সৈয়দ সাহেব গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, –ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব, এত দিন আমি বড়ই গাফেলী করেছি–আল্লাহ্ মাফ কবৃনেওয়ালা–আমি আর দেরি করব না, যেমন করে পারি, কাজটা শেষ করে ফেলব।
আসরের নামায বাদ হাজী সাহেব মসজিদের ভিতরে দাঁড়াইয়া উহার কোথায় কিরূপ কাজ হইয়াছে, তাহার সমালোচনা করিতে লাগিলেন! তিনি আরবের কোথায় কোন্ মসজিদে কবে নামায পড়িয়াছিলেন, তাহার কোন্ জায়গাটিতে কিরূপ ধরনের কারুকার্যের বাহার দেখিয়াছেন, সে সকল তন্নতন্ন করিয়া বলিতে আরম্ভ করিলেন এবং সৈয়দ সাহেব একাগ্রমনে শুনিতে শুনিতে সেই সকলের চিত্র মনের মধ্যে আঁকিয়া তুলিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহার পর বাহিরে আসিয়া বারান্দাটি কত বড় হওয়া উচিত, তাহার ছাদ কিরূপ হইবে এবং কয়টি থাম দিলে মানাইবে; বারান্দার সম্মুখে বেশ কোশাদা রকম একটা রোয়াক দিলে ভালো হয়–এই রকমই তিনি অনেক ভালো ভালো জায়গার মসজিদে দেখিয়া আসিয়াছেন– এইরূপ নানাপ্রকার মত প্রকাশ করিলেন।
বৈবাহিকের সহিত এই সকল বিষয়ের আলোচনার পর হইতে এই মসজিদটিই সৈয়দ সাহেবের একমাত্র চিন্তনীয় বিষয় হইয়া উঠিল। পরদিন হাজী সাহেব রওয়ানী হইয়া গেলে পরই তিনি আবদুল মালেককে ডাকিয়া কহিলেন, বাবা, মসজিদটা তো আর ফেলে রাখা। যায় না।
আবদুল মালেক কহিল, –তা কী করবেন, এরাদা করেছেন?
আরো গোটা দুই তালুক বেচা ছাড়া তো আর উপায় দেখছি নে। ওই রসুলপুরের তোমার আম্মার দরুন তালুকটা আর মাদারগঞ্জেরটা বেচব মনে কচ্ছি।
আবদুল মালেক মনে মনে ভারি চটিয়া গেল। পিতা আর কিছুদিন বাঁচিয়া থাকিলে তালুক-মুলুক সবই ছারেখারে যাইবে, তাহাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না। সে একটু হতাশভাবে কহিল, –তা হলে ধরুন গে আপনার থাকবে কী?
পিতা একটু বিরক্ত হইয়া কহিলেন, –কেন? যা থাকবে, তা বুঝেসুঝে চালাতে পাল্লে তোমাদের আর ভাবনা কী? আর কদ্দিন! এ কাজটা আমি শেষ করেই যাব, বাকি খোদার মরজি।
আবদুল মালেক আবার কহিল, –যা আছে, তাই ধরুন গে আপনার ভাগ হয়ে গেলে আমরা কীই-বা পাব, তার ওপর আবার…
পিতা অসহিষ্ণুভাবে বাধা দিয়া কহিলেন, তোমরা খোদার ওপর তওয়াক্কল রাখতে একেবারেই ভুলে যাও। সেই জন্যেই তোমাদের মন থেকে ভাবনা ঘোচে না। তোমার ভাবনা কী বাবা? তোমার শ্বশুরের বিষয়-আশয়ের খবর রাখ কি? খোদা চাহে তো বড় বউমার যেটা পাওয়া যাবে, তাতেই তো খোশ-হালে জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। আর তোমার বোনেরা তো একরকম পার হয়ে গিয়েছে–ছোট যে দুটো আছে, আমি যদি বিয়ে দিয়ে না যেতে পারি, তবে তোমরাই দেখেশুনে দিও। তেমন ঘরে পলে হয়তো তোমাদের সম্পত্তিতে হাত নাও পড়তে পারে–একটু বুঝেসুঝে সংসার কত্তে হয়, বাবা! আর তোমার ভাইদের–আবদুল কাদেরের কথা ছেড়ে দাও, সে তো সবুরেজিস্ট্রার হয়েছে, তার এক রকম চলে যাবে। আর ওই ছোট ছেলেগুলো রয়েছে, তোমরা দেখেশুনে ওদের বিয়ে দিও, তা হলে আর কারুর কোনো ভাবনা থাকবে না, বাকি খোদার মরজি।
