আচ্ছা, করতে পারেন, আমি আপিসে সন্ধান নিয়ে দেখব, খালি হচ্ছে কি না। যদি খালি হয়, তবে হয়তো পেতেও পারেন, কিন্তু আমি কোনো অঙ্গীকার কত্তে পারি নে, মুন্সী।
আপনি আশা দিলেন স্যার, তার জন্যেই আমরা কৃতজ্ঞ।
অল রাইট, মুন্সী, গুডমর্নিং! বলিয়া কিঞ্চিৎ ঘাড় নাড়িয়া তাহাদিগকে সাহেব বিদায়সূচক সম্ভাষণ করিলেন। তাঁহারাও থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, স্যার, গুডমর্নিং! বলিয়া এক সেলাম করিয়া বিদায় লইলেন।
বাহিরে বারান্দায় কয়েকজন ডেপুটি বাবু, পেশকার, উমেদার প্রভৃতি সাহেবের সহিত সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় বসিয়া ছিলেন। আকবর আলী তাহাদিগকে স্মিতমুখে সালাম করিলেন; কেহ কেহ সে সালাম গ্রহণ করিলেন, কেহ কেহ করিলেন না। তাহারা চলিয়া গেলে একজন জিজ্ঞাসা করিলেন–এ আর এক ব্যাটা নেড়ে এল কোত্থেকে হে?
পেশকার বাবু কহিলেন, সব মুন্সী কোত্থেকে জোটাচ্ছে, কে জানে! এক নেড়ে যখন ঢুকেছে, তখন নেড়েয় নেড়েয় মক্কা হয়ে যাবে দেখতে পাবেন;–আর আজকাল মুন্সীর তো পোয়াবারো! সাহেবের ভারি সুনজর! এই দেখুন না, কারু সঙ্গে সাহেব দুই-তিন মিনিটের বেশি আলাপ করেন না, আর মুন্সী প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সাহেবের সঙ্গে খোশআলাপ করে এল! অপর এক বাবু কহিলেন, –তা হবে না? আজকাল যে ওরা গভর্নমেন্টের পুষ্যি পুত্তুর হয়ে উঠেছে। তাহার পর তিনি চক্ষু দুইটি ঘুরাইয়া কহিলেন, –সার্কুলার বেরুচ্ছে চাকরি খালি হলে এখন নেড়েরাই পাবে। নেড়ে এ্যাঁপয়েন্ট না করতে পারলে আবার কৈফিয়তও দিতে হবে!…
এমন সময় বাবুটির তলব হইল; তিনি তাড়াতাড়ি চেয়ার হইতে লাফাইয়া উঠিয়া পকেট হাতড়াইয়া রুমাল বাহির করিয়া এক হাতে মুখ মুছিতে মুছিতে এবং আর এক হাতে চাপকানের দাম পাট করিতে করিতে দরজার চৌকাঠে ছোটখাটো একটা হোঁচট খাইয়া সেটা সামলাইতে সামলাইতে সাহেবের কামরায় গিয়া প্রবেশ করিলেন।
.
১৮.
