আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, তুমি যাবে কী করে? ছুটি যদি না পাও?
কাল যে রবিবার!
ওহ হো? তাও তো বটে। আচ্ছা, তুমিই যাও, আমি থাকছি।
পরদিন প্রাতে কলিকাতায় পৌঁছিয়া আবদুল কাদের বরাবর তাহার পিতার পীর সাহেবের বাড়িতে গিয়া উঠিল, এবং সাক্ষাতে যথারীতি তাঁহার কদমবুসি করিয়া হালিমার অবস্থা এবং তাহার আগমনের কারণ সমস্ত আরও করিল। শুনিয়া তিনি কহিলেন, –আচ্ছা, বাবা, দাওয়া করো আওর দোআ-ভি করো! মায় সুফী কো তোহারে সাথ ভেজ দেতা, যো যো তদ্বির মায় বাতা দেউঙ্গা উওহ্ ঠিক ঠিক করে গা—এন্শা আল্লাহ্ আওর কোই খাওফ নেহি রহে গা।
পীর সাহেব যাহাকে সুফী বলিয়া নির্দেশ করিলেন তিনি তাহার একজন প্রধান মুরীদ। তাহার প্রকৃত নাম সফিউল্লাহ্; কিন্তু ধার্মিক লোক বলিয়া সকলে তাহাকে সুফী সাহেব বলিয়া ডাকিত। পোশাক তিনি ঠিক সুফী ধরনেরই পরিতেন; কখনো রঙিন লুঙ্গি, কখনো ঢিলা পায়জামা, তাহার উপর আগুলফ লম্বিত ঢিলা কোর্তা, এবং সর্বোপরি ঘন-ঘুণ্টি দেওয়া দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো গোল পকেটওয়ালা বেগুনি মখমলের সদৃরিয়া আঁটা, মাথায় কলপ দেওয়া রেশমি সুতার কাজ-করা সাদা টুপি, পায়ে দিল্লিওয়ালা নাগরা–দেখিলে লোকে তাহাকে পরম সুফী বলিয়া ভক্তি না করিয়া থাকিতে পারিত না। লেখাপড়া বড় কিছু শেখেন নাই; তবে মছলেকায় কোরান মজিদের পারা দশেক মুখস্থ করিয়া নিম-হাফেজ হইয়াছিলেন। দেশে তাহার বড় কিছু নাই–এইখানেই পড়িয়া থাকেন আর হযরতের হুকুম তামিল করেন। কলিকাতাতেই জনৈক পীর-ভাইয়ের এক বিধবা আত্মীয়াকে পীর সাহেবের হুকুমেই বিবাহ করিয়াছেন। সংসারের কোনো চিন্তা-ভাবনা নাই, নিশ্চিন্ত মনে এবাদত বন্দেগি করেন আর পীর সাহেবের মজলিসে বসিয়া অবসর কাল কাটাইয়া দেন।
আবদুল কাদের ঔষধ ক্রয় করিতে যাইবার জন্য বাহির হইবে মনে করিতেছে এমন সময় তাহার খালাতো ভাই মজিলপুরের ফজলুর রহমান আসিয়া উপস্থিত হইল। সে আবদুল কাদেরকে দেখিয়া কহিল, বাঃ, ভাই সাহেব যে! কখন এলেন? বলিয়া কদমবুসি করিল।
আবদুল কাদের কহিল, এই সকালে। তুমি এখানে কদ্দিন?
বলছি, থামুন বলিয়া ফজলুর রহমান আবদুল কাদেরকে পার্শ্ববর্তী কামরায় লইয়া গেল। সেখানে তক্তপোশের উপর বসিয়া ফজলু কহিতে লাগিল, আমি এবার ডেপুটিশিপের জন্য ক্যান্ডিডেট হয়েছি। বি-এটা পাস করতে পাল্লে কোনো কথাই ছিল না–তবে হযরত আশা দিচ্ছেন, বলছেন, চেষ্টা কর, খোদার মরজিতে হয়ে যাবে। তা উনি যখন এতটা বলছেন তখন আমার তো খুবই ভরসা হয়–কী বলেন ভাই সাহেব?
