সন্ধ্যার পর আকবর আলী এবং আবদুল্লাহ্ তাহার মেঘাচ্ছন্ন মুখ দেখিয়া বুঝিলেন যে, একটা কিছু ঘটিয়াছে। আবদুল কাদের নিষ্ফল ক্রোধে ও ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া শশীবাবুর ব্যবহারের উল্লেখ করিয়া কহিল, –দেখুন তো, লোকটার আচরণ! এমন করে আশা দিয়ে নিরাশ কল্লে! এ কি মানুষের কাজ? আকবর আলী কহিলেন, –তা আর কী করবেন বলুন! ব্যাপারটা কী হয়েছে, তা আমি বুঝতে পেরেছি। ওর বাড়িখানার ভাড়া বাড়াবার দরকার ছিল, সুযোগ পেয়ে আপনাকে দিয়ে বাড়িয়ে নিলে। ২০ টাকা দিতে রাজি হয়েছিলেন, এই বলে সে কারুর কাছ থেকে অন্তত ১৮ টাকা তো আদায় করবেই। যখন আপনার সঙ্গে কথাবার্তা হয়, তখন হয়তো সে লোককেও সেখানে হাজির রেখেছিল; আপনার মুখ থেকেই তাকে শুনিয়ে দিয়েছে যে, ভাড়া বেশি দিতে চেয়েছেন। আমি অনেক দিন থেকে ওদের সঙ্গে মেলামেশা কচ্ছি কিনা, ওদের কলাকৌশল আমার কিছু কিছু জানা আছে। দেখে নেবেন কদিন পরে।
২১-২৫. ১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগ
১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগের দরুন দেশের সর্বত্র যে হুলুস্থুল পড়িয়া গিয়াছিল, তাহারই ফলে রসুলপুর হাইস্কুলেও তুমুল স্বদেশী আন্দোলনের উদ্ভাবনা হয়। ছাত্রেরা বিদেশী দ্রব্যের ব্যবহার রহিত করিল, মাথায় করিয়া দেশী কাপড় ও অন্যান্য দ্রব্য ফেরি করিতে আরম্ভ করিল এবং দল বাঁধিয়া বাজারে গিয়া বিলাতি দ্রব্যের বেচাকেনা বন্ধ করিবার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই প্রণোদিত করিতে লাগিল। ইহাই লইয়া পুলিশের সহিত তাহাদের সংঘর্ষ উপস্থিত হয় এবং কয়েকজন ছাত্র ধৃত হইয়া শাস্তিও পায়। তার পর শিক্ষা বিভাগ হইতে এই ব্যাপারের তদন্ত করিবার জন্য স্বয়ং বিভাগীয় ইনস্পেক্টর রসুলপুরে আসিলেন এবং ছাত্রগণকে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিবার জন্য প্ররোচিত করার অপরাধে হেডমাস্টার এবং তাহার কয়েকজন সহকারীকে বরখাস্ত করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে স্কুল হইতে স্বদেশী আন্দোলনের বীজ সমূলে নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে উহাকে অস্থায়ীভাবে গভর্নমেন্ট স্কুলে পরিণত করিবার জন্য উপরে লিখিয়া পাঠাইলেন।
এইরূপে রসুলপুর স্কুলের গোলমাল মিটাইয়া ইনস্পেক্টর সাহেব বরিহাটী জেলা স্কুল পরিদর্শন করিতে আসিলেন। পূর্বেই সংবাদ দেওয়া ছিল; হেডমাস্টার মাস্টার-ছাত্র সকলের উপর কড়া কড়া নোটিশ জারি করিতে লাগিলেন, যেন পরিদর্শনের দিন সকলের পরিধানে পরিষ্কার কাপড় থাকে; সমস্ত শ্লেট-বহি, খাতা-পত্র প্রভৃতি আনিতে যেন কেহ না ভোলে, স্কুলঘরের ছাদ ও দেওয়ালের কোণগুলি হইতে মাকড়সার জালের রাশি বেশ করিয়া ঝাড়িয়া, দরজা জানালাগুলি ভিজা ন্যাকড়া দিয়া মুছিয়া এবং মেঝে ভালো করিয়া ধুইয়া তকতকে করিয়া রাখা হয়। কয়দিন হইতে স্কুলের চাকরবাকরগুলার খাটিতে খাটিতে