নাশতার আয়োজন দেখিয়া আবদুল্লাহ্ কহিল, এ কী করেছেন ভাবী সাহেবা!
মীর সাহেব কহিলেন, ও তোমার ভাবী সাহেবার দোষ নয়, বাবা। আমারই অত্যাচার। তাহার পর একটু ভারী গলায় কহিতে লাগিলেন, আমার এই আম্মাটি ছাড়া আমাকে আদর করে খাওয়াবার আর কেউ নেই! তাই যখন এখানে আসি, ফরমাশের চোটে আমার আম্মাকে হয়রান করে দিই। খেতে পারি আর না-পারি, আমাকে পাঁচ রকম তয়ের করে খাওয়ানোর জন্যে উনি হাসিমুখে যে খাটুনিটা খাটেন, তাই দেখেই আমার প্রাণটা ভরে। যায়। আমার আম্মার আদরে সংসারের যত অনাদর-অবহেলা সব আমি ভুলে যাই। তাই ছুটে ছুটে আমার আম্মার কাছে আসি।
মীর সাহেবের কথায় সকলেরই চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। রাবিয়া তাড়াতাড়ি জল আনিবার ছলে সরিয়া পড়িয়াছিল।
এই মেয়েটিকে মীর সাহেব ছেলেবেলা হইতেই অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। ইহার মাতা তাহার দূরসম্পর্কের চাচাতো বোন, কিন্তু সম্পর্ক দূর হইলেও তিনি ইহাদিগকে আপনার জন বলিয়াই মনে করিতেন। তাই রাবিয়ার বিবাহের অল্প কাল পরেই যখন তাহার পিতার মৃত্যু হয় এবং তাহার মাতা শিশু-কন্যা মালেকাকে লইয়া অকূল সাগরে ভাসিলেন, তখন মীর সাহেবই তাহাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিলেন। মীর সাহেবেরই চেষ্টায় অসহায় বিধবার এবং কন্যা দুইটির সম্পত্তিটুকু অপরাপর অংশীদারগণের কবল হইতে রক্ষা পাইয়াছিল। সম্প্রতি তিনি মালেকারও বেশ ভালো বিবাহ দিয়া দিয়াছেন–জামাতা মঈনুদ্দীন একজন সব্ডিপুটি, তাহার ভ্রাতা মহিউদ্দীন ডিপুটি, পৈতৃক সম্পত্তিও ইহাদের মন্দ নহে। নূরপুর গ্রামের মধ্যে এই বংশই শ্রেষ্ঠ বংশ–পুরাতন জমিদার ঘর হইলেও নিতান্ত ভগ্নদশা নহে।
মীর সাহেবের এই সকল অযাচিত অনুগ্রহে রাবিয়া এবং তাহার মাতা ও ভগ্নী তাহার নিকট সর্বদা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উৎসুক। উপকার করিয়া মীর সাহেব যদি কাহারো নিকট আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পাইয়া থাকেন তবে সে এইখানেই।
নাশতার পর মীর সাহেব উঠিয়া বাহিরে গেলে আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, তারপর ভাইজান, আপনার কাজকর্ম চলছে কেমন?
আবদুল খালেক কহিল, তা খোদার ফজলে মন্দ চলছে না। মামুজানের মেহেরবানিতে আমার দুখখু ঘুচেছে! আজ প্রায় তিন বছর আম্মার এন্তেকাল হয়েছে, এরই মধ্যে মামুজানের পরামর্শমতো চলে আমার অবস্থা ফিরে গিয়েছে। আহা, এদ্দিন যদি মামুজানকে পেতাম, তবে কি আর শরিকের ঘরে গোলামি করতে যেতে হত? তা আম্মা ওঁর ওপরে এমন নারাজ ছিলেন যে, বাড়িতে পর্যন্ত আসতে দিতেন না।
কেন, সুদ খান বলেই তো!
