এইরূপ কল্পনা-জল্পনা করিতে করিতে আবদুল্লাহ আহারাদি করিয়া একখানি দরখাস্ত লিখিয়া হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করিতে চলিল। স্কুলে উপস্থিত হইয়া জনৈক ভৃত্যকে হেডমাস্টারের কামরা কোথায় জিজ্ঞাসা করিল। সে একবার আবদুল্লাহর আপাদমস্তক ভালো করিয়া দেখিয়া লইয়া কহিল, –একখানা কাগজে নাম এবং কী জন্য দেখা করিতে চাহেন তাহা লিখিয়া দিতে হইবে। আবদুল্লাহ্ তাহাই লিখিয়া দিল। কিছুক্ষণ পরে ভৃত্যটি আসিয়া তাহাকে হেডমাস্টারের কামরায় লইয়া গেল।
আবদুল্লাহ্ কামরায় প্রবেশ করিতেই হেডমাস্টার চেয়ার হইতে উঠিয়া সবেগে তাহার সহিত করমর্দন করিলেন এবং হাতমুখ নাড়িয়া অদ্ভুত বিকৃত উচ্চারণে বলিয়া ফেলিলেন, আইয়ে জনাব, বয়ঠিয়ে, আপ কাঁহা সে আসতে হ্যাঁয়?
আবদুল্লাহ্ বিনয়ের সহিত কহিল, –স্যার, আমি বাঙালি, আমার সঙ্গে বালাতে কথা বলতে পারেন।
হেডমাস্টার একটু ঘাড় নিচু করিয়া তাহার নাসিকার মধ্যস্থিত চশমাটির উপর হইতে আবদুল্লাহর দিকে নেত্রপাত করিয়া কহিলেন, –ওঃ হো! আপনি বাঙালি? বেশ, বেশ, আপনার পোশাক দেখে আমি ঠাউরেছিলাম যে, আপনি দিল্লি কিংবা লাহোর না হোক, অন্তত ঢাকা কিংবা মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে এসেছেন; সেখানকার নবাব ফ্যামিলির লোকেরা এই রকমই পোশাক পরেন কিনা!
আবদুল্লাহ্ একটুখানি হাসিয়া কহিল, –কেন, মুসলমানেরা সব জায়গাতেই তো এই রকম আচকান আর পায়জামা পরে…।
কই মশায়, আমি তো দেখতে পাই এখানে কেউ টুপিটা পর্যন্ত পরে না। তা এরা সব—এই–ছোটলোক কিনা, চাষাভুষো; এসব পোশাক ওরা কোত্থেকে পাবে!
আবদুল্লাহ কহিল, হ্যাঁ, তা সম্ভান্ত লোকমাত্রেই এইরকম পোশাক ব্যবহার করেন…
তা বৈকি! তবে আপনাদের মতো সম্ভ্রান্ত লোক এ অঞ্চলে কটিই বা আছেন!
আবদুল্লাহ্ একটুখানি চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল, –মশায়ের কাছে একটা দরবার নিয়ে এসেছিলাম…
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি বুঝি এই পোস্টটার জন্যে স্ট্যান্ড কত্তে চান? তবে কি জানেন, এতে মাইনে অতি সামান্য, প্রসপেক্টও কিছু নেই, আপনাদের মতো লোকের কি আর এসব চাকরি পোষাবে? আমি তাই ভাবছি।
আমাদের অবস্থা নিতান্ত মন্দ স্যার। বি-এ পড়ছিলাম, হঠাৎ আমার ফাদার মারা গেলেন, কাজেই আর পড়াশুনো হল না, আর এখন চাকরি ছাড়া সংসার চালাবার উপায় নেই…
ওঃ বটে? তবে তো বড়ই দুঃখের বিষয়! তা আপনি একটু চেষ্টা কল্লে খুব ভালো চাকরিই পেতে পারেন। ডিপুটি না হোক, সব্ডিপুটি তো চট করে হয়ে যাবেন। কেন মিছিমিছি এই সামান্য মাইনের চাকরি করবেন, এতে না আছে পয়সা, না আছে ইজ্জত…
আমার তেমন মুরব্বি নেই স্যার, আর ডিপুটি সবুডিপুটি ওসব বি-এ পাস না হলে হয় না…
কে বলেছে আপনাকে? আপনাদের বেলায় ও-সব কিছুই লাগে না। একবার গিয়ে দাঁড়ালেই হল। আজকাল যে সব গভর্নমেন্ট সার্কুলার বেরুচ্ছে, মুসলমান হলেই সে চাকরি পাবে, তা কি আপনি জানেন না?
