নাদের আলী কহিল, –না, না হুজুর, আগাম নেব ক্যা? আপনারা ভাড়া নিবেন, তার আবার কথা? বাড়ি আপনাগোরই থাকল; শ্যাষ হতি আরো মাসখানেক লাগবে; আল্লায় করলি ত্যাখন আপনাগোরই ভাড়া দেব।
আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, –তা ভাড়া কত করে নেবে, নাদের আলী?
নাদের কহিল, –আগে শ্যাষ করেই তো নিই, হুজুর, ভাড়ার কথা পাছে।
না, না, আগে থেকেই ওটা ঠিক করে রাখা ভালো। তোমার বাড়ি প্রায় হয়েই রয়েছে; তিন কামরা আর এক বারান্দা–এই তো! তবে ভাড়া ঠিক করতে আর অসুবিধে কী?
নাদের একটুখানি হাসিয়া কহিল, –তা আপনারা যা দেবেন হুজুর, আমি তাই নেব। আপনাগোর সাতে কি আর দর-দস্তুর কত্তি পারি?
তবু তোমার কত হলে পোষাবে, মনে কর!
বাড়ি ভাড়া তো দেখতিইছেন হুজুর–বাবুরা সব বাড়ির জন্যি খাই খাই করে বেড়ায়। ড্যাড়া ড্যাড়া ভাড়া দ্যেও বাড়ি পায় না। তা আপনাগোর কাছে আর বেশি নেব না হুজুর, কুড়ি টাকা করে দেবেন।
নাদের নিতান্ত অন্যায় ভাড়া চাহে নাই বুঝিয়া আবদুল কাদের তাহাতেই রাজি হইয়া গেল। ঠিক হইল যে বাড়ি শেষ হইলে যেদিন আকামত হইবে সেইদিনই আবদুল কাদের বাড়ি দখল করিবেন।
বিদায়ের পূর্বে নাদের আবদুল্লাহকে কহিল, –হুজুর, আকামতের দিন এট্টু মৌলুদ শরীফ পড়াতি চাই, তা আপনি এট্টু দয়া কত্তি হবে…
আবদুল্লাহ কহিল, –কী করতে হবে!
আপনিই এট্টু পড়বেন–আপনাগোর মুখির পড়ায় খোদায় বরকত দেবে।
আবদুল্লাহ্ হাসিয়া কহিল, –আচ্ছা আচ্ছা, পড়া যাবে।
যাহা হউক, একটা বাসার বন্দোবস্ত হইয়া গেল মনে করিয়া আবদুল কাদের নিশ্চিন্ত হইল। কিন্তু নাদেরের বাড়িখানি শেষ হইতে এখনো এক মাসের বেশি লাগিবে। এতদিন বোর্ডিঙে থাকা উচিত হইবে না। তাই দুই জনে পরামর্শ করিয়া স্থির করিল, যতদিন বাড়ি প্রস্তুত না হয়, ততদিন আবদুল কাদের আকবর আলী সাহেবের ওখানেই থাকিবে, খাওয়াদাওয়ার স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত করিয়া লইবে।
আকবর আলী আবদুল কাদেরকে পুনরায় সাদরে নিজে বাটীতে স্থান দিলেন; কিন্তু তাহার স্বতন্ত্র আহারের বন্দোবস্তে বিশেষ রকম আপত্তি করিতে লাগিলেন। আবদুল কাদের কিছুতেই শুনিল না; সে এখন খোদার ফজলে যথেষ্ট উপায় করিতেছে, এক্ষেত্রে নিজের একটা বন্দোবস্ত করিয়া লওয়া ভালো দেখাইবে না বলিয়া সে জেদ করিতে লাগিল। অগত্যা আকবর আলীকে সম্মত হইতে হইল। তিনি বৈঠকখানা ঘরের বারান্দায় একধারে ঘিরিয়া উপস্থিত রান্নার কাজ চালাইবার মতো একটু স্থান করিয়া দিলেন।
