মীর সাহেব কহিলেন, আস্তে কথা, আস্তে! এইটুকুতেই কি অতটা চটলে চলে! এই রকমই তো আমাদের সমাজে ঘটে আসছে, নইলে কি আর আমাদের এমন দুর্দশা হয়? তোমাকে মাফ কল্লে তো লোকের কাছে ওঁর মান বাড়ত না, শুধু শুধু টাকাগুলোই বরবাদ যেত। আর এক্ষেত্রে দেখ দেখি, বাবা, হিন্দু সমাজে ওঁর কেমন নাম চেতে গেল!
আবদুল্লাহ্ কহিল, সে কথা ঠিক, ফুফাজান। সেইখানেই বসে বসেই নবাব বংশটংশ বলে ওঁকে খুব তারিফ করে গেল। যে ভোলানাথ বাবু ইচ্ছে কল্লে ওঁকে এক হাটে সাত বার বেচাকেনা কত্তে পারে, সে-ই বলতে লাগল, আমরা তো আপনাদেরই খেয়ে মানুষ! আর। উনি তাই সব শুনে এক্কেবারে গলে গেলেন!
মীর সাহেব কহিলেন, সে তো ঠিকই বলেছে! ওঁদের খেয়েই তো মানুষ ওরা।
কী রকম? ওরা যে মস্ত টাকাওয়ালা লোক!
মস্ত টাকাওয়ালা আজকাল হয়েছে; আগে ছিল না; সেসব কথা বোঝাতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়। আবদুল খালেক–-বোধ হয় জান কিছু কিছু…
আবদুল খালেক কহিল, শুনেছি কিছু কিছু, কিন্তু সব কথা ভালো করে জানি নে।
আবদুল্লাহ্ সাগ্রহে কহিল, বলুন না, ফুফাজান, শুনি।
মীর সাহেব আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করিয়া কহিতে লাগিলেন, ভোলানাথের বাপ শিবনাথ তোমার পর-দাদাশ্বশুরের নায়েব ছিল। তিনি যখন মারা যান, তখন তোমার দাদাশ্বশুর সৈয়দ আবদুস সাত্তার ছিলেন ছেলেমানুষ, এই ষোল-আঠার বছর বয়েস হবে, আর আবদুল খালেকের দাদা মাহতাবউদ্দীন তো নিতান্ত শিশু-তারও বাপ কিছু আগেই মারা। গিয়েছিলেন। এরা দুই জন মামাতো-ফুফাতো ভাই ছিলেন, তা বোধহয় জান। এখন। শিবনাথ দেখলে যে দুই শরিকের দুই কর্তাই নাবালক; কাজেই সে পাকেচক্রে একটাকে দিয়ে আর একটার ঘাড় ভাঙতে আরম্ভ কল্লে। এর ভেতরে আরো একটু কথা ছিল। সেটুকু খুলে বলতে হয়।
এঁদের সকলের পূর্বপুরুষ ছিলেন সৈয়দ আবদুল হাদি। তার বিস্তর লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল–আজ তার দাম লাখো টাকার উপর। তা ছাড়া ছোট বড় অনেক তালুকটালুকও ছিল। যাক সে কথা–সৈয়দ আবদুল হাদির কেবল দুই মেয়ে ছিল, ছেলে ছিল না। তাদের বিয়ে দিয়ে তিনি দুটো ঘরজামাই পুষলেন। এই দুই পক্ষই হল গিয়ে দুই শরিক… বড়টির অংশে হলেন গিয়ে তোমার শ্বশুর, আর ছোটটির হল আবদুল খালেক।
আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞাসা করিল, তবে এক শরিক সৈয়দ হলেন আর এক শরিক হলেন না কেন?
