ভোলানাথ এবং তাহার অনুচরবর্গ বৈঠকখানায় প্রবেশ করিতেই সৈয়দ সাহেব তাহাদের অভ্যর্থনার জন্য অসতে আজ্ঞা হোক, আসতে আজ্ঞা হোক, বলিতে বলিতে সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থান করিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু ভোলানাথ সরকার কহিলেন, –থাক্ থাক, উঠবেন না, আপনি কাহিল মানুষ–আমরা এই বসছি– বলিয়া তাহার ফরশের এক প্রান্তে উঠিয়া বসিলেন। সৈয়দ সাহেব তাঁহাদের নিকটে সরিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, –তারপর, সরকার মশায়, খবর ভালো তো?
সরকার মহাশয় পরম বিনয়ের সহিত কহিলেন, –হ্যাঁ, আপনার দোয়াতে খবর ভালো। আপনার শরীর-গতিক আজকাল কেমন?
সৈয়দ সাহেব একটু কাতরোক্তির সহিত কহিলেন, আর মশায় এ বয়সে আবার শরীর-গতিক! বেঁচে আছি, সেই ঢের। জ্বরটায় বড় কাহিল করে ফেলেছে…
সরকার মহাশয় কহিলেন, –তাই তো! আপনার চেহারা বড্ড রোগা হয়ে গেছে–তা আপনার বয়েসই বা এমন কী হয়েছে, দু-চার দিনেই সেরে উঠবেন এখন।
সৈয়দ সাহেব বলিলেন, –হ্যাঁ, বয়সে তো আপনি আমার কিছু বড় হবেন; কিন্তু আপনার শরীরটা বেশ আছে–আমি একেবারে ভেঙে পড়েছি…।
ভোলানাথ একটু হাসিয়া কহিলেন, –আমাদের কথা আর কী বলছেন, সৈয়দ সাহেব–খাটুনির শরীর, একটু মজবুত না হলে চলে না যে! আপনাদের সুখের শরীর কিনা, অল্পেই কাহিল হয়ে পড়েন। মনে করবেন ওটা কিছু না, তা হলে দুদিনেই তাজা হয়ে উঠবেন। সরকার মহাশয়ের সঙ্গে একটি যুবকও আসিয়াছিলেন। তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া আবদুল কুদ্দুস জিজ্ঞাসা করিলেন, –এটি কে, সরকার মশায়?
এটি আমার কনিষ্ঠ পুত্র হরনাথ! এম-এ পাস দিয়েছে, এখন আইন পড়ছে, –হরে, সৈয়দ সাহেবকে সেলাম কর বাবা, এরা হচ্ছেন আমাদের মনিব!
হরনাথ মাথা নোয়াইয়া সালাম করিলে সৈয়দ সাহেব কহিলেন–বেঁচে থাক, বাবা! তারপর ভোলানাথের দিকে চাহিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, –আপনার বড় ছেলেরা সব কোথায়?
তারা সব নিজের নিজের চাকরিস্থানে–বড়টি রাজশাহীতে–মেজটি বাঁকুড়ায়, আর সেজটি আছে কটকে।
বড়টি ডিপুটি হয়েছে, না?
আজ্ঞে না, সে মুনসেফ, মেজটি ডিপুটি হয়েছে আর সেজটি ডাক্তার।
বেশ বেশ, বড় সুখের কথা! আপনাদের উন্নতি দেখলে চোখ জুড়ায়, সরকার মশায়।
এ-সব আপনাদেরই দোয়াতে!
তা ছোটটিকে কি চাকরিতে দেবেন ঠিক করেছেন?
না, ওঁকে চাকরিতে দেব না–আর ওরও ইচ্ছে নয় যে চাকরি করে। আইন পাস করে ওকালতি করবে।
সৈয়দ সাহেব কহিলেন–তা বেশ, বেশ! ওকালতি করবেন উনি সে তো খুব ভালো কথা!–যত সব বাজে লোকের কাছে যেতে হয় মালি-মোকদ্দমা নিয়ে, একজন ঘরের ছেলে উকিল হলে তো আমাদেরও সুবিধে–কী বলেন সরকার মশায়!
