আচ্ছা, দেখি!
রতিকান্ত কহিতে লাগিল, –হুজুর একটি মুখের কথা বললেই বেচারা মাফ পেয়ে যায়–ও কটা টাকা তো হুজুরদের নখের ময়লা বৈ তো নয়!
সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –আচ্ছা দেখি।
মহেশ গলার চাদরখানি দুইটি হাতে জোড় করিয়া ঘরের ভিতর আসিল এবং আভূমি নত হইয়া সকলকে সালাম করিল। তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ওসমান আলী নামক সৈয়দ সাহেবের অপর একজন গোমস্তা খাতাপত্র লইয়া প্রবেশ করিল।
সৈয়দ সাহেব ওসমানকে আসিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –তুমি কী চাও?
ওসমান কহিল, –হুজুর, আমিই মহেশের তহসিলের গরমিলটা ধরেছিলাম কিনা তাই…
সৈয়দ সাহেব ক্রোধভরে কহিলেন, –তোমাকে কে আসতে বল্লে! যাও…
ওসমান বেচারা বে-ওকুফ হইয়া খাতাপত্র রাখিয়া চলিয়া গেল। অতঃপর সৈয়দ সাহেব মহেশকে কহিলেন, –কই দেখি, কোথায় গরমিল হচ্চে?
মহেশ কম্পিতহস্তে হিসাবের খাতা খুলিয়া দেখাইতে লাগিল এবং ক্রন্দনের সুরে কহিতে লাগিল, –হুজুর, কেমন করে এ টাকাটা যে কোথায় গেল তা আমি কিছুই ভেবে ঠিক করতে পাচ্ছি নে–এখন আপনি মাফ না কল্লে একেবারেই মারা পড়ি–বলিয়া সৈয়দ সাহেবের পা ধরিতে গেল।
আরে কর কী, কর কী বলিয়া সৈয়দ সাহেব পা টানিয়া লইলেন এবং কহিলেন, আচ্ছা যাও, ও টাকা আমি তোমাকে মাফ করে দিচ্ছি–আয়েন্দা একটু সাবধানে কাজকর্ম কোরো।
ভোলানাথ কহিলেন, –সে কি আর বলতে! এবার ওর যা শিক্ষা হল–কেবল আপনার দয়াতে পরিত্রাণ পেলে। এতে ওর যথেষ্ট চৈতন্য হবে।
সৈয়দ সাহেব হিসাবের খাতায় মাফ করা গেল লিখিয়া ফারসিতে এক খোঁচায় নিজের নাম দস্তখত করিয়া খাতাটা ছুড়িয়া দিলেন। মহেশ এক সুদীর্ঘ সালাম বাজাইয়া খাতাপত্র লইয়া চলিয়া গেল।
রতিকান্ত কহিতে লাগিল, –হুজুররা বাদশার জাত কিনা, নইলে এমন উঁচু নজর কি যারতার হয়? এঁদের পূর্বপুরুষদের কথা শুনিছি, তাদের কাছে কেউ কোনোদিন আশা করে নিরাশ হয় নি। এই যে একবালপুরে যত তালুকদার টালুকদার আছে, সমস্তই তো এই বংশেরই দান পেয়ে আজ দুমুঠো খাচ্ছে!
ভোলানাথ কহিলেন, –তাতে আর সন্দেহ কী! এ অঞ্চলে এঁরাই তো বুনিয়াদী জমিদার, আর সকলে এঁদেরই খেয়ে মানুষ। যেমন ঘর তেমনি ব্যাভার। ভগবান যারে দ্যান, তার নজরটাও তেমনি উঁচু করে দ্যান কিনা।
এমন সময় এক চাকর আবদুল মালেকের একটি শিশুপুত্র কোলে লইয়া কলিকায় ফুঁ দিতে দিতে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিল এবং শিশুটিকে ফর্শের উপর নামাইয়া দিয়া কলিকাটি পেচোয়ানের মাথায় বসাইয়া দিল।
সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –ওরে, আর একটা কল্কে নিয়ে আয় না। আর বাবুদের হুঁকোটা আলি নে…।
ভোলানাথ কহিলেন, –থাক্, বেলা হয়ে উঠল, আমরা এখন উঠি…
সৈয়দ সাহেব বাধা দিয়া কহিলেন, –না, না, একটু বসুন–ওরে, আর কল্কেয় কাজ নেই; এতেই হবে, কেবল কোটা নিয়ে আয়।
চাকর একটা শুকনা নারিকেলি হুঁকা আনিয়া ভোলানাথের হাতে দিল। সৈয়দ সাহেব স্বহস্তে পেচোয়ানের মাথা হইতে কলিকাটি তুলিয়া তাহাকে দিতে গেলেন।
ভোলানাথ না, না, না, থাক, থাক্ আমি নিচ্ছি বলিয়া একটু অগ্রসর হইয়া কলিকাটি লইলেন এবং ধূমপান করিবার জন্য বাহিরে যাইবার উদ্দেশ্যে ফরশ হইতে নামিয়া পড়িলেন।
সৈয়দ সাহেব কহিলেন, –ওকি, উঠলেন যে! এইখানেই বসে তামাকটা খান না, সরকার মশায়!
