হ্যাঁ, সার এ্যাপ্লিকেশন ও সঙ্গে এনেছি। বলিয়া আবদুল্লাহ দরখাস্তখানি পেশ করিল। হেডমাস্টার সেখানি এক নজর দেখিয়া লইয়া টেবিলের উপর চাপা দিয়া রাখিলেন এবং কহিলেন–বেশ, এখন রইল আপনার এ্যাপ্লিকেশন । এখনো এ্যাপয়েন্টমেন্টের দেরি আছে। সময়মতো খবর পাবেন।
আবদুল্লাহ্ কহিল, –তবে এখন উঠি, স্যার। দয়া করে মনে রাখবেন, এটা পেলে আমার বড় উপকার হবে।
তা নিশ্চয়ই আপনাকে আর ও সম্বন্ধে কিছু বলতে হবে না, আমার যতদূর সাধ্য আপনার জন্যে চেষ্টা করব।
আবদুল্লাহ্ তাহাকে ধন্যবাদ দিয়া বিদায় হইল। সেদিন সন্ধ্যার পর আকবর আলীর বৈঠকখানায় আবদুল্লাহর উমেদারির প্রথম অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে আলোচনা চলিতেছিল। হেডমাস্টারের সঙ্গে তাহার যে সকল কথাবার্তা হইয়াছিল তাহা সবিস্তারে শুনিয়া আকবর আলী কহিলেন, — আপনি খুব টিকে গিয়েছেন, যা হোক।
আবদুল্লাহ কৌতূহলী হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, — টিকে গেলাম কেমন?
লোকটার চেষ্টা ছিল, আপনাকে খুব আমড়াগাছী করে ও ছোট চাকরি যাতে আপনি নিতে না চান তাই করা। দেখুন না, প্রথমেই আপনাকে নবাব ফ্যামিলির সঙ্গে তুলনা করে দিল–তারপরে বললে, মুসলমান হলেই বড় চাকরি পায়, পাসটাসের দরকার হয় না–
এইসব শুনেটুনে হয়তো আপনার মাথা ঘুরে যেত…।
তা আমাকে ভোগা দিয়ে ওঁর কী লাভ? এ পোস্টে তো মুসলমানই নেবে বলে এ্যাঁভার্টাইজ করেছে…
তা করুক। যদি মুসলমান ক্যান্ডিডেট কেউ এ্যাঁপ্লাই করে, তা হলে তো শেষটা হিন্দুই ওটা পাবে।
আবদুল্লাহ্ এতটা তলাইয়া দেখে নাই। এক্ষণে আকবর আলী সাহেবের নিকট গূঢ়ার্থ অবগত হইয়া সে একেবারে আশ্চর্য হইয়া গেল। রাত্রে শুইয়া শুইয়া সে অনেকক্ষণ ভাবিল, পরস্পর সহৃদয়তার এমন অভাব যেখানে সেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করে কেমন করিয়া? আর যদি সে এ চাকরি পায়, তাহা হইলে এরূপ লোকের অধীনে কাজ করিয়া তো সুখ পাইবে না! যা হোক, খোদা যা করেন, ভালোই করিবেন, এই বলিয়া সে আপাতত মনকে প্রবোধ দিল।
পরদিন আকবর আলী তাহাকে সঙ্গে লইয়া ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে দেখা করিতে গেলেন। সাহেব কোনো অঙ্গীকারে আবদ্ধ হইতে পারিলেন না, তবে যদি যোগ্যতর লোক না পাওয়া যায়, তাহা হইলে আবদুল্লাহর বিষয়ে বিবেচনা করিবেন বলিয়া ভরসা দিলেন। আবদুল্লাহ্ সেই রাত্রেই কলিকাতায় ফিরিয়া গেল।
