তা ডাক্তারি করাতে হয়, এইখানেই করাও–ও সদরে যাওয়া হবে না। আর সেখানে। নিয়ে গেলেই বা রাখবে কোথায়? বাড়ি দেবে কে তোমাকে?
কেন আকবর আলী সাহেবদের ওখানে…
কীহ্! আকবর মুন্সীর বাড়ি? তারা কোনকালের কুটুম আমাদের যে বউমাকে সেখানে পাঠাব? দু পাতা ইংরেজি পড়ে জ্ঞান-বুদ্ধি সব ধুয়ে খেয়েছ? কী বলে তুমি ওদের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে! ওরা কে, তা জান? ওদের সঙ্গে যে তোমরা বসা-ওঠা কর, সেই ঢের, তার উপর আবার অন্দর নিয়ে সেখানে যাওয়া! এ কি একটা কথা হল?
বৃদ্ধের ভাবগতিক দেখিয়া আবদুল্লাহ্ প্রমাদ গনিল। সত্যই তো সেখানে আর বাড়ি পাওয়া যাইবে না। এক আকবর আলীর আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন কোনো উপায় নাই; কিন্তু সৈয়দ সাহেব তাহার আভিজাত্যের গর্বে হালিমাকে সেখানে লইয়া যাইতে দিবেন না। আবদুল্লাহ্ দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া উঠিয়া গেল।
অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া কোনো উপায় স্থির করিতে না পারিয়া অবশেষে আবদুল্লাহ্ সেই রাত্রেই পশ্চিম পাড়ায় সরকার মহাশয়ের বাড়ির দিকে চলিল। সেখানে উপস্থিত হইয়া ডাক্তারবাবুর সহিত দেখা করিতে চাহিল। দেবনাথ তখন আহারে বসিয়াছিলেন। সংবাদ পাইয়া তাড়াতাড়ি আহার সারিয়া বাহিরে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, খবর কী? এত রাত্রে যে!
আবদুল্লাহ্ দুঃখিত চিত্তে কহিল, খবর বড় ভালো নয় ডাক্তারবাবু। হালিমাকে তো বরিহাটীতে নিয়ে যেতে পাচ্ছি নে।
কেন, কর্তার বুঝি অমত?
অমত বলে অমত! শুনে একেবারে চটেই উঠেছেন। সেখানে এক আমাদের মুন্সী সাহেবের বাড়ি ছাড়া আর উঠবার জায়গা নেই, কিন্তু সেখানে তিনি কিছুতেই নিয়ে যেতে দেবেন না।
কেন?
তারা নাকি ছোটলোক!
ওঃ! তবে একটা বাড়ি ভাড়া নেবেনখন।
বাড়ি কোথায় পাব? মুসলমানকে কেউ বাড়ি দেয় না।
বাঃ! কেন দেবে না? চেষ্টা কল্লে নিশ্চয়ই পাবেন। ভাড়া পাবে–বাড়ি দেবে না কেন?
চেষ্টা এর আগে ঢের করে দেখা গেছে। কোনোমতেই পাওয়া গেল না। আবদুল কাদের তো আজ ক বছর মুন্সী সাহেবদের বাড়িতেই কাটিয়ে দিলে।
দেবনাথ একটু চিন্তা করিয়া কহিলেন, আচ্ছা, আমার কোয়ার্টার ছেড়ে দিই যদি তা হলে আসতে পারবেন?
আবদুল্লাহ্ একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিল, আপনার কোয়ার্টার ছেড়ে দেবেন? আর আপনি?
আমার ফ্যামিলি তো এখন ওখানে নাই; স্বচ্ছন্দে ছেড়ে দিতে পারব। আমি হয়। বাইরের কামরাটায় থাকবখন, না হয় হসপিটাল এসিস্টেন্টের ওখানে…
সত্যিই বলছেন ডাক্তারবাবু?