সরকার মহাশয় কহিলেন, –না, না, তাও কি হয়! আপনারা হচ্চেন গিয়ে আমাদের মনিব! বলিয়া তিনি বারান্দায় গিয়া শুষ্ক হুঁকায় টান দিতে লাগিলেন।
এদিকে আবদুল মালেকের শিশুপুত্রটি আসিয়া তাহার দাদাজানের ক্রোড় অধিকার করিয়া বসিয়াছে। দাদাজান পান খাইতেছেন দেখিয়া সে আমালে দাদাজান বলিয়া পক্ষী-শাবকের ন্যায় হাঁ করিয়া তাহার মুখের কাছে মুখ লইয়া গেল। পান তখন প্রায় ফুরাইয়াছে–কাজেই দাদাজান আর কী করিবেন, নড়া-নড়া দাঁতগুলির ফাঁকে যাহা কিছু লাগিয়া ছিল, তাহাই জিভ দিয়া টানিয়া টানিয়া খানিকটা লাল থুতুর সহিত মিশাইয়া তাহার মুখে ঢালিয়া দিলেন। ইহা দেখিয়া হরনাথ মুখোনি অত্যন্ত বিকৃত করিয়া ঘাড় ফিরাইয়া রহিল।
তামাক খাওয়া হইলে ভোলানাথ বৈঠকখানায় পুনঃপ্রবেশ করিলেন, এবং কলিকাটি যথাস্থানে প্রত্যর্পণ করিয়া বিদায় লইলেন।
.
১৪.
বৈকালে একটু বেড়াইতে যাইবে মনে করিয়া আবদুল্লাহ্ আবদুল মালেকের সন্ধানে তাহার মহলে গিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু দেখিল সে নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে এবং গৃহের অপর পার্শ্বে বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব তাহার দুই তিনটি ছাত্রী লইয়া নিম্নস্বরে সবক দিতেছেন। আবদুল্লাহ্ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, ইনি ওঠেন কখন?
মৌলবী সাহেব কহিলেন, –অঃ, আসরের আগে উঠতাই না–গুমানের বাতে বড় মিঞা সাব এক্কালে সত্ লইছেন বলিয়া তিনি মৃদু হাস্য করিলেন।
অগত্যা আবদুল্লাহ একেলাই বেড়াইতে বাহির হইল। সৈয়দ সাহেবদের বিস্তীর্ণ বাগানটির পশ্চাতেই আবদুল খালেকদের বৃহৎ পুষ্করিণী; তাহার ওপারে তাহাদের পুরাতন মসজিদটি মেরামতের দরুন তক্ত করিতেছে দেখিয়া আবদুল্লাহ্ ভাবিল, যাই, একবার। দেখিয়া আসি।
বাগানের পথটি ধরিয়া, পুষ্করিণীর তীর দিয়া আবদুল্লাহ্ মসজিদের ঘাটে গিয়া উপস্থিত হইল। সিঁড়ির উপর আবদুল খালেকের দশমবর্ষীয় পুত্র আবদুস সামাদ একাগ্রচিত্তে বসিয়া মাছ ধরিতেছিল, কেহ যে আসিয়া তাহার পিছনে দাঁড়াইয়া আছে তাহা সে টের পায় নাই। আবদুল্লাহ্ কহিল, –কিরে, সামু, কটা মাছ পেলি!
