নীলকর সাহেবের দ্বিতীয় রিভোলিউসন হবে বিবেচনা করে (ঠাকুঘরে কে? না আমি কলা খাইনি) গভর্ণমেণ্ট তোপ ও গোরা সাহায্য চেয়ে পাঠালেন! রেজিমেণ্টকে রেজিমেণ্ট গোরা, গণ্, বোট ও এম্পেশিয়াল কমিশনর চল্লো;–মফস্বলের জেলে আর নিরপরাধীর জায়গা হয় না, কাগজে হুলথুল পড়ে গেল ও আণ্টর ব্রেড অবতার হয়ে পড়লেন।
প্রজার দুরবস্থা শুনতে ইণ্ডিগো-কমিশন বসলো, ভারতবর্ষীয় খুড়ীর চমকা ভেঙ্গে গেল। (খুড়ী একটু আফিম খান।) বাঙ্গালীর হয়ে ভারতবর্ষীয় খুড়ীর একজন খুড়ো কমিশনর হলেন। কমিশনে কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়লো। সেই সাপের বিষে নীলদর্পণ জন্মালো; তার দারুণ নীলকর-দল হন্নে হয়ে উঠলেন—ছাইগাদা, কচুবন, ও ফ্যানগোঁজলা ছেড়ে দিয়ে ঠাকুর-ঘরে, গিরজেয়, প্যালেসে ও প্রেসে ত্যাগ কল্লেন! শেষে ঐ দলের একটা বড় হঙ্গেরিয়ান হাউণ্ড পাদরী লং সাহেবকে কামড়ে দিলে।
প্যায়দারা পর্যন্ত ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হয়ে মফস্বলে চল্লেন। তুমুল কাণ্ড বেধে উঠলো। বাদাবুনে বাঘ (প্ল্যানটারস এসোসিয়েসন) বেগতিক দেখে নাম বদলে ল্যাণ্ডহোল্ডারস এসোসিয়েশন তুলসীবনে ঢুকলেন। হরিশ মলেন। লংএর মেয়াদ হলো। ওয়েলস্ ধমক খেলেন। গ্রাণ্ট রিজাইন দিলেন—তবু হুকুক মিটলো না। প্রকৃত বাঁদুরে হাঙ্গমে বাজারে নানা রকম গান উঠলো; চাষার ছেলেরা লাঙ্গল ধরে, মূলো মুড়ি খেতে খেতে —
গান
সুর—“হাঃ শালার গরু; তাল টিটকিরি ও ল্যাজমলা।”
উঠলো সে সুখ, ঘটলো অসুখ মনে, এত দিনে।
মহারাণীর পুণ্যে মোরা ছিলাম সুখে এই স্থানে।।
উঠলো খামার ভিটে ধান, গেল মানী লোকের মন,
হ্যানো সোনার বাংলা গান, পোড়ালে নীল হনুমানে।।
গাইতে লাগলো। নীরকরেরা এর উত্তরে ক্যাটল্ট্রেসপস বিল পাস করে, কেউ কোন কোন ছোট আদালতের উকীল জজদের শ্যামপীন খাইয়ে ও ঘরঘ্যাঁস করে, কেউ বা খাজনা বাজিয়ে, খেউরে জিতে কথঞ্চিৎ গায়ের জ্বালা নিবারণ কল্লেন।
নীলবানুরে লঙ্কাকাণ্ডের পালা শেষ হয়ে গেল, মোড়লেরা জিরেন পেলেন; ভারতবর্ষীয় খুড়ী এক মৌতাত চড়িয়ে আরাম কত্তে লাগলেন। কোন কোন আশাসোটাওয়ালা খেতাবী খুড়ো, অনুরেরী চৌকিদারী, তথা ছেলেপুলের আসেসরী ও ডেপুটী ম্যাজেষ্ট্ররীর জন্য সাদা দেবতার উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত হলেন। তথাস্তু!!
