হালিমা কাছেই ছিল, শুনিয়া তাহার মনটা বড় খারাপ হইয়া গেল। বড় বিবি মৃদুস্বরে কহিলেন, ও, গোসা করে বিবিরা চলে গিয়েছেন!
বিবিরা খাইতে বসিলেন। কেহ-বা নখে করিয়া একআধটা দানা অতি আস্তে আস্তে মুখে তুলিয়া দিতে লাগিলেন, কেহ-বা এক লোকমা মুখে দিলেন তো আর এক লোকমা কবে দিবেন তাহার ঠিকানা করা অসম্ভব হইয়া উঠিল। প্রায় এক ঘণ্টা, সকলে দস্তরখানে বসিয়া রহিলেন; কিন্তু সকলের রেকাবিতেই রাশীকৃত গোশত ও পোলাও রহিয়া গেল। শরীফ ঘরের দস্তুর অনুসারে কেহ কেহ বাটী হইতে আহার করিয়াই আসিয়াছিলেন, তাহারা কেবল সম্মান রক্ষার জন্য একবার দস্তরখানে বসিয়াছিলেন মাত্র। যাহাদিগের সত্যই পেটে ক্ষুধা ছিল, তাহারাও পার্শ্ববর্তিনীর স্থূপীকৃত রেকাবির লজ্জায় নিজের স্থূপ অধিক ক্ষয় করিতে পারিলেন না।
যাহা হউক, কোনোক্রমে আহার-পর্ব খতম হইল। বাঁদীরা সিলিচি ও বদনা লইয়া একে একে বিবিদের হাত ধোয়াইতে আরম্ভ করিল। সে হাত ধোয়ানোও এক বিষম ব্যাপার! বাঁদী বেচারিদের ঝুঁকিয়া থাকিতে থাকিতে কোমরে ব্যথা ধরিয়া যায়, তথাপি বিবি একবার এক কোষ পানি হাতে লইয়া আবার যে দ্বিতীয় কোষ এ-জীবনে লইবেন, বেচারারা এরূপ ভরসা করিতে সাহস পায় না!
হাত ধোওয়া ব্যাপার চলিতেছে, এমন সময় রাবিয়া ও মালেকাকে বারান্দার উপর উঠিতে দেখিয়া একটি অল্পবয়স্কা অদূরদর্শিনী বিবি বলিয়া উঠিলেন, –এই যে, বাঃ! এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনারা? আমরা তো খেয়ে উঠলাম!
রাবিয়া বেশ একটু পরিষ্কার গলায় কহিল, –আমাকে ভাই তাড়াতাড়ি একটু বাড়িতে যেতে হল–একটা মস্ত কাজ ভুলে এসেছিলাম–না গেলে হয়তো বড় ক্ষতি হয়ে যেত…
কী এমন কাজ ছিল যে খাবার সময় তাড়াতাড়ি কাউকে না বলে চলে গেলেন?
খানকয়েক নোট বালিশের নিচে রেখেছিলাম, তখন তাড়াতাড়ি আসার সময় তা তুলে রাখতে মনে হয় নি। হঠাৎ মনে পড়ে গেল… তা থাক, আপনাদের খাওয়া হয়ে গেছে বেশ হয়েছে, আমরা তো ঘরেরই মেয়ে-বউ, আমরা খেয়ে নেবখন।
হালিমা সাড়া পাইয়া তাড়াতাড়ি কোনোমতে হাত ধুইয়া ছুটিয়া আসিল–তাহার মনে হইতেছিল, বুঝি রাবিয়ার বড়ই অভিমান ও দুঃখ হইয়াছে। কিন্তু তাহার হাসিমুখ দেখিয়া হালিমার মনের ভার অনেকটা লঘু হইয়া গেল। রাবিয়া তাহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিল, বাঃ, বেশ তো! আমাদের ফেলে নিজেরা খেয়ে এলে। এখন চল, আমাদের খাওয়াবে বসে।
ইহারা চলিয়া গেলে বিবিদের মধ্যে একটা সমালোচনার গুঞ্জন উথিত হইল। কেহ কহিলেন, –যাক, বাঁচা গিয়েছে। আবার কেহ-বা কহিলেন, –হলে কী হয়? মেয়েটা খুব চালাক বটে! সবদিক বজায় রেখে গেল।
.
