আবদুল খালেক কহিতে লাগিল, আমি হাত দিয়েছি তো ঢের কাজে–তা কোনোটাতেই লাভ মন্দ হচ্ছে না। আমার জমি বেশি নেই, ধান যা পাই, তাতে একরকম করে বছরটা কেটে যায়। তা ছাড়া আমার ক্ষেতগুলোতে হলুদ, –এটাতে খুবই লাভ আদা, মরিচ, সর্ষে, কয়েক রকম কলাই, তারপর পিঁয়াজ, রসুন, তরিতরকারি–এসব যথেষ্ট হয়, খেয়েদেয়েও ঢের বিক্রি করতে পারি। গোটা চারেক বরজ করিছি, তাতেও বেশ আয় হচ্ছে। সুপুরি নারিকেলের গাছ আমার বেশি নেই, আরো কিছু জমি নিয়ে বেশি করে লাগাব মনে কচ্ছি। যে জমিতে এগুলো দেব, সেখানে কলার বাগান করা যাবে, যদ্দিন ফসল না পাওয়া যায়, তদ্দিন কলা থেকেও কিছু কিছু আয় হবে। তারপর দেখ, মাছ তো আমাকে। আর এখন কিনতেই হচ্ছে না, কাজেই বাজার খরচ বলে একটা খরচ আমার একরকম করতেই হয় না বললে চলে। ছাগল, মুরগি, হাঁস এ-সব দেদার খেয়েও এ-বছর বেচেছি প্রায় শ দেড়েক টাকার, ক্রমে আরো বেশি হবে। একটু ভেবে দেখলে এই রকম আরো ঢের উপায় বার করা যায়, যাতে কারুর গোলামি না করে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কাটানো যেতে পারে।
এই সকল বিবরণ শুনিয়া আবদুল্লাহর মনে বড়ই আনন্দ হইল। সে কহিল, আচ্ছা, ভাইজান, চোখের উপর উপায় করবার এমন এমন সুন্দর পন্থা থাকতে কেউ যায় গোলামি করতে আর কেউ-বা হাত-পা কোলে করে ঘরে বসে আকাশ পানে চেয়ে হা-হুঁতাশ করে। কী আশ্চর্য!
আবদুল খালেক কহিল, আমার নিজের জীবনে যা ঘটেছে, তাতে বুঝতে পাচ্ছি যে, আমাদের শরাফতের অভিমান, দারুণ আলস্য, আর উপযুক্ত উপদেষ্টার অভাব, এই তিনটে কারণে আমরা সংসারের সুপথ খুঁজে পাই নে। কোনো রকমে পেটটা চলে গেলেই আল্লাহ্ আল্লাহ করে জীবনটাকে কাটিয়ে দিই। আর নেহাত পেট যদি না চলে, তো ঝুলি কাঁধে নিয়ে সায়েলী কত্তে বেরুই।
এইরূপ কথাবার্তা কহিতে কহিতে মগরেবের সময় হইয়া আসিল দেখিয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, তবে এখন উঠি, ভাইজান!
আবদুল খালেক স্ত্রীকে ডাকিয়া কহিল, ওগো, শুনছ, আবদুল্লাহ্ রোখসৎ হচ্ছে– একবার এদিকে এস।
রাবিয়া রান্নাঘরে ছিল, তাড়াতাড়ি হাতের কাজ ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া কহিল, এখনই রোখৃসৎ হচ্চেন কী, খখানকার সাহেব! আজ রাত্রে আমাদের বাড়িতে খেতে হবে যে।
আবদুল খালেক কহিল, না গো না, তার আর কাজ নেই। এখানে যে ও বেড়াতে এসেছে, তাতেই ওর শ্বশুরবাড়িতে কত কথা হবে এখন।
আবদুল্লাহ্ সোৎসুকে জিজ্ঞাসা করিল, কেন–কেন?
আবদুল খালেক কহিল, আমাদের সঙ্গে যে ওঁদের আজকাল মনান্তর চলছে।
মনান্তর হল কিসে?
