কিন্তু তাহারাও দরজা পর্যন্ত আসিয়া থমকিয়া গেলেন! কী ভয়ে যে কেহ ভিতরের খোলা ময়দানের মতো খালি জায়গায় গিয়া বসিতে চাহিতেছেন না তাহা আবদুল্লাহ্ ভাবিয়া পাইল না। অবশেষে বিরক্ত হইয়া সে বারান্দার ভিড়ের মধ্য হইতে ছোট ছোট ছেলেগুলাকে টানিয়া তুলিয়া ভিতরে ঠেলিয়া দিতে লাগিল। সে বেচারারাও ভিড়ের চাপ হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া বাঁচিল, এদিকে বারান্দার নবাগতদিগেরও কিঞ্চিৎ স্থান হইয়া গেল।
মৌলুদ পাঠ শুরু হইয়া গেল। মৌলুদ-খান সাহেব কলিকাতার আমদানি, সঙ্গে দুই জন চেলা। তাহার গলা যেমন দরাজ, তেমনি মিষ্ট; তিনি প্রথমেই কোরান মজিদ হইতে একটি সুরা এমন মধুর কেরাতের সহিত আবৃত্তি করিয়া গেলেন যে, সকলে শুনিয়া মোহিত হইয়া গেল। তারপর উর্দু কেতাব খুলিয়া সম্মুখস্থ বালিশের উপর রাখিয়া চক্ষু বন্ধ করিলেন এবং উর্দু গদ্যে ও গজলে, কখনো-বা দুই-একটা ফারসি বয়েতে নানা সুরে কখনো-বা একা, কখনো চেলাদ্বয়ের সহিত একত্রে, রওআয়েতের পর রওআয়েত আবৃত্তি করিয়া যাইতে লাগিলেন। প্রথমেই পবিত্র মৌলুদ শরীফ শ্রবণের অশেষবিধ গুণের বর্ণনা করা হইল–কেমন করিয়া বোন্দাদবাসিনী এক ইহুদি রমণী একবার স্বপ্নে স্বয়ং হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামকে প্রতিবেশী মুসলমান বণিকের গৃহে শুভাগমন করিতে দেখিয়াছিল এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছিল যে, যে বাটীতে মৌলুদ শরীফ পাঠ করা হয় হযরত স্বয়ং এইরূপে সদা-সর্বদা সেই বাটীতে অদৃশ্যভাবে যাতায়াত করিয়া থাকেন–আবুলাহাবের বাঁদী তাহার প্রভুর নিকট হযরতের জন্ম-সংবাদ আনিয়া কিরূপ আনন্দ প্রকাশ করিয়াছিল এবং সেইদিন সোমবার ছিল বলিয়া মৃত্যুর পর কাফের থাকাবশত দোজখে গিয়াও কিরূপে প্রতি সোমবারে আজাব (নরক-যন্ত্রণা) হইতে রেহাই পাইয়া আসিতেছে–যে-ঘরে মৌলুদ শরীফ পাঠ করা হয় সেখানে কিরূপে ফেরেশতাগণের শুভাগমন হইয়া থাকে এবং তথায় কিরূপ অপূর্ব স্বর্গীয় আলোক প্রদীপ্ত হইয়া থাকে, পবিত্র হাদিস শরীফে তাহার কী কী প্রমাণ দেওয়া আছে–এসকল যথাযথরূপে বিবৃত হইল।
তাহার পর এই বিশ্বজগতের সৃষ্টির পূর্বের কথা আসিল। তখন কেবল আল্লাহতালার পবিত্র নূর এবং সেই নূর হইতে তাহারই ইচ্ছায় সৃষ্ট আমাদের নবী-করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হেস্ সালামের পবিত্র নূর ভিন্ন আর কিছুই বিদ্যমান ছিল না। এই পবিত্র মোহাম্মদী নূর তখন এক পবিত্র স্থানে বহু আবরণের মধ্যে রক্ষিত ছিল–পরে উহা ওই সকল আবরণ হইতে বহির্গত হইয়া নিশ্বাস লইলে, সেই পবিত্র নিশ্বাস হইতে ফেরেশতাগণ, পয়গম্বরগণ এবং বিশ্বাসীগণের আত্মাসমূহ সৃষ্টি হইল। ইহার পর ওই নূর দশ ভাগে বিভক্ত হইল এবং দশম ভাগ হইতে উৎপন্ন বস্তুর দৈর্ঘ্য চারি সহস্র বৎসরের ন্যায় হইল, প্রস্থও তাহার অনুরূপ হইল। আল্লাহ্ যখন ওই বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন, তখন উহা কাপিতে কাঁপিতে অর্ধেক জল ও অর্ধেক অগ্নিতে রূপান্তরিত হইয়া গেল। ওই জল সমুদ্রে পরিণত হইল এবং সমুদ্রের তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে বায়ুমণ্ডলের উৎপত্তি হইয়া এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শূন্যস্থান পূর্ণ করিয়া দিল। তাহার পর সেই অগ্নির উত্তাপে সমুদ্রে ফেন ও বাষ্প এই দুইটি পদার্থ উৎপন্ন হইল; ফেন হইতে জন্মিল মৃত্তিকা এবং বাষ্প হইতে হইল আকাশ। মৃত্তিকা তখন টলমল করিতেছিল, সুতরাং তাহাকে স্থির করিবার জন্য ফেনের মধ্যে যেগুলি অত্যন্ত বৃহদাকার এবং শুভ্রবর্ণ ছিল, সেগুলিকে পর্বতরূপ পেরেকে পরিণত করিয়া মৃত্তিকায় ঠুকিয়া দেওয়া হইল। আবার পর্বতগুলির মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবেশ করিয়া খনির সৃষ্টি করিয়া দিল।
পরে যখন আল্লাহতালা মানুষ সৃষ্টি করিলেন, তখন ওই মোহাম্মদী নূর কিরূপে হযরত আদম আলায়হেস্ সালামের পৃষ্ঠে অর্পিত হইয়াছিল, এবং অর্পণকালে তিনি পশ্চাদ্দিকে কিরূপ সুমধুর ধ্বনি শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া গিয়াছিলেন; কিরূপে হযরত আদমের বংশাবলির মধ্যে পর পর কাহার কাহার পৃষ্ঠে নূর প্রকাশিত হইতে হইতে অবশেষে কোরেশ বংশের বনি হাশেম শাখার আবদুল্লাহর মুখমণ্ডলে আসিয়া প্রকাশিত হইয়াছিল এবং তাহাই দেখিতে পাইয়া কিরূপে এক বুদ্ধিমতী ইহুদি সুন্দরী শেষ নবীর গর্ভধারিণী হইবার লোভে আবদুল্লাহর মনোহরণ করিয়া তাহার সহিত বিবাহিতা হইবার লোভে বৃথা চেষ্টা করিয়াছিল; যখন আমেনা খাতুনের সহিত আবদুল্লাহর বিবাহ হয়, তখন কিরূপে মক্কাবাসিনী দুই শত রূপসী যুবতী রশক ও হাসা-সে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল; যে-রাত্রে আমেনা বিবির গর্ভসঞ্চার হয়, সে-রাত্রে কিরূপে হযরত জিব্রীল বেহেশত হইতে সবুজ রঙের পতাকা আনিয়া কাবার উপর স্থাপন করিয়াছিলেন, কিরূপে শয়তানের আকুল ক্রন্দনে আরবের উপত্যকাগুলি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছিল, কিরূপে পৃথিবীর যেখানে যত দেব-দেবীর মূর্তি ছিল, সমস্তই মস্তক অবনত করিয়াছিল, কিরূপে পৃথিবীর জীবজন্তুসমূহ বাকশক্তি পাইয়া হযরতের শুভাগমন বিষয়ের আন্দোলন জুড়িয়া দিয়াছিল–এ সকল ব্যাপার পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিবৃত হইতে লাগিল।
অবশেষে যখন আমেনা বিবির প্রসবকাল নিকটবর্তী হইল, তখন তিনি দেখিলেন যে, সূতিকাগৃহ জ্যোতির্ময়ী রমণীবৃন্দের দ্বারা আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিতেই তাঁহারা কহিলেন যে, তাহারা বেহেশতের হুর, খোদাতালা কর্তৃক আমেনা বিবির সেবা শুশ্রূষার জন্য প্রেরিতা হইয়াছেন। এমন সময় একটা বিকট শব্দ হইল–আমেনা চকিতা ও ভীতা হইয়া উঠিলেন, কিন্তু তৎক্ষণাৎ এক প্রকাণ্ড শ্বেতকায় পক্ষী আসিয়া আমেনার বক্ষঃস্থলে ডানা ঘষিয়া দিল, অমনি তাহার ভয় দূর হইয়া গেল; কিন্তু ভয়ের পরিবর্তে ভয়ানক পিপাসা বোধ হইতে লাগিল। হঠাৎ কোথা হইতে এক যুবক আসিয়া পড়িলেন এবং এমন এক পেয়ালা শরবত তাহার সম্মুখে ধরিলেন, যাহা দুধ অপেক্ষাও শুভ্র এবং মধু অপেক্ষাও মিষ্ট ছিল। আমেনা তাহাই পান করিয়া সুস্থ হইলেন– যথাসময়ে হযরত ভূমিষ্ঠ হইলেন।
