সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –কী করি বাপ, ওই মসজিদটা পড়ে রয়েছে, খোদার কাজ একবার আরম্ভ করে যদি শেষ না করে মরি, তবে আখেরাতে খোদার কাছে কী জবাব দেব?
সে মসজিদ এখনো শেষ হয় নি?
কই আর হল! তিন বছরের বেশি হল তুমি বাড়িছাড়া, সংসারের খবর তো আর রাখ না–টাকা-পয়সা কোথে কে আসবে যে কাজ শেষ করব? তালুক বিক্রি ছাড়া আর উপায়। কী?
মসজিদ শেষ কত্তে আর কত টাকা লাগবে?
এখনো তো ঢের বাকি–বারান্দা আর সামনের একটা রোয়াক, বাইরের আস্তর, উপরকার মিনারা…
তা কোন তালুকটা বিক্রি কচ্ছেন?
এই দেখ বাবা, দলিলটাই দেখ, তোমার কাছে আর লুকিয়ে কী হবে!
দলিল দেখিয়া আবদুল কাদের আশ্চর্য হইয়া কহিল, –এই দুটো ভালো ভালো মহাল মাত্র সাত হাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন আবা? আর ও দুটো গেলে থাকবেই-বা কী!
তা কী করি, ভোলানাথ বাবু ওর বেশি আর দিতে চাইলেন না…
সাত হাজার টাকাই কি মসজিদে লাগবে?
তা লাগবে বৈকি! মেজেতে সঙ্গে মমর দেবার ইচ্ছে আছে, ভেতরেও কিছু পাথরের কাজ, উপরে মিনারা, বারান্দায় থাম, পাথরের কাজ দিতে হবে, তাতে করে অনেক টাকা। পড়ে যাবে।
এত না কল্লেও তো চলে আব্বা…
না, না, তাও কি হয় বাবা! নিয়ত যা করিছি খোদার নামে, তা আদায় না কল্লে যে খোদার কাছে বেইমানি হবে।
আমার মনে হয়, আহ্বা, নিয়ত, কল্লেই যে সেটা সম্পূর্ণ আদায় কত্তে হবে, তার কোনো মানে নেই। যদি এখন সাধ্যে না কুলোয়, তবে? যতটা পারা যায়, তাই কল্লেই খোদা রাজি থাকেন। এখন আমি যদি নিয়ত, করে বসি যে, পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে মসজিদ। দেব, তা কি কখনো আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হতে পারে? মসজিদ দেওয়া আপনার নিয়ত; এখন সাধ্যে যতদূর কুলোয়, তাই খরচ করে ওটা শেষ করে ফেলুন। আমি বলি, রসুলপুরের ওটা থাক্, মাদারগঞ্জেরটা বরং বন্ধক রেখে হাজার দুই টাকা নেন; ও টাকা খোদা চাহে তো আমিই পরিশোধ করব। আপনার কিছু ভাবতে হবে না; খোদার ফজলে বিষয়েও আঁচ লাগবে না, আপনার মসজিদও শেষ হয়ে যাবে।
সৈয়দ সাহেব একটু ভাবিয়া কহিলেন, দু হাজার টাকায় কি হবে বাবা?
যাতে হয়, তাই করুন; বেশি আড়ম্বর করে কাজ নেই, আব্বা। এই যে সরকার মহাশয়ও এসে পড়েছেন…
সরকার মহাশয় উঠিতে উঠিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, –নৌকা এখন খোলা হবে না?
সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –আবদুল কাদেরকে সব কথা খুলে বললাম, ও তো বিক্রি কত্তে দিতে চায় না–আর আমার বড় ছেলেরও মত নয় যে বিক্রি করি। এখন ছেলেরা সব লায়েক হয়েছে, ওদের অমতে কাজটা করা ভালো দেখায় না, সরকার মশায়…।
ভোলানাথ কহিলেন, –তা বেশ তো। বিক্রি নাই-বা কল্লেন। আমি তো আর জোর করে কিনতে চাই নি…
নারাজ হবেন না, সরকার মশায়…
না, না, আপনার সম্পত্তি আপনি ইচ্ছে হয় বিক্রি করুন, ইচ্ছে হয় না করুন, তাতে আমি নারাজ হব কেন, সৈয়দ সাহেব!
কিন্তু আমার টাকার দরকার যে! আপনি মেহেরবানি করে যদি বন্ধক রাখেন…
ওই সাত হাজার টাকায়! সে কি হয়?
