যথাসময়ে ডাক্তারবাবুকে রোগিণীর ঘরে লইয়া যাওয়া হইল। কবিরাজ মহাশয়কে যে উপায়ে হাত দেখানো হইয়াছিল, তাহাকেও সেই উপায়ে দেখানো হইল। তাহার পর তিনি থার্মোমিটার বাহির করিয়া আবদুল্লাহর হাতে দিলেন। আবদুল্লাহ্ টেম্পারেচার লইয়া আসিলে দেখা গেল, জ্বর ১০৪ ডিগ্রি উঠিয়াছে। নানারূপ জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া ডাক্তারবাবু জানিতে পারিলেন যে, জ্বর বৈকালের দিকেই বাড়ে এবং সকালে একটু কম থাকে। নিদ্রা, কোষ্ঠ, কোষ্ঠাশ্রিত বায়ু, শরীরের কোনো স্থানে বেদনা আছে কি না, কাশি ইত্যাদি সম্বন্ধে তিনি তন্নতন্ন করিয়া জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন।
তাহার পর একটু ভাবিয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, চেস্ট-টা একটু এজামিন করা দরকার।
আবদুল মালেক জিজ্ঞাসা করিলেন, কী?
আবদুল্লাহ্ বুঝাইয়া দিতেই তিনি চোখমুখ উল্টাইয়া বলিয়া উঠিলেন, না, না, সে ধরগে’ তোমার কেমন করে হবে!
ডাক্তারবাবু দৃঢ়স্বরে কহিলেন, তা নইলে তো আমি কিছু বুঝতে পাচ্ছি নে। না বুঝে চিকিৎসাও তো করা যায় না।
আবদুল্লাহ্ কহিল তবে উপায়?
ডাক্তারবাবু কহিলেন, এক কাজ করুন। স্টেথসকোপটা কানে দিয়ে পরদার কাছে বসি, আপনারা কেউ ওধারটা নিয়ে যেখানে যেখানে বসাতে বলি, ঠিক সেইখানে সেইখানে চেপে ধরুন।
এখন হালিমার বুকে স্টেথসূকোপ বসাইতে যাইবে কে? সকলে এ উহার মুখের দিকে চাহিতে লাগিলেন। আবদুল মালেক আবদুল্লাহর কানে কানে জিজ্ঞাসা করিলেন, সালেহা পারবে না?
আবদুল্লাহ্ কহিল, দেখুন বলে।
আবদুল মালেক পরদার পার্শ্বে দাঁড়াইয়া সালেহাকে ইশারা করিয়া ডাকিয়া, কী করিতে হইবে, ফিসফিস করিয়া বুঝাইয়া দিলেন। ডাক্তারবাবু নলটি কানে দিয়া পরদা ঘেঁষিয়া বসিলেন, এবং প্রথমেই বুকের যেখানটায় ধুকধুক করে, সেইখানে বসাইতে বলিলেন।
কিন্তু নল কানে দিয়া মিনিট দুই বসিয়া থাকিয়াও তিনি কোনো শব্দ শুনিতে পাইলেন না; আবার কহিলেন, ভালো করে চেপে ধরুন। তবু কোনো ফল হইল না।
নাঃ, আর কাউকে বলুন বলিয়া ডাক্তারবাবু কান হইতে স্টেথকোপ নামাইয়া ফেলিলেন। ক্রমে বাড়ির স্ত্রী-পরিজন, বালক ইত্যাদি যে যেখানে ছিল, সকলকে দিয়া চেষ্টা করা হইল; কোনো ফল হইল না। যদিও-বা এক আধবার একটু শব্দ শুনিতে পাওয়া যায়, তাহাও মশারির, পরদার কাপড়ের, এবং ধবৃনেওয়ালার হাতের ঘষায় সব গুলাইয়া যায়।
নাঃ, কিছু হল না বলিয়া অবশেষে ডাক্তারবাবু উঠিয়া পড়িলেন। পরে আবদুল্লাহর দিকে চাহিয়া একটু বিরক্তির স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনিও কি পারেন না?
