কিছু তো ঠিক করে উঠতে পাচ্ছি নে কী করব। ভাবছি মাস্টারি করে প্রাইভেট পড়ব।
সে কি সুবিধে হবে? তা হলে ল-টা আর পড়া হবে না…
তা জিজ্ঞাসা করবে ছিল
বছর দুই তিন মাস্টারি করে কিছু টাকা জমিয়ে শেষে ল পড়তে পারি।
ও, সে অনেক দূরের কথা। তার কাজ নেই, আমিই তোমার পড়ার খরচ দেব, তুমি কলেজে পড় গিয়ে!
আবদুল্লাহ্ তাহার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি স্থাপিত করিয়া কহিল, তা হলে তো বড়ই ভালো হয়, ফুফাজান। কিন্তু আম্মাকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখতে হবে।
তা জিজ্ঞাসা করবে বৈকি!
আবদুল্লাহ্ একটু ভাবিয়া কহিল, কিন্তু তিনি যদি আপনার টাকা নিতে না দেন?
মীর সাহেব একটু চিন্তিত হইয়া কহিলেন, তাও তো বটে! আমার টাকা নিতে আপত্তি করা তাঁর পক্ষে আশ্চর্য নয়। না হয় তুমি তাকে বোলো যে এ টাকা কর্জ নিচ্ছ, পরে যখন রোজগার করবে, তখন শোধ দেবে।
কিন্তু আবদুল্লাহর মনে খটকা রহিয়া গেল। তাহার মাতা যে সুদখোরের টাকা কর্জ লইতেও রাজি হইবেন, এরূপ সম্ভবে না। একটু ভাবিয়া অবশেষে সে কহিল, –আচ্ছা তাই বলে দেখব। নিতান্তই যদি আম্মা রাজি না হন, তখন মাস্টারি করতে হবে, আর কোনো উপায় দেখছি নে!
আবদুল খালেক কহিল, আরে তুমি আগে থেকেই এত ভাবছ কেন? বলে দেখ গে তো! রাজি হবেন এখন। মামুজান তো কর্জ দিচ্ছেন, তাতে আর দোষ কী!
মীর সাহেব কহিলেন, না, ভাববার কথা বৈকি! এঁরা সব পাক্কা দীনদার মানুষ, আমার সঙ্গে এদের ব্যবহার কেমন, তা জান তো!
আবদুল্লাহ্ কহিল, সেই জন্যেই তো আমি ভাবছি। তবু একবার বলে দেখি। তারপর আপনাকে জানাব।
এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ বিদায় গ্রহণ করিল।
১৬-২০. বড় দুইটি পুত্র
বড় দুইটি পুত্রের মধ্যে আবদুল কাদেরকেই একটু মানুষের মতো দেখা গিয়াছিল বলিয়া সৈয়দ সাহেব তাহার ওপর অনেক ভরসা করিয়া বসিয়া ছিলেন। আবদুল মালেক তো বাল্যকাল হইতেই বুদ্ধি-বিবেচনা বিষয়ে অভ্রান্ত স্থূলতা দেখাইয়া আসিতেছিল; তাই তাহার দ্বারা কাজের মতো কাজ কিছু একটা হইবার সম্ভাবনা না দেখিয়া তিনি পশ্চিম হইতে এক জন কারী (সুষ্ঠুভাবে কোরআন শরীফ পাঠে দক্ষ ব্যক্তি) আনাইয়া তাহাকে কোরআন মজিদ হেফজ (মুখস্থ) করিতে দিয়াছিলেন। তাহার পর মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর দিবারাত্র ঢুলিয়া ঢুলিয়া নানা সুরে নানা ভঙ্গিতে আয়েত (শ্লোক)-গুলি শতবার সহস্রবার আওড়াইয়া অবশেষে যখন আবদুল মালেক হাফেজ (আদ্যন্ত কোরআন মজিদ যাহার কণ্ঠস্থ) হইয়া উঠিল, তখন সৈয়দ সাহেব মনে করিলেন, যা হোক ছোঁড়াটার ইহকালের কিছু হোক না-হোক, পরকালের একটা গতি হইয়া গেল। এক্ষণে আবদুল কাদেরকে দিয়া কতদূর কী করানো যায়, তাহার দিকে মনোনিবেশ করিলেন।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর। আবদুল কাদের মাদ্রাসা পাস করিয়া পশ্চিমে যাইবে; সেখানকার বড় বড় আলেমগণের নিকট হাদিস, তফসির প্রভৃতি পড়িয়া দীনী এল এর (ধর্মবিষয়ক শিক্ষা) একেবারে চরম পর্যন্ত হাসেল (আয়ত্ত) করিয়া আসিবে, সৈয়দ সাহেব বহুকাল হইতে এই আশা হৃদয়ে পোষণ করিয়া আসিতেছিলেন। কিন্তু সে যখন তাঁহাকে এমন করিয়া দাগা দিয়া এলমে-দীনের পরিবর্তে এলমে-দুনিয়ার উপর ঝুঁকিয়া পড়িল, তখন তিনি ভয়ানক চটিয়া গেলেন এবং তাহার পড়াশুনা বন্ধ করিয়া দিয়া বাড়িতে আনাইয়া বসাইয়া রাখিলেন। রাগের মাথায় স্পষ্ট করিয়া মুখে কিছু না বলিলেও, ব্যবহারে। তাহার ঘোর বিরক্তি ও দারুণ অসন্তোষ পদে পদে প্রকাশ পাইতে লাগিল। এইরূপে বৎসরাধিক কাল কাটিয়া গেল।