মীর সাহেব হাসিয়া কহিলেন, ঠিক ধরেছ বাবা! মা সৈয়দের মেয়ে হলে ছেলে সৈয়দ সচরাচর হয় না বটে, কিন্তু কেউ কেউ সেক্ষেত্রে সৈয়দ কওলান, কেউ কেউ কওলান না। আবদুল খালেকদের পূর্বপুরুষেরা বোধহয় একটু sensible ছিলেন, তাই তারা সৈয়দ কওলাতেন না।
যা হোক, এখন সৈয়দ আবদুল হাদি তার বিষয়-সম্পত্তি সমস্ত সমান দুই ভাগ করে দুই মেয়েকে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তিনি গত হলে মেয়েরা ভিন্ন হলেন–অবিশ্যি বাপের সেই রকমই হুকুম ছিল, –তা সত্ত্বেও দু বোনের মধ্যে ভারি ভাব ছিল। বড়টি পৈতৃক বসতবাটী, পুকুর, বাগান, মসজিদ, সমস্ত ছোট বোনকে দিয়ে নিজে একটু সরে গিয়ে নতুন বাড়ি করে রইলেন।
এদিকে ছোট বোনের একটিমাত্র ছেলে, তার বিয়ে হল খালাতো বোনের সঙ্গে। খালার ছেলে মাত্র একটি, তোমার পর-দাদাশ্বশুর তিনি। শিবনাথ ছিল তাঁরই নায়েব। দুই শরিকেরই নায়েব বলতে হবে, শুধু তার কেন–কেননা ও-শরিকের বিষয় দেখাশুনার ভার ছিল তোমার পর-দাদাশ্বশুরের ওপর। তিনি খুব কাজের লোক ছিলেন–তার আমলে শিবনাথ কোনো দিকে হাত চালাতে পারে নি। যা হোক, তিনি আর তার ভগ্নীপতি প্রায় এক সময়েই মারা গেলেন–রইলেন ও-ঘরে তোমার দাদাশ্বশুর, আর এ-ঘরে আবদুল খালেকের দাদা–দুই মামাতো-ফুফাতো ভাই।
আগেই বলেছি আবদুল খালেকের দাদা তখন নিতান্ত শিশু। তার বিষয় আশয় দেখাশুনার ভার তোমার দাদাশ্বশুরকেই নিতে হল। তিনিও একরকম ছেলেমানুষ, কাজেই শিবনাথের উপর ষোল আনা নির্ভর। আর তিনি বাপের আমলের নায়েব বলে শিবনাথকে মানতেনও খুব–আর ওদিকে বুদ্ধিসুদ্ধিও খোদার ফজলে ছিল একটু মোটা, তাই সে যা বলত তাই শুনতেন, যা বোঝাত তাই বুঝতেন। এখন এঁদের সম্পত্তি খানিকটা এর ফুফুর সঙ্গে ও-ঘরে গিয়ে পড়াতে ওরা সম্পর্কে ছোট শরিক হয়েও কাজে বড় শরিক হয়ে দাঁড়িয়েছে, এইটেই শিবনাথ বেশ ভালো করে আবদুস সাত্তারকে বুঝিয়ে দিলে। আর ওদের একটু খাটো করবার উপায়ও বাতলে দিলে, মাহতাবউদ্দীনের বড় দুই বোন আছে, তার অন্তত একটাকে বিয়ে করা আর যদ্দিন মাহতাব ছোট আছে, তদ্দিনের মধ্যে ওদের দু-চারটে মহালের খাজনা সেস্-টেস সব বাকি ফেলে ফেলে সেগুলো নিলেম করিয়ে বেনামীতে খরিদ করা। তোমাকে বলে রাখি আবদুল্লাহ্, হয়তো তুমি জানও, মাহতাবউদ্দীনের আর এক বোনকে তোমার দাদা নজিবউল্লাহ বিয়ে করেছিলেন।
আবদুল্লাহ্ কহিল, জি–হাঁ, তা জানি।
মীর সাহেব কহিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি একদম ফাঁকিতে পড়েছিলেন, বিষয়ের ভাগ এক কানাকড়িও পান নি। যা হোক, সৈয়দ আবদুস্ সাত্তার শিবনাথের পরামর্শমতোই কাজ করতে লাগলেন–আর কাজ তো আসলে শিবনাথই করত, তিনি খালি হাঁ করে বসেই থাকতেন। শেষটাতে বেচারা মাহতাবউদ্দীনের অনেকগুলো লাখেরাজ সম্পত্তি শিবনাথ কতক নিজের নামে, কতক তার স্ত্রীর নামে খরিদ করে ফেল্লে। আবদুস সাত্তার তার কিছুই জানতে পারলেন না।