সরকার মহাশয় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, –তা তো বটেই, তা তো বটেই–হারু তো আপনাদের ঘরের ছেলের মতোই–ওর বাপ-দাদা তো আপনাদের খেয়েই মানুষ!
সৈয়দ সাহেব হে হে হে করিয়া একটু হাস্য করিলেন। এমন সময় অন্দর হইতে এক তশতরি ছেঁচা পান এবং এক বাটা খিলি আসিল। সৈয়দ সাহেবের কয়েকটি দাঁত পড়িয়া গিয়াছে এবং অবশিষ্টের অনেকগুলিই নোটিশ দিয়াছে; তাই তিনি খিলিগুলি অভ্যাগতগণের দিকে বাড়াইয়া দিয়া চামচে করিয়া হেঁচা পান তুলিয়া তুলিয়া খাইতে লাগিলেন এবং তামাকের হুকুম করিলেন।
ভোলানাথ পান চিবাইতে চিবাইতে কহিলেন, আজ আপনার কাছে একটা দরবার নিয়ে এসেছিলাম, তা যদি মেহেরবানি করে শোনেন তো…
সৈয়দ সাহেব ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, –সে কী! সে কী! আমার কাছে আবার দরবার কী রকম!
দরবার বৈকি! একটা লোক–আমারই একজন আত্মীয়–মারা যায়, এখন আপনার দয়ার উপরই তার জীবন-মরণ!
কথাটা কী সরকার মশায়, খুলেই বলুন না। আমার যা সাধ্য থাকে, তা আমি করব।
ভোলানাথের নায়েব রতিকান্ত বলিয়া উঠিল, –সাধ্যের কথা কী বলছেন হুজুর! আপনার একটা মুখের কথার উপরেই সব নির্ভর করছে।
ভোলানাথ কহিতে লাগিলেন–বলছিলাম ঐ মহেশ বোসের কথা…
আবদুল কুদ্দুস জিজ্ঞাসা করিলেন, –কোন মহেশ বোস?
আপনারই তহসিলদার সে…
ওঃ, তারই কথা বলছেন? কেন কী হয়েছে?
ভোলানাথ দেখিলেন সৈয়দ সাহেব তাহার বিষয়-আশয় সম্বন্ধে বড় একটা খবর রাখেন না। আগেও এ-কথা তিনি জানিতেন, তবে এখন তাহার চাক্ষুষ প্রমাণ পাইয়া ভাবিলেন, তাহার কাজ হাসিল করিতে বড় বেগ পাইতে হইবে না। তিনি কহিলেন, –কথাটা এত সামান্য যে হয়তো সেটা আপনার নজরেই পড়ে নি, –কিন্তু সামান্য হলেও বেচারা গরিবের পক্ষে একেবারে মারা যাওয়ার কথা…
সৈয়দ সাহেবের ঔৎসুক্য চরম মাত্রায় চড়িয়া উঠিল! তিনি একটু অসহিষ্ণু হইয়া কহিলেন, আসল কথাটা কী, তাই বলুন না, সরকার মশায়!
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই বলছি। কথাটা কী, –বেচারার তহবিল থেকে কিছু টাকা খোয়া গেছে…।
খোয়া গেছে? কত টাকা?
বেশি নয়, এই শ’আষ্টেক আন্দাজ হবে…
কেমন করে খোয়া গেল?
তা সে নিজেই বুঝতে পাচ্ছে না, সৈয়দ সাহেব! গেল চোত মাসে হিসেব মিলাবার সময় ওটা ধরা পড়ল–একটা মাস সে অনেক করে উল্টেপাল্টে দেখলে, কিছুতেই টাকাটার মিল হল না;–এখন বেচারা একেবারে পাগলের মতো হয়ে গেছে…
সৈয়দ সাহেব বলিয়া উঠিলেন, –ওরে কে আছিস্, মহেশকে ডাক্ তো।
ভোলানাথ কহিতে লাগিলেন–আপনি দয়া না কলে বেচারার আর কোনোই উপায় নাই। অনেকগুলো পুষ্যি, না খেয়েই মারা যাবে!
