কে কে! আবদুল কাদের? তুমি? তুমি এখানে? অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হইয়া সৈয়দ সাহেব এই কথা কয়টি বলিয়া উঠিলেন।
ভোলানাথ সরকার কহিলেন, বাঃ আপনি এখানে এসেছেন, তা তো আমরা কেউই জানি নে! কর্তাও তো জানেন না দেখতে পাচ্ছি!
আবদুল কাদের কহিল, –আমি আজ মাত্র তিন দিন হল বদলি হয়ে এসেছি। আপনার তবিয়ত ভালো তো, আব্বা? কিন্তু আবার মনে এতক্ষণে একটা তুমুল আন্দোলন উঠিয়া পড়িয়াছে। আজ প্রায় তিন বৎসর পরে পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎ হইয়াছে; কুশল-প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দূরে থাকুক, তিনি ভয়েই অস্থির হইয়া উঠিয়াছেন। আবদুল কাদের ছেলেটি যেরূপ বেতরো গোছের, তাহাতে হয়তো সে বিষয়-বিক্রয় লইয়া একটা গণ্ডগোল উপস্থিত করিবে এবং তাহাতে অনর্থক একটা জানাজানি কেলেঙ্কারি ব্যাপার দাঁড়াইবে, এই ভাবিয়া তিনি তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন, আমাদের একটা কাজ ছিল; কিন্তু কথাটা তোমাকে একটু নিরালা বলতে চাই আগে…
আবদুল কাদের কহিল, –কাজটা কী আব্বা? কোনো দলিলটলিল রেজিস্টারি কত্তে হবে কি?
হ্যাঁ, তাই বটে, তবে…
তা হলে আমার বাসাতেই চলুন…
ভোলানাথ জিজ্ঞাসা করিলেন, –কোথায় বাসা?
এই কাছেই বোর্ডিঙে আবদুল্লাহর ওখানে এখন আপাতত আছি, এখনো বাসা পাই নি।
আচ্ছা আমি কর্তার সঙ্গে একটু পরামর্শ করে পরে যাচ্ছি, এই বলিয়া ভোলানাথ সৈয়দ সাহেবকে বারান্দার এক প্রান্তে লইয়া গেলেন।
আবদুল কাদেরের সন্দেহ হইল, ইহার ভিতর এমন কোনো কথা আছে, যাহা ইহারা তাহার নিকট প্রকাশ করিতে ইতস্তত করিতেছেন। দলিল রেজিস্টারি করিতে গেলে তো সব কথাই জানা যাইবে; কিন্তু যদি ইহারা অতিরিক্ত ফী দিয়া অন্যত্র রেজিস্টারি করিতে যান? সরকার মহাশয় বুঝি আব্বার সঙ্গে সেই পরামর্শই করিতে গেলেন। আবদুল কাদের এইরূপ চিন্তা করিতেছে, এমন সময় ভোলানাথ আসিয়া কহিলেন, দেখুন মেজ মিঞা, কর্তার মত বদলে গিয়েছে। তিনি একখানা দলিল রেজিস্টারি কত্তে এসেছিলেন বটে কিন্তু সেটা আর করবেন না।
কেন?
এর ভেতরে অনেক কথা আছে, তা অন্য সময় বলব। এখন আমাকে নৌকায় ফিরে। যেতে হচ্ছে–কর্তা চলে গিয়েছেন, তিনি আমাকে বলে গেলেন, এখনই নৌকা খুলতে হবে।
বাঃ এসেই অমনি চলে যাবেন। সে কেমন কথা!
বাড়িতে অনেক জরুরি কাজ ফেলে এইছি–দলিলখানা রেজিস্টারি হলেই আমরা নৌকা খুলতাম। এখন যখন রেজিস্টারি হলই না, তখন আর দেরি করে ফল নেই; যত শিগগির বাড়ি পৌঁছুতে পারি, ততই ভালো!