পুত্রকে এইরূপে বুঝাইয়া, খোদার উপর তওয়াক্কল রাখিয়া সংসার চালাইবার কৌশল শিখাইয়া দিয়া সৈয়দ সাহেব দুইটি তালুক বিক্রয়ের বন্দোবস্তে লাগিয়া গেলেন। এবার যাহাতে বিক্রয়ের পূর্বে জানাজানি হয়, সেইজন্যে তিনি ভোলানাথ সরকারকে গোপনে ডাকিয়া তাহার হস্তে তালুক দুইটি ন্যস্ত করিবেন, স্থির করিলেন। তিনি মনে মনে আশা করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, তালুক দুইটির মূল্য যে দশ হাজার টাকা হইবে, তাহাতে আর ভুল নাই। কিন্তু সরকার মহাশয় আসিয়া কাগজপত্র দেখিয়া সাত হাজার পর্যন্ত দিতে রাজি হইলেন। সৈয়দ সাহেব অনেক ঝুলাঝুলি করিলেন, কিন্তু ভোলানাথ সেই সাত হাজারই তাহার শেষ কথা বলিয়া উঠিয়া গেলেন।
সৈয়দ সাহেব ভাবিতে লাগিলেন, আর কোনো খরিদ্দারের সন্ধান করা কর্তব্য কি না। তালুক দুটি নিতান্ত মন্দ নহে; বৎসরে প্রায় চার-পাঁচ শত টাকা আয় আছে; এত সস্তায় উহা ছাড়িয়া দিতে তাহার মন সরিতেছিল না। কিন্তু অন্যত্র খরিদ্দার দেখিতে গেলে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সহজেই জানাজানি হইয়া পড়িবে; পাছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহ কৌশলে খরিদ করিয়া বসে, তাহা হইলে আর সৈয়দ সাহেবের মুখ দেখাইবার যো থাকিবে না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া অবশেষে তিন তিনটি হাজার টাকার লোভ তাহাকে সংবরণ করিতেই হইল এবং সাত হাজারেই সম্মত হইয়া দলিল রেজিস্টারি করিবার জন্য তিনি ভোলানাথ সরকারকে সঙ্গে লইয়া স্বয়ং বরিহাটী রওয়ানা হইলেন।
সদরে সম্প্রতি একটি জয়েন্ট আপিস খোলা হইয়াছে, সেইখানেই তাহাদিগকে দলিল রেজিস্টারি করিতে হইবে। যেদিন প্রাতে তাহাদের নৌকা বরিহাটীর ঘাটে আসিয়া ভিড়িল, সেই দিনই বেলা সাড়ে দশটার সময় তাহারা দলিলাদি লইয়া জয়েন্ট আপিসে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আপিসের আমলাগণ তাহাদিগকে চিনিল; সুতরাং তাহারা এজলাসের এক পার্শ্বে দুইখানি চেয়ার আনাইয়া যত্ন করিয়া তাহাদিগকে বসাইল। সবুরেজিস্ট্রার তখনো আসেন নাই; আসিবার বড় বিলম্বও নাই।
একটু পরেই সব্রেজিস্ট্রার আসিলেন। এজলাসে উঠিয়াই চেয়ারে উপবিষ্ট মূর্তি দুইটি দেখিয়া তিনি একটুখানি থমকাইয়া দাঁড়াইলেন; পরক্ষণেই অগ্রসর হইয়া তিনি সৈয়দ সাহেবকে কদমবুসি করিয়া ফেলিলেন!
