হঠাৎ ডাকে সামু ওরফে আবদুস সামাদ চমকিয়া ফিরিয়া চাহিল এবং বাঃ! চাচাজান। কখন এলেন? বলিয়া ছিপ ফেলিয়া উঠিয়া আসিয়া আবদুল্লাহর কদমবুসি (পদচুম্বন) করিল।
এই কাল এসেছি। তোরা ভালো আছিস্ তো?
জি হ্যাঁ–অ্যাঁ! ভালো আছি। বলিয়া সামু ঘাড়টা অনেকখানি কাত করিয়া দিল! আবদুল্লাহ্ তাহার মাথায় হাত রাখিয়া কহিল, –ক্রমেই যে লম্বা হয়ে চলেছি, সামু! গায়ে তো গোশত্ নেই। কেবল রোদে রোদে খেলে বেড়াস্ বুঝি আর মাছ ধরিস্–কেমন, না?
সামু মুখ নিচু করিয়া ঘাড় নাড়িয়া কহিল, –না, –আঃ—
কী মাছ পেয়েছিস দেখি?
বেশি পাই নি, দু-তিনটে বাটা আর একটা ফলুই…
ওঃ, তবে তো বড় পেয়েছিস দেখছি!
পাছে আবদুল্লাহ তাহার ক্ষমতা সম্বন্ধে ভুল ধারণা করিয়া বসেন, এই ভয়ে সামু তাড়াতাড়ি দুই হাতে এক বৃহৎ মৎস্যের আকার দেখাইয়া চোখ পাকাইয়া গম্ভীর আওয়াজে বলিয়া উঠিল, –আর একটা মস্ত মোটা মাছ, বোধ হয় রুই কি কাতলা হবে–আর একটু হলেই তুলেছিলাম আর কি!
তুলতে পাল্লিনে কেন?
সামু ক্ষুণ্ণস্বরে কহিল, –যে জোর কল্লে, কেটে গেল!
আবদুল্লাহ্ কহিল, –ভাগ্যি কেটে গেল, নইলে হয়তো তোকেসুদ্ধ টেনে পানির ভেতর নিয়ে যেত।
সামু আপনাকে যথেষ্ট অপমানিত জ্ঞান করিয়া কহিল, –ইস্, টেনে নিয়ে গেল আর কি! আমি কত বড় মাছ ধরি, ছিপে!
ওঃ, তাই নাকি? তবে তো খুব বাহাদুর হয়ে উঠেছি। স্কুলেটুলে যাস, না খালি মাছ মারিস?
সামু খুব সপ্রতিভভাবে কহিল–বা স্কুলে যাইনে বুঝি? এখন যে বন্ধ।
কোন্ ক্লাসে পড়িস?
গম্ভীরভাবে সামু কহিল, সিকসথ ক্লাস, দি পশ্চিমপাড়া শিবনাথ ইনস্টিটিউশন!
এই সাড়ম্বর নামোল্লেখ শুনিয়া আবদুল্লাহ্ মনে মনে একটু হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোদের স্কুল খুলবে কবে?
ওঃ, সে ঢের দেরি। সামনের সোমবারের পরের সোমবার।
এ ছুটির মধ্যে পড়াশুনা কিছু করিছিস?
বাঃ, করি নি বুঝি? রোজ সক্কালে উঠে পড়া করি। আজ দাদাজান আমার একজামিন নিলেন।
দাদাজান? কোন দাদাজান?
রসুলপুরের দাদাজান! আবার কে?
ও তিনি এসেছেন?
হ্যাঁ, আজ সক্কালে, আমি যখন পড়া কচ্ছিলাম, সেই তখন।
বাড়িতে আছেন?
নাঃ–আব্বার সঙ্গে তিনি ক্ষেতে গেছেন।
কোথায় ক্ষেত?
উ-ই যে ওদিকে–বলিয়া সামু আঙুল দিয়া বাড়ির পশ্চাৎদিক দেখাইয়া দিল। আবদুল্লাহ্ সেই দিকে প্রস্থান করিল এবং সামু পুনরায় তাহার বড়শিটোপে মন দিল।
ক্ষেতের কাছে গিয়া আবদুল্লাহ্ দেখিতে পাইল, জন দুই কৃষাণ জমি পাইট করিতেছে এবং তাহার এক পার্শ্বে দাঁড়াইয়া মীর সাহেব ও আবদুল খালেক তাহাদের কাজ দেখিতেছেন। দূর হইতে আবদুল্লাহকে দেখিতে পাইয়া তাহারা উভয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিলেন, বাঃ আবদুল্লাহ্ যে!
