তা বেশ তো! পড় না হয়…
কিন্তু খরচ চালাব কেমন করে তাই ভাবছি। হুজুর যদি মেহেরবানি করে একটু সাহায্য করেন…
বাধা দিয়া শ্বশুর বলিয়া উঠিলেন, –হেঃ হেঃ আমি! আমি কী সাহায্য করব?
এই কটা মাসের খরচের অভাবে আমার পড়াটা বন্ধ হয়। সামান্যই খরচ, হুজুর যদি চালিয়ে দিতেন, তো আমার বড্ড উপকার হত…।
আমি কোথা থেকে দেব? আমার এখন এমন টানাটানি যে তা বলবার নয়। মসজিদটার জন্য ক বছর ধরে মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে যদি-বা শুরু করে দিয়েছিলাম, তা এখনো শেষ করতে পারলাম না। এবারে ব্যারামে পড়ে ভেবেছিলাম, বুঝি খোদা আমার কেসমতে ওটা লেখেন নি! তাড়াতাড়ি আকামত করে নামায শুরু করিয়ে দিলাম; কিন্তু কাজটা শেষ করতে এখনো ঢের টাকা লাগবে। কোথা থেকে কী করব ভেবে ভেবে বেচায়েন হয়ে পড়িছি। এখন এক খোদাই ভরসা বাবা, তিনি যদি জুটিয়ে দেন, তবে মসজিদ শেষ করে যেতে পারব। কিন্তু এখন আমার এমন সাধ্যি নেই যে, তোমাকে সাহায্য করি।
আবদুল্লাহ অত্যন্ত দুঃখের সহিত কহিল, তা হলে আর আমার পড়াশুনা হয় না, দেখছি!
শ্বশুর একটু সান্ত্বনার ও সহানুভূতির সুরে কহিলেন, তা আর কী করবে বাবা, খোদা যার কেসমতে যা মাপান, তার বেশি কি সে পায়? সকল অবস্থাতেই শোকর গোজারী করতে হয়, বাবা! সবই খোদাতালার মরজি! আর তা ছাড়া এতে তো তোমার ভালোই হবে, আমি দেখছি; তোমাকে ইংরেজি পড়তে দিয়ে তোমার বাপ বড়ই ভুল করেছিলেন, এখন বুঝে দেখ বাবা, খোদাতালার ইচ্ছে নয় যে তুমি ওই বেদীনী লোভে পড়ে দীনদারী ভুলে যাও। তাই তোমার ও-পথ বন্ধ করেছেন তিনি। তোমরা যে পীরের গোষ্ঠী, তোমাদের ও-সব চালচলন সইবে কেন, বাবা? ও-সব দুনিয়াদারি খেয়াল ছেড়ে-ছুঁড়ে দিয়ে দীনদারীর দিকে মন দাও, দেখবে খোদা সব দিক থেকে তোমারে ভালো করবেন ।
আবদুল্লাহ্ তাহার শ্বশুরের এই দীর্ঘ বক্তৃতায় অসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়াছিল। সে একটু বাধা দিয়া বলিয়া উঠিল, কিন্তু সংসার চালাবার জন্যে তো পয়সা রোজগার করতে হবে…
শ্বশুর বলিলেন, –কেন, তোমার বাপ-দাদারা সংসার চালিয়ে যান নি? তারা যেমন দীনদারী বজায় রেখেও সুখে-স্বচ্ছন্দে সংসার করে গেছেন, তোমরা এলে-বিয়ে পাস করেও তেমন পারবে না। আর লোকের কাছে কত মান সম্ভ্রম…
তারা যে কাজ করে গেছেন, আমার ও কাজে মন যায় না!