প্রাণান্ত হইবার উপক্রম হইল; তথাপি তাহাদের কার্য হেডমাস্টারের মনঃপূত হইল না। দুবেলা তিনি সদলবলে আসিয়া তাহাদের উপর সচিৎকার তম্বি করিতে লাগিলেন। খাজনা অপেক্ষা বাজনাই বেশি হইতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতে শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর আসিয়া উপস্থিত হইল। আজ সাহেব আসিবেন; মাস্টার-ছাত্র সকলেই সকাল সকাল স্কুলে আসিয়া পড়িয়াছেন। কোনো ক্লাসে সামান্য একটু গোলমালের আভাস পাইলেই পাঁচ-সাত জন ছুটিয়া গিয়া চাপা গলায় এই, এই! চুপ চুপ! বলিয়া ধমক দিতেছেন। ছাত্রেরা কী একটা নিদারুণ বিভীষিকা আসন্ন হইতেছে মনে করিয়া, উদ্বেগে মুখ অন্ধকার করিয়া গুটিসুটি মারিয়া বসিয়া থাকিতে চেষ্টা করিতেছে।
লাইব্রেরিঘরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া কয়েকজন মাস্টার নিম্নস্বরে আলাপ করিতেছেন– সাহেব আসিয়া কী বলিবে, কী করিবে, কাহার চাকরি থাকিবে, কাহার যাইবে–এমন সময় চাপরাসী দৌড়িয়া আসিয়া খবর দিল, –সাহেব, সাহেব! অমনি সকলে যে যার ক্লাসে গিয়া উপস্থিত হইলেন। যাহাদের ক্লাস ছিল না, তাহাদিগকে লইয়া হেডমাস্টার গেটের কাছে গিয়া দাঁড়াইলেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনস্পেক্টর, ডিপুটি-ইনস্পেক্টর, সব-ইনস্পেক্টর, ইনস্পেকটিং পণ্ডিত প্রভৃতি সামন্তবর্গ পশ্চাতে লইয়া সাহেবের শুভাগমন হইল; অমনি সকলে সপাগড়ি মস্তক আভূমি অবনত করিয়া সেলাম করিলেন। সাহেব হস্তস্থিত ক্ষুদ্র ছড়িখানির অগ্রভাগ হ্যাটের প্রান্ত পর্যন্ত উঁচু করিয়া সেলাম গ্রহণ করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, ওয়েল, হেডমাস্টার, হাউ আর ইউ? থ্যাংক ইউ স্যার, আই অ্যাম কোয়াইট ওয়েল বলিয়া হেডমাস্টার সাহেবের সুদীর্ঘ পদক্ষেপের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিতে ছুটিতে তাহার কামরায় আসিয়া প্রবেশ করিলেন।
যথারীতি স্কুলের বিবরণাদি পরীক্ষা করিয়া ইনস্পেক্টর সাহেব ক্লাস পরির্দশন করিতে উঠিলেন। সামন্তবর্গকে নিম্নতর শ্রেণীগুলির পরীক্ষার ভার দিয়া সাহেব উপরকার চারিটি ক্লাস দেখিবেন বলিয়া নোটিশ দিলেন। সকলে যে যার ক্লাসে গিয়া পরীক্ষা-কার্যে ব্যাপৃত হইলেন। খোদ সাহেব প্রথম শ্রেণীতে গিয়া প্রবেশ করিলেন।
ছাত্রেরা যথাসাধ্য নীরবতার সহিত উঠিয়া দাঁড়াইল এবং শিক্ষক মহাশয় যথারীতি সেলাম করিয়া সরিয়া দাঁড়াইলেন। সাহেব কামরাটির উপর-নিচে চারিদিকে এক নজর দেখিয়া লইলেন। দেওয়ালগুলির নিচের দিকটায় স্থানে স্থানে এবং মেঝের প্রায় সর্বত্র কালির ছিটার দাগ একটু একটু দেখা যাইতেছে; ওদিকে সম্মুখের দিককার জানালার খিলানের কোণে খানিকটা ঝুল বাতাসে নড়িতেছিল। এই সকলের দিকে সাহেবদের দৃষ্টি প্রথমে পড়িয়া থাকে; তাই তিনি একটুখানি টিটকারি দিয়া কহিলেন–ওয়েল হেডমাস্টার, আপনি স্কুলঘরটি তেমন পরিষ্কার রাখিতে যত্ন করেন না বলিয়া মনে হইতেছে।