তা ছাড়া আর কী? কিন্তু এমন লোক আর দেখি নি! সকলেই চায় গরিব আত্মীয়স্বজনের ঘাড় ভেঙে নিজের নিজের পেট ভরতে–কিন্তু ইনি গায়ে পড়ে এসে উপকার করেন। খালুজান যখন আমার মাইনে বন্ধ করে দিলেন, তখন উনিই তো এসে আমার সব দেনা। পরিশোধ করে আমাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে আনলেন, তারপর এইসব ক্ষেত-খামার, জমি-জারাত সব গুছিয়ে নিতেও তো আমাকে উনি কম টাকা দেন নি…।
আবদুল্লাহ্ কহিল, ওঁর যে সুদের টাকা, ওইখানটাতেই তো একটু গোল রয়েছে।
আবদুল খালেক কহিল, তা থাকলই-বা গোল, তাতে কিছু আসে যায় না। আর সুদ নিয়ে ওঁর যে গোনাহ্ হচ্ছে তার ঢের বেশি সওয়াব হচ্ছে পরের উপকার করে। এতেই আল্লাহতালা আখেরাতে ওঁর সব গোনাহ মাফ করে দেবেন বলে আমার বিশ্বাস।
এই কথাটি লইয়া আবদুল্লাহ্ কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিতে লাগিল, কিন্তু কোনো সন্তোষজনক। মীমাংসায় উপনীত হইতে পারিল না। একটু পরে আবদুল খালেক আবার কহিতে লাগিল, দেখ ভাই, উনি যে শুধু টাকা দিয়েই লোকের উপকার করেন, তা নয়; সৎপরামর্শ দিয়ে বরং তার চেয়ে ঢের বেশি উপকার করেন। আজকাল যে আমি এই ক্ষেত-খামার-গরু ছাগল-হাঁস-মুরগি–এই-সব নিয়ে আছি, আগে কখনো স্বপ্নেও আমার খেয়ালে আসে নি যে, এ-সব করে মানুষ সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে। এই পানের বরজ একটা জিনিস, যাতে বেশ দু পয়সা আয় হয়, এ তো বারুইদেরই একচেটে; কোনো শরীফজাদাকে বলে দেখো পানের বরজ করতে, অমনি সে আড়াই হাত জিভ বার করে বলবে, সর্বনাশ, ওতে জাত থাকে! ক্ষেতি-টেতির বেলাতেও সেই রকম; তাতে যে একটু নড়েচড়ে বেড়াতে হয়, সেই জন্যেই শরীফজাদাদের ওসব দিকে মন যায় না। ঘরে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং দিয়ে দুমুঠো মোটা ভাত জুটলেই তারা বিেশ থাকেন। নিতান্ত দায়ে ঠেকলে পরের গোলামি করে জুতো-লাথি খাবেন তাও স্বীকার, তবু ও-সব ছোটলোকের কাজে হাত দিয়ে জাত খোয়াতে চান না। এই আমার কী দশা ছিল, দেখ না; বিষয় যা পেয়েছিলাম, তাতে তো আর সংসার চলে না। কী করি, গেলাম ওঁদের গোলামি করতে–জমি-জারাত যা ছিল, সেগুলো যে খাঁটিয়ে খাব, সে চিন্তাই মনে এল না! তারপর মামুজান এসে যখন পথে তুলে দিলেন তখন চোখ ফুটল।
আবদুল্লাহ্ তন্ময় হইয়া কথাগুলি শুনিতেছিল। শুনিতে শুনিতে প্রতি মুহূর্তে তাহার মনের ভিতর নানাপ্রকার চিন্তা বিদ্যতের ন্যায় খেলিয়া যাইতেছিল। আর পড়া কি চাকরি-বাকরির দিকে না গিয়া ভাইজানেরই পথ অবলম্বন করিবে–কিন্তু তাহার উপযুক্ত জমি তেমন নাই, নগদ টাকাও নাই, কেমন করিয়া আরম্ভ করিবে? ফুফাজানের সাহায্য চাহিবে? আম্মা তাতে নারাজ হইবেন। তবে কিছুদিন চাকরি করিয়া টাকা জমাইয়া ওই সব কাজ শুরু করিয়া দিবে। সে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল, আচ্ছা, ভাইজান, আজকাল আপনি কী কী কাজ নিয়ে আছেন? আর কোন্ কোন্টায় বেশ লাভ হচ্ছে?