আবদুল কাদেরের প্রকৃতি যে ধাতুতে গড়া তাহাতে অকর্মা হইয়া বসিয়া থাকা তাহার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর। প্রথম প্রথম কিছুদিন সে কর্মচারীদিগের সেরেস্তায় গিয়া বসিয়া জমিদারির কাজকর্ম দেখিতে আরম্ভ করিয়াছিল। আমলারা দেখিল মেজ মিয়া সাহেব যেরূপ উপদ্রব আরম্ভ করিয়াছেন, তাহাতে বেচারাদের চাকরি বজায় রাখা দায় হইয়া উঠিয়াছে। অবশেষে তাহারা একদিন খোদ্ কর্তাকে গিয়া ধরিয়া পড়িল; কর্তা আবদুল কাদেরকে ডাকিয়া ধমকাইয়া দিলেন এবং বুঝাইয়া দিলেন যে, আমলা-ফামলার কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করিতে যাওয়া জমিদার-পুত্রের পক্ষে সম্মানজনক নহে। পক্ষান্তরে ও-সকল কাজের ভিতর গিয়া ডুবিয়া পড়িলে দীনদারী বজায় রাখা অসম্ভব হয়; নহিলে কি তিনি নিজেই সব দেখাশুনা করিতে পারিতেন না! ওইসব দুনিয়াদারীর ব্যাপার আমলাদের উপর ছাড়িয়া দিতে পারিয়াছেন বলিয়াই তো তিনি নিশ্চিন্ত মনে খোদার নাম লইতে পারিতেছেন!
আবার বেকার বসিয়া বসিয়া কিছুকাল কাটিয়া গেল। অবশেষে একদিন আবদুল কাদের পিতার নিকট গিয়া প্রস্তাব করিল যে, সে কোনো একটা চাকরির সন্ধানে বিদেশে যাইতে চাহে। শুনিয়া সৈয়দ সাহেব একেবারে আকাশ হইতে পড়িলেন। জমিদারের ছেলে চাকরি করিবে–বিশেষ সৈয়দজাদা হইয়া! নাঃ, ছেলের আখেরাতের বিষয় আর উদাসীন হইয়া থাকিলে চলিতেছে না! অতঃপর সৈয়দ সাহেব প্রত্যহ দুবেলা তাহাকে কাছে বসাইয়া দীনী এলম্-এর ফজিলাত (গুণ) বয়ান (বর্ণনা) করিয়া, পুনরায় মাদ্রাসায় পড়ার আবশ্যকতা বুঝাইবার জন্য নানাপ্রকার নসিহৎ (উপদেশ) করিতে আরম্ভ করিলেন।
আল্লাহতালা মানুষকে দুনিয়ায় পাঠাইয়াছেন পরীক্ষা করিবার জন্য, কে কতদূর দুনিয়াদারির লোভ সামলাইয়া দীনদারীতে কায়েম থাকিতে পারে এবং তাহাকে ইয়াদ (স্মরণ করিতে পারে। যে গরিব, লাচার, তাহাকে অবশ্য সংসার চালাইবার জন্য খাটিতে হয়, খোদাকে ইয়াদ করিবার সময় বেশি পায় না, তাহার পক্ষে দিন-রাত এবাদত না করিতে পারিলেও মাফ আছে। কিন্তু আল্লাহতালা যাহাকে ধন-সম্পত্তি দিয়াছেন, সংসার চালাইবার ভাবনা ভাবিতে দেন নাই, তাহার পক্ষে পরীক্ষাটা আরো কঠিন করিয়াছেন। সে যদি দিন-রাত এবাদতে মশগুল না থাকে, তবে তাহার আর মাফ নাই। আর তেমন লোক যদি আবার দুনিয়াদারিতে মজিয়া পড়ে, তো সে নিশ্চয়ই জাহান্নামে যাইবে। অতএব যখন। আবদুল কাদেরের সংসারের ভাবনা আল্লাহতালা নিজেই ভাবিয়া রাখিয়া দিয়াছেন, তখন তাহার উচিত দীনের ভাবনা ভাবা, দীনী এল হাসেল করিয়া আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয় করা, ইত্যাদি ইত্যাদি।
