আলহামদো লিল্লাহ্! কী চাকরি পেয়েছে, বাবা?
সব্রেজিস্ট্রার হয়েছে–এখন উমেদারি কচ্ছে, তাতেও মাসে কুড়ি টাকা করে পাবে, এর পরে পাকা চাকরি পেলে মাসে এক শ কি দেড় শও পেতে পারে।
শুনিয়া মাতা খোদার কাছে হাজার হাজার শোকর করিতে লাগিলেন। হালিমা তাহার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়া শুনিতেছিল; আনন্দে তাহার হৃদয় ভরিয়া উঠিল। শ্বশুরালয়ে একেবারেই তাহার মন টিকিত না; এইবার খোদার ফজলে স্বামীর যখন চাকরি হইয়াছে, তখন নিজের সংসার গুছাইয়া পাতিয়া লইয়া পছন্দমতো থাকিতে পারিবে, ইহাই মনে করিয়া সে মনে মনে একটা সোয়াস্তি অনুভব করিল।
মাতা একটু ভাবিয়া কহিলেন–তা তুইও ওই চাকরির চেষ্টা কর না বাবা!
আবদুল্লাহ্ কহিল, সেও তো তাই লিখেছে, আর আমাকে বরিহাটীতে যেতেও বলেছে। কিন্তু ওদিকে গেলে যে আর পড়াশুনা করা যাবে না। আমার ইচ্ছে, মাস্টারি করে বি-এ পাস করি। বিএ পাস কত্তে পাল্লে ও সবরেজিস্ট্রারির চাইতে ঢের ভালো চাকরি পাওয়া যাবে–আর না হলে ওকালতিও তো করা যাবে।
সংসারের উপস্থিত টানাটানির কথা ভাবিয়া মাতা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন; কিন্তু পুত্রের সঙ্কল্পের কোনো প্রতিবাদ করিলেন না। কহিলেন, –আচ্ছা, বাবা, যা ভালো বোঝ, তাই কর। খোদা এক রকম করে চালিয়ে দেবেন।
এদিকে আবদুল্লাহর রওয়ানা হইবার সময় নিকট হইয়া আসিয়াছে। সে তাড়াতাড়ি আবদুল কাদেরের পত্রের জবাব লিখিয়া ফেলিল। তাহাতে পিতার মৃত্যু সংবাদ হইতে আরম্ভ করিয়া তাহার শ্বশুরবাড়ির ঘটনা এবং চাকরির সন্ধানে কলিকাতায় যাওয়ার বন্দোবস্তের কথা পর্যন্ত মোটামুটি লিখিয়া দিল এবং কলিকাতায় গিয়া কোথায় থাকিবে, কী করিবে, না করিবে সে সকল বিষয় সেখানে গিয়া পরে জানাইবে, তাহাও বলিয়া রাখিল।
যাত্রাকালে মাতা কহিলেন, –একটা খোশ-খবর নিয়ে যাত্রা করলি বাবা, খোদা বোধহয় ভালো করবেন। বিসমিল্লাহ বলিয়া আশায় বুক বাঁধিয়া আবদুল্লাহ রওয়ানা হইয়া গেল।
কিন্তু যে আশা ও উৎসাহ লইয়া আবদুল্লাহ্ কলিকাতায় আসিল, দুদিনেই তাহা ভঙ্গ হইয়া গেল। কোনো স্কুলেই মাস্টারি জুটিল না। কলিকাতায় এক মাদ্রাসা ভিন্ন তখন আর মুসলমান স্কুল ছিল না; সেখানে একটা চাকরি খালি পাইয়াও, আর একজন বিহারবাসী উমেদারের বিপুল সুপারিশের আয়োজনের সম্মুখে সে তিষ্ঠিতে পারিল না।
এইরূপে কয়েক মাস বেকার কাটিয়া গেল। হালিমা যে কয়টি টাকা দিয়াছিল, তাহাও প্রায় ফুরাইয়া আসিল, অথচ উপার্জনের কোনোই কিনারা হইল না। এদিকে আবদুল্লাহ কাহারো বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজও খুঁজিতেছিল। কিন্তু মুসলমানগণের ঘরে বড়জোর পাঁচ টাকায় আপারা এবং উর্দু পড়াইবার কাজ মিলিতে পারে; তাও আবার ইংরেজি-পড়া লোক দেখিলে লোকে আমল দিতে চায় না। যাহা হউক অনেক অনুসন্ধানের পর অবশেষে মীর্জাপুরের জনৈক ধনী চামড়াওয়ালার বাড়িতে আহার ও বাসস্থানসহ পনর টাকা বেতনে দুইটি বালকের শিক্ষকতা পাইয়া আবদুল্লাহ্ আপাতত হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল।
