সেটা কি ভালো হল? ঠকানো হল যে!
ওঃ! আপনি পাড়াগায় থাকেন কিনা! এমন ঠকানো তো সব্বাই ঠকাচ্ছে… বলিতে। বলিতে উভয়ে ট্রাম হইতে নামিয়া বাসার দিকে চলিল।
সন্ধ্যার পর খানা খাইবার সময় পীর সাহেব সুফী সাহেবকে হালিমার রোগের জন্য যে যে তদ্বির করিতে হইবে তাহা বুঝাইয়া দিলেন। রাত্রি নয়টার সময় আবদুল কাদের তাহাকে লইয়া একখানি গাড়ি করিয়া স্টেশনের দিকে রওয়ানা হইল। ফজলুর রহমানও তাহাদিগকে গাড়িতে তুলিয়া দিবার জন্য সঙ্গে আসিল। গাড়ির ছাদে একটা বড় গোছের ট্রাংক, প্রকাণ্ড একটা বিছানার মোট, এবং কতকগুলি পোটলা-পুঁটলি দেখিয়া কুলিরা আসিয়া ঘিরিয়া দাঁড়াইল। সকলে গাড়ি হইতে নামিলে একটা কুলি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কৌ কিলাস কে টিকিট মুন্সীজী?
ফজলুর রহমান কহিল, ইন্টার।
কুলি জিজ্ঞাসা করিল, টিকিট হায়, না করূনা হোগা? করুনা হোয় তো জলদি কিজিয়ে, পয়লা ঘণ্টা হো গিয়া।
আচ্ছা, আচ্ছা, হাম জানতা হায়। বলিয়া ফজলুর রহমান গাড়োয়ানকে জিনিসপত্র নামাইতে কহিল। কুলি নিম্নস্বরে কহিল, কেয়া বখশিশ মিলেগা কহিয়ে, বিনা ওজনকে চড়া দেগা।
আবদুল কাদের কহিল, আরে নেই, নেই, হামলোগ ওজন করা লেগা।
ফজলুর রহমান কহিল, আপনি আসুন না ভাই সাহেব, আমি দিচ্ছি সব ঠিক করে। এই কুলি, কেন্যা লেগা বোলো।
কুলি কহিল, –একঠো রুপিয়া মিল যায়, নবাব সাব!
আরে নেই নেই, আট আনা দেগা, চড়া দেও।
নেই সাব–-আপ লোক আমীর আমী, একঠো রুপিয়া দে দিজিয়েগা।
তব্ নেহি হোগা, যাও…।
কুলি যাইতে যাইতে কহিল, যাইয়ে ওজন করাইয়ে, দো তিন রুপিয়া লাগ্ জায়েগা।
আবদুল কাদের কহিল, তা লাগে লাগুক, ওসব ঠকামি দিয়ে কাজ নেই।
ফজলুর রহমান একটু অগ্রসর হইয়া কহিল, –এই কুলি, আরে চল কুছ কম লেও…
বারে আনা দিজিয়েগা?
আচ্ছা চল।
নেই, ঠিক ঠিক কহ্ দিজিয়ে–বারে আনা পয়সা লেঙ্গে, ইস্ সে কমতি নেহি হোগা!
আচ্ছা আচ্ছা, দেঙ্গে চল! জারা ঠারো, হাম্ টিকিট লে আতে হেঁ।
আবদুল কাদেরের রিটার্ন টিকিট ছিল, কেবল সুফী সাহেবেরই জন্য টিকিট কিনিতে হইবে। ফজলুর রহমান ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। তাহার পর প্রায় পনের মিনিট হইয়া গেল, তবু সে ফিরিতেছে না দেখিয়া আবদুল কাদের উদ্বিগ্ন হইয়া তাহাকে খুঁজিতে গেল! কিন্তু টিকিটঘরে তাহাকে কোথাও দেখিতে পাইল না। এদিক-ওদিক খুঁজিয়া না পাইয়া ব্যস্ত হইয়া ফিরিয়া আসিতেছে, এমন সময় ফজলুর রহমান অন্য একদিক হইতে আসিয়া পড়িল। আবদুল কাদের কহিল, এত দেরি হল? আমি আরো তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।
ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? গাড়ির এখনো ঢের সময় আছে। চলুন।
সুফী সাহেব খাক-থু করিয়া থুতু ফেলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, টিকিট হো গিয়া, ফজলু মিয়া?
