এইখানে মৌলুদ-খান সাহেবের ইঙ্গিতমতো মজলিসের সকলেই উঠিয়া দাঁড়াইয়া। তাহার সহিত সুর মিলাইবার বৃথা চেষ্টা করিয়া উচ্চৈঃস্বরে এয়া নবীসালাম আলায়-কা ইত্যাদি সালাম পড়িতে লাগিলেন। মৌলুদ-খান এক এক চরণ একা একা সুর করিয়া পাঠ করেন, আর চরণশেষে সকলে একযোগে এয়া নবী ইত্যাদি কোরাস ধরিয়া সুরে-বেসুরে চিৎকার করিতে থাকেন। ক্রমে সালাম পাঠ শেষ হইলে আবার সকলে বসিয়া পড়িলেন।
মৌলুদ-খান এক্ষণে কিছুক্ষণ দরুদ শরীফ পড়িলেন, এবং অনেকেই গুনগুন স্বরে তাহার সঙ্গে যোগ দিলেন। পরে হযরত রসুলে-মকবুল আহমদ মোজুতবা মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হেস সালামের শুভ জন্মগ্রহণ মুহূর্তে পৃথিবীর কোথায় কোথায় কী কী অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়াছিল, তাহার বর্ণনা আরম্ভ হইল। হযরত মুসা আলায়হেস্ সালাম্ তাহার শিষ্যবর্গকে (ইহুদিগণকে) বলিয়া গিয়াছিলেন যে, আকাশের বিশেষ একটি নক্ষত্র স্থানচ্যুত হইলে দুনিয়াতে কোনো নবীর আবির্ভাব হইবে। তদবধি ইহুদিগণ পুরুষপরম্পরায় সেই নক্ষত্রটি লক্ষ্য করিয়া আসিতেছিল, অদ্য সহসা উহা খসিয়া পড়িল! শাম-প্রদেশস্থ। একটি অতিথিশালার কূপ কয়েক বৎসর একেবারে শুকাইয়া গিয়াছিল, অদ্য হঠাৎ তাহা জলপূর্ণ হইয়া উঠিল! পারস্য দেশের সওয়া নামক প্রায় দশ ক্রোশব্যাপী হ্রদবিশেষ হঠাৎ শুকাইয়া গেল, এবং সাওয়া নামক মরুভূমিটি এক জলপূর্ণ বিশাল হ্রদে পরিণত হইল, পারসিক অগ্নি-উপাসকদিগের অগ্নিকুণ্ড সহস্র সহস্র বৎসর ধরিয়া অবাধে জ্বলিয়া আজ হঠাৎ নিভিয়া গেল এবং পারস্যরাজ নওশেরোআনের প্রাসাদচূড়া চূর্ণ হইয়া ভূপতিত হইল। এবং পরিশেষে কাবা মন্দিরের প্রতিমাগুলির মুখ থুবড়িয়া পড়িয়া গেল!
এইরূপ বহু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনার পর মৌলুদ-খান সাহেব এক দীর্ঘ মোনাজাত (প্রার্থনা) করিয়া মৌলুদ শরীফ সাঙ্গ করিলেন। সমস্তই উর্দু ভাষাতে কথিত ও গীত হইল; অধিকাংশ লোকই তাহার এক বর্ণও বুঝিল না; কিন্তু তাহাতে পুণ্যসঞ্চয়ের কোনো বাধা হইল না।
যাহা হউক, মৌলুদশেষে যথারীতি মিষ্টান্ন বিতরণের পর সকলে উঠিয়া পড়িলেন। প্রতিবেশী সাধারণ লোকেরা ঘরে ফিরিয়া গেল। দুই-চারি জন আত্মীয় রাত্রের আহারের জন্য নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন, তাহারা রহিয়া গেলেন। সাধারণের নিমন্ত্রণ পরদিন রাত্রে।
