শেষটা মাহতাবউদ্দীন যখন বড় হয়ে দেখলেন যে, তিনি প্রায় পথে দাঁড়িয়েছেন, তখন মামাতো ভাইয়ের নামে নালিশ কল্লেন। তখন শিবনাথও নেই, কিছুদিন আগেই মারা গেছে। মোকদ্দমা প্রায় তিন-চার বচ্ছর ধরে চলল, কিন্তু কোনো পক্ষেই কিছু প্রমাণ হল না, মাহতাবউদ্দীন হেরে গেলেন। লাভের মধ্যে তার যেটুকু সম্পত্তি অবশিষ্ট ছিল, তারও কতকটা মোকদ্দমার খরচ যোগাতে বিকিয়ে গেল।
এখন এই মোকদ্দমার সময় আর একটা মজার কথা প্রকাশ হয়ে পড়ল। শিবনাথ যে কেবল এ-শরিকেরই সর্বনাশ করে গিয়েছে, তা নয়, ওঁর নিজের মাথায়ও বেশ করে হাত বুলিয়ে গিয়েছে! কিন্তু যা হোক সব নিতে পারে নি। বেচারা হঠাৎ মারা গেল কিনা, আর কিছুদিন বেঁচে গেলে ও-শরিককেও হাতে মালা নিতে হত।
আবদুল খালেক কহিল, তারও বড় বেশি বাকি নেই, মামুজান। আমি তো এদ্দিন কাজ করে এলাম, সব জানি। তার ওপর আবার এই মসজিদ দেবার ঝেকে দেখুন না কী দাঁড়ায়।
আবদুল্লাহ্ কহিল, তা যাক্, এখন দেখছি ভোলানাথ বাবুরা এদের সম্পত্তি নিয়েই বড় মানুষ হয়েছেন…
মীর সাহেব কহিলেন, আর এঁরা হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন–তা একরকম ভালোই হয়েছে বলতে হবে।
কেন?
ও সম্পত্তিগুলো এদের হাতে থাকলে নাস্তাখাস্তা হয়ে যেত এদ্দিনে–দেখ না, যা আছে তারই দশা কী! আর দেখ তো ওদের দিকে চেয়ে, যেমন আয়ও ঢের বাড়িয়েছে, তেমনি সম্পত্তিও দিন দিন বাড়াচ্ছে–ছেলেগুলো সব মানুষ করেছে, বড় বড় চাকরি কচ্ছে।
আবদুল্লাহ্ কহিল, সুদের জোরেই তো ওরা বাড়ে, আমাদের যে সেটা হবার যো নেই।
মানি, সুদের জোরে বাড়ে কিন্তু ছেলেপিলে মানুষ হয়, সেও কি সুদের জোরে? এদিকে মহালের বন্দোবস্ত ভালো করেও তো আয় বাড়ানো যায়–তাই-বা কই? এঁরা কি কিছু দেখেন শোনেন? নায়েব-গোমস্তার হাতে খান, তারা যা হাতে তুলে দেয়, তাতেই খোশ!–এমন জুত পেয়ে যে ব্যাটা নায়েব কি গোমস্তা শিবনাথের মতো দু হাতে না লোটে, সে নেহাত গাধা।
এমন সময় সামু, আব্বা, দাদাজানকে আর চাচাজানকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির মধ্যে আসুন বলিতে বলিতে দৌড়িয়া আসিল। মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন ভাইজান, আম্মা কি নাশতা করাবেন আমাদের!
সামু কহিল, হ্যাঁ–হ্যাঁ। শিগগির আসুন বলিয়া সে দাদাজানের হাত ধরিয়া টানিয়া উঠাইল। অতঃপর সকলে বৈঠকখানার দিকে চলিলেন।
.
১৫.
