ঠিক সন্ধ্যার সময় বাবু আসিলেন।
আবদুল্লাহ্ তাড়াতাড়ি ইফতার করিয়া বাহিরে গেল এবং আবদুল কাদের খাটের উপর একটা মশারি লটকাইয়া তাহার উপর দুই পার্শ্বে দুইটি মোটা চাদর ফেলিয়া পরদা করিয়া দিল। একখানি চেয়ার আনিয়া বিছানার পার্শ্বে রাখিল। আবদুল্লাহ্ ডাক্তারবাবুকে লইয়া ভিতরে আসিল।
আবার পরদার হাঙ্গামা দেখিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, এর ভেতর থেকে তো স্টেথসকোপ ইউস্ করা যাবে না!
আবদুল কাদের উৎকণ্ঠিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন?
ডাক্তারবাবু একটু হাসিয়া কহিলেন, হার্ট আর লাংস-এর শব্দ অত্যন্ত মৃদু, খুব সাবধানে শুনতে হয়। এত কাপড়ের ভেতর থেকে স্টেথসকোপের নল চালিয়ে দিলে কেবল কাপড়ের ঘষার শব্দই শুনতে পাওয়া যাবে–লাংসের অবস্থা কিছুই বোঝা যাবে না। বাড়িতেও তো ওই রকম করা হয়েছিল, জিজ্ঞেস করুন আপনাদের দুলামিয়াকে।
আবদুল কাদের চিন্তিত হইয়া কহিল, তবে উপায়!
ডাক্তারবাবু কহিলেন, ওসব মশারি-টশারি তুলে ফেলুন, রোগীকে ভালো করে দেখতে দিন। না দেখে কি আন্দাজে চিকিৎসা চলে? আপনারা এজুকেটেড হয়েও যে এসব ওল্ড ফগিইজম ছাড়তে পারেন না, এ বড় আশ্চর্য!
আবদুল্লাহ্ কহিল, কি জানেন, ডাক্তারবাবু–পরদার মারামারিটা আমাদের ভেতর এত বেশি যে, এর একটু এদিক ওদিক হলেই মনে হয় বুঝি এক্ষণি আকাশ ভেঙ্গে মাথায় বাজ পড়বে! কিন্তু দরকারমতো পরদার একটু-আধটু ব্যতিক্রম কল্লে যে সত্যি সত্যিই বাজ পড়ে, সংসার যেমন চলছে তেমনিই চলতে থাকে, এটুকু পরীক্ষা করে দেখবার সাহস কারুর নেই!
ডাক্তারবাবু কহিলেন, তবে কি আমাকে আন্দাজেই চিকিৎসা কত্তে হবে?
আবদুল্লাহ্ কহিল, না, তা কল্লে চলবে কেন? এক কাজ করা যাক; রোগীর গায়ে আগাগোড়া একটা মোটা চাদর দিয়ে দিই, আপনি কাপড়ের উপর উপর থেকে স্টেথকোপ লাগিয়ে দেখুন। আবদুল কাদের কী বল?
আবদুল কাদের আমতা আমতা করিতে লাগিল। আবদুল্লাহ আবার দৃঢ়স্বরে কহিল, নেও, ওসব গোঁড়ামি রেখে দাও। ডাক্তারবাবু, আপনি মেহেরবানি করে একটু বাইরে দাঁড়ান, আমি সব বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।
ডাক্তারবাবু বাহিরে চলিয়া গেলেন। আবদুল্লাহর মাতা অনেক আপত্তি করিলেন। আবদুল কাদেরও লোকে শুনলে কী বলবে, আব্বা ভয়ানক চটে যাবেন, ইত্যাদি অনেক ওজর করিতে লাগিল, কিন্তু আবদুল্লাহ্ কাহারো কথায় কান দিল না। অবশেষে হালিমাও ক্ষীণ স্বরে আপত্তি জানাইল, কহিল, ভাইজান, কাজটা কি ভালো হবে? সকলেই নারাজ…
আবদুল্লাহ্ কহিল, নে, নে, তুই থাম; আমি যা কচ্ছি তা তোর ভালোর জন্যেই কচ্ছি…।
উনি যে অমত কচ্ছেন ভাইজান!
