! আজ সে টাকাটা যদি রেখেও যেতেন তা হলে তোমাদের আর ভাবনা কী ছিল?

আবদুল্লাহ্ কহিল, –আমাকে লেখাপড়া শেখাবার জন্যে আব্বা যে টাকাটা খরচ করেছেন, অবিশ্যি তাতে তার নিজের আব্বতের কোনো উপকার হয়েছে কি না তা বলতে পারি নে, কিন্তু আমার যে তিনি উপকার করে গেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। যদি পড়া শেষ করতে পারতাম, তা হলে তো কথাই ছিল না; সেইজন্যেই আপনার কাছে কিছু সাহায্য চাইতে এসেছিলাম। তা যাক, এখনো খোদার ফজলে চাকরি করে যা রোজগার করতে পারব, তাতে সংসারের টানাটানিটাও তো অন্তত ঘুচবে। আব্ব তো চিরকাল টানাটানির মধ্যেই কাটিয়ে গেছেন…।

শ্বশুর বাধা দিয়া কহিলেন, –সে তারই দোষ; দু ঘর মুরীদান যাতে বাড়ে, সেদিকে তো তার কোনোই চেষ্টা ছিল না! তুমি বাপু যদি একটু চেষ্টা কর, তবে তোমার দাদা পর-দাদার নামের বরকতে এখনো হাজার ঘর মুরীদান যোগাড় করে নিতে পার। তা হলে আর তোমার ভাবনা কী? নবাবি হালে দিন গুজরান করতে পারবে-ও শত চাকরিতেও তেমনটি হবে না, আমি বলে রাখলাম বাপু!

ইহার উপর আবদুল্লাহর আর কোনো কথা বলিতে ইচ্ছা হইল না; সে চুপ করিয়া ঘাড় নিচু করিয়া বসিয়া রহিল। তাহাকে নীরব দেখিয়া শ্বশুর আবার কহিলেন, –কী বল?

জি না, ও-কাজ আমার দ্বারা হবে না।

সৈয়দ সাহেব একটু রুষ্ট হইয়া কহিলেন, –তোমরা যেসব ইংরেজি কেতাব পড়েছ, তাতে তো আর মুরব্বিদের কথা মানতে শেখায় না। যা খুশি তোমরা কর গিয়ে বাবা, আমরা আর কদিন! ছেলে তো একটা গেছে বিগড়ে, তাকেই যখন পথে আনতে পারলাম না, তখন তুমি তো জামাই, তোমাকে আর কী বলব বাবা!

আবদুল্লাহ্ আর কোনো কথাই কহিল না। এদিকে খোদা নেওয়াজ নাশতা লইয়া আসিল। আবদুল মালেকের ডাক পড়িল। তিনি আসিলে মৌলবী সাহেব তাহার ফরশী ছাত্রগণকে সঙ্গে লইয়া দস্তরখানে বসিয়া গেলেন। অপর ছাত্রেরা মাদুরের উপর বসিয়া গুনগুন করিয়া সবক ইয়াদ করিতে লাগিল বটে; কিন্তু বেচারাদের এক চোখ কেতাবের দিকে থাকিলেও আর এক চোখ অদূরবর্তী দস্তরখানটির দিকে ক্ষণে ক্ষণে নিবদ্ধ হইতে লাগিল।

.

১৩.

নাশতা শেষ হইতে হইতেই একজন চাকর আসিয়া সংবাদ দিল যে, পশ্চিমপাড়ার ভোলানাথ সরকার মহাশয় আরো একজন লোক সঙ্গে করিয়া সৈয়দ সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছেন। সৈয়দ সাহেব ব্যস্তসমস্ত হইয়া কহিলেন–নিয়ে আয়, নিয়ে আয় ওঁদের!

ভোলানাথ এবং তাহার অনুচরবর্গ বৈঠকখানায় প্রবেশ করিতেই সৈয়দ সাহেব তাহাদের অভ্যর্থনার জন্য অসতে আজ্ঞা হোক, আসতে আজ্ঞা হোক, বলিতে বলিতে সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থান করিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু ভোলানাথ সরকার কহিলেন, –থাক্ থাক, উঠবেন না, আপনি কাহিল মানুষ–আমরা এই বসছি– বলিয়া তাহার ফরশের এক প্রান্তে উঠিয়া বসিলেন। সৈয়দ সাহেব তাঁহাদের নিকটে সরিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –তারপর, সরকার মশায়, খবর ভালো তো?

সরকার মহাশয় পরম বিনয়ের সহিত কহিলেন, –হ্যাঁ, আপনার দোয়াতে খবর ভালো। আপনার শরীর-গতিক আজকাল কেমন?

সৈয়দ সাহেব একটু কাতরোক্তির সহিত কহিলেন, আর মশায় এ বয়সে আবার শরীর-গতিক! বেঁচে আছি, সেই ঢের। জ্বরটায় বড় কাহিল করে ফেলেছে…

সরকার মহাশয় কহিলেন, –তাই তো! আপনার চেহারা বড্ড রোগা হয়ে গেছে–তা আপনার বয়েসই বা এমন কী হয়েছে, দু-চার দিনেই সেরে উঠবেন এখন।

সৈয়দ সাহেব বলিলেন, –হ্যাঁ, বয়সে তো আপনি আমার কিছু বড় হবেন; কিন্তু আপনার শরীরটা বেশ আছে–আমি একেবারে ভেঙে পড়েছি…।

ভোলানাথ একটু হাসিয়া কহিলেন, –আমাদের কথা আর কী বলছেন, সৈয়দ সাহেব–খাটুনির শরীর, একটু মজবুত না হলে চলে না যে! আপনাদের সুখের শরীর কিনা, অল্পেই কাহিল হয়ে পড়েন। মনে করবেন ওটা কিছু না, তা হলে দুদিনেই তাজা হয়ে উঠবেন। সরকার মহাশয়ের সঙ্গে একটি যুবকও আসিয়াছিলেন। তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া আবদুল কুদ্দুস জিজ্ঞাসা করিলেন, –এটি কে, সরকার মশায়?

এটি আমার কনিষ্ঠ পুত্র হরনাথ! এম-এ পাস দিয়েছে, এখন আইন পড়ছে, –হরে, সৈয়দ সাহেবকে সেলাম কর বাবা, এরা হচ্ছেন আমাদের মনিব!

হরনাথ মাথা নোয়াইয়া সালাম করিলে সৈয়দ সাহেব কহিলেন–বেঁচে থাক, বাবা! তারপর ভোলানাথের দিকে চাহিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, –আপনার বড় ছেলেরা সব কোথায়?

তারা সব নিজের নিজের চাকরিস্থানে–বড়টি রাজশাহীতে–মেজটি বাঁকুড়ায়, আর সেজটি আছে কটকে।

বড়টি ডিপুটি হয়েছে, না?

আজ্ঞে না, সে মুনসেফ, মেজটি ডিপুটি হয়েছে আর সেজটি ডাক্তার।

বেশ বেশ, বড় সুখের কথা! আপনাদের উন্নতি দেখলে চোখ জুড়ায়, সরকার মশায়।

এ-সব আপনাদেরই দোয়াতে!

তা ছোটটিকে কি চাকরিতে দেবেন ঠিক করেছেন?

না, ওঁকে চাকরিতে দেব না–আর ওরও ইচ্ছে নয় যে চাকরি করে। আইন পাস করে ওকালতি করবে।

সৈয়দ সাহেব কহিলেন–তা বেশ, বেশ! ওকালতি করবেন উনি সে তো খুব ভালো কথা!–যত সব বাজে লোকের কাছে যেতে হয় মালি-মোকদ্দমা নিয়ে, একজন ঘরের ছেলে উকিল হলে তো আমাদেরও সুবিধে–কী বলেন সরকার মশায়!

সরকার মহাশয় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, –তা তো বটেই, তা তো বটেই–হারু তো আপনাদের ঘরের ছেলের মতোই–ওর বাপ-দাদা তো আপনাদের খেয়েই মানুষ!

সৈয়দ সাহেব হে হে হে করিয়া একটু হাস্য করিলেন। এমন সময় অন্দর হইতে এক তশতরি ছেঁচা পান এবং এক বাটা খিলি আসিল। সৈয়দ সাহেবের কয়েকটি দাঁত পড়িয়া গিয়াছে এবং অবশিষ্টের অনেকগুলিই নোটিশ দিয়াছে; তাই তিনি খিলিগুলি অভ্যাগতগণের দিকে বাড়াইয়া দিয়া চামচে করিয়া হেঁচা পান তুলিয়া তুলিয়া খাইতে লাগিলেন এবং তামাকের হুকুম করিলেন।

ভোলানাথ পান চিবাইতে চিবাইতে কহিলেন, আজ আপনার কাছে একটা দরবার নিয়ে এসেছিলাম, তা যদি মেহেরবানি করে শোনেন তো…

সৈয়দ সাহেব ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, –সে কী! সে কী! আমার কাছে আবার দরবার কী রকম!

দরবার বৈকি! একটা লোক–আমারই একজন আত্মীয়–মারা যায়, এখন আপনার দয়ার উপরই তার জীবন-মরণ!

কথাটা কী সরকার মশায়, খুলেই বলুন না। আমার যা সাধ্য থাকে, তা আমি করব।

ভোলানাথের নায়েব রতিকান্ত বলিয়া উঠিল, –সাধ্যের কথা কী বলছেন হুজুর! আপনার একটা মুখের কথার উপরেই সব নির্ভর করছে।

ভোলানাথ কহিতে লাগিলেন–বলছিলাম ঐ মহেশ বোসের কথা…

আবদুল কুদ্দুস জিজ্ঞাসা করিলেন, –কোন মহেশ বোস?

আপনারই তহসিলদার সে…

ওঃ, তারই কথা বলছেন? কেন কী হয়েছে?

ভোলানাথ দেখিলেন সৈয়দ সাহেব তাহার বিষয়-আশয় সম্বন্ধে বড় একটা খবর রাখেন না। আগেও এ-কথা তিনি জানিতেন, তবে এখন তাহার চাক্ষুষ প্রমাণ পাইয়া ভাবিলেন, তাহার কাজ হাসিল করিতে বড় বেগ পাইতে হইবে না। তিনি কহিলেন, –কথাটা এত সামান্য যে হয়তো সেটা আপনার নজরেই পড়ে নি, –কিন্তু সামান্য হলেও বেচারা গরিবের পক্ষে একেবারে মারা যাওয়ার কথা…

সৈয়দ সাহেবের ঔৎসুক্য চরম মাত্রায় চড়িয়া উঠিল! তিনি একটু অসহিষ্ণু হইয়া কহিলেন, আসল কথাটা কী, তাই বলুন না, সরকার মশায়!

হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই বলছি। কথাটা কী, –বেচারার তহবিল থেকে কিছু টাকা খোয়া গেছে…।

খোয়া গেছে? কত টাকা?

বেশি নয়, এই শ’আষ্টেক আন্দাজ হবে…

কেমন করে খোয়া গেল?

তা সে নিজেই বুঝতে পাচ্ছে না, সৈয়দ সাহেব! গেল চোত মাসে হিসেব মিলাবার সময় ওটা ধরা পড়ল–একটা মাস সে অনেক করে উল্টেপাল্টে দেখলে, কিছুতেই টাকাটার মিল হল না;–এখন বেচারা একেবারে পাগলের মতো হয়ে গেছে…

সৈয়দ সাহেব বলিয়া উঠিলেন, –ওরে কে আছিস্, মহেশকে ডাক্ তো।

ভোলানাথ কহিতে লাগিলেন–আপনি দয়া না কলে বেচারার আর কোনোই উপায় নাই। অনেকগুলো পুষ্যি, না খেয়েই মারা যাবে!

আচ্ছা, দেখি!

রতিকান্ত কহিতে লাগিল, –হুজুর একটি মুখের কথা বললেই বেচারা মাফ পেয়ে যায়–ও কটা টাকা তো হুজুরদের নখের ময়লা বৈ তো নয়!

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –আচ্ছা দেখি।

মহেশ গলার চাদরখানি দুইটি হাতে জোড় করিয়া ঘরের ভিতর আসিল এবং আভূমি নত হইয়া সকলকে সালাম করিল। তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ওসমান আলী নামক সৈয়দ সাহেবের অপর একজন গোমস্তা খাতাপত্র লইয়া প্রবেশ করিল।

সৈয়দ সাহেব ওসমানকে আসিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –তুমি কী চাও?

ওসমান কহিল, –হুজুর, আমিই মহেশের তহসিলের গরমিলটা ধরেছিলাম কিনা তাই…

সৈয়দ সাহেব ক্রোধভরে কহিলেন, –তোমাকে কে আসতে বল্লে! যাও…

ওসমান বেচারা বে-ওকুফ হইয়া খাতাপত্র রাখিয়া চলিয়া গেল। অতঃপর সৈয়দ সাহেব মহেশকে কহিলেন, –কই দেখি, কোথায় গরমিল হচ্চে?

মহেশ কম্পিতহস্তে হিসাবের খাতা খুলিয়া দেখাইতে লাগিল এবং ক্রন্দনের সুরে কহিতে লাগিল, –হুজুর, কেমন করে এ টাকাটা যে কোথায় গেল তা আমি কিছুই ভেবে ঠিক করতে পাচ্ছি নে–এখন আপনি মাফ না কল্লে একেবারেই মারা পড়ি–বলিয়া সৈয়দ সাহেবের পা ধরিতে গেল।

আরে কর কী, কর কী বলিয়া সৈয়দ সাহেব পা টানিয়া লইলেন এবং কহিলেন, আচ্ছা যাও, ও টাকা আমি তোমাকে মাফ করে দিচ্ছি–আয়েন্দা একটু সাবধানে কাজকর্ম কোরো।

ভোলানাথ কহিলেন, –সে কি আর বলতে! এবার ওর যা শিক্ষা হল–কেবল আপনার দয়াতে পরিত্রাণ পেলে। এতে ওর যথেষ্ট চৈতন্য হবে।

সৈয়দ সাহেব হিসাবের খাতায় মাফ করা গেল লিখিয়া ফারসিতে এক খোঁচায় নিজের নাম দস্তখত করিয়া খাতাটা ছুড়িয়া দিলেন। মহেশ এক সুদীর্ঘ সালাম বাজাইয়া খাতাপত্র লইয়া চলিয়া গেল।

রতিকান্ত কহিতে লাগিল, –হুজুররা বাদশার জাত কিনা, নইলে এমন উঁচু নজর কি যারতার হয়? এঁদের পূর্বপুরুষদের কথা শুনিছি, তাদের কাছে কেউ কোনোদিন আশা করে নিরাশ হয় নি। এই যে একবালপুরে যত তালুকদার টালুকদার আছে, সমস্তই তো এই বংশেরই দান পেয়ে আজ দুমুঠো খাচ্ছে!

ভোলানাথ কহিলেন, –তাতে আর সন্দেহ কী! এ অঞ্চলে এঁরাই তো বুনিয়াদী জমিদার, আর সকলে এঁদেরই খেয়ে মানুষ। যেমন ঘর তেমনি ব্যাভার। ভগবান যারে দ্যান, তার নজরটাও তেমনি উঁচু করে দ্যান কিনা।

এমন সময় এক চাকর আবদুল মালেকের একটি শিশুপুত্র কোলে লইয়া কলিকায় ফুঁ দিতে দিতে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিল এবং শিশুটিকে ফর্‌শের উপর নামাইয়া দিয়া কলিকাটি পেচোয়ানের মাথায় বসাইয়া দিল।

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –ওরে, আর একটা কল্কে নিয়ে আয় না। আর বাবুদের হুঁকোটা আলি নে…।

ভোলানাথ কহিলেন, –থাক্, বেলা হয়ে উঠল, আমরা এখন উঠি…

সৈয়দ সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন, –না, না, একটু বসুন–ওরে, আর কল্কেয় কাজ নেই; এতেই হবে, কেবল কোটা নিয়ে আয়।

চাকর একটা শুকনা নারিকেলি হুঁকা আনিয়া ভোলানাথের হাতে দিল। সৈয়দ সাহেব স্বহস্তে পেচোয়ানের মাথা হইতে কলিকাটি তুলিয়া তাহাকে দিতে গেলেন।

ভোলানাথ না, না, না, থাক, থাক্ আমি নিচ্ছি বলিয়া একটু অগ্রসর হইয়া কলিকাটি লইলেন এবং ধূমপান করিবার জন্য বাহিরে যাইবার উদ্দেশ্যে ফরশ হইতে নামিয়া পড়িলেন।

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –ওকি, উঠলেন যে! এইখানেই বসে তামাকটা খান না, সরকার মশায়!

সরকার মহাশয় কহিলেন, –না, না, তাও কি হয়! আপনারা হচ্চেন গিয়ে আমাদের মনিব! বলিয়া তিনি বারান্দায় গিয়া শুষ্ক হুঁকায় টান দিতে লাগিলেন।

এদিকে আবদুল মালেকের শিশুপুত্রটি আসিয়া তাহার দাদাজানের ক্রোড় অধিকার করিয়া বসিয়াছে। দাদাজান পান খাইতেছেন দেখিয়া সে আমালে দাদাজান বলিয়া পক্ষী-শাবকের ন্যায় হাঁ করিয়া তাহার মুখের কাছে মুখ লইয়া গেল। পান তখন প্রায় ফুরাইয়াছে–কাজেই দাদাজান আর কী করিবেন, নড়া-নড়া দাঁতগুলির ফাঁকে যাহা কিছু লাগিয়া ছিল, তাহাই জিভ দিয়া টানিয়া টানিয়া খানিকটা লাল থুতুর সহিত মিশাইয়া তাহার মুখে ঢালিয়া দিলেন। ইহা দেখিয়া হরনাথ মুখোনি অত্যন্ত বিকৃত করিয়া ঘাড় ফিরাইয়া রহিল।

তামাক খাওয়া হইলে ভোলানাথ বৈঠকখানায় পুনঃপ্রবেশ করিলেন, এবং কলিকাটি যথাস্থানে প্রত্যর্পণ করিয়া বিদায় লইলেন।

.

১৪.

বৈকালে একটু বেড়াইতে যাইবে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ আবদুল মালেকের সন্ধানে তাহার মহলে গিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু দেখিল সে নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে এবং গৃহের অপর পার্শ্বে বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব তাহার দুই তিনটি ছাত্রী লইয়া নিম্নস্বরে সবক দিতেছেন। আবদুল্লাহ্ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, ইনি ওঠেন কখন?

মৌলবী সাহেব কহিলেন, –অঃ, আসরের আগে উঠতাই না–গুমানের বাতে বড় মিঞা সাব এক্কালে সত্ লইছেন বলিয়া তিনি মৃদু হাস্য করিলেন।

অগত্যা আবদুল্লাহ একেলাই বেড়াইতে বাহির হইল। সৈয়দ সাহেবদের বিস্তীর্ণ বাগানটির পশ্চাতেই আবদুল খালেকদের বৃহৎ পুষ্করিণী; তাহার ওপারে তাহাদের পুরাতন মসজিদটি মেরামতের দরুন তক্ত করিতেছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ ভাবিল, যাই, একবার। দেখিয়া আসি।

বাগানের পথটি ধরিয়া, পুষ্করিণীর তীর দিয়া আবদুল্লাহ্ মসজিদের ঘাটে গিয়া উপস্থিত হইল। সিঁড়ির উপর আবদুল খালেকের দশমবর্ষীয় পুত্র আবদুস সামাদ একাগ্রচিত্তে বসিয়া মাছ ধরিতেছিল, কেহ যে আসিয়া তাহার পিছনে দাঁড়াইয়া আছে তাহা সে টের পায় নাই। আবদুল্লাহ্ কহিল, –কিরে, সামু, কটা মাছ পেলি!

হঠাৎ ডাকে সামু ওরফে আবদুস সামাদ চমকিয়া ফিরিয়া চাহিল এবং বাঃ! চাচাজান। কখন এলেন? বলিয়া ছিপ ফেলিয়া উঠিয়া আসিয়া আবদুল্লাহর কদমবুসি (পদচুম্বন) করিল।

এই কাল এসেছি। তোরা ভালো আছিস্ তো?

জি হ্যাঁ–অ্যাঁ! ভালো আছি। বলিয়া সামু ঘাড়টা অনেকখানি কাত করিয়া দিল! আবদুল্লাহ্ তাহার মাথায় হাত রাখিয়া কহিল, –ক্রমেই যে লম্বা হয়ে চলেছি, সামু! গায়ে তো গোশত্ নেই। কেবল রোদে রোদে খেলে বেড়াস্ বুঝি আর মাছ ধরিস্–কেমন, না?

সামু মুখ নিচু করিয়া ঘাড় নাড়িয়া কহিল, –না, –আঃ—

কী মাছ পেয়েছিস দেখি?

বেশি পাই নি, দু-তিনটে বাটা আর একটা ফলুই…

ওঃ, তবে তো বড় পেয়েছিস দেখছি!

পাছে আবদুল্লাহ তাহার ক্ষমতা সম্বন্ধে ভুল ধারণা করিয়া বসেন, এই ভয়ে সামু তাড়াতাড়ি দুই হাতে এক বৃহৎ মৎস্যের আকার দেখাইয়া চোখ পাকাইয়া গম্ভীর আওয়াজে বলিয়া উঠিল, –আর একটা মস্ত মোটা মাছ, বোধ হয় রুই কি কাতলা হবে–আর একটু হলেই তুলেছিলাম আর কি!

তুলতে পাল্লিনে কেন?

সামু ক্ষুণ্ণস্বরে কহিল, –যে জোর কল্লে, কেটে গেল!

আবদুল্লাহ্ কহিল, –ভাগ্যি কেটে গেল, নইলে হয়তো তোকেসুদ্ধ টেনে পানির ভেতর নিয়ে যেত।

সামু আপনাকে যথেষ্ট অপমানিত জ্ঞান করিয়া কহিল, –ইস্, টেনে নিয়ে গেল আর কি! আমি কত বড় মাছ ধরি, ছিপে!

ওঃ, তাই নাকি? তবে তো খুব বাহাদুর হয়ে উঠেছি। স্কুলেটুলে যাস, না খালি মাছ মারিস?

সামু খুব সপ্রতিভভাবে কহিল–বা স্কুলে যাইনে বুঝি? এখন যে বন্ধ।

কোন্ ক্লাসে পড়িস?

গম্ভীরভাবে সামু কহিল,  সিকসথ ক্লাস, দি পশ্চিমপাড়া শিবনাথ ইনস্টিটিউশন!

এই সাড়ম্বর নামোল্লেখ শুনিয়া আবদুল্লাহ্ মনে মনে একটু হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোদের স্কুল খুলবে কবে?

ওঃ, সে ঢের দেরি। সামনের সোমবারের পরের সোমবার।

এ ছুটির মধ্যে পড়াশুনা কিছু করিছিস?

বাঃ, করি নি বুঝি? রোজ সক্কালে উঠে পড়া করি। আজ দাদাজান আমার একজামিন নিলেন।

দাদাজান? কোন দাদাজান?

রসুলপুরের দাদাজান! আবার কে?

ও তিনি এসেছেন?

হ্যাঁ, আজ সক্কালে, আমি যখন পড়া কচ্ছিলাম, সেই তখন।

বাড়িতে আছেন?

নাঃ–আব্বার সঙ্গে তিনি ক্ষেতে গেছেন।

কোথায় ক্ষেত?

উ-ই যে ওদিকে–বলিয়া সামু আঙুল দিয়া বাড়ির পশ্চাৎদিক দেখাইয়া দিল। আবদুল্লাহ্ সেই দিকে প্রস্থান করিল এবং সামু পুনরায় তাহার বড়শিটোপে মন দিল।

ক্ষেতের কাছে গিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিতে পাইল, জন দুই কৃষাণ জমি পাইট করিতেছে এবং তাহার এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া মীর সাহেব ও আবদুল খালেক তাহাদের কাজ দেখিতেছেন। দূর হইতে আবদুল্লাহকে দেখিতে পাইয়া তাহারা উভয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিলেন, বাঃ আবদুল্লাহ্ যে!

মীর সাহেব কহিলেন, আমি তোমাদের ওখানেই চলেছি। তা এখানে কবে এলে?

আবদুল্লাহ্ উভয়ের কদমবুসি করিয়া কহিল, কাল সন্ধেবেলা এসেছি।

ভালো তো সব?

হ্যাঁ, এক রকম ভালোই–আপনি পীরগঞ্জে যাবেন বলছিলেন…

হ্যাঁ, বাবা, তোমার চিঠি পেলাম তরশু দিন বাড়ি এসে–প্রায় মাসেক কাল আগের চিঠি, মনে করলাম একবার খবরটা নিয়ে আসি। তা ভালোই হল, তোমার সঙ্গে এইখানেই দেখা হয়ে গেল। এখন খবর কী, বল।

আবদুল্লাহ্ কহিল খবর আর কী, পড়াশুনোর আর কোনো সুবিধে করে উঠতে পাচ্ছিনে, ফুফাজান।

কেন, খরচপত্রের অভাবে?

জি হ্যাঁ।

তোমার শ্বশুরকে বলে দেখেছ?

তাই বলতেই তো আম্মা আমাকে ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিলেন; কিন্তু যা ভেবেছিলাম তাই– তিনি কোনো সাহায্য কত্তে পারবেন না।

মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন পারবেন না, তা কিছু বললেন কি?

বললেন যে মসজিদটায় তার অনেক খরচ পড়ে যাচ্ছে, এ সময় হাত বড় টানাটানি কিন্তু এ-দিকে আর এক ব্যাপার দেখলাম।

কী?

শুনবেন? তবে আসুন এই গাছতলায় বসি–বসে বসে সব বলছি, সে বড় মজার কথা।

তিন জনে আমগাছের ছায়ায় ঘাসের উপর বসিয়া পড়িলেন। আবদুল্লাহ্ কহিল– পশ্চিমপাড়ার ভোলানাথবাবু এসেছিলেন একটা সুপারিশ কত্তে।

আবদুল খালেক কহিল, ওঃ বুঝেছি! মহেশ বোসের জন্যে তো?

হ্যাঁ তারই জন্যে–আপনি তা হলে জানেন সব?

কতক কতক জানি–ওসমানের মুখে শুনেছি। দেখুন মামুজান, আমার খালুজানের কাণ্ড, কোনো দিনও হিসেবপত্র দেখেন না, গোমস্তারা যা খুশি তাই করে। মহেশ বোস যে কতকাল থেকে টাকা লুটছে, তার ঠিক নেই। এবার ওসমান ধরেছে, গেল বছরের হিসেবে আট শ টাকারও ওপর তসরুফ হয়ে গেছে। এইবার মহেশটা জব্দ হবে।

মীর সাহেব কহিলেন, সে তার কাজ গুছিয়ে নিয়েছে, এখন তাকে আর কী জব্দ করবেন? না হয় টাকাটা ঘর থেকে আবার বার করে দেবে, এই তো? তা সে কত টাকাই তো নিচ্ছে, না হয় এ টাকাটা ফসকেই গেল।

আবদুল্লাহ কহিল, না, না, ফুফাজান, তাও ফসকায় নি। সে ব্যাটা গিয়ে ধরছে ভোলানাথবাবুকে, তিনি এসে একটু আমড়াগাছি কত্তেই আর কি! কর্তা অমনি খসখস করে লিখে দিলেন– মাফ!

আবদুল খালেক অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিল, –মাফ করে দিলেন, –সব?

আবদুল্লাহ্ কহিল, সব।

এই কথায় আবদুল খালেক ক্রোধ ও ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া উঠিল। যদিও তাহারা সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসদিগের শরিক, তথাপি অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হইয়া পড়ায় তাহাকে অনন্যোপায় হইয়া সৈয়দ সাহেবের সেরেস্তায় কয়েক বৎসর গোমস্তাগিরি করিতে হইয়াছিল। ঘটনাক্রমে এক সময়ে তাহার তহবিল হইতে আশিটি টাকা চুরি যায়; সৈয়দ সাহেব ওই টাকা উহার বেতন হইতে কাটিয়া লইবার আদেশ দেন। সেই কথা মনে করিয়া আবদুল খালেক চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, দেখুন তো মামুজান, এঁদের কী অবিচার! আমার বেলায় সিকি পয়সা ছাড়লেন না, আর এ ব্যাটাকে একেবারে আট আট শ টাকা মাফ। করে দিলেন।

মীর সাহেব কহিলেন, আস্তে কথা, আস্তে! এইটুকুতেই কি অতটা চটলে চলে! এই রকমই তো আমাদের সমাজে ঘটে আসছে, নইলে কি আর আমাদের এমন দুর্দশা হয়? তোমাকে মাফ কল্লে তো লোকের কাছে ওঁর মান বাড়ত না, শুধু শুধু টাকাগুলোই বরবাদ যেত। আর এক্ষেত্রে দেখ দেখি, বাবা, হিন্দু সমাজে ওঁর কেমন নাম চেতে গেল!

আবদুল্লাহ্ কহিল, সে কথা ঠিক, ফুফাজান। সেইখানেই বসে বসেই নবাব বংশটংশ বলে ওঁকে খুব তারিফ করে গেল। যে ভোলানাথ বাবু ইচ্ছে কল্লে ওঁকে এক হাটে সাত বার বেচাকেনা কত্তে পারে, সে-ই বলতে লাগল, আমরা তো আপনাদেরই খেয়ে মানুষ! আর। উনি তাই সব শুনে এক্কেবারে গলে গেলেন!

মীর সাহেব কহিলেন, সে তো ঠিকই বলেছে! ওঁদের খেয়েই তো মানুষ ওরা।

কী রকম? ওরা যে মস্ত টাকাওয়ালা লোক!

মস্ত টাকাওয়ালা আজকাল হয়েছে; আগে ছিল না; সেসব কথা বোঝাতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়। আবদুল খালেক–-বোধ হয় জান কিছু কিছু…

আবদুল খালেক কহিল, শুনেছি কিছু কিছু, কিন্তু সব কথা ভালো করে জানি নে।

আবদুল্লাহ্ সাগ্রহে কহিল, বলুন না, ফুফাজান, শুনি।

মীর সাহেব আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করিয়া কহিতে লাগিলেন, ভোলানাথের বাপ শিবনাথ তোমার পর-দাদাশ্বশুরের নায়েব ছিল। তিনি যখন মারা যান, তখন তোমার দাদাশ্বশুর সৈয়দ আবদুস সাত্তার ছিলেন ছেলেমানুষ, এই ষোল-আঠার বছর বয়েস হবে, আর আবদুল খালেকের দাদা মাহতাবউদ্দীন তো নিতান্ত শিশু-তারও বাপ কিছু আগেই মারা। গিয়েছিলেন। এরা দুই জন মামাতো-ফুফাতো ভাই ছিলেন, তা বোধহয় জান। এখন। শিবনাথ দেখলে যে দুই শরিকের দুই কর্তাই নাবালক; কাজেই সে পাকেচক্রে একটাকে দিয়ে আর একটার ঘাড় ভাঙতে আরম্ভ কল্লে। এর ভেতরে আরো একটু কথা ছিল। সেটুকু খুলে বলতে হয়।

এঁদের সকলের পূর্বপুরুষ ছিলেন সৈয়দ আবদুল হাদি। তার বিস্তর লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল–আজ তার দাম লাখো টাকার উপর। তা ছাড়া ছোট বড় অনেক তালুকটালুকও ছিল। যাক সে কথা–সৈয়দ আবদুল হাদির কেবল দুই মেয়ে ছিল, ছেলে ছিল না। তাদের বিয়ে দিয়ে তিনি দুটো ঘরজামাই পুষলেন। এই দুই পক্ষই হল গিয়ে দুই শরিক… বড়টির অংশে হলেন গিয়ে তোমার শ্বশুর, আর ছোটটির হল আবদুল খালেক।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, তবে এক শরিক সৈয়দ হলেন আর এক শরিক হলেন না কেন?

মীর সাহেব হাসিয়া কহিলেন, ঠিক ধরেছ বাবা! মা সৈয়দের মেয়ে হলে ছেলে সৈয়দ সচরাচর হয় না বটে, কিন্তু কেউ কেউ সেক্ষেত্রে সৈয়দ কওলান, কেউ কেউ কওলান না। আবদুল খালেকদের পূর্বপুরুষেরা বোধহয় একটু sensible ছিলেন, তাই তারা সৈয়দ কওলাতেন না।

যা হোক, এখন সৈয়দ আবদুল হাদি তার বিষয়-সম্পত্তি সমস্ত সমান দুই ভাগ করে দুই মেয়েকে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তিনি গত হলে মেয়েরা ভিন্ন হলেন–অবিশ্যি বাপের সেই রকমই হুকুম ছিল, –তা সত্ত্বেও দু বোনের মধ্যে ভারি ভাব ছিল। বড়টি পৈতৃক বসতবাটী, পুকুর, বাগান, মসজিদ, সমস্ত ছোট বোনকে দিয়ে নিজে একটু সরে গিয়ে নতুন বাড়ি করে রইলেন।

এদিকে ছোট বোনের একটিমাত্র ছেলে, তার বিয়ে হল খালাতো বোনের সঙ্গে। খালার ছেলে মাত্র একটি, তোমার পর-দাদাশ্বশুর তিনি। শিবনাথ ছিল তাঁরই নায়েব। দুই শরিকেরই নায়েব বলতে হবে, শুধু তার কেন–কেননা ও-শরিকের বিষয় দেখাশুনার ভার ছিল তোমার পর-দাদাশ্বশুরের ওপর। তিনি খুব কাজের লোক ছিলেন–তার আমলে শিবনাথ কোনো দিকে হাত চালাতে পারে নি। যা হোক, তিনি আর তার ভগ্নীপতি প্রায় এক সময়েই মারা গেলেন–রইলেন ও-ঘরে তোমার দাদাশ্বশুর, আর এ-ঘরে আবদুল খালেকের দাদা–দুই মামাতো-ফুফাতো ভাই।

আগেই বলেছি আবদুল খালেকের দাদা তখন নিতান্ত শিশু। তার বিষয় আশয় দেখাশুনার ভার তোমার দাদাশ্বশুরকেই নিতে হল। তিনিও একরকম ছেলেমানুষ, কাজেই শিবনাথের উপর ষোল আনা নির্ভর। আর তিনি বাপের আমলের নায়েব বলে শিবনাথকে মানতেনও খুব–আর ওদিকে বুদ্ধিসুদ্ধিও খোদার ফজলে ছিল একটু মোটা, তাই সে যা বলত তাই শুনতেন, যা বোঝাত তাই বুঝতেন। এখন এঁদের সম্পত্তি খানিকটা এর ফুফুর সঙ্গে ও-ঘরে গিয়ে পড়াতে ওরা সম্পর্কে ছোট শরিক হয়েও কাজে বড় শরিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, এইটেই শিবনাথ বেশ ভালো করে আবদুস সাত্তারকে বুঝিয়ে দিলে। আর ওদের একটু খাটো করবার উপায়ও বাতলে দিলে, মাহতাবউদ্দীনের বড় দুই বোন আছে, তার অন্তত একটাকে বিয়ে করা আর যদ্দিন মাহতাব ছোট আছে, তদ্দিনের মধ্যে ওদের দু-চারটে মহালের খাজনা সেস্-টেস সব বাকি ফেলে ফেলে সেগুলো নিলেম করিয়ে বেনামীতে খরিদ করা। তোমাকে বলে রাখি আবদুল্লাহ্, হয়তো তুমি জানও, মাহতাবউদ্দীনের আর এক বোনকে তোমার দাদা নজিবউল্লাহ বিয়ে করেছিলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, জি–হাঁ, তা জানি।

মীর সাহেব কহিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি একদম ফাঁকিতে পড়েছিলেন, বিষয়ের ভাগ এক কানাকড়িও পান নি। যা হোক, সৈয়দ আবদুস্ সাত্তার শিবনাথের পরামর্শমতোই কাজ করতে লাগলেন–আর কাজ তো আসলে শিবনাথই করত, তিনি খালি হাঁ করে বসেই থাকতেন। শেষটাতে বেচারা মাহতাবউদ্দীনের অনেকগুলো লাখেরাজ সম্পত্তি শিবনাথ কতক নিজের নামে, কতক তার স্ত্রীর নামে খরিদ করে ফেল্লে। আবদুস সাত্তার তার কিছুই জানতে পারলেন না।

শেষটা মাহতাবউদ্দীন যখন বড় হয়ে দেখলেন যে, তিনি প্রায় পথে দাঁড়িয়েছেন, তখন মামাতো ভাইয়ের নামে নালিশ কল্লেন। তখন শিবনাথও নেই, কিছুদিন আগেই মারা গেছে। মোকদ্দমা প্রায় তিন-চার বচ্ছর ধরে চলল, কিন্তু কোনো পক্ষেই কিছু প্রমাণ হল না, মাহতাবউদ্দীন হেরে গেলেন। লাভের মধ্যে তার যেটুকু সম্পত্তি অবশিষ্ট ছিল, তারও কতকটা মোকদ্দমার খরচ যোগাতে বিকিয়ে গেল।

এখন এই মোকদ্দমার সময় আর একটা মজার কথা প্রকাশ হয়ে পড়ল। শিবনাথ যে কেবল এ-শরিকেরই সর্বনাশ করে গিয়েছে, তা নয়, ওঁর নিজের মাথায়ও বেশ করে হাত বুলিয়ে গিয়েছে! কিন্তু যা হোক সব নিতে পারে নি। বেচারা হঠাৎ মারা গেল কিনা, আর কিছুদিন বেঁচে গেলে ও-শরিককেও হাতে মালা নিতে হত।

আবদুল খালেক কহিল, তারও বড় বেশি বাকি নেই, মামুজান। আমি তো এদ্দিন কাজ করে এলাম, সব জানি। তার ওপর আবার এই মসজিদ দেবার ঝেকে দেখুন না কী দাঁড়ায়।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা যাক্, এখন দেখছি ভোলানাথ বাবুরা এদের সম্পত্তি নিয়েই বড় মানুষ হয়েছেন…

মীর সাহেব কহিলেন, আর এঁরা হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন–তা একরকম ভালোই হয়েছে বলতে হবে।

কেন?

ও সম্পত্তিগুলো এদের হাতে থাকলে নাস্তাখাস্তা হয়ে যেত এদ্দিনে–দেখ না, যা আছে তারই দশা কী! আর দেখ তো ওদের দিকে চেয়ে, যেমন আয়ও ঢের বাড়িয়েছে, তেমনি সম্পত্তিও দিন দিন বাড়াচ্ছে–ছেলেগুলো সব মানুষ করেছে, বড় বড় চাকরি কচ্ছে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, সুদের জোরেই তো ওরা বাড়ে, আমাদের যে সেটা হবার যো নেই।

মানি, সুদের জোরে বাড়ে কিন্তু ছেলেপিলে মানুষ হয়, সেও কি সুদের জোরে? এদিকে মহালের বন্দোবস্ত ভালো করেও তো আয় বাড়ানো যায়–তাই-বা কই? এঁরা কি কিছু দেখেন শোনেন? নায়েব-গোমস্তার হাতে খান, তারা যা হাতে তুলে দেয়, তাতেই খোশ!–এমন জুত পেয়ে যে ব্যাটা নায়েব কি গোমস্তা শিবনাথের মতো দু হাতে না লোটে, সে নেহাত গাধা।

এমন সময় সামু, আব্বা, দাদাজানকে আর চাচাজানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির মধ্যে আসুন বলিতে বলিতে দৌড়িয়া আসিল। মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন ভাইজান, আম্মা কি নাশতা করাবেন আমাদের!

সামু কহিল, হ্যাঁ–হ্যাঁ। শিগগির আসুন বলিয়া সে দাদাজানের হাত ধরিয়া টানিয়া উঠাইল। অতঃপর সকলে বৈঠকখানার দিকে চলিলেন।

.

১৫.

এদিকে আসরের ওক্ত হইয়া গিয়াছে দেখিয়া মীর সাহেব বৈঠকখানায় প্রবেশ করিতে করিতে সামুকে ডাকিয়া কহিলেন, আম্মাকে বল গে, ভাইজান, আমরা নামায পড়ে যাচ্ছি।

জি আচ্ছা বলিয়া সামু দৌড়িয়া মাকে বলিতে গেল।

নামায বাদ তিন জনে অন্দরে আসিলেন। শয়নঘরের বারান্দায় ছোট একটি তক্তপোশের উপর ফর পাতা হইয়াছিল।

মীর সাহেব গিয়া তাহার উপর বসিলেন এবং আবদুল খালেক আবদুল্লাহকে ঘরের ভিতর লইয়া গেল।

আবদুল খালেকের পত্নী রাবিয়া মেঝের উপর বসিয়া পান সাজিতেছিল। আবদুল্লাহকে দেখিয়া আঁচলটা মাথার উপর তুলিয়া দিয়া হাসি-হাসি মুখে রাবিয়া কহিল, বাঃ, আজ কী ভাগ্যি! কবে এলেন, খোকার সাহেব?

আবদুল্লাহ্ রাবিয়ার কদমবুসি করিয়া কহিল, কাল সন্ধেবেলায় এসেছি। আপনি ভালো আছেন তো, ভাবী সাহেবা?

হ্যাঁ ভাই, আপনাদের দোয়াতে ভালোই আছি…

আবদুল খালেক ঠাট্টা করিয়া কহিল, আঃ, ওর দোওয়াতে আবার ভালো থাকবে! ও খখানকার হলে কী হয়, খোনকারী তো আর ও করে না যে, ওর দোয়াতে কোনো ফল হবে।

রাবিয়া কহিল, তা নাই-বা কল্লেন খোনকারী, ভালবেসে মন থেকে দোওয়া কল্লে সবারই দোয়াতে ফল হয়। বলুন না খোনকার সাহেব!

আবদুল খালেক আবদুল্লাহকে লইয়া খাটের সম্মুখস্থ তক্তপোশের উপর বসিলে রাবিয়া জিজ্ঞাসা করিল, বাড়ির সব ভালো তো ভাই? ফুফু-আম্মা কেমন আছেন?

তাঁর শরীরটা ভালো নেই…

তা তো না থাকবারই কথা; তা হালিমাকে আর বউকে এবার নিয়ে যান, ওরা কাছে গেলে ওঁর মনটা একটু ভালো থাকবে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তাই মনে কচ্ছি। কিন্তু আপনাদের বউকে হয়তো ওঁরা এখন পাঠাতে চাইবেন না।

কেন?

তাকে নিয়ে যেতে চাইলে আমার শ্বশুর তো বরাবরই একটা ওজর করেন–আর। আবার ব্যারামের সময়েই পাঠাইলেন না…

রাবিয়া একটু বিরক্তির স্বরে কহিল, বাঃ, তাই বলে বউকে আপনারা নিয়ে যাবেন না, বাপের বাড়িতেই চিরকাল রেখে দেবেন?

তাই রেখে দিতে হবে, দেখতে পাচ্ছি। আর তাকে নিয়ে যাওয়াও তো কম হাঙ্গামের কথা নয়, সঙ্গে বাঁদী তো নিদেনপক্ষে জন তিনেক যাবে–তা ছাড়া তার তো নড়ে বসতেই ছ মাস–হ্যাঁতে করে সংসারের কুটো গাছটিও নাড়ে না। এখন তাকে নিয়ে গেলে কেবল আম্মারই খাটুনি বাড়ানো হবে। তা ছাড়া আমাদের যে অবস্থা এখন, তাতে এতগুলো বাঁদী। পোষা-ও পেরে ওঠা যাবে না! তার চেয়ে এখন ওর এইখেনেই থাকা ভালো।

রাবিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল, ও মেয়ে যে কখনো সংসার করতে। পারবে, তা বোধ হয় না! আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে দেখতে পাচ্ছি, খোনকার সাহেব!

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা আর কী করব, ভাবী সাহেবা!

আবদুল খালেক কহিল, এখন আর কিছু করে কাজ নেই, চল নাশতাটা করা যাক। এই বলিয়া সে আবদুল্লাহকে বারান্দায় লইয়া গিয়া ফশের উপর ছোট্ট একটি দস্তরখান পাতিয়া দিল। রাবিয়া রেকাবিগুলি আনিয়া তাহার উপর সাজাইতে লাগিল।

নাশতার আয়োজন দেখিয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, এ কী করেছেন ভাবী সাহেবা!

মীর সাহেব কহিলেন, ও তোমার ভাবী সাহেবার দোষ নয়, বাবা। আমারই অত্যাচার। তাহার পর একটু ভারী গলায় কহিতে লাগিলেন, আমার এই আম্মাটি ছাড়া আমাকে আদর করে খাওয়াবার আর কেউ নেই! তাই যখন এখানে আসি, ফরমাশের চোটে আমার আম্মাকে হয়রান করে দিই। খেতে পারি আর না-পারি, আমাকে পাঁচ রকম তয়ের করে খাওয়ানোর জন্যে উনি হাসিমুখে যে খাটুনিটা খাটেন, তাই দেখেই আমার প্রাণটা ভরে। যায়। আমার আম্মার আদরে সংসারের যত অনাদর-অবহেলা সব আমি ভুলে যাই। তাই ছুটে ছুটে আমার আম্মার কাছে আসি।

মীর সাহেবের কথায় সকলেরই চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। রাবিয়া তাড়াতাড়ি জল আনিবার ছলে সরিয়া পড়িয়াছিল।

এই মেয়েটিকে মীর সাহেব ছেলেবেলা হইতেই অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। ইহার মাতা তাহার দূরসম্পর্কের চাচাতো বোন, কিন্তু সম্পর্ক দূর হইলেও তিনি ইহাদিগকে আপনার জন বলিয়াই মনে করিতেন। তাই রাবিয়ার বিবাহের অল্প কাল পরেই যখন তাহার পিতার মৃত্যু হয় এবং তাহার মাতা শিশু-কন্যা মালেকাকে লইয়া অকূল সাগরে ভাসিলেন, তখন মীর সাহেবই তাহাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিলেন। মীর সাহেবেরই চেষ্টায় অসহায় বিধবার এবং কন্যা দুইটির সম্পত্তিটুকু অপরাপর অংশীদারগণের কবল হইতে রক্ষা পাইয়াছিল। সম্প্রতি তিনি মালেকারও বেশ ভালো বিবাহ দিয়া দিয়াছেন–জামাতা মঈনুদ্দীন একজন সব্‌ডিপুটি, তাহার ভ্রাতা মহিউদ্দীন ডিপুটি, পৈতৃক সম্পত্তিও ইহাদের মন্দ নহে। নূরপুর গ্রামের মধ্যে এই বংশই শ্রেষ্ঠ বংশ–পুরাতন জমিদার ঘর হইলেও নিতান্ত ভগ্নদশা নহে।

মীর সাহেবের এই সকল অযাচিত অনুগ্রহে রাবিয়া এবং তাহার মাতা ও ভগ্নী তাহার নিকট সর্বদা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উৎসুক। উপকার করিয়া মীর সাহেব যদি কাহারো নিকট আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পাইয়া থাকেন তবে সে এইখানেই।

নাশতার পর মীর সাহেব উঠিয়া বাহিরে গেলে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, তারপর ভাইজান, আপনার কাজকর্ম চলছে কেমন?

আবদুল খালেক কহিল, তা খোদার ফজলে মন্দ চলছে না। মামুজানের মেহেরবানিতে আমার দুখখু ঘুচেছে! আজ প্রায় তিন বছর আম্মার এন্তেকাল হয়েছে, এরই মধ্যে মামুজানের পরামর্শমতো চলে আমার অবস্থা ফিরে গিয়েছে। আহা, এদ্দিন যদি মামুজানকে পেতাম, তবে কি আর শরিকের ঘরে গোলামি করতে যেতে হত? তা আম্মা ওঁর ওপরে এমন নারাজ ছিলেন যে, বাড়িতে পর্যন্ত আসতে দিতেন না।

কেন, সুদ খান বলেই তো!

তা ছাড়া আর কী? কিন্তু এমন লোক আর দেখি নি! সকলেই চায় গরিব আত্মীয়স্বজনের ঘাড় ভেঙে নিজের নিজের পেট ভরতে–কিন্তু ইনি গায়ে পড়ে এসে উপকার করেন। খালুজান যখন আমার মাইনে বন্ধ করে দিলেন, তখন উনিই তো এসে আমার সব দেনা। পরিশোধ করে আমাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে আনলেন, তারপর এইসব ক্ষেত-খামার, জমি-জারাত সব গুছিয়ে নিতেও তো আমাকে উনি কম টাকা দেন নি…।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ওঁর যে সুদের টাকা, ওইখানটাতেই তো একটু গোল রয়েছে।

আবদুল খালেক কহিল, তা থাকলই-বা গোল, তাতে কিছু আসে যায় না। আর সুদ নিয়ে ওঁর যে গোনাহ্ হচ্ছে তার ঢের বেশি সওয়াব হচ্ছে পরের উপকার করে। এতেই আল্লাহতালা আখেরাতে ওঁর সব গোনাহ মাফ করে দেবেন বলে আমার বিশ্বাস।

এই কথাটি লইয়া আবদুল্লাহ্ কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিল, কিন্তু কোনো সন্তোষজনক। মীমাংসায় উপনীত হইতে পারিল না। একটু পরে আবদুল খালেক আবার কহিতে লাগিল, দেখ ভাই, উনি যে শুধু টাকা দিয়েই লোকের উপকার করেন, তা নয়; সৎপরামর্শ দিয়ে বরং তার চেয়ে ঢের বেশি উপকার করেন। আজকাল যে আমি এই ক্ষেত-খামার-গরু ছাগল-হাঁস-মুরগি–এই-সব নিয়ে আছি, আগে কখনো স্বপ্নেও আমার খেয়ালে আসে নি যে, এ-সব করে মানুষ সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে। এই পানের বরজ একটা জিনিস, যাতে বেশ দু পয়সা আয় হয়, এ তো বারুইদেরই একচেটে; কোনো শরীফজাদাকে বলে দেখো পানের বরজ করতে, অমনি সে আড়াই হাত জিভ বার করে বলবে, সর্বনাশ, ওতে জাত থাকে! ক্ষেতি-টেতির বেলাতেও সেই রকম; তাতে যে একটু নড়েচড়ে বেড়াতে হয়, সেই জন্যেই শরীফজাদাদের ওসব দিকে মন যায় না। ঘরে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং দিয়ে দুমুঠো মোটা ভাত জুটলেই তারা বিেশ থাকেন। নিতান্ত দায়ে ঠেকলে পরের গোলামি করে জুতো-লাথি খাবেন তাও স্বীকার, তবু ও-সব ছোটলোকের কাজে হাত দিয়ে জাত খোয়াতে চান না। এই আমার কী দশা ছিল, দেখ না; বিষয় যা পেয়েছিলাম, তাতে তো আর সংসার চলে না। কী করি, গেলাম ওঁদের গোলামি করতে–জমি-জারাত যা ছিল, সেগুলো যে খাঁটিয়ে খাব, সে চিন্তাই মনে এল না! তারপর মামুজান এসে যখন পথে তুলে দিলেন তখন চোখ ফুটল।

আবদুল্লাহ্ তন্ময় হইয়া কথাগুলি শুনিতেছিল। শুনিতে শুনিতে প্রতি মুহূর্তে তাহার মনের ভিতর নানাপ্রকার চিন্তা বিদ্যতের ন্যায় খেলিয়া যাইতেছিল। আর পড়া কি চাকরি-বাকরির দিকে না গিয়া ভাইজানেরই পথ অবলম্বন করিবে–কিন্তু তাহার উপযুক্ত জমি তেমন নাই, নগদ টাকাও নাই, কেমন করিয়া আরম্ভ করিবে? ফুফাজানের সাহায্য চাহিবে? আম্মা তাতে নারাজ হইবেন। তবে কিছুদিন চাকরি করিয়া টাকা জমাইয়া ওই সব কাজ শুরু করিয়া দিবে। সে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল, আচ্ছা, ভাইজান, আজকাল আপনি কী কী কাজ নিয়ে আছেন? আর কোন্ কোন্‌টায় বেশ লাভ হচ্ছে?

আবদুল খালেক কহিতে লাগিল, আমি হাত দিয়েছি তো ঢের কাজে–তা কোনোটাতেই লাভ মন্দ হচ্ছে না। আমার জমি বেশি নেই, ধান যা পাই, তাতে একরকম করে বছরটা কেটে যায়। তা ছাড়া আমার ক্ষেতগুলোতে হলুদ, –এটাতে খুবই লাভ আদা, মরিচ, সর্ষে, কয়েক রকম কলাই, তারপর পিঁয়াজ, রসুন, তরিতরকারি–এসব যথেষ্ট হয়, খেয়েদেয়েও ঢের বিক্রি করতে পারি। গোটা চারেক বরজ করিছি, তাতেও বেশ আয় হচ্ছে। সুপুরি নারিকেলের গাছ আমার বেশি নেই, আরো কিছু জমি নিয়ে বেশি করে লাগাব মনে কচ্ছি। যে জমিতে এগুলো দেব, সেখানে কলার বাগান করা যাবে, যদ্দিন ফসল না পাওয়া যায়, তদ্দিন কলা থেকেও কিছু কিছু আয় হবে। তারপর দেখ, মাছ তো আমাকে। আর এখন কিনতেই হচ্ছে না, কাজেই বাজার খরচ বলে একটা খরচ আমার একরকম করতেই হয় না বললে চলে। ছাগল, মুরগি, হাঁস এ-সব দেদার খেয়েও এ-বছর বেচেছি প্রায় শ দেড়েক টাকার, ক্রমে আরো বেশি হবে। একটু ভেবে দেখলে এই রকম আরো ঢের উপায় বার করা যায়, যাতে কারুর গোলামি না করে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কাটানো যেতে পারে।

এই সকল বিবরণ শুনিয়া আবদুল্লাহর মনে বড়ই আনন্দ হইল। সে কহিল, আচ্ছা, ভাইজান, চোখের উপর উপায় করবার এমন এমন সুন্দর পন্থা থাকতে কেউ যায় গোলামি করতে আর কেউ-বা হাত-পা কোলে করে ঘরে বসে আকাশ পানে চেয়ে হা-হুঁতাশ করে। কী আশ্চর্য!

আবদুল খালেক কহিল, আমার নিজের জীবনে যা ঘটেছে, তাতে বুঝতে পাচ্ছি যে, আমাদের শরাফতের অভিমান, দারুণ আলস্য, আর উপযুক্ত উপদেষ্টার অভাব, এই তিনটে কারণে আমরা সংসারের সুপথ খুঁজে পাই নে। কোনো রকমে পেটটা চলে গেলেই আল্লাহ্ আল্লাহ করে জীবনটাকে কাটিয়ে দিই। আর নেহাত পেট যদি না চলে, তো ঝুলি কাঁধে নিয়ে সায়েলী কত্তে বেরুই।

এইরূপ কথাবার্তা কহিতে কহিতে মগরেবের সময় হইয়া আসিল দেখিয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, তবে এখন উঠি, ভাইজান!

আবদুল খালেক স্ত্রীকে ডাকিয়া কহিল, ওগো, শুনছ, আবদুল্লাহ্ রোখসৎ হচ্ছে– একবার এদিকে এস।

রাবিয়া রান্নাঘরে ছিল, তাড়াতাড়ি হাতের কাজ ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া কহিল, এখনই রোখৃসৎ হচ্চেন কী, খখানকার সাহেব! আজ রাত্রে আমাদের বাড়িতে খেতে হবে যে।

আবদুল খালেক কহিল, না গো না, তার আর কাজ নেই। এখানে যে ও বেড়াতে এসেছে, তাতেই ওর শ্বশুরবাড়িতে কত কথা হবে এখন।

আবদুল্লাহ্ সোৎসুকে জিজ্ঞাসা করিল, কেন–কেন?