বাঃ! সত্যি বলছি নে তো কি আর মিথ্যে বলছি? আমার ওসব প্রেজুডিস নেই।
আবদুল্লাহ্ আবেগভরে দেবনাথের হাত ধরিয়া কহিল, ডাক্তারবাবু, কী বলে আপনাকে ধন্যবাদ দেব তা আমি ভেবে পাচ্ছি নে। বাস্তবিক আমি…
থাক, থাক। আপনি এখন যান; গিয়ে সব বন্দোবস্ত ঠিক করে ফেলুন; কাল সকালেই রওয়ানা হতে হবে। দেরি হয়ে গেলে রোগীর অবস্থা সঙ্কট হয়ে দাঁড়াবে।
.
২৪.
ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টারটি পাওয়া গিয়াছে শুনিয়াও সৈয়দ সাহেব প্রথমটা রাজি হন নাই। কিন্তু আবদুল্লাহ্ একেবারে নাছোড়বান্দা হইয়া জেদ করিয়া হালিমাকে পরদিন বেলা দেড় প্রহরের মধ্যেই নৌকায় তুলিয়া ফেলিল। কেবল সে হালিমাকে লইয়াই ছাড়িল, এমন নহে। প্রবল বাধা ও গুরুতর আপত্তি খণ্ডন করিয়া সে সালেহাকেও লইয়া চলিল। নহিলে রোগীর শুশ্রূষা করিবে কে? আবদুল্লাহর মাতাও সঙ্গে গেলেন।
মাঝিরা নৌকা খুব টানিয়া বাহিয়া লইয়া চলিল! আসরের পূর্বেই তাহারা বরিহাটীর ঘাটে পৌঁছিলেন। নদীর তীরেই ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার। হালিমাকে সাবধানে পালকিতে করিয়া বাসায় উঠানো হইল। ডাক্তারবাবু বলিয়া পাঠাইলেন রোগীকে এখন একটু বিশ্রাম করিতে দেওয়া হউক; যদি একটু নিদ্রা হয় ভালোই, যদি না হয়, সন্ধ্যার পরই তিনি একবার ভালো করিয়া পরীক্ষা করিবেন।
আবদুল কাদেরের নিকট সংবাদ দেওয়া হইল; সে তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া আসিল; এবং আবদুল্লাহ্ কেমন করিয়া এমন অসাধ্য সাধন করিল তাহা ভাবিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। সে হাসপাতালে গিয়া ডাক্তারবাবুকেও অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাইয়া আসিল।
ডাক্তারবাবুর ঝি দ্বিপ্রহরে বাড়ি চলিয়া গিয়াছিল; সন্ধ্যার পূর্বেই সে আসিল। পরিবার নাই; ডাক্তারবাবু ছোট ডাক্তারবাবুর বাড়িতে খান। কাজেই ঝট-পাট দেওয়া ছাড়া তাহার আজকাল বড় একটা কাজ নাই। সে ধীরেসুস্থে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করিয়া লোকজন দেখিয়া মনে করিল, বুঝি গিন্নি মা-রা আসিয়াছেন। তাই সে একগাল হাসিয়া ঘরে উঠিয়া গেল; কিন্তু ঘরের ভিতর সব অপরিচিত মুখ দেখিয়া অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, আপনারা কারা গো?
আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, কেন?
না, তাই জিজ্ঞেস কচ্ছি, আপনাদের নতুন দেখনু কিনা…
এমন সময় হালিমা ক্ষীণস্বরে কহিল, ভাইজান, একটু পানি!
ঝি দুয়ারের বাহিরে কপাট ধরিয়া দাঁড়াইয়াছিল। হালিমার কথা শুনিয়া সে তাড়াতাড়ি। কপাট ছাড়িয়া দিয়া পায়ের আঙুলের উপর ভর করিয়া বলিয়া উঠিল, –মা গো! এরা যে মোচম্মান! ডাক্তারবাবু কেমন নোক গো! মোচম্মান ঘরে এনেচে! আমি এই চনু, আর এস্বনি, এদের বাড়ি আর কাজ করবনি! মা গো! কী হবে গো–এই সন্ধেবেলা নাইতে হবে গিয়ে…।
এরূপ বকিতে বকিতে এবং ডিঙ্গী মারিয়া পা ফেলিতে ফেলিতে সে উঠান পার হইয়া চলিয়া গেল।