এইরূপে বিপুল সমারোহের সহিত নূতন মসজিদের আকামত পর্ব শেষ হইল। কয়দিন ধরিয়া বাটীর প্রভু-ভৃত্য সকলেরই ক্রমাগত খাঁটিয়া প্রাণান্ত হইতে হইয়াছে। কিন্তু অন্দরমহলে যাহা কিছু খাটুনি তিনটি প্রাণীর উপর দিয়া গিয়াছে। হালিমা তো বধূ, তাহাকে খাটিতেই হইবে, কিন্তু রাবিয়া ও তাহার বোন যে খাটুনিটা খাঁটিয়াছিল, যেরূপে বাঁদীর মতো শ্রমে ও ভগ্নীর মতো যত্নে সমাগতা বিবিগণের সেবা করিতেছিল তাহাতে, সেই বিবিগণের মধ্যে যাহারা উহাদিগকে চিনিতেন না তাহারা উহাদের আভিজাত্য সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া এক দস্তরখানে বসিতে ইতস্তত করিতেছিলেন। এমন সময় মজিলপুরের এক বিবি, কয়েকজনকে একটু অন্তরালে লইয়া গিয়া রাবিয়াদের পরিচয় দিয়া কহিলেন, রাবিয়ার পিতামহ দ্বিতীয়বার যে বিবাহ করিয়াছিলেন, সে বিবি একটু নীচু ঘরের মেয়ে রাবিয়ার পিতা তাহারই গর্ভে জন্মিয়াছিলেন। এই কথা শুনিয়া শরীফাবাদের এক বিবি কহিলেন, হুঁ, সে আমি চালচলন দেখে আগেই ঠাউরেছিলাম! এবং সৈয়দ সাহেবের বড় বিবিকে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –বেয়ান সাহেব, রাবিয়ারা কি আমাদের সঙ্গে এক দস্তরখানে বসবে?
বড় বিবি কহিলেন, না, না, ওরা কেন বসবে? ওরা খাদিমী করবেখন।
শরীফাবাদের বিবি কহিলেন—না, না, সেটা ভালো দেখাবে না। ওদের আলাদা ঘরে বসালেই হবে।
শরীফাবাদের বেয়ান আবদুল মালেকের শ্বশুর হাজী সাহেবের বিবি; এবং হাজী সাহেব হইলেন এ অঞ্চলের মধ্যে একেবারে অতি আদি শরীফ ঘর; সুতরাং তাহার কথা রাখিতেই হইল।
কিন্তু হালিমা এ কথা শুনিয়া একেবারে মর্মাহত হইল। সে তাহার শাশুড়িকে গিয়া কহিল, –তবে আমিও বসব না, আম্মা; ভাবী সাহেবাদের সঙ্গে খাবখন।
শাশুড়ি বিরক্ত হইয়া কহিলেন, –বাঃ সে কী কথা! তুমি হলে মেজবউ, বড়বউ বসবে, আর তুমি বসবে না? এরা সব কী মনে করবেন?
আর ওঁরাই বা কী মনে করবেন? আজ সারাটা দিন ওঁরা খেটে হয়রান হয়েছেন, আর তাদের না নিয়ে খাওয়া কি ভালো হবে? ওঁদের মনে যে দুঃখ দেওয়া হবে তা হলে।
শাশুড়ি কহিলেন, তা দুঃখ হলে কী করব বাপু! যে যেমন, তার তেমনভাবেই চলতে হবে তো? শরীফাবাদের বিবিদের সঙ্গে বসবার যুগ্যি ওরা নয়!
এদিকে দস্তরখান পড়িয়া গিয়াছে। বাঁদীরা শাশুড়ি-বধূকে ডাকিতে আসিয়া কহিল, বিবিরা সব বসে গেছেন!
চল বউ, আর দেরি কোরো না। বলিয়া তিনি হালিমার হাত ধরিয়া লইয়া চলিলেন। দুয়ারের কাছে আসিয়া সালেহাকে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া কহিলেন, রাবিয়াদের জন্যে ও-ঘরে দস্তরখান দিতে বলেছি, দিল কি না দেখে এস।
সকলে বসিয়া গিয়াছেন, বাঁদীরা সিলিপূচি (হাত ধোয়াইবার পাত্র) লইয়া একে একে হাত ধোয়াইতেছে, এমন সময় সালেহা আসিয়া মাতাকে কহিল, –তারা তো নেই! বেলার কাছে শুনলাম, এক্ষুনি তারা পাছ-দুয়ারে পালকি ডাকিয়ে চলে গিয়েছেন বলিয়া মাতার পার্শ্বে বসিয়া পড়িল।
