আকবর আলী তাহার সম্মুখে নীত হইয়া যথারীতি সালাম করিলে সাহেব বলিয়া উঠিলেন, –গুডমর্নিং, মুন্সী, খবর কী?
আকবর আলী কহিলেন, থ্যাংক ইউ সার, খবর ভালোই। আজ একটা দরবার নিয়ে হুজুরে হাজির হয়েছি…।
বলা বাহুল্য, কথাবার্তা ইংরেজিতেই হইতেছিল।
সাহেব কহিলেন, –কেন, আপনার ছেলের চাকরি তো সেদিন হয়ে গেল, আবার কিসের দরবার?
আপনার দয়াতেই আমার ছেলের চাকরি জুটেছে, সেজন্য কী বলে আমি আমার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানাব, তা ভেবে পাই নে…
না না, মুন্সী, দয়াটয়া কিছু নয়, তবে উপযুক্ত লোক পেলে আমি অবশ্যই চাকরি দিয়ে থাকি…।
সেই ভরসাতেই আজ একজন দুস্থ মুসলমান উমেদারকে সঙ্গে করে এনেছি, স্যার! যদি হুকুম হয়…
আচ্ছা, তাকে আসতে বল, দেখি।
আকবর আলী তৎক্ষণাৎ বাহিরে গিয়া আবদুল কাদেরকে সঙ্গে করিয়া আনিলেন। আবদুল কাদের সালাম করিয়া দাঁড়াইলেন, করবেট সাহেব তাহার নাম, যোগ্যতা প্রভৃতি জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, –ওয়েল মুন্সী, এ তো এনট্রান্স পাস করে নাই। পাস না হলে আজ-কাল তো গভর্নমেন্ট আপিসে চাকরি হওয়া কঠিন–তবে বিশেষ ক্ষেত্রের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র।
আকবর আলী কহিলেন, –ইনি আপিসে কোনো চাকরি চান না স্যার; সব্রেজিস্ট্রারির জন্যে এপ্রেন্টিসী প্রার্থনা করেন…
সাহেব কহিলেন, –সে তো আরো কঠিন কথা! আজকাল যেসব গ্রাজুয়েট, আন্ডার গ্রাজুয়েট এসে সব্রেজিস্ট্রারির জন্যে উমেদার হচ্ছে…।
এন্ট্রান্স ফেলও তো আপনার কৃপায় পেয়ে যাচ্ছে, স্যার!
সাহেব একটু হাসিয়া বলিয়া উঠিলেন, –ও! আপনি উমাশঙ্কর বাবুর ছেলের কথা বলছেন? সে যে খুব সম্ভ্রান্ত বংশের লোক…
ইনিও কম সম্ভ্রান্ত বংশের লোক নন, স্যার! একবালপুরের জমিদারেরা যে কেমন পুরাতন ঘর তা স্যারের জানা আছে…
সাহেব কহিলেন, –ওঃ আপনি একবালপুরের সৈয়দ বংশের লোক বটে?–আপনার সঙ্গে আজ পরিচয় হওয়ায় বড়ই সুখী হলাম! তা আপনাদের মতো বড় ঘরের ছেলের চাকরির দরকার কী?