এদিকে আসরের ওক্ত হইয়া গিয়াছে দেখিয়া মীর সাহেব বৈঠকখানায় প্রবেশ করিতে করিতে সামুকে ডাকিয়া কহিলেন, আম্মাকে বল গে, ভাইজান, আমরা নামায পড়ে যাচ্ছি।
জি আচ্ছা বলিয়া সামু দৌড়িয়া মাকে বলিতে গেল।
নামায বাদ তিন জনে অন্দরে আসিলেন। শয়নঘরের বারান্দায় ছোট একটি তক্তপোশের উপর ফর পাতা হইয়াছিল।
মীর সাহেব গিয়া তাহার উপর বসিলেন এবং আবদুল খালেক আবদুল্লাহকে ঘরের ভিতর লইয়া গেল।
আবদুল খালেকের পত্নী রাবিয়া মেঝের উপর বসিয়া পান সাজিতেছিল। আবদুল্লাহকে দেখিয়া আঁচলটা মাথার উপর তুলিয়া দিয়া হাসি-হাসি মুখে রাবিয়া কহিল, বাঃ, আজ কী ভাগ্যি! কবে এলেন, খোকার সাহেব?
আবদুল্লাহ্ রাবিয়ার কদমবুসি করিয়া কহিল, কাল সন্ধেবেলায় এসেছি। আপনি ভালো আছেন তো, ভাবী সাহেবা?
হ্যাঁ ভাই, আপনাদের দোয়াতে ভালোই আছি…
আবদুল খালেক ঠাট্টা করিয়া কহিল, আঃ, ওর দোওয়াতে আবার ভালো থাকবে! ও খখানকার হলে কী হয়, খোনকারী তো আর ও করে না যে, ওর দোয়াতে কোনো ফল হবে।
রাবিয়া কহিল, তা নাই-বা কল্লেন খোনকারী, ভালবেসে মন থেকে দোওয়া কল্লে সবারই দোয়াতে ফল হয়। বলুন না খোনকার সাহেব!
আবদুল খালেক আবদুল্লাহকে লইয়া খাটের সম্মুখস্থ তক্তপোশের উপর বসিলে রাবিয়া জিজ্ঞাসা করিল, বাড়ির সব ভালো তো ভাই? ফুফু-আম্মা কেমন আছেন?
তাঁর শরীরটা ভালো নেই…
তা তো না থাকবারই কথা; তা হালিমাকে আর বউকে এবার নিয়ে যান, ওরা কাছে গেলে ওঁর মনটা একটু ভালো থাকবে।
আবদুল্লাহ্ কহিল, তাই মনে কচ্ছি। কিন্তু আপনাদের বউকে হয়তো ওঁরা এখন পাঠাতে চাইবেন না।
কেন?
তাকে নিয়ে যেতে চাইলে আমার শ্বশুর তো বরাবরই একটা ওজর করেন–আর। আবার ব্যারামের সময়েই পাঠাইলেন না…
রাবিয়া একটু বিরক্তির স্বরে কহিল, বাঃ, তাই বলে বউকে আপনারা নিয়ে যাবেন না, বাপের বাড়িতেই চিরকাল রেখে দেবেন?
তাই রেখে দিতে হবে, দেখতে পাচ্ছি। আর তাকে নিয়ে যাওয়াও তো কম হাঙ্গামের কথা নয়, সঙ্গে বাঁদী তো নিদেনপক্ষে জন তিনেক যাবে–তা ছাড়া তার তো নড়ে বসতেই ছ মাস–হ্যাঁতে করে সংসারের কুটো গাছটিও নাড়ে না। এখন তাকে নিয়ে গেলে কেবল আম্মারই খাটুনি বাড়ানো হবে। তা ছাড়া আমাদের যে অবস্থা এখন, তাতে এতগুলো বাঁদী। পোষা-ও পেরে ওঠা যাবে না! তার চেয়ে এখন ওর এইখেনেই থাকা ভালো।
রাবিয়া একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিল, ও মেয়ে যে কখনো সংসার করতে। পারবে, তা বোধ হয় না! আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে দেখতে পাচ্ছি, খোনকার সাহেব!
আবদুল্লাহ্ কহিল, তা আর কী করব, ভাবী সাহেবা!
আবদুল খালেক কহিল, এখন আর কিছু করে কাজ নেই, চল নাশতাটা করা যাক। এই বলিয়া সে আবদুল্লাহকে বারান্দায় লইয়া গিয়া ফশের উপর ছোট্ট একটি দস্তরখান পাতিয়া দিল। রাবিয়া রেকাবিগুলি আনিয়া তাহার উপর সাজাইতে লাগিল।