আবদুল খালেক কহিল, আমাদের সঙ্গে যে ওঁদের আজকাল মনান্তর চলছে।

মনান্তর হল কিসে?

ওই যে কটা তালুক খালুজান বিক্রি কল্লেন, সে কটা মামুজান আমারই নামে বেনামী করে খরিদ করেছেন কিনা, তাই।

হ্যাঁ তা তো শুনেছি। কিন্তু তাতে আপনার সঙ্গে মনান্তর হল কেন?

খালুজানের ইচ্ছে ছিল, কোনো আত্মীয়স্বজন কথাটা না জানতে পারে। বরিহাটীর দীনেশবাবু ওঁয়াদের উকিল কিনা, তাকে দিয়ে গোপনে বিক্রি করবার বন্দোবস্ত করেছিলেন। কিন্তু এদিকে দীনেশবাবুর সঙ্গে মামুজানের খুব ভাব; তাই যখন মামুজান জানতে পেরে নিজেই নিতে চাইলেন, তখন দীনেশবাবু আর আপত্তি কল্লেন না। খালুজান কিন্তু মনে

করলেন যে, আমিই পাকেচক্রে মামুজানকে সন্ধান দিয়ে খরিদ করিয়েছি।

আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা, উনি যখন বেচলেনই তখন আপনিই না হয় কিনলেন, তাতে আপনার অপরাধ!

আবদুল খালেক কহিল, ওই তো কথা ঘোরে রে ভাই! অপরাধ যে আমার কী, সেটা আর বুঝলে না? ছিলাম ওঁদের গোলাম হয়ে আর আজ কিনা দু পয়সা উপায় কচ্ছি, তার ওপর আবার ওঁদের তালুক কিনে ফেললাম, এতে আমার স্পর্ধা কি কম হল?

আবদুল্লাহ্ ব্যঙ্গ করিয়া কহিল, তা তো বটেই!

সেইজন্যেই তো বলছিলাম, তুমি আমাদের সঙ্গে মেলামেশা খাওয়াদাওয়া কল্লে তোমার শ্বশুরবাড়িতে কথা উঠবে।

তা উঠলই বা! ওঁরা চটলেন তো ভারি বয়েই গেল! এমনিই বড় ভালবাসেন কিনা…

আরে না, না। তুমি তো আজ বাদে কাল চলে যাবে, তারপর এর ঝক্কি সইতে হবে আমাদেরই।

রাবিয়া এবং আবদুল্লাহ্ উভয়েই প্রায় সমবয়সী। আবদুল খালেকের বিবাহ হওয়া অবধি তাহাদের অনেকবার দেখা-সাক্ষাৎ হইয়াছে এবং স্বাভাবিক স্নেহশীলতাগুণে রাবিয়া আবদুল্লাহকে অত্যন্ত আপনার করিয়া লইয়াছে। আবদুল্লাহও তাহাকে আপন ভগ্নীর ন্যায় ভক্তি করে এবং ভালবাসে; বিশেষত রাবিয়ার নিপুণ হস্তের রন্ধন এবং পরিবেশন-কালে ততোধিক নিপুণ আদর-কুশলতা এমনি লুব্ধ করিয়া রাখিয়াছে যে, ভ্রাতার প্রত্যাখ্যানে সে আজ বড়ই মনঃক্ষুণ্ণ হইয়া গেল। অগত্যা সে কহিল, তবে থাক এ যাত্রা ভাবী সাহেবা! আমি কিন্তু কাল ভোরেই রওয়ানা হব।

রাবিয়া কহিল, সে কী, ভাই!–বাড়ি এসে কি এক দিন থেকেই চলে যেতে আছে?

না ভাবী সাহেবা, এবার আর থাকতে পারছি নে। আম্মা ও-দিকে পথ চেয়ে আছেন, পড়াশুনার তো কোনো বন্দোবস্ত এখনো হয়ে উঠল না, অন্তত কাজ-কর্মের চেষ্টা তো দেখতে হবে। মনটা বড় অস্থির হয়ে আছে। খোদা যদি দিন দেন, তবে কত আসব যাব, আপনাকে বিরক্ত করব। এখন তবে আসি।

এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ রাবিয়ার কদমবুসি করিয়া বিদায় লইল।

বাহিরে আসিয়া মীর সাহেবের নিকট বিদায় লইবার সময় তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তবে এখন তোমার পড়াশুনার কী করবে আবদুল্লাহ?

কিছু তো ঠিক করে উঠতে পাচ্ছি নে কী করব। ভাবছি মাস্টারি করে প্রাইভেট পড়ব।

সে কি সুবিধে হবে? তা হলে ল-টা আর পড়া হবে না…

তা জিজ্ঞাসা করবে ছিল

বছর দুই তিন মাস্টারি করে কিছু টাকা জমিয়ে শেষে ল পড়তে পারি।

ও, সে অনেক দূরের কথা। তার কাজ নেই, আমিই তোমার পড়ার খরচ দেব, তুমি কলেজে পড় গিয়ে!

আবদুল্লাহ্ তাহার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া কহিল, তা হলে তো বড়ই ভালো হয়, ফুফাজান। কিন্তু আম্মাকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখতে হবে।

তা জিজ্ঞাসা করবে বৈকি!

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, কিন্তু তিনি যদি আপনার টাকা নিতে না দেন?

মীর সাহেব একটু চিন্তিত হইয়া কহিলেন, তাও তো বটে! আমার টাকা নিতে আপত্তি করা তাঁর পক্ষে আশ্চর্য নয়। না হয় তুমি তাকে বোলো যে এ টাকা কর্জ নিচ্ছ, পরে যখন রোজগার করবে, তখন শোধ দেবে।

কিন্তু আবদুল্লাহর মনে খটকা রহিয়া গেল। তাহার মাতা যে সুদখোরের টাকা কর্জ লইতেও রাজি হইবেন, এরূপ সম্ভবে না। একটু ভাবিয়া অবশেষে সে কহিল, –আচ্ছা তাই বলে দেখব। নিতান্তই যদি আম্মা রাজি না হন, তখন মাস্টারি করতে হবে, আর কোনো উপায় দেখছি নে!

আবদুল খালেক কহিল, আরে তুমি আগে থেকেই এত ভাবছ কেন? বলে দেখ গে তো! রাজি হবেন এখন। মামুজান তো কর্জ দিচ্ছেন, তাতে আর দোষ কী!

মীর সাহেব কহিলেন, না, ভাববার কথা বৈকি! এঁরা সব পাক্কা দীনদার মানুষ, আমার সঙ্গে এদের ব্যবহার কেমন, তা জান তো!

আবদুল্লাহ্ কহিল, সেই জন্যেই তো আমি ভাবছি। তবু একবার বলে দেখি। তারপর আপনাকে জানাব।

এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ বিদায় গ্রহণ করিল।

১৬-২০. বড় দুইটি পুত্র

বড় দুইটি পুত্রের মধ্যে আবদুল কাদেরকেই একটু মানুষের মতো দেখা গিয়াছিল বলিয়া সৈয়দ সাহেব তাহার ওপর অনেক ভরসা করিয়া বসিয়া ছিলেন। আবদুল মালেক তো বাল্যকাল হইতেই বুদ্ধি-বিবেচনা বিষয়ে অভ্রান্ত স্থূলতা দেখাইয়া আসিতেছিল; তাই তাহার দ্বারা কাজের মতো কাজ কিছু একটা হইবার সম্ভাবনা না দেখিয়া তিনি পশ্চিম হইতে এক জন কারী (সুষ্ঠুভাবে কোরআন শরীফ পাঠে দক্ষ ব্যক্তি) আনাইয়া তাহাকে কোরআন মজিদ হেফজ (মুখস্থ) করিতে দিয়াছিলেন। তাহার পর মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর দিবারাত্র ঢুলিয়া ঢুলিয়া নানা সুরে নানা ভঙ্গিতে আয়েত (শ্লোক)-গুলি শতবার সহস্রবার আওড়াইয়া অবশেষে যখন আবদুল মালেক হাফেজ (আদ্যন্ত কোরআন মজিদ যাহার কণ্ঠস্থ) হইয়া উঠিল, তখন সৈয়দ সাহেব মনে করিলেন, যা হোক ছোঁড়াটার ইহকালের কিছু হোক না-হোক, পরকালের একটা গতি হইয়া গেল। এক্ষণে আবদুল কাদেরকে দিয়া কতদূর কী করানো যায়, তাহার দিকে মনোনিবেশ করিলেন।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর। আবদুল কাদের মাদ্রাসা পাস করিয়া পশ্চিমে যাইবে; সেখানকার বড় বড় আলেমগণের নিকট হাদিস, তফসির প্রভৃতি পড়িয়া দীনী এল এর (ধর্মবিষয়ক শিক্ষা) একেবারে চরম পর্যন্ত হাসেল (আয়ত্ত) করিয়া আসিবে, সৈয়দ সাহেব বহুকাল হইতে এই আশা হৃদয়ে পোষণ করিয়া আসিতেছিলেন। কিন্তু সে যখন তাঁহাকে এমন করিয়া দাগা দিয়া এলমে-দীনের পরিবর্তে এলমে-দুনিয়ার উপর ঝুঁকিয়া পড়িল, তখন তিনি ভয়ানক চটিয়া গেলেন এবং তাহার পড়াশুনা বন্ধ করিয়া দিয়া বাড়িতে আনাইয়া বসাইয়া রাখিলেন। রাগের মাথায় স্পষ্ট করিয়া মুখে কিছু না বলিলেও, ব্যবহারে। তাহার ঘোর বিরক্তি ও দারুণ অসন্তোষ পদে পদে প্রকাশ পাইতে লাগিল। এইরূপে বৎসরাধিক কাল কাটিয়া গেল।

আবদুল কাদেরের প্রকৃতি যে ধাতুতে গড়া তাহাতে অকর্মা হইয়া বসিয়া থাকা তাহার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর। প্রথম প্রথম কিছুদিন সে কর্মচারীদিগের সেরেস্তায় গিয়া বসিয়া জমিদারির কাজকর্ম দেখিতে আরম্ভ করিয়াছিল। আমলারা দেখিল মেজ মিয়া সাহেব যেরূপ উপদ্রব আরম্ভ করিয়াছেন, তাহাতে বেচারাদের চাকরি বজায় রাখা দায় হইয়া উঠিয়াছে। অবশেষে তাহারা একদিন খোদ্ কর্তাকে গিয়া ধরিয়া পড়িল; কর্তা আবদুল কাদেরকে ডাকিয়া ধমকাইয়া দিলেন এবং বুঝাইয়া দিলেন যে, আমলা-ফামলার কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করিতে যাওয়া জমিদার-পুত্রের পক্ষে সম্মানজনক নহে। পক্ষান্তরে ও-সকল কাজের ভিতর গিয়া ডুবিয়া পড়িলে দীনদারী বজায় রাখা অসম্ভব হয়; নহিলে কি তিনি নিজেই সব দেখাশুনা করিতে পারিতেন না! ওইসব দুনিয়াদারীর ব্যাপার আমলাদের উপর ছাড়িয়া দিতে পারিয়াছেন বলিয়াই তো তিনি নিশ্চিন্ত মনে খোদার নাম লইতে পারিতেছেন!

আবার বেকার বসিয়া বসিয়া কিছুকাল কাটিয়া গেল। অবশেষে একদিন আবদুল কাদের পিতার নিকট গিয়া প্রস্তাব করিল যে, সে কোনো একটা চাকরির সন্ধানে বিদেশে যাইতে চাহে। শুনিয়া সৈয়দ সাহেব একেবারে আকাশ হইতে পড়িলেন। জমিদারের ছেলে চাকরি করিবে–বিশেষ সৈয়দজাদা হইয়া! নাঃ, ছেলের আখেরাতের বিষয় আর উদাসীন হইয়া থাকিলে চলিতেছে না! অতঃপর সৈয়দ সাহেব প্রত্যহ দুবেলা তাহাকে কাছে বসাইয়া দীনী এলম্-এর ফজিলাত (গুণ) বয়ান (বর্ণনা) করিয়া, পুনরায় মাদ্রাসায় পড়ার আবশ্যকতা বুঝাইবার জন্য নানাপ্রকার নসিহৎ (উপদেশ) করিতে আরম্ভ করিলেন।

আল্লাহতালা মানুষকে দুনিয়ায় পাঠাইয়াছেন পরীক্ষা করিবার জন্য, কে কতদূর দুনিয়াদারির লোভ সামলাইয়া দীনদারীতে কায়েম থাকিতে পারে এবং তাহাকে ইয়াদ (স্মরণ করিতে পারে। যে গরিব, লাচার, তাহাকে অবশ্য সংসার চালাইবার জন্য খাটিতে হয়, খোদাকে ইয়াদ করিবার সময় বেশি পায় না, তাহার পক্ষে দিন-রাত এবাদত না করিতে পারিলেও মাফ আছে। কিন্তু আল্লাহতালা যাহাকে ধন-সম্পত্তি দিয়াছেন, সংসার চালাইবার ভাবনা ভাবিতে দেন নাই, তাহার পক্ষে পরীক্ষাটা আরো কঠিন করিয়াছেন। সে যদি দিন-রাত এবাদতে মশগুল না থাকে, তবে তাহার আর মাফ নাই। আর তেমন লোক যদি আবার দুনিয়াদারিতে মজিয়া পড়ে, তো সে নিশ্চয়ই জাহান্নামে যাইবে। অতএব যখন। আবদুল কাদেরের সংসারের ভাবনা আল্লাহতালা নিজেই ভাবিয়া রাখিয়া দিয়াছেন, তখন তাহার উচিত দীনের ভাবনা ভাবা, দীনী এল হাসেল করিয়া আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয় করা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু এত নসিহতেও কোনো ফল হইল না। আকবত-এর ভয় দেখাইয়াও সৈয়দ সাহেব পুত্রের মন ফিরাইতে পারিলেন না। সে আর মাদ্রাসায় পড়িতে চাহিল না। যদি পড়িতেই হয়, তবে সে ইংরেজি পড়িবে, আর যদি তাহা পড়িতে নাও দেন, তাহা হইলে যে-টুকু সে শিখিয়াছে, তাহাতেই করিয়া খাইতে পারিবে। সুতরাং অনন্যোপায় হইয়া সৈয়দ সাহেব সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিবার ভয় দেখাইতে বাধ্য হইলেন। এইটিই তাহার হাতের শেষ মহাস্ত্র ছিল এবং মনে করিয়াছিলেন, এ মারাত্মক অস্ত্র ব্যর্থ হইবে না।

আবদুল কাদের নিতান্ত নির্বোধ ছিল না। সে বুঝিতে পারিয়াছিল যে, পিতার সম্পত্তি ভ্রাতা-ভগ্নীগণের মধ্যে বিভাগ হইয়া গেলে আর পায়ের উপর পা দিয়া বড়-মানুষি করা চলিবে না; বিশেষত পিতা যেরূপ অবিবেচনার সহিত খরচ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন, তালুক বিক্রয় করিয়া মসজিদ দিতেছেন, তাহাতে শেষ পর্যন্ত সম্পত্তির যে কতটুকু থাকিয়া যাইবে, তাহা এখন বলা যায় না। এরূপ অবস্থায় পিতা তাহাকে যেটুকু সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিবার ভয় দেখাইতেছেন, সেটুকু থাকিলেও বড় লাভ নাই, গেলেও বড় লোকসান নাই। সুতরাং পিতার মহাস্ত্রের ভয়েও সে টলিল না, বরং জেদ করিতে লাগিল, তাহাকে এন্ট্রান্সটা পাস করিতে দেওয়া হউক, নতুবা সে নিজের পথ দেখিবার জন্য গৃহত্যাগ করিয়া যাইবে।

সৈয়দ সাহেব অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া কহিলেন, তবে তুই দূর হয়ে যা–তোর সঙ্গে আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

আবদুল কাদের খুশি হইয়া ভাবিল, –সে তো তাহাই চাহে। মুখে কহিল, জি, আচ্ছা, তাই যাচ্ছি।

তাহার পর সত্য সত্যই সে একদিন বাটী হইতে বাহির হইয়া গেল।

.

১৭.

গৃহত্যাগ করিয়া আবদুল কাদের বরিহাটীর সদরে আসিয়া তাহার সহপাঠী ওয়াহেদ আলীর বাটীতে আশ্রয় লইল। ওয়াহেদ আলী তখন বাটীতে ছিল না; কিছুদিন পূর্বে সে পুলিশের সব্‌-ইনস্পেক্টারি চাকরি পাইয়া ট্রেনিঙের জন্য ভাগলপুরে চলিয়া গিয়াছিল। তাহার পিতা আকবর আলী আবদুল কাদেরের পরিচয় পাইয়া সযত্নে তাহাকে নিজ বাটীতে স্থান দিলেন এবং চাকরি সম্বন্ধেও তাহাকে যথাসাধ্য সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন।

বরিহাটী জেলায় মোটের উপর মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা অধিক হইলেও শহরে মুসলমান বাসিন্দা বড় একটা দেখিতে পাওয়া যায় না। মুসলমান জমিদারগণের ভগ্নাবশেষ যে দুই-চারি ঘর এখনো টিকিয়া আছেন, সদরে বাড়ি করিয়া থাকিবার আবশ্যকতাও তাঁহাদের নাই, আর ক্ষমতাও নাই বলিলে চলে। তাহাদের বিষয়-সংক্রান্ত কাজকর্ম নায়েব গোমস্তা ও উকিলবাবুরাই করিয়া থাকেন, কৃচিৎ স্বয়ং হাজির হইবার দরকার পড়িলে নৌকায় আসেন এবং নৌকাতে থাকেন। তাই বলিয়া মুসলমান বাসিন্দা যে একেবারে নাই, তাহা নহে। শহরের এক প্রান্তে কয়েক ঘর পেয়াদা ও চাপরাসী শ্রেণীর লোক বাস করে; সেইটাই এখানকার মুসলমান পাড়া! আকবর আলী কালেক্টারির একজন প্রধান আমলা ছিলেন; চাকরি উপলক্ষে তাহাকে এখানে অনেক দিন হইতে বাস করিতে হইতেছে। কিন্তু অন্য কোথাও স্থান না পাইয়া তিনি এই মুসলমান পাড়াতেই বাসের উপযুক্ত খানকয়েক ঘর বাঁধিয়া লইয়াছেন।

যাহা হউক মুসলমানদিগের মধ্যে হিন্দু মহলে যা কিছু খাতির তা একশ্চন্দ্ৰস্তমো হন্তি গোছ আকবর আলীই পাইয়া থাকেন। কিন্তু সে খাতিরটুকুর মূলে, তাহার কার্যদক্ষতার গুণে সাহেব-সুবার সুনজর ব্যতীত আর কিছু ছিল কি না, তাহা সঠিক বলা যায় না।

বিদেশে অপরিচিত স্থানে একাধারে এহেন আশ্রয় ও সহায় পাইয়া আবদুল কাদের কতকটা আশ্বস্ত হইল বটে কিন্তু চাকরি কবে জুটিবে, ততদিন কেমন করিয়া নিজের খরচ চালাইবে, আর কতদিনই-বা বসিয়া পরের অন্ন ধ্বংস করিবে, ইহাই ভাবিয়া সে উতলা হইয়া উঠিল। সে আকবর আলীকে কহিল যে, যতদিন তাহার চাকরি না হয়, ততদিনের জন্য তাহাকে একটা প্রাইভেট টুইশন যোগাড় করিয়া দিলে বড় উপকৃত হইবে।

আকবর আলী তাহাকে বুঝাইয়া কহিলেন, –যদিও বরিহাটীতে অনেক শিক্ষিত লোকের বাস আছে, কিন্তু সকলেই হিন্দু; তাহাদের বাড়িতে টুইশন পাওয়া অসম্ভব, কেননা, একে তো তাহারা স্বজাতীয় লোক পাইতে অপরকে ও-কাজ দিতে রাজি হইবেন না, তাহার উপর আবার হিন্দু গ্রাজুয়েট, আণ্ডার-গ্রাজুয়েটের অভাব নাই, সুতরাং মাত্র এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়া মুসলমানের পক্ষে এ শহরে টুইশনের প্রত্যাশা করা ধৃষ্টতা বৈ আর কিছু নহে। তবে নিতান্ত যদি আবদুল কাদের বেকার থাকিতে অনিচ্ছুক হন, তবে আকবর আলী সাহেবের পুত্রটিকে মাঝে মাঝে লইয়া বসিলে তিনি বড়ই উপকৃত হইবেন।

এ প্রস্তাবে আবদুল কাদের সানন্দে সম্মত হইল এবং আকবর আলী সাহেবকে বহু। ধন্যবাদ দিয়া সেই দিন হইতেই তাহার পুত্রের শিক্ষকতায় লাগিয়া গেল। তাহার আগ্রহ এবং তৎপরতা দেখিয়া আকবর আলী মনে মনে সন্তুষ্ট হইলেন এবং যাহাতে সত্বর বেচারার একটা চাকরির যোগাড় করিয়া দিতে পারেন, তাহার চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

সৌভাগ্যক্রমে মাস দুইয়ের মধ্যেই একটি এপ্রেন্টিস্ সব্‌রেজিস্ট্রারের পদ খালি হইতেছে বলিয়া সংবাদ পাওয়া গেল। আকবর আলী অবিলম্বে আবদুল কাদেরকে লইয়া ম্যাজিস্ট্রেট করবেট সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলেন। করবেট সাহেব লোকটি বড় ভালো, যেমন কার্যদক্ষ, তেমনি খোশমেজাজ। অধীনস্থ কর্মচারীগণের ওপর তাহার মেহেরবানির সীমা নাই। দরিদ্র প্রজার সুখ-দুঃখও তাহার দৃষ্টি এড়াইতে পারে না এবং তাহাদের কিঞ্চিৎ উপকারের সুযোগ পাইলে তিনি তাহার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন।

আকবর আলী তাহার সম্মুখে নীত হইয়া যথারীতি সালাম করিলে সাহেব বলিয়া উঠিলেন, –গুডমর্নিং, মুন্সী, খবর কী?

আকবর আলী কহিলেন, থ্যাংক ইউ সার, খবর ভালোই। আজ একটা দরবার নিয়ে হুজুরে হাজির হয়েছি…।

বলা বাহুল্য, কথাবার্তা ইংরেজিতেই হইতেছিল।

সাহেব কহিলেন, –কেন, আপনার ছেলের চাকরি তো সেদিন হয়ে গেল, আবার কিসের দরবার?

আপনার দয়াতেই আমার ছেলের চাকরি জুটেছে, সেজন্য কী বলে আমি আমার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানাব, তা ভেবে পাই নে…

না না, মুন্সী, দয়াটয়া কিছু নয়, তবে উপযুক্ত লোক পেলে আমি অবশ্যই চাকরি দিয়ে থাকি…।

সেই ভরসাতেই আজ একজন দুস্থ মুসলমান উমেদারকে সঙ্গে করে এনেছি, স্যার! যদি হুকুম হয়…

আচ্ছা, তাকে আসতে বল, দেখি।

আকবর আলী তৎক্ষণাৎ বাহিরে গিয়া আবদুল কাদেরকে সঙ্গে করিয়া আনিলেন। আবদুল কাদের সালাম করিয়া দাঁড়াইলেন, করবেট সাহেব তাহার নাম, যোগ্যতা প্রভৃতি জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, –ওয়েল মুন্সী, এ তো এনট্রান্স পাস করে নাই। পাস না হলে আজ-কাল তো গভর্নমেন্ট আপিসে চাকরি হওয়া কঠিন–তবে বিশেষ ক্ষেত্রের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র।

আকবর আলী কহিলেন, –ইনি আপিসে কোনো চাকরি চান না স্যার; সব্‌রেজিস্ট্রারির জন্যে এপ্রেন্টিসী প্রার্থনা করেন…

সাহেব কহিলেন, –সে তো আরো কঠিন কথা! আজকাল যেসব গ্রাজুয়েট, আন্ডার গ্রাজুয়েট এসে সব্‌রেজিস্ট্রারির জন্যে উমেদার হচ্ছে…।

এন্ট্রান্স ফেলও তো আপনার কৃপায় পেয়ে যাচ্ছে, স্যার!

সাহেব একটু হাসিয়া বলিয়া উঠিলেন, –ও! আপনি উমাশঙ্কর বাবুর ছেলের কথা বলছেন? সে যে খুব সম্ভ্রান্ত বংশের লোক…

ইনিও কম সম্ভ্রান্ত বংশের লোক নন, স্যার! একবালপুরের জমিদারেরা যে কেমন পুরাতন ঘর তা স্যারের জানা আছে…

সাহেব কহিলেন, –ওঃ আপনি একবালপুরের সৈয়দ বংশের লোক বটে?–আপনার সঙ্গে আজ পরিচয় হওয়ায় বড়ই সুখী হলাম! তা আপনাদের মতো বড় ঘরের ছেলের চাকরির দরকার কী?

আবদুল কাদের কহিল, –আমাদের ঘরের অবস্থা আর আজ-কাল তেমন ভালো নেই, স্যার। এখন অন্য উপায়ে উপার্জন না কত্তে পাল্লে সংসারই চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। আপনি একটু দয়া কল্লে, স্যার, আমার কষ্ট দূর হতে পারে।

সাহেব একটু আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, –মুসলমান জমিদার ঘরের ছেলে হয়ে আপনি এমন কথা বলছেন! আমি দেখেছি, আপনাদের শ্রেণীর মধ্যে এমন লোকও আছে যে, ক্রমে দুরবস্থায় পড়েও গুমোর ছাড়ে না। লেখাপড়া শেখা, কি কোনো ব্যবসায় করা, ছোটলোকের কাজ বলে মনে করে–শেষটা তাদের বংশাবলীর ভাগ্যে হয় ভিক্ষা, না হয় জাল-জুয়াচুরি ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

আকবর আলী কহিলেন, –আমাদের ভিতরকার অবস্থা সম্বন্ধে আপনার চমৎকার বহুদর্শিতা আছে, স্যার।

হ্যাঁ, আমি অনেক ঘুরে ঘুরে দেখেছি বটে। দেখেশুনে সত্যই আমার মনে বড় দুঃখ হয় এদের জন্যে। কিন্তু যতদিন এরা লেখাপড়ার দিকে মন না দিচ্ছে, ততদিন কিছুতেই কিছু হতে পারবে না। দেখ, হিন্দুরা লেখাপড়া শিখে কেমন উন্নতি করে ফেলেছে– আপিসে আদালতে কি ব্যবসায়-বাণিজ্যে, যেখানে যেখানে দেশীয় লোক দেখতে পাই, কেবলই হিন্দু–ক্বচিৎ কালে-ভদ্রে একজন মুসলমান নজরে পড়ে। ক্রমে ওরাই দেশের সর্বেসর্বা হয়ে উঠবে, দেখতে পাবেন, আপনারা কেবল কাঠ কাটবার জন্যে পড়ে থাকবেন।

আকবর আলী কহিলেন, –আজ কাল দুই-একজন করে লেখাপড়া শিখতে আরম্ভ করেছে, স্যার, এই তো একজন আপনার কাছে হাজির করেছি…

ওঃ, এক-আধ জন একটু শিখলে তাতে তো ফল হয় না, আর ইনি তো পাসও কত্তে পারেন নি…

প্রথম অবস্থায় এইটুকুতেই একটু উৎসাহ না পেলে লেখাপড়ার দিকে লোকের উৎসাহ বাড়বে কেন, স্যার? প্রথম প্রথম তো আমরা হিন্দুদের সঙ্গে সমান সমান হয়ে প্রতিযোগিতা কত্তে পারব না, কাজেই গভর্নমেন্টের একটু বিশেষ নজর এ গরিবদের উপর থাকবে বলে ভরসা করি।

সাহেব কহিলেন, –কিন্তু এ কথা মনে রাখবেন, মুন্সী সাহেব, চিরদিন যদি আপনারা ওই বিশেষ নজরের ওপর নির্ভর করে থাকেন, তবে কখনই উন্নতি করে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সমকক্ষ হতে পারবেন না।

সে কথা খুবই ঠিক, স্যার। তবে বর্তমানে লেখাপড়ায় একটু কম থাকলেও, স্যার বোধহয় দেখেছেন, মুসলমান কর্মচারীরা কাজকর্মে নিতান্ত মন্দ দাঁড়ায় না…

তা দেখেছি বটে। আবার অনেক সময় বি-এ পাস হিন্দু দেখে লোক নিযুক্ত করে আমাকে ঠকতে হয়েছে। অবশ্য কেবল পাস হলেই যে লোক যোগ্য হল তা নয়, তবু গভর্নমেন্টের পক্ষে বাছাই করবার ওটা একটা সহজ উপায় বটে। সেইজন্যেই পাসটা আমাদের দেখতে হয়।

তবু স্যার, এর বেলায় আপনি একটু বিশেষ দয়া না করলে ভদ্রলোকের মারা পড়বার দশা। লেখাপড়া শিখবার এর খুবই আগ্রহ ছিল, কিন্তু এদিকে বয়সও বেড়ে চলল, অবস্থাতেও আর কুলাল না, কাজেই চাকরির চেষ্টা কত্তে হচ্ছে। গরিবের ওপর আপনার যেমন মেহেরবানি, তাতেই একে আজ আনতে সাহস করেছি…।

সাহেব কহিলেন, –আচ্ছা, আচ্ছা, আপনি একটা দরখাস্ত পাঠিয়ে দেবেন–এপ্রেন্টিসী খালি হলে আপনার বিষয় বিবেচনা করা যাবে। আর, মুন্সী, আপনি একটু নজর রাখবেন, সময়মতো আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবেন।

আকবর আলী কহিলেন, –সম্প্রতি একটা এপ্রেন্টিসী খালি হবার কথা শুনছি, স্যার। যদি হুকুম হয়, তবে আজই দরখাস্ত পেশ করি…

আচ্ছা, করতে পারেন, আমি আপিসে সন্ধান নিয়ে দেখব, খালি হচ্ছে কি না। যদি খালি হয়, তবে হয়তো পেতেও পারেন, কিন্তু আমি কোনো অঙ্গীকার কত্তে পারি নে, মুন্সী।

আপনি আশা দিলেন স্যার, তার জন্যেই আমরা কৃতজ্ঞ।

অল রাইট, মুন্সী, গুডমর্নিং! বলিয়া কিঞ্চিৎ ঘাড় নাড়িয়া তাহাদিগকে সাহেব বিদায়সূচক সম্ভাষণ করিলেন। তাঁহারাও থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, স্যার, গুডমর্নিং! বলিয়া এক সেলাম করিয়া বিদায় লইলেন।

বাহিরে বারান্দায় কয়েকজন ডেপুটি বাবু, পেশকার, উমেদার প্রভৃতি সাহেবের সহিত সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় বসিয়া ছিলেন। আকবর আলী তাহাদিগকে স্মিতমুখে সালাম করিলেন; কেহ কেহ সে সালাম গ্রহণ করিলেন, কেহ কেহ করিলেন না। তাহারা চলিয়া গেলে একজন জিজ্ঞাসা করিলেন–এ আর এক ব্যাটা নেড়ে এল কোত্থেকে হে?

পেশকার বাবু কহিলেন, সব মুন্সী কোত্থেকে জোটাচ্ছে, কে জানে! এক নেড়ে যখন ঢুকেছে, তখন নেড়েয় নেড়েয় মক্কা হয়ে যাবে দেখতে পাবেন;–আর আজকাল মুন্সীর তো পোয়াবারো! সাহেবের ভারি সুনজর! এই দেখুন না, কারু সঙ্গে সাহেব দুই-তিন মিনিটের বেশি আলাপ করেন না, আর মুন্সী প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সাহেবের সঙ্গে খোশআলাপ করে এল! অপর এক বাবু কহিলেন, –তা হবে না? আজকাল যে ওরা গভর্নমেন্টের পুষ্যি পুত্তুর হয়ে উঠেছে। তাহার পর তিনি চক্ষু দুইটি ঘুরাইয়া কহিলেন, –সার্কুলার বেরুচ্ছে চাকরি খালি হলে এখন নেড়েরাই পাবে। নেড়ে এ্যাঁপয়েন্ট না করতে পারলে আবার কৈফিয়তও দিতে হবে!…

এমন সময় বাবুটির তলব হইল; তিনি তাড়াতাড়ি চেয়ার হইতে লাফাইয়া উঠিয়া পকেট হাতড়াইয়া রুমাল বাহির করিয়া এক হাতে মুখ মুছিতে মুছিতে এবং আর এক হাতে চাপকানের দাম পাট করিতে করিতে দরজার চৌকাঠে ছোটখাটো একটা হোঁচট খাইয়া সেটা সামলাইতে সামলাইতে সাহেবের কামরায় গিয়া প্রবেশ করিলেন।

.

১৮.

হালিমাকে সঙ্গে লইয়া আবদুল্লাহ্ যখন গৃহে ফিরিল, তখন মাতা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন। বহুদিন তিনি কন্যাকে দেখেন নাই; ইতোমধ্যে তাহার একটি পুত্রও হইয়াছে। স্বামীর মৃত্যুতে তিনিও দারুণ শোক পাইয়াছেন, এক্ষণে শোকের ও আনন্দের যুগপৎ উচ্ছ্বাসে অধীর হইয়া কন্যাকে কোলে টানিয়া লইয়া কাদিতে লাগিলেন, আবার পরক্ষণেই তাহার পুত্রটিকে বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া অশ্রুসিক্ত মুখে হাসিয়া ফেলিলেন। কিন্তু সে যখন তাহার অজস্র চুম্বনে অস্থির হইয়া কাঁদিয়া ফেলিল, তখন তিনি তাহাকে ভুলাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন; তাহাকে কোলের উপর নাচাইয়া কাক, বিড়াল, মুরগি, যাহা যেখানে ছিল, সব ডাকিয়া, এটা ওটা সেটা দেখাইয়া তাহাকে হাসাইয়া দিলেন।

কিন্তু এ আনন্দের মধ্যেও তাহার মনের কোণে দুইটি কারণে দুঃখের কুশাঙ্কুর বিধিয়া রহিল, –বউ আসে নাই, সে এক কারণ, আর আবদুল্লাহর পড়ার কোনো বন্দোবস্ত হইল না, সেই আর এক কারণ। আবদুল্লাহর শ্বশুর তো সাহায্য করিতে রাজি হইলেন না; মীর সাহেব যদিও সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছেন বলিয়া আবদুল্লাহর মুখে শুনিলেন, কিন্তু সে সাহায্য গ্রহণ করা ভালো বিবেচনা করিলেন না। সুতরাং আর কোনো উপায় নাই; আবদুল্লাহ্কে চাকরির সন্ধানেই বাহির হইতে হইবে। আবার বাহির হইতে হইলে কিছু খরচপত্র চাই, তাহারও যোগাড় করা দরকার; এই সকল কথা ভাবিয়া মাতা বড়ই অস্থির হইয়া উঠিলেন।

কয়েকদিন ধরিয়া ভাবিয়া ভাবিয়া টাকা সংগ্রহের কোনো উপায় স্থির করিতে না পারিয়া শেষে পুত্রকে ডাকিয়া কহিলেন, –বিদেশে যাবি বাবা, কিছু টাকা তো হাতে রাখতে হয়! তা আমার যা দুই একখানা গয়না আছে সেগুলো বেচে ফেল্!

আবদুল্লাহ্ কহিল, –কীই বা এমন আছে, আম্মা, ওগুলো না হয় ঘর বলে থাক। আমি যোগাড় করে নেবখন…।

কোথা থেকে যোগাড় করবি, বাবা?

হালিমা কহিল, –আমার হাতে কিছু আছে, ভাইজান, আমি দিচ্ছি।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –না, না, ও টাকা থাক, সময়-অসময়ে কাজে লাগবে…

হালিমা বাধা দিয়া কহিল, –তা বেশ তো, আপনার অসময় পড়েছে, ভাইজান, তাই তো কাজে লাগাতে চাচ্ছি। কেন মিছিমিছি ধার-কর্জ কত্তে যাবেন; এই টাকাই নেন, তারপর খোদা যদি দিন দেন, তখন না হয় আবার আমাকে দেবেন।

মাতাও হালিমার এই প্রস্তাবে মত দিলেন। অগত্যা তাহাকে ভগ্নীর নিকট হইতেই টাকা লইতে রাজি হইতে হইল।

স্থির হইল, সে প্রথম কলিকাতায় গিয়া তাহাদের পুরাতন মেসে বাসা লইবে এবং চাকরির সন্ধান করিবে। আবদুল্লাহ্ আশা করিয়াছিল, কলিকাতায় গেলে নিশ্চয়ই একটা কিনারা করিতে পারিবে। সে বিশাল নগরীতে শত-সহস্র লোক উপার্জন করিতেছে, চেষ্টা করিলে তাহারও কি একটা উপায় হইবে না! আশায়, উৎসাহে সে কলিকাতায় যাইবার আয়োজন করিতে লাগিল।

এমন সময় বরিহাটী হইতে আবদুল কাদেরের এক পত্র আসিল। অনেক দিন পরে তাহার পত্র পাইয়া আবদুল্লাহ্ ক্ষিপ্রহস্তে খুলিয়া এক নিশ্বাসে পড়িয়া ফেলিয়া, আম্মা, আম্মা, হালিমা, হালিমা বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে বাড়ির ভিতর ছুটিয়া আসিল। তাহার ব্যস্ততা দেখিয়া মাতা তাড়াতাড়ি রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী, কী, আবদুল্লাহ্, কী হয়েছে?

আবদুল কাদেরের চাকরি হয়েছে, আম্মা!

আলহামদো লিল্লাহ্! কী চাকরি পেয়েছে, বাবা?

সব্‌রেজিস্ট্রার হয়েছে–এখন উমেদারি কচ্ছে, তাতেও মাসে কুড়ি টাকা করে পাবে, এর পরে পাকা চাকরি পেলে মাসে এক শ কি দেড় শও পেতে পারে।

শুনিয়া মাতা খোদার কাছে হাজার হাজার শোকর করিতে লাগিলেন। হালিমা তাহার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়া শুনিতেছিল; আনন্দে তাহার হৃদয় ভরিয়া উঠিল। শ্বশুরালয়ে একেবারেই তাহার মন টিকিত না; এইবার খোদার ফজলে স্বামীর যখন চাকরি হইয়াছে, তখন নিজের সংসার গুছাইয়া পাতিয়া লইয়া পছন্দমতো থাকিতে পারিবে, ইহাই মনে করিয়া সে মনে মনে একটা সোয়াস্তি অনুভব করিল।

মাতা একটু ভাবিয়া কহিলেন–তা তুইও ওই চাকরির চেষ্টা কর না বাবা!

আবদুল্লাহ্ কহিল, সেও তো তাই লিখেছে, আর আমাকে বরিহাটীতে যেতেও বলেছে। কিন্তু ওদিকে গেলে যে আর পড়াশুনা করা যাবে না। আমার ইচ্ছে, মাস্টারি করে বি-এ পাস করি। বিএ পাস কত্তে পাল্লে ও সবরেজিস্ট্রারির চাইতে ঢের ভালো চাকরি পাওয়া যাবে–আর না হলে ওকালতিও তো করা যাবে।

সংসারের উপস্থিত টানাটানির কথা ভাবিয়া মাতা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন; কিন্তু পুত্রের সঙ্কল্পের কোনো প্রতিবাদ করিলেন না। কহিলেন, –আচ্ছা, বাবা, যা ভালো বোঝ, তাই কর। খোদা এক রকম করে চালিয়ে দেবেন।

এদিকে আবদুল্লাহর রওয়ানা হইবার সময় নিকট হইয়া আসিয়াছে। সে তাড়াতাড়ি আবদুল কাদেরের পত্রের জবাব লিখিয়া ফেলিল। তাহাতে পিতার মৃত্যু সংবাদ হইতে আরম্ভ করিয়া তাহার শ্বশুরবাড়ির ঘটনা এবং চাকরির সন্ধানে কলিকাতায় যাওয়ার বন্দোবস্তের কথা পর্যন্ত মোটামুটি লিখিয়া দিল এবং কলিকাতায় গিয়া কোথায় থাকিবে, কী করিবে, না করিবে সে সকল বিষয় সেখানে গিয়া পরে জানাইবে, তাহাও বলিয়া রাখিল।

যাত্রাকালে মাতা কহিলেন, –একটা খোশ-খবর নিয়ে যাত্রা করলি বাবা, খোদা বোধহয় ভালো করবেন। বিসমিল্লাহ বলিয়া আশায় বুক বাঁধিয়া আবদুল্লাহ রওয়ানা হইয়া গেল।

কিন্তু যে আশা ও উৎসাহ লইয়া আবদুল্লাহ্ কলিকাতায় আসিল, দুদিনেই তাহা ভঙ্গ হইয়া গেল। কোনো স্কুলেই মাস্টারি জুটিল না। কলিকাতায় এক মাদ্রাসা ভিন্ন তখন আর মুসলমান স্কুল ছিল না; সেখানে একটা চাকরি খালি পাইয়াও, আর একজন বিহারবাসী উমেদারের বিপুল সুপারিশের আয়োজনের সম্মুখে সে তিষ্ঠিতে পারিল না।

এইরূপে কয়েক মাস বেকার কাটিয়া গেল। হালিমা যে কয়টি টাকা দিয়াছিল, তাহাও প্রায় ফুরাইয়া আসিল, অথচ উপার্জনের কোনোই কিনারা হইল না। এদিকে আবদুল্লাহ কাহারো বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজও খুঁজিতেছিল। কিন্তু মুসলমানগণের ঘরে বড়জোর পাঁচ টাকায় আপারা এবং উর্দু পড়াইবার কাজ মিলিতে পারে; তাও আবার ইংরেজি-পড়া লোক দেখিলে লোকে আমল দিতে চায় না। যাহা হউক অনেক অনুসন্ধানের পর অবশেষে মীর্জাপুরের জনৈক ধনী চামড়াওয়ালার বাড়িতে আহার ও বাসস্থানসহ পনর টাকা বেতনে দুইটি বালকের শিক্ষকতা পাইয়া আবদুল্লাহ্ আপাতত হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল।

কিন্তু গৃহশিক্ষকের কাজ করিয়া বি-এ পাস করিবার সুযোগ পাওয়া যাইবে না। প্রাইভেট দিতে হইলে কোনো স্কুলে মাস্টারি করা চাই; আর কলেজে পড়িতে গেলে এ সামান্য বেতনে চলা কঠিন, তবে যদি ফ্রি স্টুডেন্ট হইতে পারে, তাহা হইলে ওই পনরটি টাকা হইতে অন্তত বারটি করিয়া টাকা মাসে মাসে মাকে পাঠাইতে পারিবে। কিন্তু এ বৎসর আর সময় নাই; এখন এইভাবেই চলুক; আগামী গ্রীষ্মের বন্ধের পর কোনো কলেজে ফ্রি পড়িবার জন্য চেষ্টা করা যাইবে। আর ইতোমধ্যে যদি একটা মাস্টারি কোনো স্কুলে জুটিয়া যায়, তবে তো কথাই নাই; নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া প্রাইভেট পরীক্ষা দিতে পারিবে।

সৌভাগ্যক্রমে চাকরির জন্য আবদুল্লাহকে অধিক দিন বসিয়া থাকিতে হইল না। কলিকাতায় আসার পর সে আবদুল কাদেরের সহিত রীতিমতো পত্র ব্যবহার করিতেছিল। ইতোমধ্যে তাহার নিকট হইতে সংবাদ পাইল যে বরিহাটীর গভর্নমেন্ট স্কুলে একজন মুসলমান আন্ডারগ্রাজুয়েট চাই, বেতন চল্লিশ টাকা। বিলম্বে ফসকাইয়া যাইতে পারে, সুতরাং আবদুল্লাহ্ যেন পত্রপাঠ চলিয়া আসে।

আবার আবদুল্লাহর মন আশার আনন্দে নাচিয়া উঠিল। সেইদিন রাত্রের মেলে রওয়ানা হইয়া পর দিন বরিহাটীতে গিয়া উপস্থিত হইল। আবদুল কাদের তাহাকে দেখিয়া এত খুশি হইল যে, সে আবদুল্লাহূকে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া কহিল, –ভাই, খোদার মরজিতে যদি তুমি এ চাকরিটা পাও, তবে আমরা দুজনে এক জায়গাতেই থাকতে পারব।

আবদুল্লাহ কহিল, –দাঁড়াও ভাই, আগে পেয়েই তো নিই। তুমি যে গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল গোছ কচ্ছ।

আরে না না, শুনলাম এবার নাকি ডিরেক্টার আপিস থেকে চিঠি এসেছে, একজন মুসলমান নিতেই হবে। আর ক্যান্ডিডেট কোথায়? থাকলেও ভয় নেই খোদার ফজলে। আমাদের মুন্সী সাহেবের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের খুব খাতির–আর তিনিই স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট কিনা। ও এ্যাপয়েন্টমেন্ট তারই হাতে। মুন্সী সাহেবকে সঙ্গে দিয়ে তোমাকে কালই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি, দাঁড়াও।

আবদুল কাদেরের আশাপূর্ণ কথায় আবদুল্লাহ্ মনে মনে অনেকটা বল পাইল। সে ভাবিল, –চল্লিশ টাকা তাহার জন্য এখন খুবই যথেষ্ট হইবে; বাসা খরচ পনর টাকা করিয়া লাগিলেও পঁচিশ টাকা সে মাকে পাঠাইতে পারিবে–আর আবদুল কাদেরও হালিমাকে মাসে মাসে পাঁচটি করিয়া টাকা পাঠাইতেছে। ওঃ, খোদা চাহে তো সংসারের আর কোনোই ভাবনা থাকিবে না।

এইরূপ কল্পনা-জল্পনা করিতে করিতে আবদুল্লাহ আহারাদি করিয়া একখানি দরখাস্ত লিখিয়া হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করিতে চলিল। স্কুলে উপস্থিত হইয়া জনৈক ভৃত্যকে হেডমাস্টারের কামরা কোথায় জিজ্ঞাসা করিল। সে একবার আবদুল্লাহর আপাদমস্তক ভালো করিয়া দেখিয়া লইয়া কহিল, –একখানা কাগজে নাম এবং কী জন্য দেখা করিতে চাহেন তাহা লিখিয়া দিতে হইবে। আবদুল্লাহ্ তাহাই লিখিয়া দিল। কিছুক্ষণ পরে ভৃত্যটি আসিয়া তাহাকে হেডমাস্টারের কামরায় লইয়া গেল।

আবদুল্লাহ্ কামরায় প্রবেশ করিতেই হেডমাস্টার চেয়ার হইতে উঠিয়া সবেগে তাহার সহিত করমর্দন করিলেন এবং হাতমুখ নাড়িয়া অদ্ভুত বিকৃত উচ্চারণে বলিয়া ফেলিলেন, আইয়ে জনাব, বয়ঠিয়ে, আপ কাঁহা সে আসতে হ্যাঁয়?

আবদুল্লাহ্ বিনয়ের সহিত কহিল, –স্যার, আমি বাঙালি, আমার সঙ্গে বালাতে কথা বলতে পারেন।

হেডমাস্টার একটু ঘাড় নিচু করিয়া তাহার নাসিকার মধ্যস্থিত চশমাটির উপর হইতে আবদুল্লাহর দিকে নেত্রপাত করিয়া কহিলেন, –ওঃ হো! আপনি বাঙালি? বেশ, বেশ, আপনার পোশাক দেখে আমি ঠাউরেছিলাম যে, আপনি দিল্লি কিংবা লাহোর না হোক, অন্তত ঢাকা কিংবা মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে এসেছেন; সেখানকার নবাব ফ্যামিলির লোকেরা এই রকমই পোশাক পরেন কিনা!

আবদুল্লাহ্ একটুখানি হাসিয়া কহিল, –কেন, মুসলমানেরা সব জায়গাতেই তো এই রকম আচকান আর পায়জামা পরে…।

কই মশায়, আমি তো দেখতে পাই এখানে কেউ টুপিটা পর্যন্ত পরে না। তা এরা সব—এই–ছোটলোক কিনা, চাষাভুষো; এসব পোশাক ওরা কোত্থেকে পাবে!

আবদুল্লাহ কহিল, হ্যাঁ, তা সম্ভান্ত লোকমাত্রেই এইরকম পোশাক ব্যবহার করেন…

তা বৈকি! তবে আপনাদের মতো সম্ভ্রান্ত লোক এ অঞ্চলে কটিই বা আছেন!

আবদুল্লাহ্ একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, –মশায়ের কাছে একটা দরবার নিয়ে এসেছিলাম…

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি বুঝি এই পোস্টটার জন্যে স্ট্যান্ড কত্তে চান? তবে কি জানেন, এতে মাইনে অতি সামান্য, প্রসপেক্টও কিছু নেই, আপনাদের মতো লোকের কি আর এসব চাকরি পোষাবে? আমি তাই ভাবছি।

আমাদের অবস্থা নিতান্ত মন্দ স্যার। বি-এ পড়ছিলাম, হঠাৎ আমার ফাদার মারা গেলেন, কাজেই আর পড়াশুনো হল না, আর এখন চাকরি ছাড়া সংসার চালাবার উপায় নেই…

ওঃ বটে? তবে তো বড়ই দুঃখের বিষয়! তা আপনি একটু চেষ্টা কল্লে খুব ভালো চাকরিই পেতে পারেন। ডিপুটি না হোক, সব্‌ডিপুটি তো চট করে হয়ে যাবেন। কেন মিছিমিছি এই সামান্য মাইনের চাকরি করবেন, এতে না আছে পয়সা, না আছে ইজ্জত…

আমার তেমন মুরব্বি নেই স্যার, আর ডিপুটি সবুডিপুটি ওসব বি-এ পাস না হলে হয় না…

কে বলেছে আপনাকে? আপনাদের বেলায় ও-সব কিছুই লাগে না। একবার গিয়ে দাঁড়ালেই হল। আজকাল যে সব গভর্নমেন্ট সার্কুলার বেরুচ্ছে, মুসলমান হলেই সে চাকরি পাবে, তা কি আপনি জানেন না?

শুনেছি বটে, কিন্তু মুসলমান হলেই তো হয় না; উপযুক্ত যোগ্যতা থাকা চাই, আবার যোগ্য লোকদের মধ্যেও কমপিটিশন আছে। যার ভালো সুপারিশ নেই, তার পক্ষে যোগ্য হলেও ওসব বড় চাকরির আশা করা বিড়ম্বনা।

হেডমাস্টার বামপার্শ্বস্থ জানালার বাহিরে দৃষ্টিস্থাপন করিয়া টেবিলের উপর অঙ্গুলির আঘাত করিতে করিতে কহিলেন, –ভুল ভুল! এমনি করেই আপনারা নিজেদের প্রসপেক্ট মাটি করেন।

তাহার পর আবদুল্লাহর দিকে চাহিয়া কহিলেন, –আমি আপনার ভালোর জন্যেই পরামর্শ দিচ্ছিলাম, একটু চেষ্টা কল্লেই আপনি এর চেয়ে ভালো চাকরি পেতেন। সরেজিস্ট্রারিও তো মাস্টারির চাইতে অনেক ভালো। এই তো সেদিন আপনাদেরই জাতের একজন সব্‌রেজিস্ট্রারি পেয়ে গেল, সে তো ফোর্থ ক্লাস পর্যন্তও পড়ে নি। এক কলম ইংরেজি লিখতে পারে না, কওয়া তো দূরের কথা। হাতের লেখাও একেবারে ছেলে মানুষের মতো, তবু সাহেব কেবল মুসলমান দেখেই তাকে চাকরি দিয়েছেন।

আপনি কি আবদুল কাদেরের কথা বলছেন, –এই মাস তিন চার হল এপ্রেন্টিস্ হয়েছে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, তারই কথা বলছি–আপনি তাকে জানেন তা হলে?

জানি একটু একটু।

তবে দেখুন দেখি, সে এই বিদ্যে নিয়ে চাকরিটা পেলে, আর আপনি বি-এ পর্যন্ত পড়ে ডিপুটি হতে পারবেন না!

তার সম্বন্ধে বোধহয় আপনি ঠিক খবর পান নি, স্যার। সে এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়েছে, আর এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়া অনেক হিন্দুই যখন সরেজিস্ট্রার হতে পেরেছেন, তখন সে হিসেবে আবদুল কাদেরকে তো অযোগ্য বলা যায় না। আর এদিকে সে ইংরেজিও খুব ভালোই জানে, হাতের লেখাও চমৎকার। এই দেখুন, তার একখানা চিঠি আমার পকেটে ছিল, পড়ে দেখতে পারেন।

হেডমাস্টার চিঠিখানি পরম আগ্রহের সহিত হাত বাড়াইয়া লইলেন এবং ঘাড় উঁচু করিয়া দূর হইতে চশমার ভিতর দিয়া গভীর মনোযোগের সহিত চিঠিখানি উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিলেন। পরে চশমার উপর দিয়া আবদুল্লাহর দিকে তাকাইয়া কহিলেন, বটে? এ তো দেখছি বেশ লেখা! আর ইংরেজিও খাসা; কে বলতে পারে এন্ট্রান্স পড়া লোকের লেখা! একেবারে বি-এ পাসের মতো বলেই বোধ হচ্ছে! আমি নিশ্চয়ই আর কারুর কথা শুনেছিলাম। কী জানেন, আপনাদের নামগুলো সকল সময় মনে থাকে না, তাই কার কথা। শুনি আর কাকে মনে করি। তা যাক, আপনি তা হলে এই পোস্টের জন্যেই এ্যাঁপ্লাই করবেন, স্থির করেছেন?

হ্যাঁ, সার এ্যাপ্লিকেশন ও সঙ্গে এনেছি। বলিয়া আবদুল্লাহ দরখাস্তখানি পেশ করিল। হেডমাস্টার সেখানি এক নজর দেখিয়া লইয়া টেবিলের উপর চাপা দিয়া রাখিলেন এবং কহিলেন–বেশ, এখন রইল আপনার এ্যাপ্লিকেশন । এখনো এ্যাপয়েন্টমেন্টের দেরি আছে। সময়মতো খবর পাবেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –তবে এখন উঠি, স্যার। দয়া করে মনে রাখবেন, এটা পেলে আমার বড় উপকার হবে।

তা নিশ্চয়ই আপনাকে আর ও সম্বন্ধে কিছু বলতে হবে না, আমার যতদূর সাধ্য আপনার জন্যে চেষ্টা করব।

আবদুল্লাহ্ তাহাকে ধন্যবাদ দিয়া বিদায় হইল। সেদিন সন্ধ্যার পর আকবর আলীর বৈঠকখানায় আবদুল্লাহর উমেদারির প্রথম অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে আলোচনা চলিতেছিল। হেডমাস্টারের সঙ্গে তাহার যে সকল কথাবার্তা হইয়াছিল তাহা সবিস্তারে শুনিয়া আকবর আলী কহিলেন, — আপনি খুব টিকে গিয়েছেন, যা হোক।

আবদুল্লাহ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, — টিকে গেলাম কেমন?

