না স্যার, ওগুলোও ছেলেরা খুব খেলে। প্রায়ই অন্যান্য স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে ম্যাচ হয়, তাতে আমাদেরই বেশির ভাগ জিত হয়।
সাহেব কহিলেন–খেলার দিকে আপনার এতটা ঝোঁক আছে, ভালো কথা। এসব থাকলে আর ছেলেরা বদ-খেয়ালের দিকে যাবার অবসর পায় না। আপনার চাকরি কত দিনের হল?
এই প্রায় আড়াই বৎসর হয়েছে।
কোন্ গ্রেডে আছেন?
চল্লিশ টাকার গ্রেডে।
আপনি আন্ডারগ্রাজুয়েট?
যখন চাকরিতে ঢুকি, তখন আন্ডারগ্রাজুয়েট ছিলাম; এই বৎসর বি-এ পাস করেছি। আরবিতে সেকেন্ড ক্লাস অনার পেয়েছি।
ও, বটে? বড়ই সুখের বিষয়। আশা করি, সত্বরই সার্ভিসে আপনার উন্নতি হবে।
এই বলিয়া সাহেব চুপ করিলেন। আবদুল্লাহ্ বিদায় লইবার জন্য কিঞ্চিৎ মাথা নোয়াইয়া আদাব করিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু সাহেব আবার কহিলেন, –আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাতে খুশি হয়েছি, মৌলবী। আপনার যাতে একটা বিশেষ সুবিধে হয়ে যায়, তার জন্যে আমি চেষ্টা করব–তবে এখন স্পষ্ট কিছু বলতে পাচ্ছি নে।
আবদুল্লাহ্ কহিল, –আপনার মেহেরবানিই আমার পক্ষে যথেষ্ট, স্যার।
সাহেব একটু হাসিয়া কহিলেন, –অল্ রাইট, মৌলবী, গুড মর্নিং।
আবদুল্লাহ্ আবার আদাব করিয়া বিদায় হইল।
.
২২.
প্রায় চারি বৎসর পরে হালিমা শ্বশুরবাড়ি আসিয়াছে। এবার সৈয়দ সাহেব নিজে উদ্যোগ করিয়া পীরগঞ্জে গিয়া তাহাকে লইয়া আসিয়াছেন। বরিহাটী হইতে দলিল লেখাপড়া করিয়া ফিরিয়া আসিয়াই তিনি মসজিদের কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছিলেন; কিন্তু ভালো লোক অভাবে কাজ বড়ই ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছিল। তাই মসজিদটা শেষ করিয়া তুলিতে আট-নয় মাস লাগিয়া গেল। মসজিদ শেষ হইয়াছে; সৈয়দ সাহেব যেখানে যত আত্মীয়স্বজন আছে, কেবল এক মীর সাহেব ছাড়া সকলকেই, কোথাও আবদুল মালেককে পাঠাইয়া, কোথাও নিজে গিয়া, দাওয়াদ করিয়াছেন, রমজান মাসের ১ তারিখেই আকামত হইবে; খুব একটা ধুমধামের আয়োজন হইতেছে। সে সময়ে পূজার ছুটিও হইবে এবং আবদুল কাদেরকেও বাড়ি আনা হইবে। তখন মৌলুদ শরীফ, খাওয়াদাওয়া, ফকির খাওয়ানো, এইসব করিতে হইবে।
বেহান কিন্তু প্রথমে হালিমাকে ছাড়িতে চাহেন নাই, –আজ প্রায় চারি বৎসর সে তাহার কাছে আছে, এখন হঠাৎ চলিয়া গেলে তিনি একলা কেমন করিয়া থাকিবেন, ইত্যাদি। কিন্তু সৈয়দ সাহেব কোনো কথাই শুনিলেন না; এমনকি বেহানকে সুদ্ধ লইয়া যাইবার জন্য জেদ করিতে লাগিলেন। উভয় তরফের তর্কাতর্কির ফল এই দাঁড়াইল যে, হালিমা এক্ষণে একবালপুরে যাউক, পূজার ছুটির তো আর বেশি দেরি নাই, আবদুল্লাহ্ বাড়ি আসিলে তাহার মাতা সৈয়দ সাহেবের মসজিদ আকামতের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইবেন। কিন্তু ফিরিবার সময় ছেলে, বউ, মেয়ে, জামাই, সব লইয়া আসিবেন।