শুনেছি বটে, কিন্তু মুসলমান হলেই তো হয় না; উপযুক্ত যোগ্যতা থাকা চাই, আবার যোগ্য লোকদের মধ্যেও কমপিটিশন আছে। যার ভালো সুপারিশ নেই, তার পক্ষে যোগ্য হলেও ওসব বড় চাকরির আশা করা বিড়ম্বনা।
হেডমাস্টার বামপার্শ্বস্থ জানালার বাহিরে দৃষ্টিস্থাপন করিয়া টেবিলের উপর অঙ্গুলির আঘাত করিতে করিতে কহিলেন, –ভুল ভুল! এমনি করেই আপনারা নিজেদের প্রসপেক্ট মাটি করেন।
তাহার পর আবদুল্লাহর দিকে চাহিয়া কহিলেন, –আমি আপনার ভালোর জন্যেই পরামর্শ দিচ্ছিলাম, একটু চেষ্টা কল্লেই আপনি এর চেয়ে ভালো চাকরি পেতেন। সরেজিস্ট্রারিও তো মাস্টারির চাইতে অনেক ভালো। এই তো সেদিন আপনাদেরই জাতের একজন সব্রেজিস্ট্রারি পেয়ে গেল, সে তো ফোর্থ ক্লাস পর্যন্তও পড়ে নি। এক কলম ইংরেজি লিখতে পারে না, কওয়া তো দূরের কথা। হাতের লেখাও একেবারে ছেলে মানুষের মতো, তবু সাহেব কেবল মুসলমান দেখেই তাকে চাকরি দিয়েছেন।
আপনি কি আবদুল কাদেরের কথা বলছেন, –এই মাস তিন চার হল এপ্রেন্টিস্ হয়েছে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তারই কথা বলছি–আপনি তাকে জানেন তা হলে?
জানি একটু একটু।
তবে দেখুন দেখি, সে এই বিদ্যে নিয়ে চাকরিটা পেলে, আর আপনি বি-এ পর্যন্ত পড়ে ডিপুটি হতে পারবেন না!
তার সম্বন্ধে বোধহয় আপনি ঠিক খবর পান নি, স্যার। সে এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়েছে, আর এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়া অনেক হিন্দুই যখন সরেজিস্ট্রার হতে পেরেছেন, তখন সে হিসেবে আবদুল কাদেরকে তো অযোগ্য বলা যায় না। আর এদিকে সে ইংরেজিও খুব ভালোই জানে, হাতের লেখাও চমৎকার। এই দেখুন, তার একখানা চিঠি আমার পকেটে ছিল, পড়ে দেখতে পারেন।
হেডমাস্টার চিঠিখানি পরম আগ্রহের সহিত হাত বাড়াইয়া লইলেন এবং ঘাড় উঁচু করিয়া দূর হইতে চশমার ভিতর দিয়া গভীর মনোযোগের সহিত চিঠিখানি উল্টাইয়া পাল্টাইয়া দেখিলেন। পরে চশমার উপর দিয়া আবদুল্লাহর দিকে তাকাইয়া কহিলেন, বটে? এ তো দেখছি বেশ লেখা! আর ইংরেজিও খাসা; কে বলতে পারে এন্ট্রান্স পড়া লোকের লেখা! একেবারে বি-এ পাসের মতো বলেই বোধ হচ্ছে! আমি নিশ্চয়ই আর কারুর কথা শুনেছিলাম। কী জানেন, আপনাদের নামগুলো সকল সময় মনে থাকে না, তাই কার কথা। শুনি আর কাকে মনে করি। তা যাক, আপনি তা হলে এই পোস্টের জন্যেই এ্যাঁপ্লাই করবেন, স্থির করেছেন?