আবদুল্লাহ্ মৃদুস্বরে ইংরেজিতে কহিল, যতক্ষণ এ-বাড়িতে আছি ততক্ষণ পারি না।
শ্শ্শ্–ননসেন্স বলিয়া ডাক্তারবাবু বাহিরে যাইবার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইলেন।
বাহিরে আসিয়া আবদুল্লাহকে একটু আড়ালে ডাকিয়া লইয়া ডাক্তারবাবু কহিলেন, কেস সম্বন্ধে ডেফিনিট কিছু বুঝতে পারা গেল না, তবে ভাবে বোধ হচ্ছে, নিউমোনিয়া সেটু-ইন করেছে। আবদুল্লাহ্ একটু ভীত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, তবে উপায়?
উপায় সাবধানে চিকিৎসা! কিন্তু এখানে রাখলে তো চিকিৎসা চলবে না– বরিহাটীতে নিয়ে যেতে হবে।
আপনি একটু দয়া করে আসতে পারবেন না কি?
আমি আসতে পারি, কিন্তু রোজ তো পারব না! অথচ এ রোগীকে দুবেলা দেখা দরকার।
ওঃ! তবে তো বড় বিপদের কথা হল দেখি!
হ্যাঁ, তা এখানে রাখতে চাইলে বিপদের কথা বৈকি!
দেখি একবার বলে; কিন্তু এরা যেরকম গোঁড়া, তাতে যে ওকে সদরে নিয়ে যেতে দেবেন, এমন তো ভরসা হয় না।
কেন? আপনি জোর করে বলবেন; যদি বাঁচাতে চান, তবে কাল সকালেই নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করবেন। এর পরে কিন্তু ওঁকে রিমুভ করা আনসেফ হয়ে পড়বে।
আচ্ছা দেখি কদ্দূর কী কত্তে পারি।
তবে আমি এখন বাড়ি চলোম। কাল সকালেই একবার দেখে রওয়ানা হব। ভিজিটের টাকা লইয়া ডাক্তারবাবু চলিয়া গেলেন।
হালিমাকে সদরে লইয়া যাইবার প্রস্তাবে বৃদ্ধ সৈয়দ সাহেব তো একেবারে আকাশ হইতে পড়িলেন। বসিয়া ছিলেন–একেবারে আধ হাত উঁচু হইয়া চক্ষু কপালে তুলিয়া উঠিলেন সে কী! মান-সম্ভ্রম তোমরা আর কিছু রাখলে না দেখছি!
আবদুল্লাহ্ বেশ একটুখানি প্রতিবাদের সুরে কহিল, মান-সম্ভ্রমের কথা পরে, জান। বাঁচান আগে। ডাক্তারবাবু যেমন বললেন, তাতে এখানে রেখে চিকিৎসা চলতে পারে না, অথচ রোগ কঠিন।
সৈয়দ সাহেব বিরক্ত হইয়া কহিলেন, নাঃ, এখানে তো আর কারো কোনোদিন চিকিৎসা হয় নি, তোমরা খোদার উপর ভরসা করতে শেখ নিওটা ইংরেজি পড়ারই দোষ। খোদা যদি হায়াত রেখে থাকেন, তবে যেখানেই থাকুক না কেন, চিকিৎসা হবেই। তগদির কখনো রদ হবার নয়।
তাই বলে কি তদ্বির কত্তে খোদা মানা করেছেন?
না, তা মানা করবেন কেন? বেশ তো, তদবির কর। কবিরাজ মশায় দেখছেন, না হয় কলকাতা থেকে হাকিম সাহেবকেও আনাও। তিনি আমাদের হযরতের ঘরেও দাওয়া করে থাকেন–আর আমাদের পীর ভাই–খুব যত্ন করে দাওয়া করবেন।
আবদুল্লাহ্ কহিল, আজকালকার হাকিমদের চিকিৎসার উপর আমার বিশ্বাস নেই। ওদের সেই চৌদ্দ পুরুষের তৈরি কতকগুলো নোকা আছে, সেইগুলো আন্দাজে চালায়, যেটা খাটে সেটাতে রোগ সারে, আর যেটা না খাটে, তাতে কিছুই হয় না। হালিমার যে অবস্থা, তাতে হাকিমের হাতে দিতে আমার ভরসা হয় না। ডাক্তারি চিকিৎসাই করাতে চাই।