আবদুল কাদের কহিল, সে তো বটেই–ওঁর দোয়ার বরকতে কী না হতে পারে!
হ্যাঁ–ভাই, একবার চেষ্টা করে দেখছি–অনেক সাহেব-সুবার সঙ্গে দেখাও করেছি। সেদিন আমাদের কমিশনার ল্যাংলি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তিনি খুব খাতির-টাতির করলেন–উঠে দাঁড়িয়ে শেকহ্যান্ড করে বসলেন–উঠে দাঁড়িয়ে, বুঝলেন ভাই সাহেব?
তা হলে বোধহয় তোমার চান্স আছে। ম্যাজিস্ট্রেট নমিনেশন দিয়েছে?
কমিশনার সাহেব বললেন, আমার কেসে সেসব লাগবে টাগবে না–একেবারে গভর্নমেন্ট থেকে হয়ে যাবে বোধহয়। তিনি আমাকে চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে বললেন…
করেছ দেখা?
না–করব এই দুই-এক দিনের মধ্যে। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে দেখা করে এই পরশু কলকেতায় এসেছি। হযরত যেদিন যেতে বলবেন সেইদিন যাব। উনি যখন দোয়া কচ্ছেন, তখন হয়ে যাবে নিশ্চয়–কী বলেন ভাই সাহেব?
খুব সম্ভব হয়ে যাবে…
সম্ভব কেন! হবেই নিশ্চয়–আমার খুব বিশ্বাস।
বেশ তো, হয় যদি, সে খুব সুখের বিষয় হবে।
ফজলুর রহমান জিজ্ঞাসা করিল, তা আপনি এখন কী মনে করে?
তোমার ভাবীর বড্ড অসুখ…
কী–কী অসুখ?
নিউমোনিয়া…
বাপ্ রে! নিউমোনিয়া! কে দেখছে?
ডাক্তার দেবনাথ সরকার–বরিহাটীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন। বেশ ভালো ডাক্তার আমাদের ওদিকেই বাড়ি–তিনি এই ওষুধ লিখে দিয়েছেন, আজই কিনে নিয়ে রাত্রের গাড়িতে ফিরতে হবে। আবদুল কাদের প্রেসক্রিপশন বাহির করিয়া দেখাইল।
ওঃ–নিউমোনিটিক সিরাম। হ্যাঁ, আজকাল সিরাম ট্রিটমেন্টই হচ্ছে। তা কোত্থেকে নেবেন?
কোনো সাহেব-বাড়ি থেকে নিতে হবে।
চলুন তবে বাথগেটের ওখান থেকে কিনে দেবখন।
তা হলে তো ভালোই হয়, আমি ওসব সাহেব-টাহেবদের দোকানে কখনো যাই। নি, –তুমি সঙ্গে গেলে ভালোই হয়।
আচ্ছা যাবখন খেয়েদেয়ে দুপুরবেলা।
দ্বিপ্রহরের আহারাদির পর দুই জনে ট্রামে চড়িয়া বাথগেটের দোকানে গেল। সেখান হইতে ঔষধ কিনিয়া চাঁদনী হইতে আরো কিছু জিনিসপত্র সগ্রহ করিয়া বাসায় ফিরিবার জন্য তাহারা ট্রামে চড়িল। ট্রাম চলিতে লাগিল; কিন্তু কন্ডাক্টর টিকিট নিতে আসিল না। ক্রমে যখন ট্রাম তাহাদের নামিবার স্থানের নিকটবর্তী হইয়া আসিল, তখন সে আসিল। আবদুল কাদের পয়সা বাহির করিতেছিল, কিন্তু ফজলুর রহমান তাড়াতাড়ি দুয়ানি বাহির করিয়া কহিল, –থাক থাক, আমিই দিচ্ছি– বলিয়া দুয়ানিটা কন্ডাকটরের হাতে দিয়া একটু ইশারা করিল। কন্ডাক্টর চলিয়া গেল।
আবদুল কাদের কহিল, ও কী! টিকিট না দিয়েই চলে গেল যে?
যাকটিকিট নিতে গেলে আরো চারটে পয়সা দিতে হত–ছ পয়সা করে কিনা। ও দু আনা ওরই লাভ–আমাদেরও কম লাগল।