হ্যাঁঃ, ওর আবার মতামত! ওকে আমি ঠিক করে নেব, তুই ভাবিস নে। থাক পড়ে এই চাদর মুড়ি দিয়ে, নড়ি চড়ি নে। আম্মা, আপনি ও-ঘরে যান। আবদুল কাদের, ডাক ডাক্তারবাবুকে।
আবদুল্লাহ্ এরূপ দৃঢ়তার সহিত কথা বলিয়া এবং কাজ করিয়া গেল যে, কেউ আর বাধা দিবার সুযোগ পাইলেন না। কর বাবা যা ভালো বোঝ! এখন বিপদের সময়–খোদা। মা কবৃনেওয়ালা।
ডাক্তারবাবু আসিয়া যথারীতি পরীক্ষাদি করিয়া কহিলেন, একবার চোখ-মুখের ভাবটা দেখতে পাল্লে ভালো হত।
আবদুল্লাহ্ কহিল, আর কাজ নেই ডাক্তারবাবু; আজ এই পর্যন্ত থাক। এরপর যদি দরকার হয়, না হয় দেখবেন। লাংসের অবস্থা কেমন দেখলেন?
চলুন, বলছি বলিয়া ডাক্তারবাবু বাহিরে আসিলেন। আবদুল কাদের ও আবদুল্লাহ্ পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিল। ডাক্তারবাবু কহিলেন, নিউমোনিয়া!
আবদুল্লাহ্ শঙ্কিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, একধারে, না দুইধারেই?
ডান দিকটায় তো খুব স্পষ্ট, বাঁ-দিকটাতেও একটু কনজেশ্চান্ বোধ হচ্ছে।
তা হলে তো ভয়ের কথা!
হ্যাঁ একটু ভয়ের কথা বৈকি! তবে শুশ্রূষা ভালো রকম চাই। ওষুধ তো চলবেই; সঙ্গে সঙ্গে বুকে পিঠে অনবরত পুলটিস দিতে হবে। ঠিক যেমন যেমন বলে দেব, তার যেন একটুও ব্যতিক্রম না হয়। নার্সিঙের উপরেই সমস্ত নির্ভর কচ্ছে। আর একটা কথা ইনজেকশন ট্রিটমেন্ট কত্তে পাল্লে ভালো হয়—
আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, সে কী রকম?
এক রকম সিরাম বেরিয়েছে, সেটা চামড়া ফুঁড়ে পিচকারি করে দিতে হয়। রোগের প্রথম অবস্থায় দিতে পাল্লে খুবই ফল পাওয়া যায়। এখনো সময় আছে, –কিন্তু সিরাম। কলকেতা থেকে আনাতে হবে। চিঠি লিখে সুবিধে হবে না; কি তার করেও সুবিধে হবে না–কার দোকানে পাওয়া যায় না-যায়, অনর্থক দেরি হয়ে যেতে পারে। কাউকে যেতে হবে–আজ রাত্রের গাড়িতেই…
আবদুল্লাহ কহিল, তা বেশ, আমিই না হয় যাচ্ছি–এখনো ট্রেনের সময় আছে।
তাই যান। আমি লিখে দিচ্ছি–স্মিথ কি বাথগেট কি আর কোনো সাহেব-বাড়ি থেকে নেবেন–ফ্রেশ পাওয়া যাবে। আর নিতান্তই ওদের ওইখানে না পান, তো অগত্যা বটকৃষ্ণ পালের ওখানে দেখবেন। কালকের গাড়িতেই ফেরা চাই কিন্তু পরশু সকালেই ইনজেকশন দিতে হবে।
ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশন লিখিয়া এবং শুশ্রষার বিষয়ে ভালো রূপ উপদেশাদি দিয়া সব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জনের বাসায় চলিয়া গেলেন। আবদুল কাদের কহিল, দেখ ভাই, তুমি থাক, আমিই কলকেতায় যাই…।
আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্য হইয়া কহিল, কেন?
তুমি না থাকলে আমার দ্বারা ওসব হাঙ্গামা হয়ে উঠবে না ভাই–বড় ভয় হয়, কী কত্তে কী করে বসব–আমি ওসব বড় একটা বুঝি-সুঝি নে…।
