ক্রমে সপিগুনের দিন সংক্ষেপ হয়ে আসতে লাগলো। ক্রিয়াবাড়ীতে স্যা্করা বসে গেল–ফলারে বামুনেরা এপ্রেনটিস নিতে লাগলেন—সংস্কৃত কলেজের ফলারের প্রফেসর রকমারী ফলারের লেকচার দিতে আরম্ভ কল্লেন—বৈদিক ছাত্রেরা ভলমনস নোট লিখে ফেল্লেন। এদিকে চতুষ্পাষ্ঠীওয়ালা ভট্টাচার্য্যের চলিত ও অর্দ্ধ পত্র পেতে লাগলেন। অনাহূত চতুষ্পাঠীহীন ভট্টাচার্য্যের সুপারিশ ও নগদ অর্দ্ধ বিদায়ের জন্য রমাপ্রসাদবাবুর বাড়ী, নিমতলা ও কাশী-মিত্তিরের ঘাট হতেও বাড়িয়ে তুল্লেন–সেথায় বা কটা শুকুনি আছে। এঁদের মধ্যে অনেকের চতুষ্পাঠীতে সংবৎসর ষাঁড় হাগে, সরস্বতী পুজার সময়ে ব্রাহ্মণী ও কোলের মেয়েটি বঙ্গদেশীয় ছাত্র সাজেন, সোলার পদ্ম ও রাংতার সাজওয়ালা ক্ষুদে ক্ষুদে মেটে সরস্বতী অধিষ্ঠান হন; জানিত ভদ্দরলোকদের নেলিয়ে দিয়ে কিছু কিছু পেটে।
ভট্টচার্য্যি মশাইদের ছেলেব্যালা যে কদিন আসল সরস্বতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, তারপর এ জন্মে আর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় না; কেবল সংবচ্ছর অন্তর একদিন মেটে সরস্বতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সেও কেবল, যৎকিঞ্চিৎ কাঞ্চনমূল্যের জন্য।
পাঠকগণ! এই যে উর্দ্দি ও তকমাওয়ালা বিদ্যালঙ্কার, ন্যায়লঙ্কার, বিদ্যাভূষণ ও বিদ্যাবাচস্পতিদের দেখচেন, এঁরা বড় ফ্যালা যান না। এঁরা পয়সা পেলে না করেন, হ্যান কৰ্ম্মই নাই! সংস্কৃত ভাষা এই মহাপুরুষদের হাতে পড়েই ভেবে ভেবে মিলিয়ে যাচ্চেন। পয়সা দিলে বানরওয়ালা নিজ বানরকে নাচায়, পোষাক পরায়, ছাগলের উপর দাঁড় করায়; কিন্তু এর পয়লা পেলে নিজে বানর পর্য্যন্ত সেজে নাচেন! যত ভয়ানক দুষ্কৰ্ম্ম, এই দলের ভিতর থেকে বেরোবে, দায়মালী জেল তন্ন তন্ন কল্লেও তত পাবে না।
আগামী কল্য সপিণ্ডন। আজকাল হিরে দলপতিদের অনকেই কুলপনা-চক্করের দলে পড়েছেন; নামটা ঢাকের মত, কিন্তু ভিতরটা ফাঁকা!–রমাপ্রসাদবাবু হবে প্রধান উকীল, সাহেব সুবোদের বাবুর প্রতি যেরূপ অনুগ্রহ, তাহাতে আর ও কত কি হয়ে পড়বেন; সুতরাং রমাপ্রসাদবাবু দলস্থ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদিগের পত্র দিলে ফিরিয়ে দেওয়াটাও ভাল হয় না, কিন্তু প্রসাদবাবু ও *** প্রভৃতি নানা প্রকার তর্ক-বির্ক চলতে লাগলো। দুই এক টাটকা দলপতি (জোর কলমে মান-অপমানের ভয় নাই) রমাপ্রসাদবাবুর তোয়াক্কা না রেখে আপন দলে আপন প্রোক্লেমেশন দিলেন, প্রোক্লেমেশন দলস্থ ভট্টাচাৰ্য দলে বিতরণ হতে লাগলো। অনেকে দু নৌকায় পা দিয়ে বিষম বিপদে পড়লেন–শানকীর ইয়ারেরা ‘বারে বারে মুরগী তুমি’ দলে ছিলেন, চিরকাল মুখ পুঁচে চলেচে, এইবার মহাবিপদে পড়তে হলো। সুতরাং মিত্তির খুড়ো লিভ নিয়ে হাওয়া খেতে চান। চাটুয্যে শয্যাগত হয়ে পড়েন। দলপতির প্রোক্লেমেশন জুরির শমন ও সফিনে হতেও ভয়ানক হয়ে পড়লো। সে এই–
