আবদুল কাদের কহিল, –হ্যাঁ মশায়, যদি দয়া করে দেন, তবে বড় উপকার হয়, বাড়ি পাচ্ছি নে।
তা বেশ তো; আমার বাড়ি নেবেন তাতে আর কথা কী! তবে ভাড়াটা সম্বন্ধে একটু কথা ছিল, নাদের আলী বলে নি আপনাকে?
হ্যাঁ, তা বলেছে। আপনি কুড়ি টাকা চান তো? আমি তাতেই রাজি আছি।
তা হলে আপনি আসচে মাসের পয়লা থেকেই নেবেন। এর মধ্যে আমি চুনকাম টুনকাম করিয়ে ফেলি। একটু-আধটু মেরামত কত্তে হবে। এ কটা দিন দেরি হলে আপনার কোনো অসুবিধে হবে না তো?
না, না, অসুবিধে কিছুই হবে না। আমি কটা দিন সবুর কত্তে রাজি আছি! তবে আপনি কিছু অগ্রিম নিলে আমি পাওয়া সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।
আবদুল কাদেরের এই প্রস্তাবে শশীবাবুর প্রতিই তাহার অবিশ্বাসের ভাব প্রকাশ পাইলেও আবদুল কাদের যেন নিজেকেই তাহার নিকট বিশ্বাস প্রতিপন্ন করিবার জন্য অগ্রিম দিতে চাহিতেছে এইরূপ ভাব দেখাইয়া শশীবাবু কহিলেন, –সে কী মশায়! অগ্রিমটগ্রিম আবার কেন? আপনার মতো ভদ্রলোকের মুখের কথাই কি আমার কাছে যথেষ্ট নয়?
ইহার উপর আর কথা চলে না। কাজেই আবদুল কাদেরকে কেবল মুখের কথার উপর নির্ভর করিয়াই বিদায় লইতে হইল।
আবদুল্লাহ্ আবদুল কাদেরের প্রতীক্ষায় আকবর আলীর বৈঠকখানায় বসিয়া তাহার সহিত বসিয়া গল্প করিতেছিল। এক্ষণে তাহাকে আসিতে দেখিয়া সে কহিল, –কী হে, এত রাত্তির হল যে?
গিয়েছিলাম শশীবাবুর ওখানে…
শশীবাবুর ওখানে? কেন–বাড়ি ঠিক করতে? পেলে?
আবদুল কাদের একটু বিজয়োল্লাসের সহিত কহিল, –হ্যাঁ হ্যাঁঃ! তোমরা বল, হিন্দুর বাড়ি মুসলমানে ভাড়া পায় না। ও একটা কথার কথা! এই তো আমি ভাড়া ঠিক করে এলাম। কুড়ি টাকা করে, ও-মাসের পয়লা থেকে নেব; শশীবাবু এর মধ্যে মেরামত টেরামত করে ফেলবেন।
আকবর আলী এবং আবদুল্লাহ্ উভয়েই এই কথা শুনিয়া একটু আশ্চর্য বোধ করিলেন। আবদুল্লাহ্ কহিল, যদি বাস্তবিক দ্যায়, তো সে খুব ভালো কথা। এতেই পরস্পরের মধ্যে সদ্ভাব বাড়বে; নইলে পরস্পরের ব্যবহারে কেবল রেষারেষি, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, এ সব থাকলে কি আর দেশের কল্যাণ হতে পারে?
বাসা একরূপ স্থির হইয়াছে বলিয়া আবদুল কাদের নির্ভাবনায় আপিস করিতেছে, এমন সময় একদিন শশীবাবু স্বয়ং আসিয়া দেখা দিলেন। আবদুল কাদের উঠিয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করিল এবং চেয়ার আনাইয়া বসিতে দিল। যথারীতি কুশল প্রশ্নাদির পর শশীবাবু কহিলেন, দেখুন সবুরেজিস্ট্রার সাহেব, আপনার কাছে এক বিষয়ে আমাকে বড়ই লজ্জিত হতে হচ্চে, অথচ উপায় নেই। আশা করি, কিছু মনে করবেন না…
আবদুল কাদেরের বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল, –বুঝি বাড়িটা ফসকাইয়া যায়! সে উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়া কহিল, –কেন, কেন?