কিন্তু রাঁধিবার আর লোক পাওয়া গেল না। অবশেষে আবদুল কাদেরের চাপরাসী নিজেই কেবল খোরাক পাইয়া রাধিয়া দিতে রাজি হইল। কিন্তু তাহাকে বেশি রাঁধিতে হইত না। আকবর আলীর অন্দর হইতে প্রায়ই ডালটা, তরকারিটা আসিত, এবং সপ্তাহের মধ্যে অন্তত তিন সন্ধ্যা আবদুল কাদেরকে বোর্ডিঙের সুপারিন্টেন্ডেন্টের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইতে হইত।
এইরূপে প্রায় এক মাস কাটিয়া গেল। একদিন সন্ধ্যার পর বৈঠকখানায় বসিয়া আবদুল কাদের আবদুল্লাহর সহিত পরামর্শ করিতেছিল, বাড়ি প্রস্তুত হইয়া গেলে হালিমাকে আনা যাইবে কি না। তাহার মাসিক আয় গড়ে এক শত টাকারও উপর। তাহা হইতে পিতার দেনা পরিশোধ বাবদ ৬০ টাকা করিয়া দিলে তাহার ৫০ টাকা আন্দাজ থাকিবে। তাহাতে জেলার ওপর সপরিবারে খরচ চালানো যায় কি না, দুই জনে তাহারই একটা হিসাব করিতেছিল, এমন সময় নাদের আলী সেখানে উপস্থিত হইয়া আভূমি মাথা নোয়াইয়া আদাব করিয়া দাঁড়াইল।
আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, –কী নাদের আলী, খবর কী? তোমার বাড়ির আকামতের মৌলুদ পড়তে হবে কবে?
নাদের আলী মুখে একটু বিষণ্ণতার ভাব আনিয়া কহিল, –হুজুর, বড় এট্টা মুশকিলি পড়লাম, তাই এখন কী করি ভাবতিছি।
কেন, কেন, কী হয়েছে?
আমাগোর মোন্সব বাবুর এক সুমুন্দি সব্ডিপুটি হয়ে আইছেন; তা মোন্সব বাবু আস্যে আমারে ধরে পড়লেন; আগাম টাকা নিতি চালাম না, তাও জোর করে দশটা টাকা হাতে গুঁজে দ্যে গেলেন ও বাড়ি তানার সুমুন্দিরে দিতেই হবে। আপনাগোরে আগে কথা দিছি, সে কথা কত করে কলাম, তা তারা মোটেই শোনলেন না। কী করি এখন…
আবদুল্লাহ্ উষ্ণ হইয়া উঠিয়া কহিল, –বাঃ আমাদের কথা দিয়ে রেখেছ আজ এক মাস হল, এর ওপরেও আবার কী করবে ভাবছ? তোমার কথার ওপর নির্ভর করে আমি এদ্দিন বসে আছি, পরিবার আনবার বন্দোবস্ত কচ্ছি; আর আজ কিনা তুমি ফস্ করে আর একজনকে বাড়ি দিয়ে ফেলে? আমরা আগাম দিতে চাইলাম, তা নিলে না; আর তোমার মুন্সেফ বাবু যেই এসে টাকা দিলেন, অমনি নিয়ে ফেল্লে! ছিঃ নাদের, তোমার একটু লজ্জাও হল না আমাদের সুমুখে আসতে?
নাদের মিনতি করিয়া কহিল, –তা কী করি হুজুর, তানারা মুনিব, নাগোর কথা তো ঠেলতি পারি নে। তা আমি আপনাগোর আর এট্টা বাড়ি দেখে দেব, আপনাগোর কোনো কষ্ট হবে না…
আর কষ্ট হবে না। নাদের, তুমি তোমার নিজের বাড়ির সম্বন্ধেই যখন কথা রাখতে পাল্লে না, তখন আর তুমি পরের বাড়ি দেখে দিয়েছ! আর তো বাড়িই নেই, তা তুমি দেবে কোথে কে? হিন্দু-বাড়ি কি আর আমাদের দেবে?
কেন দেবে না হুজুর? ওই ওদিকে বাবুর একখানা বাড়ি খালি আছে, তবে তার ভাড়াডা কিছু বেশি, তিরিশ টাকা…