হ্যাঁ, চলিয়ে, দেতে হেঁ বলিয়া ফজলু সকলকে লইয়া গাড়িতে গিয়া উঠিল। গেটের ভিতর দিয়া আসিবার সময় আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কুলিরা কোথায় গেল? ফজলর রহমান হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, চুপ, আসুন, তারা আচে।
ইন্টার ক্লাস কামরার ধারে তাঁহারা দাঁড়াইয়া আছেন, এমন সময় কুলিরা অন্যপথে প্ল্যাটফর্মে ঢুকিয়া তাহাদের সম্মুখে আসিল। জিনিসপত্র তুলিয়া কুলি বিদায় করিয়া ফজলু নিম্নস্বরে কহিল, দেখুন, একটা লোকের কাছে একখানা রিটার্ন হাফ পাওয়া গেল। আজ শেষ তারিখ। তার যাওয়া হল না। আট গণ্ডা পয়সায় দিয়ে ফেলে। বেচারার সবটাই মারা যাচ্ছিল, আমাদেরও প্রায় ডেট্টাকা বেঁচে গেল।
সুফী সাহেব একবার খাক–থু করিয়া একগাল হাসিয়া কহিলেন, ও ফজলু মিয়া, আপ তো বড়া চালাক হায়। আপনে আজ বহুত পয়সা বাঁচা দিয়া।
ঘণ্টা পড়িল। তাড়াতাড়ি দুই জনে গাড়িতে চড়িয়া বসিলেন। ফজলুর রহমান বিদায় লইয়া গেল। গাড়ি ছাড়িয়া দিল।
.
২৫.
বরিহাটীতে ফিরিয়া আসিয়া আবদুল কাদের দেখিল তাহার পিতা আসিয়াছেন। দেখিয়াই তো তাহার চক্ষুস্থির! এক্ষণে হালিমার চিকিৎসার কী উপায় হইবে, তাহাই ভাবিতে গিয়া পিতার কদমবুসি করিতে সে যেটুকু বিলম্ব করিয়া ফেলিল, তাহা নিতান্তই দর্শনটুকু হইয়া উঠিল।
পিতা যথাসম্ভব ক্রোধ চাপিয়া কহিলেন, তোমরা বাকি কিছু রাখলে না, দেখছি!
আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, কেন, আব্বা?
ডাক্তারকে নাকি দেখানো হয়েছে?
হ্যাঁ, তা চাদর মুড়ি দিয়ে তো ছিল!
থাকলই-বা! কোন্ শরীফের ঘরের বউ-ঝিকে এমন করে ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষে করাতে দেখেছ? আর কি মুখ দেখাবার যো রইল? আবার শুনছি গা ছুঁড়ে দাওয়াই দেওয়া হবে–ওই ডাক্তারের সামনে বউ-মা গা আলগা করে দেবেন?
হাতের উপরটা একটুখানি আগা করে…
তা হলে বে-আবরু হল না? তোমরা কি জ্ঞান-বুদ্ধি একেবারে ধুয়ে খেয়েছ? আমি যদ্দিন আছি, বাবা, তদ্দিন এসব বে-চাল দেখতে পারব না। যা হবার তা হয়ে গেছে– ওসব ডাক্তারি-ফাক্তারির কাজ নেই, বাড়ি নিয়ে চল, আমি হাকিম সাহেবকে আনাচ্ছি– হযরতের কাছ থেকেও দোয়া-তাবিজ আনিয়ে দিচ্ছি, খোদা চাহে তো তাতেই আরাম হয়ে যাবে।
তার কাছে গিয়াছিলাম…
গিয়েছিলে? তবু ভালো! তা তিনি কী বললেন?
সুফী সাহেবকে পাঠিয়ে দিয়েছেন…
সুফী সাহেবকে?–কই, কোথায় তিনি?
বাইরের ঘরে আছেন।
সৈয়দ সাহেব তাড়াতাড়ি সুফী সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে চলিলেন।