২৩.
মসজিদ আকামতের দিন দুই পরেই হালিমার জ্বর হইল। প্রথম দিন জ্বর তেমন বেশি হয় নাই, কিন্তু দ্বিতীয় দিনে জ্বরের বেগটা কিছু প্রবল দেখা গেল। তৃতীয় দিনও সেইভাবে কাটিল।
গ্রামে এক বৃদ্ধ কবিরাজ ছিলেন; সচরাচর তিনিই এ-বাটীর চিকিৎসা করিতেন। তাঁহাকে ডাকা হইল। রোগিণী মশারির ভিতর রহিল, তাহার পার্শ্বে একটা দোহারা রঙিন কাপড়ের পরদা লটকানো হইল। পরদার ভিতরে হালিমার মাতা, শাশুড়ি এবং আরো দুই এক জন স্ত্রী-পরিজন রহিলেন। কবিরাজ আসিয়া পরদার বাহিরে বসিলেন এবং রোগিণীর অবস্থা সম্বন্ধে নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। আবদুল কাদের এক একটি প্রশ্ন শুনিয়া পরদার ভিতর যায় এবং একটু পরে আবার বাহিরে আসিয়া উত্তরটি কবিরাজ মহাশয়কে শুনায়। এইরূপে মোটামুটি অবস্থা জানিয়া তিনি একবার রোগিণীর হাত দেখিতে চাহিলেন। আবদুল কাদের ভিতরে গিয়া পরদার এক প্রান্ত সামান্য একটু উঁচু করিয়া ধরিল এবং কবিরাজ মহাশয়কে হাত বাড়াইয়া দিতে কহিল। কবিরাজ মহাশয় পরদার ভিতর হাত। বাড়াইয়া দিলেন; আবদুল কাদের তাহার হাতের আঙুল ধরিয়া হালিমার বাম হস্তের কবজির উপর ধরিয়া রহিল; কবিরাজ তিন আঙুলে নাড়ি টিপিয়া ধরিয়া যতটা সম্ভব উহার গতি অনুভব করিতে চেষ্টা করিলেন, এবং একটু পরে পরদার ভিতর হইতে হাত টানিয়া লইলেন।
নাড়ি পরীক্ষা হইয়া গেলে সকলে উৎসুক হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন দেখলেন, কবিরাজ মশায়?
কবিরাজ কহিলেন, –জ্বরটা প্রবল বটে; বাত-শ্লেষ্মর ক্ষেত্র বলে সন্দেহ হচ্ছে–তবে। ভয়ের কোনোই কারণ নেই, গোড়াতেই যখন চিকিৎসা আরম্ভ হচ্ছে, তখন ওটা কেটেই যাবে।
তাহার পর তিনি ঔষধ-পথ্যাদির ব্যবস্থা করিয়া একটি টাকা দর্শনী পাইয়া প্রস্থান করিলেন।
ঔষধ রীতিমতো চলিতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে সৈয়দ সাহেবের দোয়া, তাবিজ, পানি পড়া এবং মক্কাশরীফ হইতে আনীত কোরবানি-করা উটের শুকনো গোশত ঘষা প্রভৃতিও প্রয়োগ করা হইল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। আরো দুই দিন কাটিয়া গেল, কিন্তু রোগের কোনোই উপশম দেখা গেল না।
এদিকে আবদুল কাদেরের ছুটি ফুরাইয়াছে, আগামীকল্যই তাহাকে সদরে হাজির হইতে হইবে। স্ত্রীর এই অবস্থা; এক্ষণে কী করিবে, ভাবিয়া পাইল না। কবিরাজ বলিতেছেন, ভয় নাই; কিন্তু আবদুল্লাহর মনের সন্দেহ ঘুচিতেছে না। সে কহিল, –রোগটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বোধ হচ্ছে!
আবদুল কাদের কহিল, –তাই তো। এখন কী করা যায়?
আমি বলি, ডাক্তার দেখানো যাক; ও কবিরাজ-টবিরাজের কর্ম নয়।
