আবদুল কাদের কহিল, –অত টাকা আমি দেব কোত্থেকে নাদের? কুড়ি টাকার মধ্যেই চাই।
নাদের একটু ভাবিয়া কহিল, –শোশি বাবুগোর একখান বাড়ি আছে দুই কামরা, ১৫ টাকা। সে খালি হবার কথা শুনিছি। ওবোশিয়ের বাবু ছেলেন সে বাড়িতি, তিনি বদলি হয়ে গ্যালেন। সেইডেই দেখি যদি হয়।
আবদুল্লাহ্ হতাশভাবে কহিল, –তা দেখ। কিন্তু হবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।
তা য্যামন করে পারি আপনাগোরে এট্টা বাড়ি করে দেবই, আপনারা ভাবনা করবেন না। এইরূপ আশ্বাস দিয়া নাদের চলিয়া গেল।
একটু পরেই আকবর আলী অন্দর হইতে বাহিরে আসিলে আবদুল কাদের নাদেরের বাড়ি সম্বন্ধে সকল কথা খুলিয়া বলিল। আকবর আলী একটু চিন্তিতভাবে কহিলেন… তবেই তো! ও বাড়ি যখন হাতছাড়া হয়ে গেল, তখন যে আপনি এখানে আর বাড়ি পাবেন, এমন বোধ হয় না। কোনো হিন্দুই মুসলমানকে বাড়ি দেবে না।
আবদুল কাদের একটু প্রতিবাদের সুরে কহিল, নাদের যেমন নিশ্চিত রকম ভরসা দিয়ে গেল, তাতে বোধহয় বাড়ি পাওয়া যেতে পারে। যদি কেউই না দিত, তবে নাদের অমন জোর করে বলতে পারত না যে, সে বাড়ি করে দেবেই। যার বাড়ির কথা বল্লে সে লোকটা হয়তো মুসলমানকে দিতে আপত্তি নাও কত্তে পারে বলে নাদের জেনে থাকবে…
কার বাড়ির কথা বল্লে সে?
আবদুল্লাহ্ কহিল, –শশীবাবু, বোধহয় উকিল শশীবাবু হবেন…
আকবর আলী অবিশ্বাসের হাসি হাসিয়া কহিলেন, –ওঃ শশীকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। ওর বাড়ি যদি আপনি পান তবে আমি কী বলেছি… ।
আবদুল কাদের কহিল, –আচ্ছা দেখাই যাক না, নাদের কদ্দূর কী কত্তে পারে। আর আমার বোধহয় এখন হিন্দুতে যখন মুসলমানের বাড়ি ভাড়া নিচ্ছে, তখন ওরা মুসলমানকে বাড়ি দিতে আর আপত্তি নাও কত্তে পারে।
আকবর আলী কহিলেন, –আপনি ক্ষেপেছেন? মুসলমানের বাড়ি হিন্দুতে ভাড়া নিচ্ছে বলেই যে হিন্দুর বাড়ি মুসলমানকে দেবে, এর কোনো মানে নাই। আমি যখন নবাবশাহীতে প্রথম চাকরি পাই, তখনকার এক ঘটনা শুনুন। একজন মুসলমান রইস্ মারা গেলেন; তাদের। পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিল না। ছেলেরা পুরোনো বাড়িটা বেচে ফেল্লে। বাড়িখানা মন্দ ছিল না। এক হিন্দু ডাক্তার সেটা কিনেছিল; সে একটু মেরামত সেরামত করে ভাড়া খাটাতে লাগল। কিছুদিন পরে একজন মুসলমান ডিপুটি নবাবশাহীতে বদলি হয়ে এলেন। তখন ও বাড়িটা খালি ছিল; তিনি এত ঝুলোঝুলি কল্লেন, ভাড়া অনেক বেশি দিতে চাইলেন, কিছুতেই সে ডাক্তার দিলে না। সাফ বলেই দিলে, মুসলমানকে দেবে না।
আবদুল কাদের কহিল, –বাঃ, বেশ তো! ওরা আমাদেরটা নেবে, আর আমাদের দরকার হলে ওদেরটা পাব না? মুসলমানের বাড়ি হিন্দুর কাছে বেচাও উচিত নয়, আর ভাড়া দেওয়াও উচিত নয়।
আবদুল্লাহ্ কহিল, ভাই রে, বেচা উচিত নয় বলছ, কিন্তু মুসলমান খদ্দের পাবে কটা? আর ভাড়া না দিয়েই বা যাবে কোথা? কজন মুসলমান চাকুরে আছে যে, সকল সময় ভাড়া পাবে? তা ছাড়া ওরাই তো যত আপিস-আদালতের হর্তাকর্তা, ওদের সঙ্গে আড়াআড়ি করে কি আমাদের চলে? এই দেখ না, নাদের বেচারা যদি মুনসেফ বাবুর সম্বন্ধীকে বাড়িটা না দিত, তবে ওর চাকরি নিয়েই পরে টানাটানি পড়ত। যেমন আমাদের সমাজের অবস্থা, তাতে এসব সয়েই থাকতে হবে। অনর্থক চটলে কোনো ফল নেই।
আবদুল কাদের হতাশভাবে কহিল, তবে কি আমি বাড়ি পাব না?
