কিন্তু এত নসিহতেও কোনো ফল হইল না। আকবত-এর ভয় দেখাইয়াও সৈয়দ সাহেব পুত্রের মন ফিরাইতে পারিলেন না। সে আর মাদ্রাসায় পড়িতে চাহিল না। যদি পড়িতেই হয়, তবে সে ইংরেজি পড়িবে, আর যদি তাহা পড়িতে নাও দেন, তাহা হইলে যে-টুকু সে শিখিয়াছে, তাহাতেই করিয়া খাইতে পারিবে। সুতরাং অনন্যোপায় হইয়া সৈয়দ সাহেব সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিবার ভয় দেখাইতে বাধ্য হইলেন। এইটিই তাহার হাতের শেষ মহাস্ত্র ছিল এবং মনে করিয়াছিলেন, এ মারাত্মক অস্ত্র ব্যর্থ হইবে না।
আবদুল কাদের নিতান্ত নির্বোধ ছিল না। সে বুঝিতে পারিয়াছিল যে, পিতার সম্পত্তি ভ্রাতা-ভগ্নীগণের মধ্যে বিভাগ হইয়া গেলে আর পায়ের উপর পা দিয়া বড়-মানুষি করা চলিবে না; বিশেষত পিতা যেরূপ অবিবেচনার সহিত খরচ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন, তালুক বিক্রয় করিয়া মসজিদ দিতেছেন, তাহাতে শেষ পর্যন্ত সম্পত্তির যে কতটুকু থাকিয়া যাইবে, তাহা এখন বলা যায় না। এরূপ অবস্থায় পিতা তাহাকে যেটুকু সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিবার ভয় দেখাইতেছেন, সেটুকু থাকিলেও বড় লাভ নাই, গেলেও বড় লোকসান নাই। সুতরাং পিতার মহাস্ত্রের ভয়েও সে টলিল না, বরং জেদ করিতে লাগিল, তাহাকে এন্ট্রান্সটা পাস করিতে দেওয়া হউক, নতুবা সে নিজের পথ দেখিবার জন্য গৃহত্যাগ করিয়া যাইবে।
সৈয়দ সাহেব অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া কহিলেন, তবে তুই দূর হয়ে যা–তোর সঙ্গে আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
আবদুল কাদের খুশি হইয়া ভাবিল, –সে তো তাহাই চাহে। মুখে কহিল, জি, আচ্ছা, তাই যাচ্ছি।
তাহার পর সত্য সত্যই সে একদিন বাটী হইতে বাহির হইয়া গেল।
.
১৭.
গৃহত্যাগ করিয়া আবদুল কাদের বরিহাটীর সদরে আসিয়া তাহার সহপাঠী ওয়াহেদ আলীর বাটীতে আশ্রয় লইল। ওয়াহেদ আলী তখন বাটীতে ছিল না; কিছুদিন পূর্বে সে পুলিশের সব্-ইনস্পেক্টারি চাকরি পাইয়া ট্রেনিঙের জন্য ভাগলপুরে চলিয়া গিয়াছিল। তাহার পিতা আকবর আলী আবদুল কাদেরের পরিচয় পাইয়া সযত্নে তাহাকে নিজ বাটীতে স্থান দিলেন এবং চাকরি সম্বন্ধেও তাহাকে যথাসাধ্য সাহায্য করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন।
বরিহাটী জেলায় মোটের উপর মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা অধিক হইলেও শহরে মুসলমান বাসিন্দা বড় একটা দেখিতে পাওয়া যায় না। মুসলমান জমিদারগণের ভগ্নাবশেষ যে দুই-চারি ঘর এখনো টিকিয়া আছেন, সদরে বাড়ি করিয়া থাকিবার আবশ্যকতাও তাঁহাদের নাই, আর ক্ষমতাও নাই বলিলে চলে। তাহাদের বিষয়-সংক্রান্ত কাজকর্ম নায়েব গোমস্তা ও উকিলবাবুরাই করিয়া থাকেন, কৃচিৎ স্বয়ং হাজির হইবার দরকার পড়িলে নৌকায় আসেন এবং