ওই যে কটা তালুক খালুজান বিক্রি কল্লেন, সে কটা মামুজান আমারই নামে বেনামী করে খরিদ করেছেন কিনা, তাই।
হ্যাঁ তা তো শুনেছি। কিন্তু তাতে আপনার সঙ্গে মনান্তর হল কেন?
খালুজানের ইচ্ছে ছিল, কোনো আত্মীয়স্বজন কথাটা না জানতে পারে। বরিহাটীর দীনেশবাবু ওঁয়াদের উকিল কিনা, তাকে দিয়ে গোপনে বিক্রি করবার বন্দোবস্ত করেছিলেন। কিন্তু এদিকে দীনেশবাবুর সঙ্গে মামুজানের খুব ভাব; তাই যখন মামুজান জানতে পেরে নিজেই নিতে চাইলেন, তখন দীনেশবাবু আর আপত্তি কল্লেন না। খালুজান কিন্তু মনে
করলেন যে, আমিই পাকেচক্রে মামুজানকে সন্ধান দিয়ে খরিদ করিয়েছি।
আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা, উনি যখন বেচলেনই তখন আপনিই না হয় কিনলেন, তাতে আপনার অপরাধ!
আবদুল খালেক কহিল, ওই তো কথা ঘোরে রে ভাই! অপরাধ যে আমার কী, সেটা আর বুঝলে না? ছিলাম ওঁদের গোলাম হয়ে আর আজ কিনা দু পয়সা উপায় কচ্ছি, তার ওপর আবার ওঁদের তালুক কিনে ফেললাম, এতে আমার স্পর্ধা কি কম হল?
আবদুল্লাহ্ ব্যঙ্গ করিয়া কহিল, তা তো বটেই!
সেইজন্যেই তো বলছিলাম, তুমি আমাদের সঙ্গে মেলামেশা খাওয়াদাওয়া কল্লে তোমার শ্বশুরবাড়িতে কথা উঠবে।
তা উঠলই বা! ওঁরা চটলেন তো ভারি বয়েই গেল! এমনিই বড় ভালবাসেন কিনা…
আরে না, না। তুমি তো আজ বাদে কাল চলে যাবে, তারপর এর ঝক্কি সইতে হবে আমাদেরই।
রাবিয়া এবং আবদুল্লাহ্ উভয়েই প্রায় সমবয়সী। আবদুল খালেকের বিবাহ হওয়া অবধি তাহাদের অনেকবার দেখা-সাক্ষাৎ হইয়াছে এবং স্বাভাবিক স্নেহশীলতাগুণে রাবিয়া আবদুল্লাহকে অত্যন্ত আপনার করিয়া লইয়াছে। আবদুল্লাহও তাহাকে আপন ভগ্নীর ন্যায় ভক্তি করে এবং ভালবাসে; বিশেষত রাবিয়ার নিপুণ হস্তের রন্ধন এবং পরিবেশন-কালে ততোধিক নিপুণ আদর-কুশলতা এমনি লুব্ধ করিয়া রাখিয়াছে যে, ভ্রাতার প্রত্যাখ্যানে সে আজ বড়ই মনঃক্ষুণ্ণ হইয়া গেল। অগত্যা সে কহিল, তবে থাক এ যাত্রা ভাবী সাহেবা! আমি কিন্তু কাল ভোরেই রওয়ানা হব।
রাবিয়া কহিল, সে কী, ভাই!–বাড়ি এসে কি এক দিন থেকেই চলে যেতে আছে?
না ভাবী সাহেবা, এবার আর থাকতে পারছি নে। আম্মা ও-দিকে পথ চেয়ে আছেন, পড়াশুনার তো কোনো বন্দোবস্ত এখনো হয়ে উঠল না, অন্তত কাজ-কর্মের চেষ্টা তো দেখতে হবে। মনটা বড় অস্থির হয়ে আছে। খোদা যদি দিন দেন, তবে কত আসব যাব, আপনাকে বিরক্ত করব। এখন তবে আসি।
এই বলিয়া আবদুল্লাহ্ রাবিয়ার কদমবুসি করিয়া বিদায় লইল।
বাহিরে আসিয়া মীর সাহেবের নিকট বিদায় লইবার সময় তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তবে এখন তোমার পড়াশুনার কী করবে আবদুল্লাহ?