আকবর আলী কহিলেন, –সেই রকমই তো বোধ হচ্ছে। নিদেনপক্ষে এই পাড়াতে, একটু জায়গা নিয়ে ঘর বেঁধে থাকবেন, আমি যেমন আছি। আর তো কোনো উপায় দেখছি নে।
এইরূপ কথাবার্তায় রাত্রি অধিক হইয়া উঠিল দেখিয়া আবদুল্লাহ্ বিদায় লইয়া বোর্ডিঙে চলিয়া গেল। আবদুল কাদের রাত্রে শুইয়া আকবর আলী সাহেবের কথামতো বাসা-বাটী নির্মাণের কল্পনা করিতে লাগিল।
পরদিন বৈকালের দিকে নাদের আলী আবদুল কাদেরের আপিসে আসিয়া কহিল, শশীবাবু তাহার বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি হইয়াছেন, কিন্তু ভাড়া পাঁচ টাকা বৃদ্ধি করিয়া কুড়ি টাকা চাহিয়াছেন; আবদুল কাদের বাড়ি ভাড়া পাইবার আশা ছাড়িয়া দিয়াছিল; এক্ষণে নাদেরের কথায় তাহার আবার ভরসা হইল–সে কুড়ি টাকাই দিতে রাজি হইয়া গেল।
নাদের কহিল–তবে চলেন হুজুর, শশীবাবুর সাথে একবার মোকাবিলা করে ঠিকঠাক করে আসি গে। আমি তানারে কয়ে আইছি, আজই আপনারে লয়ে যাব। তানি সঁজ বাদ যাতি কইছেন।
বেশ তো, সন্ধ্যার পরই যাব। তুমি আমাকে নিয়ে যেও। আপিসেই থাকবখন–আজ কাজ অনেক।
সন্ধ্যার পর নাদের আসিয়া আবদুল কাদেরকে শশীবাবুর বাড়িতে লইয়া গেল। শশীবাবু তাকে পরম সমাদরে ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া একখানি চেয়ারে বসাইলেন এবং পান, তামাক প্রভৃতির ফরমাইশ করিলেন। তৎক্ষণাৎ পান আসিল, তামাক আসিলে শশীবাবু কিঞ্চিৎ সেবন করিয়া কলিকাটি নাদেরের হস্তে তুলিয়া দিয়া কহিলেন, –দেও তো মিঞা,
একটা কাগজের ঠোঙ্গা করে সবুরেজিস্ট্রার সাহেবকে তামাক খাওয়াও।
অনভ্যস্ত বলিয়া আবদুল কাদের কাগজের ঠোঙ্গায় তামাক খাইয়া জুত পাইল না। তবু ভদ্রতার খাতিরে দুই-এক টান দিল এবং কাশিতে কাশিতে কলিকাটি ফিরাইয়া দিল।
শশীবাবু উপস্থিত আর একটি ভদ্রলোকের দিকে কাটি বাড়াইয়া দিয়া কহিলেন, নাদের আলী বলছিল, আমার ওই নদীর ধারের বাড়িটা আপনি ভাড়া নিতে চান।