কিন্তু গৃহশিক্ষকের কাজ করিয়া বি-এ পাস করিবার সুযোগ পাওয়া যাইবে না। প্রাইভেট দিতে হইলে কোনো স্কুলে মাস্টারি করা চাই; আর কলেজে পড়িতে গেলে এ সামান্য বেতনে চলা কঠিন, তবে যদি ফ্রি স্টুডেন্ট হইতে পারে, তাহা হইলে ওই পনরটি টাকা হইতে অন্তত বারটি করিয়া টাকা মাসে মাসে মাকে পাঠাইতে পারিবে। কিন্তু এ বৎসর আর সময় নাই; এখন এইভাবেই চলুক; আগামী গ্রীষ্মের বন্ধের পর কোনো কলেজে ফ্রি পড়িবার জন্য চেষ্টা করা যাইবে। আর ইতোমধ্যে যদি একটা মাস্টারি কোনো স্কুলে জুটিয়া যায়, তবে তো কথাই নাই; নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া প্রাইভেট পরীক্ষা দিতে পারিবে।
সৌভাগ্যক্রমে চাকরির জন্য আবদুল্লাহকে অধিক দিন বসিয়া থাকিতে হইল না। কলিকাতায় আসার পর সে আবদুল কাদেরের সহিত রীতিমতো পত্র ব্যবহার করিতেছিল। ইতোমধ্যে তাহার নিকট হইতে সংবাদ পাইল যে বরিহাটীর গভর্নমেন্ট স্কুলে একজন মুসলমান আন্ডারগ্রাজুয়েট চাই, বেতন চল্লিশ টাকা। বিলম্বে ফসকাইয়া যাইতে পারে, সুতরাং আবদুল্লাহ্ যেন পত্রপাঠ চলিয়া আসে।
আবার আবদুল্লাহর মন আশার আনন্দে নাচিয়া উঠিল। সেইদিন রাত্রের মেলে রওয়ানা হইয়া পর দিন বরিহাটীতে গিয়া উপস্থিত হইল। আবদুল কাদের তাহাকে দেখিয়া এত খুশি হইল যে, সে আবদুল্লাহূকে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিয়া কহিল, –ভাই, খোদার মরজিতে যদি তুমি এ চাকরিটা পাও, তবে আমরা দুজনে এক জায়গাতেই থাকতে পারব।
আবদুল্লাহ কহিল, –দাঁড়াও ভাই, আগে পেয়েই তো নিই। তুমি যে গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল গোছ কচ্ছ।
আরে না না, শুনলাম এবার নাকি ডিরেক্টার আপিস থেকে চিঠি এসেছে, একজন মুসলমান নিতেই হবে। আর ক্যান্ডিডেট কোথায়? থাকলেও ভয় নেই খোদার ফজলে। আমাদের মুন্সী সাহেবের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের খুব খাতির–আর তিনিই স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট কিনা। ও এ্যাপয়েন্টমেন্ট তারই হাতে। মুন্সী সাহেবকে সঙ্গে দিয়ে তোমাকে কালই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি, দাঁড়াও।
আবদুল কাদেরের আশাপূর্ণ কথায় আবদুল্লাহ্ মনে মনে অনেকটা বল পাইল। সে ভাবিল, –চল্লিশ টাকা তাহার জন্য এখন খুবই যথেষ্ট হইবে; বাসা খরচ পনর টাকা করিয়া লাগিলেও পঁচিশ টাকা সে মাকে পাঠাইতে পারিবে–আর আবদুল কাদেরও হালিমাকে মাসে মাসে পাঁচটি করিয়া টাকা পাঠাইতেছে। ওঃ, খোদা চাহে তো সংসারের আর কোনোই ভাবনা থাকিবে না।