মীর সাহেব কহিলেন, আমি তোমাদের ওখানেই চলেছি। তা এখানে কবে এলে?
আবদুল্লাহ্ উভয়ের কদমবুসি করিয়া কহিল, কাল সন্ধেবেলা এসেছি।
ভালো তো সব?
হ্যাঁ, এক রকম ভালোই–আপনি পীরগঞ্জে যাবেন বলছিলেন…
হ্যাঁ, বাবা, তোমার চিঠি পেলাম তরশু দিন বাড়ি এসে–প্রায় মাসেক কাল আগের চিঠি, মনে করলাম একবার খবরটা নিয়ে আসি। তা ভালোই হল, তোমার সঙ্গে এইখানেই দেখা হয়ে গেল। এখন খবর কী, বল।
আবদুল্লাহ্ কহিল খবর আর কী, পড়াশুনোর আর কোনো সুবিধে করে উঠতে পাচ্ছিনে, ফুফাজান।
কেন, খরচপত্রের অভাবে?
জি হ্যাঁ।
তোমার শ্বশুরকে বলে দেখেছ?
তাই বলতেই তো আম্মা আমাকে ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিলেন; কিন্তু যা ভেবেছিলাম তাই– তিনি কোনো সাহায্য কত্তে পারবেন না।
মীর সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন পারবেন না, তা কিছু বললেন কি?
বললেন যে মসজিদটায় তার অনেক খরচ পড়ে যাচ্ছে, এ সময় হাত বড় টানাটানি কিন্তু এ-দিকে আর এক ব্যাপার দেখলাম।
কী?
শুনবেন? তবে আসুন এই গাছতলায় বসি–বসে বসে সব বলছি, সে বড় মজার কথা।
তিন জনে আমগাছের ছায়ায় ঘাসের উপর বসিয়া পড়িলেন। আবদুল্লাহ্ কহিল– পশ্চিমপাড়ার ভোলানাথবাবু এসেছিলেন একটা সুপারিশ কত্তে।
আবদুল খালেক কহিল, ওঃ বুঝেছি! মহেশ বোসের জন্যে তো?
হ্যাঁ তারই জন্যে–আপনি তা হলে জানেন সব?
কতক কতক জানি–ওসমানের মুখে শুনেছি। দেখুন মামুজান, আমার খালুজানের কাণ্ড, কোনো দিনও হিসেবপত্র দেখেন না, গোমস্তারা যা খুশি তাই করে। মহেশ বোস যে কতকাল থেকে টাকা লুটছে, তার ঠিক নেই। এবার ওসমান ধরেছে, গেল বছরের হিসেবে আট শ টাকারও ওপর তসরুফ হয়ে গেছে। এইবার মহেশটা জব্দ হবে।
মীর সাহেব কহিলেন, সে তার কাজ গুছিয়ে নিয়েছে, এখন তাকে আর কী জব্দ করবেন? না হয় টাকাটা ঘর থেকে আবার বার করে দেবে, এই তো? তা সে কত টাকাই তো নিচ্ছে, না হয় এ টাকাটা ফসকেই গেল।
আবদুল্লাহ কহিল, না, না, ফুফাজান, তাও ফসকায় নি। সে ব্যাটা গিয়ে ধরছে ভোলানাথবাবুকে, তিনি এসে একটু আমড়াগাছি কত্তেই আর কি! কর্তা অমনি খসখস করে লিখে দিলেন– মাফ!
আবদুল খালেক অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইয়া কহিল, –মাফ করে দিলেন, –সব?
আবদুল্লাহ্ কহিল, সব।
এই কথায় আবদুল খালেক ক্রোধ ও ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া উঠিল। যদিও তাহারা সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসদিগের শরিক, তথাপি অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হইয়া পড়ায় তাহাকে অনন্যোপায় হইয়া সৈয়দ সাহেবের সেরেস্তায় কয়েক বৎসর গোমস্তাগিরি করিতে হইয়াছিল। ঘটনাক্রমে এক সময়ে তাহার তহবিল হইতে আশিটি টাকা চুরি যায়; সৈয়দ সাহেব ওই টাকা উহার বেতন হইতে কাটিয়া লইবার আদেশ দেন। সেই কথা মনে করিয়া আবদুল খালেক চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, দেখুন তো মামুজান, এঁদের কী অবিচার! আমার বেলায় সিকি পয়সা ছাড়লেন না, আর এ ব্যাটাকে একেবারে আট আট শ টাকা মাফ। করে দিলেন।