শ্যামচাঁদের অসহ্য টরচরে ভূত পালায়, প্রজারা খেপে উঠবে কোন কথা! মিউটীনি ও ক্লার্ক অ্যাকটের সভাতে তো শ্রীবৃদ্ধিকারীরা চটেই ছিলেন; নীলবানুরে হাঙ্গামে সেইটি বদ্ধমূল হয়ে পড়লো। বড় ঘরে সতীশ হলে, বড় বৌ ও ছোট বৌকে তুষ্ট কর্ত্তে কৰ্ত্তা ও গিন্নীর যেমন হাড় ভাজা ভাজা হয়ে যায়; শ্রীবৃদ্ধিকারী, সুইপিং ক্লাস ও নেটীভ কমিউনিটীকে তুষ্ট কত্তে গিয়ে, ইণ্ডিয়া ও বেঙ্গল গবর্ণমেণ্ট ও সেই রকম অবস্থায় পড়লেন।
১.২১ রমাপ্রসাদ রায়
হুতোমের পাঠক! আমরা আপনাদের পূর্ব্বেই বলে এসেছি যে, সময় কাহারও হাত ধরা নয়, সময় নদীর জলের ন্যায়, বেশ্যার যৌবনের ন্যায়, জীবনের পরমায়ুর ন্যায়; কারুরই অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে আমরা বড় হচ্চি, দেখতে দেখতে বছর ফিরে যাচ্চে; কিন্তু আমাদের প্রায় মনে পড়ে না যে, ‘কোন্ দিন যে, মত্তে হবে তার স্থিরতা নাই।’ বরং যত বয়স হচ্চে ততই, জীবিতাশা বশবর্তী হচ্চে; শরীর তোয়াজে রাখচি, আরসি ধরে শোননুটীর মত পাকা গোঁপে কলপ দিচ্চি, সিমলের কালাপেন্ডের বেহ বাহারে বঞ্চিত হতে প্রাণ কেঁদে উঠচে। শরীর ত্রিভঙ্গ হয়ে গিয়েছে, চশমা ভিন্ন দেখতে পাইনে, কিন্তু আশা ও তৃষ্ণা তেমনি রয়েচে, বরং ক্রমে বাড়ছে বই কমছে না। এমন কি, অমর বর পেয়ে প্রকৃতির সঙ্গে চিরজীবী হলেও মনের সাধ মেটে কি না সন্দেহ। প্রচণ্ড রৌদ্রক্লান্ত পথিক অভীষ্ট প্রদেশে শীঘ্র পৌঁছিবার জন্য একমনে হন হন করে চলেছেন, এমন সময় হঠাৎ যদি একটা গেঁড়ি-ভাঙ্গা কেউটে রাস্তায় শুয়ে আছে দেখতে পান, তা হলে তিনি যেমন চমকে ওঠেন, এই সংসারে আমরাও কখন কখন মহাবিপদে ঐ রকম অবস্থায় পড়ে থাকি। তখন এই হৃদয়ের চৈতন্য হয়। উল্লিখিত পথিকের হাতে সে সময় এক গাছ মোটা লাঠি থাকলে তিনি যেমন সাপটাকে মেরে পুনরায় চলতে আরম্ভ করেন, আমরাও মহাবিপদে প্রিয়বন্ধুদের পরামর্শ ও সাহায্যের তরে যেতে পারি; কিন্তু যে হতভাগ্যের এ জগতে বন্ধু বলে আহ্বান করবার একজনও নাই, বিপৎপাতে তার কি দুর্দশাই না হয়। তখন তার এ জগতে ঈশ্বরই একমাত্র অনন্যগতি হয়ে পড়েন। ধৰ্ম্মের এমনি বিশুদ্ধ জ্যোতি-এমনি গম্ভীর ভাব যে, তার প্রভা-প্রভাবে ভয়ে ভণ্ডামো, নাস্তিকতা বজ্জাতি সরে পলায়—চারিদিকে স্বর্গীয় বিশুদ্ধ প্রেমের স্রোত বহিতে থাকে—তখন বিপদসাগর জননীর স্নেহময় কোল হতেও কোমল বোধ হয়। হায়! সেই ধন্য, যে নিজ বিপদ সময়ে এই বিমল আনন্দ উপভোগ করবার অবসর পেয়ে, আপনা আপনি ধন্য ও চরিতার্থ হয়েছে। কারণ, প্রবল আঘাতে একবার পাষাণের মর্ম ভেদ কত্তে পাল্লে চিরকালেও মিলিয়ে যায় না।
ক্রমে ক্রমে আমরাও বড় হয়ে উঠলেম–ছলনা কু-আশায় আবৃত, আশার পরিসরশূন্য, সংসার সাগরের ভয়ানক শব্দ শোনা যেতে লাগলো। একদিন আমরা কতকগুলি সমবয়সী একত্র হয়ে, একটা সামান্য বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক কচ্চি, এমন সময়ে আমাদের দলের একজন বলে উঠলেন, “আরে আর শুনেছ? রমাপ্রসাদবাবুর মার সপিণ্ডীকরণের বড় ধূম। এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ; সহরের সমস্ত দলে, উদিকে কাশী-কৰ্ণাট পর্য্যন্ত পত্র দেওয়া হবে।” ক্রমে আমরা অনেকের মুখেই শ্রাদ্ধের নানা রকম হুজুক শুনতে লাগলেম। রমাপ্রসাদবাবুর বাপ ব্রাহ্মধর্ম্মপ্রচারক, তিনি স্বয়ং ব্রাহ্মসমাজের ট্রাষ্টি; মার সপিণ্ডীকরণে পৌত্তলিকতার দাস হয়ে শ্রাদ্ধ করবেন শুলে কার না কৌতূহল বাড়ে; সুতরাং আমরা শ্রাদ্ধের আনুপূৰ্ব্বিক নক্সা নিতে লাগলো।