লোকটার চেষ্টা ছিল, আপনাকে খুব আমড়াগাছী করে ও ছোট চাকরি যাতে আপনি নিতে না চান তাই করা। দেখুন না, প্রথমেই আপনাকে নবাব ফ্যামিলির সঙ্গে তুলনা করে দিল–তারপরে বললে, মুসলমান হলেই বড় চাকরি পায়, পাসটাসের দরকার হয় না–

এইসব শুনেটুনে হয়তো আপনার মাথা ঘুরে যেত…।

তা আমাকে ভোগা দিয়ে ওঁর কী লাভ? এ পোস্টে তো মুসলমানই নেবে বলে এ্যাঁভার্টাইজ করেছে…

তা করুক। যদি মুসলমান ক্যান্ডিডেট কেউ এ্যাঁপ্লাই করে, তা হলে তো শেষটা হিন্দুই ওটা পাবে।

আবদুল্লাহ্ এতটা তলাইয়া দেখে নাই। এক্ষণে আকবর আলী সাহেবের নিকট গূঢ়ার্থ অবগত হইয়া সে একেবারে আশ্চর্য হইয়া গেল। রাত্রে শুইয়া শুইয়া সে অনেকক্ষণ ভাবিল, পরস্পর সহৃদয়তার এমন অভাব যেখানে সেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করে কেমন করিয়া? আর যদি সে এ চাকরি পায়, তাহা হইলে এরূপ লোকের অধীনে কাজ করিয়া তো সুখ পাইবে না! যা হোক, খোদা যা করেন, ভালোই করিবেন, এই বলিয়া সে আপাতত মনকে প্রবোধ দিল।

পরদিন আকবর আলী তাহাকে সঙ্গে লইয়া ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে গেলেন। সাহেব কোনো অঙ্গীকারে আবদ্ধ হইতে পারিলেন না, তবে যদি যোগ্যতর লোক না পাওয়া যায়, তাহা হইলে আবদুল্লাহর বিষয়ে বিবেচনা করিবেন বলিয়া ভরসা দিলেন। আবদুল্লাহ্ সেই রাত্রেই কলিকাতায় ফিরিয়া গেল।

যথাসময়ে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কুঠিতে কমিটির অধিবেশন হইল। ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং প্রেসিডেন্ট, হেডমাস্টার সেক্রেটারি এবং একজন ডিপুটি, একজন উকিল ও একজন স্থানীয় জমিদার, এই তিনজন বাকি মেম্বর। আবদুল্লাহ্ ব্যতীত আর একজন মাত্র মুসলমান দরখাস্ত দিয়াছে; সে লোকটি এফ-এ পাস এবং কিছুদিন অন্যত্র মাস্টারিও করিয়াছে। হেডমাস্টার তাহাকেই উপযুক্ত বলিয়া পছন্দ করিলেন। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আবদুল্লাহকেই অধিক যোগ্য বলিয়া মত দিলেন। হেডমাস্টার কহিলেন–উহার শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু ইহার নাই। সাহেব কহিলেন, এ ব্যক্তি বি-এ পর্যন্ত পড়িয়াছে, সুতরাং ও ব্যক্তি অপেক্ষা কিছু বিদ্বান, এবং ইহার হাতের লেখাও সুন্দর, দেখিলে লোকটিকে বেশ দক্ষ বলিয়া ধারণা হয়। তাহার পর তিনি মেম্বরগণের মতামত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন যে, তাহার মতের অপেক্ষা না করিয়া মেম্বরগণ স্বাধীনভাবে মত দিতে পারেন। অবশ্য যাহার পক্ষে ভোট অধিক হইবে, সেই চাকরি পাইবে, তা সাহেব নিজে যাহাকেই পছন্দ করুন না কেন! ফলে কিন্তু মেম্বরত্রয় সাহেবের মতেই মত দিয়া ফেলিলেন। আবদুল্লাহ্ চাকরি পাইল।

কুঠি হইতে বাহিরে আসিয়া পথে চলিতে চলিতে জমিদার বাবুটি হেডমাস্টারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি সাহেবের বিরুদ্ধে ও লোকটার জন্যে এত উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলেন কেন। হেডমাস্টার কহিলেন, –আরে মশায়, আপনারা কেউ আমার দিকে ভোট দিলেন না, তা আর কী করব! আমারই ভুল হয়ে গেল। আর সাহেব যে ওর দিকে ঝুঁকে পড়বেন, তা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি। আগে থেকে আপনাদের যদি একটু বলে রাখি, তা হলে আজ ভোটে ঠিক মেরে দিয়েছিলাম মশায়। সাহেব লোক ভালো, মেম্বরদের মত দেখলে তিনি কখনই জেদ কত্তেন না।

উকিল বাবুটি জিজ্ঞাসা করিলেন, –তা ও দু ব্যাটাই তো নেড়ে, ওর আবার ভালো মন্দ কী? একটা হলেই হল।

হেডমাস্টার কহিলেন–আরে না মশায়, এর ভেতর কথা আছে। এ-লোকটা পি-এল লেকচার কমপ্লিট করেছে, এখন একজামিন দিয়ে পাস কল্লেই চাকরি ছেড়ে দেবে, আমি সঠিক খবর জানি। ছেড়ে দিলে একটা প্লি হত, নেড়েগুলো স্টিক করে না তাতে কাজের বড় ডিসলোকেশন হয়। তারপর নিজেদের একটা লোক নেওয়া যেত।

উকিল বাবুটি একটু আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, –আপনি একটু আগে কেন বলেন নি? আমরা তো এর কিছুই জানি নে। জানলে নিশ্চয়ই এর জন্যে ভোট দিতাম। বলা উচিত ছিল আপনার আগে।

হেডমাস্টার কহিলেন, কে জানে মশায়, এত গণ্ডগোল হবে! ভেবেছিলাম, আমি যাকে ফিট বলে দেব, সাহেব তাতেই রাজি হবে। যাক, ওর বরাতে আছে, আমি কী করব!

.

১৯.

একবালপুরে সৈয়দ-বাড়িতে আজ মহা ধুম পড়িয়া গিয়াছে। আবদুল মালেকের শ্বশুর শরীফাবাদের হাজী বরকতউল্লাহ সম্প্রতি মক্কা শরীফ হইতে ফিরিয়া বৈবাহিকের সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন।

হাজী সাহেব বড় যে-সে লোক নহেন; কি ভূসম্পত্তিতে, কি বংশমর্যাদায়, বরিহাটী জেলায় আশরাফ সমাজে তাহার সমকক্ষ আর কেহ নাই। এমনকি, আমাদের সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসও তাহার সহিত কুটুম্বিতা করিতে পারিয়া আপনাকে ধন্য মনে করিয়াছিলেন। করিবারই কথা; কেননা হাজী সাহেবের পিতা শরীয়তুল্লাহ্ মাত্র পনের দিনের দারোগাগিরির দৌলতে যখন এক বিপুল সম্পত্তি খরিদ করিয়া দেশের মধ্যে একজন গণ্যমান্য লোক হইয়া উঠিয়াছিলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে তাহার শরাফতের দরজাও অতিমাত্রায় বাড়িয়া গিয়াছিল, এবং যদিও লোকে বলে যে, পঞ্চদশ দিবসে ভোরবেলায় ওযু করিবার সময় এক মস্ত বড় ডাকাতি-ব্যবসায়ী জমিদার সদ্য-খুন-করা লাশ সমেত তাহার নিকট ধরা পড়িয়া হাজার। টাকা ঘুষ কবুল করিয়াছিল এবং টাকার তোড়া আনিবার জন্য যে লোকটিকে সে বাড়িতে পাঠাইয়াছিল, সে দিশাহারা হইয়া টাকার পরিবর্তে মোহরের তোড়া আনিয়া নূতন দারোগা সাহেবকে দিয়া ফেলিয়াছিল এবং তাহারই বলে শরীয়তুল্লাহ পঞ্চদশ দিনের চাকরিতে ইস্তফা দিয়া হঠাৎ জমিদারি ক্রয় করিয়া বসিয়াছিলেন, তথাপি তাহার সাহেবজাদা বরকল্লাহ্র পক্ষে বরিহাটী জেলায়, এমনকি বঙ্গদেশের মধ্যে একেবারে অতি-আদি শরীফতম ঘর বলিয়া পরিচিত হইতে কোনোই বাধা-বিঘ্ন ঘটে নাই!

সুতরাং একে তো বরকতউল্লাহ্ মস্ত বড় মানী লোক, তাহার উপর আবার এক্ষণে হাজী হইয়া সমাজে তাঁহার সম্ভ্রম আরো বাড়িয়া গিয়াছে; কাজেই তাহার শুভাগমনে সৈয়দ-বাড়ি আজ পবিত্র হইয়াছে এবং মনিব-চাকর, ছোট-বড় সকলেই তাহার উপযুক্ত খাতির-তোয়াজ করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গিয়াছে।

বেলা প্রায় তিন প্রহরের সময় আহারাদি শেষ করিয়া সৈয়দ সাহেব বৈবাহিকের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত শুনিতে বসিলেন। হাজী সাহেব মক্কা মওয়াজ্জমা, মদিনা মনুওয়ারা, দামেস্ক, বাগদাদ প্রভৃতি আরবের বহু পবিত্র স্থান দর্শন করিয়া আসিয়াছিলেন, একে একে সে সকলের বর্ণনা করিয়া তিনি সৈয়দ সাহেবকে চমকৃত ও ঈর্ষান্বিত করিয়া তুলিলেন। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে দান করিয়া তাহাদের জীবন ধন্য করিবার জন্য হাজী সাহেব পুণ্যভূমি হইতে নানা প্রকার পবিত্র বস্তু সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলেন। বৈবাহিক তাহা হইতে বঞ্চিত হইলেন না; হাজী সাহেব তোরঙ্গ খুলিয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ শুনা উটের গোশত, একটুখানি জমজমের পানি এবং কাবার গেলাফের এক টুকরা বাহির করিয়া দিলেন। সৈয়দ সাহেব এই সকল পবিত্র বস্তু পাইয়া যে কী অপার আনন্দ লাভ করিলেন, তাহা আর বলিয়া শেষ করিতে। পারিলেন না। তিনি কহিতে লাগিলেন, –ভাই সাহেব, আপনি এ গরিবের কথা মনে করে। যে কষ্ট করে এ-সব পাক চিজ বয়ে এনেছেন, তাতে আমি বড়ই সরফরাজ হলাম। কী বলে আর দোয়া করব ভাইজান, খোদা আপনার নসিব কোশাদা করুন! খাস করে এই যে গেলাফ-পাকের কাপড়টুকু আপনি দিলেন, এতে আমাদের ঘর আজ পাক হয়ে গেল! এ চিজ যার ঘরে থাকে তার যত মুসিবত সব কেটে যায়। এমন চিজ কি আর দুনিয়াতে আছে? আহা, চ বলিয়া তিনি কাপড়ের টুকরাটিতে বহুত তাজিমের সঙ্গে বোসা (চুম্বন) দিলেন, এবং উহা দুই চক্ষে, কপালে এবং বক্ষে ঠেকাইয়া অতি যত্নে তুলিয়া রাখিলেন।

তাহার পর জমজমের পানি একটুখানি শিশি হইতে ঢালিয়া লইয়া পান করিলেন এবং দেহে ও মনে পরম তৃপ্তি ও এক অভিনব পবিত্রতা অনুভব করিয়া আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিলেন।

কিন্তু এক্ষণে উটের গোশতটুকু লইয়া কী করা যায়? উহা তো শুকাইয়া একেবারে হাড় হইয়া গিয়াছে; খাওয়া যাইবে না। হাজী সাহেব কহিলেন, –ইহা কোরবানির গোশত; খাস মক্কা মওয়াজ্জমাতেই কোরবানি হয়েছিল, এর বরকতই আলাদা। এটুকু ঘরে রাখাই ভালো, কারুর ব্যারাম-পীড়ার সময় কাজে লাগবে।

সৈয়দ সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী করতে হয়?

হাজী সাহেব কহিলেন–কিছু না, একটুখানি ঘষে বিসমিল্লাহ্ বলে খাইয়ে দিলেই হল।

সৈয়দ সাহেব শুকনা মাংসখণ্ডটিও সযত্নে তুলিয়া রাখিলেন।

কথায়-বার্তায় ক্রমে আসর-এর আযান পড়িয়া গেল। উভয়ে ওযু করিয়া মসজিদের দিকে চলিলেন। মসজিদটি এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়িয়া আছে দেখিয়া হাজী সাহেব একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিলেন, –এ কী! আপনি এ কাজ এতদিন ফেলে রেখে দিয়েছেন?

সৈয়দ সাহেব একটু বিষাদের সুরে কহিলেন, –না, ভাই সাহেব, ফেলে রেখে দিই নি, পেরে উঠছি নে।

বাঃ, আপনার মতো লোকের না পেরে ওঠার তো কথাই নয়। এতে যে আপনার গোনাহ্ হচ্ছে তা কি বুঝতে পাচ্ছেন না! খোদার কাজে হাত দিয়ে এমন করে ফেলে রাখা এতে যে হেকারত করা হচ্ছে।

তা তো বুঝি ভাই সাহেব; আজ প্রায় তিন বৎসর হল কাজে হাত দিইছি, বছরখানেক কাজ চালিয়ে এই পর্যন্ত করে তুলেছি। কিন্তু গেল দুই বছর থেকে আমার যে কী দশা ধরেছে, কিছুতেই গুছিয়ে উঠতে পাচ্ছি নে। কী বলব ভাই সাহেব, এর জন্যে আমার রাত্রে ঘুম হয় না। এ দিকে ব্যারাম-পীড়ায় কাতর হয়ে পড়েছি, কেবল ভয় হয়, কোন দিন দম বেরিয়ে যাবে, এ-কাজটা খোদা আমার দ্বারা বুঝি আর করাতে দেবেন না–কী যে কেসমতে আছে, তা সেই পরওয়ারদেগারই জানেন!

হাজী সাহেব গম্ভীর হইয়া কহিলেন, –আপনার মুখে এমন কথা শোভা পায় না, ভাই সাহেব। খোদা আপনাকে যা দিয়েছেন, তা যদি খোদার কাজে না লাগালেন, তবে আখেরাতে কী জবাব দেবেন? বিষয়-সম্পত্তিই বলুন, আর ধন-দৌলতই বলুন, কিছুই তো আর সঙ্গে যাবে না। ও-সব খোদার কাজেই লাগানো উচিত।

সৈয়দ সাহেব গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, –ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব, এত দিন আমি বড়ই গাফেলী করেছি–আল্লাহ্ মাফ কবৃনেওয়ালা–আমি আর দেরি করব না, যেমন করে পারি, কাজটা শেষ করে ফেলব।

আসরের নামায বাদ হাজী সাহেব মসজিদের ভিতরে দাঁড়াইয়া উহার কোথায় কিরূপ কাজ হইয়াছে, তাহার সমালোচনা করিতে লাগিলেন! তিনি আরবের কোথায় কোন্ মসজিদে কবে নামায পড়িয়াছিলেন, তাহার কোন্ জায়গাটিতে কিরূপ ধরনের কারুকার্যের বাহার দেখিয়াছেন, সে সকল তন্নতন্ন করিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন এবং সৈয়দ সাহেব একাগ্রমনে শুনিতে শুনিতে সেই সকলের চিত্র মনের মধ্যে আঁকিয়া তুলিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহার পর বাহিরে আসিয়া বারান্দাটি কত বড় হওয়া উচিত, তাহার ছাদ কিরূপ হইবে এবং কয়টি থাম দিলে মানাইবে; বারান্দার সম্মুখে বেশ কোশাদা রকম একটা রোয়াক দিলে ভালো হয়–এই রকমই তিনি অনেক ভালো ভালো জায়গার মসজিদে দেখিয়া আসিয়াছেন– এইরূপ নানাপ্রকার মত প্রকাশ করিলেন।

বৈবাহিকের সহিত এই সকল বিষয়ের আলোচনার পর হইতে এই মসজিদটিই সৈয়দ সাহেবের একমাত্র চিন্তনীয় বিষয় হইয়া উঠিল। পরদিন হাজী সাহেব রওয়ানী হইয়া গেলে পরই তিনি আবদুল মালেককে ডাকিয়া কহিলেন, বাবা, মসজিদটা তো আর ফেলে রাখা। যায় না।

আবদুল মালেক কহিল, –তা কী করবেন, এরাদা করেছেন?

আরো গোটা দুই তালুক বেচা ছাড়া তো আর উপায় দেখছি নে। ওই রসুলপুরের তোমার আম্মার দরুন তালুকটা আর মাদারগঞ্জেরটা বেচব মনে কচ্ছি।

আবদুল মালেক মনে মনে ভারি চটিয়া গেল। পিতা আর কিছুদিন বাঁচিয়া থাকিলে তালুক-মুলুক সবই ছারেখারে যাইবে, তাহাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না। সে একটু হতাশভাবে কহিল, –তা হলে ধরুন গে আপনার থাকবে কী?

পিতা একটু বিরক্ত হইয়া কহিলেন, –কেন? যা থাকবে, তা বুঝেসুঝে চালাতে পাল্লে তোমাদের আর ভাবনা কী? আর কদ্দিন! এ কাজটা আমি শেষ করেই যাব, বাকি খোদার মরজি।

আবদুল মালেক আবার কহিল, –যা আছে, তাই ধরুন গে আপনার ভাগ হয়ে গেলে আমরা কীই-বা পাব, তার ওপর আবার…

পিতা অসহিষ্ণুভাবে বাধা দিয়া কহিলেন, তোমরা খোদার ওপর তওয়াক্কল রাখতে একেবারেই ভুলে যাও। সেই জন্যেই তোমাদের মন থেকে ভাবনা ঘোচে না। তোমার ভাবনা কী বাবা? তোমার শ্বশুরের বিষয়-আশয়ের খবর রাখ কি? খোদা চাহে তো বড় বউমার যেটা পাওয়া যাবে, তাতেই তো খোশ-হালে জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। আর তোমার বোনেরা তো একরকম পার হয়ে গিয়েছে–ছোট যে দুটো আছে, আমি যদি বিয়ে দিয়ে না যেতে পারি, তবে তোমরাই দেখেশুনে দিও। তেমন ঘরে পলে হয়তো তোমাদের সম্পত্তিতে হাত নাও পড়তে পারে–একটু বুঝেসুঝে সংসার কত্তে হয়, বাবা! আর তোমার ভাইদের–আবদুল কাদেরের কথা ছেড়ে দাও, সে তো সবুরেজিস্ট্রার হয়েছে, তার এক রকম চলে যাবে। আর ওই ছোট ছেলেগুলো রয়েছে, তোমরা দেখেশুনে ওদের বিয়ে দিও, তা হলে আর কারুর কোনো ভাবনা থাকবে না, বাকি খোদার মরজি।

পুত্রকে এইরূপে বুঝাইয়া, খোদার উপর তওয়াক্কল রাখিয়া সংসার চালাইবার কৌশল শিখাইয়া দিয়া সৈয়দ সাহেব দুইটি তালুক বিক্রয়ের বন্দোবস্তে লাগিয়া গেলেন। এবার যাহাতে বিক্রয়ের পূর্বে জানাজানি হয়, সেইজন্যে তিনি ভোলানাথ সরকারকে গোপনে ডাকিয়া তাহার হস্তে তালুক দুইটি ন্যস্ত করিবেন, স্থির করিলেন। তিনি মনে মনে আশা করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, তালুক দুইটির মূল্য যে দশ হাজার টাকা হইবে, তাহাতে আর ভুল নাই। কিন্তু সরকার মহাশয় আসিয়া কাগজপত্র দেখিয়া সাত হাজার পর্যন্ত দিতে রাজি হইলেন। সৈয়দ সাহেব অনেক ঝুলাঝুলি করিলেন, কিন্তু ভোলানাথ সেই সাত হাজারই তাহার শেষ কথা বলিয়া উঠিয়া গেলেন।

সৈয়দ সাহেব ভাবিতে লাগিলেন, আর কোনো খরিদ্দারের সন্ধান করা কর্তব্য কি না। তালুক দুটি নিতান্ত মন্দ নহে; বৎসরে প্রায় চার-পাঁচ শত টাকা আয় আছে; এত সস্তায় উহা ছাড়িয়া দিতে তাহার মন সরিতেছিল না। কিন্তু অন্যত্র খরিদ্দার দেখিতে গেলে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সহজেই জানাজানি হইয়া পড়িবে; পাছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহ কৌশলে খরিদ করিয়া বসে, তাহা হইলে আর সৈয়দ সাহেবের মুখ দেখাইবার যো থাকিবে না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অবশেষে তিন তিনটি হাজার টাকার লোভ তাহাকে সংবরণ করিতেই হইল এবং সাত হাজারেই সম্মত হইয়া দলিল রেজিস্টারি করিবার জন্য তিনি ভোলানাথ সরকারকে সঙ্গে লইয়া স্বয়ং বরিহাটী রওয়ানা হইলেন।

সদরে সম্প্রতি একটি জয়েন্ট আপিস খোলা হইয়াছে, সেইখানেই তাহাদিগকে দলিল রেজিস্টারি করিতে হইবে। যেদিন প্রাতে তাহাদের নৌকা বরিহাটীর ঘাটে আসিয়া ভিড়িল, সেই দিনই বেলা সাড়ে দশটার সময় তাহারা দলিলাদি লইয়া জয়েন্ট আপিসে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আপিসের আমলাগণ তাহাদিগকে চিনিল; সুতরাং তাহারা এজলাসের এক পার্শ্বে দুইখানি চেয়ার আনাইয়া যত্ন করিয়া তাহাদিগকে বসাইল। সবুরেজিস্ট্রার তখনো আসেন নাই; আসিবার বড় বিলম্বও নাই।

একটু পরেই সব্‌রেজিস্ট্রার আসিলেন। এজলাসে উঠিয়াই চেয়ারে উপবিষ্ট মূর্তি দুইটি দেখিয়া তিনি একটুখানি থমকাইয়া দাঁড়াইলেন; পরক্ষণেই অগ্রসর হইয়া তিনি সৈয়দ সাহেবকে কদমবুসি করিয়া ফেলিলেন!

কে কে! আবদুল কাদের? তুমি? তুমি এখানে? অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হইয়া সৈয়দ সাহেব এই কথা কয়টি বলিয়া উঠিলেন।

ভোলানাথ সরকার কহিলেন, বাঃ আপনি এখানে এসেছেন, তা তো আমরা কেউই জানি নে! কর্তাও তো জানেন না দেখতে পাচ্ছি!

আবদুল কাদের কহিল, –আমি আজ মাত্র তিন দিন হল বদলি হয়ে এসেছি। আপনার তবিয়ত ভালো তো, আব্বা? কিন্তু আবার মনে এতক্ষণে একটা তুমুল আন্দোলন উঠিয়া পড়িয়াছে। আজ প্রায় তিন বৎসর পরে পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎ হইয়াছে; কুশল-প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দূরে থাকুক, তিনি ভয়েই অস্থির হইয়া উঠিয়াছেন। আবদুল কাদের ছেলেটি যেরূপ বেতরো গোছের, তাহাতে হয়তো সে বিষয়-বিক্রয় লইয়া একটা গণ্ডগোল উপস্থিত করিবে এবং তাহাতে অনর্থক একটা জানাজানি কেলেঙ্কারি ব্যাপার দাঁড়াইবে, এই ভাবিয়া তিনি তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, আমাদের একটা কাজ ছিল; কিন্তু কথাটা তোমাকে একটু নিরালা বলতে চাই আগে…

আবদুল কাদের কহিল, –কাজটা কী আব্বা? কোনো দলিলটলিল রেজিস্টারি কত্তে হবে কি?

হ্যাঁ, তাই বটে, তবে…

তা হলে আমার বাসাতেই চলুন…

ভোলানাথ জিজ্ঞাসা করিলেন, –কোথায় বাসা?

এই কাছেই বোর্ডিঙে আবদুল্লাহর ওখানে এখন আপাতত আছি, এখনো বাসা পাই নি।

আচ্ছা আমি কর্তার সঙ্গে একটু পরামর্শ করে পরে যাচ্ছি, এই বলিয়া ভোলানাথ সৈয়দ সাহেবকে বারান্দার এক প্রান্তে লইয়া গেলেন।

আবদুল কাদেরের সন্দেহ হইল, ইহার ভিতর এমন কোনো কথা আছে, যাহা ইহারা তাহার নিকট প্রকাশ করিতে ইতস্তত করিতেছেন। দলিল রেজিস্টারি করিতে গেলে তো সব কথাই জানা যাইবে; কিন্তু যদি ইহারা অতিরিক্ত ফী দিয়া অন্যত্র রেজিস্টারি করিতে যান? সরকার মহাশয় বুঝি আব্বার সঙ্গে সেই পরামর্শই করিতে গেলেন। আবদুল কাদের এইরূপ চিন্তা করিতেছে, এমন সময় ভোলানাথ আসিয়া কহিলেন, দেখুন মেজ মিঞা, কর্তার মত বদলে গিয়েছে। তিনি একখানা দলিল রেজিস্টারি কত্তে এসেছিলেন বটে কিন্তু সেটা আর করবেন না।

কেন?

এর ভেতরে অনেক কথা আছে, তা অন্য সময় বলব। এখন আমাকে নৌকায় ফিরে। যেতে হচ্ছে–কর্তা চলে গিয়েছেন, তিনি আমাকে বলে গেলেন, এখনই নৌকা খুলতে হবে।

বাঃ এসেই অমনি চলে যাবেন। সে কেমন কথা!

বাড়িতে অনেক জরুরি কাজ ফেলে এইছি–দলিলখানা রেজিস্টারি হলেই আমরা নৌকা খুলতাম। এখন যখন রেজিস্টারি হলই না, তখন আর দেরি করে ফল নেই; যত শিগগির বাড়ি পৌঁছুতে পারি, ততই ভালো!

আচ্ছা, তা যেন হল; কিন্তু হঠাৎ দলিল রেজিস্টারি করতে আসা আবার হঠাৎ মত ফিরিয়ে চলে যাওয়া, এর মানে তো কিছু বুঝতে পাচ্ছি নে; বোধহয় আমাকে দেখেই আপনারা মত ফিরিয়ে ফেললেন…

সরকার মশায় তাড়াতাড়ি কহিলেন, –আপনাকে দেখে কেন মত ফেরাব? তবে কি জানেন, কর্তার মতের ঠিক নেই…।

আবদুল কাদের বাধা দিয়া কহিল, –না, নিশ্চয়ই এর ভেতর এমন কোনো কথা আছে, যা আমাকে আপনারা লুকুচ্ছেন–কোনো বিষয় বিক্রি টিক্রি নয় তো?

এই কথায় ভোলানাথ একটু হাসিয়া উঠিলেন; কিন্তু সে হাসির একান্ত শুষ্কতা উপলব্ধি করিয়া আবদুল কাদেরের মনে সন্দেহ বদ্ধমূল হইয়া গেল। ভোলানাথ কহিলেন, –আপনি মিছে সন্দেহ কচ্ছেন, মেজ মিঞা…।

না না, মিছে নয়। সেবার কয়েকটা তালুক বিক্রি করবার সময় আমি আবার সঙ্গে খুব একচোট চটাচটি করেছিলাম কিনা, তাই বোধহয় এবার আমার কাছ থেকে কথাটা লুকুচ্ছেন। নইলে বেশ ভালো মানুষটির মতো দলিল রেজিস্টারি করবার জন্য আপিসে এসে বসে রয়েছেন, আর আমাকে দেখবামাত্রই যেন কেমন একরকম হয়ে গেলেন, আর মতও বদলে গেল! আমি এখানে বদলি হয়ে এসেছি জানলে, আপনারা কখনো এখানে আসতেন না! কেমন কি না, বলুন।

সরকার মহাশয় একটু ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া আমতা আমতা করিতে লাগিলেন। চক্রী ব্যবসায়ী ভোলানাথের সত্য গোপনের চেষ্টা আবদুল কাদেরের নির্ভীক সরল স্পষ্টবাদিতার সম্মুখে ব্যর্থ হইয়া গেল। তবু একবার শেষ চেষ্টা করিবার জন্য তিনি কহিলেন, –আচ্ছা, আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হয়, কর্তাকেই জিজ্ঞেস করে দেখবেন।

আবদুল কাদের তৎক্ষণাৎ কহিল, –তাই চলুন।

ভোলানাথ কহিলেন, –আপনি এগোন, আমি আসছি! নৌকা থানার ঘাটে আছে।

সৈয়দ সাহেব আবদুল কাদেরকে এড়াইয়া সরিয়া পড়িতে চাহিয়াছিলেন। তাই আগে আগে নৌকায় আসিয়া উৎকণ্ঠিতচিত্তে প্রতি মুহূর্তে ভোলানাথের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। তাহার মনে মনে ভয়ও হইতেছিল, পাছে-বা সঙ্গে সঙ্গে আবদুল কাদেরও আসিয়া পড়ে। পরে ভোলানাথের পরিবর্তে তাহাকেই নৌকায় উঠিতে দেখিয়া তাহার মন এমন বিক্ষুব্ধ হইয়া পড়িল যে, যখন আবদুল কাদের সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল– আব্বা, আপনি বুঝি আবার তালুক বিক্রি কচ্ছেন?–তখন তিনি কী বলিবেন ঠিক করিতে নাপারিয়া, কেবল না, হাঁ, তা কি জান ইত্যাদি অসংলগ্ন দুই-চারিটি শব্দ উচ্চারণ করিলেন।

আবদুল কাদের কহিতে লাগিলেন, –আব্বা, আপনাকে একটা কথা বলি। সেবারে তালুক বিক্রি করবার সময় আমি অনেক আপত্তি করেছিলাম, তাতে আপনি আমার ওপর। নারাজ হয়েছিলেন। কিন্তু তখন আমার বাধা দেবার কোনো ক্ষমতা ছিল না–আপনার টাকার দরকার পড়েছিল, আমার যদি তখন সে টাকা দেবার উপায় থাকত, তবে কিছুতেই বিক্রি কত্তে দিতাম না। আর আপনারও বিক্রি করবার দরকার হত না। এখন খোদার ফজলে আমি কিছু কিছু রোজগার কচ্ছি–আমার যতদূর সাধ্য আপনাকে সাহায্য করব, আপনি আর তালুক বিক্রি করবেন না…

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –কী করি বাপ, ওই মসজিদটা পড়ে রয়েছে, খোদার কাজ একবার আরম্ভ করে যদি শেষ না করে মরি, তবে আখেরাতে খোদার কাছে কী জবাব দেব?

সে মসজিদ এখনো শেষ হয় নি?

কই আর হল! তিন বছরের বেশি হল তুমি বাড়িছাড়া, সংসারের খবর তো আর রাখ না–টাকা-পয়সা কোথে কে আসবে যে কাজ শেষ করব? তালুক বিক্রি ছাড়া আর উপায়। কী?

মসজিদ শেষ কত্তে আর কত টাকা লাগবে?

এখনো তো ঢের বাকি–বারান্দা আর সামনের একটা রোয়াক, বাইরের আস্তর, উপরকার মিনারা…

তা কোন তালুকটা বিক্রি কচ্ছেন?

এই দেখ বাবা, দলিলটাই দেখ, তোমার কাছে আর লুকিয়ে কী হবে!

দলিল দেখিয়া আবদুল কাদের আশ্চর্য হইয়া কহিল, –এই দুটো ভালো ভালো মহাল মাত্র সাত হাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন আবা? আর ও দুটো গেলে থাকবেই-বা কী!

তা কী করি, ভোলানাথ বাবু ওর বেশি আর দিতে চাইলেন না…

সাত হাজার টাকাই কি মসজিদে লাগবে?

তা লাগবে বৈকি! মেজেতে সঙ্গে মমর দেবার ইচ্ছে আছে, ভেতরেও কিছু পাথরের কাজ, উপরে মিনারা, বারান্দায় থাম, পাথরের কাজ দিতে হবে, তাতে করে অনেক টাকা। পড়ে যাবে।

এত না কল্লেও তো চলে আব্বা…

না, না, তাও কি হয় বাবা! নিয়ত যা করিছি খোদার নামে, তা আদায় না কল্লে যে খোদার কাছে বেইমানি হবে।

আমার মনে হয়, আহ্বা, নিয়ত, কল্লেই যে সেটা সম্পূর্ণ আদায় কত্তে হবে, তার কোনো মানে নেই। যদি এখন সাধ্যে না কুলোয়, তবে? যতটা পারা যায়, তাই কল্লেই খোদা রাজি থাকেন। এখন আমি যদি নিয়ত, করে বসি যে, পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে মসজিদ। দেব, তা কি কখনো আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হতে পারে? মসজিদ দেওয়া আপনার নিয়ত; এখন সাধ্যে যতদূর কুলোয়, তাই খরচ করে ওটা শেষ করে ফেলুন। আমি বলি, রসুলপুরের ওটা থাক্‌, মাদারগঞ্জেরটা বরং বন্ধক রেখে হাজার দুই টাকা নেন; ও টাকা খোদা চাহে তো আমিই পরিশোধ করব। আপনার কিছু ভাবতে হবে না; খোদার ফজলে বিষয়েও আঁচ লাগবে না, আপনার মসজিদও শেষ হয়ে যাবে।

সৈয়দ সাহেব একটু ভাবিয়া কহিলেন, দু হাজার টাকায় কি হবে বাবা?

যাতে হয়, তাই করুন; বেশি আড়ম্বর করে কাজ নেই, আব্বা। এই যে সরকার মহাশয়ও এসে পড়েছেন…

সরকার মহাশয় উঠিতে উঠিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, –নৌকা এখন খোলা হবে না?

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –আবদুল কাদেরকে সব কথা খুলে বললাম, ও তো বিক্রি কত্তে দিতে চায় না–আর আমার বড় ছেলেরও মত নয় যে বিক্রি করি। এখন ছেলেরা সব লায়েক হয়েছে, ওদের অমতে কাজটা করা ভালো দেখায় না, সরকার মশায়…।

ভোলানাথ কহিলেন, –তা বেশ তো। বিক্রি নাই-বা কল্লেন। আমি তো আর জোর করে কিনতে চাই নি…

নারাজ হবেন না, সরকার মশায়…

না, না, আপনার সম্পত্তি আপনি ইচ্ছে হয় বিক্রি করুন, ইচ্ছে হয় না করুন, তাতে আমি নারাজ হব কেন, সৈয়দ সাহেব!

কিন্তু আমার টাকার দরকার যে! আপনি মেহেরবানি করে যদি বন্ধক রাখেন…

ওই সাত হাজার টাকায়! সে কি হয়?

আবদুল কাদের কহিল, –না, না, সাত হাজার টাকা কেন! আমরা কেবল মাদারগঞ্জের তালুকটা বন্ধক রাখব; আপনি মেহেরবানি করে কেবল ওইটা রেখেই যদি দু হাজার টাকা দেন…

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –না না, দু হাজারে আমার চলবে না তো! নিদেনপক্ষে তিন হাজার চাই যে।

ভোলানাথ একটু ভাবিয়া কহিলেন, –বন্ধক রেখে তিন হাজার দিতে গেলেও দুটো তালুক চাই; তা নইলে তিন হাজার দিতে পারব না।

আবদুল কাদের অনেক আপত্তি করিল; কিন্তু সৈয়দ সাহেব দু হাজারে সন্তুষ্ট হইতে চাহিলেন না, এবং ভোলানাথও দুইটি সম্পত্তি না হইলে তিন হাজার দিতে রাজি হইলেন না। অবশেষে ভোলানাথেরই জয় হইল।

সেই দিনই দলিল লেখাপড়া হইয়া গেল। সুদের হার লইয়া আবদুল কাদেরকে অনেক লড়ালড়ি করিতে হইয়াছিল; অবশেষে ভোলানাথ বার্ষিক শতকরা ১২ টাকাতেই রাজি হইয়া গেলেন। বন্দোবস্ত হইল যে, আবদুল কাদের প্রতি মাসে সুদে-আসলে ৬০ টাকা করিয়া ভোলানাথকে পাঠাইতে থাকিবে। ইহাতে প্রায় ছয় বৎসরে সমস্ত টাকা পরিশোধ হইতে পারিবে। কিন্তু ভোলানাথ আরো শর্ত করিয়া লইলেন যে, কিস্তি কোনো সময়ে খেলাফ হইলে, সুদের হার শতকর ২৫ টাকায় দাঁড়াইবে, এবং খেলাফকালীন সুদ আসলে পরিণত হইয়া চক্রবৃদ্ধি হারে গণ্য হইবে।

সদর আপিসেই দলিল রেজিস্টারি করা হইল। আবদুল্লাহ্ও তাহাতে একজন সাক্ষী হইয়া রহিল। সৈয়দ সাহেব ও ভোলানাথ সেইদিনই সন্ধ্যার পর নৌকা খুলিলেন।

.

২০.

বরিহাটী জেলাস্কুলে এতদিন মুসলমান ছাত্রদের কোনো বোর্ডিং ছিল না; আবদুল্লাহ্ এখানে মাস্টার হওয়ার পর অনেক চেষ্টা-চরিত্র করিয়া একটি মুসলমান বোর্ডিং স্থাপন করিতে সক্ষম হইয়াছে এবং নিজেই তাহার সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হইয়া সেইখানেই বাস করিতেছে। আবদুল কাদের বরিহাটীর জয়েন্ট আপিসে বদলি হইয়া আসা অবধি আবদুল্লাহর ওখানেই রহিয়াছে; এখনো বাসা পায় নাই; কিন্তু স্বতন্ত্র বাসা না করিলে তো চলিবে না। বোর্ডিঙে বাহিরের লোক অধিক দিন রাখা যায় না; সুতরাং আবদুল্লাহ্ এবং আবদুল কাদের উভয়েই বাসা খুঁজিতে লাগিয়া গেল।

বরিহাটীতে মুসলমানপাড়ায় চাপরাসী ও পেয়াদা শ্রেণীর লোকদের কয়েকখানি খড়ো ঘর ছাড়া মুসলমানের আর কোনো বাড়ি ছিল না। সম্প্রতি নাদের আলী বলিয়া একজন সিভিল কোর্টের পেয়াদা নদীর ধারে একটুখানি জমি খরিদ করিয়া ছোটখাটো একটি পাকা বাড়ি তৈয়ার করিতেছিল। নাদের আবদুল্লাহর পিতার মুরীদ ছিল; সুতরাং তাহাকে বলিলে সে নিশ্চয়ই আর কাহাকেও ভাড়া দিবে না। এই মনে করিয়া আবদুল্লাহ নাদের আলীর বাড়িতে গিয়া তাহাকে বিশেষ করিয়া অনুরাধ করিল, যেন বাড়িখানি আর কাহাকেও ভাড়া দেওয়া না হয় এবং কিছু অগ্রিমও দিতে চাহিল।

নাদের আলী কহিল, –না, না হুজুর, আগাম নেব ক্যা? আপনারা ভাড়া নিবেন, তার আবার কথা? বাড়ি আপনাগোরই থাকল; শ্যাষ হতি আরো মাসখানেক লাগবে; আল্লায় করলি ত্যাখন আপনাগোরই ভাড়া দেব।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, –তা ভাড়া কত করে নেবে, নাদের আলী?

নাদের কহিল, –আগে শ্যাষ করেই তো নিই, হুজুর, ভাড়ার কথা পাছে।

না, না, আগে থেকেই ওটা ঠিক করে রাখা ভালো। তোমার বাড়ি প্রায় হয়েই রয়েছে; তিন কামরা আর এক বারান্দা–এই তো! তবে ভাড়া ঠিক করতে আর অসুবিধে কী?

নাদের একটুখানি হাসিয়া কহিল, –তা আপনারা যা দেবেন হুজুর, আমি তাই নেব। আপনাগোর সাতে কি আর দর-দস্তুর কত্তি পারি?

তবু তোমার কত হলে পোষাবে, মনে কর!

বাড়ি ভাড়া তো দেখতিইছেন হুজুর–বাবুরা সব বাড়ির জন্যি খাই খাই করে বেড়ায়। ড্যাড়া ড্যাড়া ভাড়া দ্যেও বাড়ি পায় না। তা আপনাগোর কাছে আর বেশি নেব না হুজুর, কুড়ি টাকা করে দেবেন।

নাদের নিতান্ত অন্যায় ভাড়া চাহে নাই বুঝিয়া আবদুল কাদের তাহাতেই রাজি হইয়া গেল। ঠিক হইল যে বাড়ি শেষ হইলে যেদিন আকামত হইবে সেইদিনই আবদুল কাদের বাড়ি দখল করিবেন।

বিদায়ের পূর্বে নাদের আবদুল্লাহকে কহিল, –হুজুর, আকামতের দিন এট্টু মৌলুদ শরীফ পড়াতি চাই, তা আপনি এট্টু দয়া কত্তি হবে…

আবদুল্লাহ কহিল, –কী করতে হবে!

আপনিই এট্টু পড়বেন–আপনাগোর মুখির পড়ায় খোদায় বরকত দেবে।

আবদুল্লাহ্ হাসিয়া কহিল, –আচ্ছা আচ্ছা, পড়া যাবে।

যাহা হউক, একটা বাসার বন্দোবস্ত হইয়া গেল মনে করিয়া আবদুল কাদের নিশ্চিন্ত হইল। কিন্তু নাদেরের বাড়িখানি শেষ হইতে এখনো এক মাসের বেশি লাগিবে। এতদিন বোর্ডিঙে থাকা উচিত হইবে না। তাই দুই জনে পরামর্শ করিয়া স্থির করিল, যতদিন বাড়ি প্রস্তুত না হয়, ততদিন আবদুল কাদের আকবর আলী সাহেবের ওখানেই থাকিবে, খাওয়াদাওয়ার স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত করিয়া লইবে।

আকবর আলী আবদুল কাদেরকে পুনরায় সাদরে নিজে বাটীতে স্থান দিলেন; কিন্তু তাহার স্বতন্ত্র আহারের বন্দোবস্তে বিশেষ রকম আপত্তি করিতে লাগিলেন। আবদুল কাদের কিছুতেই শুনিল না; সে এখন খোদার ফজলে যথেষ্ট উপায় করিতেছে, এক্ষেত্রে নিজের একটা বন্দোবস্ত করিয়া লওয়া ভালো দেখাইবে না বলিয়া সে জেদ করিতে লাগিল। অগত্যা আকবর আলীকে সম্মত হইতে হইল। তিনি বৈঠকখানা ঘরের বারান্দায় একধারে ঘিরিয়া উপস্থিত রান্নার কাজ চালাইবার মতো একটু স্থান করিয়া দিলেন।

কিন্তু রাঁধিবার আর লোক পাওয়া গেল না। অবশেষে আবদুল কাদেরের চাপরাসী নিজেই কেবল খোরাক পাইয়া রাধিয়া দিতে রাজি হইল। কিন্তু তাহাকে বেশি রাঁধিতে হইত না। আকবর আলীর অন্দর হইতে প্রায়ই ডালটা, তরকারিটা আসিত, এবং সপ্তাহের মধ্যে অন্তত তিন সন্ধ্যা আবদুল কাদেরকে বোর্ডিঙের সুপারিন্টেন্ডেন্টের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইতে হইত।

এইরূপে প্রায় এক মাস কাটিয়া গেল। একদিন সন্ধ্যার পর বৈঠকখানায় বসিয়া আবদুল কাদের আবদুল্লাহর সহিত পরামর্শ করিতেছিল, বাড়ি প্রস্তুত হইয়া গেলে হালিমাকে আনা যাইবে কি না। তাহার মাসিক আয় গড়ে এক শত টাকারও উপর। তাহা হইতে পিতার দেনা পরিশোধ বাবদ ৬০ টাকা করিয়া দিলে তাহার ৫০ টাকা আন্দাজ থাকিবে। তাহাতে জেলার ওপর সপরিবারে খরচ চালানো যায় কি না, দুই জনে তাহারই একটা হিসাব করিতেছিল, এমন সময় নাদের আলী সেখানে উপস্থিত হইয়া আভূমি মাথা নোয়াইয়া আদাব করিয়া দাঁড়াইল।

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, –কী নাদের আলী, খবর কী? তোমার বাড়ির আকামতের মৌলুদ পড়তে হবে কবে?

নাদের আলী মুখে একটু বিষণ্ণতার ভাব আনিয়া কহিল, –হুজুর, বড় এট্টা মুশকিলি পড়লাম, তাই এখন কী করি ভাবতিছি।

কেন, কেন, কী হয়েছে?

আমাগোর মোন্সব বাবুর এক সুমুন্দি সব্‌ডিপুটি হয়ে আইছেন; তা মোন্সব বাবু আস্যে আমারে ধরে পড়লেন; আগাম টাকা নিতি চালাম না, তাও জোর করে দশটা টাকা হাতে গুঁজে দ্যে গেলেন ও বাড়ি তানার সুমুন্দিরে দিতেই হবে। আপনাগোরে আগে কথা দিছি, সে কথা কত করে কলাম, তা তারা মোটেই শোনলেন না। কী করি এখন…

আবদুল্লাহ্ উষ্ণ হইয়া উঠিয়া কহিল, –বাঃ আমাদের কথা দিয়ে রেখেছ আজ এক মাস হল, এর ওপরেও আবার কী করবে ভাবছ? তোমার কথার ওপর নির্ভর করে আমি এদ্দিন বসে আছি, পরিবার আনবার বন্দোবস্ত কচ্ছি; আর আজ কিনা তুমি ফস্ করে আর একজনকে বাড়ি দিয়ে ফেলে? আমরা আগাম দিতে চাইলাম, তা নিলে না; আর তোমার মুন্সেফ বাবু যেই এসে টাকা দিলেন, অমনি নিয়ে ফেল্লে! ছিঃ নাদের, তোমার একটু লজ্জাও হল না আমাদের সুমুখে আসতে?

নাদের মিনতি করিয়া কহিল, –তা কী করি হুজুর, তানারা মুনিব, নাগোর কথা তো ঠেলতি পারি নে। তা আমি আপনাগোর আর এট্টা বাড়ি দেখে দেব, আপনাগোর কোনো কষ্ট হবে না…

আর কষ্ট হবে না। নাদের, তুমি তোমার নিজের বাড়ির সম্বন্ধেই যখন কথা রাখতে পাল্লে না, তখন আর তুমি পরের বাড়ি দেখে দিয়েছ! আর তো বাড়িই নেই, তা তুমি দেবে কোথে কে? হিন্দু-বাড়ি কি আর আমাদের দেবে?

কেন দেবে না হুজুর? ওই ওদিকে বাবুর একখানা বাড়ি খালি আছে, তবে তার ভাড়াডা কিছু বেশি, তিরিশ টাকা…

আবদুল কাদের কহিল, –অত টাকা আমি দেব কোত্থেকে নাদের? কুড়ি টাকার মধ্যেই চাই।

নাদের একটু ভাবিয়া কহিল, –শোশি বাবুগোর একখান বাড়ি আছে দুই কামরা, ১৫ টাকা। সে খালি হবার কথা শুনিছি। ওবোশিয়ের বাবু ছেলেন সে বাড়িতি, তিনি বদলি হয়ে গ্যালেন। সেইডেই দেখি যদি হয়।

আবদুল্লাহ্ হতাশভাবে কহিল, –তা দেখ। কিন্তু হবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।

তা য্যামন করে পারি আপনাগোরে এট্টা বাড়ি করে দেবই, আপনারা ভাবনা করবেন না। এইরূপ আশ্বাস দিয়া নাদের চলিয়া গেল।

একটু পরেই আকবর আলী অন্দর হইতে বাহিরে আসিলে আবদুল কাদের নাদেরের বাড়ি সম্বন্ধে সকল কথা খুলিয়া বলিল। আকবর আলী একটু চিন্তিতভাবে কহিলেন… তবেই তো! ও বাড়ি যখন হাতছাড়া হয়ে গেল, তখন যে আপনি এখানে আর বাড়ি পাবেন, এমন বোধ হয় না। কোনো হিন্দুই মুসলমানকে বাড়ি দেবে না।

আবদুল কাদের একটু প্রতিবাদের সুরে কহিল, নাদের যেমন নিশ্চিত রকম ভরসা দিয়ে গেল, তাতে বোধহয় বাড়ি পাওয়া যেতে পারে। যদি কেউই না দিত, তবে নাদের অমন জোর করে বলতে পারত না যে, সে বাড়ি করে দেবেই। যার বাড়ির কথা বল্লে সে লোকটা হয়তো মুসলমানকে দিতে আপত্তি নাও কত্তে পারে বলে নাদের জেনে থাকবে…

কার বাড়ির কথা বল্লে সে?

আবদুল্লাহ্ কহিল, –শশীবাবু, বোধহয় উকিল শশীবাবু হবেন…

আকবর আলী অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া কহিলেন, –ওঃ শশীকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ওর বাড়ি যদি আপনি পান তবে আমি কী বলেছি… ।

আবদুল কাদের কহিল, –আচ্ছা দেখাই যাক না, নাদের কদ্দূর কী কত্তে পারে। আর আমার বোধহয় এখন হিন্দুতে যখন মুসলমানের বাড়ি ভাড়া নিচ্ছে, তখন ওরা মুসলমানকে বাড়ি দিতে আর আপত্তি নাও কত্তে পারে।

আকবর আলী কহিলেন, –আপনি ক্ষেপেছেন? মুসলমানের বাড়ি হিন্দুতে ভাড়া নিচ্ছে বলেই যে হিন্দুর বাড়ি মুসলমানকে দেবে, এর কোনো মানে নাই। আমি যখন নবাবশাহীতে প্রথম চাকরি পাই, তখনকার এক ঘটনা শুনুন। একজন মুসলমান রইস্ মারা গেলেন; তাদের। পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল না। ছেলেরা পুরোনো বাড়িটা বেচে ফেল্লে। বাড়িখানা মন্দ ছিল না। এক হিন্দু ডাক্তার সেটা কিনেছিল; সে একটু মেরামত সেরামত করে ভাড়া খাটাতে লাগল। কিছুদিন পরে একজন মুসলমান ডিপুটি নবাবশাহীতে বদলি হয়ে এলেন। তখন ও বাড়িটা খালি ছিল; তিনি এত ঝুলোঝুলি কল্লেন, ভাড়া অনেক বেশি দিতে চাইলেন, কিছুতেই সে ডাক্তার দিলে না। সাফ বলেই দিলে, মুসলমানকে দেবে না।

আবদুল কাদের কহিল, –বাঃ, বেশ তো! ওরা আমাদেরটা নেবে, আর আমাদের দরকার হলে ওদেরটা পাব না? মুসলমানের বাড়ি হিন্দুর কাছে বেচাও উচিত নয়, আর ভাড়া দেওয়াও উচিত নয়।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ভাই রে, বেচা উচিত নয় বলছ, কিন্তু মুসলমান খদ্দের পাবে কটা? আর ভাড়া না দিয়েই বা যাবে কোথা? কজন মুসলমান চাকুরে আছে যে, সকল সময় ভাড়া পাবে? তা ছাড়া ওরাই তো যত আপিস-আদালতের হর্তাকর্তা, ওদের সঙ্গে আড়াআড়ি করে কি আমাদের চলে? এই দেখ না, নাদের বেচারা যদি মুনসেফ বাবুর সম্বন্ধীকে বাড়িটা না দিত, তবে ওর চাকরি নিয়েই পরে টানাটানি পড়ত। যেমন আমাদের সমাজের অবস্থা, তাতে এসব সয়েই থাকতে হবে। অনর্থক চটলে কোনো ফল নেই।

আবদুল কাদের হতাশভাবে কহিল, তবে কি আমি বাড়ি পাব না?

আকবর আলী কহিলেন, –সেই রকমই তো বোধ হচ্ছে। নিদেনপক্ষে এই পাড়াতে, একটু জায়গা নিয়ে ঘর বেঁধে থাকবেন, আমি যেমন আছি। আর তো কোনো উপায় দেখছি নে।

এইরূপ কথাবার্তায় রাত্রি অধিক হইয়া উঠিল দেখিয়া আবদুল্লাহ্ বিদায় লইয়া বোর্ডিঙে চলিয়া গেল। আবদুল কাদের রাত্রে শুইয়া আকবর আলী সাহেবের কথামতো বাসা-বাটী নির্মাণের কল্পনা করিতে লাগিল।

পরদিন বৈকালের দিকে নাদের আলী আবদুল কাদেরের আপিসে আসিয়া কহিল, শশীবাবু তাহার বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি হইয়াছেন, কিন্তু ভাড়া পাঁচ টাকা বৃদ্ধি করিয়া কুড়ি টাকা চাহিয়াছেন; আবদুল কাদের বাড়ি ভাড়া পাইবার আশা ছাড়িয়া দিয়াছিল; এক্ষণে নাদেরের কথায় তাহার আবার ভরসা হইল–সে কুড়ি টাকাই দিতে রাজি হইয়া গেল।

নাদের কহিল–তবে চলেন হুজুর, শশীবাবুর সাথে একবার মোকাবিলা করে ঠিকঠাক করে আসি গে। আমি তানারে কয়ে আইছি, আজই আপনারে লয়ে যাব। তানি সঁজ বাদ যাতি কইছেন।

বেশ তো, সন্ধ্যার পরই যাব। তুমি আমাকে নিয়ে যেও। আপিসেই থাকবখন–আজ কাজ অনেক।

সন্ধ্যার পর নাদের আসিয়া আবদুল কাদেরকে শশীবাবুর বাড়িতে লইয়া গেল। শশীবাবু তাকে পরম সমাদরে ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া একখানি চেয়ারে বসাইলেন এবং পান, তামাক প্রভৃতির ফরমাইশ করিলেন। তৎক্ষণাৎ পান আসিল, তামাক আসিলে শশীবাবু কিঞ্চিৎ সেবন করিয়া কলিকাটি নাদেরের হস্তে তুলিয়া দিয়া কহিলেন, –দেও তো মিঞা,

একটা কাগজের ঠোঙ্গা করে সবুরেজিস্ট্রার সাহেবকে তামাক খাওয়াও।

অনভ্যস্ত বলিয়া আবদুল কাদের কাগজের ঠোঙ্গায় তামাক খাইয়া জুত পাইল না। তবু ভদ্রতার খাতিরে দুই-এক টান দিল এবং কাশিতে কাশিতে কলিকাটি ফিরাইয়া দিল।

শশীবাবু উপস্থিত আর একটি ভদ্রলোকের দিকে কাটি বাড়াইয়া দিয়া কহিলেন, নাদের আলী বলছিল, আমার ওই নদীর ধারের বাড়িটা আপনি ভাড়া নিতে চান।

আবদুল কাদের কহিল, –হ্যাঁ মশায়, যদি দয়া করে দেন, তবে বড় উপকার হয়, বাড়ি পাচ্ছি নে।

তা বেশ তো; আমার বাড়ি নেবেন তাতে আর কথা কী! তবে ভাড়াটা সম্বন্ধে একটু কথা ছিল, নাদের আলী বলে নি আপনাকে?

হ্যাঁ, তা বলেছে। আপনি কুড়ি টাকা চান তো? আমি তাতেই রাজি আছি।

তা হলে আপনি আসচে মাসের পয়লা থেকেই নেবেন। এর মধ্যে আমি চুনকাম টুনকাম করিয়ে ফেলি। একটু-আধটু মেরামত কত্তে হবে। এ কটা দিন দেরি হলে আপনার কোনো অসুবিধে হবে না তো?

না, না, অসুবিধে কিছুই হবে না। আমি কটা দিন সবুর কত্তে রাজি আছি! তবে আপনি কিছু অগ্রিম নিলে আমি পাওয়া সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।

আবদুল কাদেরের এই প্রস্তাবে শশীবাবুর প্রতিই তাহার অবিশ্বাসের ভাব প্রকাশ পাইলেও আবদুল কাদের যেন নিজেকেই তাহার নিকট বিশ্বাস প্রতিপন্ন করিবার জন্য অগ্রিম দিতে চাহিতেছে এইরূপ ভাব দেখাইয়া শশীবাবু কহিলেন, –সে কী মশায়! অগ্রিমটগ্রিম আবার কেন? আপনার মতো ভদ্রলোকের মুখের কথাই কি আমার কাছে যথেষ্ট নয়?

