হাজী সাহেব বড় যে-সে লোক নহেন; কি ভূসম্পত্তিতে, কি বংশমর্যাদায়, বরিহাটী জেলায় আশরাফ সমাজে তাহার সমকক্ষ আর কেহ নাই। এমনকি, আমাদের সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসও তাহার সহিত কুটুম্বিতা করিতে পারিয়া আপনাকে ধন্য মনে করিয়াছিলেন। করিবারই কথা; কেননা হাজী সাহেবের পিতা শরীয়তুল্লাহ্ মাত্র পনের দিনের দারোগাগিরির দৌলতে যখন এক বিপুল সম্পত্তি খরিদ করিয়া দেশের মধ্যে একজন গণ্যমান্য লোক হইয়া উঠিয়াছিলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে তাহার শরাফতের দরজাও অতিমাত্রায় বাড়িয়া গিয়াছিল, এবং যদিও লোকে বলে যে, পঞ্চদশ দিবসে ভোরবেলায় ওযু করিবার সময় এক মস্ত বড় ডাকাতি-ব্যবসায়ী জমিদার সদ্য-খুন-করা লাশ সমেত তাহার নিকট ধরা পড়িয়া হাজার। টাকা ঘুষ কবুল করিয়াছিল এবং টাকার তোড়া আনিবার জন্য যে লোকটিকে সে বাড়িতে পাঠাইয়াছিল, সে দিশাহারা হইয়া টাকার পরিবর্তে মোহরের তোড়া আনিয়া নূতন দারোগা সাহেবকে দিয়া ফেলিয়াছিল এবং তাহারই বলে শরীয়তুল্লাহ পঞ্চদশ দিনের চাকরিতে ইস্তফা দিয়া হঠাৎ জমিদারি ক্রয় করিয়া বসিয়াছিলেন, তথাপি তাহার সাহেবজাদা বরকল্লাহ্র পক্ষে বরিহাটী জেলায়, এমনকি বঙ্গদেশের মধ্যে একেবারে অতি-আদি শরীফতম ঘর বলিয়া পরিচিত হইতে কোনোই বাধা-বিঘ্ন ঘটে নাই!
সুতরাং একে তো বরকতউল্লাহ্ মস্ত বড় মানী লোক, তাহার উপর আবার এক্ষণে হাজী হইয়া সমাজে তাঁহার সম্ভ্রম আরো বাড়িয়া গিয়াছে; কাজেই তাহার শুভাগমনে সৈয়দ-বাড়ি আজ পবিত্র হইয়াছে এবং মনিব-চাকর, ছোট-বড় সকলেই তাহার উপযুক্ত খাতির-তোয়াজ করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়া গিয়াছে।
বেলা প্রায় তিন প্রহরের সময় আহারাদি শেষ করিয়া সৈয়দ সাহেব বৈবাহিকের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত শুনিতে বসিলেন। হাজী সাহেব মক্কা মওয়াজ্জমা, মদিনা মনুওয়ারা, দামেস্ক, বাগদাদ প্রভৃতি আরবের বহু পবিত্র স্থান দর্শন করিয়া আসিয়াছিলেন, একে একে সে সকলের বর্ণনা করিয়া তিনি সৈয়দ সাহেবকে চমকৃত ও ঈর্ষান্বিত করিয়া তুলিলেন। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে দান করিয়া তাহাদের জীবন ধন্য করিবার জন্য হাজী সাহেব পুণ্যভূমি হইতে নানা প্রকার পবিত্র বস্তু সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছিলেন। বৈবাহিক তাহা হইতে বঞ্চিত হইলেন না; হাজী সাহেব তোরঙ্গ খুলিয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ শুনা উটের গোশত, একটুখানি জমজমের পানি এবং কাবার গেলাফের এক টুকরা বাহির করিয়া দিলেন। সৈয়দ সাহেব এই সকল পবিত্র বস্তু পাইয়া যে কী অপার আনন্দ লাভ করিলেন, তাহা আর বলিয়া শেষ করিতে। পারিলেন না। তিনি কহিতে লাগিলেন, –ভাই সাহেব, আপনি এ গরিবের কথা মনে করে। যে কষ্ট করে এ-সব পাক চিজ বয়ে এনেছেন, তাতে আমি বড়ই সরফরাজ হলাম। কী বলে আর দোয়া করব ভাইজান, খোদা আপনার নসিব কোশাদা করুন! খাস করে এই যে গেলাফ-পাকের কাপড়টুকু আপনি দিলেন, এতে আমাদের ঘর আজ পাক হয়ে গেল! এ চিজ যার ঘরে থাকে তার যত মুসিবত সব কেটে যায়। এমন চিজ কি আর দুনিয়াতে আছে? আহা, চ বলিয়া তিনি কাপড়ের টুকরাটিতে বহুত তাজিমের সঙ্গে বোসা (চুম্বন) দিলেন, এবং উহা দুই চক্ষে, কপালে এবং বক্ষে ঠেকাইয়া অতি যত্নে তুলিয়া রাখিলেন।
তাহার পর জমজমের পানি একটুখানি শিশি হইতে ঢালিয়া লইয়া পান করিলেন এবং দেহে ও মনে পরম তৃপ্তি ও এক অভিনব পবিত্রতা অনুভব করিয়া আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিলেন।
কিন্তু এক্ষণে উটের গোশতটুকু লইয়া কী করা যায়? উহা তো শুকাইয়া একেবারে হাড় হইয়া গিয়াছে; খাওয়া যাইবে না। হাজী সাহেব কহিলেন, –ইহা কোরবানির গোশত; খাস মক্কা মওয়াজ্জমাতেই কোরবানি হয়েছিল, এর বরকতই আলাদা। এটুকু ঘরে রাখাই ভালো, কারুর ব্যারাম-পীড়ার সময় কাজে লাগবে।
সৈয়দ সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী করতে হয়?
হাজী সাহেব কহিলেন–কিছু না, একটুখানি ঘষে বিসমিল্লাহ্ বলে খাইয়ে দিলেই হল।
সৈয়দ সাহেব শুকনা মাংসখণ্ডটিও সযত্নে তুলিয়া রাখিলেন।
কথায়-বার্তায় ক্রমে আসর-এর আযান পড়িয়া গেল। উভয়ে ওযু করিয়া মসজিদের দিকে চলিলেন। মসজিদটি এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়িয়া আছে দেখিয়া হাজী সাহেব একটু আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিলেন, –এ কী! আপনি এ কাজ এতদিন ফেলে রেখে দিয়েছেন?
সৈয়দ সাহেব একটু বিষাদের সুরে কহিলেন, –না, ভাই সাহেব, ফেলে রেখে দিই নি, পেরে উঠছি নে।
বাঃ, আপনার মতো লোকের না পেরে ওঠার তো কথাই নয়। এতে যে আপনার গোনাহ্ হচ্ছে তা কি বুঝতে পাচ্ছেন না! খোদার কাজে হাত দিয়ে এমন করে ফেলে রাখা এতে যে হেকারত করা হচ্ছে।
তা তো বুঝি ভাই সাহেব; আজ প্রায় তিন বৎসর হল কাজে হাত দিইছি, বছরখানেক কাজ চালিয়ে এই পর্যন্ত করে তুলেছি। কিন্তু গেল দুই বছর থেকে আমার যে কী দশা ধরেছে, কিছুতেই গুছিয়ে উঠতে পাচ্ছি নে। কী বলব ভাই সাহেব, এর জন্যে আমার রাত্রে ঘুম হয় না। এ দিকে ব্যারাম-পীড়ায় কাতর হয়ে পড়েছি, কেবল ভয় হয়, কোন দিন দম বেরিয়ে যাবে, এ-কাজটা খোদা আমার দ্বারা বুঝি আর করাতে দেবেন না–কী যে কেসমতে আছে, তা সেই পরওয়ারদেগারই জানেন!
হাজী সাহেব গম্ভীর হইয়া কহিলেন, –আপনার মুখে এমন কথা শোভা পায় না, ভাই সাহেব। খোদা আপনাকে যা দিয়েছেন, তা যদি খোদার কাজে না লাগালেন, তবে আখেরাতে কী জবাব দেবেন? বিষয়-সম্পত্তিই বলুন, আর ধন-দৌলতই বলুন, কিছুই তো আর সঙ্গে যাবে না। ও-সব খোদার কাজেই লাগানো উচিত।
