ভালো ডাক্তার বা এখানে কই?
কেন? সদর থেকে আনা যাক।
আবদুল কাদের কহিল, –ডাক্তার দেখাতে কি অব্বিা রাজি হবেন? ডাক্তারি ওষুধের তিনি নামই শুনতে পারেন না।
তা না শুনতে পাল্লে চলবে কেন? রোগটা কঠিন তাতে সন্দেহ নেই; চল, বরং তাকে বলি গিয়ে।
কিন্তু সৈয়দ সাহেব ডাক্তারের কথা শুনিয়া প্রথমটা চটিয়াই উঠিলেন এবং কহিলেন, হ্যাঁঃ! এই রমজান শরীফে শরাবটরাব খাইয়ে এখন বউটার আখেরাতের সর্বনাশ কর আর কি! কেন, কবিরাজ মশায় তো বেশ দাওয়া দিচ্ছেন…
আবদুল্লাহ কহিল, –কিন্তু তাতে তো কোনো উপকার হচ্ছে না, জ্বর ক্রমেই বেড়ে চলেছে, তাইতে সন্দেহ হচ্ছে…
না, নাঃ! তোমরা অনর্থক সন্দেহ কচ্ছ, বাবা। আর সন্দেহ কিসের? খোদা যদি হায়াত রেখে থাকেন তো এতেই রোগ সেরে যাবে। তার উপর আমি যেসব তদ্বির কচ্ছি, এতে দেখো আল্লাহ রহম দেবে নিশ্চয়। ও-সব নাচিজ আর খাইয়ে কাজ নেই।
আবদুল্লাহ্ জেদ করিয়া কহিল, –তা হুজুর তদ্বির কচ্ছেন, ভালোই হচ্ছে। কিন্তু দোয়ার সঙ্গে দাওয়া কত্তেও তো আল্লাহতালা হুকুম করেছেন…
তা দাওয়া তো চলছেই, আবার কেন!
ও কবিরাজি দাওয়াতে বড় ফল হবে বলে বোধ হয় না; আর আজকাল ওরা সকল রোগ চিনতেই পারে না–অবিশ্যি যেটা ধত্তে পারে, ওষুধের গুণে সেটাতে উপকার দেখায় বটে…
সৈয়দ সাহেব বিরক্তির সহিত কহিলেন, –আর ডাক্তার ব্যাটারা এলেই অমনি রোগ ধরে ফেলে! তা হলে আর দুনিয়ায় কেউ মরত না।
আবদুল্লাহ কহিল, –সে কথা হচ্ছে না; ডাক্তারেরা কবিরাজদের চেয়ে অনেক বেশি। রোগী নিয়ে নাড়াচাড়া করে কিনা, তাই রোগ সম্বন্ধে এদের জ্ঞান কবিরাজদের চেয়ে বেশি। জন্মে। তা ওষুধ না হয় কবিরাজ মশায়ই দেবেন, একবার একজন ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ কল্লে বোধহয় মন্দ হত না।
সৈয়দ সাহেব যেন একটু নরম হইলেন। ভাবিয়া কহিলেন, ডাক্তার দেখে আর কী-ই বা এমন বেশি বুঝবে–একটুখানি নাড়ি টিপে দেখা ছাড়া তো আর কিছু হবে না, সে তো কবিরাজও দেখছে।
আবদুল্লাহ্ কহিল, –ডাক্তারেরা নাড়ির উপর বড় বেশি নির্ভর করে না, আর আর সব লক্ষণ ধরে রোগ নির্ণয় করে।
তবে অবস্থা গিয়ে বললেই তো হয়, ডাকার দরকার কী?
কী কী অবস্থায় কোন কোন বিষয়ে সে জানতে চাইবে, তা আমরা কী করে বুঝব? ডেকে আনলে সে যা যা জিজ্ঞাসা করবে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে পারা যাবে…
কাকে ডাকবে, ঠিক করেছ?
ঠিক এখনো করি নি; আবদুল কাদের আজ শেষরাত্রেই রওয়ানা হচ্ছে, সে কাল সদর থেকে ভালো করে জেনেশুনে একজনকে নিয়ে আসবে।
কাছারি খুলবে যে কাল! কী করে আসবে ও?