শ্বশুর একটু বিরক্তির স্বরে কহিলেন, –ওই তো তোমাদের দোষ। সাধে কি আমি ইংরেজি পড়তে মানা করি? ইংরেজি পড়লে লোকের আর দীনদারীর দিকে কিছুতেই মন যায় না–কেবল খেয়াল দৌড়ায় দুনিয়াদারির দিকে খালি পয়সা, পয়সা। আর তাও বলি, তোমার বাপ খোন্দকারী করেও তো খাসা পয়সা রোজগার করে গেছেন, তোমার পেছনেও কম টাকাটা ওড়ান নি! একটা ভালো কাজে টাকাগুলো খরচ করতেন, তাও না হয় বুঝতাম, নিজের আব্বতের কাজ করে গেলেন। নাহক টাকাটা উড়িয়ে দিলেন, না নিজের কোনো কাজে লাগল, না তোমাদের কোনো উপকার হল! আজ সে টাকাটা যদি রেখেও যেতেন তা হলে তোমাদের আর ভাবনা কী ছিল?
আবদুল্লাহ্ কহিল, –আমাকে লেখাপড়া শেখাবার জন্যে আব্বা যে টাকাটা খরচ করেছেন, অবিশ্যি তাতে তার নিজের আব্বতের কোনো উপকার হয়েছে কি না তা বলতে পারি নে, কিন্তু আমার যে তিনি উপকার করে গেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। যদি পড়া শেষ করতে পারতাম, তা হলে তো কথাই ছিল না; সেইজন্যেই আপনার কাছে কিছু সাহায্য চাইতে এসেছিলাম। তা যাক, এখনো খোদার ফজলে চাকরি করে যা রোজগার করতে পারব, তাতে সংসারের টানাটানিটাও তো অন্তত ঘুচবে। আব্ব তো চিরকাল টানাটানির মধ্যেই কাটিয়ে গেছেন…।
শ্বশুর বাধা দিয়া কহিলেন, –সে তারই দোষ; দু ঘর মুরীদান যাতে বাড়ে, সেদিকে তো তার কোনোই চেষ্টা ছিল না! তুমি বাপু যদি একটু চেষ্টা কর, তবে তোমার দাদা পর-দাদার নামের বরকতে এখনো হাজার ঘর মুরীদান যোগাড় করে নিতে পার। তা হলে আর তোমার ভাবনা কী? নবাবি হালে দিন গুজরান করতে পারবে-ও শত চাকরিতেও তেমনটি হবে না, আমি বলে রাখলাম বাপু!
ইহার উপর আবদুল্লাহর আর কোনো কথা বলিতে ইচ্ছা হইল না; সে চুপ করিয়া ঘাড় নিচু করিয়া বসিয়া রহিল। তাহাকে নীরব দেখিয়া শ্বশুর আবার কহিলেন, –কী বল?
জি না, ও-কাজ আমার দ্বারা হবে না।
সৈয়দ সাহেব একটু রুষ্ট হইয়া কহিলেন, –তোমরা যেসব ইংরেজি কেতাব পড়েছ, তাতে তো আর মুরব্বিদের কথা মানতে শেখায় না। যা খুশি তোমরা কর গিয়ে বাবা, আমরা আর কদিন! ছেলে তো একটা গেছে বিগড়ে, তাকেই যখন পথে আনতে পারলাম না, তখন তুমি তো জামাই, তোমাকে আর কী বলব বাবা!
আবদুল্লাহ্ আর কোনো কথাই কহিল না। এদিকে খোদা নেওয়াজ নাশতা লইয়া আসিল। আবদুল মালেকের ডাক পড়িল। তিনি আসিলে মৌলবী সাহেব তাহার ফরশী ছাত্রগণকে সঙ্গে লইয়া দস্তরখানে বসিয়া গেলেন। অপর ছাত্রেরা মাদুরের উপর বসিয়া গুনগুন করিয়া সবক ইয়াদ করিতে লাগিল বটে; কিন্তু বেচারাদের এক চোখ কেতাবের দিকে থাকিলেও আর এক চোখ অদূরবর্তী দস্তরখানটির দিকে ক্ষণে ক্ষণে নিবদ্ধ হইতে লাগিল।
.
১৩.
নাশতা শেষ হইতে হইতেই একজন চাকর আসিয়া সংবাদ দিল যে, পশ্চিমপাড়ার ভোলানাথ সরকার মহাশয় আরো একজন লোক সঙ্গে করিয়া সৈয়দ সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছেন। সৈয়দ সাহেব ব্যস্তসমস্ত হইয়া কহিলেন–নিয়ে আয়, নিয়ে আয় ওঁদের!