শশীবাবু গভীর দুঃখব্যঞ্জক সুরে কহিতে লাগিলেন, –কী করব, মৌলবী সাহেব, বাড়িটা তো আপনাকে দেব বলেই ঠিক করেছিলাম, কিন্তু ও-দিকে এক বিষম বাগড়া পড়ে গেল…
ঔৎসুক্যে অধীর হইয়া আবদুল কাদের জিজ্ঞাসা করিল, –কী রকম?
আমাদের বারের প্রেসিডেন্ট অতুল বাবু ওই পাড়াতেই থাকেন কিনা তা তিনি এবং আরো পাঁচজনে বলেছেন, ও-পাড়ায় ভদ্দরলোকের বাস, ওখানে মুসলমানকে বাড়ি দিলে সকলকারই অসুবিধে হবে, তাই ভাবছি–আবার এদিকে…।
ভদ্দরলোকের পাড়ায় মুসলমানকে থাকিতে না দেওয়ার ইঙ্গিতে আবদুল কাদের বড়ই রুষ্ট হইয়া কহিল, –তা ও-পাড়া যে ভদ্রলোকের পাড়া তা তো আপনার জানা ছিল, তবে আমার মতো অভদ্র অর্থাৎ মুসলমানকে কেন কথা দিয়েছিলেন মশায়?
না, না, মশায় কিছু মনে করবেন না আপনাকে কেন অভদ্র বলে মনে কত্তে যাব…
ভদ্রলোকের পাড়ায় যাকে থাকতে দেওয়া উচিত হয় না, সে অভদ্র নয় তো কী?
না, না, মৌলবী সাহেব, –ওটা একটা কথার কথা বৈ তো নয়–যেমন ধরুন না, বাঙালি বললে আপনারা বাঙালি হিন্দুকেই বোঝেন…
কই, তা তো বুঝি নে–আমরাও তো বাঙালি…
আমি অনেক মুসলমানকে বলতে শুনিছি, –মুসলমানেরা আজকাল ধুতি পরে বাঙালি সাজে। এর মানে কী?
এর মানে এই যে, অনেক মুসলমান ভিন্ন দেশ থেকে এসে এখানে বাস কচ্ছে কিনা তাই তারা এদেশের আসল বাসিন্দাদের বাঙালি বলে; কিন্তু তাই বলে আপনারা হিন্দু বলেই যে ভদ্র নামের একমাত্র অধিকারী, আর কেউ ভদ্রলোক নয়, এমন মনে করা কি ঠিক?
কি জানেন মৌলবী সাহেব, ওটা কথার কথায় দাঁড়িয়ে গেছে তা আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি আপত্তি মানতাম না; আসল কথা হচ্ছে কী জানেন, ও বাড়িখানি ঠিক আমার নয় কিনা? ওটা হচ্ছে আমার এক পিসিমার–তিনি বিধবা মানুষ জানেনই তো আমাদের বিধবারা কেমন গোঁড়া। তা তিনি কিছুতেই দিতে রাজি হলেন না। বললেন ওইটুকুই তার সম্বল আছে, ওতে অনাচার হলে তার অকল্যাণ হবে। এমন কথা বললে তো আর পীড়াপীড়ি করা যায় না। এখন কী করি, এ-দিকে আপনাকেও কথা দিয়ে রেখেছি, ও-দিকে পিসিমাকেও রাজি কত্তে পাচ্ছি নে, আমি মহা মুশকিলে পড়ে গিইছি…
আবদুল কাদের বিরক্তির সহিত কহিল, –বাড়ি যখন আপনার নিজের নয়, তখন তাকে না জিজ্ঞেস করে আপনার কথা দেওয়া উচিত হয় নি…।
আমি তখন এতটা ভাবি নি মশায় তিনি যে আপত্তি কত্তে পারেন এ-কথা আমার। মনেই হয় নি। নইলে কি আর আপনাকে এমন করে হয়রান করি? তা আপনি কিছু মনে করবেন না মশায়। তবে এখন উঠি, সেলাম।