যথাসময়ে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কুঠিতে কমিটির অধিবেশন হইল। ম্যাজিস্ট্রেট স্বয়ং প্রেসিডেন্ট, হেডমাস্টার সেক্রেটারি এবং একজন ডিপুটি, একজন উকিল ও একজন স্থানীয় জমিদার, এই তিনজন বাকি মেম্বর। আবদুল্লাহ্ ব্যতীত আর একজন মাত্র মুসলমান দরখাস্ত দিয়াছে; সে লোকটি এফ-এ পাস এবং কিছুদিন অন্যত্র মাস্টারিও করিয়াছে। হেডমাস্টার তাহাকেই উপযুক্ত বলিয়া পছন্দ করিলেন। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আবদুল্লাহকেই অধিক যোগ্য বলিয়া মত দিলেন। হেডমাস্টার কহিলেন–উহার শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু ইহার নাই। সাহেব কহিলেন, এ ব্যক্তি বি-এ পর্যন্ত পড়িয়াছে, সুতরাং ও ব্যক্তি অপেক্ষা কিছু বিদ্বান, এবং ইহার হাতের লেখাও সুন্দর, দেখিলে লোকটিকে বেশ দক্ষ বলিয়া ধারণা হয়। তাহার পর তিনি মেম্বরগণের মতামত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন যে, তাহার মতের অপেক্ষা না করিয়া মেম্বরগণ স্বাধীনভাবে মত দিতে পারেন। অবশ্য যাহার পক্ষে ভোট অধিক হইবে, সেই চাকরি পাইবে, তা সাহেব নিজে যাহাকেই পছন্দ করুন না কেন! ফলে কিন্তু মেম্বরত্রয় সাহেবের মতেই মত দিয়া ফেলিলেন। আবদুল্লাহ্ চাকরি পাইল।
কুঠি হইতে বাহিরে আসিয়া পথে চলিতে চলিতে জমিদার বাবুটি হেডমাস্টারকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি সাহেবের বিরুদ্ধে ও লোকটার জন্যে এত উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলেন কেন। হেডমাস্টার কহিলেন, –আরে মশায়, আপনারা কেউ আমার দিকে ভোট দিলেন না, তা আর কী করব! আমারই ভুল হয়ে গেল। আর সাহেব যে ওর দিকে ঝুঁকে পড়বেন, তা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি। আগে থেকে আপনাদের যদি একটু বলে রাখি, তা হলে আজ ভোটে ঠিক মেরে দিয়েছিলাম মশায়। সাহেব লোক ভালো, মেম্বরদের মত দেখলে তিনি কখনই জেদ কত্তেন না।
উকিল বাবুটি জিজ্ঞাসা করিলেন, –তা ও দু ব্যাটাই তো নেড়ে, ওর আবার ভালো মন্দ কী? একটা হলেই হল।
হেডমাস্টার কহিলেন–আরে না মশায়, এর ভেতর কথা আছে। এ-লোকটা পি-এল লেকচার কমপ্লিট করেছে, এখন একজামিন দিয়ে পাস কল্লেই চাকরি ছেড়ে দেবে, আমি সঠিক খবর জানি। ছেড়ে দিলে একটা প্লি হত, নেড়েগুলো স্টিক করে না তাতে কাজের বড় ডিসলোকেশন হয়। তারপর নিজেদের একটা লোক নেওয়া যেত।
উকিল বাবুটি একটু আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, –আপনি একটু আগে কেন বলেন নি? আমরা তো এর কিছুই জানি নে। জানলে নিশ্চয়ই এর জন্যে ভোট দিতাম। বলা উচিত ছিল আপনার আগে।
হেডমাস্টার কহিলেন, কে জানে মশায়, এত গণ্ডগোল হবে! ভেবেছিলাম, আমি যাকে ফিট বলে দেব, সাহেব তাতেই রাজি হবে। যাক, ওর বরাতে আছে, আমি কী করব!
.
১৯.
একবালপুরে সৈয়দ-বাড়িতে আজ মহা ধুম পড়িয়া গিয়াছে। আবদুল মালেকের শ্বশুর শরীফাবাদের হাজী বরকতউল্লাহ সম্প্রতি মক্কা শরীফ হইতে ফিরিয়া বৈবাহিকের সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়াছেন।