ছুটি নেবে।–তা এক কাজ কল্লে হয়। নেওয়াজ ভাই সাহেবকে বরং সঙ্গে দিলে হয়। আবদুল কাদের যদি না-ই আসতে পারে, তো উনিই ডাক্তার নিয়ে আসবেনখন।
অনেক চিন্তার পর সৈয়দ সাহেব এই প্রস্তাবেই মত দিলেন; কিন্তু বারবার করিয়া সাবধান করিয়া দিলেন, যেন ডাক্তারি ঔষধ খাওয়ানো না হয়। বরং তেমন বেগতিক দেখিলে কলিকাতা হইতে হাকিম গোলাম নবী সাহেবকে আনা যাইবে।
পরদিন সদরে পৌঁছিয়াই আবদুল কাদের কোন ডাক্তারকে পাঠানো যাইবে সে সম্বন্ধে। আকবর আলী সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করিল। অবস্থা শুনিয়া আকবর আলী কহিলেন, — এখানকার নতুন অ্যাসিস্টান্ট সার্জন শুনিছি ডাক্তার ভালো…
কে? দেবনাথবাবু?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, –তার বাড়ি আপনাদের ওইদিকে…
পশ্চিম পাড়ায়–ভোলানাথবাবুর ছেলে। তা উনি গেলে তো ভালোই হয়।
তা যাবেন বৈকি, বেশি দূর তো নয়…
চলুন না একবার তার কাছে…
এখনই? কাছারির সময় হয়ে এল যে!
আচ্ছা কাছারি যাবার পথে?
তাই।
বেলা প্রায় এগারটার সময় হাসপাতালে গিয়া তাহারা ডাক্তার দেবনাথ সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলেন এবং সকল কথা তাহাকে খুলিয়া কহিলেন। ডাক্তার বাবু একটু ভাবিয়া কহিলেন, আমার হাতে দুটো কেস রয়েছে, সন্ধের সময় দেখতে যাবার কথা…
আকবর আলী কহিলেন, –অমূল্যবাবুকে বলে গেলে হবে না? অমূল্য বাবুও একজন এল-এম, এফ, স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করেন।
ডাক্তার একটু ভাবিয়া কহিলেন, –আচ্ছা দেখি, সাহেবকেও একবার বলতে হবে…
আবদুল কাদের কহিল, –কিন্তু আজই রওয়ানা হতে হবে–সন্ধের পরেই পৌঁছানো চাই–কাল সকালে অবস্থাটা দেখে দু প্রহরের মধ্যে ফিরতে পারবেন।
ডাক্তারবাবু কহিল–আচ্ছা আমি দেখি…
আকবর আলী কহিলেন, শুধু দেখি বললে হবে না ডাক্তারবাবু–আপনাকে যেতেই হবে।
আচ্ছা আমি একবার সাহেবের সঙ্গে আর অমূল্যবাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আপনার আপিসে খবর পাঠাবখন…
আবদুল কাদের কহিল–নৌকা তয়ের আছে–আমি যে নৌকোয় এসেছি, আপনি সেইটেতেই যেতে পারবেন। আর দেখি যদি আমি ছুটির যোগাড় করতে পারি, তো আমিও যাবখন সঙ্গে।
ডাক্তারবাবু আশ্বাস দিয়া উঠিয়া পড়িলেন। একদিকে সৌভাগ্যক্রমে ডাক্তার সাহেব অনুমতি দিলেন এবং অমূল্যবাবুও কেস দুটি একবার দেখিয়া আসিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত হইলেন; কিন্তু অন্যদিকে দুর্ভাগ্যক্রমে আবদুল কাদের ছুটি পাইল না। ম্যাজিস্ট্রেট নূতন। সাহেব, লোকটা সুবিধার নহে।
যাহা হউক খোদা নেওয়াজ ডাক্তার লইয়া বেলা প্রায় দুইটার সময় রওয়ানা হইয়া গেল। খোদা নেওয়াজ মাল্লাদিগকে ডবল ভাড়া কবুল করিয়া জোরে বাহিবার জন্য উৎসাহিত করিতে লাগিল। তাহারাও প্রাণপণে বাহিয়া সন্ধ্যার পরেই একবালপুরের ঘাটে নৌকা ভিড়াইয়া দিল।
