যাহার জন্য চাকরদের সঙ্গে বকাবকি করিয়া গলা ভাঙিয়া গিয়াছে, তাহারই জন্য সাহেবের কাছে অপ্রস্তুত হইতে হইল! হেডমাস্টার মহাশয়ের মনে ভয়ানক ক্রোধের উদয় হইল; তিনি সাহেবের একটু পশ্চাৎ দিকে সরিয়া আসিয়া মুখখানা ভীষণ রকম বিকৃত করিয়া, চক্ষু দিয়া অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটাইয়া একবার এ-দিক ওদিক চাহিলেন। ভাগ্যে ভৃত্যদের কেহ সেখানে উপস্থিত ছিল না; থাকিলে আজ নিশ্চয়ই ভস্ম হইয়া যাইত!
প্রথম শ্রেণীর পরীক্ষা শেষ করিয়া সাহেব একে একে অপরাপর শ্রেণীর পরীক্ষা লইলেন। পরীক্ষাশেষে তিনি মত প্রকাশ করিলেন যে, ছেলেরা পড়াশুনায় মন্দ নহে, কিন্তু ছেলেদের একটা ভয়ানক বদঅভ্যাস হইয়াছে–তাহারা লিখিবার সময় কলম ঝাড়িয়া মেঝে ও দেওয়াল নষ্ট করে। ভবিষ্যতে যেন হেডমাস্টার এদিকে বিশেষ নজর রাখেন।
পরিদর্শন শেষ হইতে প্রায় চারিটা বাজিয়া গেল। সাহেব চলিয়া যাইতেছিলেন, এমন সময় একটি প্রিয়দর্শন সুবেশ ছাত্র ছুটির দরখাস্ত লইয়া তাহার সম্মুখে দাঁড়াইল। পশ্চাতে দপ্তরী দোয়াত-দান হাতে দাঁড়াইয়া ছিল; সাহেব দরখাস্তখানা হাতে লইতেই একজন শিক্ষক তাড়াতাড়ি একটা কলম তুলিয়া লইয়া দোয়াতে ডুবাইয়া একবার মেঝের উপর ঝাড়িয়া, সাহেবের দিকে বাড়াইয়া ধরিলেন। সাহেব একটু মুচকি হাসিয়া কলম লইলেন এবং দুই দিনের ছুটি মঞ্জুর করিয়া প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় হেডমাস্টারকে বলিয়া গেলেন, যদি কোনো শিক্ষকের বিশেষ কোনো কিছু বলিবার থাকে, তবে কল্য প্রাতে ৮টা হইতে ৯টার মধ্যে ডাকবাংলায় তাহার সঙ্গে দেখা করিতে পারেন। কে কে দেখা করিতে যাইবেন, তাহা যেন আজই সন্ধ্যার মধ্যে তাঁহাকে লিখিয়া জানানো হয়। তবে কেহ যেন অনর্থক তাহাকে বিরক্ত করিতে না যান, হেডমাস্টার সেদিকে লক্ষ্য রাখিয়া লিস্ট প্রস্তুত করিবেন!
পরদিন প্রাতে হেডমাস্টার মহাশয়ের প্রস্তুত লিস্ট অনুসারে যে তিন জন শিক্ষক সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিবার অনুমতি পাইয়াছিলেন, তাঁহারা আটটার পূর্বেই আসিয়া ডাকবাংলায় উপস্থিত হইলেন। একটু পরে আবদুল্লাহও আসিয়া হাজির হইল। তাহাকে দেখিয়া একজন শিক্ষক জিজ্ঞাসা করিলেন, –আপনি যে, আপনার নাম তো হেডমাস্টার লিস্টে দেন নাই, সাহেব কি আপনার সঙ্গে দেখা করবেন? আপনি কার্ড দিবেন না, অনর্থক সাহেব বিরক্ত হবেন, আর আমাদেরও কাজ নষ্ট হবে।
আবদুল্লাহ্ কহিল, –না মশায়, ভয় নেই, আমি এখন কার্ড দিচ্ছি নে। আপনারা দেখাটেখা করে আসুন, তারপর আমি কার্ড দেব; তারপর সাহেব যা করেন!