ইহার উপর আর কথা চলে না। কাজেই আবদুল কাদেরকে কেবল মুখের কথার উপর নির্ভর করিয়াই বিদায় লইতে হইল।

আবদুল্লাহ্ আবদুল কাদেরের প্রতীক্ষায় আকবর আলীর বৈঠকখানায় বসিয়া তাহার সহিত বসিয়া গল্প করিতেছিল। এক্ষণে তাহাকে আসিতে দেখিয়া সে কহিল, –কী হে, এত রাত্তির হল যে?

গিয়েছিলাম শশীবাবুর ওখানে…

শশীবাবুর ওখানে? কেন–বাড়ি ঠিক করতে? পেলে?

আবদুল কাদের একটু বিজয়োল্লাসের সহিত কহিল, –হ্যাঁ হ্যাঁঃ! তোমরা বল, হিন্দুর বাড়ি মুসলমানে ভাড়া পায় না। ও একটা কথার কথা! এই তো আমি ভাড়া ঠিক করে এলাম। কুড়ি টাকা করে, ও-মাসের পয়লা থেকে নেব; শশীবাবু এর মধ্যে মেরামত টেরামত করে ফেলবেন।

আকবর আলী এবং আবদুল্লাহ্ উভয়েই এই কথা শুনিয়া একটু আশ্চর্য বোধ করিলেন। আবদুল্লাহ্ কহিল, যদি বাস্তবিক দ্যায়, তো সে খুব ভালো কথা। এতেই পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব বাড়বে; নইলে পরস্পরের ব্যবহারে কেবল রেষারেষি, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, এ সব থাকলে কি আর দেশের কল্যাণ হতে পারে?

বাসা একরূপ স্থির হইয়াছে বলিয়া আবদুল কাদের নির্ভাবনায় আপিস করিতেছে, এমন সময় একদিন শশীবাবু স্বয়ং আসিয়া দেখা দিলেন। আবদুল কাদের উঠিয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করিল এবং চেয়ার আনাইয়া বসিতে দিল। যথারীতি কুশল প্রশ্নাদির পর শশীবাবু কহিলেন, দেখুন সবুরেজিস্ট্রার সাহেব, আপনার কাছে এক বিষয়ে আমাকে বড়ই লজ্জিত হতে হচ্চে, অথচ উপায় নেই। আশা করি, কিছু মনে করবেন না…

আবদুল কাদেরের বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল, –বুঝি বাড়িটা ফসকাইয়া যায়! সে উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়া কহিল, –কেন, কেন?

শশীবাবু গভীর দুঃখব্যঞ্জক সুরে কহিতে লাগিলেন, –কী করব, মৌলবী সাহেব, বাড়িটা তো আপনাকে দেব বলেই ঠিক করেছিলাম, কিন্তু ও-দিকে এক বিষম বাগড়া পড়ে গেল…

ঔৎসুক্যে অধীর হইয়া আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, –কী রকম?

আমাদের বারের প্রেসিডেন্ট অতুল বাবু ওই পাড়াতেই থাকেন কিনা তা তিনি এবং আরো পাঁচজনে বলেছেন, ও-পাড়ায় ভদ্দরলোকের বাস, ওখানে মুসলমানকে বাড়ি দিলে সকলকারই অসুবিধে হবে, তাই ভাবছি–আবার এদিকে…।

ভদ্দরলোকের পাড়ায় মুসলমানকে থাকিতে না দেওয়ার ইঙ্গিতে আবদুল কাদের বড়ই রুষ্ট হইয়া কহিল, –তা ও-পাড়া যে ভদ্রলোকের পাড়া তা তো আপনার জানা ছিল, তবে আমার মতো অভদ্র অর্থাৎ মুসলমানকে কেন কথা দিয়েছিলেন মশায়?

না, না, মশায় কিছু মনে করবেন না আপনাকে কেন অভদ্র বলে মনে কত্তে যাব…

ভদ্রলোকের পাড়ায় যাকে থাকতে দেওয়া উচিত হয় না, সে অভদ্র নয় তো কী?

না, না, মৌলবী সাহেব, –ওটা একটা কথার কথা বৈ তো নয়–যেমন ধরুন না, বাঙালি বললে আপনারা বাঙালি হিন্দুকেই বোঝেন…

কই, তা তো বুঝি নে–আমরাও তো বাঙালি…

আমি অনেক মুসলমানকে বলতে শুনিছি, –মুসলমানেরা আজকাল ধুতি পরে বাঙালি সাজে। এর মানে কী?

এর মানে এই যে, অনেক মুসলমান ভিন্ন দেশ থেকে এসে এখানে বাস কচ্ছে কিনা তাই তারা এদেশের আসল বাসিন্দাদের বাঙালি বলে; কিন্তু তাই বলে আপনারা হিন্দু বলেই যে ভদ্র নামের একমাত্র অধিকারী, আর কেউ ভদ্রলোক নয়, এমন মনে করা কি ঠিক?

কি জানেন মৌলবী সাহেব, ওটা কথার কথায় দাঁড়িয়ে গেছে তা আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি আপত্তি মানতাম না; আসল কথা হচ্ছে কী জানেন, ও বাড়িখানি ঠিক আমার নয় কিনা? ওটা হচ্ছে আমার এক পিসিমার–তিনি বিধবা মানুষ জানেনই তো আমাদের বিধবারা কেমন গোঁড়া। তা তিনি কিছুতেই দিতে রাজি হলেন না। বললেন ওইটুকুই তার সম্বল আছে, ওতে অনাচার হলে তার অকল্যাণ হবে। এমন কথা বললে তো আর পীড়াপীড়ি করা যায় না। এখন কী করি, এ-দিকে আপনাকেও কথা দিয়ে রেখেছি, ও-দিকে পিসিমাকেও রাজি কত্তে পাচ্ছি নে, আমি মহা মুশকিলে পড়ে গিইছি…

আবদুল কাদের বিরক্তির সহিত কহিল, –বাড়ি যখন আপনার নিজের নয়, তখন তাকে না জিজ্ঞেস করে আপনার কথা দেওয়া উচিত হয় নি…।

আমি তখন এতটা ভাবি নি মশায় তিনি যে আপত্তি কত্তে পারেন এ-কথা আমার। মনেই হয় নি। নইলে কি আর আপনাকে এমন করে হয়রান করি? তা আপনি কিছু মনে করবেন না মশায়। তবে এখন উঠি, সেলাম।

সন্ধ্যার পর আকবর আলী এবং আবদুল্লাহ্ তাহার মেঘাচ্ছন্ন মুখ দেখিয়া বুঝিলেন যে, একটা কিছু ঘটিয়াছে। আবদুল কাদের নিষ্ফল ক্রোধে ও ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া শশীবাবুর ব্যবহারের উল্লেখ করিয়া কহিল, –দেখুন তো, লোকটার আচরণ! এমন করে আশা দিয়ে নিরাশ কল্লে! এ কি মানুষের কাজ? আকবর আলী কহিলেন, –তা আর কী করবেন বলুন! ব্যাপারটা কী হয়েছে, তা আমি বুঝতে পেরেছি। ওর বাড়িখানার ভাড়া বাড়াবার দরকার ছিল, সুযোগ পেয়ে আপনাকে দিয়ে বাড়িয়ে নিলে। ২০ টাকা দিতে রাজি হয়েছিলেন, এই বলে সে কারুর কাছ থেকে অন্তত ১৮ টাকা তো আদায় করবেই। যখন আপনার সঙ্গে কথাবার্তা হয়, তখন হয়তো সে লোককেও সেখানে হাজির রেখেছিল; আপনার মুখ থেকেই তাকে শুনিয়ে দিয়েছে যে, ভাড়া বেশি দিতে চেয়েছেন। আমি অনেক দিন থেকে ওদের সঙ্গে মেলামেশা কচ্ছি কিনা, ওদের কলাকৌশল আমার কিছু কিছু জানা আছে। দেখে নেবেন কদিন পরে।

২১-২৫. ১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগ

১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগের দরুন দেশের সর্বত্র যে হুলুস্থুল পড়িয়া গিয়াছিল, তাহারই ফলে রসুলপুর হাইস্কুলেও তুমুল স্বদেশী আন্দোলনের উদ্ভাবনা হয়। ছাত্রেরা বিদেশী দ্রব্যের ব্যবহার রহিত করিল, মাথায় করিয়া দেশী কাপড় ও অন্যান্য দ্রব্য ফেরি করিতে আরম্ভ করিল এবং দল বাঁধিয়া বাজারে গিয়া বিলাতি দ্রব্যের বেচাকেনা বন্ধ করিবার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই প্রণোদিত করিতে লাগিল। ইহাই লইয়া পুলিশের সহিত তাহাদের সংঘর্ষ উপস্থিত হয় এবং কয়েকজন ছাত্র ধৃত হইয়া শাস্তিও পায়। তার পর শিক্ষা বিভাগ হইতে এই ব্যাপারের তদন্ত করিবার জন্য স্বয়ং বিভাগীয় ইনস্পেক্টর রসুলপুরে আসিলেন এবং ছাত্রগণকে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিবার জন্য প্ররোচিত করার অপরাধে হেডমাস্টার এবং তাহার কয়েকজন সহকারীকে বরখাস্ত করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে স্কুল হইতে স্বদেশী আন্দোলনের বীজ সমূলে নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে উহাকে অস্থায়ীভাবে গভর্নমেন্ট স্কুলে পরিণত করিবার জন্য উপরে লিখিয়া পাঠাইলেন।

এইরূপে রসুলপুর স্কুলের গোলমাল মিটাইয়া ইনস্পেক্টর সাহেব বরিহাটী জেলা স্কুল পরিদর্শন করিতে আসিলেন। পূর্বেই সংবাদ দেওয়া ছিল; হেডমাস্টার মাস্টার-ছাত্র সকলের উপর কড়া কড়া নোটিশ জারি করিতে লাগিলেন, যেন পরিদর্শনের দিন সকলের পরিধানে পরিষ্কার কাপড় থাকে; সমস্ত শ্লেট-বহি, খাতা-পত্র প্রভৃতি আনিতে যেন কেহ না ভোলে, স্কুলঘরের ছাদ ও দেওয়ালের কোণগুলি হইতে মাকড়সার জালের রাশি বেশ করিয়া ঝাড়িয়া, দরজা জানালাগুলি ভিজা ন্যাকড়া দিয়া মুছিয়া এবং মেঝে ভালো করিয়া ধুইয়া তকতকে করিয়া রাখা হয়। কয়দিন হইতে স্কুলের চাকরবাকরগুলার খাটিতে খাটিতে প্রাণান্ত হইবার উপক্রম হইল; তথাপি তাহাদের কার্য হেডমাস্টারের মনঃপূত হইল না। দুবেলা তিনি সদলবলে আসিয়া তাহাদের উপর সচিৎকার তম্বি করিতে লাগিলেন। খাজনা অপেক্ষা বাজনাই বেশি হইতে লাগিল।

দেখিতে দেখিতে শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর আসিয়া উপস্থিত হইল। আজ সাহেব আসিবেন; মাস্টার-ছাত্র সকলেই সকাল সকাল স্কুলে আসিয়া পড়িয়াছেন। কোনো ক্লাসে সামান্য একটু গোলমালের আভাস পাইলেই পাঁচ-সাত জন ছুটিয়া গিয়া চাপা গলায় এই, এই! চুপ চুপ! বলিয়া ধমক দিতেছেন। ছাত্রেরা কী একটা নিদারুণ বিভীষিকা আসন্ন হইতেছে মনে করিয়া, উদ্বেগে মুখ অন্ধকার করিয়া গুটিসুটি মারিয়া বসিয়া থাকিতে চেষ্টা করিতেছে।

লাইব্রেরিঘরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া কয়েকজন মাস্টার নিম্নস্বরে আলাপ করিতেছেন– সাহেব আসিয়া কী বলিবে, কী করিবে, কাহার চাকরি থাকিবে, কাহার যাইবে–এমন সময় চাপরাসী দৌড়িয়া আসিয়া খবর দিল, –সাহেব, সাহেব! অমনি সকলে যে যার ক্লাসে গিয়া উপস্থিত হইলেন। যাহাদের ক্লাস ছিল না, তাহাদিগকে লইয়া হেডমাস্টার গেটের কাছে গিয়া দাঁড়াইলেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনস্পেক্টর, ডিপুটি-ইনস্পেক্টর, সব-ইনস্পেক্টর, ইনস্পেকটিং পণ্ডিত প্রভৃতি সামন্তবর্গ পশ্চাতে লইয়া সাহেবের শুভাগমন হইল; অমনি সকলে সপাগড়ি মস্তক আভূমি অবনত করিয়া সেলাম করিলেন। সাহেব হস্তস্থিত ক্ষুদ্র ছড়িখানির অগ্রভাগ হ্যাটের প্রান্ত পর্যন্ত উঁচু করিয়া সেলাম গ্রহণ করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, ওয়েল, হেডমাস্টার, হাউ আর ইউ? থ্যাংক ইউ স্যার, আই অ্যাম কোয়াইট ওয়েল বলিয়া হেডমাস্টার সাহেবের সুদীর্ঘ পদক্ষেপের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিতে ছুটিতে তাহার কামরায় আসিয়া প্রবেশ করিলেন।

যথারীতি স্কুলের বিবরণাদি পরীক্ষা করিয়া ইনস্পেক্টর সাহেব ক্লাস পরির্দশন করিতে উঠিলেন। সামন্তবর্গকে নিম্নতর শ্রেণীগুলির পরীক্ষার ভার দিয়া সাহেব উপরকার চারিটি ক্লাস দেখিবেন বলিয়া নোটিশ দিলেন। সকলে যে যার ক্লাসে গিয়া পরীক্ষা-কার্যে ব্যাপৃত হইলেন। খোদ সাহেব প্রথম শ্রেণীতে গিয়া প্রবেশ করিলেন।

ছাত্রেরা যথাসাধ্য নীরবতার সহিত উঠিয়া দাঁড়াইল এবং শিক্ষক মহাশয় যথারীতি সেলাম করিয়া সরিয়া দাঁড়াইলেন। সাহেব কামরাটির উপর-নিচে চারিদিকে এক নজর দেখিয়া লইলেন। দেওয়ালগুলির নিচের দিকটায় স্থানে স্থানে এবং মেঝের প্রায় সর্বত্র কালির ছিটার দাগ একটু একটু দেখা যাইতেছে; ওদিকে সম্মুখের দিককার জানালার খিলানের কোণে খানিকটা ঝুল বাতাসে নড়িতেছিল। এই সকলের দিকে সাহেবদের দৃষ্টি প্রথমে পড়িয়া থাকে; তাই তিনি একটুখানি টিটকারি দিয়া কহিলেন–ওয়েল হেডমাস্টার, আপনি স্কুলঘরটি তেমন পরিষ্কার রাখিতে যত্ন করেন না বলিয়া মনে হইতেছে।

যাহার জন্য চাকরদের সঙ্গে বকাবকি করিয়া গলা ভাঙিয়া গিয়াছে, তাহারই জন্য সাহেবের কাছে অপ্রস্তুত হইতে হইল! হেডমাস্টার মহাশয়ের মনে ভয়ানক ক্রোধের উদয় হইল; তিনি সাহেবের একটু পশ্চাৎ দিকে সরিয়া আসিয়া মুখখানা ভীষণ রকম বিকৃত করিয়া, চক্ষু দিয়া অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটাইয়া একবার এ-দিক ওদিক চাহিলেন। ভাগ্যে ভৃত্যদের কেহ সেখানে উপস্থিত ছিল না; থাকিলে আজ নিশ্চয়ই ভস্ম হইয়া যাইত!

প্রথম শ্রেণীর পরীক্ষা শেষ করিয়া সাহেব একে একে অপরাপর শ্রেণীর পরীক্ষা লইলেন। পরীক্ষাশেষে তিনি মত প্রকাশ করিলেন যে, ছেলেরা পড়াশুনায় মন্দ নহে, কিন্তু ছেলেদের একটা ভয়ানক বদঅভ্যাস হইয়াছে–তাহারা লিখিবার সময় কলম ঝাড়িয়া মেঝে ও দেওয়াল নষ্ট করে। ভবিষ্যতে যেন হেডমাস্টার এদিকে বিশেষ নজর রাখেন।

পরিদর্শন শেষ হইতে প্রায় চারিটা বাজিয়া গেল। সাহেব চলিয়া যাইতেছিলেন, এমন সময় একটি প্রিয়দর্শন সুবেশ ছাত্র ছুটির দরখাস্ত লইয়া তাহার সম্মুখে দাঁড়াইল। পশ্চাতে দপ্তরী দোয়াত-দান হাতে দাঁড়াইয়া ছিল; সাহেব দরখাস্তখানা হাতে লইতেই একজন শিক্ষক তাড়াতাড়ি একটা কলম তুলিয়া লইয়া দোয়াতে ডুবাইয়া একবার মেঝের উপর ঝাড়িয়া, সাহেবের দিকে বাড়াইয়া ধরিলেন। সাহেব একটু মুচকি হাসিয়া কলম লইলেন এবং দুই দিনের ছুটি মঞ্জুর করিয়া প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় হেডমাস্টারকে বলিয়া গেলেন, যদি কোনো শিক্ষকের বিশেষ কোনো কিছু বলিবার থাকে, তবে কল্য প্রাতে ৮টা হইতে ৯টার মধ্যে ডাকবাংলায় তাহার সঙ্গে দেখা করিতে পারেন। কে কে দেখা করিতে যাইবেন, তাহা যেন আজই সন্ধ্যার মধ্যে তাঁহাকে লিখিয়া জানানো হয়। তবে কেহ যেন অনর্থক তাহাকে বিরক্ত করিতে না যান, হেডমাস্টার সেদিকে লক্ষ্য রাখিয়া লিস্ট প্রস্তুত করিবেন!

পরদিন প্রাতে হেডমাস্টার মহাশয়ের প্রস্তুত লিস্ট অনুসারে যে তিন জন শিক্ষক সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিবার অনুমতি পাইয়াছিলেন, তাঁহারা আটটার পূর্বেই আসিয়া ডাকবাংলায় উপস্থিত হইলেন। একটু পরে আবদুল্লাহও আসিয়া হাজির হইল। তাহাকে দেখিয়া একজন শিক্ষক জিজ্ঞাসা করিলেন, –আপনি যে, আপনার নাম তো হেডমাস্টার লিস্টে দেন নাই, সাহেব কি আপনার সঙ্গে দেখা করবেন? আপনি কার্ড দিবেন না, অনর্থক সাহেব বিরক্ত হবেন, আর আমাদেরও কাজ নষ্ট হবে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –না মশায়, ভয় নেই, আমি এখন কার্ড দিচ্ছি নে। আপনারা দেখাটেখা করে আসুন, তারপর আমি কার্ড দেব; তারপর সাহেব যা করেন!

যথাসময়ে শিক্ষকত্রয়ের একে একে ডাক হইল। দশ-পনের মিনিটের মধ্যেই তাহাদের রাজদর্শন সমাধা হইয়া গেল। সাহেব মিষ্ট কথায় তুষ্ট করিয়া তাহাদিগকে বিদায় করিলেন; তাঁহারাও হাসিমুখে ভবিষ্যৎ প্রমোশনের কথা কল্পনা করিতে করিতে যে যাহার ঘরে গেলেন। আবদুল্লাহ্ কার্ড পাঠাইয়া দিল।

একটু পরেই আবদুল্লাহর ডাক হইল। ঘরে ঢুকিবামাত্র সাহেব কহিলেন, ওয়েল মৌলবী, আপনার নাম তো হেডমাস্টার পাঠান নাই, তবে আপনি আমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন কেন?

আবদুল্লাহ্ বিনীতভাবে কহিল, –স্যার, আমি নিজের কোনো কথার জন্যে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসি নি, এখানকার আঞ্জুমানের তরফ থেকে প্রেরিত হয়ে এসেছি…

আঞ্জুমানের কী এমন বিশেষ কথা আছে?

স্যার, স্কুলে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা এখন ক্রমে ক্রমে বেড়ে উঠেছে। দু বছর আগে ছিল মাত্র তেইশটি, কিন্তু বর্তমানে আটত্রিশটি হয়েছে। অথচ ফারসি পড়াবার জন্যে মৌলবী

নেই। আঞ্জুমান প্রার্থনা করেন যে, একজন মৌলবী নিযুক্ত করা হোক।

এখানকার মুসলমান ছাত্রেরা তো সব সংস্কৃত পড়ে; তবে মৌলবীর দরকার কী?

ফারসি পড়তে পায় না বলেই তারা সংস্কৃত পড়ে, স্যার। মৌলবী পেলে সকলেই ফারসি পড়বে, এবং ভবিষ্যতে ছাত্রের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আঞ্জুমান মনে করেন।

সাহেব একটু ভাবিয়া কহিলেন, –আচ্ছা, বেশ, আপনি আঞ্জুমানকে বলতে পারেন একটা Representation দিতে। আমি এ-সম্বন্ধে বিবেচনা করব। আর কোনো কথা আছে?

না স্যার, আমার আর কোনো কথা নাই।

আবদুল্লাহর ইংরেজি কথাবার্তায়, তাহার সসম্ভ্রম অথচ নিঃসঙ্কোচ আলাপে এবং তাহার আদব-কায়দায় সাহেব তাহার দিকে বেশ একটু আকৃষ্ট হইতেছিলেন। তিনি একটু ভাবিয়া কহিলেন, –এসিস্টান্ট ইনস্পেক্টরের মন্তব্যের মধ্যে দেখলাম আপনি দেশী খেলার বড় পক্ষপাতী। বলে তিনি রিমার্ক করেছেন–কেন, আপনি ফুটবল, ক্রিকেট, এগুলো পছন্দ করেন না?

আবদুল্লাহ্ কহিল, খুবই করি, স্যার। এগুলোতে শরীর, মন উভয়ের স্ফুর্তি জন্মে এবং ছাত্রদের পক্ষে একান্ত উপযোগী। কিন্তু আমাদের ফিল্ড ছোট, স্কুলের সকল ছাত্র একসঙ্গে খেলায় যোগ দিতে পারে না। সুতরাং অনেক ছাত্রই হয় বাড়িতে চুপ করে বসে থাকে, না হয় গল্প করে বেড়ায় আর খুব বেশি করে তো মাঠের একধারে বসে খেলা দেখে। তাই। আমি তাদের জন্যে কতকগুলো দেশী খেলা চালিয়েছি, যার জন্যে কোনো বড় মাঠ দরকার হয় না, আরো অনেকগুলো ছেলে একসঙ্গে খেলতে পারে, এমনকি, রাস্তার ধারে একটু জায়গা পেলেও খেলা চলে।

সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী কী খেলা আপনি চালিয়েছেন?

আবদুল্লাহ্ তখন ডাণ্ডা-গুলি, হাডু-ডুডু, কপাটি, গোল্লাছুট প্রভৃতি খেলার বিবরণ সাহেবকে বলিয়া বুঝাইয়া দিল। সাহেব শুনিয়া কহিলেন, –এ খেলাগুলো তো বেশ! কিন্তু তাই বলে ফুটবল, হকি, এগুলো একেবারে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

না স্যার, ওগুলোও ছেলেরা খুব খেলে। প্রায়ই অন্যান্য স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে ম্যাচ হয়, তাতে আমাদেরই বেশির ভাগ জিত হয়।

সাহেব কহিলেন–খেলার দিকে আপনার এতটা ঝোঁক আছে, ভালো কথা। এসব থাকলে আর ছেলেরা বদ-খেয়ালের দিকে যাবার অবসর পায় না। আপনার চাকরি কত দিনের হল?

এই প্রায় আড়াই বৎসর হয়েছে।

কোন্ গ্রেডে আছেন?

চল্লিশ টাকার গ্রেডে।

আপনি আন্ডারগ্রাজুয়েট?

যখন চাকরিতে ঢুকি, তখন আন্ডারগ্রাজুয়েট ছিলাম; এই বৎসর বি-এ পাস করেছি। আরবিতে সেকেন্ড ক্লাস অনার পেয়েছি।

ও, বটে? বড়ই সুখের বিষয়। আশা করি, সত্বরই সার্ভিসে আপনার উন্নতি হবে।

এই বলিয়া সাহেব চুপ করিলেন। আবদুল্লাহ্ বিদায় লইবার জন্য কিঞ্চিৎ মাথা নোয়াইয়া আদাব করিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু সাহেব আবার কহিলেন, –আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাতে খুশি হয়েছি, মৌলবী। আপনার যাতে একটা বিশেষ সুবিধে হয়ে যায়, তার জন্যে আমি চেষ্টা করব–তবে এখন স্পষ্ট কিছু বলতে পাচ্ছি নে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –আপনার মেহেরবানিই আমার পক্ষে যথেষ্ট, স্যার।

সাহেব একটু হাসিয়া কহিলেন, –অল্ রাইট, মৌলবী, গুড মর্নিং।

আবদুল্লাহ্ আবার আদাব করিয়া বিদায় হইল।

.

২২.

প্রায় চারি বৎসর পরে হালিমা শ্বশুরবাড়ি আসিয়াছে। এবার সৈয়দ সাহেব নিজে উদ্যোগ করিয়া পীরগঞ্জে গিয়া তাহাকে লইয়া আসিয়াছেন। বরিহাটী হইতে দলিল লেখাপড়া করিয়া ফিরিয়া আসিয়াই তিনি মসজিদের কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছিলেন; কিন্তু ভালো লোক অভাবে কাজ বড়ই ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছিল। তাই মসজিদটা শেষ করিয়া তুলিতে আট-নয় মাস লাগিয়া গেল। মসজিদ শেষ হইয়াছে; সৈয়দ সাহেব যেখানে যত আত্মীয়স্বজন আছে, কেবল এক মীর সাহেব ছাড়া সকলকেই, কোথাও আবদুল মালেককে পাঠাইয়া, কোথাও নিজে গিয়া, দাওয়াদ করিয়াছেন, রমজান মাসের ১ তারিখেই আকামত হইবে; খুব একটা ধুমধামের আয়োজন হইতেছে। সে সময়ে পূজার ছুটিও হইবে এবং আবদুল কাদেরকেও বাড়ি আনা হইবে। তখন মৌলুদ শরীফ, খাওয়াদাওয়া, ফকির খাওয়ানো, এইসব করিতে হইবে।

বেহান কিন্তু প্রথমে হালিমাকে ছাড়িতে চাহেন নাই, –আজ প্রায় চারি বৎসর সে তাহার কাছে আছে, এখন হঠাৎ চলিয়া গেলে তিনি একলা কেমন করিয়া থাকিবেন, ইত্যাদি। কিন্তু সৈয়দ সাহেব কোনো কথাই শুনিলেন না; এমনকি বেহানকে সুদ্ধ লইয়া যাইবার জন্য জেদ করিতে লাগিলেন। উভয় তরফের তর্কাতর্কির ফল এই দাঁড়াইল যে, হালিমা এক্ষণে একবালপুরে যাউক, পূজার ছুটির তো আর বেশি দেরি নাই, আবদুল্লাহ্ বাড়ি আসিলে তাহার মাতা সৈয়দ সাহেবের মসজিদ আকামতের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইবেন। কিন্তু ফিরিবার সময় ছেলে, বউ, মেয়ে, জামাই, সব লইয়া আসিবেন।

পূজার ছুটি আসিল; আবদুল্লাহ্ও বাড়ি আসিল। কয়েক দিন পরে আবদুল কাদের একবালপুরে আসিলে পীরগঞ্জে লোক পাঠানো হইল। আবদুল্লাহ্ মাতাকে লইয়া শ্বশুরবাড়ি আসিল।

ধুমধাম খুবই হইল। এবার আত্মীয়স্বজন কেহ কোথাও বাকি নাই। শরীফাবাদ, মজিলপুর, রসুলপুর, নূরপুর প্রভৃতি গ্রাম হইতে প্রায় সকলেই মায় সওয়ারী তশরীফ আনিয়াছেন। এমনকি, আবদুল খালেকও এবার সপরিবারে নিমন্ত্রিত হইয়াছেন।

পহেলা রমজান বাদ-মগরেব (সান্ধ্য নামাযের পর) মসজিদে মৌলুদ শরীফ শুরু হইল। ঝাড়-ফানুসে মসজিদের অন্দর ও বারান্দা আলোকময় এবং শোভাময় হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু লোক আর ধরিতেছে না–মসজিদ নিতান্ত ছোট নহে, ঢের লোক ধরিতে পারে; কিন্তু যিনি আসিতেছেন, তিনিই মসজিদে প্রবেশ করিয়াই দরজার কাছে বসিয়া পড়িতেছেন, কেহই মিম্বারের কাছে ঘেঁষিয়া বসিবার বেআদবিটুকু স্বীকার করিতে চাহিতেছেন না। সুতরাং আদব রক্ষা করিতে গিয়া জায়গার টানাটানি পড়িয়া গেল। অধিকাংশ লোককে বারান্দাতেই বসিতে হইল।

ক্রমেই যখন বারান্দা ভরিয়া গেল, তখনো গ্রামের নিমন্ত্রিতদের আসিতে বাকি। তাঁহারাও একে একে আসিতে আরম্ভ করিলেন। এখন বসিতে দেওয়া যায় কোথায়? আবদুল মালেক তাড়াতাড়ি আসিয়া হুকুম করিলেন, –ওরে, বাইরে একটা বড় শতরঞ্জি পেতে দে।

আবদুল্লাহ্ নিকটেই ছিল, সে জিজ্ঞাসা করিল, –বাইরে কেন?

আবদুল মালেক কহিলেন, –তবে এঁরা বসবেন কোথায়? ভিতরে তো ধরগে’ তোমার আর জায়গা নেই।

কেন থাকবে না? মসজিদের মধ্যে তো সব খালি পড়ে আছে!

তা সেখানে তো কেউ বসছে না, এখন ধরগে’ তোমার করি কী?

আচ্ছা, আমি দেখছি, দাঁড়ান–বাইরে বসানো কি ভালো দেখাবে? এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ অতি কষ্টে বারান্দার ভিড় ঠেলিয়া মসজিদের মাঝখানের দরজাটির কাছে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং যাহারা দরজা ঘেঁষিয়া ঠাসাঠাসি করিয়া বসিয়াছিলেন, তাহাদিগকে কহিতে লাগিল, –আপনারা একটু এগিয়ে বসুন, জনাব!

সকলেই ঘাড় ফিরাইয়া তাহার দিকে একবার চাহিল, কিন্তু কেহই নড়িয়া বসিল না।

আবদুল্লাহ্ আবার কহিল, –ঢের জায়গা রয়েছে সুমুখে, আপনারা একটু এগিয়ে না বসলে যে অনেক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এই কথায় দুই-এক জন একটু নড়িয়া কেহ আধ হাত, কেহ-বা বড়জোর মুটুম হাত পরিমাণ অগ্রসর হইয়া বসিলেন। অনেক বলিয়া-কহিয়াও আবদুল্লাহ্ ইহাদিগকে আর নড়াইতে পারিল না দেখিয়া বাহিরে ফিরিয়া আসিল এবং যাহারা দাঁড়াইয়া ছিলেন, তাহাদিগকেই ভিতরে বসাইবার জন্য ডাকিয়া আনিল।

কিন্তু তাহারাও দরজা পর্যন্ত আসিয়া থমকিয়া গেলেন! কী ভয়ে যে কেহ ভিতরের খোলা ময়দানের মতো খালি জায়গায় গিয়া বসিতে চাহিতেছেন না তাহা আবদুল্লাহ্ ভাবিয়া পাইল না। অবশেষে বিরক্ত হইয়া সে বারান্দার ভিড়ের মধ্য হইতে ছোট ছোট ছেলেগুলাকে টানিয়া তুলিয়া ভিতরে ঠেলিয়া দিতে লাগিল। সে বেচারারাও ভিড়ের চাপ হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া বাঁচিল, এদিকে বারান্দার নবাগতদিগেরও কিঞ্চিৎ স্থান হইয়া গেল।

মৌলুদ পাঠ শুরু হইয়া গেল। মৌলুদ-খান সাহেব কলিকাতার আমদানি, সঙ্গে দুই জন চেলা। তাহার গলা যেমন দরাজ, তেমনি মিষ্ট; তিনি প্রথমেই কোরান মজিদ হইতে একটি সুরা এমন মধুর কেরাতের সহিত আবৃত্তি করিয়া গেলেন যে, সকলে শুনিয়া মোহিত হইয়া গেল। তারপর উর্দু কেতাব খুলিয়া সম্মুখস্থ বালিশের উপর রাখিয়া চক্ষু বন্ধ করিলেন এবং উর্দু গদ্যে ও গজলে, কখনো-বা দুই-একটা ফারসি বয়েতে নানা সুরে কখনো-বা একা, কখনো চেলাদ্বয়ের সহিত একত্রে, রওআয়েতের পর রওআয়েত আবৃত্তি করিয়া যাইতে লাগিলেন। প্রথমেই পবিত্র মৌলুদ শরীফ শ্রবণের অশেষবিধ গুণের বর্ণনা করা হইল–কেমন করিয়া বোন্দাদবাসিনী এক ইহুদি রমণী একবার স্বপ্নে স্বয়ং হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামকে প্রতিবেশী মুসলমান বণিকের গৃহে শুভাগমন করিতে দেখিয়াছিল এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছিল যে, যে বাটীতে মৌলুদ শরীফ পাঠ করা হয় হযরত স্বয়ং এইরূপে সদা-সর্বদা সেই বাটীতে অদৃশ্যভাবে যাতায়াত করিয়া থাকেন–আবুলাহাবের বাঁদী তাহার প্রভুর নিকট হযরতের জন্ম-সংবাদ আনিয়া কিরূপ আনন্দ প্রকাশ করিয়াছিল এবং সেইদিন সোমবার ছিল বলিয়া মৃত্যুর পর কাফের থাকাবশত দোজখে গিয়াও কিরূপে প্রতি সোমবারে আজাব (নরক-যন্ত্রণা) হইতে রেহাই পাইয়া আসিতেছে–যে-ঘরে মৌলুদ শরীফ পাঠ করা হয় সেখানে কিরূপে ফেরেশতাগণের শুভাগমন হইয়া থাকে এবং তথায় কিরূপ অপূর্ব স্বর্গীয় আলোক প্রদীপ্ত হইয়া থাকে, পবিত্র হাদিস শরীফে তাহার কী কী প্রমাণ দেওয়া আছে–এসকল যথাযথরূপে বিবৃত হইল।

তাহার পর এই বিশ্বজগতের সৃষ্টির পূর্বের কথা আসিল। তখন কেবল আল্লাহতালার পবিত্র নূর এবং সেই নূর হইতে তাহারই ইচ্ছায় সৃষ্ট আমাদের নবী-করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হেস্ সালামের পবিত্র নূর ভিন্ন আর কিছুই বিদ্যমান ছিল না। এই পবিত্র মোহাম্মদী নূর তখন এক পবিত্র স্থানে বহু আবরণের মধ্যে রক্ষিত ছিল–পরে উহা ওই সকল আবরণ হইতে বহির্গত হইয়া নিশ্বাস লইলে, সেই পবিত্র নিশ্বাস হইতে ফেরেশতাগণ, পয়গম্বরগণ এবং বিশ্বাসীগণের আত্মাসমূহ সৃষ্টি হইল। ইহার পর ওই নূর দশ ভাগে বিভক্ত হইল এবং দশম ভাগ হইতে উৎপন্ন বস্তুর দৈর্ঘ্য চারি সহস্র বৎসরের ন্যায় হইল, প্রস্থও তাহার অনুরূপ হইল। আল্লাহ্ যখন ওই বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন, তখন উহা কাপিতে কাঁপিতে অর্ধেক জল ও অর্ধেক অগ্নিতে রূপান্তরিত হইয়া গেল। ওই জল সমুদ্রে পরিণত হইল এবং সমুদ্রের তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে বায়ুমণ্ডলের উৎপত্তি হইয়া এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শূন্যস্থান পূর্ণ করিয়া দিল। তাহার পর সেই অগ্নির উত্তাপে সমুদ্রে ফেন ও বাষ্প এই দুইটি পদার্থ উৎপন্ন হইল; ফেন হইতে জন্মিল মৃত্তিকা এবং বাষ্প হইতে হইল আকাশ। মৃত্তিকা তখন টলমল করিতেছিল, সুতরাং তাহাকে স্থির করিবার জন্য ফেনের মধ্যে যেগুলি অত্যন্ত বৃহদাকার এবং শুভ্রবর্ণ ছিল, সেগুলিকে পর্বতরূপ পেরেকে পরিণত করিয়া মৃত্তিকায় ঠুকিয়া দেওয়া হইল। আবার পর্বতগুলির মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবেশ করিয়া খনির সৃষ্টি করিয়া দিল।

পরে যখন আল্লাহতালা মানুষ সৃষ্টি করিলেন, তখন ওই মোহাম্মদী নূর কিরূপে হযরত আদম আলায়হেস্ সালামের পৃষ্ঠে অর্পিত হইয়াছিল, এবং অর্পণকালে তিনি পশ্চাদ্দিকে কিরূপ সুমধুর ধ্বনি শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া গিয়াছিলেন; কিরূপে হযরত আদমের বংশাবলির মধ্যে পর পর কাহার কাহার পৃষ্ঠে নূর প্রকাশিত হইতে হইতে অবশেষে কোরেশ বংশের বনি হাশেম শাখার আবদুল্লাহর মুখমণ্ডলে আসিয়া প্রকাশিত হইয়াছিল এবং তাহাই দেখিতে পাইয়া কিরূপে এক বুদ্ধিমতী ইহুদি সুন্দরী শেষ নবীর গর্ভধারিণী হইবার লোভে আবদুল্লাহর মনোহরণ করিয়া তাহার সহিত বিবাহিতা হইবার লোভে বৃথা চেষ্টা করিয়াছিল; যখন আমেনা খাতুনের সহিত আবদুল্লাহর বিবাহ হয়, তখন কিরূপে মক্কাবাসিনী দুই শত রূপসী যুবতী রশক ও হাসা-সে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল; যে-রাত্রে আমেনা বিবির গর্ভসঞ্চার হয়, সে-রাত্রে কিরূপে হযরত জিব্রীল বেহেশত হইতে সবুজ রঙের পতাকা আনিয়া কাবার উপর স্থাপন করিয়াছিলেন, কিরূপে শয়তানের আকুল ক্রন্দনে আরবের উপত্যকাগুলি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছিল, কিরূপে পৃথিবীর যেখানে যত দেব-দেবীর মূর্তি ছিল, সমস্তই মস্তক অবনত করিয়াছিল, কিরূপে পৃথিবীর জীবজন্তুসমূহ বাকশক্তি পাইয়া হযরতের শুভাগমন বিষয়ের আন্দোলন জুড়িয়া দিয়াছিল–এ সকল ব্যাপার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিবৃত হইতে লাগিল।

অবশেষে যখন আমেনা বিবির প্রসবকাল নিকটবর্তী হইল, তখন তিনি দেখিলেন যে, সূতিকাগৃহ জ্যোতির্ময়ী রমণীবৃন্দের দ্বারা আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিতেই তাঁহারা কহিলেন যে, তাহারা বেহেশতের হুর, খোদাতালা কর্তৃক আমেনা বিবির সেবা শুশ্রূষার জন্য প্রেরিতা হইয়াছেন। এমন সময় একটা বিকট শব্দ হইল–আমেনা চকিতা ও ভীতা হইয়া উঠিলেন, কিন্তু তৎক্ষণাৎ এক প্রকাণ্ড শ্বেতকায় পক্ষী আসিয়া আমেনার বক্ষঃস্থলে ডানা ঘষিয়া দিল, অমনি তাহার ভয় দূর হইয়া গেল; কিন্তু ভয়ের পরিবর্তে ভয়ানক পিপাসা বোধ হইতে লাগিল। হঠাৎ কোথা হইতে এক যুবক আসিয়া পড়িলেন এবং এমন এক পেয়ালা শরবত তাহার সম্মুখে ধরিলেন, যাহা দুধ অপেক্ষাও শুভ্র এবং মধু অপেক্ষাও মিষ্ট ছিল। আমেনা তাহাই পান করিয়া সুস্থ হইলেন– যথাসময়ে হযরত ভূমিষ্ঠ হইলেন।

এইখানে মৌলুদ-খান সাহেবের ইঙ্গিতমতো মজলিসের সকলেই উঠিয়া দাঁড়াইয়া। তাহার সহিত সুর মিলাইবার বৃথা চেষ্টা করিয়া উচ্চৈঃস্বরে এয়া নবীসালাম আলায়-কা ইত্যাদি সালাম পড়িতে লাগিলেন। মৌলুদ-খান এক এক চরণ একা একা সুর করিয়া পাঠ করেন, আর চরণশেষে সকলে একযোগে এয়া নবী ইত্যাদি কোরাস ধরিয়া সুরে-বেসুরে চিৎকার করিতে থাকেন। ক্রমে সালাম পাঠ শেষ হইলে আবার সকলে বসিয়া পড়িলেন।

মৌলুদ-খান এক্ষণে কিছুক্ষণ দরুদ শরীফ পড়িলেন, এবং অনেকেই গুনগুন স্বরে তাহার সঙ্গে যোগ দিলেন। পরে হযরত রসুলে-মকবুল আহমদ মোজুতবা মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হেস সালামের শুভ জন্মগ্রহণ মুহূর্তে পৃথিবীর কোথায় কোথায় কী কী অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহার বর্ণনা আরম্ভ হইল। হযরত মুসা আলায়হেস্ সালাম্ তাহার শিষ্যবর্গকে (ইহুদিগণকে) বলিয়া গিয়াছিলেন যে, আকাশের বিশেষ একটি নক্ষত্র স্থানচ্যুত হইলে দুনিয়াতে কোনো নবীর আবির্ভাব হইবে। তদবধি ইহুদিগণ পুরুষপরম্পরায় সেই নক্ষত্রটি লক্ষ্য করিয়া আসিতেছিল, অদ্য সহসা উহা খসিয়া পড়িল! শাম-প্রদেশস্থ। একটি অতিথিশালার কূপ কয়েক বৎসর একেবারে শুকাইয়া গিয়াছিল, অদ্য হঠাৎ তাহা জলপূর্ণ হইয়া উঠিল! পারস্য দেশের সওয়া নামক প্রায় দশ ক্রোশব্যাপী হ্রদবিশেষ হঠাৎ শুকাইয়া গেল, এবং সাওয়া নামক মরুভূমিটি এক জলপূর্ণ বিশাল হ্রদে পরিণত হইল, পারসিক অগ্নি-উপাসকদিগের অগ্নিকুণ্ড সহস্র সহস্র বৎসর ধরিয়া অবাধে জ্বলিয়া আজ হঠাৎ নিভিয়া গেল এবং পারস্যরাজ নওশেরোআনের প্রাসাদচূড়া চূর্ণ হইয়া ভূপতিত হইল। এবং পরিশেষে কাবা মন্দিরের প্রতিমাগুলির মুখ থুবড়িয়া পড়িয়া গেল!

এইরূপ বহু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনার পর মৌলুদ-খান সাহেব এক দীর্ঘ মোনাজাত (প্রার্থনা) করিয়া মৌলুদ শরীফ সাঙ্গ করিলেন। সমস্তই উর্দু ভাষাতে কথিত ও গীত হইল; অধিকাংশ লোকই তাহার এক বর্ণও বুঝিল না; কিন্তু তাহাতে পুণ্যসঞ্চয়ের কোনো বাধা হইল না।

যাহা হউক, মৌলুদশেষে যথারীতি মিষ্টান্ন বিতরণের পর সকলে উঠিয়া পড়িলেন। প্রতিবেশী সাধারণ লোকেরা ঘরে ফিরিয়া গেল। দুই-চারি জন আত্মীয় রাত্রের আহারের জন্য নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন, তাহারা রহিয়া গেলেন। সাধারণের নিমন্ত্রণ পরদিন রাত্রে।

এইরূপে বিপুল সমারোহের সহিত নূতন মসজিদের আকামত পর্ব শেষ হইল। কয়দিন ধরিয়া বাটীর প্রভু-ভৃত্য সকলেরই ক্রমাগত খাঁটিয়া প্রাণান্ত হইতে হইয়াছে। কিন্তু অন্দরমহলে যাহা কিছু খাটুনি তিনটি প্রাণীর উপর দিয়া গিয়াছে। হালিমা তো বধূ, তাহাকে খাটিতেই হইবে, কিন্তু রাবিয়া ও তাহার বোন যে খাটুনিটা খাঁটিয়াছিল, যেরূপে বাঁদীর মতো শ্রমে ও ভগ্নীর মতো যত্নে সমাগতা বিবিগণের সেবা করিতেছিল তাহাতে, সেই বিবিগণের মধ্যে যাহারা উহাদিগকে চিনিতেন না তাহারা উহাদের আভিজাত্য সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া এক দস্তরখানে বসিতে ইতস্তত করিতেছিলেন। এমন সময় মজিলপুরের এক বিবি, কয়েকজনকে একটু অন্তরালে লইয়া গিয়া রাবিয়াদের পরিচয় দিয়া কহিলেন, রাবিয়ার পিতামহ দ্বিতীয়বার যে বিবাহ করিয়াছিলেন, সে বিবি একটু নীচু ঘরের মেয়ে রাবিয়ার পিতা তাহারই গর্ভে জন্মিয়াছিলেন। এই কথা শুনিয়া শরীফাবাদের এক বিবি কহিলেন, হুঁ, সে আমি চালচলন দেখে আগেই ঠাউরেছিলাম! এবং সৈয়দ সাহেবের বড় বিবিকে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –বেয়ান সাহেব, রাবিয়ারা কি আমাদের সঙ্গে এক দস্তরখানে বসবে?

বড় বিবি কহিলেন, না, না, ওরা কেন বসবে? ওরা খাদিমী করবেখন।

শরীফাবাদের বিবি কহিলেন—না, না, সেটা ভালো দেখাবে না। ওদের আলাদা ঘরে বসালেই হবে।

শরীফাবাদের বেয়ান আবদুল মালেকের শ্বশুর হাজী সাহেবের বিবি; এবং হাজী সাহেব হইলেন এ অঞ্চলের মধ্যে একেবারে অতি আদি শরীফ ঘর; সুতরাং তাহার কথা রাখিতেই হইল।

কিন্তু হালিমা এ কথা শুনিয়া একেবারে মর্মাহত হইল। সে তাহার শাশুড়িকে গিয়া কহিল, –তবে আমিও বসব না, আম্মা; ভাবী সাহেবাদের সঙ্গে খাবখন।

শাশুড়ি বিরক্ত হইয়া কহিলেন, –বাঃ সে কী কথা! তুমি হলে মেজবউ, বড়বউ বসবে, আর তুমি বসবে না? এরা সব কী মনে করবেন?

আর ওঁরাই বা কী মনে করবেন? আজ সারাটা দিন ওঁরা খেটে হয়রান হয়েছেন, আর তাদের না নিয়ে খাওয়া কি ভালো হবে? ওঁদের মনে যে দুঃখ দেওয়া হবে তা হলে।

শাশুড়ি কহিলেন, তা দুঃখ হলে কী করব বাপু! যে যেমন, তার তেমনভাবেই চলতে হবে তো? শরীফাবাদের বিবিদের সঙ্গে বসবার যুগ্যি ওরা নয়!

এদিকে দস্তরখান পড়িয়া গিয়াছে। বাঁদীরা শাশুড়ি-বধূকে ডাকিতে আসিয়া কহিল, বিবিরা সব বসে গেছেন!

চল বউ, আর দেরি কোরো না। বলিয়া তিনি হালিমার হাত ধরিয়া লইয়া চলিলেন। দুয়ারের কাছে আসিয়া সালেহাকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া কহিলেন, রাবিয়াদের জন্যে ও-ঘরে দস্তরখান দিতে বলেছি, দিল কি না দেখে এস।

সকলে বসিয়া গিয়াছেন, বাঁদীরা সিলিপূচি (হাত ধোয়াইবার পাত্র) লইয়া একে একে হাত ধোয়াইতেছে, এমন সময় সালেহা আসিয়া মাতাকে কহিল, –তারা তো নেই! বেলার কাছে শুনলাম, এক্ষুনি তারা পাছ-দুয়ারে পালকি ডাকিয়ে চলে গিয়েছেন বলিয়া মাতার পার্শ্বে বসিয়া পড়িল।

হালিমা কাছেই ছিল, শুনিয়া তাহার মনটা বড় খারাপ হইয়া গেল। বড় বিবি মৃদুস্বরে কহিলেন, ও, গোসা করে বিবিরা চলে গিয়েছেন!

বিবিরা খাইতে বসিলেন। কেহ-বা নখে করিয়া একআধটা দানা অতি আস্তে আস্তে মুখে তুলিয়া দিতে লাগিলেন, কেহ-বা এক লোকমা মুখে দিলেন তো আর এক লোকমা কবে দিবেন তাহার ঠিকানা করা অসম্ভব হইয়া উঠিল। প্রায় এক ঘণ্টা, সকলে দস্তরখানে বসিয়া রহিলেন; কিন্তু সকলের রেকাবিতেই রাশীকৃত গোশত ও পোলাও রহিয়া গেল। শরীফ ঘরের দস্তুর অনুসারে কেহ কেহ বাটী হইতে আহার করিয়াই আসিয়াছিলেন, তাহারা কেবল সম্মান রক্ষার জন্য একবার দস্তরখানে বসিয়াছিলেন মাত্র। যাহাদিগের সত্যই পেটে ক্ষুধা ছিল, তাহারাও পার্শ্ববর্তিনীর স্থূপীকৃত রেকাবির লজ্জায় নিজের স্থূপ অধিক ক্ষয় করিতে পারিলেন না।

যাহা হউক, কোনোক্রমে আহার-পর্ব খতম হইল। বাঁদীরা সিলিচি ও বদনা লইয়া একে একে বিবিদের হাত ধোয়াইতে আরম্ভ করিল। সে হাত ধোয়ানোও এক বিষম ব্যাপার! বাঁদী বেচারিদের ঝুঁকিয়া থাকিতে থাকিতে কোমরে ব্যথা ধরিয়া যায়, তথাপি বিবি একবার এক কোষ পানি হাতে লইয়া আবার যে দ্বিতীয় কোষ এ-জীবনে লইবেন, বেচারারা এরূপ ভরসা করিতে সাহস পায় না!

হাত ধোওয়া ব্যাপার চলিতেছে, এমন সময় রাবিয়া ও মালেকাকে বারান্দার উপর উঠিতে দেখিয়া একটি অল্পবয়স্কা অদূরদর্শিনী বিবি বলিয়া উঠিলেন, –এই যে, বাঃ! এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনারা? আমরা তো খেয়ে উঠলাম!

রাবিয়া বেশ একটু পরিষ্কার গলায় কহিল, –আমাকে ভাই তাড়াতাড়ি একটু বাড়িতে যেতে হল–একটা মস্ত কাজ ভুলে এসেছিলাম–না গেলে হয়তো বড় ক্ষতি হয়ে যেত…

কী এমন কাজ ছিল যে খাবার সময় তাড়াতাড়ি কাউকে না বলে চলে গেলেন?

খানকয়েক নোট বালিশের নিচে রেখেছিলাম, তখন তাড়াতাড়ি আসার সময় তা তুলে রাখতে মনে হয় নি। হঠাৎ মনে পড়ে গেল… তা থাক, আপনাদের খাওয়া হয়ে গেছে বেশ হয়েছে, আমরা তো ঘরেরই মেয়ে-বউ, আমরা খেয়ে নেবখন।

হালিমা সাড়া পাইয়া তাড়াতাড়ি কোনোমতে হাত ধুইয়া ছুটিয়া আসিল–তাহার মনে হইতেছিল, বুঝি রাবিয়ার বড়ই অভিমান ও দুঃখ হইয়াছে। কিন্তু তাহার হাসিমুখ দেখিয়া হালিমার মনের ভার অনেকটা লঘু হইয়া গেল। রাবিয়া তাহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিল, বাঃ, বেশ তো! আমাদের ফেলে নিজেরা খেয়ে এলে। এখন চল, আমাদের খাওয়াবে বসে।

ইহারা চলিয়া গেলে বিবিদের মধ্যে একটা সমালোচনার গুঞ্জন উথিত হইল। কেহ কহিলেন, –যাক, বাঁচা গিয়েছে। আবার কেহ-বা কহিলেন, –হলে কী হয়? মেয়েটা খুব চালাক বটে! সবদিক বজায় রেখে গেল।

.

২৩.

মসজিদ আকামতের দিন দুই পরেই হালিমার জ্বর হইল। প্রথম দিন জ্বর তেমন বেশি হয় নাই, কিন্তু দ্বিতীয় দিনে জ্বরের বেগটা কিছু প্রবল দেখা গেল। তৃতীয় দিনও সেইভাবে কাটিল।

গ্রামে এক বৃদ্ধ কবিরাজ ছিলেন; সচরাচর তিনিই এ-বাটীর চিকিৎসা করিতেন। তাঁহাকে ডাকা হইল। রোগিণী মশারির ভিতর রহিল, তাহার পার্শ্বে একটা দোহারা রঙিন কাপড়ের পরদা লটকানো হইল। পরদার ভিতরে হালিমার মাতা, শাশুড়ি এবং আরো দুই এক জন স্ত্রী-পরিজন রহিলেন। কবিরাজ আসিয়া পরদার বাহিরে বসিলেন এবং রোগিণীর অবস্থা সম্বন্ধে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। আবদুল কাদের এক একটি প্রশ্ন শুনিয়া পরদার ভিতর যায় এবং একটু পরে আবার বাহিরে আসিয়া উত্তরটি কবিরাজ মহাশয়কে শুনায়। এইরূপে মোটামুটি অবস্থা জানিয়া তিনি একবার রোগিণীর হাত দেখিতে চাহিলেন। আবদুল কাদের ভিতরে গিয়া পরদার এক প্রান্ত সামান্য একটু উঁচু করিয়া ধরিল এবং কবিরাজ মহাশয়কে হাত বাড়াইয়া দিতে কহিল। কবিরাজ মহাশয় পরদার ভিতর হাত। বাড়াইয়া দিলেন; আবদুল কাদের তাহার হাতের আঙুল ধরিয়া হালিমার বাম হস্তের কবজির উপর ধরিয়া রহিল; কবিরাজ তিন আঙুলে নাড়ি টিপিয়া ধরিয়া যতটা সম্ভব উহার গতি অনুভব করিতে চেষ্টা করিলেন, এবং একটু পরে পরদার ভিতর হইতে হাত টানিয়া লইলেন।

নাড়ি পরীক্ষা হইয়া গেলে সকলে উৎসুক হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন দেখলেন, কবিরাজ মশায়?