“শ্রী শ্রীহরি
শরণং।
অসেস শাস্ত্ররত্নাকরপারবরপরম পূজনীয়—
শ্রীল
ভট্টাচাৰ্য মহাশয়গণ–শ্রীচরণেষু।
সেবক শ্রী * চন্দর দাস ঘোষ ধৰ্ম্ম–
সাষ্টাঙ্গে শত সহস্র প্রণীপাত পুরঃসর নিবেদন কার্য্যাণঞ্চাগে শ্ৰীশ্ৰীভট্টাচার্য্য মহাশয়দিগের আশীর্ব্বাদে এ সেবকের প্রাণগতীক কুসল। পরে যে হেতুক ঁরামমোহন রায়ের পুত্র বাবু রমাপ্রসাদ রায় স্বীয় মাতাঠাকুরাণীর একোর্দ্দিষ্ট শ্রাদ্ধে মহাসমারোহ করিতেছে। এই দলের বিখ্যাত কুলীন ও আমার ভগ্নিপতি বাবু ধিনিকৃষ্ট মিত্ৰজা মজকুর সম্যক প্রতিয়মাণ হইয়া জানিয়াছেন যে উক্ত রায় বাবু সহরের সমস্ত দলেই পত্র দিবেন সুতরাং এ দল ও পত্র পাঠাইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। কিন্তু আমাদের শ্রীশ্রী ঁ সভার দলের অনুগত দলের সহিত রায় মজকুবের আহার ব্যাভার চলিত নাই। সুতরাং তিনি পত্র পাঠাইলেও আপনারা তথায় সভাস্থ হইবেন না।
সম্মতঃ
শ্রীহবীস্বর ন্যায়লঙ্কারোপাধীক
কাব্য সভাপণ্ডিতঃ।
শ্রী * চন্দর দাস ঘোষ।
সাং–নুড়িঘাটা।
প্রক্লেমেশন পেয়ে ভট্টচার্য্যি ও ফলারের ডুব মাল্লেন; কেউ কেউ কন্তু নদীর মত অন্তঃশীলে বইতে লাগলেন; ডুবে জল খেলে শিবের বাবার সাধ্যি নাই যে টের পান; তবুও অনেক জায়গায় চৌকি, থানা ও পাহারা বসে গেল। কিছুতেই কেহ কিছু কোত্তে পাল্লেন না; টাকার খুসবো পাঁজ রসুনের গন্ধ চেকে তুল্লে—শ্ৰাদ্ধসভা পবিত্র হয়ে উঠলো। বাগবাজারের মদনমোহন ও শ্রীপাট খড়দর শ্যামসুন্দর পর্য্যন্ত ব্ৰজের রসে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। শ্রাদ্ধের দিন সকাল বেলা রমাপ্রসাদবাবুর বাড়ী লোকারণ্য হয়ে গেলো গাড়ীবারেণ্ডা থেকে বাবুর্চ্চিখানা পর্য্যন্ত ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের ঠেল ধরলো; এমন কি, শ্রীক্ষেত্রে রথযাত্রায় জগন্নাথের চাঁদমুখ দেখতেও এত লোকারণ্য হয় না।
সপিণ্ডনের দিন সকালে রমাপ্রসাদবাবু বারাণসী গরদের জোড় পরে ভক্তি ও শ্রদ্ধার আধার হয়ে পড়লেন। ব্যালার সঙ্গে সভার জনতা বাড়তে লাগলো। এক দিকে রাজভাটেরা সুর করে বল্লালের গুণগরিমা ও আদিশূরের গুণকীর্ত্তন কত্তে লাগলো; একদিকে ভট্টাচার্য্যদের তর্ক লেগে গেল, দু দশ জন ভেরতমুখো কুলীন-দলপতিরা ভয় ও লজ্জায় সোয়ার হয়ে সভাস্থ হতে লাগলেন। দল দল কেত্তন আরম্ভ হলো, খোলের চাঁটিতে ও হরিবোলের শব্দে ডাইনিং রুমের কাচের গ্লাস ও ডিশের যেন ভয়ে কাঁপতে লাগলো; বৈমাত্রভাই ধূম করে মার শ্রাদ্ধ কচ্চেন দেখে জাতিত্বনিবন্ধন হিংসাতেই ব্ৰহ্মধৰ্ম্ম কাঁদতে লাগলেন; দেখে—আমিবিশন হাসতে লাগলেন।