যথাসময়ে শিক্ষকত্রয়ের একে একে ডাক হইল। দশ-পনের মিনিটের মধ্যেই তাহাদের রাজদর্শন সমাধা হইয়া গেল। সাহেব মিষ্ট কথায় তুষ্ট করিয়া তাহাদিগকে বিদায় করিলেন; তাঁহারাও হাসিমুখে ভবিষ্যৎ প্রমোশনের কথা কল্পনা করিতে করিতে যে যাহার ঘরে গেলেন। আবদুল্লাহ্ কার্ড পাঠাইয়া দিল।
একটু পরেই আবদুল্লাহর ডাক হইল। ঘরে ঢুকিবামাত্র সাহেব কহিলেন, ওয়েল মৌলবী, আপনার নাম তো হেডমাস্টার পাঠান নাই, তবে আপনি আমার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন কেন?
আবদুল্লাহ্ বিনীতভাবে কহিল, –স্যার, আমি নিজের কোনো কথার জন্যে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসি নি, এখানকার আঞ্জুমানের তরফ থেকে প্রেরিত হয়ে এসেছি…
আঞ্জুমানের কী এমন বিশেষ কথা আছে?
স্যার, স্কুলে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা এখন ক্রমে ক্রমে বেড়ে উঠেছে। দু বছর আগে ছিল মাত্র তেইশটি, কিন্তু বর্তমানে আটত্রিশটি হয়েছে। অথচ ফারসি পড়াবার জন্যে মৌলবী
নেই। আঞ্জুমান প্রার্থনা করেন যে, একজন মৌলবী নিযুক্ত করা হোক।
এখানকার মুসলমান ছাত্রেরা তো সব সংস্কৃত পড়ে; তবে মৌলবীর দরকার কী?
ফারসি পড়তে পায় না বলেই তারা সংস্কৃত পড়ে, স্যার। মৌলবী পেলে সকলেই ফারসি পড়বে, এবং ভবিষ্যতে ছাত্রের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আঞ্জুমান মনে করেন।
সাহেব একটু ভাবিয়া কহিলেন, –আচ্ছা, বেশ, আপনি আঞ্জুমানকে বলতে পারেন একটা Representation দিতে। আমি এ-সম্বন্ধে বিবেচনা করব। আর কোনো কথা আছে?
না স্যার, আমার আর কোনো কথা নাই।
আবদুল্লাহর ইংরেজি কথাবার্তায়, তাহার সসম্ভ্রম অথচ নিঃসঙ্কোচ আলাপে এবং তাহার আদব-কায়দায় সাহেব তাহার দিকে বেশ একটু আকৃষ্ট হইতেছিলেন। তিনি একটু ভাবিয়া কহিলেন, –এসিস্টান্ট ইনস্পেক্টরের মন্তব্যের মধ্যে দেখলাম আপনি দেশী খেলার বড় পক্ষপাতী। বলে তিনি রিমার্ক করেছেন–কেন, আপনি ফুটবল, ক্রিকেট, এগুলো পছন্দ করেন না?
আবদুল্লাহ্ কহিল, খুবই করি, স্যার। এগুলোতে শরীর, মন উভয়ের স্ফুর্তি জন্মে এবং ছাত্রদের পক্ষে একান্ত উপযোগী। কিন্তু আমাদের ফিল্ড ছোট, স্কুলের সকল ছাত্র একসঙ্গে খেলায় যোগ দিতে পারে না। সুতরাং অনেক ছাত্রই হয় বাড়িতে চুপ করে বসে থাকে, না হয় গল্প করে বেড়ায় আর খুব বেশি করে তো মাঠের একধারে বসে খেলা দেখে। তাই। আমি তাদের জন্যে কতকগুলো দেশী খেলা চালিয়েছি, যার জন্যে কোনো বড় মাঠ দরকার হয় না, আরো অনেকগুলো ছেলে একসঙ্গে খেলতে পারে, এমনকি, রাস্তার ধারে একটু জায়গা পেলেও খেলা চলে।
সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী কী খেলা আপনি চালিয়েছেন?
আবদুল্লাহ্ তখন ডাণ্ডা-গুলি, হাডু-ডুডু, কপাটি, গোল্লাছুট প্রভৃতি খেলার বিবরণ সাহেবকে বলিয়া বুঝাইয়া দিল। সাহেব শুনিয়া কহিলেন, –এ খেলাগুলো তো বেশ! কিন্তু তাই বলে ফুটবল, হকি, এগুলো একেবারে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