কবিরাজ কহিলেন, –জ্বরটা প্রবল বটে; বাত-শ্লেষ্মর ক্ষেত্র বলে সন্দেহ হচ্ছে–তবে। ভয়ের কোনোই কারণ নেই, গোড়াতেই যখন চিকিৎসা আরম্ভ হচ্ছে, তখন ওটা কেটেই যাবে।

তাহার পর তিনি ঔষধ-পথ্যাদির ব্যবস্থা করিয়া একটি টাকা দর্শনী পাইয়া প্রস্থান করিলেন।

ঔষধ রীতিমতো চলিতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে সৈয়দ সাহেবের দোয়া, তাবিজ, পানি পড়া এবং মক্কাশরীফ হইতে আনীত কোরবানি-করা উটের শুকনো গোশত ঘষা প্রভৃতিও প্রয়োগ করা হইল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। আরো দুই দিন কাটিয়া গেল, কিন্তু রোগের কোনোই উপশম দেখা গেল না।

এদিকে আবদুল কাদেরের ছুটি ফুরাইয়াছে, আগামীকল্যই তাহাকে সদরে হাজির হইতে হইবে। স্ত্রীর এই অবস্থা; এক্ষণে কী করিবে, ভাবিয়া পাইল না। কবিরাজ বলিতেছেন, ভয় নাই; কিন্তু আবদুল্লাহর মনের সন্দেহ ঘুচিতেছে না। সে কহিল, –রোগটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বোধ হচ্ছে!

আবদুল কাদের কহিল, –তাই তো। এখন কী করা যায়?

আমি বলি, ডাক্তার দেখানো যাক; ও কবিরাজ-টবিরাজের কর্ম নয়।

ভালো ডাক্তার বা এখানে কই?

কেন? সদর থেকে আনা যাক।

আবদুল কাদের কহিল, –ডাক্তার দেখাতে কি অব্বিা রাজি হবেন? ডাক্তারি ওষুধের তিনি নামই শুনতে পারেন না।

তা না শুনতে পাল্লে চলবে কেন? রোগটা কঠিন তাতে সন্দেহ নেই; চল, বরং তাকে বলি গিয়ে।

কিন্তু সৈয়দ সাহেব ডাক্তারের কথা শুনিয়া প্রথমটা চটিয়াই উঠিলেন এবং কহিলেন, হ্যাঁঃ! এই রমজান শরীফে শরাবটরাব খাইয়ে এখন বউটার আখেরাতের সর্বনাশ কর আর কি! কেন, কবিরাজ মশায় তো বেশ দাওয়া দিচ্ছেন…

আবদুল্লাহ কহিল, –কিন্তু তাতে তো কোনো উপকার হচ্ছে না, জ্বর ক্রমেই বেড়ে চলেছে, তাইতে সন্দেহ হচ্ছে…

না, নাঃ! তোমরা অনর্থক সন্দেহ কচ্ছ, বাবা। আর সন্দেহ কিসের? খোদা যদি হায়াত রেখে থাকেন তো এতেই রোগ সেরে যাবে। তার উপর আমি যেসব তদ্বির কচ্ছি, এতে দেখো আল্লাহ রহম দেবে নিশ্চয়। ও-সব নাচিজ আর খাইয়ে কাজ নেই।

আবদুল্লাহ্ জেদ করিয়া কহিল, –তা হুজুর তদ্বির কচ্ছেন, ভালোই হচ্ছে। কিন্তু দোয়ার সঙ্গে দাওয়া কত্তেও তো আল্লাহতালা হুকুম করেছেন…

তা দাওয়া তো চলছেই, আবার কেন!

ও কবিরাজি দাওয়াতে বড় ফল হবে বলে বোধ হয় না; আর আজকাল ওরা সকল রোগ চিনতেই পারে না–অবিশ্যি যেটা ধত্তে পারে, ওষুধের গুণে সেটাতে উপকার দেখায় বটে…

সৈয়দ সাহেব বিরক্তির সহিত কহিলেন, –আর ডাক্তার ব্যাটারা এলেই অমনি রোগ ধরে ফেলে! তা হলে আর দুনিয়ায় কেউ মরত না।

আবদুল্লাহ কহিল, –সে কথা হচ্ছে না; ডাক্তারেরা কবিরাজদের চেয়ে অনেক বেশি। রোগী নিয়ে নাড়াচাড়া করে কিনা, তাই রোগ সম্বন্ধে এদের জ্ঞান কবিরাজদের চেয়ে বেশি। জন্মে। তা ওষুধ না হয় কবিরাজ মশায়ই দেবেন, একবার একজন ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ কল্লে বোধহয় মন্দ হত না।

সৈয়দ সাহেব যেন একটু নরম হইলেন। ভাবিয়া কহিলেন, ডাক্তার দেখে আর কী-ই বা এমন বেশি বুঝবে–একটুখানি নাড়ি টিপে দেখা ছাড়া তো আর কিছু হবে না, সে তো কবিরাজও দেখছে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, –ডাক্তারেরা নাড়ির উপর বড় বেশি নির্ভর করে না, আর আর সব লক্ষণ ধরে রোগ নির্ণয় করে।

তবে অবস্থা গিয়ে বললেই তো হয়, ডাকার দরকার কী?

কী কী অবস্থায় কোন কোন বিষয়ে সে জানতে চাইবে, তা আমরা কী করে বুঝব? ডেকে আনলে সে যা যা জিজ্ঞাসা করবে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে পারা যাবে…

কাকে ডাকবে, ঠিক করেছ?

ঠিক এখনো করি নি; আবদুল কাদের আজ শেষরাত্রেই রওয়ানা হচ্ছে, সে কাল সদর থেকে ভালো করে জেনেশুনে একজনকে নিয়ে আসবে।

কাছারি খুলবে যে কাল! কী করে আসবে ও?

ছুটি নেবে।–তা এক কাজ কল্লে হয়। নেওয়াজ ভাই সাহেবকে বরং সঙ্গে দিলে হয়। আবদুল কাদের যদি না-ই আসতে পারে, তো উনিই ডাক্তার নিয়ে আসবেনখন।

অনেক চিন্তার পর সৈয়দ সাহেব এই প্রস্তাবেই মত দিলেন; কিন্তু বারবার করিয়া সাবধান করিয়া দিলেন, যেন ডাক্তারি ঔষধ খাওয়ানো না হয়। বরং তেমন বেগতিক দেখিলে কলিকাতা হইতে হাকিম গোলাম নবী সাহেবকে আনা যাইবে।

পরদিন সদরে পৌঁছিয়াই আবদুল কাদের কোন ডাক্তারকে পাঠানো যাইবে সে সম্বন্ধে। আকবর আলী সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করিল। অবস্থা শুনিয়া আকবর আলী কহিলেন, — এখানকার নতুন অ্যাসিস্টান্ট সার্জন শুনিছি ডাক্তার ভালো…

কে? দেবনাথবাবু?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, –তার বাড়ি আপনাদের ওইদিকে…

পশ্চিম পাড়ায়–ভোলানাথবাবুর ছেলে। তা উনি গেলে তো ভালোই হয়।

তা যাবেন বৈকি, বেশি দূর তো নয়…

চলুন না একবার তার কাছে…

এখনই? কাছারির সময় হয়ে এল যে!

আচ্ছা কাছারি যাবার পথে?

তাই।

বেলা প্রায় এগারটার সময় হাসপাতালে গিয়া তাহারা ডাক্তার দেবনাথ সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলেন এবং সকল কথা তাহাকে খুলিয়া কহিলেন। ডাক্তার বাবু একটু ভাবিয়া কহিলেন, আমার হাতে দুটো কেস রয়েছে, সন্ধের সময় দেখতে যাবার কথা…

আকবর আলী কহিলেন, –অমূল্যবাবুকে বলে গেলে হবে না? অমূল্য বাবুও একজন এল-এম, এফ, স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করেন।

ডাক্তার একটু ভাবিয়া কহিলেন, –আচ্ছা দেখি, সাহেবকেও একবার বলতে হবে…

আবদুল কাদের কহিল, –কিন্তু আজই রওয়ানা হতে হবে–সন্ধের পরেই পৌঁছানো চাই–কাল সকালে অবস্থাটা দেখে দু প্রহরের মধ্যে ফিরতে পারবেন।

ডাক্তারবাবু কহিল–আচ্ছা আমি দেখি…

আকবর আলী কহিলেন, শুধু দেখি বললে হবে না ডাক্তারবাবু–আপনাকে যেতেই হবে।

আচ্ছা আমি একবার সাহেবের সঙ্গে আর অমূল্যবাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আপনার আপিসে খবর পাঠাবখন…

আবদুল কাদের কহিল–নৌকা তয়ের আছে–আমি যে নৌকোয় এসেছি, আপনি সেইটেতেই যেতে পারবেন। আর দেখি যদি আমি ছুটির যোগাড় করতে পারি, তো আমিও যাবখন সঙ্গে।

ডাক্তারবাবু আশ্বাস দিয়া উঠিয়া পড়িলেন। একদিকে সৌভাগ্যক্রমে ডাক্তার সাহেব অনুমতি দিলেন এবং অমূল্যবাবুও কেস দুটি একবার দেখিয়া আসিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন; কিন্তু অন্যদিকে দুর্ভাগ্যক্রমে আবদুল কাদের ছুটি পাইল না। ম্যাজিস্ট্রেট নূতন। সাহেব, লোকটা সুবিধার নহে।

যাহা হউক খোদা নেওয়াজ ডাক্তার লইয়া বেলা প্রায় দুইটার সময় রওয়ানা হইয়া গেল। খোদা নেওয়াজ মাল্লাদিগকে ডবল ভাড়া কবুল করিয়া জোরে বাহিবার জন্য উৎসাহিত করিতে লাগিল। তাহারাও প্রাণপণে বাহিয়া সন্ধ্যার পরেই একবালপুরের ঘাটে নৌকা ভিড়াইয়া দিল।

যথাসময়ে ডাক্তারবাবুকে রোগিণীর ঘরে লইয়া যাওয়া হইল। কবিরাজ মহাশয়কে যে উপায়ে হাত দেখানো হইয়াছিল, তাহাকেও সেই উপায়ে দেখানো হইল। তাহার পর তিনি থার্মোমিটার বাহির করিয়া আবদুল্লাহর হাতে দিলেন। আবদুল্লাহ্ টেম্পারেচার লইয়া আসিলে দেখা গেল, জ্বর ১০৪ ডিগ্রি উঠিয়াছে। নানারূপ জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া ডাক্তারবাবু জানিতে পারিলেন যে, জ্বর বৈকালের দিকেই বাড়ে এবং সকালে একটু কম থাকে। নিদ্রা, কোষ্ঠ, কোষ্ঠাশ্রিত বায়ু, শরীরের কোনো স্থানে বেদনা আছে কি না, কাশি ইত্যাদি সম্বন্ধে তিনি তন্নতন্ন করিয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন।

তাহার পর একটু ভাবিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, চেস্ট-টা একটু এজামিন করা দরকার।

আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিলেন, কী?

আবদুল্লাহ্ বুঝাইয়া দিতেই তিনি চোখমুখ উল্টাইয়া বলিয়া উঠিলেন, না, না, সে ধরগে’ তোমার কেমন করে হবে!

ডাক্তারবাবু দৃঢ়স্বরে কহিলেন, তা নইলে তো আমি কিছু বুঝতে পাচ্ছি নে। না বুঝে চিকিৎসাও তো করা যায় না।

আবদুল্লাহ্ কহিল তবে উপায়?

ডাক্তারবাবু কহিলেন, এক কাজ করুন। স্টেথসকোপটা কানে দিয়ে পরদার কাছে বসি, আপনারা কেউ ওধারটা নিয়ে যেখানে যেখানে বসাতে বলি, ঠিক সেইখানে সেইখানে চেপে ধরুন।

এখন হালিমার বুকে স্টেথসূকোপ বসাইতে যাইবে কে? সকলে এ উহার মুখের দিকে চাহিতে লাগিলেন। আবদুল মালেক আবদুল্লাহর কানে কানে জিজ্ঞাসা করিলেন, সালেহা পারবে না?

আবদুল্লাহ্ কহিল, দেখুন বলে।

আবদুল মালেক পরদার পার্শ্বে দাঁড়াইয়া সালেহাকে ইশারা করিয়া ডাকিয়া, কী করিতে হইবে, ফিসফিস করিয়া বুঝাইয়া দিলেন। ডাক্তারবাবু নলটি কানে দিয়া পরদা ঘেঁষিয়া বসিলেন, এবং প্রথমেই বুকের যেখানটায় ধুকধুক করে, সেইখানে বসাইতে বলিলেন।

কিন্তু নল কানে দিয়া মিনিট দুই বসিয়া থাকিয়াও তিনি কোনো শব্দ শুনিতে পাইলেন না; আবার কহিলেন, ভালো করে চেপে ধরুন। তবু কোনো ফল হইল না।

নাঃ, আর কাউকে বলুন বলিয়া ডাক্তারবাবু কান হইতে স্টেথকোপ নামাইয়া ফেলিলেন। ক্রমে বাড়ির স্ত্রী-পরিজন, বালক ইত্যাদি যে যেখানে ছিল, সকলকে দিয়া চেষ্টা করা হইল; কোনো ফল হইল না। যদিও-বা এক আধবার একটু শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়, তাহাও মশারির, পরদার কাপড়ের, এবং ধবৃনেওয়ালার হাতের ঘষায় সব গুলাইয়া যায়।

নাঃ, কিছু হল না বলিয়া অবশেষে ডাক্তারবাবু উঠিয়া পড়িলেন। পরে আবদুল্লাহর দিকে চাহিয়া একটু বিরক্তির স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনিও কি পারেন না?

আবদুল্লাহ্ মৃদুস্বরে ইংরেজিতে কহিল, যতক্ষণ এ-বাড়িতে আছি ততক্ষণ পারি না।

শ্‌শ্‌শ্‌–ননসেন্স বলিয়া ডাক্তারবাবু বাহিরে যাইবার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

বাহিরে আসিয়া আবদুল্লাহকে একটু আড়ালে ডাকিয়া লইয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, কেস সম্বন্ধে ডেফিনিট কিছু বুঝতে পারা গেল না, তবে ভাবে বোধ হচ্ছে, নিউমোনিয়া সেটু-ইন করেছে। আবদুল্লাহ্ একটু ভীত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, তবে উপায়?

উপায় সাবধানে চিকিৎসা! কিন্তু এখানে রাখলে তো চিকিৎসা চলবে না– বরিহাটীতে নিয়ে যেতে হবে।

আপনি একটু দয়া করে আসতে পারবেন না কি?

আমি আসতে পারি, কিন্তু রোজ তো পারব না! অথচ এ রোগীকে দুবেলা দেখা দরকার।

ওঃ! তবে তো বড় বিপদের কথা হল দেখি!

হ্যাঁ, তা এখানে রাখতে চাইলে বিপদের কথা বৈকি!

দেখি একবার বলে; কিন্তু এরা যেরকম গোঁড়া, তাতে যে ওকে সদরে নিয়ে যেতে দেবেন, এমন তো ভরসা হয় না।

কেন? আপনি জোর করে বলবেন; যদি বাঁচাতে চান, তবে কাল সকালেই নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করবেন। এর পরে কিন্তু ওঁকে রিমুভ করা আনসেফ হয়ে পড়বে।

আচ্ছা দেখি কদ্দূর কী কত্তে পারি।

তবে আমি এখন বাড়ি চলোম। কাল সকালেই একবার দেখে রওয়ানা হব। ভিজিটের টাকা লইয়া ডাক্তারবাবু চলিয়া গেলেন।

হালিমাকে সদরে লইয়া যাইবার প্রস্তাবে বৃদ্ধ সৈয়দ সাহেব তো একেবারে আকাশ হইতে পড়িলেন। বসিয়া ছিলেন–একেবারে আধ হাত উঁচু হইয়া চক্ষু কপালে তুলিয়া উঠিলেন সে কী! মান-সম্ভ্রম তোমরা আর কিছু রাখলে না দেখছি!

আবদুল্লাহ্ বেশ একটুখানি প্রতিবাদের সুরে কহিল, মান-সম্ভ্রমের কথা পরে, জান। বাঁচান আগে। ডাক্তারবাবু যেমন বললেন, তাতে এখানে রেখে চিকিৎসা চলতে পারে না, অথচ রোগ কঠিন।

সৈয়দ সাহেব বিরক্ত হইয়া কহিলেন, নাঃ, এখানে তো আর কারো কোনোদিন চিকিৎসা হয় নি, তোমরা খোদার উপর ভরসা করতে শেখ নিওটা ইংরেজি পড়ারই দোষ। খোদা যদি হায়াত রেখে থাকেন, তবে যেখানেই থাকুক না কেন, চিকিৎসা হবেই। তগদির কখনো রদ হবার নয়।

তাই বলে কি তদ্বির কত্তে খোদা মানা করেছেন?

না, তা মানা করবেন কেন? বেশ তো, তদবির কর। কবিরাজ মশায় দেখছেন, না হয় কলকাতা থেকে হাকিম সাহেবকেও আনাও। তিনি আমাদের হযরতের ঘরেও দাওয়া করে থাকেন–আর আমাদের পীর ভাই–খুব যত্ন করে দাওয়া করবেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আজকালকার হাকিমদের চিকিৎসার উপর আমার বিশ্বাস নেই। ওদের সেই চৌদ্দ পুরুষের তৈরি কতকগুলো নোকা আছে, সেইগুলো আন্দাজে চালায়, যেটা খাটে সেটাতে রোগ সারে, আর যেটা না খাটে, তাতে কিছুই হয় না। হালিমার যে অবস্থা, তাতে হাকিমের হাতে দিতে আমার ভরসা হয় না। ডাক্তারি চিকিৎসাই করাতে চাই।

তা ডাক্তারি করাতে হয়, এইখানেই করাও–ও সদরে যাওয়া হবে না। আর সেখানে। নিয়ে গেলেই বা রাখবে কোথায়? বাড়ি দেবে কে তোমাকে?

কেন আকবর আলী সাহেবদের ওখানে…

কীহ্! আকবর মুন্সীর বাড়ি? তারা কোনকালের কুটুম আমাদের যে বউমাকে সেখানে পাঠাব? দু পাতা ইংরেজি পড়ে জ্ঞান-বুদ্ধি সব ধুয়ে খেয়েছ? কী বলে তুমি ওদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে! ওরা কে, তা জান? ওদের সঙ্গে যে তোমরা বসা-ওঠা কর, সেই ঢের, তার উপর আবার অন্দর নিয়ে সেখানে যাওয়া! এ কি একটা কথা হল?

বৃদ্ধের ভাবগতিক দেখিয়া আবদুল্লাহ্ প্রমাদ গনিল। সত্যই তো সেখানে আর বাড়ি পাওয়া যাইবে না। এক আকবর আলীর আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন কোনো উপায় নাই; কিন্তু সৈয়দ সাহেব তাহার আভিজাত্যের গর্বে হালিমাকে সেখানে লইয়া যাইতে দিবেন না। আবদুল্লাহ্ দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া উঠিয়া গেল।

অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া কোনো উপায় স্থির করিতে না পারিয়া অবশেষে আবদুল্লাহ্ সেই রাত্রেই পশ্চিম পাড়ায় সরকার মহাশয়ের বাড়ির দিকে চলিল। সেখানে উপস্থিত হইয়া ডাক্তারবাবুর সহিত দেখা করিতে চাহিল। দেবনাথ তখন আহারে বসিয়াছিলেন। সংবাদ পাইয়া তাড়াতাড়ি আহার সারিয়া বাহিরে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, খবর কী? এত রাত্রে যে!

আবদুল্লাহ্ দুঃখিত চিত্তে কহিল, খবর বড় ভালো নয় ডাক্তারবাবু। হালিমাকে তো বরিহাটীতে নিয়ে যেতে পাচ্ছি নে।

কেন, কর্তার বুঝি অমত?

অমত বলে অমত! শুনে একেবারে চটেই উঠেছেন। সেখানে এক আমাদের মুন্সী সাহেবের বাড়ি ছাড়া আর উঠবার জায়গা নেই, কিন্তু সেখানে তিনি কিছুতেই নিয়ে যেতে দেবেন না।

কেন?

তারা নাকি ছোটলোক!

ওঃ! তবে একটা বাড়ি ভাড়া নেবেনখন।

বাড়ি কোথায় পাব? মুসলমানকে কেউ বাড়ি দেয় না।

বাঃ! কেন দেবে না? চেষ্টা কল্লে নিশ্চয়ই পাবেন। ভাড়া পাবে–বাড়ি দেবে না কেন?

চেষ্টা এর আগে ঢের করে দেখা গেছে। কোনোমতেই পাওয়া গেল না। আবদুল কাদের তো আজ ক বছর মুন্সী সাহেবদের বাড়িতেই কাটিয়ে দিলে।

দেবনাথ একটু চিন্তা করিয়া কহিলেন, আচ্ছা, আমার কোয়ার্টার ছেড়ে দিই যদি তা হলে আসতে পারবেন?

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিল, আপনার কোয়ার্টার ছেড়ে দেবেন? আর আপনি?

আমার ফ্যামিলি তো এখন ওখানে নাই; স্বচ্ছন্দে ছেড়ে দিতে পারব। আমি হয়। বাইরের কামরাটায় থাকবখন, না হয় হসপিটাল এসিস্টেন্টের ওখানে…

সত্যিই বলছেন ডাক্তারবাবু?

বাঃ! সত্যি বলছি নে তো কি আর মিথ্যে বলছি? আমার ওসব প্রেজুডিস নেই।

আবদুল্লাহ্ আবেগভরে দেবনাথের হাত ধরিয়া কহিল, ডাক্তারবাবু, কী বলে আপনাকে ধন্যবাদ দেব তা আমি ভেবে পাচ্ছি নে। বাস্তবিক আমি…

থাক, থাক। আপনি এখন যান; গিয়ে সব বন্দোবস্ত ঠিক করে ফেলুন; কাল সকালেই রওয়ানা হতে হবে। দেরি হয়ে গেলে রোগীর অবস্থা সঙ্কট হয়ে দাঁড়াবে।

.

৪.

ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টারটি পাওয়া গিয়াছে শুনিয়াও সৈয়দ সাহেব প্রথমটা রাজি হন নাই। কিন্তু আবদুল্লাহ্ একেবারে নাছোড়বান্দা হইয়া জেদ করিয়া হালিমাকে পরদিন বেলা দেড় প্রহরের মধ্যেই নৌকায় তুলিয়া ফেলিল। কেবল সে হালিমাকে লইয়াই ছাড়িল, এমন নহে। প্রবল বাধা ও গুরুতর আপত্তি খণ্ডন করিয়া সে সালেহাকেও লইয়া চলিল। নহিলে রোগীর শুশ্রূষা করিবে কে? আবদুল্লাহর মাতাও সঙ্গে গেলেন।

মাঝিরা নৌকা খুব টানিয়া বাহিয়া লইয়া চলিল! আসরের পূর্বেই তাহারা বরিহাটীর ঘাটে পৌঁছিলেন। নদীর তীরেই ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার। হালিমাকে সাবধানে পালকিতে করিয়া বাসায় উঠানো হইল। ডাক্তারবাবু বলিয়া পাঠাইলেন রোগীকে এখন একটু বিশ্রাম করিতে দেওয়া হউক; যদি একটু নিদ্রা হয় ভালোই, যদি না হয়, সন্ধ্যার পরই তিনি একবার ভালো করিয়া পরীক্ষা করিবেন।

আবদুল কাদেরের নিকট সংবাদ দেওয়া হইল; সে তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া আসিল; এবং আবদুল্লাহ্ কেমন করিয়া এমন অসাধ্য সাধন করিল তাহা ভাবিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। সে হাসপাতালে গিয়া ডাক্তারবাবুকেও অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাইয়া আসিল।

ডাক্তারবাবুর ঝি দ্বিপ্রহরে বাড়ি চলিয়া গিয়াছিল; সন্ধ্যার পূর্বেই সে আসিল। পরিবার নাই; ডাক্তারবাবু ছোট ডাক্তারবাবুর বাড়িতে খান। কাজেই ঝট-পাট দেওয়া ছাড়া তাহার আজকাল বড় একটা কাজ নাই। সে ধীরেসুস্থে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করিয়া লোকজন দেখিয়া মনে করিল, বুঝি গিন্নি মা-রা আসিয়াছেন। তাই সে একগাল হাসিয়া ঘরে উঠিয়া গেল; কিন্তু ঘরের ভিতর সব অপরিচিত মুখ দেখিয়া অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আপনারা কারা গো?

আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

না, তাই জিজ্ঞেস কচ্ছি, আপনাদের নতুন দেখনু কিনা…

এমন সময় হালিমা ক্ষীণস্বরে কহিল, ভাইজান, একটু পানি!

ঝি দুয়ারের বাহিরে কপাট ধরিয়া দাঁড়াইয়াছিল। হালিমার কথা শুনিয়া সে তাড়াতাড়ি। কপাট ছাড়িয়া দিয়া পায়ের আঙুলের উপর ভর করিয়া বলিয়া উঠিল, –মা গো! এরা যে মোচম্মান! ডাক্তারবাবু কেমন নোক গো! মোচম্মান ঘরে এনেচে! আমি এই চনু, আর এস্বনি, এদের বাড়ি আর কাজ করবনি! মা গো! কী হবে গো–এই সন্ধেবেলা নাইতে হবে গিয়ে…।

এরূপ বকিতে বকিতে এবং ডিঙ্গী মারিয়া পা ফেলিতে ফেলিতে সে উঠান পার হইয়া চলিয়া গেল।

ঠিক সন্ধ্যার সময় বাবু আসিলেন।

আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি ইফতার করিয়া বাহিরে গেল এবং আবদুল কাদের খাটের উপর একটা মশারি লটকাইয়া তাহার উপর দুই পার্শ্বে দুইটি মোটা চাদর ফেলিয়া পরদা করিয়া দিল। একখানি চেয়ার আনিয়া বিছানার পার্শ্বে রাখিল। আবদুল্লাহ্ ডাক্তারবাবুকে লইয়া ভিতরে আসিল।

আবার পরদার হাঙ্গামা দেখিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, এর ভেতর থেকে তো স্টেথসকোপ ইউস্ করা যাবে না!

আবদুল কাদের উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন?

ডাক্তারবাবু একটু হাসিয়া কহিলেন, হার্ট আর লাংস-এর শব্দ অত্যন্ত মৃদু, খুব সাবধানে শুনতে হয়। এত কাপড়ের ভেতর থেকে স্টেথসকোপের নল চালিয়ে দিলে কেবল কাপড়ের ঘষার শব্দই শুনতে পাওয়া যাবে–লাংসের অবস্থা কিছুই বোঝা যাবে না। বাড়িতেও তো ওই রকম করা হয়েছিল, জিজ্ঞেস করুন আপনাদের দুলামিয়াকে।

আবদুল কাদের চিন্তিত হইয়া কহিল, তবে উপায়!

ডাক্তারবাবু কহিলেন, ওসব মশারি-টশারি তুলে ফেলুন, রোগীকে ভালো করে দেখতে দিন। না দেখে কি আন্দাজে চিকিৎসা চলে? আপনারা এজুকেটেড হয়েও যে এসব ওল্ড ফগিইজম ছাড়তে পারেন না, এ বড় আশ্চর্য!

আবদুল্লাহ্ কহিল, কি জানেন, ডাক্তারবাবু–পরদার মারামারিটা আমাদের ভেতর এত বেশি যে, এর একটু এদিক ওদিক হলেই মনে হয় বুঝি এক্ষণি আকাশ ভেঙ্গে মাথায় বাজ পড়বে! কিন্তু দরকারমতো পরদার একটু-আধটু ব্যতিক্রম কল্লে যে সত্যি সত্যিই বাজ পড়ে, সংসার যেমন চলছে তেমনিই চলতে থাকে, এটুকু পরীক্ষা করে দেখবার সাহস কারুর নেই!

ডাক্তারবাবু কহিলেন, তবে কি আমাকে আন্দাজেই চিকিৎসা কত্তে হবে?

আবদুল্লাহ্ কহিল, না, তা কল্লে চলবে কেন? এক কাজ করা যাক; রোগীর গায়ে আগাগোড়া একটা মোটা চাদর দিয়ে দিই, আপনি কাপড়ের উপর উপর থেকে স্টেথকোপ লাগিয়ে দেখুন। আবদুল কাদের কী বল?

আবদুল কাদের আমতা আমতা করিতে লাগিল। আবদুল্লাহ আবার দৃঢ়স্বরে কহিল, নেও, ওসব গোঁড়ামি রেখে দাও। ডাক্তারবাবু, আপনি মেহেরবানি করে একটু বাইরে দাঁড়ান, আমি সব বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।

ডাক্তারবাবু বাহিরে চলিয়া গেলেন। আবদুল্লাহর মাতা অনেক আপত্তি করিলেন। আবদুল কাদেরও লোকে শুনলে কী বলবে, আব্বা ভয়ানক চটে যাবেন, ইত্যাদি অনেক ওজর করিতে লাগিল, কিন্তু আবদুল্লাহ্ কাহারো কথায় কান দিল না। অবশেষে হালিমাও ক্ষীণ স্বরে আপত্তি জানাইল, কহিল, ভাইজান, কাজটা কি ভালো হবে? সকলেই নারাজ…

আবদুল্লাহ্ কহিল, নে, নে, তুই থাম; আমি যা কচ্ছি তা তোর ভালোর জন্যেই কচ্ছি…।

উনি যে অমত কচ্ছেন ভাইজান!

হ্যাঁঃ, ওর আবার মতামত! ওকে আমি ঠিক করে নেব, তুই ভাবিস নে। থাক পড়ে এই চাদর মুড়ি দিয়ে, নড়ি চড়ি নে। আম্মা, আপনি ও-ঘরে যান। আবদুল কাদের, ডাক ডাক্তারবাবুকে।

আবদুল্লাহ্ এরূপ দৃঢ়তার সহিত কথা বলিয়া এবং কাজ করিয়া গেল যে, কেউ আর বাধা দিবার সুযোগ পাইলেন না। কর বাবা যা ভালো বোঝ! এখন বিপদের সময়–খোদা। মা কবৃনেওয়ালা।

ডাক্তারবাবু আসিয়া যথারীতি পরীক্ষাদি করিয়া কহিলেন, একবার চোখ-মুখের ভাবটা দেখতে পাল্লে ভালো হত।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আর কাজ নেই ডাক্তারবাবু; আজ এই পর্যন্ত থাক। এরপর যদি দরকার হয়, না হয় দেখবেন। লাংসের অবস্থা কেমন দেখলেন?

চলুন, বলছি বলিয়া ডাক্তারবাবু বাহিরে আসিলেন। আবদুল কাদের ও আবদুল্লাহ্ পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিল। ডাক্তারবাবু কহিলেন, নিউমোনিয়া!

আবদুল্লাহ্ শঙ্কিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, একধারে, না দুইধারেই?

ডান দিকটায় তো খুব স্পষ্ট, বাঁ-দিকটাতেও একটু কনজেশ্চান্ বোধ হচ্ছে।

তা হলে তো ভয়ের কথা!

হ্যাঁ একটু ভয়ের কথা বৈকি! তবে শুশ্রূষা ভালো রকম চাই। ওষুধ তো চলবেই; সঙ্গে সঙ্গে বুকে পিঠে অনবরত পুলটিস দিতে হবে। ঠিক যেমন যেমন বলে দেব, তার যেন একটুও ব্যতিক্রম না হয়। নার্সিঙের উপরেই সমস্ত নির্ভর কচ্ছে। আর একটা কথা ইনজেকশন ট্রিটমেন্ট কত্তে পাল্লে ভালো হয়—

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, সে কী রকম?

এক রকম সিরাম বেরিয়েছে, সেটা চামড়া ফুঁড়ে পিচকারি করে দিতে হয়। রোগের প্রথম অবস্থায় দিতে পাল্লে খুবই ফল পাওয়া যায়। এখনো সময় আছে, –কিন্তু সিরাম। কলকেতা থেকে আনাতে হবে। চিঠি লিখে সুবিধে হবে না; কি তার করেও সুবিধে হবে না–কার দোকানে পাওয়া যায় না-যায়, অনর্থক দেরি হয়ে যেতে পারে। কাউকে যেতে হবে–আজ রাত্রের গাড়িতেই…

আবদুল্লাহ কহিল, তা বেশ, আমিই না হয় যাচ্ছি–এখনো ট্রেনের সময় আছে।

তাই যান। আমি লিখে দিচ্ছি–স্মিথ কি বাথগেট কি আর কোনো সাহেব-বাড়ি থেকে নেবেন–ফ্রেশ পাওয়া যাবে। আর নিতান্তই ওদের ওইখানে না পান, তো অগত্যা বটকৃষ্ণ পালের ওখানে দেখবেন। কালকের গাড়িতেই ফেরা চাই কিন্তু পরশু সকালেই ইনজেকশন দিতে হবে।

ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশন লিখিয়া এবং শুশ্রষার বিষয়ে ভালো রূপ উপদেশাদি দিয়া সব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জনের বাসায় চলিয়া গেলেন। আবদুল কাদের কহিল, দেখ ভাই, তুমি থাক, আমিই কলকেতায় যাই…।

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্য হইয়া কহিল, কেন?

তুমি না থাকলে আমার দ্বারা ওসব হাঙ্গামা হয়ে উঠবে না ভাই–বড় ভয় হয়, কী কত্তে কী করে বসব–আমি ওসব বড় একটা বুঝি-সুঝি নে…।

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, তুমি যাবে কী করে? ছুটি যদি না পাও?

কাল যে রবিবার!

ওহ হো? তাও তো বটে। আচ্ছা, তুমিই যাও, আমি থাকছি।

পরদিন প্রাতে কলিকাতায় পৌঁছিয়া আবদুল কাদের বরাবর তাহার পিতার পীর সাহেবের বাড়িতে গিয়া উঠিল, এবং সাক্ষাতে যথারীতি তাঁহার কদমবুসি করিয়া হালিমার অবস্থা এবং তাহার আগমনের কারণ সমস্ত আরও করিল। শুনিয়া তিনি কহিলেন, –আচ্ছা, বাবা, দাওয়া করো আওর দোআ-ভি করো! মায় সুফী কো তোহারে সাথ ভেজ দেতা, যো যো তদ্বির মায় বাতা দেউঙ্গা উওহ্ ঠিক ঠিক করে গা—এন্‌শা আল্লাহ্ আওর কোই খাওফ নেহি রহে গা।

পীর সাহেব যাহাকে সুফী বলিয়া নির্দেশ করিলেন তিনি তাহার একজন প্রধান মুরীদ। তাহার প্রকৃত নাম সফিউল্লাহ্; কিন্তু ধার্মিক লোক বলিয়া সকলে তাহাকে সুফী সাহেব বলিয়া ডাকিত। পোশাক তিনি ঠিক সুফী ধরনেরই পরিতেন; কখনো রঙিন লুঙ্গি, কখনো ঢিলা পায়জামা, তাহার উপর আগুলফ লম্বিত ঢিলা কোর্তা, এবং সর্বোপরি ঘন-ঘুণ্টি দেওয়া দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো গোল পকেটওয়ালা বেগুনি মখমলের সদৃরিয়া আঁটা, মাথায় কলপ দেওয়া রেশমি সুতার কাজ-করা সাদা টুপি, পায়ে দিল্লিওয়ালা নাগরা–দেখিলে লোকে তাহাকে পরম সুফী বলিয়া ভক্তি না করিয়া থাকিতে পারিত না। লেখাপড়া বড় কিছু শেখেন নাই; তবে মছলেকায় কোরান মজিদের পারা দশেক মুখস্থ করিয়া নিম-হাফেজ হইয়াছিলেন। দেশে তাহার বড় কিছু নাই–এইখানেই পড়িয়া থাকেন আর হযরতের হুকুম তামিল করেন। কলিকাতাতেই জনৈক পীর-ভাইয়ের এক বিধবা আত্মীয়াকে পীর সাহেবের হুকুমেই বিবাহ করিয়াছেন। সংসারের কোনো চিন্তা-ভাবনা নাই, নিশ্চিন্ত মনে এবাদত বন্দেগি করেন আর পীর সাহেবের মজলিসে বসিয়া অবসর কাল কাটাইয়া দেন।

আবদুল কাদের ঔষধ ক্রয় করিতে যাইবার জন্য বাহির হইবে মনে করিতেছে এমন সময় তাহার খালাতো ভাই মজিলপুরের ফজলুর রহমান আসিয়া উপস্থিত হইল। সে আবদুল কাদেরকে দেখিয়া কহিল, বাঃ, ভাই সাহেব যে! কখন এলেন? বলিয়া কদমবুসি করিল।

আবদুল কাদের কহিল, এই সকালে। তুমি এখানে কদ্দিন?

বলছি, থামুন বলিয়া ফজলুর রহমান আবদুল কাদেরকে পার্শ্ববর্তী কামরায় লইয়া গেল। সেখানে তক্তপোশের উপর বসিয়া ফজলু কহিতে লাগিল, আমি এবার ডেপুটিশিপের জন্য ক্যান্ডিডেট হয়েছি। বি-এটা পাস করতে পাল্লে কোনো কথাই ছিল না–তবে হযরত আশা দিচ্ছেন, বলছেন, চেষ্টা কর, খোদার মরজিতে হয়ে যাবে। তা উনি যখন এতটা বলছেন তখন আমার তো খুবই ভরসা হয়–কী বলেন ভাই সাহেব?

আবদুল কাদের কহিল, সে তো বটেই–ওঁর দোয়ার বরকতে কী না হতে পারে!

হ্যাঁ–ভাই, একবার চেষ্টা করে দেখছি–অনেক সাহেব-সুবার সঙ্গে দেখাও করেছি। সেদিন আমাদের কমিশনার ল্যাংলি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তিনি খুব খাতির-টাতির করলেন–উঠে দাঁড়িয়ে শেকহ্যান্ড করে বসলেন–উঠে দাঁড়িয়ে, বুঝলেন ভাই সাহেব?

তা হলে বোধহয় তোমার চান্স আছে। ম্যাজিস্ট্রেট নমিনেশন দিয়েছে?

কমিশনার সাহেব বললেন, আমার কেসে সেসব লাগবে টাগবে না–একেবারে গভর্নমেন্ট থেকে হয়ে যাবে বোধহয়। তিনি আমাকে চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে বললেন…

করেছ দেখা?

না–করব এই দুই-এক দিনের মধ্যে। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে এই পরশু কলকেতায় এসেছি। হযরত যেদিন যেতে বলবেন সেইদিন যাব। উনি যখন দোয়া কচ্ছেন, তখন হয়ে যাবে নিশ্চয়–কী বলেন ভাই সাহেব?

খুব সম্ভব হয়ে যাবে…

সম্ভব কেন! হবেই নিশ্চয়–আমার খুব বিশ্বাস।

বেশ তো, হয় যদি, সে খুব সুখের বিষয় হবে।

ফজলুর রহমান জিজ্ঞাসা করিল, তা আপনি এখন কী মনে করে?

তোমার ভাবীর বড্ড অসুখ…

কী–কী অসুখ?

নিউমোনিয়া…

বাপ্ রে! নিউমোনিয়া! কে দেখছে?

ডাক্তার দেবনাথ সরকার–বরিহাটীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন। বেশ ভালো ডাক্তার আমাদের ওদিকেই বাড়ি–তিনি এই ওষুধ লিখে দিয়েছেন, আজই কিনে নিয়ে রাত্রের গাড়িতে ফিরতে হবে। আবদুল কাদের প্রেসক্রিপশন বাহির করিয়া দেখাইল।

ওঃ–নিউমোনিটিক সিরাম। হ্যাঁ, আজকাল সিরাম ট্রিটমেন্টই হচ্ছে। তা কোত্থেকে নেবেন?

কোনো সাহেব-বাড়ি থেকে নিতে হবে।

চলুন তবে বাথগেটের ওখান থেকে কিনে দেবখন।

তা হলে তো ভালোই হয়, আমি ওসব সাহেব-টাহেবদের দোকানে কখনো যাই। নি, –তুমি সঙ্গে গেলে ভালোই হয়।

আচ্ছা যাবখন খেয়েদেয়ে দুপুরবেলা।

দ্বিপ্রহরের আহারাদির পর দুই জনে ট্রামে চড়িয়া বাথগেটের দোকানে গেল। সেখান হইতে ঔষধ কিনিয়া চাঁদনী হইতে আরো কিছু জিনিসপত্র সগ্রহ করিয়া বাসায় ফিরিবার জন্য তাহারা ট্রামে চড়িল। ট্রাম চলিতে লাগিল; কিন্তু কন্ডাক্টর টিকিট নিতে আসিল না। ক্রমে যখন ট্রাম তাহাদের নামিবার স্থানের নিকটবর্তী হইয়া আসিল, তখন সে আসিল। আবদুল কাদের পয়সা বাহির করিতেছিল, কিন্তু ফজলুর রহমান তাড়াতাড়ি দুয়ানি বাহির করিয়া কহিল, –থাক থাক, আমিই দিচ্ছি– বলিয়া দুয়ানিটা কন্ডাকটরের হাতে দিয়া একটু ইশারা করিল। কন্ডাক্টর চলিয়া গেল।

আবদুল কাদের কহিল, ও কী! টিকিট না দিয়েই চলে গেল যে?

যাকটিকিট নিতে গেলে আরো চারটে পয়সা দিতে হত–ছ পয়সা করে কিনা। ও দু আনা ওরই লাভ–আমাদেরও কম লাগল।

সেটা কি ভালো হল? ঠকানো হল যে!

ওঃ! আপনি পাড়াগায় থাকেন কিনা! এমন ঠকানো তো সব্বাই ঠকাচ্ছে… বলিতে। বলিতে উভয়ে ট্রাম হইতে নামিয়া বাসার দিকে চলিল।

সন্ধ্যার পর খানা খাইবার সময় পীর সাহেব সুফী সাহেবকে হালিমার রোগের জন্য যে যে তদ্বির করিতে হইবে তাহা বুঝাইয়া দিলেন। রাত্রি নয়টার সময় আবদুল কাদের তাহাকে লইয়া একখানি গাড়ি করিয়া স্টেশনের দিকে রওয়ানা হইল। ফজলুর রহমানও তাহাদিগকে গাড়িতে তুলিয়া দিবার জন্য সঙ্গে আসিল। গাড়ির ছাদে একটা বড় গোছের ট্রাংক, প্রকাণ্ড একটা বিছানার মোট, এবং কতকগুলি পোটলা-পুঁটলি দেখিয়া কুলিরা আসিয়া ঘিরিয়া দাঁড়াইল। সকলে গাড়ি হইতে নামিলে একটা কুলি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কৌ কিলাস কে টিকিট মুন্সীজী?

ফজলুর রহমান কহিল, ইন্টার।

কুলি জিজ্ঞাসা করিল, টিকিট হায়, না করূনা হোগা? করুনা হোয় তো জলদি কিজিয়ে, পয়লা ঘণ্টা হো গিয়া।

আচ্ছা, আচ্ছা, হাম জানতা হায়। বলিয়া ফজলুর রহমান গাড়োয়ানকে জিনিসপত্র নামাইতে কহিল। কুলি নিম্নস্বরে কহিল, কেয়া বখশিশ মিলেগা কহিয়ে, বিনা ওজনকে চড়া দেগা।

আবদুল কাদের কহিল, আরে নেই, নেই, হামলোগ ওজন করা লেগা।

ফজলুর রহমান কহিল, আপনি আসুন না ভাই সাহেব, আমি দিচ্ছি সব ঠিক করে। এই কুলি, কেন্যা লেগা বোলো।

কুলি কহিল, –একঠো রুপিয়া মিল যায়, নবাব সাব!

আরে নেই নেই, আট আনা দেগা, চড়া দেও।

নেই সাব–-আপ লোক আমীর আমী, একঠো রুপিয়া দে দিজিয়েগা।

তব্‌ নেহি হোগা, যাও…।

কুলি যাইতে যাইতে কহিল, যাইয়ে ওজন করাইয়ে, দো তিন রুপিয়া লাগ্‌ জায়েগা।

আবদুল কাদের কহিল, তা লাগে লাগুক, ওসব ঠকামি দিয়ে কাজ নেই।

ফজলুর রহমান একটু অগ্রসর হইয়া কহিল, –এই কুলি, আরে চল কুছ কম লেও…

বারে আনা দিজিয়েগা?

আচ্ছা চল।

নেই, ঠিক ঠিক কহ্ দিজিয়ে–বারে আনা পয়সা লেঙ্গে, ইস্ সে কমতি নেহি হোগা!

আচ্ছা আচ্ছা, দেঙ্গে চল! জারা ঠারো, হাম্‌ টিকিট লে আতে হেঁ।

আবদুল কাদেরের রিটার্ন টিকিট ছিল, কেবল সুফী সাহেবেরই জন্য টিকিট কিনিতে হইবে। ফজলুর রহমান ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। তাহার পর প্রায় পনের মিনিট হইয়া গেল, তবু সে ফিরিতেছে না দেখিয়া আবদুল কাদের উদ্বিগ্ন হইয়া তাহাকে খুঁজিতে গেল! কিন্তু টিকিটঘরে তাহাকে কোথাও দেখিতে পাইল না। এদিক-ওদিক খুঁজিয়া না পাইয়া ব্যস্ত হইয়া ফিরিয়া আসিতেছে, এমন সময় ফজলুর রহমান অন্য একদিক হইতে আসিয়া পড়িল। আবদুল কাদের কহিল, এত দেরি হল? আমি আরো তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।

ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? গাড়ির এখনো ঢের সময় আছে। চলুন।

সুফী সাহেব খাক-থু করিয়া থুতু ফেলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, টিকিট হো গিয়া, ফজলু মিয়া?

হ্যাঁ, চলিয়ে, দেতে হেঁ বলিয়া ফজলু সকলকে লইয়া গাড়িতে গিয়া উঠিল। গেটের ভিতর দিয়া আসিবার সময় আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কুলিরা কোথায় গেল? ফজলর রহমান হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, চুপ, আসুন, তারা আচে।

ইন্টার ক্লাস কামরার ধারে তাঁহারা দাঁড়াইয়া আছেন, এমন সময় কুলিরা অন্যপথে প্ল্যাটফর্মে ঢুকিয়া তাহাদের সম্মুখে আসিল। জিনিসপত্র তুলিয়া কুলি বিদায় করিয়া ফজলু নিম্নস্বরে কহিল, দেখুন, একটা লোকের কাছে একখানা রিটার্ন হাফ পাওয়া গেল। আজ শেষ তারিখ। তার যাওয়া হল না। আট গণ্ডা পয়সায় দিয়ে ফেলে। বেচারার সবটাই মারা যাচ্ছিল, আমাদেরও প্রায় ডেট্টাকা বেঁচে গেল।

সুফী সাহেব একবার খাক–থু করিয়া একগাল হাসিয়া কহিলেন, ও ফজলু মিয়া, আপ তো বড়া চালাক হায়। আপনে আজ বহুত পয়সা বাঁচা দিয়া।

ঘণ্টা পড়িল। তাড়াতাড়ি দুই জনে গাড়িতে চড়িয়া বসিলেন। ফজলুর রহমান বিদায় লইয়া গেল। গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

.

২৫.

বরিহাটীতে ফিরিয়া আসিয়া আবদুল কাদের দেখিল তাহার পিতা আসিয়াছেন। দেখিয়াই তো তাহার চক্ষুস্থির! এক্ষণে হালিমার চিকিৎসার কী উপায় হইবে, তাহাই ভাবিতে গিয়া পিতার কদমবুসি করিতে সে যেটুকু বিলম্ব করিয়া ফেলিল, তাহা নিতান্তই দর্শনটুকু হইয়া উঠিল।

পিতা যথাসম্ভব ক্রোধ চাপিয়া কহিলেন, তোমরা বাকি কিছু রাখলে না, দেখছি!

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কেন, আব্বা?

ডাক্তারকে নাকি দেখানো হয়েছে?

হ্যাঁ, তা চাদর মুড়ি দিয়ে তো ছিল!

থাকলই-বা! কোন্ শরীফের ঘরের বউ-ঝিকে এমন করে ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষে করাতে দেখেছ? আর কি মুখ দেখাবার যো রইল? আবার শুনছি গা ছুঁড়ে দাওয়াই দেওয়া হবে–ওই ডাক্তারের সামনে বউ-মা গা আলগা করে দেবেন?

হাতের উপরটা একটুখানি আগা করে…

তা হলে বে-আবরু হল না? তোমরা কি জ্ঞান-বুদ্ধি একেবারে ধুয়ে খেয়েছ? আমি যদ্দিন আছি, বাবা, তদ্দিন এসব বে-চাল দেখতে পারব না। যা হবার তা হয়ে গেছে– ওসব ডাক্তারি-ফাক্তারির কাজ নেই, বাড়ি নিয়ে চল, আমি হাকিম সাহেবকে আনাচ্ছি– হযরতের কাছ থেকেও দোয়া-তাবিজ আনিয়ে দিচ্ছি, খোদা চাহে তো তাতেই আরাম হয়ে যাবে।

তার কাছে গিয়াছিলাম…

গিয়েছিলে? তবু ভালো! তা তিনি কী বললেন?

সুফী সাহেবকে পাঠিয়ে দিয়েছেন…

সুফী সাহেবকে?–কই, কোথায় তিনি?

বাইরের ঘরে আছেন।

সৈয়দ সাহেব তাড়াতাড়ি সুফী সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে চলিলেন।

আবদুল্লাহ কহিল, এখন উপায়?

তাই তো, কী করি!

চল ডাক্তারবাবুর কাছে যাওয়া যাক, দেখি তিনি কী বলেন।

ব্যাপার শুনিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, কেসের এখনো প্রথম অবস্থা, কোনো খারাপ টার্ন নেয় নি। তবে ভবিষ্যতের জন্যে সাবধান হওয়া দরকার। কেবল ওষুধেও ফল যে না হয়। এমন কথা নয়–ওষুধ আর শুশ্রূষা। কিন্তু ইনজেকশন কয়েকটা দিতে পাল্লে অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত।

তাহার পর একটু ভাবিয়া তিনি আবার কহিলেন, এক কাজ কল্লে হয়। আপনারা কেউ দিতে সাহস করবেন?

আবদুল্লাহ্ কহিল, কী, ইনজেকশন?

আবদুল কাদের তাড়াতাড়ি কহিলেন, না, না, তার কাজ নেই…

ডাক্তারবাবু কহিলেন, কেন, ভয় কী? ইনজেকশন দেওয়া অতি সহজ। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

আবদুল্লাহ কহিল, আমাদের হাতে আবার কোনো বেকায়দা না হয়ে পড়ে…

না, না, কিছু হবে না। আপনি বরং আমার হাতেই দিয়ে একবার প্র্যাকটিস করে নেন!

এই বলিয়া ডাক্তারবাবু যন্ত্রপাতি বাহির করিলেন এবং সেগুলি যথারীতি পরিষ্কার করিয়া আবদুল্লাহকে কহিলেন, আসুন, আপনার হাতে একবার ছুঁড়ে দেখিয়ে দি।

আবদুল্লাহর বাহুমূলে হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জের সুচটি ফুটাইয়া দিয়া ডাক্তারবাবু প্রক্রিয়াগুলি বেশ করিয়া বুঝাইয়া দিলেন। তাহার পর সেটি বাহির করিয়া আবার পরিষ্কার করিলেন, এবং নিজের বাহুমূল বাহির করিয়া দিয়া কহিলেন, –এখন দিন দেখি আমাকে একটা ইনজেকশন।

আবদুল্লাহ্ নির্দেশমতো সাবধানে ডাক্তারবাবুর বাহুমূলে রীতিমতো টিংচার-আইওডিন মালিশ করিয়া সুচটি প্রবেশ করাইয়া দিল। তাহার পর যেই নলদণ্ডটি টিপিতে যাইবে, অমনি ডাক্তারবাবু বাধা দিয়া কহিলেন, থাক থাক, ওটা আর এখন টিপে অনর্থক খানিকটা বাতাস ঢুকিয়ে দেবেন না।

আবদুল্লাহ নিরস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ঠিক হয়েছে তো?

ডাক্তারবাবু হাসিয়া কহিলেন, হ্যাঁ, ঠিক হয়েছে, ওতেই চলবে। তবে আমার হাতে হলে ব্যথাটা কম লাগত।

যাহা হউক, ডাক্তারবাবুর প্রদর্শিত প্রণালীতে যথারীতি সতর্কতা অবলম্বন করিয়া আবদুল্লাহ্ হালিমার বাহুমূলে ইনজেকশন করিয়া দিল।

ঔষধাদি রীতিমতো চলিতে লাগিল। এদিকে সৈয়দ সাহেব এবং সুফী সাহেব উভয়ে পীরসাহেবের আদেশমতো তদবির করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। হালিমার গলায় এবং বাহুতে তাবিজ বাধিয়া দেওয়া হইল, এবং দুই বেলা পীর সাহেবের দোয়া লেখা কাগজ ধুইয়া ধুইয়া খাওয়ানো হইতে লাগিল।

কিন্তু রোগীর শুশ্রূষা যেরূপ হওয়া উচিত সেরূপ হওয়া অসম্ভব হইয়া পড়িল। আবদুল্লাহর মাতা একে রুগ্ণা, বৃদ্ধা; এই রমজানের সময় তিনি আর কতই-বা খাটিতে পারেন! রান্নার কাজ প্রায় সব তাহাকেই করিতে হয়, নইলে রোগীর পথ্য পর্যন্ত প্রস্তুত হয় না। পুলটিস দেওয়া যেরূপ বৃহৎ ব্যাপার তাহাতেই দুই জন লোককে ক্রমাগত নিযুক্ত থাকিতে হয়; কিন্তু লোকাভাবে তাহা রীতিমতো দেওয়া ঘটে না; আবদুল্লাহ একটু বাহিরে গেলে ঔষধ খাওয়াইবারও সময় বহিয়া যায়। আবদুল কাদেরের কাজ অনেক, বেলা দশটা। হইতে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তাহাকে আপিসে থাকিতে হয়। সালেহার তো জায়নামাজ আর তসবি আছেই; তাহার ওপর সন্ধ্যার পর তারাবির নামাযে খাড়া হইলে আর তাহাকে পাওয়া। যায় না; সুতরাং পরিচর্যা চলিতে পারে না। বাঁদীগুলা তো কেবল চিৎকার করা ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানেই না!