আবদুল কাদের কহিল, –না, না, সাত হাজার টাকা কেন! আমরা কেবল মাদারগঞ্জের তালুকটা বন্ধক রাখব; আপনি মেহেরবানি করে কেবল ওইটা রেখেই যদি দু হাজার টাকা দেন…
সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –না না, দু হাজারে আমার চলবে না তো! নিদেনপক্ষে তিন হাজার চাই যে।
ভোলানাথ একটু ভাবিয়া কহিলেন, –বন্ধক রেখে তিন হাজার দিতে গেলেও দুটো তালুক চাই; তা নইলে তিন হাজার দিতে পারব না।
আবদুল কাদের অনেক আপত্তি করিল; কিন্তু সৈয়দ সাহেব দু হাজারে সন্তুষ্ট হইতে চাহিলেন না, এবং ভোলানাথও দুইটি সম্পত্তি না হইলে তিন হাজার দিতে রাজি হইলেন না। অবশেষে ভোলানাথেরই জয় হইল।
সেই দিনই দলিল লেখাপড়া হইয়া গেল। সুদের হার লইয়া আবদুল কাদেরকে অনেক লড়ালড়ি করিতে হইয়াছিল; অবশেষে ভোলানাথ বার্ষিক শতকরা ১২ টাকাতেই রাজি হইয়া গেলেন। বন্দোবস্ত হইল যে, আবদুল কাদের প্রতি মাসে সুদে-আসলে ৬০ টাকা করিয়া ভোলানাথকে পাঠাইতে থাকিবে। ইহাতে প্রায় ছয় বৎসরে সমস্ত টাকা পরিশোধ হইতে পারিবে। কিন্তু ভোলানাথ আরো শর্ত করিয়া লইলেন যে, কিস্তি কোনো সময়ে খেলাফ হইলে, সুদের হার শতকর ২৫ টাকায় দাঁড়াইবে, এবং খেলাফকালীন সুদ আসলে পরিণত হইয়া চক্রবৃদ্ধি হারে গণ্য হইবে।
সদর আপিসেই দলিল রেজিস্টারি করা হইল। আবদুল্লাহ্ও তাহাতে একজন সাক্ষী হইয়া রহিল। সৈয়দ সাহেব ও ভোলানাথ সেইদিনই সন্ধ্যার পর নৌকা খুলিলেন।
.
২০.
বরিহাটী জেলাস্কুলে এতদিন মুসলমান ছাত্রদের কোনো বোর্ডিং ছিল না; আবদুল্লাহ্ এখানে মাস্টার হওয়ার পর অনেক চেষ্টা-চরিত্র করিয়া একটি মুসলমান বোর্ডিং স্থাপন করিতে সক্ষম হইয়াছে এবং নিজেই তাহার সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হইয়া সেইখানেই বাস করিতেছে। আবদুল কাদের বরিহাটীর জয়েন্ট আপিসে বদলি হইয়া আসা অবধি আবদুল্লাহর ওখানেই রহিয়াছে; এখনো বাসা পায় নাই; কিন্তু স্বতন্ত্র বাসা না করিলে তো চলিবে না। বোর্ডিঙে বাহিরের লোক অধিক দিন রাখা যায় না; সুতরাং আবদুল্লাহ্ এবং আবদুল কাদের উভয়েই বাসা খুঁজিতে লাগিয়া গেল।
বরিহাটীতে মুসলমানপাড়ায় চাপরাসী ও পেয়াদা শ্রেণীর লোকদের কয়েকখানি খড়ো ঘর ছাড়া মুসলমানের আর কোনো বাড়ি ছিল না। সম্প্রতি নাদের আলী বলিয়া একজন সিভিল কোর্টের পেয়াদা নদীর ধারে একটুখানি জমি খরিদ করিয়া ছোটখাটো একটি পাকা বাড়ি তৈয়ার করিতেছিল। নাদের আবদুল্লাহর পিতার মুরীদ ছিল; সুতরাং তাহাকে বলিলে সে নিশ্চয়ই আর কাহাকেও ভাড়া দিবে না। এই মনে করিয়া আবদুল্লাহ নাদের আলীর বাড়িতে গিয়া তাহাকে বিশেষ করিয়া অনুরাধ করিল, যেন বাড়িখানি আর কাহাকেও ভাড়া দেওয়া না হয় এবং কিছু অগ্রিমও দিতে চাহিল।