পূজার ছুটি আসিল; আবদুল্লাহ্ও বাড়ি আসিল। কয়েক দিন পরে আবদুল কাদের একবালপুরে আসিলে পীরগঞ্জে লোক পাঠানো হইল। আবদুল্লাহ্ মাতাকে লইয়া শ্বশুরবাড়ি আসিল।
ধুমধাম খুবই হইল। এবার আত্মীয়স্বজন কেহ কোথাও বাকি নাই। শরীফাবাদ, মজিলপুর, রসুলপুর, নূরপুর প্রভৃতি গ্রাম হইতে প্রায় সকলেই মায় সওয়ারী তশরীফ আনিয়াছেন। এমনকি, আবদুল খালেকও এবার সপরিবারে নিমন্ত্রিত হইয়াছেন।
পহেলা রমজান বাদ-মগরেব (সান্ধ্য নামাযের পর) মসজিদে মৌলুদ শরীফ শুরু হইল। ঝাড়-ফানুসে মসজিদের অন্দর ও বারান্দা আলোকময় এবং শোভাময় হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু লোক আর ধরিতেছে না–মসজিদ নিতান্ত ছোট নহে, ঢের লোক ধরিতে পারে; কিন্তু যিনি আসিতেছেন, তিনিই মসজিদে প্রবেশ করিয়াই দরজার কাছে বসিয়া পড়িতেছেন, কেহই মিম্বারের কাছে ঘেঁষিয়া বসিবার বেআদবিটুকু স্বীকার করিতে চাহিতেছেন না। সুতরাং আদব রক্ষা করিতে গিয়া জায়গার টানাটানি পড়িয়া গেল। অধিকাংশ লোককে বারান্দাতেই বসিতে হইল।
ক্রমেই যখন বারান্দা ভরিয়া গেল, তখনো গ্রামের নিমন্ত্রিতদের আসিতে বাকি। তাঁহারাও একে একে আসিতে আরম্ভ করিলেন। এখন বসিতে দেওয়া যায় কোথায়? আবদুল মালেক তাড়াতাড়ি আসিয়া হুকুম করিলেন, –ওরে, বাইরে একটা বড় শতরঞ্জি পেতে দে।
আবদুল্লাহ্ নিকটেই ছিল, সে জিজ্ঞাসা করিল, –বাইরে কেন?
আবদুল মালেক কহিলেন, –তবে এঁরা বসবেন কোথায়? ভিতরে তো ধরগে’ তোমার আর জায়গা নেই।
কেন থাকবে না? মসজিদের মধ্যে তো সব খালি পড়ে আছে!
তা সেখানে তো কেউ বসছে না, এখন ধরগে’ তোমার করি কী?
আচ্ছা, আমি দেখছি, দাঁড়ান–বাইরে বসানো কি ভালো দেখাবে? এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ অতি কষ্টে বারান্দার ভিড় ঠেলিয়া মসজিদের মাঝখানের দরজাটির কাছে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং যাহারা দরজা ঘেঁষিয়া ঠাসাঠাসি করিয়া বসিয়াছিলেন, তাহাদিগকে কহিতে লাগিল, –আপনারা একটু এগিয়ে বসুন, জনাব!
সকলেই ঘাড় ফিরাইয়া তাহার দিকে একবার চাহিল, কিন্তু কেহই নড়িয়া বসিল না।
আবদুল্লাহ্ আবার কহিল, –ঢের জায়গা রয়েছে সুমুখে, আপনারা একটু এগিয়ে না বসলে যে অনেক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
এই কথায় দুই-এক জন একটু নড়িয়া কেহ আধ হাত, কেহ-বা বড়জোর মুটুম হাত পরিমাণ অগ্রসর হইয়া বসিলেন। অনেক বলিয়া-কহিয়াও আবদুল্লাহ্ ইহাদিগকে আর নড়াইতে পারিল না দেখিয়া বাহিরে ফিরিয়া আসিল এবং যাহারা দাঁড়াইয়া ছিলেন, তাহাদিগকেই ভিতরে বসাইবার জন্য ডাকিয়া আনিল।