ভাবিয়া চিন্তিয়া আবদুল্লাহ আবদুল খালেকের নিকট পত্র লিখিল।

এদিকে রোগীর অবস্থার আর বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা যাইতেছে না– কোনোদিন জ্বরের বৃদ্ধি, কোনোদিন কাশির বৃদ্ধি–কিন্তু ডাক্তারবাবু বলিতেছেন, ভয়ের এখনো কোনো কারণ নাই। তবু আর একবার ফুসফুঁসের অবস্থাটা দেখিতে পারিলে ডাক্তারবাবু নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেন; কিন্তু তাহার উপায় নাই। তিনি কদিন আর এ বাড়িতে আসেনই নাই; আবদুল্লাহ্ গিয়া অবস্থা জানাইতেছে এবং তিনি শুনিয়া ও টেম্পারেচার-চার্ট দেখিয়া ব্যবস্থা দিতেছেন।

সেদিন শুক্রবার। সুফী সাহেব জুমার নামায পড়িবার জন্য মসজিদে যাইতে চাহিলেন। মসজিদ বলিয়া একটা কিছু বরিহাটীর সদরে নাই। তবে মুসলমান পাড়ায় নিষ্ঠাবান পিয়াদা চাপরাসীরা আকবর আলী সাহেবের নেতৃত্বে চাদা তুলিয়া একটা টিনের জুমা-ঘর প্রস্তুত করিয়া লইয়া আজ কয়েক বৎসর হইতে তাহাতেই জুমা ও ঈদের নামায পড়িয়া। আসিতেছে। সৈয়দ সাহেব পিয়াদা-চাপরাসীদের সঙ্গে নামায পড়িতে যাইবার জন্য মোটেই উৎসুক ছিলেন না; কিন্তু সুফী সাহেবের প্রস্তাবে অমত করিতেও পারিলেন না। সুতরাং তাহাকে বিরস মনেই যাইতে হইল।

জুমা-ঘরে পৌঁছিয়া তাঁহারা দেখিলেন, প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ জন লোক জমিয়াছে। কেহ কালাল-জুমা পড়িতেছে, কেহ-বা পড়া শেষ করিয়া বসিয়া আছে। সৈয়দ সাহেবকে অনেকেই চিনিত, তাহাকে দেখিয়া তাহারা তটস্থ হইয়া তাড়াতাড়ি সরিয়া গিয়া সম্মুখের কাতারে তাঁহাদিগের জন্য স্থান করিয়া দিল। তাহারা অগ্রসর হইয়া কালাল-জুমা পড়িতে আরম্ভ করিলেন। আর আর সকলে পশ্চাতে বসিল, প্রথম কাতারে কেহই বসিতে সাহস করিল না।

কিছুক্ষণ পরে আকবর আলী সাহেবের সহিত একজন পাগড়িওয়ালা মৌলবী এবং আরো কয়েকজন মুসল্লি মসজিদে প্রবেশ করিতে করিতে উপস্থিত সকলকে মৃদুস্বরে সালাম সম্ভাষণ করিল। অনেকেই ঘাড় ফিরাইয়া তাহাদিগকে দেখিল এবং যথারীতি প্রতি-সম্ভাষণ করিল। সৈয়দ সাহেবের কাবলাল-জুমা তখনো শেষ হয় নাই।

পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেব অগ্রসর হইয়া সৈয়দ সাহেবের পার্শ্ব দিয়া, সম্মুখস্থ পেশ নামাজের উপর গিয়া কালাল-জুমা পড়িতে লাগিলেন। আকবর আলী সঙ্গী কয়জনকে লইয়া সৈয়দ সাহেবের সহিত প্রথম কাতারে স্থান লইলেন। সৈয়দ সাহেব নামায শেষ করিয়া একমনে মাথা নিচু করিয়া বসিয়া নীরবে দোয়া-দরুদ পড়িয়া যাইতে লাগিলেন।

সানি আযান হইয়া গেল। এক্ষণে জুমার নামায শুরু হইবে। পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেব খোবা পাঠ করিবার জন্য কেতাব হাতে লইয়া, মুসল্লিগণের দিকে ফিরিয়া দাঁড়াইলেন। সৈয়দ সাহেব তাহাকে এক নজর দেখিয়া লইবার জন্য মাথা উঁচু করিলেন।

সেই পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেবকে দেখিবামাত্র সৈয়দ সাহেবের চেহারা ভয়ঙ্কর রকম বদলাইয়া গেল! ঘৃণায় ও রাগে কাপিয়া কাপিয়া কেয়া হায়, এত্তা বাৎ! বলিতে বলিতে বৃদ্ধ উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

না জানি কী ঘটিয়াছে মনে করিয়া অনেকেই সেইসঙ্গে উঠিয়া দাঁড়াইল। আকবর আলী সাহেব ব্যস্ত সমস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কী, কী সৈয়দ সাহেব, কী হয়েছে?

সৈয়দ সাহেব ক্রোধে উন্মত্তের ন্যায় হইয়া চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, এত বড় আস্পর্ধা ওর! ব্যাটা জোলা, পাগড়ি বেঁধে এমামতি কত্তে এসেছে?

আকবর আলী দৃঢ়স্বরে কহিলেন, কেন, তাতে কী দোষ হয়েছে? উনি তো দস্তুরমতো পাস-করা মৌলবী, ওঁর মতো আলেম এদেশে কয়টা আছে, সৈয়দ সাহেব?

এঃ! আলেম হয়েছে! ব্যাটা জোলার ব্যাটা জোলা, আজ আলেম হয়েছে, ওর চৌদ্দ পুরুষ আমাদের জুতো বয়ে এসেছে, আর আজ কিনা ও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে এমামতি করবে, আর আমরা ওই ব্যাটার পেছনে দাঁড়িয়ে নামায পড়ব?

পাগড়িওয়ালা মৌলবী সাহেব ধীরভাবে কহিলেন, এটা আপনার বাড়ি নয়, সৈয়দ সাহেব, এটা মসজিদ, সে-কথা আপনি ভুলে যাচ্ছেন।

সৈয়দ সাহেব রুখিয়া উঠিয়া কহিলেন, চুপ রহ্, হারামজাদা! আভি তুঝকো জুতা মাকে নেকাল দেঙ্গে।

মুসল্লিগণের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিলেন, উনি কোহাকার লাট সাহেব গো? আমাগোর মৌলবী সাহেবের গালমন্দ দিতি লাগলেন যে বড়! এ আমারগোর জুমা ঘর, দে তো দেহি কেমন করে ওনারে বার করে দিতি পারেন উনি!

আর একজন কহিল, ওনারেই দেও বার করে–ওসব সয়েদ ফয়েদের ধার আমরা ধারি নে–

আকবর আলী তাহাদিগকে নিরস্ত করিয়া কহিলেন, সৈয়দ সাহেব, এটা আপনার অন্যায়। কেতাবমতো ধত্তে গেলে মুসলমানের সমাজেই উঁচু-নীচু বিচার নেই; তাতে আবার এটা খোদার ঘর–

সৈয়দ সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন, তাই বলে জোলা তাঁতি নিকেরি যে-সে জাতের পেছনে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে হবে? ভালো চাও তো ওকে এক্ষুনি বের করে দাও, ওর পেছনে আমরা নামায পড়ব না।

সমবেত লোকের মধ্য হইতে একটা প্রতিবাদের কলরব উঠিল। একজন চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, উনি না পড়েন উনিই বেরিয়ে যান না কেন? আমরা মৌলবী সাহেবকে দিয়ে নামায পড়াবই।

চলে আইয়ে সুফী সাহেব। শালা জোহা-লোক জাহা মৌলভী বন্‌কে ইমাম হোতা হায়, ওহ ভালে আদ্মী কা রান্না দোরস্ত নেহী। এই বলিয়া সৈয়দ সাহেব সুফী সাহেবকে টানিয়া বাহিরে লইয়া আসিলেন। সুফী সাহেব বাহিরে আসিয়া একবার খাক–থু করিলেন এবং সৈয়দ সাহেবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়া গেলেন। অতঃপর নির্বিবাদে জুমার নামায শুরু হইয়া গেল।

গরম মেজাজে বাসায় আসিয়া সৈয়দ সাহেব যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাহার মেজাজে একেবারে আগুন লাগিয়া গেল। তিনিও ঘরে ঢুকিতেছেন, ডাক্তারবাবুও স্টেথসকোপ গুটাইয়া পকেটে ভরিতে ভরিতে বাহির হইতেছেন। পশ্চাতে আবদুল্লাহ্ এবং বারান্দায় খোদা নেওয়াজ।

সৈয়দ সাহেব থমকিয়া দাঁড়াইয়া চক্ষু লাল করিয়া একবার প্রত্যেকের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলেন। ডাক্তারবাবু বরাবর বাহির হইয়া চলিয়া গেলেন।

তোমাদের নিতান্তই কপাল পুড়েছে, আমি দেখছি। যা খুশি তাই কর তোমরা কিন্তু আমি এখানে আর এক দণ্ডও নয়। খোদা নেওয়াজ, যাও, নৌকা ঠিক কর গিয়ে। সওয়ারী যাবার নৌকা চাই।

খোদা নেওয়াজ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করিল, সওয়ারী কেন, হুজুর?

সৈয়দ সাহেব চটিয়া উঠিয়া কহিলেন, যা বলি তাই কর, কৈফিয়ত তলব কোরো না।

খোদা নেওয়াজ চলিয়া গেল। সৈয়দ সাহেব গুম হইয়া বসিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, এদের সকলকে কি নিয়ে যাবেন?

সৈয়দ সাহেব কহিলেন, না। কেবল সালেহাকে নিয়ে যাব। তোমাদের এসব বে-পরদা কারবারের মধ্যে ওকে আমি রাখতে চাই নে। বউমাকে নিয়ে তোমরা যা খুশি তাই কর। ছেলেই যখন অধঃপাতে গেছে তখন বউ নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাব?

আবদুল্লাহ্ বলিতে যাইতেছিল যে তাহার স্ত্রীকে সে যাইতে দিবে না। কিন্তু আবার ভাবিল, তাহাকে রাখিয়াও যে বড় কাজের সুবিধা হইবে, এমন নয়; বরং তাহাকে ধরিয়া রাখিতে গেলেই শ্বশুরের সঙ্গে একটা মনোবিবাদের সৃষ্টি হইয়া যাইবে, এবং স্ত্রীরও মনে কষ্ট দেওয়া হইবে। সুতরাং সে স্থির করিল, বাধা দিয়া কাজ নাই।

এক্ষণে আবদুল কাদেরকে সংবাদ দেওয়া উচিত বিবেচনা করিয়া আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি আপিসের দিকে চলিল। পথেই আবদুল কাদেরের সহিত তাহার দেখা হইল। খোদা নেওয়াজ তাহাকে আগে খবর দিয়া পরে নৌকা ঠিক করিতে গিয়াছিল।

আবদুল কাদের ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আব্বা নাকি সকলকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন?

কেবল সালেহাকে।

তাকে তুমি নিয়ে যেতে দেবে?

তা যাক না সে; সে তো কোনো কাজেই লাগছে না। আর ছোট তরফের ভাইজানকেও চিঠি লিখেছি; তিনিও হয়তো এসে পড়বেন–নেওয়াজ ভাইকেও বলে দেবখন তাকে শিগগির পাঠিয়ে দিতে। তোমার আর এখন বাসায় গিয়ে কাজ নেই–অনর্থক একটা বকাবকি মন-কষাকষি হবে। উনি যে যাচ্ছেন, এটা খোদার তরফ থেকেই হচ্ছে; থাকলে কেবল হাঙ্গামা কত্তেন বৈ তো নয়।

আবদুল্লাহর পরামর্শমতো আবদুল কাদের আবার আপিসে চলিয়া গেল। খোদা নেওয়াজ নৌকা ঠিক করিয়া আসিল। বৈকালেই সৈয়দ সাহেব সালেহাকে লইয়া রওয়ানা হইলেন। যাইবার সময় আবদুল্লাহর মাতা আপত্তি করিয়াছিলেন, কিন্তু আবদুল্লাহ্ তাঁহাকে বুঝাইয়া নিরস্ত করিয়াছিল। সুফী সাহেব রহিয়া গেলেন।

ঠিক সন্ধ্যার সময় আবদুল খালেক আসিয়া পৌঁছিলেন। সঙ্গে স্ত্রী রাবিয়া, পুত্র এবং মালেকা, একজন মামা এবং একজন চাকর।

২৬-৩০. হালিমার শুশ্রূষার ভার

রাবিয়া আসিয়া যখন হালিমার শুশ্রূষার ভার লইল, তখন সে বেচারির দুঃখ ঘুচিল। আবদুল্লাহর মাতাও রান্নাঘর হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন–রাবিয়ার মামা সেখানে তাহার স্থান। গ্রহণ করিল।

ডাক্তারবাবু এক্ষণে প্রত্যহ আসিয়া দেখিয়া যাইতে লাগিলেন। রোগীর অবস্থা সম্বন্ধে এখনো নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা যায় না। ফুসফুঁসের অবস্থা আর বেশি খারাপ হয় নাই; খুব সম্ভব একুশ দিনে জ্বর ছাড়িতে পারে। কিন্তু সেই দিনটাই সঙ্কটের দিন। যদি ভালোয় ভালোয় কাটিয়া যায়, তবেই রক্ষা। ক্রমে কয়েক দিনের মধ্যে ডাক্তারবাবু আরো দুইবার ইনজেকশন দিলেন।

আবদুল খালেক দুই দিন পরেই চলিয়া গেলেন বাড়িতে কেহই নাই, একজন না। থাকিলে সেখানকার কাজকর্ম নষ্ট হইয়া যাইবে। যাইবার সময় বারবার করিয়া বলিয়া গেলেন যেন প্রত্যহ পত্র লেখা হয়, এবং সময় পাইলেই সত্বর অন্তত এক দিনের জন্যও একবার আসিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন।

আবদুল্লাহ্ বা আবদুল কাদের কাহাকেও আর এখন রোগিণীর শুশ্রূষা সম্বন্ধে কিছুই দেখিতে হয় না। তাহারা ঔষধাদি আনিয়া দিয়া এবং ডাক্তারবাবুর আদেশগুলি শুনাইয়া খালাস। রাবিয়া ও মালেকা পালা করিয়া রাত্রি জাগে। আবদুল্লাহ একবার রাত্রি জাগরণের। ভাগ লইতে চাহিয়াছিল; কিন্তু রাবিয়া তাহাকে আমল দেয় নাই। বলিয়াছিল, মেয়েমানুষের শুশ্রষা কি পুরুষমানুষ দিয়ে হয়?

একুশ দিনের দিন ডাক্তারবাবু বলিলেন, আজ বড় সাবধানে থাকতে হবে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর দিবেন। রাত্রে আমার এইখানেই থাকা দরকার হতে পারে।

বৈকালের দিকে একটু একটু ঘাম দিয়া জ্বর কমিতে আরম্ভ করিল। সন্ধ্যার পর দেখা গেল, জ্বর ১০০ ডিগ্রির নিচে নামিয়াছে। ডাক্তারবাবুকে খবর দেওয়া হইল। তিনি তাড়াতাড়ি আহারাদি সারিয়া ব্যাগ হাতে করিয়া আসিলেন, এবং একবার হালিমার অবস্থা নিজে দেখিতে চাহিলেন। গিয়া দেখিলেন, হাত-পা বেশ একটু ঠাণ্ডা হইয়া গিয়াছে। জ্বর আরো কমিয়াছে এবং বেশ একটু ঘামও হইতেছে। কহিলেন, একটু পরেই জ্বর একেবারে ত্যাগ হইবে; কিন্তু যদি টেম্পারেচার বেশি নামে, তবেই বিপদ। দেখা যাক, কী হয়। যদি বেশি ঘাম হয়, তবে তৎক্ষণাৎ আমাকে ডাকবেন।

সে রাত্রে আর কাহারো ঘুম হইল না। দারুণ উৎকণ্ঠায় সকলে বসিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাইতে লাগিলেন। রাত্রি প্রায় একটার সময় হালিমার অত্যন্ত ঘাম হইতে লাগিল এবং শরীর এলাইয়া পড়িল। ডাক্তারবাবুকে ডাকা হইল। তিনি কহিলেন, যা ভেবেছিলাম কিন্তু ভয় নেই, ও ঠিক হয়ে যাবেখন। আর একটা ইনজেকশন দিতে হবে।

নূতন একটা ইনজেকশন দেওয়া হইল। কিছুক্ষণ পরে রোগীর অবস্থা একটু ফিরিল, শরীরে উত্তাপ বাড়িল, হাত-পা বেশ গরম হইয়া উঠিল, ঘাম বন্ধ হইল। সকলের মনে আশা হইল এ যাত্রা হালিমা বাঁচিয়া যাইবে।

কিন্তু শেষরাত্রের দিকে আবার ঘাম ছুটিল। ডাক্তারবাবু আবার ইনজেকশন দিলেন। ব্যাগ হইতে একটা তীব্র ঔষধ বাহির করিয়া একটু খাওয়াইয়াও দিলেন, এবং কহিলেন, ওঁকে এখন চুপ করে পড়ে থাকতে দিন, যদি একটু ঘুম হয়। আর ভয় নেই, হার্টের অবস্থা ভালো।

যাহা হউক, উদ্বেগে দুর্ভাবনায় রাত্রিটা একরকম কাটিয়া গেল। ভোরের দিকে হালিমার বেশ গাঢ় নিদ্রা হইল। ডাক্তারবাবু কহিলেন, আর কোনো ভয় নেই, এ যাত্রা উনি রক্ষা পেয়ে গেলেন। এখন ওঁর সেবা-শুশ্রূষার দিকেই একটু বেশি নজর রাখতে হবে।

পরদিন হইতে হালিমার অবস্থা ভালোই দেখা যাইতে লাগিল। কিন্তু শরীর এত দুর্বল যে কথা কহিতে কষ্ট হয়। কাশিও একটু রহিয়া গেল। ডাক্তারবাবু বলকারক ঔষধের এবং দুবেলা মুরগির সুরুয়ার ব্যবস্থা করিলেন। রাবিয়া এবং মালেকার সযত্ন ও সস্নেহ শুশ্রূষায় হালিমা দেখিতে দেখিতে সুস্থ হইয়া উঠিল। আগের দিন ডাক্তারবাবু তাহাকে অন্ন-পথ্য করিবার অনুমতি দিলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ডাক্তারবাবু, কাল আমাদের ঈদ, বড়ই আনন্দের দিন। তার উপর আমার বোনটি ঈশ্বরেচ্ছায় আর আপনার চিকিৎসার গুণে বেঁচে উঠেছে, কাজেই আমাদের পক্ষে ডবল আনন্দ। যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে, তবে…

তবে কী?

আপনাকে নেমন্তন্ন কত্তে চাই?

ডাক্তারবাবু অতি আনন্দে বলিয়া উঠিলেন, বাঃ! হলে তো দেখছি তে-ডবল আনন্দ।

আবদুল্লাহ্ একটু দ্বিধার সহিত জিজ্ঞাসা করিল, খেতে আপনার আপত্তি নেই?

কিছু না! আমার ওসব প্রেজুডিস নেই, বিশেষ করে আপনাদের ঘরের পোলাও কোরমা-কো–কাবাব–এইসবের কথা মনে উঠলে সব প্রেজুডিস পগার পার হয়ে যায়!

আবদুল্লাহ্ আহ্লাদিত হইয়া কহিল, তবে কাল দুপুরবেলা আমাদের এখানে চাট্টি নুন ভাত খাবেন…

ডাক্তারবাবু যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। নুন-ভাত? সে কী মশায়! আপনাদের বাড়িতে শেষটা নুন-ভাত খেয়েই জাতটা মারব?

আবদুল্লাহ্ হাসিয়া কহিল, তা মাল্লেনই যখন, তখন না হয় গরিবের বাড়ির নুন-ভাত খেয়েই এবার মারুন।

না, না, সেসব হবে না, মুরগি-মুসাল্লাম চাহিয়ে। একবার যা খেয়েছিলাম মশায়… বলিয়া ডাক্তারবাবু কবে কোন মুসলমান বাড়িতে কী কী খাইয়াছিলেন তাহার ইতিহাস সবিস্তারে বর্ণনা করিতে লাগিলেন। পরিশেষে রায় দিয়া ফেলিলেন, মাংসটা আপনাদের ঘরে খাসা রান্না হয়–অমন আমাদের ঘরে হয় না।

এমন সময় পাশের বাড়িতে একটা চিৎকার ছোটাছুটি গোলমাল শোনা গেল। ব্যাপার কী, জানিবার জন্য সকলে উৎকণ্ঠিত হইয়া বৈঠকখানা হইতে নামিয়া বাহিরে আসিলেন। ডাক্তারবাবুর বাসাটি হাসপাতালের হাতার এক প্রান্তে অবস্থিত। হাতার বাহিরে ছোট একটি বাগান, তাহার পর জনৈক উকিলের বাসাবাটী। সেইখানেই গোলমাল হইতেছিল। একজন চাকর হেই হেই দূর দূর রবে চিৎকার করিতে করিতে বাগানের দিকে ছুটিয়া আসিল; ইহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ একটা ঝি, এবং তাহারও পশ্চাতে ছোট ছোট কয়েকটা ছেলেমেয়ে ঢিল হাতে দৌড়াইয়া আসিতেছিল। একটা মুরগি কটুকটুকটাআশ রবে ক্রন্দন করিতে করিতে তাহাদের সম্মুখে উড়িয়া হাসপাতালের হাতার মধ্যে আসিয়া পড়িল। বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, কী হয়েছে রে রামা?

রামা নামক চাকরটি হাঁপাইতে হাঁপাইতে কহিল, হবে আর কী বাবু, মুরগি ঢুকেছে। বাড়িতে।

তারই জন্যে এত চেঁচামেচি? আমি বলি বুঝি-বা ডাকাত পড়েছে।

ঝি কহিল, বাঃ, রান্নাঘরের দোরে গে উঠল যে! ভাত-তরকারি সব গেল! বাবুর কাছারি যাবার সময় হল, কখন আবার ব্রাধবে? না খেয়েই বাবুকে কাছারি যেতে হবে। আর তাও বলি, আপনিই-বা কেমন ধারা মানুষ বাপু, বাড়িতে মুরগি পুষছে, তা কিছু বলচ না! আমাদের বাবু কত বকাবকি করে…

আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি বাড়ির ভিতর গিয়া মামাটার ওপর তম্বি করিতে লাগিল! এত করে বলি, এ হিন্দুপাড়া, মুরগিগুলো বেঁধে রাখতে, তা কেউ সে কথা কানে করে না…

মামা কহিল, বাধাই তো ছিল ঠ্যাঙ্গে দড়ি দে। কম্নে যে খুলে পলায়ে গেছে তা ঠাওর কত্তি পারি নি।

তা নেও, এখন ওটাকে ধরে ভালো করে বেঁধে রাখ। আমাদের জন্যে ডাক্তারবাবুকে পর্যন্ত কথা শুনতে হচ্ছে। ভদ্দরলোক মনে করবে কী?

বাহিরে আসিয়া আবদুল্লাহ্ বলিল, ডাক্তারবাবু আপনাকে তো অনেক কষ্ট দিলামই, তার উপর আমাদের জন্যে আপনাকে অপদস্থ পর্যন্ত…

আরে রামঃ! এসব কথা কি গ্রাহ্য কত্তে আছে? আপনি বুঝি ভেবেছেন এ বাড়িতে মুরগির চাষ এই প্রথম? তা নয়; আমারই একপাল মুরগি ছিল। এদ্দিন ওরা কিছু বলতে সাহস করে নি–এখন আপনারা রয়েছেন কিনা, তাই একবার ঝালটা ঝেড়ে নিলে। আচ্ছা আমি এটা বুঝতে পারি নে, কাক ঢুকলে হাঁড়ি মারা যায় না, মুরগি ঢুকলে যায় কেমন করে? কাকে তো খায় না, এমন ময়লাই নেই!

আবদুল্লাহ্ কহিল, মুরগিটা যে আপনাদের সাংঘাতিক রকম অখাদ্য…

গোমাংসের চেয়েও?

তা না হতে পারে, কিন্তু অপবিত্র তো বটে।

আর কাকটা বুঝি ভারি পবিত্র হল? ওসব কোনো কথাই নয়। আমার মনে হয়, এর মূলে একটা বিদ্বেষ ভাব আছে। তা মরুক গে যাক–অপবিত্র হোক আর অখাদ্যই হোক, কাল কিন্তু ওটা চাই, নইলে সহজে জাত খোয়াচ্ছি নে…

এই বলিয়া ডাক্তারবাবু হাসিতে হাসিতে বিদায় লইলেন।

বৈকাল হইতেই রাবিয়ার পুত্র আবদুস সামাদ চাঁদ দেখিবার জন্য নদীর ধারে গিয়া দাঁড়াইল। কাছারির ফেরতা পিয়াদা-চাপরাসীরাও নদীর ধার দিয়া আকাশের দিকে চাহিতে চাহিতে চলিয়াছে। সন্ধ্যার একটু পূর্বেই ঈদের ক্ষীণ চন্দ্র-লেখা পশ্চিম আকাশের গায়ে ফুটিয়া উঠিল। দেখিতে পাইয়াই সামু আসিয়া চিৎকার করিয়া সকলকে ডাকিয়া কহিতে লাগিল, আম্মা, দাদু, চাঁদ উঠেছে, ওই দেখুন।

কই? কই? বলিতে বলিতে সকলে বাহিরে আসিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া চাঁদ খুঁজিতে লাগিলেন! হালিমাও রাবিয়ার কাঁধে ভর করিয়া আস্তে আস্তে বাহিরে আসিয়া তাহাদের সঙ্গে যোগ দিল।

রাবিয়া প্রথমেই দেখিতে পাইল এবং ফুপু-আম্মাকে দেখাইবার জন্য বৃথা চেষ্টা করিতে লাগিল। চাঁদ এত ক্ষীণ যে কিছুতেই তাহার নজরে আসিল না। অবশেষে তিনি দুঃখিতচিত্তে কহিলেন, আর মা! সে চোখ কি আর আছে, যে দেখতে পাব? তোমরা দেখেছ, তাইতে আমার হয়েছে।

অতঃপর যে যাহার গুরুজনের কদমবুসি করিল। আবদুল্লাহ্ এবং আবদুল কাদেরও বাড়ির ভিতরে আসিয়া মুরব্বিগণের কদমবুসি করিয়া গেল। আবদুল্লাহর মাতা সকলকে দোয়া করিতে লাগিলেন, খোদা চিরদিন তোমাদের ঈদ মোবারক করুন!

হালিমা কদমবুসি করিতে আসিলে মাতা গদগদকণ্ঠে কহিলেন, থাক থাক, ব্যারাম নিয়ে আর সালাম করিস্ নে। এ ঈদে যে তুই আবার সালাম করবি, এ ভরসা ছিল না মা! শোকর তোর দরগায় খোদা! এই বলিয়া তিনি অঞ্চলে চক্ষু মুছিলেন।

সন্ধ্যার পরেই আকবর আলী সাহেব আসিয়া কহিলেন, সব্‌রেজিস্ট্রার সাহেব, কাল নামাযে ইমামতি করতে হবে আপনাকে।

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কেন, আপনাদের মৌলবী সাহেব কোথায় গেলেন!

আকবর আলী কহিলেন, তিনি তো সেদিনকার সেই গোলমালের পর থেকে আর এ-মুখো হন নি! সৈয়দ সাহেব সেদিন বেচারাকে সকলের সামনে যে অপমানটা করলেন, অমন কোনো ভদ্রলোক করে না। বেচারার মনে বড় চোট লেগেছে!

আবদুল্লাহ্ কহিল, আহা, তা লাগবারই কথা। আমার শ্বশুরের সেটা ভারি অন্যায় হয়ে গেছে। তিনি মস্ত বড় শরীফ, এই অহঙ্কারেই তিনি একেবারে অন্ধ।

আকবর আলী কহিলেন, সে মৌলবী সাহেবকে তো আর পাওয়া যাবে না; এখন আপনাদের একজনকে ইমামতি কত্তে হচ্ছে। আপনার ওয়ালেদ সাহেবই যখন তাকে তাড়িয়েছেন, তখন আপনারই উচিত ক্ষতিপূরণ করা, সব্‌রেজিস্ট্রার সাহেব।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ক্ষতিপূরণ ও-ভাবে কলে তো হবে না–সেই মৌলবী সাহেবকে ডেকে যদি আমরা সকলে তার পিছনে নামায পড়ি, তবে কিছুটা হয় বটে।

আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, তিনি থাকেন কোথায়?

আকবর আলী কহিলেন, বেশি দূর নয়, ওপারে নিকারিপাড়ায়।

তবে তাকে খবর দিন না, কাল ঈদের নামাযে ইমামতি কত্তে।

আমি গত জুমায় তার কাছে লোক পাঠিয়েছিলাম, তা তিনি আসলেন না।

আবদুল্লাহ কহিল, তবে এক কাজ করি না কেন? আমরা নিজেরা গিয়ে তাকে অনুরোধ করে আসি…

আবদুল কাদের কহিল, দোষ কী? কয়েকজন একসঙ্গে দু-তিনটে হেরিকেন নিয়ে যাবখন।

আকবর আলী কহিলেন, নিতান্তই যদি যেতে চান তবে আমি কয়েকজন লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি, তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যান। কিন্তু একথা সৈয়দ সাহেব জানতে পারলে আপনাদের আর আস্ত রাখবেন না…

আবদুল্লাহ্ বাধা দিয়া কহিল, ইঃ! কী করবেন আমাদের? ওঁর ও ফাঁকা আওয়াজের আমরা আর বড় তোয়াক্কা রাখি নে।

সেই রাত্রেই আবদুল্লাহ্ এবং আবদুল কাদের ওপারে নিকারিপাড়ায় গিয়া উপস্থিত হইল। মৌলবী সাহেব যে বাড়িতে ছিলেন, তাহা খুঁজিয়া বাহির করিতে বেশি বেগ পাইতে হইল না। তাহারা ঘরে উঠিয়া সালাম-সম্ভাষণ করিতেই মৌলবী সাহেব যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। বলিয়া উঠিলেন, এ কী আপনারা! এখানে!…

আবদুল্লাহ্ কহিলেন, জি হ্যাঁ, আমরাই, আপনারই কাছে এসেছি।

মৌলবী সাহেব কহিলেন, আপনাদের মতো লোকের আমার কাছে আসাটা একটু তাজ্জবের কথা বটে। কী মনে করে আপনাদের আসা হয়েছে?

কাল ঈদের নামায পড়াবার জন্যে আপনাকে বরিহাটী যেতে হবে।

মৌলবী সাহেব আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, আমাকে পড়াতে হবে? আবার?

সে কথা মনে করে আর কষ্ট করবেন না, মৌলবী সাহেব। যা হবার তা হয়ে গেছে। বুড়ো মানুষ–শরাফতের গুমোর ওঁদের হাড়ে-মাংসে জড়িয়ে আছে–ওঁর কথা ছেড়ে দিন। আমরা আছি–ওঁর মেজ ছেলে এই সব্‌রেজিস্ট্রার সাহেবও আছেন–আমরাই আপনাকে অনুরোধ কচ্ছি, মেহেরবানি করে এসে আমাদের ইমামতি করুন।

মৌলবী সাহেব চুপ করিয়া রহিলেন। আবদুল্লাহ্ আবার জিজ্ঞাসা করিল, কী বলেন, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব হাত দুটি জোড় করিয়া কহিলেন, আমাকে মাফ করুন। আমরা ছোটলোক হলেও একটা মান-অপমান জ্ঞান তো আছে! ধরুন, আপনাকেই যদি কেউ কোনোখানে অপমান করে, সেখানে কি আর আপনার যেতে ইচ্ছা করে? তার উপর এরা আবার আমাকে যত্ন করে রেখেছে–এদের ফেলে তো যাওয়া যেতেই পারে না।

এ কথার আর কি জওয়াব দেওয়া যায়? অথচ এ-বেচারার উপর যে অত্যাচারটা হইয়া গিয়াছে, তাহার একটা প্রতিকার করিবার জন্য আবদুল্লাহ্ উদ্বিগ্ন হইয়া রহিয়াছে। সে ভাবিতে লাগিল।

হঠাৎ আবদুল্লাহর মাথায় একটা খেয়াল আসিল। সে বলিয়া উঠিল, তবে আমরাও আসব আপনার সঙ্গে নামায পড়তে…

মৌলবী সাহেব যেন একটু সঙ্কোচের সহিত কহিলেন, আপনারা এতদূরে আসবেন কষ্ট করে…

কষ্ট আর কী, মৌলবী সাহেব, এই রাত্রে যখন আসতে পেরেছি, তখন দিনে এর চেয়েও সহজে আসতে পারব। কী বল, আবদুল কাদের?

আবদুল কাদের কহিল, তা তো বটেই! আমরা ঠিক আসব।

মৌলবী সাহেব একটু আমতা আমতা করিয়া তা–তবে– ইত্যাদি কী যেন বলিতে যাইতেছিলেন। আবদুল্লাহ বাধা দিয়া কহিল, আপনি মনে কিছু দ্বিধা করবেন না, মৌলবী সাহেব। আমাদের কোনো কু-মতলব নেই। সরলভাবেই বলছি, আপনি একজন আলেম লোক বলে আমরা আপনাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করি আপনার পিছনে নামায পড়া আমরা গৌরবের কথা বলেই মনে করব।

মৌলবী সাহেব যাহার বাড়িতে ছিলেন, সে লোকটা নিকারিদের মোড়ল। সেও সেখানে উপস্থিত ছিল। সে বলিল, বেশ তো, আপনারা যেতি আমাগোর সাতে নোমায পড়তি আসেন, সে তো ভালো কতা!

আবদুল্লাহ্ কহিল, কেন আসব না? আমরা সব্বাই মুসলমান, ভাই ভাই। যত বেশি ভাই মিলে একসঙ্গে নামায পড়া যায়, ততই সওয়াব বেশি হয়। ঈদের নামায যেখানে বড় জমাত হয়, সেইখানেই গিয়ে পড়া উচিত–কী বলেন, মৌলবী সাহেব?

মৌলবী সাহেব কহিলেন, সে তো ঠিক কথা!

আবদুল্লাহ্ কহিল, ওপারে জমাত ছোট হয়। কজনই-বা লোক আছে বরিহাটীতে। আমি চেষ্টা করব, যাতে ওখানকার সকলেও এপারে এসে নামায পড়েন।

এ প্রস্তাবে সকলেই খুশি হইয়া উঠিল। মোড়ল কহিল, আমাগোর হ্যাঁপারে যে জোমাত হয়, মানুষির মাথা গুনে শ্যাষ করা যায় না। এই গেরদের বিশ তিরিশ হান্ গেরামের লোক আসে আমাগোর ঈদগায়ে নোমায পড়তি। মাঠহাও পেল্লায়–বহুত লোক বসতি পারে। এত বড় ঈদগা এ-গেরুদের মদ্দি নেই!

আবদুল্লাহ্ কহিল, আপনার কাছে আরো একটা অনুরোধ আছে, মৌলবী সাহেব। নামায পড়াতে যাবার অনুরোধ তো রাখলেন না; তার বদলে আমরাই আসছি। কিন্তু এ অনুরোধটা রাখতেই হবে।

মৌলবী সাহেব কুণ্ঠিতভাবে কহিলেন, আমাকে এমন করে বলে কেন লজ্জা দিচ্ছেন আপনারা…

না, না, ওরকম কেন মনে কচ্ছেন আপনি! আমার অনুরোধ এই যে, কাল দুপুরবেলা আমাদের বাসায় আপনাকে দাওৎ কবুল কত্তে হবে।

মৌলবী সাহেব মোড়লের মুখের দিকে চাহিলেন। মোড়ল কহিল, তা ক্যামন করে হবে, মেয়া সাহেব, ঈদির দিন উনি আমাগোর বাড়ি না খালি হবে ক্যান্?

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা উনি রাত্রে এখানে খাবেনখন। উনি তো কেবল আপনাদেরই মৌলবী সাহেব নন, আমাদেরও মৌলবী সাহেব। আমরাও ওঁকে একবেলা খাওয়াব।

মোড়ল কহিল, না, ঈদের দিন ওনারে আমরা যাতি দি ক্যাম্নয়? আপনারা ওনারে পাছে খাওয়াবিন।

আমরা যে দুই-এক দিনের মধ্যে চলে যাচ্ছি মোড়লসাহেব। কাল ছাড়া আর আমাদের দিনই নেই।

কাজেই মোড়ল সাহেবকে হাল ছাড়িতে হইল। স্থির হইল যে, কাল নামায বাদ মৌলবী সাহেব ওখানে খাইতে যাইবেন, কিন্তু রাত্রে উহাদিগকে মোড়ল বাড়ির দাওয়াদ কবুল করিতে হইবে। অবশ্য কাল দ্বিপ্রহরে মোড়ল স্বয়ং গিয়া রীতিমতো দাওয়াদ করিয়া আসিবে। আবদুল্লাহ্ রাজি হইয়া গেল।

রাত্রে বাসায় ফিরিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিল, আবদুল খালেক আসিয়াছেন, তিনি কাজের ঝঞ্ঝাটে অনেক চেষ্টা করিয়াও এ কয়দিন আসিতে পারেন নাই বলিয়া কৈফিয়ত দিলেন। কিন্তু সে-সকল কৈফিয়তে কান দিবার মতো মনের স্থিরতা আবদুল্লাহর ছিল না। শ্বশুর কর্তৃক অপমানিত মৌলবীটিকে লইয়া কাল যে ব্যাপার ঘটাইতে হইবে, তাহারই ভাবনায় উন্মনা হইয়া ছিল। সে আবদুল খালেককে সকল কথা খুলিয়া বলিল। তিনিও অনুমোদন করিলেন দেখিয়া আবদুল্লাহ্ বড়ই খুশি হইয়া গেল।

পরদিন ভোরে উঠিয়াই আবদুল্লাহ্ আকবর আলী সাহেবের নিকটে উপস্থিত হইয়া ওপারে নামায পড়িতে যাইবার প্রস্তাব উত্থাপন করিল; কিন্তু আকবর আলী তাহাতে রাজি হইতে পারিলেন না। কহিলেন, যখন তাহারই চেষ্টায় ইহারা সকলে একটা জুমা-ঘর প্রস্তুত করিয়াছে, এবং কয় বৎসর ধরিয়া এখানে রীতিমতো নামায হইয়া আসিতেছে, তখন এ-স্থান ছাড়িয়া অন্যত্র নামায পড়িতে যাওয়া কর্তব্য হইবে না। বিশেষত একবার নামায বাদ পড়িলে ভবিষ্যতে ইহার স্থায়িত্ব সম্বন্ধে গোল ঘটিতে পারে।

অগত্যা আবদুল্লাহ্ স্থির করিল, কেবল তাহারাই কয়জন ওপারে যাইবে। আকবর আলী নিরস্ত করিতে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু সে কহিল, যখন কথা দিয়া আসা হইয়াছে, তখন যাইতেই হইবে।

.

২৭.

বেলা দেড় প্রহর হইতে না হইতেই আবদুল্লাহরা নিকারিপাড়ার ঈদগাহে আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন ঈদগাহ প্রায় ভরিয়া উঠিয়াছে। নিকটবর্তী বহু গ্রাম হইতে লোকে এইখানে ঈদ-বকরীদের নামায পড়িতে আসে, প্রায়-ছয় সাত শত লোকের জমাত হইয়া থাকে।

তাহারা আসিতেই সকলে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল, এবং তাহাদের সালাম-সম্ভাষণের যুগপৎ প্রতি-সম্ভাষণে একটা সমুচ্চ গুঞ্জন উপস্থিত হইল। সকলেই বসিয়া ছিল–কেহ-বা মাদুর, কেহ-বা ছোট জায়নামাজ বা শতরঞ্জ পাতিয়া, কেহ-বা রঙিন রুমাল ঘাসের উপর বিছাইয়া স্থান করিয়া লইয়াছিল। মৌলবী সাহেব গ্রামের কয়েকজন মাতব্বর লোকসহ। ভিড়ের মধ্যে নড়িয়াচড়িয়া, যে দুই-এক জন লোক তখনো আসিতেছিল, তাহাদিগকে বসাইবার বন্দোবস্ত করিতেছিলেন। তিনি একটু অগ্রসর হইয়া কহিলেন, তশরীফ লাইয়ে, হুজুর! আপনাদের দেরি দেখে ভাবছিলাম, বুঝি আর আসা হল না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, না, না, মৌলবী সাহেব, না আসবার তো কোনো কারণই নেই। ওখান থেকে সবাইকে আনবার জন্যে চেষ্টা কচ্ছিলাম কিনা, তাই একটু দেরি হয়ে গেল।

আর কেউ কি আসবেন?

না; তারা বলেন, এখানকার জুমা-ঘরে বরাবর নামায হয়ে আসছে, কাজেই সেটা বন্ধ করা ভালো দেখায় না।

মৌলবী সাহেব কহিলেন, তবে আর দেরি করে কাজ কী?

জমাতের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি বলিয়া উঠিল, নামায শুরু হয়ে যাক–রোদ তেতে উঠল!

আর এক ব্যক্তি দূর-প্রান্ত হইতে কহিল, এট্টু দেরেঙ্গ করেন আপনারা, ওই যে আরো কজন মুসল্লি আসতিছেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, ঈদগাহটি এঁরা বেশ সুন্দর জায়গায় করেছেন কিন্তু! চারদিকে বড় বড় গাছ, সবটা জায়গা ছায়াতে ঢেকে পড়েছে। আরামে নামায পড়া যাবেখন।

মৌলবী সাহেব কহিলেন, কিন্তু দেরি হয়ে গেলে আর আরাম থাকবে না। ইমামের মাথার উপরেই রোদ লাগবে আগে!

আবদুল্লাহ এবার হাসিয়া কহিল, সেইজন্যেই বুঝি আপনি তাড়াতাড়ি কচ্ছেন?

মৌলবী সাহেব কহিলেন, তাও বটে, আর ঈদের নামাযে বেশি দেরি করা জায়েজ নয়, সেজন্যেও বটে।

এদিকে গ্রামের মোড়ল আর একজন মুসল্লি সঙ্গে লইয়া, দুই জনে একখানা বড় রুমালের দুই প্রান্ত ধরিয়া প্রত্যেকের নিকট হইতে ফেত্রার পয়সা আদায় করিতে আরম্ভ করিল। সেই মুসল্লিটি কহিতে লাগিল, ফেত্রার পয়সা দেন, মেয়া সাহেবরা! পোনে দু সের গমের দাম চোদ্দ পয়সা। ছোট বড়, কারো মাফ নেই। ছোট, বড় আওরত, মরদ। সলকার জন্যি ফেত্রা দেওয়া ওয়াজেব! হর হর বাড়ির মালিক জনে জনে হিসেব করে দেবেন! ফেত্রা না দিলি রোজার পুরা সওয়াব মেলে না!

রুমাল ঘুরিয়া চলিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন পয়সা পড়িতে লাগিল। কেহ কহিল, এই নেন আমার পাঁচ জোনের ফেতরা এক ট্যাহা ছয় পয়সা; কেহ আমি একলা মানুষ বলিয়া সাড়ে তিন আনা পয়সা ফেলিয়া দিল; কেহ-বা কহিল, আমি বড় গরিব, মেয়া সাহেব। খোদায় মাফ করবি!

ক্রমে টাকা পয়সা সিকি দুআনিতে ভরিয়া রুমালখানি দারুণ ভারী হইয়া উঠিল। তখন সেখানি বেশ করিয়া বাধিয়া মেম্বারের পার্শ্বে রাখিয়া দিয়া আর একখানি রুমাল আনা হইল। এইরূপে তিন-চারিখানি রুমাল ভরিয়া ফেত্রা আদায় করা হইয়া গেলে মৌলবী সাহেব নামাযে খাড়া হইলেন। তখন ঈদগাহের পশ্চিম প্রান্ত রৌদ্রে ভরিয়া গেলেও মেন্বর প্রান্তস্থিত ভরা রুমালগুলি তাহাকে সূর্যতাপ অনুভব করিবার অবসর দিল না।

সকলে উঠিয়া কেবলামুখী হইয়া দাঁড়াইল। মৌলবী সাহেব চিৎকার করিয়া কহিলেন কাতার ঠিক করে দাঁড়াবেন, মিয়া সাহেবরা! পায়ের দিকে চেয়ে দেখবেন।

অমনি সকলে পার্শ্ববর্তীগণের পায়ের দিকে চাহিয়া দেখিয়া নড়িয়াচড়িয়া কাতার সোজা করিয়া লইল। নামায শুরু হইল।

নিয়ত করা হইয়া গেলে মৌলবী সাহেব সমুচ্চকণ্ঠে চারবার তীর উচ্চারণ করিলেন। অতঃপর সকলে তহরিমা বাধিয়া নতমস্তকে দাঁড়াইয়া ইমামের সুরা-পাঠ শ্রবণ করিতে লাগিল। ইমাম সাহেব বড়ই সুকণ্ঠ; প্রান্তর মুখরিত করিয়া তাহার মধুর কেরাত নামাযীগণের হৃদয়ে যেন প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। ক্রমে সুরা পাঠ শেষ হইলে আবার গম্ভীর রবে তীর উচ্চারিত হইল; অমনি সকলে যুগপৎ অর্ধঅবনমিত দেহে রুকু করিল–সুশিক্ষিত সেনাদল যেমন নায়কের ইঙ্গিতমাত্রে যন্ত্রচালিতের ন্যায় একযোগে আদেশ-পালনে তৎপর হয়, তেমনি তৎপরতার সহিত সকলে একযোগে রুকুতে অবনত হইল। আবার তীর উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তেমনই সকলে একযোগে দণ্ডায়মান হইল, এবং একযোগে ভূ-তলে জানু পাতিয়া ভূ-পৃষ্ঠ-মস্তকে সেজদা করিল। আল্লাহ্ যেমন এক তেমনি নামাযরত জনসংঘেরও যেন একই প্রাণ, একই দেহ!

দুই রাকাত নামায় দেখিতে দেখিতে শেষ হইয়া গেল; ইমামের সালাম পাঠের সঙ্গে সঙ্গে সকলে দক্ষিণে ও বামে মস্তক হেলাইয়া সমগ্র মোসলেম-জগতের প্রতি মঙ্গল আশীর্বাদ বর্ষণ করিল।

তাহার পর ইমাম মোনাজাত করিলেন এবং সকলে দুই হাত তুলিয়া তাহার সহিত যোগদান করিল। মোনাজাত হইয়া গেলে তিনি দণ্ডায়মান হইয়া আরবি কেতাব হাতে লইয়া খোবা পড়িতে লাগিলেন। যদিও তাহার এক বর্ণও কাহারো বোধগম্য হইল না, তথাপি সকলে ধর্মবুদ্ধিপ্রণোদিত হইয়া গভীর মনোযোগের সহিত খোত্বা শ্রবণ করিতে লাগিল।

খোৎবার পর আবার মোনাজাত হইল। তাহার পর আলিঙ্গনের পালা। প্রত্যেকে একবার ইমামের সহিত এবং আর একবার পরস্পরের সহিত কোলাকুলি করিবার জন্য ব্যগ্রতা দেখাইতে লাগিল। যেন সকলেই ভাই ভাই, এক প্রাণ, এক আত্মা! একতার এমন নিদর্শন। শার কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না; কার্যক্ষেত্রে এমন নিদর্শনের এমন ব্যর্থতাও আর। সমাজে ঘটিয়াছে কি না সন্দেহ।

ঈদের নামায খতম হইল, যে যাহার ঘরে চলিল। মৌলবী সাহেবের রুমালে বাধা টাকা-পয়সার মোটগুলিও মোড়লের হাতে ঘরে চলিল! মৌলবী সাহেব তাহার ঘরে গিয়া সেখানে গনিয়া বাক্সবন্দি করিয়া আসিলেন, এবং আবদুল্লাহদের সঙ্গে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে চলিলেন।

বেলা প্রায় দ্বিপ্রহরের সময় বাসায় পৌঁছিয়া যে-যাহার মুরব্বিগণের কদমবুসি করিল। মুরব্বিরাও সকলকে প্রাণ ভরিয়া দোয়া করিতে লাগিলেন।

তাহার পর আহারের পালা। ডাক্তারবাবুকে ডাকিয়া আনিবার জন্য সামুকে পাঠানো হইল। একটু পরেই ডাক্তারবাবু হসপিটাল অ্যাসিট্যান্ট বাবুকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিলেন। কহিলেন, এঁকে ধরে নিয়ে এলাম। একা একাই জাতটা খুইয়ে লেজকাটা শেয়াল হব? আরো যতগুলার পারি লেজ কেটে দি!

আবদুল্লাহ সবিনয়ে কহিল, বড়ই সুখের বিষয় যে আপনি এসেছেন। আপনার প্রেজুডিস নেই তা তো জানিনে, কাজেই বলতে সাহস করি নি।

ডাক্তারবাবু কহিলেন, আরে, এর আর বলাবলি কী? যারা মুরগি-মাটনের স্বাদ একবার পেয়েছে, তাদের আর বলতে-কইতে হয় না কিছু। কী বল, ভায়া? আর এ আমার নিজের বাড়ি–আমিই তো ওঁকে নিমন্ত্রণ করে এনেছি।

বৈঠকখানা-ঘরে দস্তরখান বিছানো হইল। অন্দর হইতে খাঞ্চা ভরিয়া খানা আসিতে লাগিল এবং আবদুল খালেকের চাকর সলিম রেকাবিগুলি যথাস্থানে সাজাইয়া দিল। চিলমচি, বদনা প্রভৃতি আসিল। আবদুল্লাহ্ প্রথমেই ডাক্তারবাবুয়ের হাত ধোয়াইয়া দিল। তৎপরে মৌলবী সাহেবকে হাত ধুইবার জন্য অনুরোধ করিলে তিনি কহিলেন যে, আর আর সকলের হাত ধোয়া হইয়া গেলে তিনি ধুইবেন। কিন্তু আবদুল্লাহ্ ছাড়িল না, আপনি আগে ধোন। আপনারা আগে ধুয়ে নেন ইত্যাদি শিষ্টাচার কলহের পর মৌলবী সাহেবকেই হারিতে হইল–তিনিই সর্বাগ্রে হাত ধুইয়া লইলেন। এমনকি আবদুল্লাহ নিজেই তাহার হাতে জল ঢালিয়া দিল।

দস্তরখানে লোক বেশি নহে বলিয়া আর স্বতন্ত্র খাদেমের দরকার হইল না। আবদুল খালেক বসিয়া বসিয়াই সকলের রেকাবিতে তাম্বখশ করিয়া পোলাও পৌঁছাইয়া দিল এবং চামচে করিয়া কাবাব ও কোফতা বাটিতে লাগিল।

সুফী সাহেব আবদুল্লাহকে কহিলেন, উওহ্ নিমকদানঠো জারা বাঢ়া দিজিয়ে। আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি নিমকদান বাড়াইয়া দিল। তখন প্রত্যেকেই নিমক চাহিলেন, সুতরাং নিমকদানটা এবার সব হাত ঘুরিয়া আসিল।

সুফী সাহেব একবার সকলের মুখের দিকে চাহিতে চাহিতে জিজ্ঞাসুভাবে কহিলেন, বিসমিল্লাহ্? আবদুল্লাহ্ কহিল, জি হাঁ, বিসমিল্লাহ। খানা শুরু হইল।

সুফী সাহেব লোকটি বেশ ভোজনবিলাসী। দুই-এক লোকমা পোলাও খাইয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন, ওঃ বড়া ওদা খানা পাক্কা! কাবাব ভি বহোৎ জায়েকাদার হুয়া!

ডাক্তারবাবু কহিলেন, বাস্তবিক, রান্নাটা খাসা হয়েছে কিন্তু। আমি অনেক জায়গায় খেয়েছি, কিন্তু এমনটি কোথাও খাই নি।

সামু খাইতে খাইতে জল চাহিল। সলিম এক গ্লাস জল ঢালিয়া তাহার হাতে দিল। কয়েক চুমুক খাইয়া সামু গেলাসটি দস্তরখানের উপর রাখিল। সুফী সাহেব চটিয়া উঠিয়া কহিলেন, বাড়া বে-তামিজ লাড়কা! দস্তরখান পর পানি কা গিলাস রাখতা হায়।

আবদুল খালেক কহিল, সামু, গেলাসটা তুলে সলিমের হাতে দাও বাবা।

খানা চলিতে লাগিল। আবদুল্লাহ কোরমার পেয়ালাটি বাম হস্তে তুলিয়া আনিয়া কাছে রাখিল এবং বাম হস্তে চামচ ধরিয়া কয়েকজনকে কোরমা তুলিয়া দিয়া, পেয়ালাটি আবদুল কাদেরের দিকে বাড়াইয়া দিয়া কহিল, দাও তো ভাই ওদিকে…ডাক্তারবাবুদের পাতে বেশি করে দিও!

দেবনাথবাবু আপত্তি করিয়া কহিলেন, ঢের রয়েছে যে, কত আর খাব! কিন্তু বলিতে বলিতেই দুই-তিন চামচ করিয়া কোরমা তাহাদের পাতে পড়িয়া গেল।

সুফী সাহেব কহিলেন, লাইয়ে তো পিয়ালা ইধার, নরম, এক বোটি চুন্ লে। আবদুল কাদের কোরমার পেয়ালা তাহার দিকে বাড়াইয়া দিল। সুফী সাহেব পেয়ালার ভিতর দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুলি ডুবাইয়া দিয়া মাংসের টুকরা টিপিয়া টিপিয়া কয়েকখানি বাছিয়া তুলিয়া লইলেন।

আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি সলিমকে ডাকিয়া কানে কানে কহিয়া দিল, দৌড়ে আর একটা পেয়ালায় করে কোরমা নিয়ে আয় তো! আর একটা চামচও আনি।

সলিম দরজার কাছে গিয়া মামাকে ডাকিয়া কহিতেই সে আর এক পেয়ালা কোরমা চামচসহ আনিয়া দিল।–সলিম উহা লইয়া ভিতরে আসিলে আবদুল্লাহ্ তাহাকে কহিল, ওটা ডাক্তারবাবুদের সুমুখে রেখে দে।

কিছুক্ষণ পূর্বে সুফী সাহেব জল খাইয়া গেলাসটি কাছেই রাখিয়া দিয়াছিলেন। এক্ষণে আবার জলের আবশ্যক হওয়াতে তিনি গেলাসটি উঠাইয়া সলিমের হাতে দিয়া কহিলেন, পানি দেও।

গেলাসের তলায় সামান্য একটু জল ছিল, সলিম তাহাতেই আবার জল ঢালিয়া দিল। সুফী সাহেব চটিয়া উঠিয়া কহিলেন, জুঠা পানিমে পানি ডালতা হায়? ফেঁক দেও উওহ পানি।

সলিম সে জল ফেলিয়া দিয়া আবার এক গ্লাস ঢালিয়া দিল।

সামু আবদুল্লাহর পাশেই বসিয়াছিল। সে ফিসফিস করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ফুপাজান, জুঠা পানিতে পানি ঢাললেই দোষ, আর ভরা পিয়ালায় জুঠা হাত ডুবালে দোষ হয় না?

আবদুল্লাহ্ কহিল, চুপ, ওকথা এখন থাক্।

ক্রমে আহার শেষ হইল। তাহার পর হাত ধুইবার পালা। সলিম চিলমচি, বদনা, তোয়ালে প্রভৃতি লইয়া আসিল। ডাক্তারবাবুদেরই আগে হাত ধোয়ানো হইল। তাহারা সাবান দিয়া হাত ধুইলেন। তাহার পর মৌলবী সাহেব, তিনিও সাবান লইলেন। কিন্তু বিলাতি সাবানে হারাম বস্তু থাকা সম্ভব মনে করিয়া সুফী সাহেব তাহা স্পর্শ করিলেন না; কেবল জল দিয়া হাত ধুইয়াই–খ্যাক–থু করিতে করিতে বেশ করিয়া তোয়ালে দিয়া মুছিয়া ফেলিলেন। হাতের আঙুলে যত চর্বি, ঘি প্রভৃতি জড়াইয়া ছিল, তাহাতে তোয়ালেখানি সুন্দর বাসন্তী রঙে রঞ্জিত হইয়া গেল! আবদুল্লাহ্ বাড়ির ভিতর গিয়া তাড়াতাড়ি আর একখানি পরিষ্কার তোয়ালে লইয়া আসিল।

পান আসিল এবং সঙ্গে সঙ্গে আবদুল কাদের দশ টাকার করিয়া পাঁচখানি নোট আনিয়া দেবনাথবাবুর সম্মুখে রাখিয়া দিল।

ডাক্তারবাবু একটু আশ্চর্য বোধ করিয়া কহিলেন, ও কী?