হালিমাকে সঙ্গে লইয়া আবদুল্লাহ্ যখন গৃহে ফিরিল, তখন মাতা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন। বহুদিন তিনি কন্যাকে দেখেন নাই; ইতোমধ্যে তাহার একটি পুত্রও হইয়াছে। স্বামীর মৃত্যুতে তিনিও দারুণ শোক পাইয়াছেন, এক্ষণে শোকের ও আনন্দের যুগপৎ উচ্ছ্বাসে অধীর হইয়া কন্যাকে কোলে টানিয়া লইয়া কাদিতে লাগিলেন, আবার পরক্ষণেই তাহার পুত্রটিকে বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া অশ্রুসিক্ত মুখে হাসিয়া ফেলিলেন। কিন্তু সে যখন তাহার অজস্র চুম্বনে অস্থির হইয়া কাঁদিয়া ফেলিল, তখন তিনি তাহাকে ভুলাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন; তাহাকে কোলের উপর নাচাইয়া কাক, বিড়াল, মুরগি, যাহা যেখানে ছিল, সব ডাকিয়া, এটা ওটা সেটা দেখাইয়া তাহাকে হাসাইয়া দিলেন।
কিন্তু এ আনন্দের মধ্যেও তাহার মনের কোণে দুইটি কারণে দুঃখের কুশাঙ্কুর বিধিয়া রহিল, –বউ আসে নাই, সে এক কারণ, আর আবদুল্লাহর পড়ার কোনো বন্দোবস্ত হইল না, সেই আর এক কারণ। আবদুল্লাহর শ্বশুর তো সাহায্য করিতে রাজি হইলেন না; মীর সাহেব যদিও সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছেন বলিয়া আবদুল্লাহর মুখে শুনিলেন, কিন্তু সে সাহায্য গ্রহণ করা ভালো বিবেচনা করিলেন না। সুতরাং আর কোনো উপায় নাই; আবদুল্লাহ্কে চাকরির সন্ধানেই বাহির হইতে হইবে। আবার বাহির হইতে হইলে কিছু খরচপত্র চাই, তাহারও যোগাড় করা দরকার; এই সকল কথা ভাবিয়া মাতা বড়ই অস্থির হইয়া উঠিলেন।
কয়েকদিন ধরিয়া ভাবিয়া ভাবিয়া টাকা সংগ্রহের কোনো উপায় স্থির করিতে না পারিয়া শেষে পুত্রকে ডাকিয়া কহিলেন, –বিদেশে যাবি বাবা, কিছু টাকা তো হাতে রাখতে হয়! তা আমার যা দুই একখানা গয়না আছে সেগুলো বেচে ফেল্!
আবদুল্লাহ্ কহিল, –কীই বা এমন আছে, আম্মা, ওগুলো না হয় ঘর বলে থাক। আমি যোগাড় করে নেবখন…।
কোথা থেকে যোগাড় করবি, বাবা?
হালিমা কহিল, –আমার হাতে কিছু আছে, ভাইজান, আমি দিচ্ছি।
আবদুল্লাহ্ কহিল, –না, না, ও টাকা থাক, সময়-অসময়ে কাজে লাগবে…
হালিমা বাধা দিয়া কহিল, –তা বেশ তো, আপনার অসময় পড়েছে, ভাইজান, তাই তো কাজে লাগাতে চাচ্ছি। কেন মিছিমিছি ধার-কর্জ কত্তে যাবেন; এই টাকাই নেন, তারপর খোদা যদি দিন দেন, তখন না হয় আবার আমাকে দেবেন।
মাতাও হালিমার এই প্রস্তাবে মত দিলেন। অগত্যা তাহাকে ভগ্নীর নিকট হইতেই টাকা লইতে রাজি হইতে হইল।
স্থির হইল, সে প্রথম কলিকাতায় গিয়া তাহাদের পুরাতন মেসে বাসা লইবে এবং চাকরির সন্ধান করিবে। আবদুল্লাহ্ আশা করিয়াছিল, কলিকাতায় গেলে নিশ্চয়ই একটা কিনারা করিতে পারিবে। সে বিশাল নগরীতে শত-সহস্র লোক উপার্জন করিতেছে, চেষ্টা করিলে তাহারও কি একটা উপায় হইবে না! আশায়, উৎসাহে সে কলিকাতায় যাইবার আয়োজন করিতে লাগিল।
এমন সময় বরিহাটী হইতে আবদুল কাদেরের এক পত্র আসিল। অনেক দিন পরে তাহার পত্র পাইয়া আবদুল্লাহ্ ক্ষিপ্রহস্তে খুলিয়া এক নিশ্বাসে পড়িয়া ফেলিয়া, আম্মা, আম্মা, হালিমা, হালিমা বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে বাড়ির ভিতর ছুটিয়া আসিল। তাহার ব্যস্ততা দেখিয়া মাতা তাড়াতাড়ি রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –কী, কী, আবদুল্লাহ্, কী হয়েছে?
আবদুল কাদেরের চাকরি হয়েছে, আম্মা!