আচ্ছা, তা যেন হল; কিন্তু হঠাৎ দলিল রেজিস্টারি করতে আসা আবার হঠাৎ মত ফিরিয়ে চলে যাওয়া, এর মানে তো কিছু বুঝতে পাচ্ছি নে; বোধহয় আমাকে দেখেই আপনারা মত ফিরিয়ে ফেললেন…
সরকার মশায় তাড়াতাড়ি কহিলেন, –আপনাকে দেখে কেন মত ফেরাব? তবে কি জানেন, কর্তার মতের ঠিক নেই…।
আবদুল কাদের বাধা দিয়া কহিল, –না, নিশ্চয়ই এর ভেতর এমন কোনো কথা আছে, যা আমাকে আপনারা লুকুচ্ছেন–কোনো বিষয় বিক্রি টিক্রি নয় তো?
এই কথায় ভোলানাথ একটু হাসিয়া উঠিলেন; কিন্তু সে হাসির একান্ত শুষ্কতা উপলব্ধি করিয়া আবদুল কাদেরের মনে সন্দেহ বদ্ধমূল হইয়া গেল। ভোলানাথ কহিলেন, –আপনি মিছে সন্দেহ কচ্ছেন, মেজ মিঞা…।
না না, মিছে নয়। সেবার কয়েকটা তালুক বিক্রি করবার সময় আমি আবার সঙ্গে খুব একচোট চটাচটি করেছিলাম কিনা, তাই বোধহয় এবার আমার কাছ থেকে কথাটা লুকুচ্ছেন। নইলে বেশ ভালো মানুষটির মতো দলিল রেজিস্টারি করবার জন্য আপিসে এসে বসে রয়েছেন, আর আমাকে দেখবামাত্রই যেন কেমন একরকম হয়ে গেলেন, আর মতও বদলে গেল! আমি এখানে বদলি হয়ে এসেছি জানলে, আপনারা কখনো এখানে আসতেন না! কেমন কি না, বলুন।
সরকার মহাশয় একটু ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া আমতা আমতা করিতে লাগিলেন। চক্রী ব্যবসায়ী ভোলানাথের সত্য গোপনের চেষ্টা আবদুল কাদেরের নির্ভীক সরল স্পষ্টবাদিতার সম্মুখে ব্যর্থ হইয়া গেল। তবু একবার শেষ চেষ্টা করিবার জন্য তিনি কহিলেন, –আচ্ছা, আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হয়, কর্তাকেই জিজ্ঞেস করে দেখবেন।
আবদুল কাদের তৎক্ষণাৎ কহিল, –তাই চলুন।
ভোলানাথ কহিলেন, –আপনি এগোন, আমি আসছি! নৌকা থানার ঘাটে আছে।
সৈয়দ সাহেব আবদুল কাদেরকে এড়াইয়া সরিয়া পড়িতে চাহিয়াছিলেন। তাই আগে আগে নৌকায় আসিয়া উৎকণ্ঠিতচিত্তে প্রতি মুহূর্তে ভোলানাথের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। তাহার মনে মনে ভয়ও হইতেছিল, পাছে-বা সঙ্গে সঙ্গে আবদুল কাদেরও আসিয়া পড়ে। পরে ভোলানাথের পরিবর্তে তাহাকেই নৌকায় উঠিতে দেখিয়া তাহার মন এমন বিক্ষুব্ধ হইয়া পড়িল যে, যখন আবদুল কাদের সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল– আব্বা, আপনি বুঝি আবার তালুক বিক্রি কচ্ছেন?–তখন তিনি কী বলিবেন ঠিক করিতে নাপারিয়া, কেবল না, হাঁ, তা কি জান ইত্যাদি অসংলগ্ন দুই-চারিটি শব্দ উচ্চারণ করিলেন।
আবদুল কাদের কহিতে লাগিলেন, –আব্বা, আপনাকে একটা কথা বলি। সেবারে তালুক বিক্রি করবার সময় আমি অনেক আপত্তি করেছিলাম, তাতে আপনি আমার ওপর। নারাজ হয়েছিলেন। কিন্তু তখন আমার বাধা দেবার কোনো ক্ষমতা ছিল না–আপনার টাকার দরকার পড়েছিল, আমার যদি তখন সে টাকা দেবার উপায় থাকত, তবে কিছুতেই বিক্রি কত্তে দিতাম না। আর আপনারও বিক্রি করবার দরকার হত না। এখন খোদার ফজলে আমি কিছু কিছু রোজগার কচ্ছি–আমার যতদূর সাধ্য আপনাকে সাহায্য করব, আপনি আর তালুক বিক্রি করবেন না…