আবদুল কাদের কহিল, আপনার ভিজিট বাবদ আমরা এতদিন কিছু দিতে পারি নি, ডাক্তারবাবু। তা ছাড়া আপনি আরো যে উপকার করেছেন, তার তো কোনো তো মূল্যই হয় না। তবে মেহেরবানি করে যদি এটা অন্তত সামান্য নজর বলে কবুল করেন…

ডাক্তারবাবু কহিলেন, না, না; ওসব আবার কী! আমি তো এখানে ডাক্তার বলে আসিনে, বন্ধুভাবেই এসেছি। আর আপনারা তো ধওে গেলে হসপিটালেই আছেন–আমার বাড়িতে জায়গা ছিল, তাই ওয়ার্ডে না রেখে এইখেনেই রেখেছি…

তা হোক, হসপিটালই হোক আর যাই হোক, আমরা আপনার কাছে যে কতদূর ঋণী তা এক ঈশ্বর জানেন, আর আমরা জানি। এ সামান্য নজরটা অবশ্য সে ঋণের পরিশোধ হতেই পারে না–তবে আমার সাধ্যে যেটুকু কুলোয় তাই দিচ্ছি, ওটা আপনাকে নিতেই হবে।

ডাক্তারবাবু একটু ভাবিয়া কহিলেন, না নিলে পাছে আপনারা বেজার হন, তাই নিচ্ছি–কিন্তু আর না… বলিয়া তিনি দুখানি নোট উঠাইয়া লইলেন। কিছুতেই অধিক লইতে চাহিলেন না।

এমন সময়, ম্যা সাএব শ্যালাম, শ্যালাম বলিতে বলিতে, এবং সুদীর্ঘ হাতখানি সম্মুখের দিকে হঠাৎ বাড়াইয়া দিয়া আবার টানিয়া লইয়া কপালে ঠেকাইতে ঠেকাইতে, নিকারিপাড়ার মোড়ল আসিয়া ঘরে ঢুকিল।

.

২৮.

২৮ স্কুল খুলিবার কয়েক দিন পরে আবদুল্লাহ্ একদিন ক্লাসে পড়াইতেছে, এমন সময় হেডমাস্টার তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। ক্লাসে কাজ করিবার সময় এমন করিয়া হঠাৎ ডাকিয়া পাঠানো স্কুলের রীতিবিরুদ্ধ–তবে কোনো বিশেষ জরুরি কারণ থাকিলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু সে জরুরি কারণটি এক্ষেত্রে কী? কিছু একটা গুরুতর অপরাধ হইয়া গিয়াছে, না কোনো অপ্রত্যাশিত শুভ সংবাদ আসিয়াছে? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে স্পন্দিত হৃদয়ে আবদুল্লাহ্ হেডমাস্টারের কামরায় গিয়া প্রবেশ করিল।

তাহাকে দেখিয়াই হেডমাস্টার স্মিতমুখে, গুড় নিউজ ফর ইউ, মৌলভী, লেটু মি কগ্রাচুলেট ইউ! বলিয়া আবদুল্লাহর হাতখানি ধরিয়া প্রবলবেগে দুই-তিনটা ঝকা দিয়া দিলেন।

আবদুল্লাহর বুকের ভিতর টিপটিপ করিতে লাগিল। সে ঔৎসুক্যে অধীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, ব্যাপার কী, স্যার?

হেডমাস্টার কহিলেন, কবে খাওয়াচ্ছেন তা আগে বলুন, –খোশ-খবর কি অম্‌নি অনি বলা যায়?

বেশ তো, যদি এমনই খোশ-খবর হয় তা হলে খাওয়াব বৈকি! অবিশ্যি আমার সাধ্যে যদ্র কুলোয়।

তা আর কুলোবে না? বলেন কী! যে খবর দিচ্ছি, তার দাম নেমন্তন্ন খাওয়ার চাইতে অনেক বেশি। আচ্ছা আপনি আঁচ করুন দেখি, এমন কী খবর হতে পারে?

সংবাদটি জানিবার জন্য আবদুল্লাহর প্রাণ অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল–অতি কষ্টে ঔৎসুক্য দমন করিয়া কহিল, বোধ করি একটা প্রমোশন পেয়ে থাকব।

হেডমাস্টার অবজ্ঞাভরে কহিলেন, না, আপনার সাধ্যই নেই সে আসল কথাটা আঁচ করা। যদি বলি আপনি হেডমাস্টার হয়েছেন, বিশ্বাস করবেন?

কোথাকার হেডমাস্টার?

রসুলপুর হাইস্কুলের।

রসুলপুরের! আমি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখুন ইনস্পেক্টরের চিঠি। ও স্কুলটা যে এখন প্রভিন্সিয়ালাইজড় হয়ে গেল। আপনাকে সত্বর রিলিভ করবার জন্যেও কড়া হুকুম এসেছে!

আবদুল্লাহ্ কম্পিতহস্তে পত্রখানি লইল এবং তাড়াতাড়ি তাহার উপর দিয়া চোখ বুলাইয়া গেল। সত্যই তো তাহাকে রসুলপুরের নূতন গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের হেডমাস্টার নিযুক্ত করা হইয়াছে।–একশত টাকা বেতন। তৎক্ষণাৎ ইনস্পেক্টর সাহেবের শেষ কথা কয়টি তাহার মনে পড়িয়া গেল, আপনার যাতে সুবিধে হয়ে যায়, তার জন্য আমি চেষ্টা করব এবং কৃতজ্ঞতায় তাহার হৃদয় ভরিয়া উঠিল। পত্রখানি হেডমাস্টারকে ফিরাইয়া দিয়া সে গদগদকণ্ঠে কহিল, স্যার, এ কেবল আপনার সুনজর ছিল বলে…

হেডমাস্টার যথেষ্ট গাম্ভীর্য অবলম্বন করিয়া কহিলেন, সাহেব সেদিন ইনস্পেকশনের সময় আমাকে বলেছিলেন, রসুলপুর স্কুল প্রভিন্সিয়ালাইজড় হবে, আর সেখানে একজন ভালো হেডমাস্টার নিযুক্ত করা হবে। আমি তক্ষনি তাকে বললাম, আমার স্টাফে একজন খুব উপযুক্ত লোক আছেন। বুঝতেই পাচ্ছেন, আপনার কথাই আমি তাকে বলেছিলাম–তা তিনি আপনার নাম নোট করে নিয়েছিলেন। আচ্ছা, আপনাকে কোনো হিন্দু দেন নি?

না, স্যার। আমি স্কুলে একজন মৌলবী দেবার কথা বলতে গিয়েছিলাম, অন্য কোনো কথা হয় নি তো।

বড়ই আশ্চর্য! সাহেবের এ্যাটিচুড দেখে কিন্তু আমার তখনই মনে হয়েছিল যে, আপনাকেই সিলেক্ট করবেন–আর করেছেন তাই। যা হোক, আমার রেকমেন্ডেশনটা যে তিনি রেখেছেন, এতে আজ আমার ভারি আনন্দ হচ্চে, মৌলবী সাহেব!

আবদুল্লাহ্ বিনয়ের সাথে কহিল, আপনার অনুগ্রহ!

তা হলে আপনি কবে যাচ্ছেন?

যখন আপনার সুবিধে হবে…

আমার সুবিধের তো কথা হচ্ছে না–মৌলবী সাহেব, আপনাকে এ্যাটওয়ান্স রিলি করবার জন্যে যে অর্ডার আছে। বিলম্ব করা তো আপনার পক্ষে উচিত হবে না।

তবে কবে আমাকে রিলিভ করবেন?

বলেন তো কালই।

আচ্ছা, স্যার।

কিন্তু আপনি যত শিগগির পারেন, ওখানে গিয়ে জয়েন করবেন। যেতেও তো দিন দুই লাগবে–কমুনিকেশন ওখানকার বড়ই বিশ্রী। আপনি আজই গিয়ে সব গুছিয়েটুছিয়ে নিন।…

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, তা হলে হোস্টেলের চার্জ কাকে দেব?

হেডমাস্টার যেন একটু চমকিয়া উঠিয়া কহিলেন, ওঃ হো! সে কথা তো আমি আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছি। এই জানুয়ারি থেকে একজন মৌলবী আসচেন যে!

আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্য হইয়া কহিল, অর্ডার এসেচে নাকি?

ইনস্পেক্টর সাহেব যে একেবারে এতখানি অনুগ্রহ করিয়া ফেলিবেন, ইহা স্বপ্নেরও অতীত। যাহা হউক, নিজের পদোন্নতিতে তো আবদুল্লাহ্ সুখী হইলই, তাহার ওপর মৌলবী নিযুক্ত করা সম্বন্ধে যে তাহার অনুরোধ রক্ষা করা হইয়াছে, ইহাতেও সে যথেষ্ট আত্মপ্রসাদ লাভ করিল।

দেখিতে দেখিতে স্কুলময় এই আশ্চর্য সংবাদ রাষ্ট্র হইয়া গেল। যে যে ঘণ্টায় যাহাদের বিশ্রাম, তখন তাহারা নানাপ্রকারে ইহার সমালোচনা করিতে লাগিলেন। কোথায় কোন স্কুলে কজন বিশেষ বিশেষ যোগ্য লোক আছেন, বরিহাটীর স্টাফেও আবদুল্লাহ্ অপেক্ষা সর্বাংশে শ্রেষ্ঠ কে কে আছেন, একে একে তাঁহাদের নাম হইতে লাগিল, এবং সকলেই একবাক্যে মত প্রকাশ করিলেন যে, এ লোকটা কেবল মুসলমান বলিয়াই হঠাৎ এমন বড় চাকরিটা পাইয়া গেল। ইহাও সকলে স্থির করিয়া ফেলিলেন যে, ও স্কুলের হেডমাস্টারি করা আবদুল্লাহর কর্ম নয়; দুদিনের মধ্যেই একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটিয়া যাইবেই যাইবে।

আবার কেহ কেহ কহিলেন, মুসলমানের আজকাল সাতখুন মাপ। আবদুল্লাহর আমলে স্কুলটি গোল্লা-নামধেয় স্থানবিশেষের প্রতি দুর্জয় ঝোঁক দেখাইলেও তাহার কোনো ভয়ের কারণ নাই। রসুলপুরের ভূতপূর্ব হেডমাস্টার বরদাবাবু কী-ই বা অপরাধ করিয়াছিলেন– কতকগুলো দুষ্ট ছেলে একটা কাণ্ড করিল, আর তাহার জন্য কিনা বেচারা বরদাবাবুর চাকরিটাই গেল। বরদাবাবু যদি মুসলমান হইতেন, তাহা হইলে স্কুলে স্বদেশীর হাট বসাইলেও গভর্নমেন্ট তাহাকে একটা খা বাহাদুরি না দিয়া ছাড়িতেন না। আর পড়াশুনা? আপনারা পাঁচজনে দেখিয়া লইবেন, যদি সাত বৎসরেও একটি ছেলে রসুলপুর হইতে এনট্রান্স পাস না করে, তথাপি আবদুল্লাহর প্রমোশন স্থগিত থাকিবে না।

যাহা হউক, আবদুল্লাহর এই সৌভাগ্যে আকবর আলী এবং আবদুল কাদের, এই দুই জন আন্তরিক সুখী হইলেন, এবং বারবার খোদার নিকট শোকর করিতে লাগিলেন। আকবর আলী কহিলেন, দেখুন খোনকার সাহেব, আপনার মুখের উপর বলাটা যদিও ঠিক নয়, তবু বলি যে, যোগ্য লোকের উন্নতি খোদা যে কোন দিক থেকে জুটিয়ে দেন, তা বলা যায় না। বাস্তবিক এখানে যার সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে, সকলেই আপনার প্রশংসা করে। বিশেষ আপনার খোশ-আখলাকে সকলেই মুগ্ধ। আপনি যাচ্ছেন বটে, খোদা করুন দিন দিন আপনার উন্নতি হোক–কিন্তু আমাদের আপনি কাঁদিয়ে যাচ্ছেন।

আবদুল্লাহ্ আজ্রকণ্ঠে কহিল, মুন্সী সাহেব, আপনি আমাকে বড্ড বেশি স্নেহ করেন বলেই এসব বলছেন…

আবদুল কাদের রহস্য করিয়া কহিল, নেও নেও; উনি স্নেহ করেন, আর আমি বুঝি করি নে? আমি কিন্তু ওয়াদা কচ্ছি, তুমি চলে গেলে এখানকার কেউ তোমার জন্য কাঁদবে না–আমিও না…

বলিতে গিয়া সত্য সত্যই আবদুল কাদেরের দুই চোখ ভরিয়া উঠিল। আবদুল্লাহ্ তাহাকে বক্ষের উপর টানিয়া ধরিয়া রুদ্ধকণ্ঠে কহিতে লাগিল, ভাই, প্রথম চাকরি পেয়ে অবধি আমরা দুজনে এক জায়গাতেই ছিলাম–বড়ই আনন্দে ছিলাম। এখন প্রমোশন পেলাম। বটে, কিন্তু তোমাদের ছেড়ে যেতে হবে, এই কথা মনে করে প্রাণটা অস্থির হচ্ছে। এ আড়াইটা বছর কী নির্ভাবনায়, কী আনন্দেই কেটে গেছে! বুঝি জীবনের এই কটা দিনই শ্রেষ্ঠ দিন গেল, এমন সুখের দিন আর হবে না, ভাই!

সন্ধ্যার কিছু পরে যখন আবদুল্লাহ্ বোর্ডিঙে ফিরিয়া আসিল, তখন দেখিল, স্কুলের অনেকগুলি ছাত্র সেখানে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। তাহাকে আসিতে দেখিয়া সেকেন্ড ক্লাসের ছাত্র সতীশ অগ্রসর হইয়া নমস্কার করিল এবং কহিল, স্যার, আপনি হেডমাস্টার হয়ে চলে যাচ্ছেন, তাতে আমরা খুব খুশি হয়েছি; কিন্তু আমাদের ছেড়ে যাচ্ছেন বলে মনে বড় দুঃখ হচ্চে। তা আমরা আপনাকে একটা address দেব বলে হেডমাস্টার মহায়শকে বললাম, কিন্তু তিনি বললেন, ওটা নাকি rule-এর against-এ। এখন আপনি যদি বলেন, তবে অন্য কোনো জায়গায় মিটিং করে আপনাকে address দিই।

আবদুল্লাহ্ কহিল, না হে, যখন ওটা rule-এর against-এ তখন ওসবে কাজ নেই। তোমরা সকলে যে আজ আমার সঙ্গে এখানে দেখা কত্তে এসেছ, এতেই address-এর চাইতে আমাকে ঢের বেশি সম্মান করা হয়েছে।

অবনী নামক আর একটি ছাত্র নিরাশাব্যঞ্জক স্বরে কহিল, তবে কি স্যার, আমাদের address দেওয়া হবে না?

এই তো দিচ্ছ ভাই আমাকে address! সভা করে ধুমধাম না কলে কি আর মনের ভালবাসা জানানো হয় না? আজ সত্যিই আমি বুঝতে পাচ্ছি, তোমরা আমাকে কতখানি ভালবাস! এই বেশ; আমার সঙ্গে তোমাদের কেমন ভাব, লোকে তা নাই-বা জানল! শুধু তোমরা আর আমি জানলাম। এই বেশ।

আবদুল্লাহর কথাগুলি ছাত্রদের মর্মে গিয়া স্পর্শ করিল-–কয়েকজন আবেগভরে বলিয়া উঠিল, থাক, স্যার, address দিতে চাই নে–তবে ভগবান করুন যেন আপনি শিগগিরই আমাদের হেডমাস্টার হয়ে আসেন।

আবদুল্লাহ্ হাসিয়া কহিল, দেখ, পাগলগুলো বলে কী! কেন, আমাদের হেডমাস্টার তো চমৎকার লোক। তিনিই ইনস্পেক্টার সাহেবের কাছে আমার জন্যে সুপারিশ করে এই চাকরি করে দিয়েছেন, এমন লোককে কি অশ্রদ্ধা কত্তে হয়!

তা হোক স্যার, আপনি গেলে আপনার মতো স্যার আমরা আর পাব না।

দেখ, তোমরা আমাকে ভালবাস বলেই এমন কথা বলছ। আমার মতো শিক্ষক পাও আর না পাও–আশীর্বাদ করি যেন আমার অপেক্ষা শত সহস্রগুণ ভালো শিক্ষক তোমরা পাও।–কিন্তু তোমাদের কথাবার্তা শুনে আমি যে বুঝতে পাচ্ছি আমি তোমাদের ভালবাসা লাভ কত্তে পেরেছি, এতেই আমার মনে যে কত আনন্দ হচ্ছে, তা বলে শেষ করা যায় না। আশীর্বাদ করি, তোমরা মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও–যে মানুষ হলে পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা কত্তে ভুলে যায়, হিন্দু মুসলমানকে, মুসলমান হিন্দুকে আপনার জন বলে মনে কত্তে পারে। এই কথাটুকু তোমরা মনে রাখবে ভাই, –অনেকবার তোমাদের বলেছি, আবার বলি, হিন্দু মুসলমান ভেদজ্ঞান মনে স্থান দিও না। আমাদের দেশের যত অকল্যাণ, যত দুঃখকষ্ট, এই ভেদজ্ঞানের দরুনই সব। এইটুকু ঘুচে গেলে আমরা মানুষ হতে পারব– দেশের মুখ উজ্জ্বল কত্তে পারব।

এইরূপ কিঞ্চিৎ উপদেশ দিয়া মিষ্ট কথায় তুষ্ট করিয়া আবদুল্লাহ্ সকলকে বিদায় দিল। যাইবার পূর্বে তাহারা জানিয়া গেল যে, আগামীকল্যই আবদুল্লাহ স্কুলের কাজ হইতে অবকাশ লইবেন এবং পরশু শুক্রবার বাদজুমা বিকালের ট্রেনে রওয়ানা হইবেন।

কিন্তু রওয়ানা হইবার সময় স্টেশনে ছাত্রদের কেহই আসিল না। আবদুল্লাহ্ মনে করিয়াছিল, তাহাকে বিদায় দিবার জন্য দুই-চারি জন ছাত্র নিশ্চয়ই স্টেশনে আসিবে, তাই প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়াইয়া উৎসুক নেত্রে এদিক-ওদিক চাহিতে লাগিল। শেষ ঘণ্টা পড়িল, তবু কেহ আসিল না। আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি আকবর আলী এবং আবদুল কাদেরের সহিত কোলাকুলি করিয়া গাড়িতে চড়িয়া বসিল।

গাড়ি ছাড়িয়া দিল।

.

২৯.

রাত্রি প্রায় ৯টার সময় বিলগাঁ স্টেশনে গাড়ি থামিল। আবদুল্লাহ জিনিসপত্র লইয়া নামিয়া পড়িল। এইখান হইতে গরুর গাড়ি করিয়া তাহাকে অনেকটা পথ যাইতে হইবে। রাত্রে গাড়িতে যাওয়া যাইবে না–একটা হোটেলে থাকিতে হইবে; পরদিন প্রাতে গাড়ি ছাড়িলে সন্ধ্যার পূর্বেই রসুলপুর পৌঁছিতে পারিবে।

স্টেশনের বাহিরেই কয়েকটা হোটেল আছে। আবদুল্লাহ্ তাহারই একটাতে গিয়া উঠিল। সঙ্গে জিনিসপত্র বেশি ছিল না, একটা তোরঙ্গ, একটা বিছানার মোট আর একটা বদনা। হাত-মুখ ধুইবার জন্য জল চাহিলে হোটেলওয়ালা একটা কুয়া দেখাইয়া দিল। আবদুল্লাহ বদনাটা লইয়া কুয়ার নিকটে গেল এবং এক বালতি জল উঠাইয়া বদনা ভরিয়া জল আনিয়া বারান্দার এক প্রান্তে ওযু করিতে বসিল। হোটেলে আরো অনেক যাত্রী ছিল; আবদুল্লাহকে ওযু করিতে দেখিয়া তাহাদের মধ্য হইতে কয়েকজন উঠিয়া ওযু করিবার জন্য কুয়ার ধারে গেল। ইতোমধ্যে আবদুল্লাহ্ ওযু সারিয়া জায়নামাজ বাহির করিল এবং হোটেল ঘরটির এক কোণে গিয়া নামাযে খাড়া হইল, ক্রমে আরো দুই-চারি জন যাত্রী ওযু করিয়া আসিয়া, কেহ তাহার দক্ষিণ পার্শ্বে, কেহ পশ্চাতে, কেহ উড়ানী, কেহ স্কন্ধস্থিত রঙিন রুমাল বিছাইয়া, নামাযে যোগদান করিল।

নামায শেষ হইতে না হইতেই খানা আসিল। প্রথমে একটা শতছিন্ন লম্বা মাদুর মেঝের উপর পাতা হইল, তাহার উপর, মাদুরের অর্ধেক ঢাকিয়া একটা খেরুয়ার দস্তরখান বিছাইয়া দিল। দস্তরখানটিতে যে কয় বেলার ডাল, সুরুয়া, ঘুসা-চিংড়ির খোসা, মাছের দুই-একটা সরু কাটা ইত্যাদি শুকাইয়া লাগিয়া রহিয়াছে, তাহার ঠিকানা নাই।

নামায শেষ করিয়া উঠিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিল, দুই-চারি জন যাত্রী খানার প্রত্যাশায় দস্তরখানে বসিয়া আছে। সেও আসিল, পার্শ্বে চিলমচি ও বদনা ছিল, হাত ধুইয়া লইল; মাদুরের কোন্‌খানটিতে বসিলে মাটি লাগিয়া কাপড় নষ্ট হইবে না, তাহা খুঁজিয়া পাইল না। অবশেষে মাটি-মাদুর নির্বিশেষে এক প্রান্তে তাহাকে বসিয়া পড়িতে হইল। দস্তরখানটির দুর্গন্ধে আবদুল্লাহ্ মনে মনে বিরক্ত হইল বটে, কিন্তু এরূপ দস্তরখানে বসা তাহার পক্ষে নূতন নহে–সচরাচর বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খাইতে গিয়া সে দস্তরখানের দুর্গন্ধে অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল। দরিদ্র মুসলমান ভদ্রলোকেরা পৈতৃক ঠাঁট বজায় রাখিতেই চেষ্টা করিয়া থাকেন; কিন্তু মানসিক নিশ্চেষ্টতার দরুন পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করিয়া চলিবার তৎপরতাটুকু তাহারা হারাইয়া বসিয়াছেন। এরূপ অবস্থায় বেচারা হোটেলওয়ালার আর অপরাধ কী!

ওদিকে যাহারা নামাযে শরিক হইয়াছিল, তাহাদের মধ্য হইতে একে একে সকলে আসিতে লাগিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি লোক টিকিয়া গেল–এদিকে সকলের খানা শুরু হইয়া গিয়াছে, কিন্তু সে লোকটি ঘাড় গুঁজিয়া তাহার রঙিন রুমালটির উপর বসিয়াই রহিল। হোটেলওয়ালা তাড়া দিয়া কহিল, নেও নেও মেয়াসাহেব, ওঠ, উদিক দে গাড়ি আস্যে পড়ল বুঝি। ওই শোন ঘণ্টা পড়তিছে।

বাস্তবিকই স্টেশনে ঘণ্টা পড়িতেছিল; কিন্তু উহা গাড়ি আসিবার ঘণ্টা নহে, রাত্রি দশটার ঘণ্টা। কিন্তু তাহা হইলেও গাড়ির ঘণ্টা পড়িবার আর বড় বিলম্ব ছিল না। বরিহাটী যাইবার গাড়ি সাড়ে দশটায় বিলগায় আসিবে। লোকটা হোটেলওয়ালার তাড়া খাইয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা শুনিয়া ঝটপট মোনাজাত করিয়া উঠিয়া পড়িল এবং দেও, দেও, জলদি খানা দেও বলিতে বলিতে দস্তরখানে আসিয়া বসিল।

হোটেলওয়ালা একটা বড় কাঠের খাঞ্চা ভরিয়া ভাত আনিল এবং কলাই-চটা এনামেলের রেকাবিগুলিতে দুই-তিন থাবা করিয়া ভাত দিয়া গেল। আর একটি লোক সবুজ রঙের লতাপাতা কাটা একটা বড় চিনামাটির পেয়ালা হইতে বেগুন ও ঘুসা-চিংড়ির ঘণ্টা থপথপ্ করিয়া খানিকটা খানিকটা দিয়া যাইতে লাগিল। একটা লোক বলিয়া উঠিল, কই মেয়াসাহেব, একটু নেমক দিলে না?

ওরে হাশেম, নেমক দিয়ে যা রে– বলিয়া হোটেলওয়ালা এক হাঁক দিল। হাশেম নামক ছোকরাটি দৌড়িয়া বাবুর্চিখানার দিকে গেল, কিন্তু একটু পরেই ফিরিয়া আসিয়া কহিল, নেমক তো নেই, বাপজী।

বলিস্ কী রে! নেমক নেই? দৌড়ে যা, দৌড়ে যা, বাজারতে এক পয়সার নেমক নে আয় বলিয়া হোটেলওয়ালা কাপড়ের খুঁট খুলিয়া একটা পয়সা বাহির করিয়া দিল। এ কার্যে অবশ্য তাহার আর হাত ধুইবার কোনো আবশ্যকতা দেখা গেল না।

এদিকে যাত্রীদিগের মধ্যে অনেকে বিনা লবণেই বিসমিল্লাহ্ বলিয়া খাইতে আরম্ভ করিয়া দিল; কিন্তু সেই অতি-নামাযী লোকটি এবং তাহার দেখাদেখি আরো দুই-এক জন কাঁধে রঙিন রুমালওয়ালা লবণ অভাবে বিসমিল্লাহ্ করিতে না পারিয়া হাত গুটাইয়া বসিয়া রহিল। প্রায় আট-দশ মিনিট পরে ছোকরাটি লবণ লইয়া ফিরিয়া আসিল এবং কাগজের ঠোঙা হইতে একটু একটু লবণ তুলিয়া পাতে পাতে দিয়া গেল। তখন রঙিন রুমালওয়ালা একটু নড়িয়া বসিয়া একটু কাশিয়া, তর্জনীটি একবার লবণের উপর চাপিয়া লইয়া সাড়ম্বরে বিসমিল্লাহ্ বলিয়া উহা জিহ্বাগ্রে ঠেকাইয়া, খানা আরম্ভ করিল।

বেগুনের সালুন দিয়া খাওয়া প্রায় শেষ হইল, যাত্রীরা ডাল এবং আরো চারিটি ভাত চাহিতেছে, এমন সময় স্টেশনে ঢং ঢং করিয়া ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল। হোটেলওয়ালা কহিল, জলদি খায়্যা লেন মেয়াসাহেবেরা, গাড়ি আস্যে পড়ল।

এ্যাঁ, খাওয়াই যে হল না! কী করি? বলিতে বলিতে পাঁচ-সাত জন উঠিয়া পড়িল। তাড়াতাড়ি হাত ধুইবার জন্য বদনা লইয়া কাড়াকাড়ি পড়িয়া গেল–কেহ-বা কুয়ার দিকে ছুটিল। হোটেলওয়ালা চিৎকার করিয়া কহিল, পয়সা তিন আনার দে যাবেন মেয়া সাহেবরা। ওরে হাশেম, পয়সাডা গুনে নিস…

হাশেম পিতার আদেশ পাইয়া দরজার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। তিন-চার জন লোক তখন হাত ধুইয়া ঘরের বাহির হইতেছিল; তাহারা ট্যাক হইতে পয়সা বাহির করিয়া গনিয়া দিয়া গেল। কিন্তু আরো কয়েকজনের নিকট হইতে পয়সা আদায় করা বাকি, তাহারা গেল। কোথায়? হোটেলওয়ালা অবশিষ্ট আহার-নিরত যাত্রীদিগকে ডাল দিতেছিল; সে কহিল, দেখ তো হাশেম, কুয়োটার কাছে, এ মেয়া-সাহেবেরা কেমন লোক? খানা খায়্যা পয়সা না দ্যেই ভাগতি চায়?

যে লোকটি হোটেলওয়ালার সহিত খাদেমি করিতেছিল, সে ইতোমধ্যে একবার বাবুর্চিখানায় যাইবার পথে কুয়ার ধারে জন তিনেক লোক ধরিয়া পয়সা আদায় করিয়া লইয়াছিল। সে ঘরে আসিয়া হোটেলওয়ালাকে কহিল, মেয়া ভাই, এই লন তিন জনের পয়সা।

হাশেম তিন জনের নিকট হইতে পয়সা আদায় করিয়াছিল। হোটেলওয়ালা গনিয়া দেখিল, সাত জন লোক উঠিয়াছে, কিন্তু পয়সা দিয়াছে ছয় জন। কোন্ লোকটা পয়সা না দিয়া পলাইল? হাশেম কহিল, যে মানুষটা শ্যাষে আইস্যা বসছিল, তারে কিন্তু আমি দেহি নাই। হোটেলওয়ালার ভাই কহিল, আমিও তো দেহি নাই! ওই মানুষটাই ভাগছে বোধ করি। মেয়া ভাই, যাই দেহি ইস্টিশনে গ্যে মানুষটারে ধরি। বলিয়াই সে চলিয়া গেল।

এদিকে সকলে খানা শেষ করিয়া উঠিয়াছে, এমন সময়ে গাড়ি আসিল। দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই আবার গাড়ি ছাড়িয়া দিল এবং তাহার একটু পরেই হোটেলওয়ালার ভাই ফিরিয়া আসিয়া কহিল, না, তারে তো ধত্তি পাল্লাম না মেয়া ভাই–বড্ড ফাঁকি দ্যে গেল।

হোটেলওয়ালার পক্ষে এরূপ ফাঁকিতে পড়া কিছু নূতন নহে। সেও তেমনি ঘণ্টা না পড়িলে লোককে ভাত দিত না; সুতরাং অনেককেই আধপেটা খাওয়াইয়া পুরা তিনগণ্ডা পয়সা আদায় করিয়া পোষাইয়া লইত। সে কেবল কহিল, ভালো রে ভালো, এমন মুসল্লি মানুষটা। ওই যে কয়, বোলে মানুষির মাথায় কালো চুল, মানুষ চেনা ভার। তা সত্যি!

প্রাতে একখানি গাড়ি ঠিক করিয়া আবদুল্লাহ্ রওয়ানা হইল। তখন কার্তিক মাস; বর্ষাকাল শেষ হইয়া গেলেও এখনো তাহার জের মিটে নাই। রাস্তার স্থানে স্থানে অনেকটা কাদা জমিয়া আছে; কাজেই গাড়ি অত্যন্ত মন্থর গতিতে চলিতে লাগিল।

এইরূপে মাঠ পার হইয়া গ্রামের ভিতর এবং গ্রাম পার হইয়া মাঠের ভিতর দিয়া। আবদুল্লাহর গাড়িখানি চলিতে লাগিল। ক্রমে বেলা দ্বিপ্রহর হইয়া আসিল দেখিয়া আবদুল্লাহ গাড়োয়ানকে কহিল, একটা বাজার-টাজার দেখিয়া গাড়ি থামানো হউক, কিছু নাশতা করিয়া লওয়া যাইবে।

গাড়োয়ান কহিল, হুমকির এই গেরামড়ার ওই মুড়োয় বাজার আছে, কাছে এট্টা ভালো পুষ্কর্নিউ আছে, পানি-টানি খাতি পারবেন।

আবদুল্লাহ কহিল, আচ্ছা তাই চল।

যে রাস্তা দিয়া আবদুল্লাহর গাড়ি চলিতেছিল, সেটি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা। রাস্তাটি বেশ চওড়া ও উচ্চ; কিন্তু সম্মুখস্থ গ্রামের ভিতর দিয়া না গিয়া বাকিয়া গ্রামের বাহির দিয়া গিয়াছে। উহার দক্ষিণ পার্শ্বে গ্রাম এবং বাম পার্শ্বে বিল। গাড়োয়ান কহিল, এ সরকারি রাস্তা দিয়া আর যাওয়া যাইবে না, কারণ বিলের ভিতর খানিকটা রাস্তা নাই, জলে একদম ধুইয়া গিয়াছে। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কায়দাই এরূপ, এক বর্ষায় রাস্তা ভাঙে, আর এক বর্ষার প্রারম্ভে মেরামত হয়। সুতরাং গ্রামের ভিতরকার সঙ্কীর্ণ পথ দিয়াই যাইতে হইবে।

গ্রামের মধ্য দিয়াই গাড়ি চলিল। পথের উভয় পার্শ্বে ঘন বসতিঘরগুলির বারান্দা। একেবারে রাস্তারই উপর। পথ এত সঙ্কীর্ণ যে একখানি গাড়ি চলিলে আর মানুষ পর্যন্ত চলিবার স্থান থাকে না। খানিকদূর গিয়াই আবদুল্লাহ্ দেখিল, সর্বনাশ! এ রাস্তাও খানিকটা ভাঙা, মধ্যে ভয়ানক গর্ত, জল-কাদায় ভরা। ভাঙন অধিক দূর লইয়া নহে, এই হাত পাঁচ-ছয় হইবে। কিন্তু পাড় এমন খাড়া যে, গাড়ি তাহার ভিতর নামানো কঠিন না হইলেও ওঠানো একরূপ অসম্ভব। এক্ষণে উপায়?

গাড়োয়ান কহিল, হুজুর, দেখতিছেন কী? এ হা্বোড়ের মদ্দি দ্যে তো গাড়ি চলবি নে।

তবে কী করা যায়?

গাড়োয়ান একটু ভাবিয়া কহিল, দেহি যদি আর কোনো পথ পাই।

গাড়িখানি ভাঙা রাস্তার কিনারায় দাঁড় করাইয়া রাখিয়া গাড়োয়ান পাড়ার মধ্যে প্রবেশ করিল। আবদুল্লাহ্ গাড়ি হইতে নামিল। সম্মুখে রাস্তার উপরেই একখানি বাড়ি; তাহার দাওয়ায় এক ব্রাহ্মণ খালি গায়ে বসিয়া ডাবা হুঁকায় তামাক খাইতেছিলেন। আবদুল্লাহ্ একটু

অগ্রসর হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, মশায়, গাড়ি যাবার কি আর কোনো পথ আছে?

ব্রাহ্মণটি একটু ঘাড় নাড়িয়া একটি উঁহুক শব্দ করিয়া ধোঁয়া ছাড়িলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, তবে কী করি, মশায়, বড়ই মুশকিল হল তো!

ব্রাহ্মণটি কোনো উত্তর করিলেন না। রৌদ্রতাপে ক্লান্ত হইয়া আবদুল্লাহর বড়ই ইচ্ছা হইতেছিল, দাওয়ার উপর উঠিয়া বসিয়া একটু বিশ্রাম করে, কিন্তু গৃহস্বামীর দুজ্ঞেয় তুষ্ণীভাব দেখিয়া আর তাহার সাহস হইল না। অগত্যা সে রাস্তার পার্শ্বেই ছাতা খুলিয়া বসিয়া ব্যগ্রচিত্তে গাড়োয়ানের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল।

কিয়ৎক্ষণ পরে গাড়োয়ান ফিরিয়া আসিয়া কহিল, হুজুর, আছে এট্টা পথ; কিন্তু সে এক ঠাহুরির বাড়ির পর দ্যে যাতি হয়। আপনি গে তানারে এট্টু করে বুলে দ্যাহেন যদি যাতি দেন।

এই কথায় কিঞ্চিৎ ভরসা পাইয়া আবদুল্লাহ গাড়োয়ানের সঙ্গে চলিল। সরুপথ দিয়া একটু গিয়াই দূর হইতে বাড়িখানি দেখাইয়া দিয়া গাড়োয়ান কহিল, ওই বাড়ি; ওই যে বটেখানা দ্যাহা যায়। আপনি যান, আমি গাড়ির কাছে থাকলাম।

আবদুল্লাহ্ গিয়া বৈঠকখানার বারান্দার উপর উঠিল। গৃহমধ্য হইতে শব্দ আসিল, কে?

আবদুল্লাহ্ কহিল, মশায়, আমি বিদেশী, একটু মুশকিলে পড়ে আপনার কাছে… বলিতে বলিতে ঘরে উঠিবার জন্য পা বাড়াইল।

টুপি-চাপকান পরিহিত অদ্ভুত মূর্তিখানি সটান ঘরের মধ্যে উঠিতে উদ্যত হইয়াছে দেখিয়া গৃহমধ্যস্থ লোকটি সত্রাসে হাঁ হাঁ, করেন কী, করেন কী, বাইরে দাঁড়ান, বাইরে দাঁড়ান বলিতে বলিতে তক্তপোশ হইতে নামিয়া পড়িলেন। আবদুল্লাহ্ অপ্রস্তুত হইয়া তাড়াতাড়ি পা টানিয়া লইয়া বারান্দায় সরিয়া দাঁড়াইলেন।

কী চান মশায়? সেই লোকটি দরজার গবরাটের উপর দাঁড়াইয়া দুই হাতে চৌকাঠের বাজু দুটি ধরিয়া, একটু রুষ্ট স্বরে এই প্রশ্ন করিলেন।

আবদুল্লাহ্ যথাশক্তি বিনয়ের ভাব দেখাইয়া কহিল, মশায় আমি গরুর গাড়ি করে যাচ্ছিলাম, গ্রামের মধ্যে এসে দেখি রাস্তার এক জায়গায় ভাঙা, গাড়ি চলা অসম্ভব। শুনলাম। মশায়ের বাড়ির পাশ দিয়ে একটা পথ আছে, যদি দয়া করে…

লোকটি রুখিয়া উঠিয়া কহিলেন, হ্যাঃ, তোমার গাড়ি চলে না চলে তা আমার কী? আমার বাড়ির উপর দিয়ে তো আর সদর রাস্তা নয় যে, যে আসবে তাকেই পথ ছেড়ে দিতে হবে…

আবদুল্লাহ্ একটু দৃঢ়স্বরে কহিল, মশায়, বিপদে পড়ে একটা অনুরোধ কত্তে এসেছিলাম, তাতে আপনি চটছেন কেন? পথ চেয়েছি বলে তো আর কেড়ে নিতে আসি নি। সোজা বললেই হয়, না, দেব না!

ওঃ, ভারি তো লবাব দেখি! কে হে তুমি, বাড়ি বয়ে এসে লম্বা লম্বা কথা কইতে লেগেছ?

লম্বা কথা কিছু কই নি মশায়, একটু অনুগ্রহ প্রার্থনা কত্তে এসেছিলাম। থাক, আপনাকে আর কোনো অনুগ্রহ কত্তে হবে না, মেজাজও খারাপ কত্তে হবে না–আমি বিদায় হচ্চি।

লোকটা গজর গজর করিতে লাগিল। আবদুল্লাহ্ ফিরিয়া চলিল। তাহাকে বিষমুখে ফিরিতে দেখিয়া গাড়োয়ান কহিল, দেলে না বুজি? আমি জানি ও ঠাহুর ভারি ত্যান্দোড়। তবু আপনারে একবার যাতি কলাম, ভদ্দরলোক দেখলি যদি যাতি দেয়।

আবদুল্লাহ্ কহিল, এস, এক কাজ করা যাক। জিনিসপত্তর গাড়ি থেকে তুলে নিয়ে দেও গাড়ি নামিয়ে। তুমি এক চাকা ঠেল, আমি এক চাকা ঠেলি–গরুও টানুক, তা হলে গাড়ি ঠিক উঠে যাবে।

গাড়োয়ান একটু ইতস্তত করিয়া কহিল, আপনি এই হাবোড়ের মদ্দি নামবেন হুজুর?

তা কী করব! দায়ে ঠেকলে সবই কত্তে হয়। নেও আর দেরি কোরো না। এই বলিয়া আবদুল্লাহ বিছানা খুলিয়া একটা ময়লা ধুতি বাহির করিল, এবং পোশাক ছাড়িয়া মালকোচা মারিল। গাড়োয়ান তোরঙ্গ এবং বিছানা গাড়ি হইতে উঠাইয়া রাস্তার কিনারায় রাখিয়া দিয়া একটা গরুর লেজ মলিয়া এবং অপর একটার পিঠে পাঁচনবাড়ি কসিয়া র্‌-র্‌-র্‌ হেট্‌-হেট্‌ করিতে করিতে গাড়ি চালাইয়া দিল। ভাঙনের সেই খাড়া পাড়ের উপর দিয়া গাড়িখানা ধড়াস্ করিয়া কাদার ভিতর নামিয়া অনেকখানি বসিয়া গেল।

গরু দুটি একবার ডাইনে, একবার বায়ে আঁকিয়াৰ্বাকিয়া অগ্রসর হইবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু কাদা প্রায় তাহাদের বুক-সই; তাহার ভিতর হইতে পা টানিয়া উঠানো দুষ্কর হইয়া পড়িল। আবদুল্লাহ্ গাড়োয়ানের সহিত একযোগে প্রাণপণে চাকা ঠেলিতে লাগিল। কিন্তু ওপারেও তেমনি খাড়া পাড়, গাড়ি কিছুতেই উঠাইতে পারিল না। গরু দুইটা তো পূর্ব হইতেই ক্লান্ত হইয়াছিল; এক্ষণে ক্রমাগত লেজমলা এবং পাঁচনবাড়ি খাইতে খাইতে মৃতপ্রায় হইয়া সেই কাদার উপরেই শুইয়া পড়িল। গাড়োয়ান চিৎকার করিয়া উঠিল, হুমুন্দির গরু আবার বজ্যাত্তি লাগাল দ্যাহো! এবং আবার মারিবার জন্য ভীষণ আস্ফালনের সহিত পাঁচনবাড়ি উঠাইল। আবদুল্লাহ্ তাহাকে নিরস্ত করিবার জন্য তাড়াতাড়ি কহিল, আরে কর কী, মরে যাবে যে! আর পারেই-বা কত? মেরো না ওদের, এক কাজ কর। দেখ যদি দুই চার জন লোক পাওয়া যায়। পয়সা দেবখন–যা চায় তাই দেব বলে নিয়ে এসো।

গাড়োয়ান কহিল, এ হেঁইর গাঁ, এহানে কি মুনিষ্যি পাওয়া যাবি? যে গেরামডা এই পাছে থুয়ে আলাম, স্যানে পাওয়া গেলিউ যাতি পারে।

তবে তাই যাও, দেরি কোরো না।

গাড়োয়ান চলিয়া গেল। আবদুল্লাহ্ কাদা ঠেলিয়া উঠিয়া আসিল এবং ছাতাটি খুলিয়া সেই ব্রাহ্মণের দাওয়ার সম্মুখে রাস্তার উপরেই বসিয়া পড়িল।

ব্রাহ্মণটি উঠিয়া গিয়াছিলেন; কিছুক্ষণ পরে পান চিবাইতে চিবাইতে ডাবা হাতে আবার বাহিরে আসিয়া বসিলেন। আবদুল্লাহ্ ঘাড় ফিরাইয়া তাহাকে একবার দেখিয়া লইল, কিন্তু কোনো কথা কহিল না।

এদিকে দ্বিপ্রহর গড়াইয়া গিয়াছে–ক্ষুধায়, শ্রান্তিতে ও উদ্বেগে আবদুল্লাহ্ অস্থির হইয়া উঠিল। গাড়োয়ানের ফিরিতে কত দেরি হইবে, কে জানে? আবদুল্লাহ্ পথের দিকেই চাহিয়া আছে। অবশেষে প্রায় অর্ধঘণ্টা পরে দূর হইতে তিন-চারি জন লোক আসিতেছে দেখা গেল। গাড়োয়ান লোক লইয়া ফিরিতেছে মনে করিয়া আবদুল্লাহর ধড়ে যেন প্রাণ আসিল। ক্রমে তাহারা নিকটবর্তী হইলে আবদুল্লাহ্ দেখিল সে-ই বটে, তিনজন লোক সঙ্গে।

তাহারা আসিয়া কাদার ভিতর নামিয়া পড়িল। আবদুল্লাহ্ নামিবার উপক্রম করিতেছিল, কিন্তু তাহারা কহিল, আপনি আর নামবিন ক্যান হুজুর? আমরাই ঠেলে দি তুলে–আপনি বসেন। গরু দুইটি কাদার ভিতর শুইয়া শুইয়া এতক্ষণে একটু বিশ্রাম করিয়া লইয়াছে। গাড়োয়ানের পাঁচনবাড়ির দুটা খোঁচা খাইয়াই তাহারা উঠিয়া পড়িল। চার জন লোকে চাকা ঠেলিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ি ওপারে তুলিয়া ফেলিল। আবদুল্লাহর জিনিসপত্রগুলিও তাহারা তথায় মাথায় করিয়া পার করিয়া দিয়া আসিল।

আবদুল্লাহ্ তাহাদিগকে কহিল, তোমরা আজ আমার বড় উপকার কল্লে বাপু না হলে আমার যে আজ কী উপায় হত তার ঠিক নেই। এদের কত দেবার কথা আছে। গাড়োয়ান?

গাড়োয়ান কহিল, আমি পুস্ কছিলাম, কত লেবা; তা ওরা কলে খুশি হয়ে যা দেন, আমরা আর কী কব!

আবদুল্লাহ্ একটি টাকা বাহির করিয়া দিল। তাহারা খুশি হইয়া সালাম করিয়া চলিয়া গেল।

যাইবার পূর্বে আবদুল্লাহ্ সেই ডাবা-প্রেমিক ব্রাহ্মণটির দিকে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল ঠাকুরমশায় তাহাদের দিকেই তাকাইয়া আছেন এবং সুস্থচিত্তে ধূমপান করিতেছেন।

.

৩০.

মগরেবের কিঞ্চিৎ পূর্বে মীরসাহেব মসজিদে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া বাহিরে আসিয়াছেন, এমন সময় দুইটি লোক বৈঠকখানার বারান্দা হইতে নামিয়া আসিয়া একেবারে তাহার পা জড়াইয়া করুণস্বরে চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, আমাগোর সর্বনাশ হয়ে গেছে হুজুর, এ্যাঁহোন আপনি যদি বাঁচান তো বাঁচি!

হঠাৎ এইরূপ আক্রান্ত হইয়া মীরসাহেব ত্রস্তভাবে পা টানিয়া লইলেন এবং কহিলেন, আর কে? বসির মাঝি? কী, কী, হয়েছে কী?

বসির কহিল, আর কী হবে হুজুর, সর্বনাশ হয়ে গেছে, আর কী কব! লাও ডুবে গেছে, খোদা জানডা বাঁচাইছে, আর কিস্সু নেই!

এ্যাঁ! নৌকো ডুবে গেছে? কোথায়? কেমন করে ডুবল?

ম্যাগনায়। পাট বোজাই করে নে যাতিছেলম, আটশো ট্যাহার পাট হুজুর! আমার যথাসর্বিশ্যি, হুজুর! অইন্দে গোনে এট্টা বাকের মুহি মস্ত এট্টা ইষ্টিমার আস্যে পড়ল, সামাল দিতে পাল্লাম না! লার পর দে চলে গেল, সোতের মুহি সবই ভাইসে গেল!

মীরসাহেব পরম দুঃখিত চিত্তে বলিয়া উঠিলেন, ওহো!

বসির চক্ষের জলে বক্ষ ভাসাইয়া কহিতে লাগিল, হুজুর, কিস্সু বাঁচাতি পালাম না! গহিন গাঙ, তাতে আঁদার রাত, লারও ঠিকানা কত্তি পালাম না। কমে ভাইসে গেল কিছুই ঠাওর করি পালাম না! এ্যাঁহোন উপায় কী হুজুর? আমার যে আর কিসু নেই।

মীরসাহেব গভীর সহানুভূতির সহিত কহিলেন, তাই তো বসির! তোমার তো বড়ই বিপদ গেছে দেখছি। বলিয়া বৈঠকখানার তক্তপোশের উপর উঠিয়া বসিলেন। বসির এবং তাহার সঙ্গের লোকটিও বারান্দায় উঠিয়া একটু দূরে মাটির উপর বসিয়া পড়িল।

বসিরের সঙ্গের লোকটি তাহার নৌকার একজন মাল্লা। সে কিয়ৎক্ষণ গালে হাত দিয়া বসিয়া চিন্তাকুলভাবে আপন মনে কহিতে লাগিল, নাইয়ার নাও গেল, মাহাজোনের ট্যাহা। গেল, হের লাইগা কিসু না; কিন্তু–উ কাণ্ডহান অইল কী?

বসির কহিল, এ্যাঁহোন আমি লাইয়্যারেই বা কী বুজ দি, আর হুজুরির ট্যাহারই বা কী করি! আমি ধোনে-পরানে মলাম রে আল্লাহ্!

মীরসাহেব কহিলেন, আমার টাকার জন্য তুমি ভেবো না, বসির। তোমার সঙ্গে আমার অনেক দিনের কারবার! তোমাকে সৎ লোক বলেই জানি। তুমি তো আর ইচ্ছে করে আমার টাকা মার নি! খোদার মরজি সবই–তার উপর তো কারুর কোনো হাত নেই।

এমন সময় একখানি গরুর গাড়ি করুণ কাতর রবে ক্লান্ত মন্থরগতিতে আসিয়া মীরসাহেবের বাড়ির সম্মুখে দাঁড়াইল। আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি গাড়ি হইতে নামিয়া আসিল, মীর সাহেবও বৈঠকখানার বারান্দা হইতে নামিয়া আসিতে আসিতে কহিলেন, এস এস, বাবা; এত দেরি যে?

আবদুল্লাহ্ কদমবুসি করিয়া কহিল, পথে একটা মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলাম–তা পরে বলবখন। আমার চিঠি পেয়েছিলেন?

হ্যাঁ, আজ সকালেই পেয়েছি। বড় খুশি হলাম যে তুমি আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে এলে তোমার পত্র পড়ে অবধি খোদার কাছে হাজার হাজার শোকর কচ্ছি।

তবিয়ত ভালো তো?

হ্যাঁ, বাবা, ভালোই আছি।

আমি মনে করেছিলাম হয়তো আপনি বাড়িতে নেই…

না থাকবারই কথা বটে–কিন্তু থেকে যেতে হয়েছে। বোধ করি তুমি আসবে বলেই খোদা আমাকে বাড়ি থেকে বেরুতে দেন নি। বলিয়া মীরসাহেব স্মিতমুখে আবদুল্লাহর স্কন্ধে হাত দিলেন।

আবদুল্লাহ্ও হাসিমুখে কহিল, তা বেশ হয়েছে, আপনি আছেন, ফুপাজান! নইলে আমার ভারি অসুবিধে হত।

মীর সাহেব কহিলেন, এস, ঘরে এস। নামাযটা পড়ে নি। ওযুর পানি চাই?

জি না, পথেই আসর পড়ে নিয়েছি। ওযু আছে।

অতঃপর মীরসাহেব গাড়োয়ানকে জিনিসপত্র তুলিয়া রাখিতে বলিয়া এবং বসিরকে বসিবার জন্য ইশারা করিয়া আবদুল্লাহকে লইয়া নামায পড়িবার জন্য বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন। উলফৎ কিঞ্চিৎ পূর্বে আলো দিয়া গিয়াছিল।

নামায বাদ মীর সাহেব অন্দরে গিয়া আবদুল্লাহর জন্য কিঞ্চিৎ নাশতার বন্দোবস্ত করিতে বলিয়া আসিলেন। একটু পরেই একটা বাঁদী নাশতার খাঞ্চা চিলমচি, বদনা দস্তরখানা প্রভৃতি একে একে লইয়া আসিল। মীরসাহেব খানপোষ উঠাইয়া ফেলিলেন; খাঞ্চার উপর এক রেকাবি সমুসা, এক তশতরি কুমড়ার মোরব্বা, এক তশতরি আণ্ডার হালুয়া ছিল, তিনি সেগুলি একে একে দস্তরখানে সাজাইয়া দিলেন।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আপনিও আসুন, ফুপাজান…

আমার তো এ সময়ে খাওয়া অভ্যাস নেই–তবে বসি তোমার সঙ্গে একটু–এই বলিয়া মীরসাহেব আবদুল্লাহর সহিত নাশতা করিতে বসিয়া গেলেন।

ফুপাজান তো একলা মানুষ; তবে এসব নাশতা কোথা হইতে আসিল? আবদুল্লাহর কৌতূহল হইল; সে জিজ্ঞাসা করিল, এগুলো কে তয়ের করেছে; ফুপাজান?

মীর সাহেব কহিলেন, কেন, ভালো হয় নি?

না, না, ভালো হবে না কেন? বেশ চমৎকার হয়েছে। তবে আপনার এখানে এসব নাশতা তয়ের করার তো কেউ নেই, তাই জিজ্ঞেস কচ্ছিলাম…

মীর সাহেব একটু হাসিয়া কহিল, ওঃ, তা বুঝি জান না? আমার এক আম্মা এসেছেন যে!

কে? ভাবী সাহেবা?

না মালেকা, আমার ছোট আম্মা।

কবে এলেন তিনি?

এই কদিন হল। মইনুদ্দীন মারা গেছে তা বোধহয় জান…

কই না! কবে?

এই পূজার ছুটির কদিন আগেই। হঠাৎ কলেরা হয়েছিল।

আবদুল্লাহ্ কেবল একবার অহো! বলিয়া অত্যন্ত বিষমুখে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।

মীর সাহেব বলিতে লাগিলেন, মেয়েটা বিধবা হয়ে একেবারে নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছিল– বুবুও তো আর নেই যে তার কাছে এসে থাকবে…

কেন, ভাসুর বুঝি জায়গা দিলেন না?

দিয়েছিলেন; কিন্তু দুই জায়ে বনল না। কাজেই তিনি বাধ্য হয়ে মালেকাকে আবদুল খালেকের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

কেন, বনল না কেন? মালেকার তো ছেলেপিলে নেই, নির্ঝঞ্ঝাট…

সে জন্যে না; অত বড় ঘরের মেয়ে–সৈয়দজাদী, বাপ জমিদার আবার সজজ– জজিয়তিও মধ্যে মধ্যে করে থাকেন তিনি কি আর সামান্য গেরস্তের মেয়ের সঙ্গে ঘর কত্তে পারেন?

হ্যাঁ, তা ঠিক ফুপাজান! শুনেছি তিনি স্বামীকেও বড় একটা কেয়ার করেন না…

আরে কেয়ার করা তো দূরের কথা; তিনি স্বামীর কথায় নাকি বলে থাকেন, ওঃ এ্যাঁয়সা ডিবৃটি কেত্তা মেরা বাপকা জুতা সাফ কবৃনে কে লিয়ে রাখৃখা গিয়া হায়!

বটে? তবে তো মহীউদ্দিন সাহেব খুব সুখেই ঘর কচ্ছেন!

হ্যাঁ! সুখ বলে সুখ? বাড়িতে তিনি যে কী হালে থাকেন, তা শুনলে কান্না আসে। তার বাসন, পেয়ালা, গেলাস, বদনা সব আলাদা। তিনি যে গেলাসে পানি খান, বিবি সাহেব সে গেলাস ছোঁনও না…

এতদূর!

এই বোঝ! মস্ত ভয়ঙ্কর বড় ঘরের মেয়ে–স্বামী হলেই-বা কী, তার সঙ্গে তুলনায় সে তো ছোটলোক।

আবদুল্লাহ একটু ভাবিয়া কহিল, মহীউদ্দিন সাহেব তো নিতান্ত যে-সে লোক নন। বেশ খাস সম্পত্তি আছে, পুরোনো জমিদারের ঘর–তার উপর ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, –এতেও যদি তিনি ছোটলোক হলেন, তবে ও বিবি সাহেবের তুল্য স্বামী পেতেন কোথায়? আর যদি এতই ছোটলোক বলে ওঁরা বিবেচনা করেন, তবে বিয়ে না দিলেই হত!