আবদুল কাদের কহিল, –আমাদের ঘরের অবস্থা আর আজ-কাল তেমন ভালো নেই, স্যার। এখন অন্য উপায়ে উপার্জন না কত্তে পাল্লে সংসারই চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। আপনি একটু দয়া কল্লে, স্যার, আমার কষ্ট দূর হতে পারে।
সাহেব একটু আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, –মুসলমান জমিদার ঘরের ছেলে হয়ে আপনি এমন কথা বলছেন! আমি দেখেছি, আপনাদের শ্রেণীর মধ্যে এমন লোকও আছে যে, ক্রমে দুরবস্থায় পড়েও গুমোর ছাড়ে না। লেখাপড়া শেখা, কি কোনো ব্যবসায় করা, ছোটলোকের কাজ বলে মনে করে–শেষটা তাদের বংশাবলীর ভাগ্যে হয় ভিক্ষা, না হয় জাল-জুয়াচুরি ছাড়া আর কিছুই থাকে না।
আকবর আলী কহিলেন, –আমাদের ভিতরকার অবস্থা সম্বন্ধে আপনার চমৎকার বহুদর্শিতা আছে, স্যার।
হ্যাঁ, আমি অনেক ঘুরে ঘুরে দেখেছি বটে। দেখেশুনে সত্যই আমার মনে বড় দুঃখ হয় এদের জন্যে। কিন্তু যতদিন এরা লেখাপড়ার দিকে মন না দিচ্ছে, ততদিন কিছুতেই কিছু হতে পারবে না। দেখ, হিন্দুরা লেখাপড়া শিখে কেমন উন্নতি করে ফেলেছে– আপিসে আদালতে কি ব্যবসায়-বাণিজ্যে, যেখানে যেখানে দেশীয় লোক দেখতে পাই, কেবলই হিন্দু–ক্বচিৎ কালে-ভদ্রে একজন মুসলমান নজরে পড়ে। ক্রমে ওরাই দেশের সর্বেসর্বা হয়ে উঠবে, দেখতে পাবেন, আপনারা কেবল কাঠ কাটবার জন্যে পড়ে থাকবেন।
আকবর আলী কহিলেন, –আজ কাল দুই-একজন করে লেখাপড়া শিখতে আরম্ভ করেছে, স্যার, এই তো একজন আপনার কাছে হাজির করেছি…
ওঃ, এক-আধ জন একটু শিখলে তাতে তো ফল হয় না, আর ইনি তো পাসও কত্তে পারেন নি…
প্রথম অবস্থায় এইটুকুতেই একটু উৎসাহ না পেলে লেখাপড়ার দিকে লোকের উৎসাহ বাড়বে কেন, স্যার? প্রথম প্রথম তো আমরা হিন্দুদের সঙ্গে সমান সমান হয়ে প্রতিযোগিতা কত্তে পারব না, কাজেই গভর্নমেন্টের একটু বিশেষ নজর এ গরিবদের উপর থাকবে বলে ভরসা করি।
সাহেব কহিলেন, –কিন্তু এ কথা মনে রাখবেন, মুন্সী সাহেব, চিরদিন যদি আপনারা ওই বিশেষ নজরের ওপর নির্ভর করে থাকেন, তবে কখনই উন্নতি করে অন্যান্য সম্প্রদায়ের সমকক্ষ হতে পারবেন না।
সে কথা খুবই ঠিক, স্যার। তবে বর্তমানে লেখাপড়ায় একটু কম থাকলেও, স্যার বোধহয় দেখেছেন, মুসলমান কর্মচারীরা কাজকর্মে নিতান্ত মন্দ দাঁড়ায় না…
তা দেখেছি বটে। আবার অনেক সময় বি-এ পাস হিন্দু দেখে লোক নিযুক্ত করে আমাকে ঠকতে হয়েছে। অবশ্য কেবল পাস হলেই যে লোক যোগ্য হল তা নয়, তবু গভর্নমেন্টের পক্ষে বাছাই করবার ওটা একটা সহজ উপায় বটে। সেইজন্যেই পাসটা আমাদের দেখতে হয়।
তবু স্যার, এর বেলায় আপনি একটু বিশেষ দয়া না করলে ভদ্রলোকের মারা পড়বার দশা। লেখাপড়া শিখবার এর খুবই আগ্রহ ছিল, কিন্তু এদিকে বয়সও বেড়ে চলল, অবস্থাতেও আর কুলাল না, কাজেই চাকরির চেষ্টা কত্তে হচ্ছে। গরিবের ওপর আপনার যেমন মেহেরবানি, তাতেই একে আজ আনতে সাহস করেছি…।
সাহেব কহিলেন, –আচ্ছা, আচ্ছা, আপনি একটা দরখাস্ত পাঠিয়ে দেবেন–এপ্রেন্টিসী খালি হলে আপনার বিষয় বিবেচনা করা যাবে। আর, মুন্সী, আপনি একটু নজর রাখবেন, সময়মতো আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবেন।
আকবর আলী কহিলেন, –সম্প্রতি একটা এপ্রেন্টিসী খালি হবার কথা শুনছি, স্যার। যদি হুকুম হয়, তবে আজই দরখাস্ত পেশ করি…