নৌকাতে থাকেন। তাই বলিয়া মুসলমান বাসিন্দা যে একেবারে নাই, তাহা নহে। শহরের এক প্রান্তে কয়েক ঘর পেয়াদা ও চাপরাসী শ্রেণীর লোক বাস করে; সেইটাই এখানকার মুসলমান পাড়া! আকবর আলী কালেক্টারির একজন প্রধান আমলা ছিলেন; চাকরি উপলক্ষে তাহাকে এখানে অনেক দিন হইতে বাস করিতে হইতেছে। কিন্তু অন্য কোথাও স্থান না পাইয়া তিনি এই মুসলমান পাড়াতেই বাসের উপযুক্ত খানকয়েক ঘর বাঁধিয়া লইয়াছেন।
যাহা হউক মুসলমানদিগের মধ্যে হিন্দু মহলে যা কিছু খাতির তা একশ্চন্দ্ৰস্তমো হন্তি গোছ আকবর আলীই পাইয়া থাকেন। কিন্তু সে খাতিরটুকুর মূলে, তাহার কার্যদক্ষতার গুণে সাহেব-সুবার সুনজর ব্যতীত আর কিছু ছিল কি না, তাহা সঠিক বলা যায় না।
বিদেশে অপরিচিত স্থানে একাধারে এহেন আশ্রয় ও সহায় পাইয়া আবদুল কাদের কতকটা আশ্বস্ত হইল বটে কিন্তু চাকরি কবে জুটিবে, ততদিন কেমন করিয়া নিজের খরচ চালাইবে, আর কতদিনই-বা বসিয়া পরের অন্ন ধ্বংস করিবে, ইহাই ভাবিয়া সে উতলা হইয়া উঠিল। সে আকবর আলীকে কহিল যে, যতদিন তাহার চাকরি না হয়, ততদিনের জন্য তাহাকে একটা প্রাইভেট টুইশন যোগাড় করিয়া দিলে বড় উপকৃত হইবে।
আকবর আলী তাহাকে বুঝাইয়া কহিলেন, –যদিও বরিহাটীতে অনেক শিক্ষিত লোকের বাস আছে, কিন্তু সকলেই হিন্দু; তাহাদের বাড়িতে টুইশন পাওয়া অসম্ভব, কেননা, একে তো তাহারা স্বজাতীয় লোক পাইতে অপরকে ও-কাজ দিতে রাজি হইবেন না, তাহার উপর আবার হিন্দু গ্রাজুয়েট, আণ্ডার-গ্রাজুয়েটের অভাব নাই, সুতরাং মাত্র এন্ট্রান্স পর্যন্ত পড়া মুসলমানের পক্ষে এ শহরে টুইশনের প্রত্যাশা করা ধৃষ্টতা বৈ আর কিছু নহে। তবে নিতান্ত যদি আবদুল কাদের বেকার থাকিতে অনিচ্ছুক হন, তবে আকবর আলী সাহেবের পুত্রটিকে মাঝে মাঝে লইয়া বসিলে তিনি বড়ই উপকৃত হইবেন।
এ প্রস্তাবে আবদুল কাদের সানন্দে সম্মত হইল এবং আকবর আলী সাহেবকে বহু। ধন্যবাদ দিয়া সেই দিন হইতেই তাহার পুত্রের শিক্ষকতায় লাগিয়া গেল। তাহার আগ্রহ এবং তৎপরতা দেখিয়া আকবর আলী মনে মনে সন্তুষ্ট হইলেন এবং যাহাতে সত্বর বেচারার একটা চাকরির যোগাড় করিয়া দিতে পারেন, তাহার চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
সৌভাগ্যক্রমে মাস দুইয়ের মধ্যেই একটি এপ্রেন্টিস্ সব্রেজিস্ট্রারের পদ খালি হইতেছে বলিয়া সংবাদ পাওয়া গেল। আকবর আলী অবিলম্বে আবদুল কাদেরকে লইয়া ম্যাজিস্ট্রেট করবেট সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলেন। করবেট সাহেব লোকটি বড় ভালো, যেমন কার্যদক্ষ, তেমনি খোশমেজাজ। অধীনস্থ কর্মচারীগণের ওপর তাহার মেহেরবানির সীমা নাই। দরিদ্র প্রজার সুখ-দুঃখও তাহার দৃষ্টি এড়াইতে পারে না এবং তাহাদের কিঞ্চিৎ উপকারের সুযোগ পাইলে তিনি তাহার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিয়া থাকেন।