বিয়ে দিয়েছিলেন মহীউদ্দিনের বাপ অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে–বড় ঘরে ছেলের বিয়ে দিয়ে কৃতার্থ হবেন, সেই জন্য আর কি! জজ সাহেবও দেখলেন, এমন ছেলে আর পাবেন। না, কাজেই তিনি রাজি হয়ে গিয়েছিলেন।

আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, বেচারা মহীউদ্দিন সাহেবের জন্যে বড় দুঃখ হয়।

মীর সাহেব কহিলেন, বরাতে দুঃখু থাকলে আর কে কী করবে বল! সে কথা থাক, এখন মালেকার একটা গতি করতে হয়, তাই ভাবছি।

কী কত্তে চান?

ফের বিয়ে দেব, মনে কচ্ছি।

বিয়ে দেবেন? ছেলে পাবেন কোথায়? বিধবার বিয়ের কথা শুনলে সব্বাই শিউরে উঠবে এক্কেবারে!

সত্যিই তাই। আমি আলতাফের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব করিয়েছিলাম। আলতাফ রাজি আছে, কিন্তু তার বাপ শুনে একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিল…

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা তো উঠবেনই! আমাদেরও ক্রমে হিন্দুদের দশা হয়ে উঠল আর কি! ভালো মানুষের বিশেষ করে গরিব ভালো মানুষের ঘরে তো আজকাল বিধবাদের বিয়ে হয়ই না।

মীর সাহেব কহিলেন, ও তো হিন্দুদের দেখাদেখি। আর জাত্যাভিমানও আছে। বিধবাদের কথা ছেড়ে দাও, কত আইবুড়ো মেয়েরই বিয়ে হচ্ছে না। এই দেখ না, আমাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই কত মেয়ের বয়স ত্রিশ বছর পার হয়ে গেল, বিয়ে হচ্ছে না। এরা আলমগীর বাদশার অবতার হয়ে এসেছেন কিনা, শাহ্জাদা পাচ্ছেন না, কাজেই শাহজাদীদের বিয়ে হচ্ছে না।

আবদুল্লাহ্ কহিল, আমার শ্বশুর একদিন কার বিয়ের কথায় বলছিলেন, শরীফজাদীর বিয়ের জন্যে আবার এত ভাবনা কেন? না হলেই-বা কী?

চিরকাল আইবুড়ো থাকবে?

তাঁর মতে থাকলেও দোষ নেই–শরাফতির ভেলায় চড়ে ভবসিন্ধু পার হয়ে যাবে।

মীর সাহেব একটু হাসিয়া কহিলেন, খোদা করে যেন সব শরীফজাদীই ওই রকম করে ভবসিন্ধু পার হয়ে যান; তা হলে শরীফগোষ্ঠী নিপাত হবে শিগগির, মুসলমান সমাজও নিস্তার পাবে।

উভয়ে হাসিতে লাগিলেন। মীর সাহেব আবার কহিলেন, দেখ সমাজে বিয়ে-থাওয়া কয়েকটা নির্দিষ্ট ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ–তার বাইরে কথা উঠলে মুরব্বিরা আপত্তি করে বলেন, ওদের সঙ্গে কোনো পুরুষে হসব-নসব নেই। অর্থাৎ যাদের সঙ্গে ইতিপূর্বে হসব নসব হয় নি, তারা যেন সবই অ-জাত! এই রকম করে কেবল আপনা-আপৃনির মধ্যেই শাদি-বিয়ে অনেক পুরুষ ধরে চলে আসছে। আর তার ফলে শারীরিক, মানসিক, সব রকম অধঃপাত হচ্চে। শাদি-বিয়ে যত বাইরে বাইরে হবে, বংশাবলি ততই সতেজ হবে। তাই বলে এমন কথা বলি নে যে ভদ্রঘরের ছেলে-মেয়ের সঙ্গে হেলো-চাষার ছেলে-মেয়ের বে থা হোক। দেখতে হবে মানসিক হিসাবে বিশেষ কোনো তফাত না থাকে। মনে কর, তিন চার পুরুষ আগে যারা চাষা ছিল, আজ তাদের বংশে লেখাপড়ার চর্চা হয়েছে, অবস্থা ফিরেছে, স্বভাব-চরিত্র ভালো, বড় বড় সমাজে আমাদের সঙ্গে সমানভাবে মেলামেশা কচ্চে, তাদের সঙ্গে হসব-নসবে কোনো দোষ হতে পারে না। এক কালে চাষা ছিল বলে যে রোজ কেয়ামত পর্যন্তই তাদের বংশ ঘৃণিত হয়ে থাকবে, তার কোনো মানে নেই। আর যারা নতুন উন্নতি কচ্চে, তাদের সঙ্গে রক্তের সংমিশ্রণ হলে আজ-কালকার শরীফজাদাদের নিস্তেজ রক্ত একটু সতেজ হয়ে উঠবে–আর এদের বংশানুক্রমিক উৎকর্ষেরও কিছু ফল ওরা পাবে– সুতরাং উভয় পক্ষেরই লাভ।

আবদুল্লাহ্ কহিল, কিন্তু বিলেতের মতো সভ্য দেশেও লর্ড ফ্যামিলির লোকেরা সাধারণ লোকের সঙ্গে ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিতে চায় না।

মীর সাহেব কহিলেন, জাত্যাভিমান তাদের মধ্যেও আছে। কিন্তু তাদের আছে বলেই যে সেটা ভালো বলে মেনে নিতে হবে, তার কোনো মানে নেই। যখন দেখতেই পাচ্ছি আমাদের নিজেদের সমাজে এই রকম আপনা-আপনির ভিতর বিবাহের ফল ভালো হচ্ছে না, অনেক স্থলেই সন্তান রোগা, নিস্তেজ, বোকা এইসব হচ্চে আর যেখানেই একটু বিভিন্ন রক্তের সংমিশ্রণ হচ্ছে, প্রায়ই সেখানে দেখতে পাই সন্তান সতেজ, সবল এবং মেধাবী হয়ে ওঠে, তখন আর কোনো যুক্তিই মানতে চাই না। আবার দেখ, মুরব্বিদের। মুখে শুনেছি, সেকালে নাকি বাড়ি বাড়ি লোকজনে ভরা ছিল, তারা বলেন, দুনিয়া আখের হয়ে এসেছে, তাই এখন সব বিরান হয়ে উঠছে! লোকসংখ্যা যে মোটের উপর বাড়ছে, সেটা তারা খেয়াল করেন না; শরীফদের ঘর উজাড় হয়ে আসছে, এইটেই কেবল লক্ষ্য করেন। তা উজাড় তো হবেই! মেয়েগুলোকে কেউ কেউ আইবুড়ো করে রাখেন আর নিতান্তই বে দেন তো সে আপনা-আপনির মধ্যে, যার ফল ভালো হয় না–বিধবা হলে। আর বে দেবেন না; এত করে আশরাফ সমাজে লোক বাড়বে কী করে? এ আশরাফ সমাজের আর মঙ্গল নেই। আর দুই-এক পুরুষের মধ্যেই এঁদের দফা শেষ হবে; আর এখন যাদের দেখে এঁরা নাক সিটকাচ্ছেন, তারাই তখন মানুষ হয়ে তাদের সমাজকেই বড় করে তুলবে।

আবদুল্লাহ্ কহিল, সে কথা ঠিক, ফুপাজান। এই তো দেখতে পাই, কলকাতার মেসগুলোতে আমাদের এদিককার যত ছাত্র আছে, তার মধ্যে আশরাফ সমাজের ছেলে খুবই কম। লেখাপড়া শিখে ওরা যখন মানুষ হবে তখন এঁরা কোথায় থাকবেন?

সাএলের দলে গিয়ে ভিড় বাড়াবেন। এখনো যদি এঁরা জাত্যাভিমান ছেড়ে, অন্যান্য উন্নতিশীল সমাজের সঙ্গে হসব-নসব কত্তে আরম্ভ করেন, তা হলে এঁদের বংশের উন্নতি হতে পারে। নইলে ক্রমেই অধঃপাত! যাক সে কথা বলছিলাম মালেকার বিয়ের কথা। বাদশাহ্ মিয়া তো কিছুতেই রাজি হবেন না। ভাবছি কোনো উপায় কত্তে পারি কি না। আলতাফ ছেলেটা ভালো; বি-এ পাস করেছে, ল পড়ছে। বারে বেশ শাইন কত্তে পারবে। দেখি যদি একান্ত না হয় অন্য কোথাও চেষ্টা কত্তে হবে। তুমিও একটু সন্ধানে থেকো, বাবা।

আবদুল্লাহ্ কহিল, জি আচ্ছা, তা দেখব। তবে আশরাফ সমাজে ছেলে পাওয়া যাবে বলে বোধ হয় না…

নাই-বা হল আশরাফ সমাজে। ছেলে ভালো, সচ্চরিত্র, সুস্থ, সবল–বাস, আর কোনো সিফাৎ চাই নে। ডিপুটি তমিজউদ্দিনের কথা শুনেছ তো? তার বাপ তো সুপারি, নারকোল, তরিতরকারি মাথায় করে নিয়ে হাটে বেচতেন। ছেলে যখন বি-এ পাস কল্লে, তখনো তিনি তার নিজের ব্যবসায় ছাড়েন নি। হাইকোর্টের উকিল আবদুল জলিল ছেলেটাকে ভালো দেখে নিজের কাছে রেখে লেখাপড়া শিখিয়ে ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট করে নিজের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। তমিজউদ্দিন মারা গেছেন, তার ছেলে বদরউদ্দীন এখন ওকালতি কচ্ছেন, দিব্বি পসার। দেখ তো, একটা নিম্নস্তরের পরিবারের কেমন ধা করে উন্নতি হয়ে গেল! আর ওই ছেলে যদি ওই সহানুভূতিটুকুর অভাবে লেখাপড়া শিখতে না পেত তবে বাঙ্গালাদেশে তো আজ একটা উন্নত পরিবার কম থেকে যেত! ওসব শরাফতের মোহ ছেড়ে দেও বাবা। ছেলে ভালো পাও আমাকে এনে দেও, তা সে যেমন। ঘরেরই হোক না কেন। কেবল দেখা চাই, ছেলেটি সুস্থ, সচ্চরিত্র আর কর্মক্ষম কি না– বাস্…

আর লেখাপড়া?

হ্যাঁ, সেটা তো চাই-ই…

তবে আপনি বংশটা একেবারেই দেখবেন না? মনে করুন এমনও তো হতে পারে যে, ছেলেটি সব বিষয়ে ভালো, কিন্তু তাদের পরিবারের মধ্যে লেখাপড়ার চর্চা নেই, culture নেই, নিম্নশ্রেণীর লোকের মতনই তাদের চাল-চলন–কেবল ছেলেটি লেখাপড়া শেখবার সুযোগ পেয়ে বি-এ পাস কত্তে পেরেছে। তার সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিলে তো মেয়েকে নিতান্ত হীন সংস্রবে জীবন কাটাতে হবে…

মীর সাহেব কহিলেন, আমি কি আর সে কথা ভেবে দেখি নি বাবা? তেমন ঘরের কথা আমি বলছি নে। অবশ্য তাও দোষের হয় না যদি ছেলেটি পরিবার থেকে আলাদা হয়ে থাকে–যেমন ধর, তাকে যদি সারাজীবন চাকরিতে বা ব্যবসায় উপলক্ষে বিদেশে বিদেশে কাটাতে হয়। আর তা ছাড়া শিক্ষিত লোকের মধ্যে আজকাল একটা tendency দেখা যাচ্ছে। পরিবারের একান্নবর্তিতা ভেঙে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হয়ে থাকবার দিকে। কাজেই তেমন ক্ষেত্রে মেয়েকে কোনো অসুবিধায় পড়বার কথা নয়। যেখানে পরিবার একান্নবর্তী সেখানে অবশ্য। কেবল ছেলে দেখলে চলে না, এ কথা মানি। তবে কবরের ওপারের দিকে তাকাবার আমি কোনো দরকার দেখি না…

আবদুল্লাহ্ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কবরের ওপারে কী রকম?

মীর সাহেব কহিলেন, অর্থাৎ যারা আছে, তাদের দেখ, তাদের পূর্বপুরুষরা কী ছিল না ছিল দেখবার দরকার নেই…

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা না দেখলে কি যারা আছে তাদের চরিত্র, চালচলন সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়?

কেন যাবে না? তাদের একটু study করে দেখে নিলেই হল। তা ছাড়া তুমি কি মনে কর ঘরানা হলেই চরিত্র, চালচলন ভালো হবে? স্ত্রীকে ধরে মারে এমন হতভাগা শরীফজাদা কি নেই?

আবদুল্লাহ্ কহিল, তা তো বটেই।

তবে বুঝেই দেখ, যে ছেলেটিকে চাই, তাকে আর তার immediate environment, কেবল এই দেখব; তার ওদিকে দেখব না…! তুমি একটু বস বাবা–বাইরে দুটো লোক বসিয়ে রেখে এসেছি, তাদের বিদায় করে আসি… এই বলিয়া মীর সাহেব উঠিয়া বাহিরে আসিলেন, এবং কহিলেন, দেখ বসির, তোমার ও টাকা আমি মাফ করে দিলাম। যখন ডুবেছে, তখন তোমারও গেছে, আমারও গেছে। তা যাক্‌ তুমি কাল এসো; যদি খোদা তোমাকে দেয়, তবে ও টাকা শোধ কোরো। কিছু টাকা দেব, ফের কারবার কোরো। এখন রাত হল, বাড়িতেও মেহমান। তোমরা আজ এস গিয়ে।

৩১-৩৫. সৈয়দ সাহেব

সৈয়দ সাহেব যেদিন সালেহাকে বরিহাটী হইতে লইয়া আসেন, সেদিন আবদুল্লাহ্ অন্তরে অন্তরে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হইলেও মুখে কোনো কথাই কহে নাই। সালেহা যখন বিদায়ের জন্য কদমবুসি করিয়াছিল, তখন আবদুল্লাহ হতভম্বের মতো দাঁড়াইয়াই ছিল। সালেহা একবার সজল করুণ-দৃষ্টি তুলিয়া আবদুল্লাহর মুখপানে চাহিতেই আবদুল্লাহর চোখ দুটি ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। গও বাহিয়া দুই ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়াইয়া পড়িয়াছিল। সালেহা তাহা দেখিয়া আর সেখানে দাঁড়াইতে পারে নাই। ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িয়াছিল। একটু পরেই নিজেকে কঞ্চিৎ শান্ত করিয়া সে আবার সেই ঘরে ঢুকিয়াছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ্ তখন বাহিরে চলিয়া গিয়াছিল। কাজেই আর সাক্ষাতের সুবিণ হয় নাই।

এই করুণ বিদায়ে সালেহার বুকের ভিতরটায় যেন একবার কাপিয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু সে-কম্পন আসন্ন বিরহের ব্যথার কম্পন নহে। তাহার অপেক্ষাও গভীর অজ্ঞাত অকল্যাণের একটা আতঙ্ক-কম্পন। স্বতঃই তাহার মনে হইয়াছিল, কোথায় কী যেন বাকি রহিয়া গেল। কী যেন প্রাণের বস্তুকে এইখানেই বিসর্জন দিয়া গেল। বরিহাটীতে কিছুদিন একসঙ্গে বাস করার ফলে সালেহা যেন একটু বদলিয়া গিয়াছিল। পিতার আদেশ অমান্য করার মতো শিক্ষা বা মন তাহার ছিল না; তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাহাকে পিতার অনুবর্তিনী হইতে হইয়াছিল।

যাহা হউক, ১০০ টাকা বেতনে হেডমাস্টার হওয়ার সংবাদ পাইয়া আবদুল্লাহ্ মনে মনে ঠিক করিয়া ফেলিল যে, রসুলপুর পৌঁছিয়াই সে সালেহাকে তথায় আনিয়া তাহার মনোমতো করিয়া শিক্ষা দিতে চেষ্টা করিবে। বরিহাটীতে সালেহার কথাবার্তায় এবং চলাফেরায় আবদুল্লাহর বেশ প্রতীতি জন্মিয়াছিল যে, হয়তো শিক্ষা দিলে সালেহা তাহা গ্রহণ করিতে পারিবে।

স্কুলের কাজকর্ম ভালোরূপে বুঝিয়া পড়িয়া লইয়া আবদুল্লাহ্ এ সম্বন্ধে মীর সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া আগামী বড়দিনের বন্ধে সালেহাকে লইয়া আসাই সাব্যস্ত করিয়া ফেলিল।

আবদুল্লাহর মা মীর সাহেবের বাড়িতে থাকিতে কখনই রাজি হইলেন না, কারণ মীর সাহেব সুদের সংস্রবে আছেন। অতএব সাব্যস্ত হইল যে মীর সাহেবের একটি রায়তের। বাড়ির সীমানায় বিঘাখানেক জমি আবদুল্লাহকে দেওয়া হইবে। শীঘ্রই সেখানে ঘর-দরজা তৈয়ার করিয়া একটি ছোট বাসা নির্মিত হইল।

মায়ের অনুমতি ব্যতিরেকে কিছুই করা উচিত হইবে না, তাই স্কুল বন্ধ হইবার দিনই সন্ধ্যায় রওয়ানা হইয়া পরদিন দ্বিপ্রহরে আবদুল্লাহ আসিয়া পীরগঞ্জে পৌঁছিল। পুত্র বি-এ পাস। করিয়া এখন ১০০ টাকা বেতনের চাকরি পাইয়াছে, ভবিষ্যতে ৪০০-৫০০ টাকা বেতনের আশা আছে। আজ আবদুল্লাহ্ বাড়ি পৌঁছায় তার মুখচন্দ্রের পানে চাহিয়া আবদুল্লাহর মার প্রাণ আহ্লাদে নাচিয়া উঠিল, তার বুক গর্বে ও আনন্দে স্ফীত হইয়া উঠিল। আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেও বুঝি কোনো মানুষের এতখানি হয় না। আজীবন অভাব-অনটনে কাটিয়াছে। কত সাধ, কত আশা অঙ্কুরেই শেষ হইয়াছে। শৈশবের, কৈশোরের, যৌবনের কত অপূর্ণ আশা-আকাঙ্ক্ষার একটি জ্বলন্ত চিত্র চকিতে তাহার মানসপটে ফুটিয়া উঠিয়া সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর কথা মনে পড়িল। তার আজিকার এই আনন্দের অংশীদার কোথায় কোন অজানা দেশে চলিয়া গিয়াছেন। ভাগ লইতে আসিতেছেন না। আবদুল্লাহর জননীর দুই চোখ ছাপাইয়া দরূদ করিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। যথাসাধ্য নিজকে সংযত করিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে তিনি কহিলেন, ভালো আছ তো বাবা, বউমাকে আর হালিমাকে নিয়ে এলে না কেন?

আবদুল্লাহ উত্তর করিল, সে পরামর্শ হবে এখন পরে।

সম্মুখে বসিয়া আদর করিয়া, আহার করাইয়া, নিজ হাতে বিছানা পাতিয়া আবদুল্লাহকে বিশ্রাম করিবার অবসর দিয়া জননী নাশতা ইত্যাদির বন্দোবস্তে লাগিয়া গেলেন।

পরদিন অপরাহ্নে আবদুল্লাহ্ মাকে বলিল, তা হলে এক কাজ করলে হয় না–চলুন না আম্মা, আপনাদিগকে রসুলপুরে নিয়ে যাই।

মা কহিলেন, তাই তো ভাবছি, তোমার সেখানে খাওয়াদাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে, তা আমার তো যেতেই মন চায়, তবে গেলে ঘরদোর দেখবে কে, সেই কথাই ভাবছি। গেলে তো করিমনকেও নিয়ে যেতে হয়।

আবদুল্লাহ্ কহিল, সেই তো কথা, তবে যদি বলেন তো আপনাদের বউকে সেখানে নিয়ে যাই।

আবদুল্লাহর জননী কহিলেন, বউমা তো ছেলেমানুষ, একলা থাকবে কেমন করে! তবে এক কাজ করলে হয়; ওই যে গোপালের মা, ওকে বাড়ি রেখে গেলে ও দেখাশুনা করবে।

শেষ এই কথাই সাব্যস্ত হইল।

যথাসময় মাতাসহ একবালপুর পৌঁছিয়া সালেহা ও হালিমাকে লইয়া যাইবার প্রস্তাব করা হইল।

সৈয়দ সাহেব হালিমার যাওয়া সম্বন্ধে বিশেষ কিছু আপত্তি করিলেন না, তাহার প্রথম কারণ হালিমা অন্য বংশের মেয়ে। দ্বিতীয় কারণ আবদুল কাদেরকে তো তিনি ভালো করিয়াই জানিতেন। হয়তো শেষ পর্যন্ত আবদুল কাদের তাহার মর্যাদা রক্ষা করিবে না। কিন্তু সালেহার সম্বন্ধে তিনি ঘোর আপত্তি করিয়া বসিলেন। প্রথম কারণ সৈয়দ সাহেব মীর সাহেবের সংস্রবে আসাটা শুধু অপমানজনক নয়, ধর্মবিরুদ্ধ বলিয়া মনে করিতেন এবং আবদুল্লাহ্ এখন মীর সাহেবেরই একজন ভক্ত এবং সদাসর্বদা মীরের সঙ্গে ওঠা-বসা, মীরের পরামর্শে সব কাজকর্ম করিয়া থাকে। সৈয়দ সাহেবের আন্তরিক বিশ্বাস যে মীর সাহেব মুসলমান হইতে খারিজ হইয়াছেন এবং শরীফ ঘরের মুসলমানদের উচিত অন্ততপক্ষে তার সঙ্গে তরুকে মাওয়ালাত (নন্-কো-অপারেশন) করা।

সেদিন সন্ধ্যাবেলা বাদ মগরেব আবদুল্লাহকে ডাকিয়া লইয়া সৈয়দ সাহেব বেশ গম্ভীরভাবে বলিলেন, বস বাবা। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সৈয়দ সাহেব বলিলেন, তা বাবা, আমি একটা খোলাসা কথা বলব। তোমরা যে যাই বল না কেন আমি ওসব কারবারে নেই। আমি সালেহাকে রসুলপুর যেতে দেব না। ওর আখেরাতের দিকে আমার তো দেখা চাই। তোমরা সব আজকাল শরা-শরীয়ত একদম উড়িয়ে দিয়েছ। হারাম-হালাল মান না। তা যাই হোক, সব চুলোয় যাক। ওদিকে, বাবা ওই যে মীর সাহেব লোকটার সঙ্গে তোমাদের অত মাখামাখি কেন? বলি, তোমরাও কি সুদ খাবে নাকি! আস্তাগফেউল্লাহ্, কী মুশকিলেই যে আমি পড়েছি! এইসব আমার কিসমতে ছিল! তা ছাড়া আরো একটা কথা বাবা, নিয়ে যেতে চাচ্ছ, যাবে কেমন করে? এখন তো নৌকা চলবে না।

আবদুল্লাহ্ মৃদুকণ্ঠে কহিল, ওদের রেলগাড়িতেই নিয়ে যাব। স্টেশন থেকে পালকির বন্দোবস্ত আছে, এতে কোনো কষ্ট হবে না। তা ছাড়া সময়ও লাগবে কম। সৈয়দ সাহেব রেলগাড়ির কথা শুনিয়া একটি গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, তা বাবা সবই বলতে পার, কিন্তু আমাদের খানদানে কোনো জানানা কখনো এ পর্যন্ত রেলে চড়ে নি, আর আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন চড়তে দেবারও আমার ইচ্ছা নাই। সে হবে না বাবা, হাজার লোক স্টেশনে, তার মধ্যে দিয়ে রেলে চড়িয়ে আমার মেয়েকে নিয়ে যাবে? এ কথা মুখে আনতেই যে আমাদের বাধে। তোমরা ইংরেজি শিখেছ, ইংরেজের চালচলন অনুকরণ করতে চাও। তা আমি আর কদিন! এই কটা দিন সবুর কর, পরে যা হয় কোরো।

আবদুল্লাহ্ বুঝিল কথা কাটাকাটিতে ফল হইবে না। সে রণে ভঙ্গ দিয়া বলিল, তা হলে হালিমাকে…।

সৈয়দ সাহেব বাধা দিয়া বলিলেন, হ্যাঁ, বউমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা, আবদুল কাদের মিয়া তো বাড়িই আছেন, তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে যা হয় কর, আমি ওর মধ্যে নেই! সেবারে বরিহাটীর কত কী কাণ্ড-কারখানা, সে সবই তো সয়েছি।

আবদুল্লাহ কহিল, আবদুল কাদের সম্মত আছে। আপনার তো কোনো আপত্তি নাই?

সৈয়দ সাহেব, না, আমার আর কী আপত্তি! সে রাজি যখন তখন আমার আপত্তির কারণ কী?

মসজিদে আযানের সঙ্গে সৈয়দ সাহেব নামায পড়ার জন্য উঠিয়া পড়িলেন, আবদুল্লাহ্ পিছনে পিছনে নামায পড়িবার জন্য মসজিদে ঢুকিল।

নামায বাদ আবদুল্লাহ্ বাড়ির ভিতর গিয়া মাকে সমস্ত কথা খুলিয়া বলিল, মা একটু দুঃখিত হইলেন; কহিলেন, তবে কাল সকালেই হালিমাকে নিয়ে যাওয়া সাব্যস্ত।

সৈয়দ সাহেব মসজিদের রোয়াকে বসিয়া আবদুল কাদেরকে বলিলেন, ওরা কবে যাচ্ছেন?

আবদুল কাদের, তা তো ঠিক জানি না।

সৈয়দ সাহের, তা হলে বউমাও যাচ্ছেন রসুলপুরে?

আবদুল কাদের, জি হ্যাঁ, তাই তো ওঁদের ইচ্ছা।

সৈয়দ সাহেব একটু উষ্ণভাবে বলিলেন, ওঁদের ইচ্ছা, তোমার কী? তোমারও ইচ্ছা না! এখন নৌকা চলে না জানা আছে তো, রেলে চড়িয়ে নিয়ে যাবে!

আবদুল কাদের, আমার তো কোনো আপত্তি নাই।

সৈয়দ সাহেব একটা বড় রকমের দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন, বেশ।

কিছুক্ষণ উভয়েই চুপ–একটু পরে সৈয়দ সাহেব দহলিজে চলিয়া গেলেন। আবদুল কাদের বাড়ির ভিতর আবদুল্লাহর কাছে সমস্ত বিষয় শুনিল।

পরদিন প্রত্যুষেই আবদুল্লাহ্ মাতা, ভগ্নী হালিমা এবং করিমনকে লইয়া রসুলপুর যাত্রা করিল।

.

৩২.

মজিলপুর একটি পুরাতন ও বিখ্যাত স্থান। এখানকার রেজিস্ট্রি আপিসটিও বেশ বড়। এখানে। বহু দলিল রেজিস্ট্রি হয়। যে সময়ের কথা বলা হইতেছে তখন সবুরেজিস্ট্রারগণ রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের সংখ্যা হিসাবে কমিশন পাইতেন। আবদুল কাদের বরিহাটী জয়েন্ট অফিসে বেশ যোগ্যতার সহিত কাজ করিয়া ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রারের সুনজর আকর্ষণ করিতে সক্ষম হইয়াছিল। এক্ষণে মজিলপুরে সব্‌রেজিস্ট্রারের পদোন্নতি হওয়ায় তিনি অন্যত্র চলিয়া গেলে আবদুল কাদের মজিলপুরে বদলি হইয়া আসিল। হালিমাও সঙ্গে আসিল। এখানে তাহার মাসিক আয়। ২৫/৩০ টাকা বাড়িয়া গেল। তা ছাড়া এখানে একটি মাদ্রাসা ছিল। একমাত্র শিক্ষার অভাবই যে সমাজের সমস্ত দুরবস্থার কারণ, ইহা আবদুল কাদের মর্মে মর্মে অনুভব করিয়াছিল। মজিলপুরে আসিয়া মাদ্রাসার সাহায্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তাহার সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করার সুযোগ পাইবে মনে করিয়া তাহার প্রাণ হর্ষে নাচিয়া উঠিল।

আবদুল মালেকের খালাতো ভাই ফজলর রহমানের পিতা মজিলপুর মাদ্রাসার সেক্রেটারি ছিলেন। সম্প্রতি তাহার মৃত্যু হওয়ায় আবদুল কাদের মাদ্রাসার সেক্রেটারি নির্বাচিত হইল।

পীর সাহেবের দোয়া, তাবিজের বরকতে যখন ফজলু মিঞা ডিপুটিগিরির স্বপ্ন দেখিতেছিল, তখন হঠাৎ একদিন দি বেঙ্গলীতে প্রবেশনারি ডিপুটির লিস্টে ফজলু মিঞার নাম না পাইয়া ফজলু মিঞার চমক ভাঙিয়া গেল। ফজলু মিঞা দমিবার পাত্র নয়! সে ভাবিল হিন্দু কাগজওয়ালা বদমাইশি করিয়া তাহার নামটি ছাপে নাই। তারপর সে কলিকাতা গেজেটেও নাম পাওয়া গেল না। ব্যাপার কী? তবে কি পীর সাহেব দোয়া করেন নাই? না, তাও কি সম্ভব? ফজলু ছুটিয়া পীর সাহেবের খেদমতে হাজির হইল। পীর সাহেব ইতোমধ্যেই খবর পাইয়াছিলেন যে ফজলু ডিপুটি কি সব্‌ডিপুটি কিছুই হইতে পারে নাই। কদমবুসি সম্পন্ন করিয়া ফজলু একপাশে বিষণ্ণমনে বসিয়া পড়িল। পীর সাহেব কহিলেন, আয় লাড়কা আবৃ তক্ তু গাফেল হায়। ফজলুর হঠাৎ মনে পড়িয়া গেল পীর সাহেব তাকে যে এশার নামাযের বাদ ১১০০০ বার একটি দোয়া পড়িতে বলিয়াছিলেন, কয়েকদিন যাবৎ সেটা ফজলু পড়িতে পারে নাই। তা ছাড়া অনেক দিনই ঘুম ভাঙিতে বিলম্ব হওয়ায় ফজরের নামাযও তার কাযা পড়িতে হইয়াছে। ফজলু মনে মনে পীর সাহেবকে সন্দেহ করিয়াছিল। তার দরুন তার মনে ভীষণ অনুশোচনা জন্মিল। সে উঠিয়া গিয়া আবেগভরে পীর সাহেবের পায়ের উপর পড়িল। সে মনে মনে আশা করিতেছিল পীর সাহেব ইচ্ছা করিলে তখনো তার চাকরির উপায় হইতে পারে।

পীর সাহেব মৃদুকণ্ঠে কহিলেন, সব করুনা চাহিয়ে, আয় লাড়কা, এক শরীফজাদী বহুত হাসীন, আরো নেহায়েত নেখত; উত্সকে সাত তোমহারী শাদি মোবারক মায় ঠিক কিয়া। এই ওজর করনে কা মোকাম নেহি হায়। আগার পছন্দ হো তো মুঝসে ছেপানা নেহি। আলাওয়া ওকে জেমিদারি ভী খুব হায়। জেমিদারিসে দস্ বারা হাজার রুপায় কী আমদানি হয়।

পীর সাহেবের প্রতি ফজলুর ভক্তি অচল। পীর সাহেবের আদেশ শিরোধার্য করিয়া লইয়া ফজলু যখন সত্য সত্যই এই বিবাহের জন্য বাপ-মায়ের অনুমতি লইয়া আসিল, তখন বিবাহে আর কোনো বাধাই রহিল না। যথাসময়ে শুভকার্য সম্পন্ন হইয়া গেল। ফজলু মিয়ার এখন আর্থিক কোনো কষ্টই রহিল না। পীর সাহেবের মেহেরবানিতে খাওয়া-পরার ভাবনা পার হইয়া ফজলু দশগুণ উৎসাহে পীরের খেদমতে নিযুক্ত হইল। পাঁচ ওয়াক্ত নামায, দোয়া দরুদ, মহফেলে-মৌলুদ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে কোনো ত্রুটি নাই। যাকাতের হিসাবের জন্য একজন মুহুরিই নিযুক্ত হইয়া গেল। এসব বিষয়ে কোনো দিকে ত্রুটি রহিল না বটে কিন্তু আদায়পত্র ইত্যাদি সমস্তই কর্মচারীদের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া হইল।

কয়েক মাস পরের কথা। পিতৃবিয়োগের সংবাদ পাইয়া ফজলু মিঞা সস্ত্রীক পিতার ফাতেহার জন্য বাড়ি আসিয়াছে। এই উপলক্ষে পীর সাহেবকেও দাওয়াদ করা হইয়াছিল। আবদুল কাদেরকে দাওয়াদ করার জন্য যখন ফজলু মিঞা আবদুল কাদেরের বাসায় আসিয়াছিল, তখন মাদ্রাসা সম্বন্ধে তাহার সঙ্গে বহু আলাপ হইয়াছিল। আবদুল কাদের মাদ্রাসার ছাত্রদিগকে কিছু ইংরেজি, বাংলা ও অঙ্ক শিক্ষা দিবার প্রস্তাব করিলে ফজলু মিঞা একেবারে যেন আকাশ হইতে পড়িলেন। সে কী কথা, তাও কি হয়! যেখানে দীনী এলেম শেখানো হয়, সেখানে এইসব দুনিয়াদারি একদম অপ্রাসঙ্গিক। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর ফজলু মিঞা কহিলেন, আচ্ছা, কালই পীর সাহেব আসছেন, তার সঙ্গে একবার আলাপ। করলেই আপনি আপনার ভুল বুঝতে পারবেন। ওসব খেয়াল আপনি মন থেকে দূর করে ফেলুন। এই দেখুন না হাতে হাতে। আমি একবার চাকরির জন্য মত্ত হয়ে পড়েছিলাম। অনেক সময় আমার নামায কাযা হয়েছে। এখানে দৌড়, ওখানে লাফ এইসব করে আমার যে কী সর্বনাশ হচ্ছিল, তা খোদাই জানেন। কিন্তু পীর সাহেবের শরণাপন্ন হয়ে আমার এখন কোনো চিন্তাই নাই। খোদার কাজ কল্লে খোদা রুজি জুটিয়ে দেবেই। আমি দেখুন ইংরেজি পড়তে গিয়ে কী ভুলই করেছি! আগে থেকে যদি পীর সাহেবের শরণাগত হতাম তা হলে আমার কেসমত আরো ভালো হত। যাক এখন আসি, একবার মেহেরবানি করে গরিবখানায়। তশরীফ আনবেন। ওয়ালেদ মরহুমের কথা মনে হলে আর কিছু ভালো লাগে না। তার শেষ কাজটা যাতে সুসম্পন্ন হয় তার জন্য আপনাদের পাঁচজনের সাহায্য চাচ্ছি। আশা করি নাওম্মেদ হব না।

এই লম্বা বক্তৃতা দিয়া আবদুল কাদেরকে স্তম্ভিত করিয়া যথারীতি সালাম-সম্ভাষণপূর্বক ফজলু বিদায় গ্রহণ করিল।

পরদিন মজিলপুরে মহা ধুম পড়িয়া গেল। এক প্রকাণ্ড বজরা নদীবক্ষ বাহিয়া মৃদু মন্থরগতিতে মজিলপুরের দিকে অগ্রসর হইতে দেখা গেল। প্রায় একশত লোক ঘাটে উপস্থিত।

এহেন ভাগ্য মজিলপুরের কোনোদিন ঘটিয়াছিল কি না সে সম্বন্ধে বহুবিধ আলোচনায় বাধা জন্মাইয়া যখন ঘণ্টাখানেক পরে পীর সাহেবের বজরা ঘাটে ভিড়িল তখন সমস্বরে মাহাবা মারহাবা রবে উপস্থিত জনমণ্ডলী গগনমণ্ডল মুখরিত করিয়া তুলিল।

ফজলুর পরলোকগত পিতার ফাতেহা উপলক্ষে লক্ষ্ণৌ হইতে একজন বাবুর্চি আনা হইয়াছিল। কলিকাতা হইতে কয়েকজন মেট এবং বাবুর্চির সঙ্গেও দুই জন মেট আসিয়াছিল। আশপাশের গ্রামের মধ্যে যারা পাকপ্রণালীর সঙ্গে পরিচিত ছিল ফজলু মিঞা তাদেরও আনাইয়াছিলেন। ফাতেহার দাওয়াদ আত্মীয়স্বজন যে যেখানে ছিল সকলেই পাইয়াছিল। গরিব দুঃখী সংবাদ পাইয়া যে যেখানে ছিল আসিয়া জুটিতেছিল। ফাতেহা উপলক্ষে জেয়াফত শেষ হইয়া গেলেও পীর সাহেব যে কয়দিন মজিলপুরে ছিলেন ও অঞ্চলের বহু ভক্ত নানা কাজ ফেলিয়া পীর সাহেবের সহিত কেহ দেখা করিতে, কেহ মুরীদ হইতে, কেহ পানি পড়াইয়া লইতে, কেহ তাবিজের জন্য আসিয়া গ্রামের রাস্তাঘাট ভরিয়া ফেলিয়াছিল। এমন বিরাট আয়োজন এবং এত জনকোলাহল দেখিয়া পীর সাহেবের বুজরগী সম্বন্ধে কোনো সংশয় রহিল না।

সেদিন রাত্রে পীর সাহেবের বজরায় একটু উত্তেজনার আভাস পাইয়া কয়েকজন খাদেম একটু বিচলিত হইয়া উঠিলেন। ব্যাপার কী জানিবার জন্য উদ্গ্রীব জনমণ্ডলী এ ওর মুখের দিকে তাকাইতে আরম্ভ করিলেন। পীর সাহেব ফজলু মিঞার কয়েকজন আত্মীয়াকে মুরীদ করিবার জন্য বজরা হইতে নামিয়া পালকি করিয়া ফজলু মিঞাদের বাড়ি গিয়াছিলেন। তথা হইতে এইমাত্র ফিরিয়া আসিয়াছেন। ফজলু মিঞা অদূরে মস্তক অবনত করিয়া বসিয়া আছেন। সকলে চুপ। কিছুক্ষণ পরে পীর সাহেব একটি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া গম্ভীরভাবে বলিলেন, উওহ্ সব মিস্ত্রিয়ো কা কাম হায়, শরীফোঁ কা কাম নেহী।

ফজলু মিঞা পীর সাহেবের মন্তব্য শিরোধার্য করিয়া লইয়া মৃদুকণ্ঠে বলিল, জি হ্যাঁ। হুজুর, উওহ্ সব সে আখেরাত কা ফায়দা নেহী হোগা।

ব্যাপার আর কিছুই নয়, পীর সাহেব যখন ফজলু মিঞাদের বাড়িতে গিয়াছিলেন সেই সুযোগে ফজলু মিঞার সাহায্যে আবদুল কাদের পীর সাহেবের খেদমতে হাজির হইয়াছিল। যথাবিহিত কদমবুসি সম্পন্ন করিয়া আবদুল কাদের বিনয়-নম্র বচনে পীর সাহেবের খেদমতে মাদ্রাসার সংস্কারের কথা পাড়িয়াছিল। পীর সাহেব আবদুল কাদেরের প্রস্তাবে মর্মাহত হইয়া শুধু বলিলেন, ইয়ে সব দুনিয়াদারি মামলা সে হামলোগ ফারেগ রত্না চাতে হায়। মেরা খেয়াল মে মাদ্রাসা দীনী এলেম কা ওয়াস্তে হায়। আংরেজী আওর বাংলা, আওর হেসাব ইয়ে সব তো আংরেজী স্কুল মে পড় হায়ি জাতি হায়, বাচ্চা।

আবদুল কাদের বিনয়-নম্র বচনে আরজ করিল, হুজুর, লোগ সব গোরাহ্ হোতে চলা হায়। আওর জারা-সা হেসাব না জানে সে মহাজন আওর জমিনদার লোক গরিবো পর বড়া জুলুম করতে হয়। লোগ্ সব্‌ ভুকা মর্‌ রহে হ্যাঁয়। এনলোগঁ কী জেন্দেগীকে ওয়াস্তে কুছ্‌ আংরেজী আওর বাংলা আওর হেসাব জানা জরুরি হায়।

পীর সাহেব ঊর্ধ্বে অঙ্গুলি নির্দেশপূর্বক কহিলেন, দীন ইসলাম কো আগে বাঁচানা চাহিয়ে। জেন্দেগীকে ওয়াস্তে খোদাও করিম পর তওয়াল করনা ওয়াজেব হায়! রাজ্জাক কো ভুলকে রোজীকা বন্দোবস্ত হো নেহী সান্তা। খায়ের, ইয়ে সব তার সে কুছ হী ফায়দা নেহী নেক্‌লেগা।

আবদুল কাদের রণে ভঙ্গ দিয়া পীর সাহেবের কদমবুসি সম্পন্ন করিয়া বিদায় লইয়া চলিয়া গেল। পীর সাহেব বড়ই নারাজ হইয়া বজরায় চলিয়া গেলেন এবং পরদিনই মজিলপুর গ্রাম পরিত্যাগপূর্বক চলিয়া গেলেন।

পীর সাহেব চলিয়া যাওয়ার পর আবদুল কাদের একটি মিল মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য চেষ্টা করিয়াছিল। চারিদিকে ঘোর আপত্তি হওয়ায় অবশেষে মাদ্রাসার জনকতক ছাত্রকে নিয়া একটু একটু ইংরেজি শিক্ষা দিবার বন্দোবস্ত করিতে সক্ষম হইয়া নিজেকে ধন্য মনে করিল।

.

৩৩.

নৌকা চলে না, রেলগাড়িতে চলাফেরায় বেপরদা–এই অজুহাতেই আবদুল্লাহর শ্বশুর সালেহাকে রসুলপুরে পাঠান নাই। গ্রীষ্মের বন্ধেও নৌকা চলিবে না। কাজেই তখনো তিনি সেই অজুহাত ধরিয়া বসিবেন। অতএব আবদুল্লাহ্ স্থির করিয়া লইল গ্রীষ্মের বন্ধে একবার শ্বশুরবাড়ি যাইয়া দেখাশুনা করিয়া আসিবে। তাহার পর পূজার বন্ধে নৌকা চলাচল আরম্ভ হইলে সালেহাকে লইয়া আসিবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কার্যত তাহা ঘটিয়া উঠিল না। কারণ স্কুলের লাইব্রেরির পুস্তকগুলি বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল, সেগুলিকে শৃঙ্খলামতো সাজাইতে গিয়া গ্রীষ্মের বন্ধে তাহার পক্ষে আর রসুলপুর ত্যাগ করা ঘটিয়া উঠিল না।

দিনের পর দিন কাটিতে লাগিল। পূজার বন্ধও ঘনাইয়া আসিল। এযাবৎ একবালপুরের কোনো খবর না পাওয়ায় আবদুল্লাহর মন কেমন একটি অজানা আশঙ্কায় অস্থির ও চঞ্চল হইয়া উঠিল। চিঠিপত্র লিখিয়া উত্তর পাওয়াও সহজ ব্যাপার নয়। কারণ ও-বাড়িতে এক আবদুল কাদের ভিন্ন প্রায় সকলেই দোয়াতে কলম দান ব্যাপারটাকে গর্হিত মনে না করিলেও সহজ মনে করিতে শেখে নাই। প্রায় ৬ মাস পরে ভাদ্রমাসের ৪ঠা তারিখে একখানা পত্র আসিল। কালো কালির লেখা দুঃসংবাদ আবদুল্লাহর হৃদয়ে কালো দাগ আঁকিয়া দিল। আসন্নপ্রসবা সালেহার আসন্ন মৃত্যুর সংবাদে আবদুল্লাহর হৃদয়ে শেল বিধিল।

আহার ও নিদ্রা ত্যাগ করিয়া, গরুর গাড়ির কঁকানি সহ্য করিয়া, কাদা ও বৃষ্টি তুচ্ছ করিয়া, আকাশের ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করিয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া জুতা হাতে নগ্নপদে আবদুল্লাহ্ যখন একবালপুরে পৌঁছিল তখন সব শেষ হইয়া গিয়াছে। সাদা লংক্লথে মোড়া খট্টাশায়ী কাষ্ঠখণ্ডবৎ দেহখানির মস্তকাবরণ উঠাইয়া তাহাকে দেখানো হইল। সেই মুখ–কিন্তু কী পরিবর্তন! শীর্ণ পাণ্ডুর রক্তলেশ পরিশূন্য, আঁখিপল্লব নিমীলিত, ঈষদুদ্ভিন্ন অধরোষ্ঠ–কী যেন বলিতে চায়, অথচ বলিতে পারে না। আবদুল্লাহর মমতলে মৃত্যুশেল বিধিল। তাহার মুখে কথা ফুটিল না। কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া সে বুক-ফাটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিল। তাহার পর ধীরে ধীরে দাফন-ক্ষেত্রের দিকে চলিয়া গেল।

.

৩৪.

ভগ্নহৃদয় লইয়া আবদুল্লাহ্ কর্মস্থলে ফিরিল। মীর সাহেব আদ্যোপান্ত সকল সংবাদই শুনিলেন। আবদুল্লাহর মনে একটা যে বৈরাগ্যের ভাব জাগিয়া উঠিয়াছে; তাহা তিনি সম্পূর্ণরূপে বুঝিতে পারিলেন। কিন্তু সে-ভাবকে আদৌ তিনি প্রশ্রয় দিলেন না। নানা প্রকারে সান্ত্বনা দিয়া তিনি আবদুল্লাহকে পুনরায় কর্মক্ষেত্রের মাঝে টানিয়া আনিলেন।

আবদুল্লাহ্ মীর সাহেবের আদেশ-অনুরোধ উপেক্ষা করিতে পারিল না। সে আবার যথারীতি স্কুলের কার্যে মনঃসংযোগ করিল। এই সময়ে হঠাৎ একদিন একবালপুর হইতে সৈয়দ সাহেবের এক পত্র আসিয়া পৌঁছিল। পত্রে সৈয়দ সাহেব মোহরানার দাবি করিয়াছেন।

আবদুল্লাহর পিতা ওলিউল্লাহর সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনে সৈয়দ সাহেব নারাজই ছিলেন। শুধু মাতার অনুরোধেই তিনি সম্মত হইয়াছিলেন। এদিকে সৈয়দ সাহেব যখন ২৫০০০ টাকা মোহরানা দাবি করিয়া বসিলেন, বড় ঘরে বিবাহ দিবার আগ্রহে আবদুল্লাহর পিতা রাজি হইয়া গেলেন। আবদুল্লাহও তখন এ বিষয়ের গুরুত্ব বুঝিতে পারে নাই। কারণ সাধারণত এই মোহরানা একটা অর্থশূন্য প্রথা বলিয়া বিবেচিত হয় এবং বাস্তবিকপক্ষেই যদি সৈয়দ সাহেবের অবস্থার পরিবর্তন না হইত তবে এ সম্বন্ধে তারাও যে কোনো দাবি করিতেন এরূপ মনের ভাব বোধহয় সৈয়দ সাহেবেরও ছিল না। কিন্তু নানা কারণেই সৈয়দ সাহেবের অবস্থার অনেক পরিবর্তন হইয়াছিল। এমন অবস্থায় হকের দাবি ছাড়িয়া দিবেন এমন অবিবেচক বলিয়া সৈয়দ সাহেবকে দোষারোপ করা চলে না।

পিতার বর্তমানে কন্যার মৃত্যু হইয়াছে সুতরাং সম্পত্তির কোনো ভাগ কন্যাতে বর্তায় নাই। এমন অবস্থায় মোহরানার টাকার দাবি ন্যায্য দাবি। কন্যার অবর্তমানে জামাতা যে শ্বশুরকে ঠকাইবার চেষ্টা করিতে পারে এ ভয়ও সৈয়দ সাহেবের ছিল; তাই তিনি চিঠিতে জানাইয়াছিলেন যে সহজে টাকা না দিলে আদালতে নালিশ করা হইবে; তিনি হক্কের দাবি ছাড়িয়া দিতে কিছুতেই পারিবেন না। তিনি আরো লিখিয়াছিলেন যে, যদি আদালতে নালিশ করেন তবে ডিক্রি নিশ্চয়ই হইবে এবং আবদুল্লাহর মোকদ্দমা খরচ বাবদ কিছু টাকা অনর্থক দণ্ড দিতে হইবে।

এই পত্রের উত্তরে আবদুল্লাহ সবিনয়ে জানাইল যে, একসঙ্গে অত টাকা দেওয়া তার সাধ্যাতীত কিন্তু সে কিস্তি করিয়া টাকা পরিশোধ করিতে সম্মত। প্রত্যুত্তরে সৈয়দ সাহেব জানাইলেন যে, তার এত টানাটানি যে তা বলিবার নয়; টাকার বড় দরকার। সুতরাং তিনি বিলম্ব করিতে অক্ষম।

অগত্যা আবদুল্লাহ্ তাহার পৈতৃক সম্পত্তি বন্ধক দিয়া টাকা পরিশোধের কথা ভাবিতে লাগিল! কিন্তু সম্পত্তি কী আর ছিল! দেখা গেল যে বন্ধক কেন, বিক্রি করিলেও সে অত টাকা সংগ্রহ করিতে অক্ষম। আবদুল্লাহ বড়ই বিচলিত হইয়া পড়িল।

চাকরি করিয়া আবদুল্লাহ্ মোট ১০০০ টাকা জমাইয়াছিল। অনেক চিন্তার পর সেই টাকা এবং সমস্ত সম্পত্তি বন্ধক দিয়া আরো ৮০০ টাকা সগ্রহ করিয়া একত্রে ১৮০০ টাকা সে সৈয়দ সাহেবকে পাঠাইয়া দিল। কিন্তু ইহাতে সৈয়দ সাহেব একটুও সন্তুষ্ট হইলেন না।

মীর সাহেব ভ্রমণে বাহির হইয়াছিলেন। মাঘ মাসের পূর্বে বাড়ি ফিরিবেন না। আবদুল্লাহ্ বড়ই চিন্তায় দিন কাটাইতে লাগিল। যাহা হউক মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহেই মীর সাহেব বাড়ি ফিরিলেন এবং সমস্ত সংবাদ জানিয়া অগত্যা তিনিই আবশ্যক টাকা কর্জ দিতে চাহিলেন। আবদুল্লাহ্ অগত্যা তাহাতেই স্বীকৃত হইল এবং বিনা দলিলে ১০০০০ টাকা কর্জ করিয়া স্বয়ং একবালপুরে গিয়া সৈয়দ সাহেবের হস্তে দিয়া আসিল। সৈয়দ সাহেব তখনই একখানা রসিদ লিখিয়া দিলেন। আবদুল্লাহ মীর সাহেবের নিকট হইতে ঋণ গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছে এ-কথা সৈয়দ সাহেব অবগত ছিলেন। সুদের টাকা লওয়া জায়েজ কিংবা না জায়েজ এ সম্বন্ধে তর্ক উঠিতে পারে এবং সৈয়দ সাহেব উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া জানিয়াছিলেন যে ২৫০০০ টাকা দেওয়া আবদুল্লাহর পক্ষে একেবারে অসম্ভব, সুতরাং আদালত। হয়তো অত টাকা ডিক্রি দিবে না। এতদ্ভিন্ন সংসারে আজকাল টানাটানি একটু বেশিই হইয়াছে। সৈয়দ সাহেব যা টাকা পাইলেন তাহাতেই রাজি হইয়া সম্পূর্ণ টাকার রসিদ লিখিয়া দিলেন। টাকা প্রাপ্তির পর সৈয়দ সাহেব আবদুল মালেককে ডাকিয়া আনিয়া বলিলেন, তোমার ওই ছেলেটার খানার কথাই ভাবছি। আবদুল্লাহর নিকট যে টাকাটা পাওয়া গেছে তার কিছুটা হাত-কর্জ শোধ দিতে যাবে। আর কিছু টাকা দিয়ে খাৎনার খরচটা চলে যাবে!

আবদুল মালেক মনে মনে ভাবিয়াছিল ওই টাকাটা দিয়া রসুলপুর ও মাদারগঞ্জের তালুকটার–যা ভোলানাথবাবুর নিকট বন্ধক ছিল, সেটা খালাস করিয়া লওয়া যাইবে। সে বলিল, তা আব্বাজান ধরুনগে আপনার ওই তালুক দুটো খালাস করে নেওয়া তো দরকার।

সৈয়দ সাহেব বলিলেন, বাবা, আমি আর কদ্দিন যে কদিন আছি খোদা এদের দেছেন, এদের নিয়ে একটু আমোদ-আহ্লাদ করে যাই, তোমরা তো রইলে।

আবদুল মালেকের পুত্রের খান্নার দিন স্থির হইয়া গেল। খাত্না উপলক্ষে সৈয়দ সাহেব কিছু ধুমধামই করিয়া বসিলেন। তার শারীরিক অবস্থা আজকাল ভালো ছিল না। এই হয়তো তার জীবনের শেষ কাজ। সুতরাং যাতে বংশমর্যাদা বজায় থাকে এরূপভাবে লোকজনকে খাওয়াইবার ভাগ্য হয়তো তার আর জুটিবে না মনে করিয়া কয়েক গ্রামের লোককেও দাওয়াদ দিলেন এবং আত্মীয়-বন্ধু যে যেখানে ছিল সবাইকে দাওয়াদ দেওয়া হইল। বরিহাটী হইতে সওদা আনা হইল। বাবুর্চি খানসামা বাড়িতে যারা ছিল তাদের দ্বারাই পাকের বন্দোবস্ত হইল। নির্দিষ্ট দিনে বহু লোক তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করিয়া বলিল এমন খানা তারা জীবনে কখনো খায়ও নাই, খাইবেও না। অবশ্য ঠিক এই ভাবের কথা তারা এই সৈয়দ সাহেবের বাড়িতে আরো বহুবার বলিয়াছে। সমস্ত ব্যাপার শুনিয়া ভোলানাথবাবু। বলিলেন, হবে না কেন? সৈয়দদের মতো বড় বংশ তো আর এ অঞ্চলে নাই। এঁরাই তো। এককালে নবাব ছিলেন।

এই উপলক্ষে আত্মীয়-বন্ধুদের সওয়ারিও আনা হইয়াছিল, সুতরাং ধুমধামের জের আরো দশ-পনের দিন চলিল। আরো কিছুদিন হয়তো চলিত–কিন্তু দেখা গেল যে টাকাগুলা কেমন করিয়া ফুরাইয়া গিয়াছে। এতগুলা টাকা কেমন করিয়া যে গেল তার হিসাবই পাওয়া গেল না। সৈয়দ সাহেব কিন্তু বলিলেন, তা বৈকি–কতই আর টাকা!

.

৩৫.

মীর সাহেবের সাহায্যে আলতাফ যথাসময়ে বি-এ ও ল পাস করিয়া বরিহাটীতে ওকালতি করিতেছে। বাদশা মিঞা এখন আলতাফের বিবাহ সম্বন্ধে বেশ একটু উৎসুক হইয়া পড়িয়াছেন। এদিকে আলতাফের মালেকার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার সংবাদে বাদশা মিঞা চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। কৃতবিদ্য ছেলের পিতা হওয়া যেমন গৌরবের তেমন দায়িত্বপূর্ণও বটে। যদিও মুসলমান সমাজের নিয়মানুসারে বিবাহের ভার বহন সাধারণভাবে ছেলের পক্ষেই করিতে হয় তথাপি শিক্ষিত ছেলের সংখ্যা কম। মেয়েকে সৎপাত্রে দান হিন্দু সমাজের পক্ষে জটিল বটে কিন্তু মুসলমান সমাজে উহা জটিলতর। শরীফ খানদানের সঙ্গে সম্বন্ধ করিতে হইবে; কিন্তু সাধারণত পুরোনো ঘরানাদের অবস্থা আজকাল প্রায়ই সচ্ছল নয